ছবি ব্লগবাংলাদেশ

ষাট গুম্বুজ মসজিদ

eid live

ষাট গম্বুজ মসজিদ বাংলাদেশের বাগেরহাট জেলার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত একটি প্রাচীন মসজিদ। বাংলার প্রথম স্বাধীন মুসলিম সুলতান শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহের (১৩৪২-১৩৫৮) বংশধর সুলতান নাছিরুদ্দীন মাহমূদ শাহের রাজত্বকালে (১৪৩৫-৫৯ খৃ.) খানজাহান আলী (১৩৬৯-১৪৫৯ খৃ.) দিল্লী থেকে যশোর-খুলনা অঞ্চলে আসেন। তিনি প্রথমে দিল্লীর সুলতানের এবং পরে বাংলার সুলতানের নিকট থেকে সুন্দরবন অঞ্চল জায়গীর হিসাবে পান। অতঃপর তিনি সুন্দরবনের কোল ষেঁষে দক্ষিণবঙ্গের একটি বৃহৎ অঞ্চলে গড়ে তোলেন ইসলামী খেলাফত। তাঁর প্রশাসনিক কেন্দ্র ছিল ‘খলীফাবাদ’। যা বর্তমানে ‘বাগেরহাট’ নামে পরিচিত। ভৈরব নদীর তীরে যশোরের বারোবাজারেও ছিল তাঁর অন্যতম প্রশাসনিক কেন্দ্র। জনকল্যাণে তিনি ৩৬০টি মসজিদ ও বহু বড় বড় দীঘি খনন করেন। ‘ষাট গুম্বুজ’ মসজিদ ছিল খানজাহানের সবচেয়ে বড় কীর্তি। ছালাত আদায়ের পাশাপাশি মসজিদটি খানজাহান আলীর ‘দরবার’ হিসাবেও ব্যবহৃত হ’ত।

ষাট গম্বুজ মসজিদ

এ মসজিদটি বহু বছর ধরে ও বহু অর্থ খরচ করে নির্মাণ করা হয়েছিল। পাথরগুলো আনা হয়েছিল রাজমহল থেকে। তুঘলকি ও জৌনপুরী নির্মাণশৈলী এতে সুস্পষ্ট। এটি বাংলাদেশের তিনটি বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের একটির মধ্যে অবস্থিত; বাগেরহাট শহরটিকেই বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। বাগেরহাট শহরটিকেই বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। ১৯৮৫ খ্রিষ্টাব্দে ইউনেস্কো এই সম্মান প্রদান করে।

মসজিদটি উত্তর-দক্ষিণে বাইরের দিকে প্রায় ১৬০ ফুট ও ভিতরের দিকে প্রায় ১৪৩ ফুট লম্বা এবং পূর্ব-পশ্চিমে বাইরের দিকে প্রায় ১০৪ ফুট ও ভিতরের দিকে প্রায় ৮৮ ফুট চওড়া। দেয়ালগুলো প্রায় ৮·৫ ফুট পুরু। ষাট গম্বুজ মসজিদে গম্বুজের সংখ্যা মোট ৮১ টি, সাত লাইনে ১১ টি করে ৭৭ টি এবং চার কোনায় ৪ টি মোট ৮১ টি। কালের বিবর্তনে লোকমুখে ৬০ গম্বুজ বলতে বলতে ষাট গম্বুজ নামকরণ হয়ে যায়, সেই থেকে ষাট গম্বুজ নামে পরিচিত।

মসজিদের অভ্যন্তরভাগ

মসজিদটির পূর্ব দেয়ালে ১১টি বিরাট আকারের খিলানযুক্ত দরজা আছে। মাঝের দরজাটি অন্যগুলোর চেয়ে বড়। উত্তর ও দক্ষিণ দেয়ালে আছে ৭টি করে দরজা। মসজিদের ৪ কোণে ৪টি মিনার আছে। এগুলোর নকশা গোলাকার এবং এরা উপরের দিকে সরু হয়ে গেছে। এদের কার্ণিশের কাছে বলয়াকার ব্যান্ড ও চূঁড়ায় গোলাকার গম্বুজ আছে। মিনারগুলোর উচ্চতা, ছাদের কার্নিশের চেয়ে বেশি। সামনের দুটি মিনারে প্যাঁচানো সিঁড়ি আছে এবং এখান থেকে আজান দেবার ব্যবস্থা ছিল। এদের একটির নাম রওশন কোঠা, অপরটির নাম আন্ধার কোঠা

ভেতরের দৃশ্য, পিলার সমূহ

মসজিদের ভেতরে ৬০টি স্তম্ভ বা পিলার আছে। এগুলো উত্তর থেকে দক্ষিণে ৬ সারিতে অবস্থিত এবং প্রত্যেক সারিতে ১০টি করে স্তম্ভ আছে। প্রতিটি স্তম্ভই পাথর কেটে বানানো, শুধু ৫টি স্তম্ভ বাইরে থেকে ইট দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। এই ৬০টি স্তম্ভ ও চারপাশের দেয়ালের ওপর তৈরি করা হয়েছে গম্বুজ।

মসজিদের মিম্বার

মসজিদটির নাম ষাট গম্বুজ (৬০ গম্বুজ) মসজিদ হলেও এখানে গম্বুজ মোটেও ৬০টি নয়,বরং গম্বুজ সংখ্যা ৭৭টি। ৭৭টি গম্বুজের মধ্যে ৭০ টির উপরিভাগ গোলাকার এবং পূর্ব দেয়ালের মাঝের দরজা ও পশ্চিম দেয়ালের মাঝের মিহরাবের মধ্যবর্তী সারিতে যে সাতটি গম্বুজ সেগুলো দেখতে অনেকটা বাংলাদেশের চৌচালা ঘরের চালের মতো। মিনারে গম্বুজের সংখ্যা ৪ টি-এ হিসেবে গম্বুজের সংখ্যা দাঁড়ায় মোট ৮১ তে । তবুও এর নাম হয়েছে ষাটগম্বুজ।

মসজিদের অভ্যন্তর

ঐতিহাসিকরা মনে করেন, সাতটি সারিবদ্ধ গম্বুজ সারি আছে বলে এ মসজিদের সাত গম্বুজ এবং তা থেকে ষাটগম্বুজ নাম হয়েছে। আবার অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন, গম্বুজগুলো ৬০ টি প্রস্তরনির্মিত স্তম্ভের ওপর অবস্থিত বলেই নাম ষাটগম্বুজ হয়েছে।

মসজিদ দর্শনীয় স্থানে রূপান্তরিত হওয়ায় সামনের আঙিনাকে সাজিয়ে তোলা হয়েছে বাহারি ফুল গাছের সমারোহে।

ষাট গম্বুজ মসজিদ প্রাঙ্গণের মূল ফটক

ষাট গম্বুজের পশ্চিম দিকে বিরাট একটি দিঘি আছে। এর মধ্যে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে জন্ম নেওয়া শাপলা মানুষকে যেমন বিমোহিত করে, ঠিক তেমনি জলের গভীরে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলে অজানা এক শঙ্কা নাড়া দেয় মনে; পুরোনো শেওলা শাপলার লতাকে কী ভয়ংকরভাবে জড়িয়ে আছে, ভাবলেই গা শিওরে ওঠে। অদ্ভুত কালো পানি যেন ভয়ের দূত! দিঘির এই অ্যাডভেঞ্চারের মধ্যেও অন্য রকম একটি ভালো লাগা আছে অবশ্যই—দর্শকই শুধু এর অনুভব করতে পারেন।

কথিত আছে যে, খানজাহান আলী ৯০ বছর বয়সে এই মসজিদের দরবার গৃহে এশার ছালাতরত অবস্থায় ৮৬৩ হিজরীর ২৬শে যিলহজ্জ মোতাবেক ১৪৫৯ সালের ২৫শে অক্টোবর তারিখে মৃত্যুবরণ করেন। যাঁর কবর হয় তাঁর খননকৃত পার্শ্ববর্তী বিশাল দীঘির পাড়ে। মোগল আমলে ১৬১০ সালে ঢাকা বাংলার রাজধানী হওয়ায় এই অঞ্চল এক প্রকার লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে যায়।

দুর্ভাগ্য, এই বিজয়ী সেনাপতি ও রীতিমত একজন রাষ্ট্রনেতাকে এখন পীর বানানো হয়েছে এবং তাঁর কবরকে মাযার বানিয়ে পূজা করা হচ্ছে। ২০১৪ সাল থেকে ষাট গুম্বজ মসজিদ সরকারী ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হচ্ছে। এখানে রেষ্ট হাউজ, গেষ্ট হাউজ এবং অন্যান্য ভৌত কাঠামো তৈরী করে স্থানটিকে আরও অধিক দর্শনীয় করা হয়েছে। বর্তমানে টিকেট সিস্টেমে দর্শকদের যেতে দেওয়া হচ্ছে। তবে কেবল আযান থেকে ছালাত শেষ হওয়া পর্যন্ত মুছল্লীদের জন্য কোন টিকেট লাগে না। কিন্তু মসজিদের ধর্মীয় ভাব-গাম্ভীর্য বিনষ্ট করা হচ্ছে মূলতঃ মুছল্লী ব্যতীত অন্যদের ঢালাও প্রবেশাধিকার দেওয়ার কারণে। এমনকি অর্ধনগ্ন মেয়েরাও সেখানে প্রবেশ করে সেলফী তোলায় ব্যস্ত থাকছে। যা মসজিদের ইমাম-মুওয়াযযিন ও সাধারণ মুসলমানদের ক্রমেই বিক্ষুব্ধ করে তুলছে।

অতএব কেবল অর্থ উপার্জন নয়, সরকারের কর্তব্য হবে মসজিদের ও খানজাহান আলীর কবরের যথাযথ মর্যাদা রক্ষা করা। দর্শনীয় স্থান সমূহ ভ্রমণের উদ্দেশ্য হ’ল আল্লাহর রহমতের নিদর্শন সমূহ স্বচক্ষে দেখা ও সেখান থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা। আল্লাহ খানজাহান আলীকে দিল্লী থেকে যশোর-খুলনায় পাঠিয়েছিলেন। অতঃপর এতদঞ্চলে ইসলামী বিধান কায়েম করেছেন এবং জনকল্যাণে বিপুল অগ্রগতি সাধন করেছেন। অমুসলিম অধ্যুষিত এই অঞ্চলটি এখন মুসলিম অধ্যুষিত। এটা কেবল আল্লাহর রহমতেই সম্ভব হয়েছে। এখন আমাদের কর্তব্য হবে নিজেদের জীবনকে ইসলামী বিধান অনুযায়ী পরিচালিত করা এবং অন্যদেরকেও সেদিকে আকৃষ্ট করা। যদি আমরা তাতে ব্যর্থ হই, তাহ’লে আল্লাহ বলেন, ‘এক্ষণে যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও, তাহ’লে তিনি তোমাদের পরিবর্তে অন্য জাতিকে স্থলাভিষিক্ত করবেন। অতঃপর তারা তোমাদের মত হবে না’ (মুহাম্মাদ ৪৭/৩৮)। অতএব আমাদের কর্তব্য হবে প্রাকৃতিক নিদর্শনগুলি থেকে আল্লাহর সৃষ্টিতত্ত্ব উপলব্ধি করা এবং তাঁর অবাধ্যতা হ’তে বিরত হওয়া। আল্লাহ আমাদেরকে তাঁর সৃষ্টি ও ব্যবস্থাপনা কৌশল অনুধাবনের ও তাঁর প্রতি বিনীত হওয়ার তাওফীক দান করুন- আমীন!

কীভাবে যাবেন?
ঢাকার গুলিস্তান থেকে সরাসরি বাস আছে বাগেরহাটে যাওয়ার। আবার মুন্সিগঞ্জের মাওয়া থেকে লঞ্চ বা ফেরিতে পদ্মা নদী পার হয়ে কাঁঠালবাড়ি থেকে বাসে সরাসরি বাগেরহাটে যেতে পারেন। এই সড়কটাও চমৎকার। গাবতলী থেকেও বাগেরহাটে যাওয়ার বাস ছাড়ে। যাঁরা সময় নিয়ে যাবেন, তাঁরা বাগেরহাট থেকে মোংলায় গিয়ে সেখান থেকে মোটরচালিত নৌকায় চড়ে সুন্দরবনে ঘুরে আসতে পারেন। বলে রাখা ভালো, বাগেরহাটে থাকার ব্যবস্থা একটু কম। দু-একটা হোটেল রয়েছে।

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

মন্তব্য করুন

Back to top button