সচেতনতা

হিজড়াদের আল্লাহ

ফেইসবুকেই প্রশ্নটা আসলো একজন নাম না জানা আইডি থেকে। ছদ্ম সে নাম ছদ্মই থাকুক, কিন্তু প্রশ্নটা আমার চিন্তার রাজ্যে তোলপাড় করে দিলো। আমি ভাবলাম, পড়লাম, বুঝার চেষ্টা করলাম এবং সে পুরাতন রোগ- খোলা জানালায় শুন্য দৃষ্টি মিলিয়ে বিষণ্ণ বাতাসে ঘাস ফুলের আন্দোলন দেখতে থাকলাম।
হিজড়া দের কোন জেন্ডার নেই। তাদের কারো উভয় জেন্ডার থাকে, তাদের সাধারণত তৃতীয় জেন্ডার বা শিমেইল ও বলে। কিংবা ছেলের মত জন্ম নিয়ে মেয়ের মত হয়ে গড়ে ওঠে। শরীরের হরমোন শুধু নয়, অন্যান্য অঙ্গেও থাকে মেয়েলিত্ব। কিংবা মেয়ে হয়ে জন্ম নিয়ে স্বাস্থ্যে সুঠামে, দেহে হাড্ডিতে, এমনকি বিশেষ অঙ্গেও পুরুষালি ভাব ফুটে ওঠে। এদের নিয়ে এই ছদ্ম নামের আইডির প্রশ্ন ছিলো।
আইডির স্বত্বাধিকারী যে বোন তার জানান তিনি দিয়েছেন। দিয়ে একটা দুঃখ শেয়ার করেছেন।
উনার এলাকা উত্তর বঙ্গের কোন এক জেলা। সেখানে প্রথমে মর্জিনা নামের এক মেয়ে বড় হয়ে উঠতে থাকে। বয়ঃসন্ধিতে তার মেয়েলিত্বের তেমন কোন চিহ্ন ফুটে উঠেনি, বরং গলার কণ্ঠহারে ভোকাল কড হঠাৎ ২২ সেন্টিমিটার লম্বা হওয়াতে ছেলেদের মত স্বর বের হতে শুরু হয়। এবং মর্জিনাকে পরে মিজানুর হতে হয়। বাড়ি ঘর ছাড়তে হয়; কারণ মা বাবা তাকে আর ঘরে রাখেনি; ভাই বোনেররা তাকে কুলক্ষণ মনে করতো লাগলো ফলে তারা তার সাথে কথা বলতো না। সে বেছে নেয় ছেলেদের সাথে কাজ করার পথ। কিন্তু সেখানে সে প্রায়ই গুপ্তাংগের প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হতো, দুঃসহ জীবন ছিলো তার।
ওখানে এক চার্চের ফাদার জানতে পেরে তাকে চার্চে ঠাঁয় দেন। বলে দেন আল্লাহ তোমাকে ত্যাগ করলেও গড তোমাকে ছাড়েনি, তুমি গডের ই আছো। তোমার সৃষ্টিতে কারো হাত নেই। গডের ই সৃষ্টি তুমি। বড় কিছু না করতে পারলেও তোমাকে না খেয়ে মরতে হবেনা এখানে। এই মিজানুর এখন মর্জিনা নাম নিয়েই গডের অর্চনা করছে। এবং আরো কিছু ‘এই রোগের’ রোগীকে নিয়ে খৃষ্টান ফাদারের তত্ববধানে খৃষ্টান হয়ে অন্তত সম্মানের জীবন চালাচ্ছে।
‘যে গল্প নিষিদ্ধ’ নামে সামিয়া রহমানের একটা ডকুমেন্টারি আমার মনে পড়ে গেলো, আমি কিছু দৃশ্য দেখে কেঁদেছিলাম। আমাদের সমাজে, মুসলিম পরিবেশে, এবং আলিম উলামাদের নিশ্চুপতা ঐ সব বানী আদমকে কোন পথে নিয়ে গেছে তা নিয়েও ভাবতেছিলাম। আমি এই বোনের প্রশ্নে নিজকে খুব অসহায় মনে করলাম। তিনি বলেছেন হুজুর, এদেরকে ইসলাম কি বলে? ইসলাম এদের কি কিছু করেনি? এরা কি আসলেই জলে ভাসা পদ্মের মতই ভেসে বেড়াবে?!!! মসজিদ এদের যায়গা দেয়না!! গ্রামের কেও এদের মানে না!! বাবা মা এদের কে অভিশাপ মনে করে!!!
আসলে কুরআন ও হাদীস এদের ব্যাপারে খুব বেশি কথা বলেনি। কুরআনের এদের কথা স্পষ্ট করে কিছু বলেনি। বলেনি, তার মানেই হলো এরা হয় ছেলে নতুবা মেয়ে হিসেবে গণ্য হবে। এদেরকে তৃতীয় জেন্ডারে নিয়ে হাসির খোরাক বানিয়ে সমাজে এদেরকে ছোট করা যাবেনা। বরং এদের ঐ সমস্যাকে খুব গোপনীয় একটা রোগ ধরে হরমোনের সঠিক চিকিৎসা চালিয়ে মেয়ে হরমোন বেশির ক্ষেত্রে মেয়ে হিসেব জেগে উঠতে সাহায্য করতে হবে, আর পুরুষ হরমোন বেশির ক্ষেত্রে ঐ সন্তানকে পুরুষ হয়ে বড় হতে সাহায্য করতে হবে। এদের এই রোগ বাইরের মানুষ জানবে কেন? বরং শিক্ষা, চাকুরি, ব্যবসায় বা সমস্ত স্থানে তারা হয় মেয়ে না হয় ছেলে হিসেবে ভূমিকা গ্রহন করবে।
কুরআনে আল্লাহ সুরা আশশুরার ৪৯-৫০ নাম্বার আয়াতে সন্তান দানের একটা প্রক্রিয়ার কথা বলেছেন। সেখানে তিনি বলেছেনঃ “আল্লাহরই হচ্ছে মহাকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর সার্বভৌমত্ব। তিনি যা চান তাই সৃষ্টি করেন। তিনি যাকে চান কন্যাসন্তান দান করেন, আর যাকে ইচ্ছা করেন পুত্রসন্তান দেন, অথবা তিনি তাদের পুত্র ও কন্যায় মিলিয়ে দেন, আবার যাকে চান তাকে তিনি বন্ধ্যা বানিয়ে দেন। নিঃসন্দেহ তিনি সর্বজ্ঞাতা, সর্বশক্তিমান”। এই ‘মিলিয়ে দেন’ কথাতে এই জেন্ডারের ইংগিত পাওয়া যায়। এর অর্থ হলো এরাও আমাদের আল্লাহর সৃষ্টি।
এই জন্য নবুওয়াতের যুগে, খিলাফাতের যুগে কিংবা তার পরের যুগেও এইটা নিয়ে বেশি কথা হয়নি। হ্যাঁ, সমস্যা তৈরি হয় তাদের যৌনতা নিয়ে।
আমাদের নবীর সময় এদের কয়েকজন ছিলো। তাদেরকে কুরআনে বর্ণিত ‘আত্তাবেঈনা গায়র উলিল ইরবাতি মিনার রিজাল’ বা ‘যে পুরুষের কাম লালসা নেই’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এদের এক জনের নাম ছিলো আনজাশাহ আরেক জনের নাম ছিলো হায়তা। তারা খুব সম্মানের জীবন যাপন করতেন। নামাজ কালাম থেকে শুরু করে অন্যান্য কাজে তাদের কোন বাঁধাই ছিলোনা।
আমাদের নবী (সা) হুনায়নের পর তায়িফ আক্রমন করতে চাইলে হায়তা এক মহিলার কথা বলেন। তিনি বলেন, খুব ভালো হবে। ওখানে গায়লানের এক মহিলা আছে, ও যখন হাঁটে, সামনের দিকের ৪টা ও পেছনের ৮টা দেখতে যা লাগে না!! এখন এই ৪ টা ও ৮ বলতে ঐ মহিলার শরীরের মেদ বহুলতাকে বুঝিয়েছেন তিনি। এর অর্থ তিনি মেয়েদের দৈহিক ব্যাপারাদিতে খবর রাখেন, লালসা রাখেন কিংবা নারীদেহের খাঁজ গুলোতে তার আকর্ষণ পুরুষের মতই ছিলো বুঝা যায়। তখন তার ব্যাপারে সাবধান করা হয়। অর্থাৎ মেয়েরা যেন তার থেকে সাবধান থাকে। এইছাড়া তাদের নিয়ে আর কোন সমস্যা দেখা দেয়নি ইসলামে।
সায়্যিদুনা আলী (রা) শাসনামলে একটা প্রশ্ন আসে। যদি কোন মানব সন্তানের দেহে ছেলে মেয়ে উভয়ের ই লিংগ বর্তমান থাকে তাকে উত্তরাধিকার হিসেবে চিহ্নিত করতে গেলে কি ভাবে করতে হবে। তিনি আমাদের নবীর (সা) এর একটা ডিরেকশানের ব্যাখ্যা করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন এক্ষেত্রে পেশাব করার সময় বুঝা যাবে ছেলে না মেয়ে। সে সময় বিজ্ঞান আমাদের মত এগিয়ে যায়নি তাই তিনি এইটা বলে ঐ সব সন্তানদের মানুষের কাতারে রেখে বাবা মায়ের সম্পদের ভাগ ও দিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করে গেছেন। হরমোন দিয়েই এখন এই ছেলে মেয়ে বুঝা যাবে, পেশাব করানো লাগবেনা।
আজ এই সব মুসলমান সন্তানদের জীবনটা আমরা মারত্মক জাহান্নামের মধ্যে ঠেলে দিয়েছি। এদের পূনুর্বাসনের জন্য সরকারের কাছে যেতে হবে কেন? বাবা মা তো তাদের আরামে রাখতে পারেন। সত্যি বলতে কি আমাদের বাবা মা রাই এদের এই সমস্যা টা বড় করে সমাজে দেখায়ে জীবন সর্বনাশ করে দেয়।
আমাদের সমাজে এদের ব্যাপারে ইসলামের শিক্ষাটা বুঝানো দরকার, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গুলো এগিয়ে আসলে বেশি ভালো হবে।

আরও দেখুন:  ‘বোবায় ধরা’ বা ‘ঘুমের পক্ষাঘাত’ থেকে রক্ষার উপায়

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

মন্তব্য করুন

Back to top button