সংবাদ

ইমাম-মুয়াজ্জিনদের টানাটানির সংসার

ফজর থেকে এশা পাঁচ ওয়াক্ত সঠিক সময়ের মধ্যে নামাজ পড়ানোর দায়িত্ব পালন করেন মসজিদের ইমাম। আর এ প্রতিটি নামাজের আগেই সময় মেনে আযান ও ইক্বামত দেন মুয়াজ্জিন। খুব বেশি শারিরীক অসুস্থতা না থাকলে ঝড়-বৃষ্টি ও প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেই এ দুই পদে নিয়োজিত ব্যক্তিরা দায়িত্ব পালন করে চলেন নিয়মিত। ধর্মপ্রাণ মানসিকতার পাশাপাশি পেশা হিসেবেও এই দায়িত্ব পালন করেন তারা। তবে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পেশা হিসেবে বেছে নিলেও মসজিদ কমিটি থেকে পাওয়া অর্থে সংসার চলে না, অভাব-অনটন লেগেই থাকে। ইমাম-মুয়াজ্জিনদের এ অভাবের চিত্র শহরের তুলনায় গ্রামে আরও প্রকট। এক্ষেত্রে ২০০৬ সালে ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয় ‘মসজিদ ব্যবস্থাপনা নীতিমালা’ প্রণয়ন করলেও বাধ্যবাধকতা না থাকায় কমিটিগুলো এসব নিয়ম মানে না।

ঢাকা ও ঢাকার বাইরের অন্তত ১৫ জন ইমাম-মুয়াজ্জিন ও খতিবের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাজধানীতে গড়পড়তা ইমামদের সম্মানি ৬ থেকে ১৫ হাজার টাকার মধ্যে। আর মুয়াজ্জিনের বেতন সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা। তবে এ সর্বোচ্চ সম্মানি দেওয়া হয় খুব কমসংখ্যক মসজিদেই। দীর্ঘদিন ধরে অধিকাংশ মসজিদে মুয়াজ্জিনের সম্মানি ৫/৬ হাজার। কোনও কোনও গ্রামের মসজিদে মৌসুমভিত্তিক ধান তুলে তাদের দেওয়া হয়।

ঢাকার বাইরে কয়েকটি গ্রামের মসজিদের ইমাম ও খতিবরা জানান, মসজিদগুলোর আয় কম হওয়ায় কমিটির তহবিলও কম। কোনও কোনও গ্রামের মসজিদে মাসে দু’শ থেকে আড়াইশ টাকা বা বছরে ৪/৫ হাজার টাকা দেওয়া সম্মানি দেওয়া হয়। এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম শহরের খতিবরা। প্রতি মাসে চার বার জুমার নামাজ পড়িয়ে গড়ে ৫ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত সম্মানি পান তারা।

১৯৯৫ সালে প্রতিষ্ঠিত তেজগাঁও শিল্প এলাকার নূরে দারুস সালাম জামে মসজিদে ২০১৫ সালের জুনে ইমাম হিসেবে নিয়োগ পান হাফেজ মাওলানা আশরাফ আলী। ২০১৩ সালে জামিয়া ইক্বরা বাংলাদেশ থেকে দাওরায়ে হাদিস সম্পন্ন করে রংপুরে দুই বছর একটি মসজিদে ইমামতি করেন তিনি। এরপর ঢাকায় এসে ২০১৫ সালে পাঁচ হাজার টাকার সম্মানিতে ওই মসজিদে যোগ দেন। এখন তার সম্মানি সাড়ে সাত হাজার টাকা।

 

গত ১২ সেপ্টেম্বর মাগরিবের নামাজের পর মসজিদে বসে কথা হয় মাওলানা আশরাফ আলীর সঙ্গে। তিনি জানান, তার গ্রামের বাড়ি ফেনীর সোনাগাজী। ব্যক্তিগত জীবনে বিবাহিত এ ইমামের ১৮ মাসের একটি কন্যাসন্তানও আছে।

আশরাফ আলী বলেন, ‘হোটেলে খাই আর মসজিদে থাকি। যে সম্মানি আসে, তাতে পরিবার নিয়ে ঢাকায় থাকার সুযোগ নাই। অন্তত ৪০/৫০ হাজার টাকা লাগবে এ শহরে পরিবার নিয়ে থাকতে।’

আরও দেখুন:  বোরকা পরলে সাড়ে ৭ লাখ টাকা জরিমানা!

কিভাবে সংসার চলে? এমন প্রশ্নের উত্তরে আশরাফ আলী বলেন, ‘বলার কিছু নেই। বলতে গেলে অনেক কথাই…। তবে প্রতি মাসের প্রথম দিকেই সম্মানি পেয়ে যাই।’

একই মসজিদের মুয়াজ্জিন মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম ১৯৯৯ সালে নূরে দারুস সালাম মসজিদে মুয়াজ্জিন হিসেবে নিয়োগ পান এক হাজার টাকা সম্মানিতে। ১৮ বছরে তার সম্মানি বেড়ে হয়েছে সাড়ে ৪ হাজার। তার দুই ছেলে ও এক মেয়ে। গ্রামের বাড়ি নোয়াখালী জেলায়। ১৯৯৭ সালে আলিয়া মাদ্রাসা থেকে আলিম (ইন্টারমিডিয়েট) পাস করে ফাজিলে ভর্তি হয়েও পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেননি। দীর্ঘ-অসুস্থতার কারণে পড়াশোনার পাঠ চুকে যায় তার।

কেমন চলছে জীবন? প্রশ্নের উত্তরে জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘চলছে,আল্লায় চালায় নেন। কিছুদিন আগে ছোট ছেলের কলেরা হইছিল, গ্রামের হাসপাতালে চিকিৎসা করিয়েছি। আমার নিজেরও দুবার অপারেশন করা হয়েছে।’

তিনি জানান, প্রতি বছরে দুটি লুঙ্গি ও দুটি পাঞ্জাবি দিয়েই পুরো বছর কাটিয়ে দিতে হয়। তার বর্তমানে চারটি পাঞ্জাবি আছে। ১৯৯৯ সাল থেকে নূরে দারুস সালাম মসজিদেই থাকছেন তিনি। ইমাম আশরাফ আলীর মতো তিনিও প্রতিবেলা খাবার বিভিন্ন হোটেল থেকে খান।

নূরে দারুস সালাম মসজিদের ইমাম মাওলানা আশরাফ আলী জানান, এ মসজিদের খতিব মাওলানা আবু মূসা আল ক্বাজী। জুমা পড়ানোয় তাকে আট হাজার টাকা সম্মানি দেওয়া হয়। কথায়-কথায় মুয়াজ্জিন জাহাঙ্গীর আলম জানান, শিল্পাঞ্চল হওয়ায় বাসা বাড়ি থেকে দাওয়াত বা হাদিয়াও আসে না। এ কারণে ফাঁকে-ফাঁকে টুকটাক টিউশনি করেন দুজন।

চকবাজার গণি মিয়ার হাট জামে মসজিদে ইমামতি ও জুমার নামাজের খতিব হাফেজ মাওলানা সুলাইমান ঢাকুবী। গত ১৩ সেপ্টেম্বর সকালে তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাকে মসজিদ কমিটি ২৫ হাজার টাকা সম্মানি দেয়। আমি জুমার নামাজও পড়াই। আমি না থাকলে আরেকজন জুনিয়র ইমাম আছেন, তিনি পড়ান। তাকে ১২ হাজার টাকা সম্মানি দেওয়া হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘তবে আমাদের মসজিদ দিয়ে ঢাকার অন্য মসজিদের তুলনা করাটা ভুল হবে। আমাদের মসজিদ ব্যতিক্রম। বেশিরভাগ ইমাম ও মুয়াজ্জিনরা সম্মানি দিয়ে সংসার চালাতে পারেন না। এরপরও আলেমরা ইমামতি করেন। কারণ আমরা দুনিয়ার চেয়ে আখেরাতের মর্যাদায় বিশ্বাসী।’

হবিগঞ্জ জেলার মাধবপুর থানার একটি গ্রামের মসজিদে পাঞ্জেগানা নামাজে ইমামতি করেন মৌলভী সিদ্দিক আহমদ। তিনি জানান, কখনও বাৎসরিক হিসেবে, কখনও বা মাসে আড়াইশ টাকা সম্মানি দেয় মসজিদ কমিটি।

আরও দেখুন:  মানবিক সাহায্য প্রদানের ঘোষণা সউদি আরবের

ওই গ্রামের মসজিদ কমিটির সূত্রে জানা যায়, পুরো মাধবপুরের অনেক মসজিদেই বাৎসরিক হিসেবে সম্মানি দেওয়া হয়। এক্ষেত্রে রমজান ও বোরো মৌসুমকে বেছে নেওয়া হয়। কোনও বছর রমজানে খতম তারাবির পর মুসুল্লিদের থেকে টাকা উঠিয়ে তারাবির ইমামকে আট হাজার, খতিবকে চার হাজার, সাধারণ ইমামকে তিন হাজার, মুয়াজ্জিন এবং খাদেমকে দুই হাজার টাকা করে দেওয়া হয়।

তবে রাজধানীতে ইমামদের বাইরে জুমার নামাজের খতিবদের সম্মানি একটু বেশি দেওয়া হয়। এক্ষেত্রে প্রতি জুমার নামাজে ৫শ’ টাকা থেকে শুরু করে এক/দুই হাজার টাকা দেওয়া হয়। রাজধানীর আজিমপুরের মাদ্রাসা ফয়জুল উলুমের হাদিসের শিক্ষক মুফতি লুৎফুর রহমান জানান, তিনি প্রায় ১৫ বছর আগে প্রতি জুমার নামাজে ৮শ’ টাকা সম্মানিতে উত্তরার একটি মসজিদে খতিব হিসেবে যোগ দেন। বর্তমানে তার সম্মানি প্রায় ১২ হাজার টাকার ওপর।

ইমাম ও মুয়াজ্জিনরা বলছেন, তারা পাঠ্য-জীবনের শুরু থেকেই মাদ্রাসা ও মসজিদ সংশ্লিষ্ট কাজে সম্পৃক্ত থাকার পরিকল্পনা করেন। এক্ষেত্রে কম বা বেশি বেতন হলেও ‘পরকালীন সাফল্যের’ প্রত্যাশায় সম্মানি নিয়ে উচ্চবাচ্য বা দাবি-দাওয়া থেকে বিরত থাকেন।

এ বিষয়ে রাজধানীর একটি জামে মসজিদের খতিব মুফতি মাওলানা ইমরানুল বারী সিরাজী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ইমামরা আল্লাহর রাসূলের সুন্নাত পালন করতেই মাদ্রাসা ও মসজিদের সঙ্গে যুক্ত থাকেন। ফলে, স্বাভাবিক জীবনে কষ্ট হলেও বেতন বা সম্মানি নিয়ে কেউ খুব একটা তৎপর হন না।’

চকবাজার গণি মিয়ার হাট জামে মসজিদে ইমামতি ও জুমার নামাজের খতিব হাফেজ মাওলানা সুলাইমান ঢাকুবী বলেন, ‘অনেকে চক্ষুলজ্জার জন্যও নিরব থাকেন। তবে ইমামদের অন্তত স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে যে ব্যয় হয়, সেটা মসজিদ কমিটি দিলে খুব ভালো হবে।’

এ বক্তব্যে একমত পোষণ করে গুলিস্থান পীর ইয়ামেনী মার্কেট জামে মসজিদ কমিটির মুতাওয়াল্লী হাজী নাসির উদ্দিন খান বলেন, ‘আমার মসজিদের ইমাম ও মুয়াজ্জিনরা ৭/৮ হাজার টাকা বেতন পান। আর জুমার নামাজের খতিব পান  দুই হাজার টাকা। এটা নিতান্তই কম।’

তিনি আরও বলেন, ‘আয়ের ওপর ইমাম-মুয়াজ্জিনদের বেতন নির্ভর করে। এ কারণেই কম। আমরা বাড়ানোর চেষ্টা করবো ইনশাল্লাহ।’

এ বিষয়ে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পরিচালক ড. সৈয়দ শাহ এমরান ‘উন্নয়নে ইমাম’ শীর্ষক একটি গবেষণা প্রতিবেদন দেখান। গবেষণায় সারাদেশে দুই লাখ পাঁচ হাজার ৩৯৯টি মসজিদ চিহ্নিত হয়েছে। তবে এ সংখ্যা তিনলাখের কাছাকাছি হতে পারে। এ গবেষণাটি ২০১৫ সালে গ্রন্থ আকারে প্রকাশ করে ইফার প্রকাশনা বিভাগ।

আরও দেখুন:  মেহেরপুরে ভণ্ডপীরের আস্তানা উচ্ছেদ

একই প্রতিষ্ঠানের সাবেক পরিচালক আবু হেনা মোস্তফা কামাল জানান, আড়াই লাখ মসজিদের সঙ্গে প্রায় পাঁচ লাখ জনবল সম্পৃক্ত রয়েছে।

ঢাকাসহ বেসরকারি মসজিদে ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের সম্মানি কম হলেও সরকারি মসজিদগুলোয় তুলনামূলক বেতন-ভাতা ভালো। ইসলামিক ফাউন্ডেশন সূত্র জানায়, সারাদেশে ৪টি মসজিদ সরকারি বেতন-ভাতা ও সুবিধা ভোগ করে। এ মসজিদগুলো হচ্ছে, জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররম, চট্টগ্রামের জমিয়তুল ফালাহ, আন্দরকিল্লা মসজিদ ও রাজশাহীর হেতেম খাঁ মসজিদ। এছাড়া বঙ্গভবন জামে মসজিদ, গণভবন জামে মসজিদ ও সচিবালয়ের মসজিদটিও কিছু সরকারি সুবিধা পায়।
সরকারি মসজিদগুলোয় সুবিধা নিশ্চিত হলেও সারাদেশের মসজিদগুলোয় সরকারি নীতিমালাটি উপেক্ষিত। পালনের বাধ্যবাধকতা না থাকায় কোনও মসজিদেই এ নিয়ম মানা হয় না।

২০০৬ সালের ১৫ নভেম্বর ধর্ম মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে মসজিদ পরিচালনা, পরিচালনা নীতি, কমিটি, মসজিদের পদবিসহ বেতনকাঠামো নির্ধারণ করা হয়। আজও এ প্রজ্ঞাপন পালনে সরকারের তরফেও কোনও উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
নীতিমালায় মসজিদের আটটি পদের কথা বলা হয়। এ পদগুলোর বিপরীতে বেতন ও ভাতার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। খতিবের সম্মানিত চুক্তি অনুযায়ী, সিনিয়র পেশ ইমামের বেতনস্কেল হবে ১৩৭৫০-৫৫০-১৯২৫০ টাকা, পেশ ইমামের ১১০০০-৪৭৫-১৭৬৫০ টাকা, ইমামের ৬৮০০-৩২৫-৯০৭৫ ইবি-৩৬৫-১৩০৯০ টাকা, প্রধান মুয়াজ্জিনের ৫১০০-২৮০-৫৮৫০-ইবি-৩০০-১০৩৬০ টাকা, জুনিয়র ‍মুয়াজ্জিনের ৪১০০-২৫০-৫৮৫০-ইবি-২৭০-৮৮২০ টাকা, প্রধান খাদিমের ৩১০০-১৭০-৪২৯০-ইবি-১৯০-৬৩৮০ টাকা এবং খাদিমের ৩০০০-১৫০-৪০৫০-ইবি-১৭০-৫৯২০ টাকা।

নীতিমালার ১৯ ধারা এর দুই উপধারায় বলা হয়েছে, সরকার পরিচালিত মসজিদে এই বেতনকাঠামো অনুসরণ করা যেতে পারে। অন্যান্য মসজিদের ক্ষেত্রে মসজিদ পরিচালনা কমিটির আর্থিক  সামর্থ্য অনুযায়ী আলোচনার মাধ্যমে বেতন-ভাতা নির্ধারণ করা যেতে পারে।

এ নীতিমালা প্রণয়ন না হওয়ায় ক্ষতির বিষয়ে বায়তুল মোকাররমের সিনিয়র ইমাম মাওলানা মুহিব্বুল্লাহ বাক্বী বলেন, ‘প্রথম নীতিমালা করা হয় ২০০৬ সালে। এরপর এটা নিয়ে কোনও অগ্রগতি হয়নি। ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের সম্মানি কম হওয়ায় একদিকে ইমামগণ জাতীয় কোনও ইস্যুতে কথা বলতে ভয় পান বা চুপ থাকেন এবং এ দুর্বলতার কারণেই অনেকে বিভ্রান্ত হন।’

তিনি আরও বলেন, ‘যদি ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের উপযুক্ত সম্মানি দেওয়া হয় তবে তারা মানসিক অস্থিরতা ও আর্থিক দুবর্লতা কাটিয়ে উঠতে পারবেন। ইমামদের যথাযথ সম্মান দিলে দেশ ও জাতি সবাই উপকৃত হবে।’

Bangla Tribune

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

মন্তব্য করুন

Back to top button