ইমান/আখলাক

দৃষ্টি হেফাজতের ১৪টি কৌশল

বর্ণিত আছে, মিশরে এক যুবক ছিল। যে সব সময় মসজিদে পরে থাকতো এবং সালাত আদায় করত। সে মসজিদে আজানও দিত। তার চেহারায় আনুগত্যের ছাপ ও ইবাদতের জ্যোতি জ্বলজ্বল করত। একদিন সে আজান দেওয়ার জন্য মিনারে উঠল। মিনারের নিচেই ছিল এক খ্রিস্টানের বাড়ি। সে ওই বাড়ির দিকে দৃষ্টি দিল এবং বাড়ির মালিকের সুন্দরী মেয়েকে দেখে তার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ল। ফলে সে আজান না দিয়ে নিচে নেমে এল এবং সে বাড়িতে প্রবেশ করল। মেয়েটি বলল, ‘তুমি কী চাও?’ সে বলল, ‘আমি তোমাকে চাই।’ মেয়েটি বলল, ‘আমাকে কীজন্য চাও?’ সে বলল, ‘আমি তোমাকে বিয়ে করব।’ মেয়েটি বলল, ‘তুমি মুসলিম আর আমি খ্রিস্টান। তাই আমার পিতা কখনোই তোমার সাথে আমার বিয়ে দেবেন না।’ সে বলল ‘তবে আমি খ্রিস্টান হয়ে যাব।’ মেয়েটি বলল, ‘যদি এমনটি করতে চাও, তবে করে ফেলো।’

অতঃপর যুবকটি তাকে বিয়ে করার জন্য খ্রিস্টান হয়ে গেল এবং তাদের সাথেই সে বাড়িতে থেকে গেল।

সেদিন যুবকটি মেয়েটির বাড়ির ছাদে উঠল। আর তখনই সেখান থেকে পড়ে সে মারা গেল। সে মেয়েটিকে নিয়ে কোনো আনন্দ-উপভোগ করার সুযোগই পেল না, উলটো নিজের দ্বীন হারিয়ে চিরস্থায়ী শাস্তির উপযুক্ত হয়ে গেল। (আল-জাওয়াবুল কাফি : ১৯৮)

লক্ষ্য করুন, একটিমাত্র হারাম দৃষ্টি যুবকটিকে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দ্বীন থেকে বের করে খ্রিস্টান বানিয়ে দিলো। আরবের কোনো কবি বলেছেন- ‘হারামের স্বাদ একসময় নিঃশেষ হয়ে যায়, কিন্তু তার গুনাহ ও লজ্জা বাকি রয়ে যায়। ভবিষ্যতে তার মন্দ পরিণতিও জমা থেকে যায়। তাই তো বলি, সেই স্বাদে কী লাভ, যার পরে জাহান্নামের আজাব ভোগ করতে হবে?’

যারা চোখের পাপে জড়িত, তাদের সাথে হয়তো এমন ঘটনা হুবহু ঘটবে না। কিন্তু আমরা এটাও জানিনা এই দৃষ্টির এই বিষাক্ত তীর ব্যবহার করে শয়তান আমাদের কোথায় নিয়ে যাবে। আমরা অহরহই জিনা-ব্যবিচার, ধর্ষণ, ধর্ষণের পর খুন এমন অনেক ঘটনা দেখছি। এসব অপরাধের মূল সূত্রপাত কিন্তু দৃষ্টির অবৈধ ব্যবহার থেকে; চাই তা বাস্তবে সরাসরি দৃষ্টিপাত হোক বা কোনো চিত্র কিংবা পর্দায় দৃষ্টিপাত হোক। কুদৃষ্টির ফলেই মানুষের মধ্যে কামনা-বাসনার আগুন দাউদাউ করে জ্বলে উঠে- যার পরিণতিতে ঘটে নানা অন্যায়-অপরাধ। যে নিজের দৃষ্টিকে অবনত রাখেনা, সে শয়তানের প্ররোচনায় সহজে পতিত হয়। পক্ষান্তরে যে নিজের দৃষ্টিকে অবনত রাখে, সে অনেক গুণাহ থেকে সহজে বেঁচে থাকতে পারে; শয়তান তাকে কাবু করতে পারেনা।

আরও দেখুন:  আকাঙ্ক্ষা : গুরুত্ব ও ফযীলত - ২

চলুন দেখে নিই দৃষ্টি হেফাজতের কিছু উপায় যা আমাদেরকে মহান রবের একজন একনিষ্ঠ দাস হয়ে উঠতে সহযোগিতা করবে-

১. আল্লাহর সাহায্য কামনা: আল্লাহ ছাড়া বান্দার কোনো শক্তি বা সামর্থ্য নেই। তাই বান্দার উচিত আত্মনির্ভরতা পরিহার করে আল্লাহমুখী হওয়া, আল্লাহর কাছে শক্তি ও সামর্থ্য কামনার পাশাপাশি এই কামনা করা- যেন তিনি দৃষ্টি সংযত রাখতে সাহায্য করেন। আর আল্লাহ সহজ করে দিলে কোনোকিছু আর কষ্টসাধ্য হয় না। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- কিছু চাইলে, আল্লাহর কাছেই চাও; কারো কাছে সাহায্য কামনা করলে, আল্লাহর কাছেই করো। (সুনানুত তিরমিজি, হাদিস নং ২৫১৬)।

২. আল্লাহর ভয় অন্তরে সর্বদা বিরাজমান রাখা: বান্দা যখন এই কথা মনে রাখবে যে, আল্লাহ তার সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত আছেন; তিনি চোখের খেয়ানত, মনের লুকোচুরি সবই জানেন; তিনি গোপন বিষয়াবলি সম্পর্কেও খুব ভালো করে জানেন। তিনি বান্দার প্রতিটি আচরণ ও উচ্চারণের খবর রাখেন; তখন স্বাভাবিকভাবেই বান্দা আল্লাহর দেওয়া নিয়ামতের অপব্যবহার এবং তাঁর অবাধ্যতায় লিপ্ত হতে লজ্জাবোধ করবে।

৩. বিবাহ করে নেওয়া কিংবা লাগাতার রোজা রাখা: এ সম্পর্কে নবিজি সাল্লল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন- হে যুবক সম্প্রদায়, তোমাদের মধ্যে যে বিয়ে করার সামর্থ্য রাখে, সে যেন বিয়ে করে ফেলে। কেননা, তা চোখ ও যৌনাঙ্গ সংযত রাখার ক্ষেত্রে অধিক কার্যকরী। আর যে সক্ষমতা না রাখবে, সে যেন রোজা রাখে। কেননা, তা-ই তার যৌন উত্তেজনা দমিয়ে রাখবে। (সহিহুল বুখারি, হাদিস নং ৫০৬৬)

৪. নজর হেফাজতের উপকারিতা জানা: দুনিয়ার কোনো কাজের লাভ-ক্ষতি সম্পর্কে জানা থাকলে যেমন সে কাজের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয় এবং কষ্টসাধ্য হলেও তা সহজ মনে হয়, তেমনি আখেরাতের কাজের বেলায়ও একই কথা।

৫. নজর হেফাজত না রাখার ক্ষতি জানা: নারীদের প্রতি অবাধ দৃষ্টিপাতের ফলে যে অনিষ্টের মুখোমুখি হতে হয় সে সম্পর্কে অবগত থাকা চাই। এর দ্বারা নজরের হেফাজত সহজ হয়।

আরও দেখুন:  মায়ের জন্য পাত্র চেয়ে বিজ্ঞাপন : ইসলাম কী বলে?

৬. পরকাল নিয়ে চিন্তাভাবনা করা: মৃত্যুর ফেরশতার উপস্থিতি থেকে নিয়ে কবর, মুনকার-নাকিরের সওয়াল-জওয়াব, জান্নাত-জাহান্নামে প্রবেশসহ পরকালের বিভিন্ন ধাপে নিজেকে কল্পনা করা। কারণ, পরকালের ভাবনা মানুষকে আল্লাহমুখী ও দুনিয়াবিমুখ করে।

৭. সৎসঙ্গ লাভ করা, অসৎসঙ্গ পরিহার করা: মানুষ নিজের অজান্তে তার সঙ্গীর দ্বারা প্রভাবিত হয়। এ কারণে দেখবেন, আপনার মুমিন বন্ধু আপনাকে নজর হেফাজতের ব্যাপারে সাহায্য করছে। আর দুষ্ট বন্ধু আপনাকে পাপাচারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

৮. সর্বদা কুরআন কারিম সঙ্গে রাখা: সর্বদা কুরআন কারিম সঙ্গে রাখুন। যখনই সুযোগ হয়, কুরআন তিলাওয়াত করুন। এতে আপনার নজর হেফাজতে থাকবে।

৯. আল্লাহর জিকিরের পাবন্দি করা: জবানে সর্বদা আল্লাহর জিকির জারি রাখুন। কারণ, জিকিরের দ্বারা আপনার দৃষ্টি অনায়াসে সংযত থাকবে। জিকিরে মশগুল থাকলে আপনার হৃদয় আল্লাহর সঙ্গে যুক্ত থাকবে। এতে করে আশেপাশে থাকা নারীদের দিকে আপনার চোখ পড়বেই না; ফিতনায় পড়া তো অনেক দূরের কথা।

১০. নারীদের চলাফেরার স্থানসমূহ এড়িয়ে চলা: এসব স্থান থেকেই মূলত ফিতনার সূচনা হয়। আসলে, মানুষ নিজেকে সরাসরি ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতে চায় না। তাই শয়তান তাকে কৌশলে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যায়। নারী ও পুরুষ প্রাকৃতিকভাবেই একে-অপরের আকর্ষিত হয়। এ আকর্ষণের কোনো শেষ নেই, কোনো সীমা নেই। নারীদের প্রতি আকর্ষণকে কাজে লাগিয়ে শয়তান ওইসব স্থানে যাওয়া এবং অবস্থান করার প্রতি পুরুষের মনে আকাঙ্ক্ষা তৈরি করে। এরপর ধাপে ধাপে তাকে ফিতনায় ফেলে। এজন্য আল্লাহ তাআলা আমাদের সতর্ক করে দিয়ে বলেন- “হে ঈমানদারগণ, তোমরা শয়তানের পদাঙ্ক অনুস্মরণ করো না।” (সুরা নুর, আয়াত ২১)

১১. সর্বাবস্থায় দ্বীনের দাওয়াতের ফিকির রাখা: গুরুত্বপূর্ণ কিছু নিয়ে যখন একজন মুসলি চিন্তায় মগ্ন থাকবে, তখন ফালতু কিছু নিয়ে তার চিন্তাভাবনার সময় থাকবে না। আর কীভাবে বিশ্বের সকল মানুষকে আল্লাহর অনুগত বান্দায় রূপান্তরিত করা যায়- এরচেয়ে বড় ফিকির আর কী হতে পারে।

আরও দেখুন:  বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ

১২. নিজেকে নিজেই পরীক্ষা করা: কিছু সময় একটি কাপড় দিয়ে আপনার চোখদুটো বেঁধে রাখুন, এবং ধরে নিন আল্লাহ আপনার দৃষ্টিশক্তি ছিনিয়ে নিয়েছেন। দেখুন কতক্ষণ থাকা যায়; তারপর বাঁধন খুলে ফেলুন। আশা করি এই একটু সময়েই আপনি এই মহান নিয়ামতের কদর অনুভব করতে সক্ষম হবেন। সুতরাং আসুন, আল্লাহর দেওয়া নিয়ামত তাঁর অবাধ্যতায় ব্যবহার না করার ব্যাপারে আমরা প্রতিজ্ঞ হই।

১৩. তাওবা ও ইস্তেগফার: নারীদের থেকে দৃষ্টি সংযত রাখার ব্যাপারে আমরা তওবা করতে পারি। নজরের হেফাজতের ওপর আল্লাহ তাআলার সঙ্গে আবারও প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হতে পারি। তবে অবশ্যই আমাদের এবারের প্রতিজ্ঞা বাস্তবায়নের সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে।

১৪. জান্নাতে মুমিনদের প্রতিদান নিয়ে ভাবা: আল্লাহ তাআলা জান্নাতে আপনাকে যতগুলো নিয়ামত দিয়ে সম্মানিত করবেন, তার অন্যতম একটি হলো- আয়তলোচনা হুরেরা। তাদের গুণ বর্ণনা করে নবিজি সাল্লল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- “জান্নাতি কোনো রমণী যদি দুনিয়াবাসীদের প্রতি উঁকি দেয় তাহলে আসমান ও জমিনের মাঝের সবকিছু আলোকিত এবং সুরভিত হয়ে যাবে। তার মাথার ওড়না দুনিয়া ও এর মধ্যবর্তী সবকিছুর চেয়ে উত্তম। (সহিহুল বুখারি, হাদিস নং ২৭৯৬)। জান্নাতি হুরদের সৌন্দর্যের সাথে দুনিয়ার নারীদের কি তুলনা চলতে পারে। দুনিয়ার নারীদের দিকে অবৈধ দৃষ্টিপাত করে জান্নাতি হুরদের থেকে বঞ্চিত হওয়া কি কোনো বুদ্ধিমানের কাজ হতে পারে?

উপরন্তু লক্ষণীয় বিষয় এই যে, প্রবৃত্তির চাহিদার কোনো সীমা নেই। তাইতো একজন সুন্দরী নারীকে দেখার পর আবার এমন এক নারীরর দিকে চোখ পড়ে, যাকে আরও বেশি সুন্দরী মনে হয়। আর এভাবেই চোখের ক্ষুধা দূর করার চেষ্টা চলতে থাকে, কিন্তু…
এজন্য আমাদের ওপর আবশ্যক হলো, পরনারীদের থেকে নজর হেফাজত করা। তা ছাড়া নারী তো আমাদের উদ্দেশ্য নয়। মুমিনের একমাত্র উদ্দেশ্য তো আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করে জান্নাতে প্রবেশ করা।

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

মন্তব্য করুন

Back to top button