সমাজ/সংস্কৃতি/সভ্যতা

মূল্যবোধের অবক্ষয় ও আমাদের করণীয়

দেহ ও আত্মার সমন্বিত চাহিদার নিয়ন্ত্রিত স্ফুরণকে মূল্যবোধ (Value) বলা হয়। মানুষ ও জীব জগতের কল্যাণ সাধনের মধ্যেই তা প্রতিফলিত হয়। এই কল্যাণ সাধনের মাত্রার উপর মূল্যবোধের মাত্রা নির্ভর করে। শেষনবী মুহাম্মাদ (ছাঃ) প্রেরিত হয়েছিলেন সর্বোত্তম চরিত্রের পূর্ণতা দানের জন্য’ (ছহীহাহ হা/৪৫)। যে কাজে জীব জগতের কল্যাণ নেই, তা মূল্যবোধের বিরোধী এবং তা অগ্রাহ্য। মানুষের মূল্যবোধের সুষ্ঠু বিকাশ ও সমাজের যথার্থ অগ্রগতির জন্যই ধর্মের সৃষ্টি। যা ধারণ করে মানুষ বেঁচে থাকে। সেকারণ পৃথিবীতে আদমকে প্রেরণের সাথে সাথে আল্লাহ তাঁর হেদায়াত প্রেরণ করেন (বাক্বারাহ ২/৩৮)। যেটাই হ’ল প্রকৃত ধর্ম। যা নিখুঁৎ। কিন্তু পরে মানুষ হঠকারিতা করে এ থেকে দূরে সরে যায় (বাক্বারাহ ২/২১৩) এবং নিজেরা ধর্মের নাম দিয়ে বহু রীতি-নীতি তৈরী করে। যেখানে থাকে স্বেচ্ছাচারিতার নানা সুযোগ। সেকারণ মন্দপ্রবণ মানসিকতা সেটিকে লুফে নিতে আগ্রহী হয়। কিন্তু আল্লাহপ্রেরিত ধর্মে স্বেচ্ছাচারিতার কোন সুযোগ থাকে না। ফলে মানুষ সেটাকে প্রশংসা করলেও তাকে গ্রহণে অনাগ্রহী হয়। বরং আতংকিত হয় একারণে যে, এখানে অন্যায়ের কোন সুযোগ পাওয়া যায় না। অথচ যে সমাজে মূল্যবোধ যত বেশী নিরাপদ হবে, সে সমাজে তত বেশী শান্তি ও সুখ নিশ্চিত হবে। এমন অবস্থা হবে যে, কেউ কারু প্রতি অন্যায় হস্তক্ষেপ করবে না। কেউ কারু জান-মাল ও ইযযতের কোন ক্ষতি করবে না। বরং প্রত্যেকে হবে প্রত্যেকের জন্য রক্ষাকবচ। কারু অসাক্ষাতেও কেউ কারু অমঙ্গল চিন্তা করবে না। বরং তার কল্যাণের জন্য দো‘আ করবে। যা ফেরেশতাগণ লিখে নিবেন ও ক্বিয়ামতের দিন তাকে উত্তম পুরস্কার দিবেন।[1]

অতএব যে মতবাদ মানুষের জৈববৃত্তিকে জীবন থেকে ছেঁটে ফেলতে চায় এবং কেবল আত্মিক উন্নতিকে অগ্রাধিকার দেয়, সেটি যেমন অগ্রাহ্য; তেমনি যে মতবাদ কেবল জৈববৃত্তিকেই অগ্রাধিকার দেয় এবং আত্মিক উন্নতিকে অস্বীকার করে, সে মতবাদ তেমনি অগ্রাহ্য। উভয়ের পূর্ণতার মধ্যেই প্রকৃত সুখ ও শান্তি নিহিত। ইসলাম সে পথেই মানুষকে আহবান করে। বস্ত্তবাদী ও জঙ্গীবাদীরা ক্ষমতা দখলের মাধ্যমে তাদের ভ্রান্ত মতবাদের প্রসার ঘটাতে চায়। অন্যদিকে অধ্যাত্মবাদীরা জীবন থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখতে চায়। অথচ প্রতিটিই ব্যর্থ। মানুষের হৃদয়ে টিকে থাকে কেবল সেটাই, যেটা মানুষের আত্মিক ও জৈবিক উভয় চাহিদার সমন্বয় ঘটায় এবং যেটি আল্লাহর পক্ষ হ’তে প্রেরিত। পবিত্র কুরআন ও ছহীহ সুন্নাহ রূপে যা ক্বিয়ামত পর্যন্ত মানুষকে শান্তির পথ দেখাবে।

জৈবিক ও অর্থনৈতিক বিষয়ের অতি মূল্যায়নের জন্যই আজকের সমাজে নৈতিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয় ঘটেছে। অথচ মানবতার শুরু হয় অন্যের প্রয়োজন মিটানোর প্রতি মনোনিবেশ করার পর থেকেই। মানব জীবন থেকে মূল্যবোধ বিযুক্ত হ’লে মনুষ্য নামের উপযোগী কোন বৈশিষ্ট্যই আর বাকী থাকে না।

মানুষের মূল্যবোধকে অক্ষুণ্ণ ও উন্নত করার জন্য এযাবৎ মনুষ্যকল্পিত যত পথ-পন্থা বের হয়েছে এবং কথিত ধর্মসমূহে যেসব নীতি ও বিধান প্রণীত হয়েছে, সে সবের ঊর্ধ্বে আল্লাহ প্রেরিত বিধানই সর্বোত্তম ও চূড়ান্ত। মানুষের জন্য ইসলামই হ’ল আল্লাহর মনোনীত একমাত্র ধর্ম (আলে ইমরান ৩/১৯)। এর বাইরে অন্যত্র কোন বিধান তালাশ করলে তা আল্লাহর নিকট কবুল হবে না এবং চূড়ান্ত বিচারে সে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে (আলে ইমরান ৩/৮৫)।

কিভাবে মাটিতে চলতে হবে, সাগরে ডুব দিতে হবে, আকাশে উড়তে হবে, মহাশূন্যে পাড়ি দিতে হবে, তা আবিষ্কার করতে মানুষ সক্ষম। কিন্তু কিভাবে সে সুখী হবে, কিভাবে তার মূল্যবোধ কার্যকর হবে, তার পথ-পন্থা আবিষ্কারে সে অক্ষম। এ কারণেই মানুষের নৈতিক মূল্যবোধ মানুষের হাতেই প্রতিনিয়ত পর্যুদস্ত হয়। বর্তমান সভ্যতার অদ্ভূত গোঁজামিল এই যে, বিশ্বশান্তির নামে বিশ্বধ্বংসের খাতে বিশ্বের অধিকাংশ মেধা ব্যয় হচ্ছে। রাষ্ট্রনেতারা মারণাস্ত্র তৈরীতে যতখানি আগ্রহী, জীবনের মূল্য নির্ধারণে ও মানুষের মূল্যবোধের উন্নয়নে ততখানি আগ্রহী নন।

ধনী রাষ্ট্রগুলি যদি ‘মানুষ হত্যা খাতে’র বরাদ্দ বাতিল করে ‘মানুষ রক্ষা’ খাতে সেগুলি ব্যয় করত, তাহ’লে এই সবুজ পৃথিবীটা শান্তি ও সুখের আবাসস্থলে পরিণত হ’ত। বস্ত্ততঃ যে চিন্তার মধ্যে মানবতার কল্যাণ নেই, সে চিন্তা মূল্যহীন। যে মেধা মানুষের মূল্যবোধ রক্ষায় অবদান রাখে না, সে মেধা ফলবলহীন। সাথে সাথে জ্ঞানের প্রজ্ঞাহীন ব্যবহার ও নৈতিক মূল্যবোধহীন প্রয়োগ বিশ্ব সভ্যতায় মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনতে পারে। বর্তমানে আমরা সেই ধ্বংসের কিনারে দাঁড়িয়ে আছি। কেননা বিশ্বের সেরা মারণাস্ত্র সমূহের সবচেয়ে বড় ডিপোগুলির বোতাম বর্তমানে এমন কিছু নেতার মুঠোর মধ্যে এসে গেছে, যাদের নৈতিক মূল্যবোধ বলতে গেলে শূন্যের কোঠায়। তারা খেলাচ্ছলেও যদি ঐ বোতাম টিপে দেন, তাহ’লে যেকোন সময় মহাশূন্যে ঝুলন্ত আনুমানিক ৬৬০০ বিলিয়ন টন ওযনের পৃথিবী নামক এই গ্রহটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হ’তে পারে।

মূল্যবোধ একটা অদৃশ্য অনুভূতির নাম। যা দেখা যায় না, কিন্তু বুঝা যায়। যা পরিমাপ করা যায় তার কর্মে ও আচরণে। বিশ্বাসের জগতে পরিবর্তন এলেই কেবল মূল্যবোধে পরিবর্তন আসে। যেখানে বিজ্ঞানীদের কোন হাত নেই। কারণ তারা বস্ত্ত নিয়ে কাজ করেন এবং সম্পূর্ণ অনুমান ও অনুমিতির মাধ্যমে অন্ধকারে পথ হাতড়িয়ে থাকেন। অন্যদিকে দার্শনিকরা আরও বেশী কল্পনাচারী। সেখানে কোন সত্য নেই, কেবলই ধারণা ছাড়া। মানুষের দেহ-মন উভয়ের যিনি স্রষ্টা। কেবল তিনিই ভাল জানেন মানুষের মানবীয় মূল্যবোধ কিসে অক্ষুণ্ণ থাকবে ও কিসে তা ক্রমোন্নতি লাভ করবে।

জাহেলী আরবের প্রচলিত মূল্যবোধ সকল যুগের নষ্ট মূল্যবোধ সমূহের প্রতিনিধিত্ব করে। যা অগ্নিকুন্ডের কিনারে পৌঁছে গিয়েছিল (আলে ইমরান ৩/১০৩)। যা পরিবর্তনের জন্য ছাহাবী বেষ্টিত ভরা মজলিসে জিব্রীলকে মনুষ্যবেশে পাঠিয়ে প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে আল্লাহ যে শিক্ষা দান করেছিলেন, সেটাকেই আমরা পতিত মূল্যবোধের পুনরুজ্জীবনের ভিত্তি রূপে গ্রহণ করতে পারি। যে মূল্যবোধকে ধারণ করে পরবর্তীতে মুসলমানরা বিশ্ব নেতৃত্বের আসন অলংকৃত করেছিল। সেগুলি ছিল মোট ছয়টি : আল্লাহর উপরে বিশ্বাস, ফেরেশতাগণের উপর বিশ্বাস, আল্লাহর কিতাব সমূহের উপর বিশ্বাস, তাঁর রাসূলগণের উপর বিশ্বাস, বিচার দিবসের উপর বিশ্বাস এবং আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত তাক্বদীরের ভাল-মন্দের উপর বিশ্বাস (মুসলিম হা/৮)। যেগুলিকে এক কথায় ‘ঈমান’ বলা হয়। যাদের মধ্যে এই ঈমান বা বিশ্বাস যত স্বচ্ছ ও দৃঢ়, তাদের কর্ম ও আচরণ তত সুন্দর ও স্থিত। তাদের নৈতিক মূল্যবোধ থাকে তত উন্নত। যা প্রমাণিত হয়েছে পরবর্তীতে মুসলমানদের জীবনে বিভিন্ন কর্মে ও আচরণে।

উল্লেখ্য যে, ছয়টি বিশ্বাসই আমাদের জন্য অদৃশ্য। আর অদৃশ্যে বিশ্বাসকেই ঈমান বলা হয়। দৃশ্যমান বস্ত্তর উপর বিশ্বাসের প্রয়োজন নেই। কেননা সেটি সামনে দেখা যায়। দাদা-দাদী ও নানা-নানীকে দেখিনি। তাই বিশ্বাস করতে হয়। তাদের অস্বীকার করলে বাপ-মার অস্তিত্ব থাকবে না। অমনিভাবে আল্লাহকে দেখিনা। তাঁর সৃষ্টিকে দেখি। তাই তাঁকে বিশ্বাস করতে হয়। নইলে আমাদের অস্তিত্ব মিথ্যা হয়ে যাবে। বুকের মধ্যে আত্মা আছে। অথচ দেখিনা। কিন্তু তাকে অস্বীকার করলে আমাদের জীবনই মিথ্যা হয়ে যাবে। এটাই হ’ল ঈমান। শয়নে-জাগরণে সর্বাবস্থায় আমি আল্লাহর সামনে আছি। এ বিশ্বাস সৃষ্টি হ’লেই মূল্যবোধ জাগ্রত হবে ও উন্নত হবে। নইলে সত্যিকার মূল্যবোধ বলে কিছুই থাকবে না। যা থাকবে, তা কেবল লোক দেখানো।

আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসকে বলা হয় ‘ঈমান’ এবং সে অনুযায়ী বাহ্যিক আচরণকে বলা হয় ‘ইসলাম’। উভয়ের সমন্বিত প্রকাশকে বলা হয় ‘ইহসান’ বা ‘মূল্যবোধ’। পরিবেশ ও পরিস্থিতির কারণে যার হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটে। একই সাথে কর্মজগতেও তারতম্য ঘটে। সেকারণ ঈমানের সংজ্ঞা হ’ল,اَلتَّصْدِيْقُ بِالْجِنَانِ وَالْإِقْرَارُ بِالْلِسَانِ وَالْعَمَلُ بِالْأَرْكَانِ يَزِيْدُ بِالطَّاعَةِ وَيَنْقُصُ بِالْمَعْصِيَةِ، اَلْإِيْمَانُ هُوَ الْاَصْلُ وَالْعَمَلُ هُوَ الْفَرْعُ- ‘হৃদয়ে বিশ্বাস, মুখে স্বীকৃতি ও কর্মে বাস্তবায়নের সমন্বিত নাম, যা আনুগত্যে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয় ও গোনাহে হ্রাসপ্রাপ্ত হয়। বিশ্বাস হ’ল মূল এবং কর্ম হ’ল শাখা’। যা না থাকলে পূর্ণ মুমিন বা ইনসানে কামেল হওয়া যায় না। যে ব্যক্তি, পরিবার বা সমাজে ঈমানের অবস্থান যত উচ্চে, সে সমাজে মানবিক মূল্যবোধের অবস্থান তত উচ্চে।

খারেজীগণ বিশ্বাস, স্বীকৃতি ও কর্ম তিনটিকেই ঈমানের মূল হিসাবে গণ্য করেন। ফলে তাদের মতে কবীরা গোনাহগার ব্যক্তি কাফের ও চিরস্থায়ী জাহান্নামী এবং তাদের রক্ত হালাল’। যুগে যুগে অধিকাংশ চরমপন্থী ভ্রান্ত মুসলমান এই মতের অনুসারী। পক্ষান্তরে মুরজিয়াগণ কেবল বিশ্বাস অথবা স্বীকৃতিকে ঈমানের মূল হিসাবে গণ্য করেন। যার কোন হ্রাস-বৃদ্ধি নেই। তাদের মতে আমল ঈমানের অংশ নয়। ফলে তাদের নিকট কবীরা গোনাহগার ব্যক্তি পূর্ণ মুমিন। আবুবকর (রাঃ)-এর ঈমান ও অন্যদের ঈমান সমান’। আমলের ব্যাপারে উদাসীন সকল যুগের শৈথিল্যবাদী ভ্রান্ত মুসলমানরা এই মতের অনুসারী।

খারেজী ও মুরজিয়া দুই চরমপন্থী ও শৈথিল্যবাদী মতবাদের মধ্যবর্তী হ’ল আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আত আহলেহাদীছের ঈমান। যাদের নিকট বিশ্বাস ও স্বীকৃতি হ’ল মূল এবং কর্ম হ’ল শাখা। অতএব কবীরা গোনাহগার ব্যক্তি তাদের নিকট কাফের নয় কিংবা পূর্ণ মুমিন নয়, বরং ফাসেক। সে তওবা না করে মারা গেলেও চিরস্থায়ী জাহান্নামী নয়। বস্ত্ততঃ এটাই হ’ল কুরআন ও সুন্নাহর অনুকূলে।

এই বিশ্বাসগত পার্থক্যের কারণেই খারেজীপন্থী লোকেরা তাদের দৃষ্টিতে কবীরা গোনাহগার মুসলমানকে ‘কাফের’ মনে করে এবং তাদের রক্ত হালাল গণ্য করে। বর্তমানে ইসলামের নামে সন্ত্রাস ও জঙ্গীবাদের উত্থানের মূল উৎস এখানেই। স্বার্থবাদী লোকেরা জান্নাতের স্বপ্ন দেখিয়ে এই ভ্রান্ত বিশ্বাসকেই উস্কে দিচ্ছে। যা ইসলামের বিশুদ্ধ আক্বীদার পরিপন্থী। প্রায় সব দেশেই শৈথিল্যবাদী মুসলমানের সংখ্যা বেশী। চরমপন্থীরা এই সুযোগটা গ্রহণ করে এবং মানুষকে নিজেদের দলে ভিড়ায়। আমরা শৈথিল্যবাদী ও চরমপন্থী সকলকে ইসলামের চিরন্তন মধ্যপন্থী আক্বীদায় ফিরে আসার আহবান জানাই।

ঈমানের হ্রাস-বৃদ্ধির সবচেয়ে বড় দলীল হিসাবে আমরা নিম্নের আয়াতটিকে গ্রহণ করতে পারি। যেমন আল্লাহ বলেন, إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ إِذَا ذُكِرَ اللهُ وَجِلَتْ قُلُوبُهُمْ وَإِذَا تُلِيَتْ عَلَيْهِمْ آيَاتُهُ زَادَتْهُمْ إِيمَانًا وَعَلَى رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ- الَّذِينَ يُقِيمُونَ الصَّلاَةَ وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنْفِقُونَ- أُولَئِكَ هُمُ الْمُؤْمِنُونَ حَقًّا لَهُمْ دَرَجَاتٌ عِنْدَ رَبِّهِمْ وَمَغْفِرَةٌ وَرِزْقٌ كَرِيمٌ- ‘মুমিন কেবল তারাই, যখন তাদের নিকট আল্লাহকে স্মরণ করা হয়, তখন তাদের অন্তর সমূহ ভয়ে কেঁপে ওঠে। আর যখন তাদের উপর তাঁর আয়াতসমূহ পাঠ করা হয়, তখন তাদের ঈমান বৃদ্ধি পায় এবং তারা তাদের প্রতিপালকের উপর ভরসা করে’। ‘যারা ছালাত কায়েম করে এবং তাদেরকে আমরা যে জীবিকা দান করেছি, তা থেকে খরচ করে’। ‘এরাই হ’ল সত্যিকারের মুমিন। এদের জন্য তাদের প্রতিপালকের নিকট রয়েছে উচ্চ মর্যাদা, ক্ষমা ও সম্মানজনক রূযী’ (আনফাল ৮/২-৪)

আরও দেখুন:  বিনোদন ও সংস্কৃতি

অত্র আয়াতে হৃদয়ে বিশ্বাস ও কর্মে বাস্তবায়নের সমন্বয়ে পূর্ণ ঈমানের সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। প্রখ্যাত তাবেঈ হাসান বাছরী (২১-১১০ হি.)-কে জিজ্ঞেস করা হ’ল, أَمُؤْمِنٌ أَنْتَ؟ ‘আপনি কি মুমিন? তিনি বললেন, الْإِيمَانُ إِيمَانَانِ ‘ঈমান দু’ভাগে বিভক্ত’। এক্ষণে যদি তুমি আমাকে ঈমানের ছয়টি স্তম্ভ সম্পর্কে জিজ্ঞেস কর, তাহ’লে আমি বলব যে, فَأَنَا مُؤْمِنٌ ‘আমি একজন মুমিন’। আর যদি তুমি আমাকে সূরা আনফাল ২-৪ আয়াতে বর্ণিত প্রকৃত মুমিন সম্পর্কে জিজ্ঞেস কর,فَوَاللهِ مَا أَدْرِي أَنَا مِنْهُمْ أَمْ لاَ ‘তাহ’লে আল্লাহর কসম! আমি জানি না, আমি তাদের অন্তর্ভুক্ত কি না’ (কাশশাফ; কুরতুবী)। অতএব যে সমাজে ঈমানী পরিবেশ যত উন্নত, সে সমাজে মূল্যবোধ ও সমৃদ্ধি তত উন্নত। সুতরাং সংশ্লিষ্ট সকলের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হ’ল পরিবারে ও সমাজে ঈমানী পরিবেশ সমুন্নত রাখা এবং সর্বদা ঈমান বৃদ্ধির জন্য সচেষ্ট থাকা। নিম্নে ঈমান বৃদ্ধির প্রধান উপায় সমূহ বর্ণিত হ’ল।-

১. আল্লাহর নাম ও গুণাবলী সহ তাঁকে চেনা :

আল্লাহকে চেনার অর্থ আল্লাহর নাম ও গুণাবলী সম্পর্কে যথাযথ জ্ঞান রাখা। আল্লাহকে চোখে দেখা যায় না। তাঁর নিদর্শন সমূহ দেখে তাঁকে চিনতে হয়। যেমন ধোঁয়া দেখে আগুনকে জানতে হয়। প্রত্যেক সৃষ্টিই তার সৃষ্টিকর্তার নিদর্শন। যে বিষয়ে চিন্তা করলে মানুষ তার সৃষ্টিকর্তাকে চিনতে পারে। আল্লাহ বলেন, وَفِي الْأَرْضِ آيَاتٌ لِلْمُوقِنِينَ- وَفِي أَنْفُسِكُمْ أَفَلاَ تُبْصِرُونَ؟ ‘আর দৃঢ় বিশ্বাসীদের জন্য পৃথিবীতে রয়েছে নিদর্শন সমূহ’ ‘এবং তোমাদের নিজেদের মধ্যেও। অথচ তোমরা কি তা অনুধাবন করবে না?’ (যারিয়াত ৫১/২০-২১)। তিনি আরও বলেন, وَضَرَبَ لَنَا مَثَلاً وَنَسِيَ خَلْقَهُ قَالَ مَنْ يُحْيِ الْعِظَامَ وَهِيَ رَمِيمٌ- قُلْ يُحْيِيهَا الَّذِي أَنْشَأَهَا أَوَّلَ مَرَّةٍ وَهُوَ بِكُلِّ خَلْقٍ عَلِيمٌ- ‘আর সে আমাদের সম্পর্কে নানাবিধ উপমা দেয়। অথচ সে নিজের সৃষ্টি বিষয়ে ভুলে যায়। সে বলে, কে হাড্ডিগুলিকে জীবিত করবে যখন তা পচে-গলে যাবে?’ ‘তুমি বলে দাও, ওগুলিকে তিনিই জীবিত করবেন, যিনি প্রথমবার সৃষ্টি করেছিলেন। আর তিনি প্রত্যেক সৃষ্টি সম্পর্কে সম্যক অবহিত’ (ইয়াসীন ৩৬/৭৮-৭৯)। তিনি উদাসীন বান্দাদের প্রতি আহবান জানিয়ে বলেন, وَكَأَيِّنْ مِنْ آيَةٍ فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ يَمُرُّونَ عَلَيْهَا وَهُمْ عَنْهَا مُعْرِضُونَ- وَمَا يُؤْمِنُ أَكْثَرُهُمْ بِاللهِ إِلاَّ وَهُمْ مُشْرِكُونَ- ‘নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলে বহু নিদর্শন রয়েছে। তারা এসবের উপর দিয়ে অতিক্রম করে। অথচ সেগুলি হ’তে তারা উদাসীন থাকে’। ‘তাদের অধিকাংশ আল্লাহকে বিশ্বাস করে। অথচ সেই সাথে শিরক করে’ (ইউসুফ ১২/১০৫-১০৬)। অতএব আল্লাহর নিদর্শন সমূহ সম্পর্কে বান্দা যত বেশী গবেষণা করবে এবং এ বিষয়ে ছহীহ হাদীছ সমূহে যা বর্ণিত হয়েছে, তার উপর যত বেশী নির্ভরশীল হবে, তার আক্বীদা তত বেশী মযবূত হবে এবং সে তত বেশী আল্লাহর অনুগ্রহ লাভে সক্ষম হবে। সেই সাথে তার মূল্যবোধ সমুন্নত হবে।

হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেন,إِنَّ لِلَّهِ تِسْعَةٌ وَتِسْعُونَ اسْمًا، مِائَةٌ إِلاَّ وَاحِدًا، لاَ يَحْفَظُهَا أَحَدٌ إِلاَّ دَخَلَ الْجَنَّةَ، وَهْوَ وَتْرٌ يُحِبُّ الْوَتْرَ ‘নিশ্চয় আল্লাহর ৯৯টি নাম রয়েছে। একশ’ থেকে একটি কম। যে ব্যক্তি সেগুলি গণনা করবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর তিনি বেজোড়। তিনি বেজোড় পসন্দ করেন’।[2] এর অর্থ হ’ল যে ব্যক্তি ঐ নামগুলো মুখস্ত করবে পূর্ণ ঈমান ও আনুগত্যের সাথে এবং আল্লাহর উপর অটুট নির্ভরতার সাথে। উছায়লী বলেন,لَيْسَ الْمُرَادُ بِالْإِحْصَاءِ عَدَّهَا فَقَطْ لِأَنَّهُ قَدْ يَعُدُّهَا الْفَاجِرُ وَإِنَّمَا الْمُرَادُ الْعَمَلُ بِهَا ‘এর অর্থ কেবল গণনা করা নয়। কেননা অনেক সময় ফাসেক্ব-ফাজের লোকেরাও এগুলি গণনা করে থাকে। বরং এর অর্থ হ’ল ঐসব গুণাবলীর উপর আমল করা’ (ফাৎহুল বারী)

আব্দুর রহমান আস-সা‘দী বলেন,

من حفظها وفهم معانيها، واعتقدها، وتعبد لله بها دخل الجنة. والجنة لا يدخلها إلا المؤمنون فعلم أن ذلك أعظم ينبوع ومادة لحصول الإيمان وقوته وثباته، ومعرفة الأسماء الحسنى هي أصل الإيمان، والإيمان يرجع إليها…

‘এর অর্থ যে ব্যক্তি এগুলি মুখস্ত করবে, এর মর্ম সমূহ উপলব্ধি করবে, সেমতে বিশ্বাস স্থাপন করবে এবং সে অনুযায়ী আল্লাহর দাসত্ব করবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর জান্নাতে প্রবেশ করবে না মুমিন ব্যতীত। অতএব জানা গেল যে, এগুলি হ’ল ঈমান হাছিলের ও তার শক্তি বৃদ্ধির এবং তার দৃঢ়তা লাভের শ্রেষ্ঠ উৎস ধারা। আল্লাহর সুন্দর নাম সমূহ হ’ল ঈমানের মূল। আর ঈমান সেদিকেই প্রত্যাবর্তিত হয়। উক্ত মা‘রেফাত তাওহীদের তিনটি প্রকারকে শামিল করে : তাওহীদে রুবূবিয়াত, তাওহীদে ইবাদত ও তাওহীদে আসমা ও ছিফাত (প্রতিপালনে একত্ব, উপাসনায় একত্ব এবং নাম ও গুণাবলীর একত্ব)। এ তিনটিই হ’ল তাওহীদের রূহ ও তার সুবাতাস। তার মূল ও উদ্দেশ্য। যখনই বান্দার মধ্যে আল্লাহর নাম ও গুণাবলীর মা‘রেফাত বৃদ্ধি পাবে, তখনই তার ঈমান বৃদ্ধি পাবে ও তার বিশ্বাস দৃঢ়তর হবে। অতএব মুমিনের উচিৎ হবে তার ক্ষমতা অনুযায়ী আল্লাহর নাম ও গুণাবলীর মর্ম উপলব্ধি করা। কেননা এই মা‘রেফাত তাকে আল্লাহর গুণশূন্য হওয়ার ও অন্যের সাথে তুলনীয় হওয়ার মত ভ্রান্ত বিশ্বাসের রোগ থেকে নিরাপদ রাখবে। যে দুই রোগে বহু বিদ‘আতী পরীক্ষায় নিপতিত হয়েছে। যা রাসূল (ছাঃ) কর্তৃক আনীত সত্যের বিরোধী। বরং প্রকৃত মা‘রেফাত সেটাই, যা কুরআন ও সুন্নাহ থেকে প্রাপ্ত এবং যা বর্ণিত হয়েছে ছাহাবী ও তাবেঈগণ থেকে। আর এই উপকারী মা‘রেফাত তার অধিকারী ব্যক্তির ঈমান বৃদ্ধিতে ও বিশ্বাসের দৃঢ়তা আনয়নে এবং শত বাধায় প্রশান্তি লাভে সহায়ক হবে’।[3] অতএব যে ব্যক্তি এই মা‘রেফাত অনুযায়ী আল্লাহকে চিনবে, সে ব্যক্তি মানুষের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী ঈমানের অধিকারী হবে ও তাদের মধ্যে আল্লাহর আনুগত্যে ও দাসত্বে সর্বাধিক দৃঢ় হবে এবং তাঁর ভয়ে ও তাঁর বিষয়ে সতর্কতার দিক দিয়ে শ্রেষ্ঠ হবে।

উদাহরণ স্বরূপ, বান্দা যখন তার জীবনের সকল ভাল-মন্দ এবং হায়াত-মউত, রিযিক, রোগ ও আরোগ্য সবকিছুর মালিক হিসাবে স্রেফ আল্লাহকে জানবে, তখন সে অন্তর থেকে আল্লাহর উপর পূর্ণ ভরসাকারী হবে এবং তার সকল কর্মে তার নিদর্শন স্পষ্ট হবে। সে কখনোই উল্লাসে ফেটে পড়বে না বা হতাশায় ভেঙ্গে পড়বে না। বরং ভিতরে-বাইরে আল্লাহর উপর পরিপূর্ণ ভরসাকারী হবে ও সর্বাবস্থায় আল্লাহর প্রশংসাকারী হবে।

যখন বান্দা জানবে যে, আল্লাহ অমুখাপেক্ষী, সকল ক্ষমতার মালিক, গুণগ্রাহী, সহনশীল ও প্রশস্ত ক্ষমার অধিকারী, তিনি করুণাময় ও কৃপানিধান; তখন সে আর কারু মুখাপেক্ষী হবে না। কোন শক্তিমানের প্রতি দুর্বল হবে না। পাপ করেও আল্লাহর ক্ষমা থেকে নিরাশ হবে না। যেকোন বৈধ প্রার্থনায় সে আল্লাহর নিকট দৃঢ় আশাবাদী হবে। সে কেবল আল্লাহর কাছেই চাইবে ও তাঁকেই ভয় করবে। তার মস্তক সর্বদা উন্নত থাকবে। কারু নিকট সে মাথা নত করবে না।

বান্দা যখন জানবে যে, আল্লাহ সবচেয়ে সুন্দর। সে সুন্দরের কোন তুলনা নেই। তখন তাঁকে দেখার জন্য ও তাঁর সাথে সাক্ষাতের জন্য সে পাগলপারা হয়ে উঠবে। পৃথিবীর কোন সৌন্দর্য তাকে আকৃষ্ট করতে পারবে না। কোন বিলাসিতা তাকে স্পর্শ করবে না। কোন সুখ-সম্ভোগ তাকে আল্লাহর মহববত থেকে ফিরাতে পারবে না।

এভাবে আল্লাহর নাম ও গুণাবলীর দিকেই বান্দার দাসত্ব বা উবূদিয়াতের সবকিছু প্রত্যাবর্তিত হবে এবং এর মধ্যেই তার দাসত্বের পূর্ণরূপ বিকশিত হবে। বস্ত্ততঃ এটাই হ’ল আল্লাহর নাম ও গুণাবলীর প্রকৃত অনুধাবন বা মা‘রেফাত।

ভ্রান্ত ফিরক্বা সমূহের অনুসারীরা আল্লাহর নাম ও গুণাবলীর কাল্পনিক অর্থ করেছেন ও বিকৃত ব্যাখ্যা করেছেন। তাদের মতে আল্লাহ নিরাকার ও গুণহীন সত্তা। তারা ‘আল্লাহর হাত’ অর্থ করেন তাঁর কুদরত ও নে‘মত, ‘চেহারা’ অর্থ করেন তাঁর সত্তা বা ছওয়াব ইত্যাদি। অথচ সঠিক আক্বীদা এই যে, আল্লাহ অবশ্যই আকার ও গুণযুক্ত সত্তা। তবে তা কারু সাথে তুলনীয় নয়। তিনি শোনেন ও দেখেন। কিন্তু সেটা কিভাবে, তা জানা যাবে না। কেননা তাঁর সত্তা ও গুণাবলী বান্দার সত্তা ও গুণাবলীর সাথে তুলনীয় নয়। ভিডিও ক্যামেরা মানুষের কথা ও ছবি ধারণ করে। তার নিজস্ব আকার ও চোখ-কান আছে। কিন্তু তা অন্যের সাথে তুলনীয় নয়। পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছ সমূহে আল্লাহর হাত, আঙ্গুল, পায়ের নলা, চেহারা, চক্ষু, কথা বলা, আরশে অবস্থান, নিম্ন আকাশে অবতরণ, ক্বিয়ামতের দিন নিজ আকারে মুমিনদের দর্শন দান ইত্যাদি অনেক বিষয়ে বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু তার ধরন মানুষের অজানা। যেমন আল্লাহ বলেন, لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ وَهُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ  ‘তাঁর তুলনীয় কিছুই নেই। তিনি সবকিছু শোনেন ও দেখেন’ (শূরা ৪২/১১)। আবার এসবের অর্থ আমরা জানিনা বলে তা বুঝার জন্য আল্লাহর উপর ন্যস্ত করাও যাবে না। বরং পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছ সমূহে বর্ণিত এসবের প্রকাশ্য অর্থের উপর বিশ্বাস করতে হবে। যেমনটি করেছেন ছাহাবায়ে কেরাম ও সালাফে ছালেহীন কোনরূপ পরিবর্তন, শূন্যকরণ, প্রকৃতি নির্ধারণ, তুলনাকরণ বা আল্লাহর উপরে ন্যস্তকরণ(من غير تحريف وتعطيل وتكييف وتمثيل وتفويض) ছাড়াই।

ভ্রান্ত বিশ্বাসীরা আল্লাহকে স্বীকার করলেও তাঁর গুণাবলীর ভ্রান্ত ব্যাখ্যার কারণে তাঁর উপরে ভরসা করে নিশ্চিন্ত হয় না। ফলে তারা তাদের ধারণা মতে বিভিন্ন উপাস্যকে অসীলা হিসাবে গ্রহণ করে ও তাদের উপরেই ভরসা করে। তাদেরকে খুশী করার জন্য নযর-নেয়ায দেয় ও জীবনপাত করে। সেজন্যই তো দেখা যায়, মানুষ না খেয়ে মরে। অথচ কবরে নযর-নেয়াযের স্তূপ জমে। গরীবের ঘরে বাতি জ্বলে না। কিন্তু কবরের উপর বাতি জ্বলে। প্রচন্ড গরমে হিট স্ট্রোকে মানুষ মরে। অথচ কবরের উপর ফ্যান ঘোরে ও সেখানে এসি চলে। এরাই হ’ল আধুনিক যুগের ধার্মিক মানুষ।

তারা তাদের পূজিত কবরের নাম দিয়েছে ‘মাযার’। অর্থাৎ সাক্ষাতের স্থান। এই সাক্ষাৎ কার সঙ্গে? যদি তিনি কবরবাসী হন, তাহ’লে তিনি কি তাদের সাক্ষাৎ দিতে পারেন? তিনি কি সাক্ষাৎকারীদের কথা জানতে পারেন? বা তাদের কথা শুনতে পান? তিনি কি তাদের কোন ভাল-মন্দ করার ক্ষমতা রাখেন? অথচ আল্লাহ স্বীয় রাসূলকে বলেন, إِنَّكَ لاَ تُسْمِعُ الْمَوْتَى ‘নিশ্চয়ই তুমি শুনাতে পারো না কোন মৃত ব্যক্তিকে’ (নমল ২৭/৮০)। وَمَا أَنْتَ بِمُسْمِعٍ مَنْ فِي الْقُبُورِ ‘আর তুমি শুনাতে পারো না কোন কবরবাসীকে’ (ফাত্বির ৩৫/২২)

আরও দেখুন:  থার্টিফার্স্ট নাইট

অন্ধ ভক্তরা তাদের নাম দিয়েছে ‘ছূফী’। তারা নিজেদেরকে বান্দা ও আল্লাহর মধ্যে মিলনের মাধ্যম মনে করেন। সেজন্য তারা বিভিন্ন তরীকা আবিষ্কার করেছেন। শরী‘আতকে তারা নারিকেলের ছোবড়া মনে করেন। তরীকতকে নারিকেল এবং তার শাসকে হকীকত বলেন। আর এ বিষয়ে জানাকেই তারা মা‘রেফাত বলেন। অথচ এ সবের জন্য আল্লাহ কোন প্রমাণ নাযিল করেননি।

তারা আল্লাহর যিক্রের নামে নানাবিধ শয়তানী ক্রিয়া-কান্ড করেন। কখনো তারা যিক্র করতে করতে বেহুঁশ হয়ে বাঁশের মাথায় উঠে মাটিতে লাফিয়ে পড়েন। কখনো মুখে ফেনা তুলে অজ্ঞান হয়ে হাত-পা ছোঁড়েন। আর ভাবেন তিনি ‘ফানা ফিল্লাহ’ অর্থাৎ ‘আল্লাহর সত্তার মধ্যে বিলুপ্ত’ হয়ে গেছেন। কেউ ভাবেন তিনি ‘বাক্বা বিল্লাহ’ অর্থাৎ ‘আল্লাহর সত্তার মধ্যে স্থায়ী’ হয়ে গেছেন। এ সময় পুরুষ মুরীদ ও নারী মুরীদের মধ্যে কোন ভেদাভেদ থাকে না। পীরের আত্মার মধ্যে বিলীন হয়ে আল্লাহর পরমাত্মার মধ্যে বিলুপ্ত হওয়ার সাধনাকেই তারা সর্বোচ্চ ইবাদত বলে মনে করেন। আর এই বিলুপ্ত হ’তে পারাকেই তারা সর্বোচ্চ মা‘রেফাত মনে করেন। অনেকে এটাকে রাসূল (ছাঃ)-এর মি‘রাজের সঙ্গেও তুলনা করার ধৃষ্টতা দেখান। অনেক ছূফী নিজেকে সরাসরি আল্লাহ বলতেও কছূর করেননি। কেননা তাদের নিকটে ‘যিকরের তাৎপর্য হ’ল, আল্লাহর সত্তার মধ্যে বিলীন হয়ে জ্যোতির্ময় হওয়া’। ফলে ‘যিকরকারী স্বয়ং আল্লাহতে পরিণত হয়ে যায়’। তাদের ধারণা মতে, যিক্রকারীরা আল্লাহর আত্মার মধ্যে বা আল্লাহ তাদের আত্মার মধ্যে প্রবেশ করেন এবং উভয়ে এক আত্মায় পরিণত হন। একে তাদের পরিভাষায় ‘হুলূল’ ও ‘ইত্তেহাদ’ বলা হয়। যার মাধ্যমে বান্দার আত্মা ও আল্লাহর পরমাত্মা মিশে একাকার হয়ে যায়। এজন্য তারা তাদের কথিত অলীর মর্যাদা নবীর উপরে ধারণা করেন। আর এ কারণেই আবু ইয়াযীদ বিস্তামী ওরফে বায়েযীদ বুস্তামী (১৮৮-২৬১ হি./৮০৪-৮৭৫ খৃ.) বলেন,سُبْحَانِي مَا أَعْظَمَ شَأنِى ‘মহাপবিত্র আমি, কতই না বড় আমার মর্যাদা’। তাঁর দরজায় কেউ ধাক্কা দিলে তিনি বলতেন, لَيْسَ فِى الْبَيْتِ غَيْرُ اللهِ ‘বাড়িতে কেউ নেই আল্লাহ ছাড়া’। আরেকজন ছূফী মনছূর হাল্লাজ (২৪৪-৩০৯ হি./৮৫৮-৯২২ খৃ.) বলতেন, أَنَا الْحَقُّ ‘আমিই আললাহ’।[4]

এইসব ভ্রান্ত আক্বীদার অনুসারীরা তাদের কথিত মাযারের সাথে বানিয়েছে মসজিদ। এর মাধ্যমে তারা নিজেদের ঈমান যাহির করে। অথচ সিজদা করে কবরে। সাহায্য চায় কবরে। মানত করে কবরে। প্রার্থনা করে কবরে। এমনকি মসজিদেও একপাশে ‘আল্লাহ’, অন্য পাশে ‘মুহাম্মাদ’ লেখে। কখনো আল্লাহর সাথে তাদের পূজিত পীরের নাম লেখে। যেমন খাজা বাবা, গরীব নেওয়ায, গওছুল আযম, বাবা ভান্ডারী প্রভৃতি। তাদের অনুসারীদের অনেকে এগুলি গাড়ীর মাথায় লেখে যাতে এক্সিডেণ্ট না হয়। এগুলি লেখা শো-বক্স বাড়ীতে বা কর্মস্থলের দেওয়ালে টাঙিয়ে রাখে যাতে বরকত হয়। যা বারবার জ্বলে ও নিভে। অনেকে হাতে হাল ধরা মুহাম্মাদের নৌকায় আল্লাহকে দাঁড় করিয়ে কাঠের ফ্রেম বানিয়ে বিক্রি করে এবং তা দেওয়ালে টাঙিয়ে রাখে যাতে শয়তান প্রবেশ করতে না পারে। অথচ ‘আল্লাহ’ বা ‘মুহাম্মাদ’ কোন সাইনবোর্ড নন। বরং আল্লাহ হৃদয়ের বস্ত্ত। যাঁকে বিশ্বাস করতে হয় একনিষ্ঠভাবে এবং তাঁর নিকট দো‘আ করতে হয় বিনীতভাবে। তাঁর সাথে অন্য কাউকে ডাকা যায় না। লেখাটি মুছে গেলে বা ভেঙ্গে গেলে কি আল্লাহ মুছে যাবেন বা ভেঙ্গে যাবেন? একইভাবে ‘মুহাম্মাদ’ আল্লাহর বান্দা ও তাঁর বাণী বাহক। তিনি উম্মতের পথপ্রদর্শক। তাঁর আনুগত্য করতে হয়। অন্যদের ন্যায় তিনিও আল্লাহর রহমতের ভিখারী। সেকারণ ক্বিয়ামতের দিন ‘মাক্বামে মাহমূদ’ পাওয়ার জন্য তাঁর পক্ষে আল্লাহর নিকট প্রতি আযানের শেষে উম্মতকে দো‘আ করার জন্য তিনি নির্দেশ দিয়ে গেছেন।[5] তিনি কখনোই আল্লাহর সমতুল্য নন। তিনি কারু জন্য পরকালীন মুক্তির অসীলা নন। ক্বিয়ামতের দিন তিনি এমনকি তাঁর প্রাণপ্রিয় কন্যা ফাতেমারও কোন উপকার করতে পারবেন না বলে দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করেছেন।[6] ফলে আল্লাহর সাথে অন্য কোনকিছুকে সমান গণ্য করা ও তাদের প্রতি সমানভাবে শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা পরিষ্কারভাবে ‘শিরক’। যা ক্ষমার অযোগ্য পাপ।

মূর্তিপূজা, কবরপূজা, তারকাপূজা, পীরপূজা, স্থানপূজা, অগ্নিপূজা প্রভৃতি এইসব ভ্রান্ত আক্বীদা থেকে সৃষ্ট। এগুলি ‘শিরক’। যার পাপ আল্লাহ কখনোই ক্ষমা করেন না (নিসা ৪/৪৮, ১১৬)। কারণ তারা আল্লাহর বড়ত্বের মহিমা থেকে ও তাঁর গুণাবলীর ঔজ্জ্বল্য থেকে বান্দার হৃদয়কে খালি করে দিয়েছেন এবং তদস্থলে তাদের কল্পিত অসীলা সমূহকে বড় করে দেখিয়েছেন। অথচ তাওহীদের সর্বোচ্চ স্থান ও আল্লাহর গুণাবলীর জ্যোতি সমূহ দ্বারা হৃদয়কে আলোকিত করা ব্যতীত কিভাবে সেটি ঈমান পদবাচ্য হ’তে পারে? ফলে মুশরিকদের সকল সৎকর্ম বরবাদ হবে’ (যুমার ৩৯/৬৫)। সেগুলি সবই ক্বিয়ামতের দিন বিক্ষিপ্ত ধূলিকণায় পরিণত হবে (ফুরক্বান ২৫/২৩)। তাদের জন্য আল্লাহ জান্নাতকে হারাম করেছেন’ (মায়েদাহ ৫/৭২)। অতএব সকল প্রকার ভ্রান্ত বিশ্বাস থেকে মুক্ত হয়ে ছাহাবায়ে কেরাম ও কুরআন-সুন্নাহর অনুসারীগণের বিশুদ্ধ আক্বীদা ও বিশ্বাসকে সর্বান্তঃকরণে হৃদয়ে ধারণ করতে হবে। আর সেটাই হবে প্রকৃত মা‘রেফাত বা আল্লাহকে চেনা। এর বাইরে গিয়ে প্রকৃত ঈমানদার হওয়ার কোন সুযোগ নেই। আর ঈমানের হ্রাস-বৃদ্ধিতেই মানবতার মূল্যবোধের হ্রাস-বৃদ্ধি নির্ভর করে। সেই সাথে নির্ভর করে সমাজের শান্তি ও স্থিতিশীলতার হ্রাস-বৃদ্ধি।

শৈথিল্যবাদী মুরজিয়া ঈমানদারগণ মূল্যবোধের বিষয়ে কপট মুনাফিকদের ন্যায় উদাসীন। তারা ছালাত আদায় করে লোক দেখানো এবং উদাসীনভাবে (মা‘ঊন ১০৭/৫-৬)। তারা ছাদাক্বা করলেও তা করে অনিচ্ছুকভাবে (তওবা ৯/১০৩)। তারা যা কিছু করে তার অধিকাংশ দুনিয়াবী স্বার্থ হাছিলের জন্য করে। ফলে মানবিক মূল্যবোধ তাদের কাছে হয় গৌণ ও স্বার্থদুষ্ট।

পক্ষান্তরে খারেজী ঈমানদারগণ মূল্যবোধের বিষয়ে চরমপন্থী হয়ে থাকে। তারা কবীরা গোনাহগারদের প্রতি হয় আগ্রাসী স্বভাবের। তারা এমনকি তাদের জান-মাল-ইযযত সবকিছুকে হালাল মনে করে। আর সেজন্যই রাসূল (ছাঃ) তাদেরকে জাহান্নামের কুকুর বলেছেন।[7]

এদের বিপরীতে কুরআন-সুন্নাহর অনুসারীর ঈমান হয় সর্বদা মধ্যপন্থী। তারা শৈথিল্যবাদী বা চরমপন্থী নন। তারা সর্বাবস্থায় মানবিক মূল্যবোধকে অগ্রাধিকার দেন এবং মানুষের হেদায়াতের জন্য দো‘আ করেন। তারা সর্বাবস্থায় সমাজ সংস্কারে অগ্রণী হন এবং সেজন্য সাধ্যমত প্রচেষ্টা চালান।

২. দ্বীনী ইলম শিক্ষা করা :

আল্লাহ বলেন, إِنَّمَا يَخْشَى اللهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ ‘বস্ত্ততঃ আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে কেবল জ্ঞানীরাই আল্লাহকে ভয় করে’ (ফাতিবর ৩৫/২৮)। কেননা তারাই আল্লাহর নাম ও গুণাবলী সম্পর্কে অধিক জ্ঞাত। অতঃপর সেটিকে তারা নিজেদের প্রার্থনায় ও নিজেদের জীবনের সর্বক্ষেত্রে ধারণ করেন। ফলে তারাই হন সর্বাধিক আল্লাহভীরু। যা তাদের হৃদয়ে ঈমানী শক্তির জাগরণ সৃষ্টি করে। নইলে যে জ্ঞান আল্লাহভীতি জাগ্রত করে না, সে জ্ঞান ধার করা। আমরা তার থেকে আল্লাহর নিকট পানাহ চাই। ইবনু রজব হাম্বলী (মৃ. ৭৯৫ হি.) বলেন, উপকারী ইল্ম দু’টি বস্ত্তর উপর ভিত্তিশীল। (১) আল্লাহকে চেনার উপর। তাঁর সুন্দর নাম ও গুণাবলী এবং অনন্য কার্যাবলীর মাধ্যমে। যা তার মধ্যে আল্লাহর বড়ত্ব, ভীতি, ভালবাসা ও আকাংখা সৃষ্টি করে। সেই সাথে সে তাঁর প্রতি ভরসা করে, তাঁর ফায়ছালায় সন্তুষ্ট থাকে এবং তাঁর পরীক্ষায় ধৈর্যধারণ করে। (২) আল্লাহ কোনটি ভালবাসেন ও কোনটি বাসেন না, সেই সকল বিশ্বাস এবং প্রকাশ্য ও গোপন কথা ও কর্ম সমূহ জানার উপর। যার ফলে সে ঐসকল কাজ দ্রুত করাকে অপরিহার্য মনে করে’।[8]

এরাই হ’লেন প্রকৃত জ্ঞানী। যারা আল্লাহর সৃষ্টিতত্ত্ব সম্পর্কে গবেষণা করেন ও সেখান থেকে উপদেশ গ্রহণ করেন। তারাই আল্লাহর শক্তি ও ক্ষমতা উপলব্ধি করেন এবং তাঁর অবাধ্যতা হ’তে বিরত থাকেন। ফলে তারাই প্রকৃত আনুগত্যের মাধ্যমে সত্যিকার অর্থে আল্লাহকে ভয় করে থাকেন। তারা সৃষ্টির গবেষণায় যত গভীরে ডুব দেন, তত বেশী আল্লাহর একত্ব ও মহত্ত জানতে পারেন। তখন তারা আল্লাহর দাসত্ব করেন এমনভাবে যেন তিনি আল্লাহকে সামনে দেখতে পান। একজন চিকিৎসক যখন রোগীর রক্ত নিয়ে গবেষণা করেন, আর দেখেন যে তার কণিকা সমূহ ইচ্ছামত ভেঙ্গে যাচ্ছে। আবার মিলে যাচ্ছে। তখন সে তার জ্ঞানের সর্বশেষ সীমায় গিয়ে বিস্ময়ে বলে ওঠে, সুবহানাল্লাহ! ঐ ব্যক্তি মুখ দিয়ে কেবল খাদ্য গ্রহণ করেছে। এক্ষণে সেই খাদ্য কিভাবে রক্ত উৎপাদন করল? কিভাবে বীর্য তৈরী করল? কিভাবে বুকে দুধ তৈরী করল? কিভাবে অস্থি-মজ্জা ও অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সুস্থ ও শক্তিশালী করল? বিজ্ঞানী যত বেশী এসবের জবাব খুঁজতে যাবেন, তত বেশী তিনি আল্লাহকে খুঁজে পাবেন ও তাঁর নৈকট্য উপলব্ধি করবেন। আল্লাহ বলেন, وَإِنَّ لَكُمْ فِي الْأَنْعَامِ لَعِبْرَةً نُسْقِيكُمْ مِمَّا فِي بُطُونِهِ مِنْ بَيْنِ فَرْثٍ وَدَمٍ لَبَنًا خَالِصًا سَائِغًا لِلشَّارِبِينَ- ‘নিশ্চয়ই গবাদি পশুর মধ্যে তোমাদের জন্য শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে। আমরা তোমাদেরকে তাদের থেকে বিশুদ্ধ দুধ পান করাই যা পানকারীদের জন্য অতীব উপাদেয়। যা নিঃসৃত হয় উক্ত পশুর উদরস্থিত গোবর ও রক্তের মধ্য হ’তে’ (নাহল ১৬/৬৬)

তিনি আরও বলেন,أَفَلاَ يَنْظُرُونَ إِلَى الْإِبِلِ كَيْفَ خُلِقَتْ- وَإِلَى السَّمَاءِ كَيْفَ رُفِعَتْ- وَإِلَى الْجِبَالِ كَيْفَ نُصِبَتْ- وَإِلَى الْأَرْضِ كَيْفَ سُطِحَتْ- ‘তারা কি দেখে না উষ্ট্রের প্রতি, কিভাবে তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে?’ ‘এবং আকাশের প্রতি, কিভাবে তাকে উচ্চ করা হয়েছে?’ ‘এবং পাহাড় সমূহের প্রতি, কিভাবে তাকে স্থাপন করা হয়েছে?’ ‘এবং পৃথিবীর প্রতি, কিভাবে তাকে বিছানো হয়েছে?’ (গাশিয়াহ ৮৮/১৭-২০)

বস্ত্ততঃ ‘ইলম’ বলতে সেটাকে বুঝায়, যা হৃদয়ে আল্লাহভীতি আনয়ন করে এবং যার প্রভাব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে প্রকাশ পায় (মির‘আত)। সেই সাথে কর্মজগতে যার বাস্তবায়ন ঘটে। হাদীছে জিব্রীলে রাসূল (ছাঃ)-কে ‘ইহসান’ সম্পর্কে যে শিক্ষা দেওয়া হয়, সেখানে বলা হয়, أَنْ تَعْبُدَ اللهَ كَأَنَّكَ تَرَاهُ فَإِنْ لَمْ تَكُنْ تَرَاهُ فَإِنَّهُ يَرَاكَ ‘তুমি আল্লাহর ইবাদত করবে এমনভাবে, যেন তুমি তাঁকে দেখছ। আর যদি দেখতে না পাও, তাহ’লে ভেবে নিয়ো যে তিনি তোমাকে দেখছেন’।[9]

হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,مَنْ سَلَكَ طَرِيقًا يَلْتَمِسُ فِيهِ عِلْمًا سَهَّلَ اللهُ لَهُ بِهِ طَرِيقًا إِلَى الْجَنَّةِ ‘যে ব্যক্তি ইলম শিক্ষার জন্য কোন পথ তালাশ করবে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতের একটি পথ সহজ করে দিবেন’।[10] এখানে ‘ইল্ম’ অর্থ ‘দ্বীনী ইল্ম’। কেননা দুনিয়াবী ইল্ম নাস্তিক ও বস্ত্তবাদীরাও শিখে থাকেন। সেটি জান্নাতের পথ সহজ করে দেয় না। বরং জাহান্নামের রাস্তা সহজ করে দেয়। তাছাড়া বিজ্ঞানের ভিত্তি হ’ল ‘অনুমিতি’। আর কুরআন-সুন্নাহর ভিত্তি হ’ল ‘আল্লাহর অহি’। তাই স্বাভাবিক জ্ঞানে কখনো কুরআন ও বিজ্ঞানে সংঘর্ষ মনে হ’লে সেখানে অবশ্যই কুরআন অগ্রাধিকার পাবে। কুরআনী সত্যের বিপরীতে অন্য কিছুই গ্রহণীয় হবে না। ইতিমধ্যেই বিজ্ঞানের বহু আবিষ্কার কুরআনের নিকট হার মানতে বাধ্য হয়েছে। আর বিশুদ্ধ হাদীছ কখনো বিশুদ্ধ জ্ঞানের সাথে সাংঘর্ষিক নয়।

আরও দেখুন:  চেতনার সংকট

৩. আল্লাহর সৃষ্টিতত্ত্ব নিয়ে গবেষণা করা :

আল্লাহ বলেন,إِنَّ فِي خَلْقِ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَاخْتِلاَفِ اللَّيْلِ وَالنَّهَارِ لَآيَاتٍ لِأُولِي الْأَلْبَابِ- الَّذِينَ يَذْكُرُونَ اللهَ قِيَامًا وَقُعُودًا وَعَلَى جُنُوبِهِمْ وَيَتَفَكَّرُونَ فِي خَلْقِ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ رَبَّنَا مَا خَلَقْتَ هَذَا بَاطِلاً سُبْحَانَكَ فَقِنَا عَذَابَ النَّارِ- ‘নিশ্চয়ই আসমান ও যমীনের সৃষ্টিতে এবং রাত্রি ও দিবসের আগমন-নির্গমনে জ্ঞানীদের জন্য (আল্লাহর) নিদর্শন সমূহ নিহিত রয়েছে’। ‘যারা দাঁড়িয়ে, বসে ও শুয়ে সর্বাবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করে এবং আসমান ও যমীনের সৃষ্টি বিষয়ে গবেষণা করে এবং বলে, হে আমাদের পালনকর্তা! তুমি এগুলিকে অনর্থক সৃষ্টি করোনি। মহা পবিত্র তুমি। অতএব তুমি আমাদেরকে জাহান্নামের আযাব থেকে বাঁচাও!’ (আলে ইমরান ৩/১৯০-৯১)

প্রতিটি কর্মই তার কর্তার প্রমাণ বহন করে। অমনিভাবে প্রতিটি সৃষ্টিই তার সৃষ্টিকর্তা আল্ললাহর প্রমাণ ও তাঁর নিদর্শন  হিসাবে গণ্য হয়। হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন, অত্র আয়াত নাযিল হওয়ার পর রাসূলুল্ললাহ (ছাঃ) ছালাতে দাঁড়িয়ে যান ও কাঁদতে থাকেন। ছালাত শেষে আয়াতটি পাঠ করে তিনি বলেন, আজ রাতে এ আয়াতটি আমার উপর নাযিল হয়েছে। অতএব وَيْلٌ لِمَنْ قَرَأَهَا وَلَمْ يَتَفَكَّرْ فِيهَا ‘দুর্ভোগ ঐ ব্যক্তির জন্য যে এটি পাঠ করে অথচ এতে চিন্তা-গবেষণা করে না’।[11]

এই চিন্তা-গবেষণা দুই ধরনের। এক- সৃষ্টির প্রাকৃতিক বিধান ও নিখুঁৎ ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা। কারণ আল্লাহ ব্যতীত কারু পক্ষেই বিশাল সৃষ্টিজগতের শৃংখলা বিধান ও সুন্দর ব্যবস্থাপনা সম্ভব নয়। যেকারণ কল্পনার অতীত দ্রুতগতিতে ঘূর্ণায়মান সূর্য-চন্দ্র ও নক্ষত্ররাজির মধ্যে পরস্পরে সংঘর্ষ হয় না। কেউ কারু নির্ধারিত দূরত্ব ও কক্ষপথ অতিক্রম করে না। সেদিকে ইঙ্গিত করেই আল্লাহ বলেন, لَوْ كَانَ فِيهِمَا آلِهَةٌ إِلاَّ اللهُ لَفَسَدَتَا فَسُبْحَانَ اللهِ رَبِّ الْعَرْشِ عَمَّا يَصِفُونَ- ‘যদি আকাশ ও পৃথিবীতে আল্লাহ ব্যতীত বহু উপাস্য থাকত, তাহ’লে উভয়টিই ধ্বংস হয়ে যেত। অতএব তারা যা বলে, তা থেকে আরশের মালিক আল্লাহ মহাপবিত্র’ (আম্বিয়া ২১/২২)। সুতরাং নভোবিজ্ঞান ও ভূবিজ্ঞানে গবেষণা করা ঈমানদার ও মেধাবী ব্যক্তির জন্য অপরিহার্য। যেমন আল্লাহ বলেন,قُلِ انْظُرُوا مَاذَا فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَمَا تُغْنِي الْآيَاتُ وَالنُّذُرُ عَنْ قَوْمٍ لاَ يُؤْمِنُونَ- ‘বলে দাও, তোমরা চোখ খুলে দেখ নভোমন্ডলে ও ভূমন্ডলে আল্লাহর কত নিদর্শন রয়েছে। বস্ত্ততঃ অবিশ্বাসী সম্প্রদায়ের জন্য নিদর্শনাবলী ও ভয় প্রদর্শন কোন কাজে আসে না’ (ইউনুস ১০/১০১)। সে যতই সৃষ্টির গভীরে ডুব দিবে, সে ততই সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব অনুভব করবে ও তাঁর প্রতি আনুগত্যশীল হবে। সাথে সাথে তার ঈমান বৃদ্ধি পাবে। সেই সঙ্গে এমনকি সমাজের একজন প্রতিবন্ধী দুর্বলতম ব্যক্তির মূল্যবোধ রক্ষায়ও সে আত্মনিয়োগ করবে।

৪. কুরআন অনুধাবন করা :

আল্লাহ বলেন,كِتَابٌ أَنْزَلْنَاهُ إِلَيْكَ مُبَارَكٌ لِيَدَّبَّرُوا آيَاتِهِ وَلِيَتَذَكَّرَ أُولُو الْأَلْبَابِ- ‘এটি এক বরকতমন্ডিত কিতাব, যা আমরা তোমার প্রতি নাযিল করেছি। যাতে লোকেরা  এর আয়াত সমূহ অনুধাবন করে এবং জ্ঞানীরা উপদেশ গ্রহণ করে’ (ছোয়াদ ৩৮/২৯)

হুযায়ফা ইবনুল ইয়ামান (রাঃ) বলেন, ‘আমি এক রাতে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর সাথে ছালাত আদায় করেছিলাম। দেখলাম, যখন আল্লাহর গুণগানের কোন আয়াত আসে, তখন তিনি ‘সুবহানাল্লাহ’ বলেন। আবার যখন প্রার্থনার আয়াত আসে, তখন তিনি প্রার্থনা করেন। যখন আল্লাহ থেকে পানাহ চাওয়ার আয়াত আসে, তখন তিনি আল্লাহর আশ্রয় চান’… (মুসলিম হা/৭৭২)। ইবনু আববাস (রাঃ) বলেন, ‘যখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) سَبِّحِ اسْمَ رَبِّكَ الْأَعْلَى (সাবিবহিস্মা রবিবকাল আ‘লা) পড়তেন, তখন তিনি ‘সুবহা-না রবিবয়াল আ‘লা’ (মহাপবিত্র আমার প্রতিপালক, যিনি সর্বোচ্চ) বলতেন’।[12] সূরা ক্বিয়ামাহ-এর শেষ আয়াতأَلَيْسَ ذَلِكَ بِقَادِرٍ عَلَى أَنْ يُحْيِيَ الْمَوْتَى-এর জওয়াবে ‘সুবহা-নাকা ফা বালা’ (মহাপবিত্র আপনি! অতঃপর হাঁ, আপনিই মৃতকে জীবিত করার ক্ষমতা রাখেন) বলতেন’।[13] এতে বুঝা যায় যে, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) গভীর অনুধাবনের সাথে কুরআন তেলাওয়াত করতেন।

এভাবে মানুষ যত বেশী কুরআন অনুধাবন করবে, তত বেশী তার ঈমান বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু যে ব্যক্তি অনুধাবন ছাড়াই কুরআন পাঠ করে, সে এর স্বাদ আস্বাদন থেকে বঞ্চিত হয় এবং অফুরন্ত কল্যাণ থেকে মাহরূম হয়। আল্লাহ বলেন,إِنَّ فِي ذَلِكَ لَذِكْرَى لِمَنْ كَانَ لَهُ قَلْبٌ أَوْ أَلْقَى السَّمْعَ وَهُوَ شَهِيدٌ ‘নিশ্চয় এতে উপদেশ রয়েছে যার অনুধাবন করার মত অন্তর রয়েছে এবং যে কান পেতে মনোযোগ দিয়ে তা শ্রবণ করে’ (ক্বাফ ৫০/৩৭)। মর্ম উপলব্ধি করে কুরআন পাঠ করলে তার দেহ-মনে ভীতির সঞ্চার হবে। যেমন আল্লাহ বলেন, اللهُ نَزَّلَ أَحْسَنَ الْحَدِيثِ كِتَابًا مُتَشَابِهًا مَثَانِيَ تَقْشَعِرُّ مِنْهُ جُلُودُ الَّذِينَ يَخْشَوْنَ رَبَّهُمْ ثُمَّ تَلِينُ جُلُودُهُمْ وَقُلُوبُهُمْ إِلَى ذِكْرِ اللهِ ذَلِكَ هُدَى اللهِ يَهْدِي بِهِ مَنْ يَشَاءُ وَمَنْ يُضْلِلِ اللهُ فَمَا لَهُ مِنْ هَادٍ- ‘আল্লাহ সর্বোত্তম বাণী সম্বলিত কিতাব নাযিল করেছেন। যা পরস্পরে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং পুনঃ পুনঃ পঠিত। এতে তাদের দেহচর্ম ভয়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে, যারা তাদের প্রতিপালককে ভয় করে। অতঃপর তাদের দেহ-মন আল্লাহর স্মরণে বিনীত হয়। এটা হ’ল আল্লাহর পথপ্রদর্শন। এর মাধ্যমে তিনি যাকে চান পথপ্রদর্শন করেন। আর আল্লাহ যাকে পথভ্রষ্ট করেন, তাকে পথ দেখানোর কেউ নেই’ (যুমার ৩৯/২৩)

মুসলিম উম্মাহর জ্ঞানীগণ যাতে ইহূদী-নাছারা আলেমদের মত আল্লাহ থেকে উদাসীন ও শক্ত হৃদয়ের না হয়, সেদিকে সাবধান করে আল্লাহ বলেন, أَلَمْ يَأْنِ لِلَّذِينَ آمَنُوا أَنْ تَخْشَعَ قُلُوبُهُمْ لِذِكْرِ اللهِ وَمَا نَزَلَ مِنَ الْحَقِّ وَلاَ يَكُونُوا كَالَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ مِنْ قَبْلُ فَطَالَ عَلَيْهِمُ الْأَمَدُ فَقَسَتْ قُلُوبُهُمْ وَكَثِيرٌ مِنْهُمْ فَاسِقُونَ- ‘মুমিনদের জন্য কি এখনও সে সময় আসেনি যে, আল্লাহর স্মরণে এবং যে সত্য (কুরআন) নাযিল হয়েছে, তার প্রতি তাদের হৃদয় সমূহ ভীত-সন্ত্রস্ত হবে? তারা যেন তাদের মত না হয়, যাদেরকে ইতিপূর্বে কিতাব দেওয়া হয়েছিল। তাদের উপর সেটি সুদীর্ঘ কাল অতিক্রান্ত হয়েছে। অতঃপর তাদের হৃদয় সমূহ কঠিন হয়ে গেছে। বস্ত্ততঃ তাদের বহু লোক ছিল পাপাচারী’ (হাদীদ ৫৭/১৬)

হাফেয ইবনুল ক্বাইয়িম (রহঃ) বলেন,فقراءة آيَة بتفكر وتفهم خير من قِرَاءَة ختمة بِغَيْر تدبر وتفهم وأنفع للقلب وأدعى الى حُصُول الايمان وذوق حلاوة الْقُرْآن ‘কুরআনের একটি আয়াত চিন্তা-গবেষণা ও বুঝে-শুনে পাঠ করা, বিনা অনুধাবনে ও বিনা বুঝে কুরআন খতম করার চাইতে উত্তম। যা হৃদয়ের জন্য অধিক উপকারী এবং ঈমান হাছিলে ও কুরআনের স্বাদ আস্বাদনে সর্বাধিক কাম্য’।[14]

হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,مَنْ تَعَلَّمَ عِلْمًا مِمَّا يُبْتَغَى بِهِ وَجْهُ اللهِ عَزَّ وَجَلَّ لاَ يَتَعَلَّمُهُ إِلاَّ لِيُصِيبَ بِهِ عَرَضًا مِنَ الدُّنْيَا لَمْ يَجِدْ عَرْفَ الْجَنَّةِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ- ‘যে ব্যক্তি ইলম শিক্ষা করল যার মাধ্যমে আল্লাহর চেহারা অন্বেষণ করা হয়, অথচ সে তা শিক্ষা করে দুনিয়াবী সম্পদ অর্জন করার জন্য, সে ক্বিয়ামতের দিন জান্নাতের সুগন্ধিও পাবে না’।[15]

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) দো‘আ করতেন,اللَّهُمَّ إِنِّى أَعُوذُ بِكَ مِنْ عِلْمٍ لاَ يَنْفَعُ وَمِنْ قَلْبٍ لاَ يَخْشَعُ وَمِنْ نَفْسٍ لاَ تَشْبَعُ وَمِنْ دَعْوَةٍ لاَ يُسْتَجَابُ لَهَا- ‘হে আল্লাহ! আমি তোমার আশ্রয় প্রার্থনা করছি ঐ ইলম থেকে যা কোন ফায়েদা দেয় না। ঐ অন্তর থেকে যা তোমার ভয়ে ভীত হয় না। ঐ আত্মা থেকে যা তৃপ্ত হয় না এবং ঐ দো‘আ থেকে যা কবুল হয় না’।[16]

হযরত কা‘ব বিন মালেক (রাঃ) হ’তে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,مَنْ طَلَبَ الْعِلْمَ لِيُجَارِىَ بِهِ الْعُلَمَاءَ أَوْ لِيُمَارِىَ بِهِ السُّفَهَاءَ أَوْ يَصْرِفَ بِهِ وُجُوهَ النَّاسِ إِلَيْهِ أَدْخَلَهُ اللهُ النَّارَ ‘যে ব্যক্তি ইলম শিখে এজন্য যে, তার দ্বারা সে আলেমদের সঙ্গে মুকাবিলা করবে অথবা বোকাদের সঙ্গে ঝগড়া করবে অথবা লোকদের চেহারা তার দিকে ফিরিয়ে নিবে, আল্লাহ তাকে জাহান্নামে প্রবেশ করাবেন’।[17]

ওমর ফারূক (রাঃ)-এর নিকটে জনৈক ব্যক্তি লোকদের প্রতি ওয়ায করার অনুমতি চাইলে তিনি তাকে বলেন,أَخْشَى عَلَيْكَ أَنْ تَقُصَّ فَتَرْتَفِعَ عَلَيْهِمْ فِى نَفْسِك ثُمَّ تَقُصَّ فَتَرْتَفِعَ حَتَّى يُخَيَّلَ إِلَيْكَ أَنَّكَ فَوْقَهُمْ بِمَنْزِلَةِ الثُّرَيَّا فَيَضَعَكَ اللَّهُ تَحْتَ أَقْدَامِهِمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ بِقَدْرِ ذَلِكَ. ‘আমার ভয় হয় ওয়ায করার ফলে তোমার মধ্যে ধ্রুবতারার ন্যায় উচ্চ মর্যাদা পাওয়ার অহংকার সৃষ্টি হবে। আর তাতে আল্লাহ তোমাকে ক্বিয়ামতের দিন ঐসব লোকদের পায়ের তলায় রাখবেন’।[18]

অতএব বান্দা যখন আল্লাহর আয়াত সমূহ গবেষণা করবে এবং এর মধ্যে জান্নাতের পুরস্কার ও জাহান্নামের হুমকি সমূহ জানবে এবং সে অনুযায়ী কর্ম সম্পাদনের দিকে এগিয়ে যাবে, তখন সে জাহান্নামের ভয়ে ভীত হবে এবং জান্নাত লাভের জন্য তার ঈমান বৃদ্ধি পাবে।                (চলমান…)

 


[1]. মুসলিম হা/২৭৩৩; মিশকাত হা/২২২৮ ‘দো‘আ সমূহ’ অধ্যায়।

[2]. বুখারী হা/৬৪১০, ৭৩৯২; মুসলিম হা/২৬৭৭; মিশকাত হা/২২৮৭।

[3]. আব্দুর রহমান বিন নাছের আস-সা‘দী, আত-তাওযীহু ওয়াল বায়ান লে শাজারাতিল ঈমান ৭২ পৃ.।

[4]. আব্দুর রহমান দামেশক্বিইয়াহ, আন-নকশবন্দিইয়াহ (রিয়াদ, দার ত্বাইয়েবাহ, ৩য় সংস্করণ ১৪০৯ হি./১৯৮৮ খৃ.) ৭৫, ৭৭ পৃ.।

[5]. বুখারী হা/৬১৪; মিশকাত হা/৬৫৯; রাবী জাবের বিন আব্দুল্লাহ (রাঃ)।

[6]. মুসলিম হা/২০৪; মিশকাত হা/৫৩৭৩।

[7]. ইবনু মাজাহ হা/১৭৩; ছহীহুল জামে‘ হা/৩৩৪৭।

[8]. ইবনু রজব হাম্বলী, ফাযলু ইলমিস সালাফ ‘আলাল খালাফ ৭ পৃ.।

[9]. মুসলিম হা/৮; মিশকাত হা/২।

[10]. মুসলিম হা/২৬৯৯; মিশকাত হা/২০৪।

[11]. ছহীহ ইবনু হিববান হা/৬২০; সনদ ছহীহ -আরনাঊত্ব।

[12]. আহমাদ হা/২০৬৬; আবুদাঊদ হা/৮৮৩; মিশকাত হা/৮৫৯ ‘ছালাতে ক্বিরাআত’ অনুচ্ছেদ-১২।

[13]. বায়হাক্বী হা/৩৫০৭; আবুদাঊদ হা/৮৮৪ ‘ছালাতে দো‘আ’ অনুচেছদ-১৫৪, হাদীছ ছহীহ।

[14]. ইবনুল ক্বাইয়িম, মিফতাহু দারিস সা‘আদাহ (বৈরূত : দারুল কুতুবিল ইলমিইয়াহ, তাবি) ১/১৮৭।

[15]. আবুদাঊদ হা/৩৬৬৪; ইবনু মাজাহ হা/২৫২; মিশকাত হা/২২৭।

[16]. মুসলিম হা/২৭২২; মিশকাত হা/২৪৬০।

[17]. তিরমিযী হা/২৬৫৪, সনদ হাসান; মিশকাত হা/২২৫।

[18]. আহমাদ হা/১১১, সনদ হাসান।

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

মন্তব্য করুন

Back to top button