সংবাদ

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ৭৮ হাজার শিক্ষক-কর্মচারি বেতন ভাতা পাচ্ছে না

প্রাণঘাতি করোনা মহামারীর ভয়াবহ সঙ্কটকালে সারাদেশে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা প্রকল্পের ৭৮ হাজার শিক্ষক-শিক্ষিকা, কর্মকর্তা-কর্মচারি গত জানুয়ারি মাস থেকে বেতন-ভাতা পাচ্ছে না। গত ডিসেম্বর মাসে পাঁচ বছর মেয়াদী এ প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। মাহে রমজানে লকডাউনের মাঝে এসব শিক্ষক-কর্মচারি অনাহার অনিদ্রায় দিন কাটাচ্ছেন। অনেকেই ইফতারি ও সেহরির খাবার যোগাতে পারছেন না। ধার-দেনা করে চলার পর এখন আর দোকানদাররাও তাদেরকে বাকিতে কোনো জিনিস দিচ্ছে না। নিরুপায় হয়ে ইফার এসব অসহায় শিক্ষক-শিক্ষিকা কর্মকর্তা-কর্মচারিদের কেউ কেউ ত্রাণের জন্য নানা দিকে ছুঁটাছুটি করেও কোনো ত্রাণ পাচ্ছে না। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইফার গণশিক্ষার একাধিক অসহায় শিক্ষক এতথ্য জানিয়েছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১৯৯৬ সনে ইফার মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা প্রকল্প চালু হয়। বর্তমানে সারাদেশে ইফার ৭৩ হাজার ৭৬৮টি গণশিক্ষা কেন্দ্রে একজন করে শিক্ষক এবং ২৪ লাখ ৩০ হাজার ২০০জন ছাত্র-ছাত্রী অধ্যায়নরত। এসব ছাত্র-ছাত্রীদের দ্বীনিশিক্ষাসহ সাধারণ শিক্ষা দেয়া হচ্ছে। এ প্রকল্পের আওতায় ২০১৭ সনে সারাদেশে ১ হাজার ১০টি দারুল আকরাম এবতেদায়ী মাদরাসা চালু করা হয়। এসব এবতেদায়ী মাদরাসায় ২ হাজার ২০ জন শিক্ষক-শিক্ষিকাও গত জানুয়ারি মাস থেকে বেতন-ভাতা পাচ্ছে না। এসব অসহায় শিক্ষক-শিক্ষিকা কর্মচারিরা ধর্ম প্রতিমন্ত্রী, ইফার ডিজি ও ইফার বোর্ড অব গভর্নস-এর কাছে ধরণা দিয়েও কোনো সুরাহা পাচ্ছে না।

উল্লেখিত এবতেদায়ী মাদরাসায় তিনজন করে নতুন শিক্ষক নিয়োগের পরীক্ষা নিয়েও ২০১৮ সন থেকে ৩ হাজার ৩০জন শিক্ষক-শিক্ষিকাকে চূড়ান্ত নিয়োগ না দিয়ে ঝুঁলিয়ে রাখা হয়েছে। নিয়োগের জন্য অপেক্ষমাণ এসব প্রার্থীদের বয়স শেষ হয়ে যাচ্ছে। তারা বর্তমানে চরম হতাশায় ভুগছেন।

এছাড়া ইফায় অডিট আপত্তির বেড়াজালে পড়ে ইফার তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণির ৩৫৯ কর্মচারি দীর্ঘ ৬ মাস যাবত বেতন-ভাতা পাচ্ছে না। প্রতিদিন তাদের হাজিরা খাতায় উপস্থিতি নেয়া হচ্ছে। কাউকে কাউকে ওভার টাইমও দেয়া হচ্ছে। কিন্ত বেতন পরিশোধের কোনো উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে না। রমজান মাসে এসব ক্ষুধার্ত কর্মচারি পরিবার পরিজন নিয়ে ঠিক মতো ইফতারি ও সেহরিও খেতে পারছেন না। বেতন-ভাতা পরিশোধের দাবিতে এসব অসহায় কর্মচারি গত ১৫ এপ্রিল আগারগাওস্থ ইফার কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে। গত ৫ মে এসব কর্মচারির পক্ষে ফিরোজ আহমেদ ও রিংকুর নেতৃত্বে কয়েকজন কর্মচারি ইফার ডিজি আনিস মাহমুদের সাথে সাক্ষাত করে তাদের বেতন ভাতা পরিশোধের দাবি জানায়। ইফা ডিজি এ ব্যাপারে উপর মহলে তদবির করার পরামর্শ দেন।

আরও দেখুন:  "আল্লাহ" শব্দের ব্যবহার নিয়ে মালয়েশীয় আদালতের রায়

ইফার ভুক্তভোগিরা জানায়, ইসলামিক ফাউন্ডেশনে ৯৭টি অডিট আপত্তির মধ্যে ৩৫জন সহকারি পরিচালক, সাবেক ডিজির আশির্বাদপুষ্ট ইফার হিসাব নিয়ন্ত্রক মো. আজাদ আলীসহ অনেকেই নিয়মিত বেতন-ভাতা পাচ্ছেন। অথচ তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারিদের বেতন ভাতা পরিশোধ করা হচ্ছে না। এতে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের দ্বিমুখী নীতি ফুটে উঠেছে।

আজ বুধবার ধর্ম মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সাবেক ডিজি সামীম মোহাম্মদ আফজালের সময়ে ২০১৯ সনের শেষের দিকে মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষার পাঁচ বছর মেয়াদী প্রকল্পে প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকার বরাদ্দ চেয়ে ধর্ম মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়। মন্ত্রণালয় উল্লেখিত প্রস্তাবটি পরিকল্পন কমিশনে পাঠায়। দফায় দফায় যাচাই বাছাই করেও ৯ হাজার কোটি টাকার পাঁচ বছর মেয়াদী প্রকল্প পাশ হয়নি। পরবর্তীতে ইফা কর্তৃপক্ষ বিলম্ব হলেও কাট-ছাঁট করে ৩ হাজার ১২৮ কোটি ৪৬ লাখ টাকার বরাদ্দ চেয়ে ধর্ম মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব দেয়। এ নিয়ে ইফার ডিজি আনিস মাহমুদ ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শেখ মো. আব্দুল্লাহর বাসায়ও একাধিক বৈঠক করেন।

অবশেষে ধর্ম মন্ত্রণালয় গত ৫ মে মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা প্রকল্পের পাঁচ বছর মেয়াদে ৩ হাজার ১২৮ কোটি ৪৬ লাখ টাকার অর্থ বরাদ্দের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে ফাইল প্রেরণ করেছে। ইফার মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা প্রকল্পের ফাইল বিলম্বে প্রেরণ করায় পরিকল্পনা কমিশন ক্ষোভ প্রকাশ করেছে বলে জানা গেছে।

ধর্ম মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়, ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শেখ মো. আব্দুল্লাহ আসন্ন ঈদ-উল-ফিতরের আগেই মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা প্রকল্পের ৭৮ হাজার শিক্ষক-কর্মকর্তা কর্মচারিদের বেতন বোনাস পরিশোধের জন্য ইফার মডেল মসজিদ ফান্ড থেকে প্রায় ১শ’ কোটি টাকা ঋণ নেয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীর সম্মতি নেয়ার চেষ্টা করছেন। উল্লেখিত প্রকল্প পাশ হলেই উক্ত ঋণের টাকা পুনরায় মডেল মসজিদ ফাউন্ডকে ফেরত দেয়া হবে।

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

মন্তব্য করুন

Back to top button