সমাজ/সংস্কৃতি/সভ্যতা

যৌতুকপ্রথা ও ইসলাম

১. ভূমিকা

প্রায় ২৩ বছর আগে ১৯৯৪ সালে দৈনিক ইনকিলাবেযৌতুকলোভী স্বামীর নির্যাতনঃ পরপর ৩ স্ত্রীর বিষপানে আত্মহত্যা” শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল। সংবাদটি পড়ে বর্তমান নিবন্ধকারের অন্তরে সৃষ্ট দুর্দমনীয় ক্ষোভ এবং হতাশা থেকে লিখিত একটি নিবন্ধ নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে মাসিক মদীনায় প্রকাশিত হয়েছিল। এটি অনস্বীকার্য, মাসিক পত্রিকায় প্রকাশিত একটি নিবন্ধ সামাজিক অনাচারের সমুদ্রে একটি ফোঁটা পানির মতো আলোড়নও সৃষ্টি করতে সক্ষম হয় না।

সাম্প্রতিককালে আমাদের গৃহসহযোগী সুবিধাবঞ্চিত নারীটির বোনের বিয়ে হয়েছিল ময়মনসিংহের এক অজ পাড়াগাঁয়ে। বর এবং কনে উভয়েই মাদ্রাসার শিক্ষক। বিয়ের অব‍্যবহিত পরে, কনে পিত্রালয় থেকে শ্বশুরালয়ে যাওয়ার আগেই বিয়েটি ভেঙ্গে যায়। বিয়েতে মোহরানা নির্ধারিত ছিল আধা ভরি স্বর্ণালঙ্কার এবং তিন হাজার টাকা। পক্ষান্তরে যৌতুক হিসাবে কনের পিতার দেয়ার কথা ছিল দেড় ভরি স্বর্ণালঙ্কার এবং নগদ কুড়ি হাজার টাকা। বিয়ের আগে বর তার হবু স্ত্রীর একজন আত্মীয়কে বলেছিলেন, দেড় ভরি সোনায় চলবে না; তিন ভরি সোনা দিতে হবে। বিয়ে হয়ে গেলো, সোনা দেড় ভরি এবং নগদ কুড়ি হাজার টাকা হস্তান্তরিত হলো। অতঃপর তিন ভরি সোনার দাবী পেশ করা হলো। বিয়ের প্রথম রাতেই বিড়াল মারা দরকার; শর্তারোপ করা হলো, এখন থেকেই স্ত্রীর প্রতিমাসের বেতনের টাকাও স্বামীর হাতে তুলে দিতে হবে। স্ত্রী তার স্বামীকে আল্লাহর দোহাই, ইসলাম ধর্মের দোহাই, তাঁর শিক্ষকতার দোহাই দিয়ে নানাভাবে বুঝাতে চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তিন ভরি সোনা যৌতুক স্বামীপ্রবরের চাই; স্ত্রীর বেতনের টাকাও তাঁর হাতে চাই। কোন অন‍্যথা চলবে না। অতঃপর বিয়েটি ভেঙ্গে গেল।

একদিকে আমরা দেখলাম একজনের যৌতুক-লোভের কাছে তিনজন নারী আত্মাহুতি দিয়েছেন। অন‍্যদিকে মানুষকে কুরআন-সুন্নাহ শিক্ষা দিয়ে থাকেন এমন একজন মাদ্রাসা-শিক্ষকের লোভের কাছে আর একজন মাদ্রাসা-শিক্ষিকার দাম্পত‍্য জীবনের শুরুতেই সকল স্বপ্ন, সকল আশা ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। দু’টি ঘটনার মধ‍্যে তেইশ বছরের ব‍্যবধান। এ সময়ে অনেককিছু বদলে গেছে; সভ‍্যতা এগিয়ে গেছে অনেক দূর; প্রযুক্তি এবং দেশ প্রায় সমান্তরালে এগিয়েছে। পাশাপাশি দ্রুততম গতিতে বৃদ্ধি পেয়েছে মানুষের রিপুর তাড়না এবং মারাত্মক অবনতি ঘটেছে মানুষের মূল‍্যবোধের।

ইসলামকে যথার্থই মানুষের ফিতরাত তথা স্বভাবধর্ম বলা হয়। সূরা আর-রূমের ৩০ আয়াতে আল্লাহতা’য়ালা বলছেন, তুমি নিজেকে একনিষ্ঠভাবে (আল্লাহর) দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত রাখ। এটাই আল্লাহর প্রকৃতি (ফিতরাত)। তুমি আল্লাহর প্রকৃতি অনুসরণ করো, যে প্রকৃতি অনুযায়ী তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহর প্রকৃতির কোন পরিবর্তন নেই।…..  সহীহ বুখারী এবং সহীহ মুসলিমের একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহকে (সাঃ) উদ্ধৃত করে আবু হুরায়রা (রাঃ) জানাচ্ছেন, “প্রতিটি নবজাতক ফিতরাতে (স্বাভাবিক মানবপ্রকৃতি) জন্মগ্রহণ করে। অতঃপর তার পিতামাতা তাকে ইয়াহুদী বানায়, খৃষ্টান বানায় বা অগ্নিপূজক বানায়…….।” কুরআন ও সুন্নাহ অনুযায়ী প্রতিটি শিশু ফিতরাতের মধ্যে অর্থাৎ ইসলাম ধর্মাবলম্বী হয়েই জন্মগ্রহণ করে। পরিবার, পরিবেশ, শিক্ষা ইত‍্যাদি তাকে ভুল পথে পরিচালিত করার মাধ‍্যমে ফিতরাত থেকে বিচ্যুত করে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীতে পরিণত করে। ইসলাম যদি সত্যিই মানুষের ফিতরাত বা স্বভাবধর্ম হয়ে থাকে তবে তো মুসলিম হওয়ার কারণে কোন পুরুষ বা নারীর অস্বাচ্ছন্দ্য বোধ করার কথা নয়, তার তো আত্মহননের কথা ঘুণাক্ষরেও মনে আসার কথা নয়। অথচ বছরের এমন একটি দিনও পাওয়া যাবে না যেদিন যৌতুক অথবা অন্য যে কোন কারণে এক বা একাধিক নারীনির্যাতন, নারীহত্যা অথবা নারীর আত্মহত্যার সংবাদ কোন না কোন সংবাদপত্রে ছাপানো হচ্ছে না। নারী কি নির্যাতিত হওয়া বা মৃত্যুবরণ করা বা আত্মহত্যা করাকেই তার ফিতরাত বলে মেনে নেবে?

এদেশে উচ্চবিত্ত-মধ‍্যবিত্ত পরিবারসমূহে উপহার আকারে বিয়ের সময় কন‍্যাকে স্বর্ণালঙ্কারসহ বিভিন্ন সামগ্রী দেয়া হয়। কিন্তু নিম্নমধ‍্যবিত্ত থেকে শুরু করে বিত্তহীন পরিবারসমূহে পাত্রপক্ষের দাবীর মুখে কন‍্যাকে সামর্থ‍্যের অতিরিক্ত যৌতুক দিতে হয়। আর এ যৌতুক দিতে না পারলেই নারী অপমানজনকভাবে তালাকাপ্রাপ্ত হচ্ছে অথবা নির্যাতিত হচ্ছে। কখনো এ নির্যাতনের কারণে অসহায় নারীর মৃত্যু ঘটছে, আবার কখনো নির্যাতন সইতে না পেরে নারী নিজেই আত্মহননের মাধ্যমে নিজের চিরমুক্তির পথ বেছে নিচ্ছে। ফিতরাতের ধর্ম ইসলামে নিশ্চয় এ অন‍্যায় তালাক, নির্যাতন, হত‍্যা বা আত্মহত‍্যার ব‍্যাপারে যথাযথ দিকনির্দেশনা আছে।

 

২. মোহরানা – পাত্র কর্তৃক প্রদেয়

পবিত্র কুরআনে বিয়ের সময় স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে মোহরানা প্রদান বা নির্ধারণের জন্য বারে বারে তাগাদা দেয়া হয়েছে। স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে প্রদেয় মোহরানা সম্পর্কিত কয়েকটি আয়াত নীচে তুলে ধরা হলোঃ

  • এবং তোমরা নারীদেরকে তাদের মোহরানা স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে (সন্তুষ্টি সহকারে) প্রদান করবে। অবশ্য তারা যদি সানন্দে মোহরের কিয়দংশ তোমাদের জন্য ছেড়ে দেয়, তবে তোমরা তা স্বচ্ছন্দে ভোগ করতে পার। আন-নিসাঃ৪।
  • হে বিশ্বাসীগণ! নারীদেরকে জবরদস্তি তোমাদের উত্তরাধিকার গণ‍্য করা হালাল নয় (মূল আরবীতে ‘হালাল’ শব্দটি ব‍্যবহৃত হয়েছে)। তোমরা তাদেরকে যা দিয়েছ, তা থেকে কিছু আত্মসাৎ করার উদ্দেশ্যে তাদেরকে উৎপীড়ন করো না। যদি না তারা প্রকাশ্য অশ্লীলতায় লিপ্ত হয়, তাদের সাথে সৎভাবে জীবন যাপন করবে। তোমরা যদি তাদের ঘৃণা কর তবে এমন হতে পারে যে আল্লাহ যাতে প্রভূত কল্যাণ রেখেছেন, তোমরা তাকেই ঘৃণা করছ। আন-নিসাঃ১৯।
  • তোমরা যদি এক স্ত্রীর স্থলে অন্য স্ত্রী গ্রহণ করা স্থির কর এবং তাদের একজনকে প্রচুর পরিমাণ (মোহরানার কোন সীমা এখানে নির্ধারিত হয়নি) অর্থ-সম্পদ দিয়ে থাক, তবুও তা থেকে কিছুই গ্রহণ করো না। তোমরা কি মিথ্যা অপবাদ এবং প্রকাশ্য পাপাচরণ দ্বারা তা গ্রহণ করবে? আন-নিসাঃ২০।
  • কিরূপে তোমরা তা গ্রহণ করবে, যখন তোমরা একে অপরের সাথে সংগত হয়েছ এবং তারা তোমাদের কাছ থেকে দৃঢ় প্রতিশ্রুতি নিয়েছে। আন-নিসাঃ২১
  • এই তালাক দুইবার। অতঃপর স্ত্রীকে হয় বিধিসম্মতভাবে (মারূফ) রেখে দেবে অথবা সদয়ভাবে (ইহসানের সাথে) মুক্ত করে দেবে। তোমরা তোমাদের স্ত্রীকে যা প্রদান করেছ তন্মধ্য থেকে কোন কিছু গ্রহণ করা তোমাদের পক্ষে বৈধ (হালাল) নয়। তবে যদি তারা স্বামী-স্ত্রী উভয়ের এ আশংকা হয় যে তারা আল্লাহর সীমারেখা রক্ষা করে চলতে পারবে না এবং তোমরা (সামাজিক বা রাষ্ট্রিক কর্তৃপক্ষ) যদি আশংকা কর যে তারা আল্লাহর সীমারেখা রক্ষা করে চলতে পারবে না, তবে স্ত্রী কোন কিছুর বিনিময়ে নিষ্কৃতি পেতে চাইলে তাতে তাদের কোন অপরাধ নাই। এই সব আল্লাহর সীমারেখা। তোমরা এগুলি লংঘন করো না। যারা এসব সীমারেখা লংঘন করে তারা যালিম। আল-বাকারাঃ২২৯
  • তোমাদের স্ত্রীকে স্পর্শ করার পূর্বে অথবা তাদের জন্য মোহর ধার্য করার পূর্বে তাদের তালাক দিলে তোমাদের কোন পাপ নেই। তবে তোমরা তাদের সংস্থানের ব্যবস্থা করো। বিত্তবান তার সাধ্য অনুযায়ী এবং বিত্তহীন তার সামর্থ্যানুযায়ী বিধিমত সংস্থানের ব্যবস্থা করবে। এটাই ইহসানকারী লোকদের কর্তব্য। আল-বাকারাঃ২৩৬
  • তোমরা যদি তাদের স্পর্শ করার পূর্বে তালাক দাও অথচ মোহর ধার্য করে থাক, তবে যা তোমরা ধার্য করেছ তার অর্ধেক, যদি না স্ত্রী অথবা যার হাতে বিবাহ বন্ধন রয়েছে সে মাফ করে না দেয় এবং মাফ করে দেয়াটাই আত্মসংযমের (তাকওয়ার) নিকটতর। আল-বাকারাঃ২৩৭ (অংশ)।
আরও দেখুন:  তবুও ভ্যালেন্টাইন?

কুরআন মাজীদের যে কয়টি আয়াত এখানে উদ্ধৃত হয়েছে, সেগুলিতে কোন দুর্বোধ্যতা বা অস্পষ্টতা নেই। এগুলি অনুধাবনের জন্য গভীর জ্ঞান বা পাণ্ডিত‍্য অনাবশ্যক। উপরোল্লিখিত সাতটি আয়াত মুসলিমের বিবাহ এবং মোহরানা সম্পর্কিত বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি প্রকাশ করছে।

  1. মুসলিমের বিবাহে স্বামী কর্তৃক প্রদেয় মোহরানা নির্ধারণ ফরজ। মোহরানার কিছু অংশ স্ত্রী স্বেচ্ছায় (স্বামীর চাপ বা অনুরোধে নয়) ছেড়ে দিলে, তা স্বামীর জন‍্য হালাল (আন-নিসাঃ ৪)।
  2. মোহরানা বিয়ের সময় নির্ধারিত না হলেও পরবর্তীতে সেটি অবশ্যই নির্ধারণ করতে হবে (আল-বাকারাঃ ২৩৬)।
  3. ধনী বা দরিদ্র যাই হোক, নারীর সামাজিক অবস্থানের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ মোহরানা প্রদানপূর্বক বা প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাকে স্ত্রীত্বে বরণ করে নিতে হবে (আন-নিসাঃ ২৫)।
  4. মোহরানার পরিমাণের কোন উর্ধ্ব বা নিম্নসীমা আল্লাহতা’য়ালা চিহ্নিত করে দেননি (আন-নিসাঃ ২০)।
  5. স্ত্রীকে প্রদত্ত বা প্রদেয় মোহরানা স্বামীর জন্য কোনভাবে হালাল নয় (আন-নিসাঃ১৯, ২০)।
  6. স্ত্রী বা তার পিতৃ-পরিবারের কাছ থেকে কোন যৌতুক দাবী করাও স্বামীর জন্য হালাল নয় (আন-নিসাঃ ১৯)।
  7. মোহরানা বা স্ত্রীর অন‍্য কোন সম্পদ আত্মসাৎ করার জন্য স্ত্রীকে কোনভাবে নির্যাতন করা যাবে না (আন-নিসাঃ ১৯)।
  8. স্ত্রীকে তালাক দিলে বা এক স্ত্রীর স্থলে অন্য স্ত্রী গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নিলে স্ত্রীর ধন-সম্পদের কোন কিছুই কেড়ে নেয়া যাবে না বা ফেরৎ নেয়ার জন্য স্ত্রীকে নির্যাতন করা যাবে না (আন-নিসাঃ২০, ২১)।
  9. মোহরানা নির্ধারণের পর স্ত্রীকে স্পর্শ করার পূর্বেই স্বামী যদি স্ত্রীকে তালাক দেয়, তাহলেও স্ত্রীকে নির্ধারিত মোহরানার অর্ধেক পরিশোধ করতে হবে (আল-বাকারাঃ ২৩৬)।
  10. স্ত্রীকে স্পর্শ করার পূর্বে এবং মোহরানা নির্ধারণের পূর্বেই স্বামী যদি স্ত্রীকে তালাক দেয় সেক্ষেত্রেও, তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রীর সংস্থানের ব্যবস্থা করার জন্য স্বামী আল্লাহতা’য়ালা কর্তৃক নির্দেশিত (আল-বাকারাঃ ২৩৭)।

মুসলিমের বিবাহে স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে মোহরানা প্রদান সম্পর্কিত আল্লাহ সুবহানাহু তা’য়ালার নির্দেশসমূহ আমরা জানতে পারলাম। স্ত্রী বা তার পিতৃ-পরিবারের পক্ষ থেকে স্বামীকে যৌতুক বা কোন অর্থ প্রদানের কোন নির্দেশ বা এমনকি সামান্য কোন ইঙ্গিতও সারা কুরআনের কোথাও পাওয়া যাবে না। আন-নিসার ১৯ আয়াতে স্পষ্ঠভাবে আল্লাহতা’য়ালা নির্দেশ দিচ্ছেনঃ …..তোমরা তাদেরকে যা দিয়েছ, তা থেকে কিছু আত্মসাৎ করার উদ্দেশ্যে তাদেরকে উৎপীড়ন করো না…। কুরআনের নির্দেশানুযায়ী এটা প্রতিষ্ঠিত, সসম্মানে যথাযথ মোহরানা আদায় করে পুরুষ নারীকে স্ত্রীত্বে বরণ করে নেবে। বিয়ের সময় মোহরানা নির্ধারিত না হলেও পরবর্তীতে সেটি নির্ধারণ ফরজ। প্রদত্ত মোহরানার কোন অংশ আত্মসাৎ করা বা কৌশলে হস্তগত করার চেষ্টাও স্বামীর জন‍্য হারাম। একইভাবে, স্ত্রী বা তার পিতৃ-পরিবারের কাছ থেকে যৌতুক দাবীও স্বামীর জন‍্য অবৈধ।

৩. স্ত্রীর ভরণপোষণের (তত্বাবধান) জন্য স্বামী দায়িত্বশীল

ইসলাম শুধু যে উপযুক্ত মোহরানা দিয়ে নারীকে সসম্মানে বধূ হিসাবে বরণ করে নিতে বলেছে তা নয়; আল্লাহর বিধান স্ত্রী এবং পরিবারের যাবতীয় ব্যয়ভার বহনের দায়িত্বও এককভাবে পুরুষ অর্থাৎ স্বামীর উপর ন্যস্ত করেছে। স্ত্রী বা স্ত্রীর পিতৃ-পরিবার যতই ধন-সম্পদশালী হোক না কেন, তাতে স্বামী বা স্বামীর পরিবারের কোন অধিকার নেই। নারী উত্তরাধিকারসূত্রে তার পিতৃ-পরিবার থেকে যে ধন-সম্পদ লাভ করে অথবা ব‍্যক্তিগতভাবে যে অর্থ উপার্জন করে, তা এককভাবে নারীরই সম্পদ। তাতেও স্বামী বা স্বামীর পরিবারের কোন অধিকার নেই। স্ত্রী তথা পরিবারের যাবতীয় ভরণপোষণের দায়-দায়িত্ব সম্পর্কে আল্লাহর দ্ব্যর্থহীন বাণীঃ

(১) পুরুষ নারীর ভরণপোষণকারী (তত্বাবধানকারী), কারণ আল্লাহ তাদের এককে অপরের উপর বৈশিষ্ট্য দান করেছেন এবং কারণ পুরুষ তার ধনসম্পদ ব্যয় করে; আন-নিসাঃ ৩৪(অংশ)।

(২) তোমাদের মধ্যে যারা জুড়িহীন, আর তোমাদের অধীনস্থদের মধ্যে যারা সচ্চরিত্রবান, তাদের বিয়ে দাও। তারা যদি গরীব হয়, তাহলে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদের ধনী করে দেবেন। আল্লাহ বড়ই প্রশস্ততা বিধানকারী এবং মহাবিজ্ঞ। আর যারা বিয়ের সুযোগ পাবে না, তাদের উচিত নৈতিক পবিত্রতা অবলম্বন করা, যতক্ষণ না স্বীয় অনুগ্রহে আল্লাহ তাদের অভাবমুক্ত করে দেন। আন-নূরঃ৩২-৩৩ (অংশ)।

পবিত্র কুরআনের উল্লিখিত দু’টি আয়াত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, পুরুষকে কর্তৃত্ব দেয়ার দুটি কারণের মধ্যে একটি এই যে, স্ত্রী এবং পরিবারের সকল সদস‍্যের যাবতীয় ব‍্যয়ভার নির্বাহের দায়িত্ব এককভাবে পুরুষের। অর্থাৎ পরিবারের জন্য ব্যয় করতে নারী কোনভাবেই বাধ‍্য নয় (একাধিক সহিহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত যে, স্বামীর দারিদ্রের কারণে নারী যদি পরিবারের ভরণপোষণের দায়িত্ব নেয়, তাহলে সেটি আল্লাহর কাছে সাদাকা হিসাবে পরিগণিত হবে)। অনুরূপভাবে সূরা আন-নূরের ৩২, ৩৩ আয়াতে আমরা দেখতে পাই, নারী তথা পরিবারের ভরণ-পোষণের সার্বিক দায়িত্ব গ্রহণের ক্ষমতা অর্জন করতে না পারা পর্যন্ত আল্লাহতা’য়ালা পুরুষকে চারিত্রিক সংযম বজায় রেখে বিয়ে না করে তাকওয়া সহকারে অবস্থার পরিবর্তনের আশায় ধৈর্য ধারণের নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু কারো যদি ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে যাওয়ার আশংকা দেখা দেয়, অথচ তার সমঅবস্থানের নারীকে বিবাহোত্তর ভরণপোষণের সামর্থ‍্য নেই, তাহলে সে তার চাইতে নিম্নঅবস্থানের কোন নারীকে বিয়ে করবে। এতে তার মোহরানার পরিমাণ এবং ভরণপোষণের ব‍্যয় তুলনামূলকভাবে কম আবশ‍্যক হতে পারে। আয়াত কয়টি সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করে, নারীর অবস্থানগত মর্যাদা যাই হোক না কেন বিয়ের সময় তাকে মোহরানা প্রদান বা ধার্য করতে হবে এবং স্বামীকেই স্ত্রীর যাবতীয় ব‍্যয়ভার বহন করতে হবে।

৪. হাদীস ও ইতিহাসের দলিল

যখন কুরআন মজীদের হুকুম দ্বারা কোন সিদ্ধান্ত প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়, তখন তার সমর্থনে অন্য কোন দলিল অনুসন্ধান অনাবশ‍্যক। তবুও নিতান্ত কৌতূহলের বশবর্তী হয়ে উল্লেখযোগ‍্য কয়েকটি হাদীসগ্রন্থ অনুসন্ধান করে এমন একটি হাদীসও পাওয়া যায়নি, যদ্বারা স্বামী কর্তৃক স্ত্রী বা তার পিতৃ-পরিবার থেকে যৌতুক বা মোহরানা দাবীর কোন প্রমাণ প্রতিষ্ঠা করা যায়। স্বামী কর্তৃক স্ত্রী বা তার পিতৃ-পরিবার থেকে যৌতুক বা মোহরানা দাবীর বিষয়টি ইসলাম এবং ইসলামের ইতিহাসে সম্পূর্ণ অজ্ঞাত। এ ধরনের ঘটনা ইসলামের ইতিহাসে (পাক-ভারত উপমহাদেশকে বাদ দিয়ে) কখনো ঘটেনি। বরং এর বিপরীতে আলহাজ্জ মাওলানা ফজলুল করীম, এম এ বি এল সংকলিত ‘মিশকাতুল মাসাবিহ’ নামক হাদীসগ্রন্থের নিয়াত অধ্যায়ে ইবনু মাজাহ-সূত্রের সুন্দর একটি হাদীস পাওয়া যায়। এখানে হাদীসটির বাংলা অনুবাদ পেশ করা হলো। আবু হুরাইরা(রাঃ) বর্ণিতঃ রাসূলুল্লাহ(সাঃ) বলেছেন, যদি কোন ব্যক্তি ফেরৎ না দেয়ার নিয়াতে অর্থপ্রাপ্তির লোভে কোন নারীকে বিয়ে করে, তবে ঐ ব্যক্তি একজন যিনাকারী। যে ব্যক্তি ফেরৎ না দেয়ার নিয়াতে কোন ঋণ গ্রহণ করে, তবে ঐ ব্যক্তি একজন চোর। সহীহ বুখারীতেও অনুরূপ একটি হাদীস রয়েছেঃ আবু হুরাইরা (রাঃ) বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, যে ব‍্যক্তি ফেরত দেয়ার নিয়াতে টাকা বা অন‍্য কোনকিছু ধার নেয়, আল্লাহ ঐ ব‍্যক্তির ঋণ আদায়ের ব‍্যবস্থা করে দেন। আর যে ব‍্যক্তি ফেরত না দিয়ে নষ্ট করার নিয়াতে টাকা বা অন‍্য কোনকিছু ধার নেয়, আল্লাহ ঐ ব‍্যক্তিকে ধ্বংস করে দেন।

ফেরত না দেয়ার এবং নষ্ট করার নিয়াতে যে টাকা ধার নিচ্ছে, সে কার্যত প্রতারণার মাধ‍্যমে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। পক্ষান্তরে আমাদের এতদঞ্চলে স্ত্রীর পিতার নিকট থেকে বিয়ের শর্ত হিসাবে যে যৌতুক বা টাকা নেয়া হয়, তা প্রকৃতার্থে যুলুম করে নেয়া হয় এবং স্ত্রীর পিতা সাধ‍্যাতিরিক্ত এ যৌতুক ও/অথবা অর্থ অনেক ক্ষেত্রে নিজেকে সর্বস্বান্ত করে ইচ্ছার বিরুদ্ধে দিয়ে থাকেন। এটি প্রতারণা নয়, বরং এটিকে ডাকাতি অথবা ছিনতাইক্রিয়া বলা সঙ্গত।

আরও দেখুন:  বড় দিন

হাদীস দু’টি নিঃসন্দেহে ইতিপূর্বে উল্লিখিত সূরা আন-নিসার ১৯ আয়াতের বক্তব্যকেই সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করছে। আয়াতটিতে আল্লাহতা’য়ালা বলেছেন জোর করে নিজেকে স্ত্রীর উত্তরাধিকারী মনে করা যাবে না এবং স্ত্রীকে প্রদত্ত মোহরানার কিয়দংশ হস্তগত করার জন্য কোনভাবেই স্ত্রীকে নির্যাতন করা যাবে না। আর এ হাদীসটিতে স্ত্রী বা তার পিতৃ-পরিবার থেকে ফেরৎ না দেয়ার নিয়াতে কোন অর্থপ্রাপ্তির লোভে বিবাহকারীকে যিনাকারী বলা হয়েছে। অর্থাৎ কুরআন এবং হাদীসের দলিল দ্বারা এটা দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রতিষ্ঠিত হলো যে, ফেরৎ না দেয়ার নিয়াতে স্ত্রী বা তার পিতৃ-পরিবার থেকে দাবী করে কোন অর্থ গ্রহণ স্বামীর জন্য বৈধ নয়, বরং তা হারাম হতে পারে।

ওয়ালিমা অর্থাৎ বউ-ভাত নামে পরিচিত অনুষ্ঠানটির কথা হাদীস গ্রন্থসমূহে খুব গুরুত্বসহকারে লিপিবদ্ধ হয়েছে। কারণ ওয়ালিমাই মুসলিমের বিয়ের একমাত্র অনুষ্ঠান। সহিহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত যে, স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তাঁর নিজের প্রতিটি বিবাহ অনুষ্ঠানে আর্থিক ও পারিপার্শ্বিক অবস্থার সাথে সঙ্গতি রেখে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রকমের খাদ‍্য দিয়ে ওয়ালিমা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছেন। ওয়ালিমা অনুষ্ঠানের আয়োজনের জন‍্য সবাইকে বিশেষ তাগাদাও দিয়েছেন। সহীহ আল-বুখারীতে উদ্ধৃত আনাস (রাঃ) বর্ণিত হাদীসসূত্রে জানা যায়, আবদুর রাহমান ইবনে আউফের (রাঃ) জামায় আতরের হলুদ দাগ দেখে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) জানতে চাইলেন, আপনার খবর কী? জবাবে আবদুর রাহমান বললেন, একটি খেজুরবিচির সমান ওজনের স্বর্ণের মোহরানা দিয়ে আমি একজন নারীকে বিয়ে করেছি। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন, আল্লাহ আপনার উপর তাঁর রাহমাত বর্ষণ করুন। একটি বকরী দিয়ে হলেও আপনি ওয়ালিমার আয়োজন করুন।

ওয়ালিমা আয়োজন রাসূলুল্লাহর (সাঃ) সুন্নাত, এ বিষয়ে ইসলামের মহান আলেমদের মধ‍্যে মতবিরোধ প্রায় নেই বললেই চলে। যেটুকু মতবিরোধ আছে তা কার্যত অনুষ্ঠানটি কখন আয়োজন করা হবে তা নিয়ে। ওয়ালিমার সকল ব্যয়ভার বহনের দায়িত্ব এককভাবে স্বামীর। এর বিপরীতে পাক-ভারত অঞ্চলে স্থানীয় ধর্মসমূহের প্রভাবে সাধারণতঃ মুসলিম কন্যার পিতাই বিয়ের মূল ভোজের অনুষ্ঠানটির আয়োজন এবং ব্যয়ভার বহন করে থাকেন। হাদীস গ্রন্থসমূহ এবং ইসলামের ইতিহাসে এ ধরণের অনুষ্ঠানের কোন দলিল দেখা যায় না। ইসলামের বিয়েতে কন্যার পিতা কর্তৃক বুকভরা স্নেহভালবাসায় তিলে তিলে বড় করে তোলা পরম আদরের কন্যাটিকে স্বামীর হাতে সমর্পণ করে দেয়া ছাড়া বিয়ে উপলক্ষ‍ে অন্য কোন প্রকার ব্যয়ভার বহনের কোন দলিল দেখা যায় না।

৫. তুলনামূলক বিশ্লেষণ

এবার কুরআন এবং সুন্নাহ থেকে প্রাপ্ত নির্দেশনাসমূহের সাথে আমাদের দেশের প্রচলিত রীতি-রেওয়াজের সংক্ষেপে তুলনামূলক বিশ্লেষণ করে দেখা যাক।

(১) যথোপযুক্ত মোহরানা প্রদান অথবা মোহরানা নির্ধারণ এবং প্রদানের নিশ্চয়তা প্রদানপূর্বক নারীকে বধূরূপে বরণ করে নেয়ার নির্দেশ কুরআন মজীদে স্বয়ং আল্লাহতা’য়ালা দিয়েছেন এবং মোহরানা আদায় ফরজ বলে জানিয়েছেন।

(২) স্ত্রীকে প্রদত্ত মোহরানার কোন অংশ কৌশলে আত্মসাৎ করা যাবে না বা নির্যাতনের মাধ‍্যমে কেড়ে নেয়া যাবে না।

(৩) কুরআন ও সুন্নাহর বিধান অনুযায়ী কন‍্যা বা কন‍্যার পিতার নিকট থেকে যৌতুক বা নগদ অর্থ দাবী করে গ্রহণ করা যাবে না। হাদীসে এ ধরণের স্বামীকে যিনাকারী বলা হয়েছে।

(৪) স্ত্রীর মোহরানা আদায় ফরজ এবং অনাদায়ী থাকলে এটি স্বামীর ঋণ হিসাবে বিবেচ‍্য হবে। মৃত স্বামীর রেখে যাওয়া সম্পদ থেকে অনাদায়ী এ ঋণ পরিশোধ পরিবারের অপরাপর সদস্যের অবশ্য কর্তব্য।

(৫) হাদীসসূত্রে আমরা জেনেছি, মুসলিমের বিয়ের মূল ভোজ অনুষ্ঠানটির নাম ওয়ালিমা এবং এর যাবতীয় ব্যয়ভার বহনের দায়িত্ব স্বামী বা তার পিতার। ওয়ালিমা রাসূল (সাঃ) কর্তৃক বিশেষ তাগাদা দেয়া গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাত।

(৬) একজন মুসলিম পুরুষ স্ত্রীর মোহরানা আদায়ের সামর্থ্য অর্জন করলে অথবা ভবিষ্যতে আদায় করতে পারার সম্ভাবনার ব্যাপারে সুনিশ্চিত হলে এবং ওয়ালিমার যাবতীয় ব‍্যয়ভারসহ দাম্পত‍্যজীবনে স্ত্রীর সার্বিক ভরণপোষণের পূর্ণ সামর্থ্য অর্জন করলেই কেবল বিয়েতে আগ্রহী হতে পারে (আন-নিসাঃ ৩৪ ও আন-নূরঃ ৩২)।

কুরআন ও সুন্নাহ থেকে প্রাপ্ত উল্লিখিত সিদ্ধান্তগুলোর বিপরীতে একটি বিবাহকে কেন্দ্র করে এতদঞ্চলে প্রচলিত রেওয়াজসমূহ তুলনা করলে কুরআন এবং সুন্নাহর নির্দেশের সাথে সাংঘর্ষিক একটি চিত্র পাওয়া যাবে।

১. আমাদের দেশে মুসলিমের সকল বিবাহ অনুষ্ঠানে একজন কাযী দম্পতির পরিচয়, মোহরানার পরিমাণ ও শর্তাবলী নথিবদ্ধ করেন। একজন আলেম পাত্র-পাত্রীর পরিচয় এবং ঘোষিত ও অনাদায়ী মোহরানার পরিমাণ ঘোষণা করে দোয়া পরিচালনা করেন। অনেক ক্ষেত্রে মোহরানার বৃহত্তর অংশ অনাদায়ী থেকে যায় এবং এটি পরিশোধ না করা যে আল্লাহর নির্দেশের লংঘন এ ব‍্যাপারে সাধারণের মধ‍্যে কোন সচেতনতা লক্ষ‍্য করা যায় না। বরং বধূবেশে গৃহে প্রবেশকারী নারী তার সাথে কত স্বর্ণালংকার নিয়ে আসলো, কী কী আসবাবপত্র নিয়ে আসলো, নগদ কত আনলো, প্রতিশ্রুত অর্থের আর কত বাকী আছে, এসবেরই হিসাব-নিকাশ হতে থাকে। নিঃসন্দেহে স্ত্রীর মোহরানা আদায় না করা কুরআনের নির্দেশের সুস্পষ্ট লংঘন।

২. প্রায় সকল বিবাহ অনুষ্ঠানে স্ত্রীকে প্রদত্ত অলংকারবাবদ মোহরানার একটি অংশ আদায় করা হয়েছে বলে ঘোষণা করা হয়ে থাকে। কিন্তু এ ক্ষেত্রেও প্রকৃত ব‍্যয়িত অঙ্কের চাইতে ঘোষিত অঙ্ক অনেক বেশী হয়ে থাকে। অর্থাৎ বিবাহ সম্পন্ন হওয়ার পূর্বেই নারীর মোহরানার কিয়দংশ সুকৌশলে হস্তগত করা হয়। আবার অনেকে নববধূর সাথে প্রথম সাক্ষাতে চাপ প্রয়োগের মাধ‍্যমে মোহরানা মাফ করিয়ে নিয়ে ধারণা করেন, অতঃপর মোহরানা আর পরিশোধ করতে হবে না। এসব কাজ সূরা আন-নিসার ১৯ আয়াতের নির্দেশের সম্পূর্ণ পরিপন্থি।

৩. এতদঞ্চলের অধিকাংশ বিয়েতে কনের পিতৃ-পরিবারের কাছ থেকে নগদ অর্থ বা বিভিন্ন প্রকারের মালামাল যৌতুক হিসাবে দাবী করে আদায় করা হয়। দম্পতির বিবাহ নথিবদ্ধকারী কাযী কিংবা দোয়া পরিচালনাকারী আলেম কনের পিতার নিকট থেকে যৌতুক হিসাবে প্রতিশ্রুত ও নগদ আদায়কৃত অর্থের পরিমাণ এবং অন‍্যান‍্য যৌতুক কত আদায় করা হলো তা নথিবদ্ধ করেন না কিংবা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ‍অতিথিবৃন্দকে তা জানিয়ে দেন না। অথচ যৌতুক গ্রহণের এ কর্মটি সূরা আন-নিসার ১৯ আয়াতের সুস্পষ্ট লংঘন এবং অবৈধ।

আরও দেখুন:  মূল্যবোধের অবক্ষয়

৪. এতদঞ্চলের অধিকাংশ বিবাহ অনুষ্ঠানে স্বামীর পরিবারিক-সামাজিক মর্যাদা ও প্রতিপত্তি বৃদ্ধির লক্ষ্যে বড় অঙ্কের মোহরানার ঘোষণা করা হয়ে থাকে। স্বামীর মৃত‍্যুর পর অনাদায়ী ঋণ হিসাবে স্ত্রীর মোহরানা পরিশোধ দূরে থাক, জীবদ্দশাতেই স্বামী নিশ্চিত ধরে নেন মোহরানার ঘোষিত অর্থ কোনদিন পরিশোধ করতে হবে না। সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধির লক্ষ্যে উচ্চ মোহরানা নির্ধারণ করা ও ঘোষিত মোহরানা স্ত্রীকে পরিশোধ না করা কুরআনের নির্দেশের লংঘন এবং একটি গুরুতর পাপ কাজ।

৫. পারিপার্শ্বিক ধর্মসমূহের প্রভাবে গড়ে উঠা রেওয়াজ অনুযায়ী এ অঞ্চলের বিয়ের প্রধান ভোজ অনুষ্ঠানটির ব‍্যয়ভার কন‍্যার পিতা বহন করেন। শহুরে উচ্চবিত্ত-মধ‍্যবিত্তদের মধ‍্যে বর বা বরের পিতাপ্রদত্ত ওয়ালিমা বা বৌভাতের প্রচলন থাকলেও গ্রামাঞ্চলে ওয়ালিমার প্রচলন নেই বললেই চলে। কন্যাদায়গ্রস্ত পিতা নগদ অর্থ ও যৌতুক প্রদানের শর্তের সাথে বিশাল বরযাত্রীকে তৃপ্তি সহকারে ভোজদানের কঠিন শর্তটিও অনন্যোপায় হয়ে মেনে নেন। এখানে তিনটি পাপকর্ম সংঘটিত হয়, প্রথমতঃ ওয়ালিমা না করার মাধ‍্যমে রাসূল (সাঃ) এর সুন্নাত ধ্বংস করা, দ্বিতীয়তঃ কন‍্যার পিতার নিকট থেকে ভোজ আদায়ের মাধ‍্যমে একটি অনৈসলামিক (বিদ’আত) অনুষ্ঠানের প্রচলন ঘটানো এবং তৃতীয়তঃ কন‍্যার পিতার উপর আর্থিক যুলুম করা। কন‍্যার পিতাপ্রদত্ত ভোজ অনুষ্ঠানটি প্রধান বা একমাত্র অনুষ্ঠান বিধায় কাযী এবং সম্মানিত আলেম বাধ‍্য হয়ে এটিতে উপস্থিত থেকে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেন।

৬. এ অঞ্চলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে পুরুষের আর্থিক সক্ষমতা বা যোগ‍্যতার চাইতে কন‍্যার বা তার পিতার আর্থ-সামাজিক সক্ষমতা বেশী গুরুত্ব পায়। জোর করে চাপিয়ে দেয়া বিশাল ভোজ অনুষ্ঠানের ব‍্যয়ভার বহন, প্রচুর গহনাসহ বিভিন্ন যৌতুকের দাবী পূরণ এবং বেকার ছেলের চাকুরী বা ব‍্যবসার সুযোগ করে দেয়ার ক্ষমতা কন‍্যার পিতার আছে কী না, এসবই বিবেচ‍্য হয়ে দাঁড়ায়।

৬. কল‍্যাণ প্রতিষ্ঠা এবং অকল‍্যাণ বিনাশ

অনেক মুসলিম হয়তো জানেন স্ত্রীর মোহরানা আদায় স্বামীর জন‍্য ফরজ। আবার এদেশে সকল ধর্মাবলম্বীর জন‍্য প্রযোজ‍্য যৌতুকবিরোধী আইন বলবৎ রয়েছে। কিন্তু শুধু আইন তৈরী করে দিলেই আইনের বাস্তবায়ন নিশ্চিত হয় না। প্রকৃত গণসচেতনতা সৃষ্টির মাধ‍্যমেই কেবল আইনের স্বতঃস্ফূর্ত বাস্তবায়ন নিশ্চিত হয়। দু-একটি প্রবন্ধ লিখে আল্লাহর বিধান প্রতিষ্ঠার জন‍্য আবশ‍্যক গণসচেতনতা সৃষ্টি অসম্ভব। এক্ষেত্রে সবচাইতে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে পারেন মসজিদের ইমাম এবং খতীবের দায়িত্বে নিয়োজিত আমাদের বিজ্ঞ আলেম সমাজ।

আমাদের আলেমগণের ক্ষমতা বিপুল। তাঁর দৈনিক পাঁচবার স্থানীয় জনগণের নামাজে নেতৃত্ব দিচ্ছেন; প্রতিদিন বিভিন্ন উৎসুক মানুষের দ্বীনি সমস‍্যা এবং প্রশ্নের জবাব দিচ্ছেন। প্রতি শুক্রবার তাঁরা বিশাল জনসমাগমে তাঁদের পছন্দমত বিষয়ে খুৎবা দিচ্ছেন। একইভাবে বিয়ের মধ্যে যে সব হারাম কর্মকাণ্ড প্রতিনিয়ত সংঘটিত হয়ে যাচ্ছে এবং যে সব হালাল কর্ম তথা আল্লাহর নির্দেশ এবং রাসূল (সাঃ) এর সুন্নাত লঙ্ঘিত হচ্ছে, সেগুলির ব্যাপারে প্রয়োজনীয় গণসচেতনতা সৃষ্টি করে হালালকে প্রতিষ্ঠা এবং হারামকে দূরীভূত করার মহান দায়িত্বটি তাঁরা খুব সহজেই পালন করতে পারেন। এর মধ‍্য দিয়ে তাঁরা কার্যত মুসলিম জনগণের মনে তাকওয়া সৃষ্টির মহান দায়িত্ব পালন করবেন।

অন্যথায় বিয়ের নামে যিনার যে অনুষ্ঠান বৈধতা লাভ করছে তার জন্য, যৌতুকের কারণে নির্যাতিত প্রতিটি নারীর জন্য, যৌতুকের দাবী মেটাতে না পেরে অবমাননাকরভাবে তালাকপ্রাপ্ত হওয়ার জন‍্য, নির্যাতন সইতে না পেরে আত্মহত্যাকারী প্রতিটি নারীর জন্য, কন্যাকে সম্প্রদান করতে গিয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে যাওয়া পিতার প্রতিটি দীর্ঘশ্বাসের জন্য, অবৈধ বিবাহ অনুষ্ঠানের অবৈধ খাদ্য গ্রহণের জন্য হালাল-হারামের পার্থক্য নির্ণয়ে সক্ষম সমাজের প্রতিটি জ্ঞানী মানুষকে আল্লাহর নিকট জবাবদিহি করতে হবে। বাংলাদেশে এখনও অধিকাংশ পরিবারে একটি কন‍্যা-শিশু জন্মগ্রহণ করলেই পিতামাতার মুখ দুশ্চিতার মেঘে ঢেকে যায়। এ কন‍্যাশিশুকে খাইয়ে-পরিয়ে বড় করে তোলার পর জমিজমা বিক্রি করে বিপুল অঙ্কের যৌতুক দিয়ে অন‍্যের সংসারে তুলে দিতে হবে, এমন দুর্ভাবনাতেই পিতামাতার বছরের পর বছর কেটে যায়। আবার প্রায়শঃই সাধ‍্যাতিরিক্ত অর্থ ব‍্যয়ে কন‍্যাকে স্বামীর হাতে তুলে দেয়ার পরও কন‍্যা বা কন‍্যার পিতার শান্তি নিশ্চিত হয় না। বরং কন‍্যার উপর যে কোনদিন যে কোন সময় নির্যাতন-যুলুমের খড়গ নেমে আসার আশংকায় দিনাতিপাত করতে হয়।

একজন নারী যদি তার জন্য ঘোষিত মোহরানা হস্তগত করে অথবা তা সে একদিন না একদিন পাবেই এ নিশ্চয়তা নিয়ে স্বামীর গৃহে আসে এবং একজন স্বামী যদি যৌতুক নেয়া হারাম – এটি জেনে যৌতুক না নিয়েই সসম্মানে একজন নারীকে বধূ হিসাবে ঘরে তুলে নেয় এবং যদি নবী (সাঃ) এর সুন্নাহ প্রতিষ্ঠাকে অধিকতর পুণ‍্যের কাজ বিবেচনা করে বিয়ের মূল ভোজ অনুষ্ঠানটির ব্যয়ভার স্বামী নিজেই বহন করেন, তাহলে ঐ গৃহে যে নারীটি বধূ হয়ে আসবেন সে নারীটি নিঃসন্দেহে সর্বোচ্চ সামাজিক মর্যাদা নিয়েই আসবেন। তাকে তার প্রাপ্য মোহরানা থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশংকা কোনদিন করতে হবে না, তালাকের ভয়ে ভীত থাকতে হবে না, তাকে যৌতুকের জন্য কোনদিন নির্যাতনের শিকার হতে হবে না বা আত্মহত্যা করার চিন্তাও করতে হবে না। কন‍্যা-সন্তান গর্ভে ধারণের জন‍্য কোন মাকে গঞ্জনা সহ‍্য করতে হবে না। কোন পিতাকেও কন্যা-সন্তানের পিতা হওয়ার কারণে কন্যাকে জীবন্ত পুঁতে ফেলার কথা ভাবতে হবে না বা কন্যাদায়গ্রস্ত পিতা বলে সমাজের কাছে হেয় হয়ে জীবনধারণ করতে হবে না। আর তখনই একজন নারী অনুভব করবে যে মুসলিম হওয়ার কারণেই সে নির্যাতিত হচ্ছে না। তখনই সে ইসলামকে ফিতরাত বা স্বভাবধর্ম হিসাবে অনুভব করবে।

সৎকাজের আদেশ দেয়া এবং অন‍্যায় কাজ থেকে মানুষকে বিরত রাখা প্রত‍্যেক মানুষের জন‍্য ফরজ হলেও, একটি আদেশ বা পরামর্শ সর্বাধিক সংখ‍্যক মানুষের কাছে পৌঁছানোর কাজটি সবচাইতে সহজে করতে পারেন আমাদের বিজ্ঞ আলেমগণ। একজন মানুষ জীবনের সবক’টি রাত নফল ইবাদাতে কাটিয়ে দিলেও, ঐ নফল ইবাদাতের সওয়াব আল্লাহু সুবহানাহু তা’য়ালার একটি হালাল প্রতিষ্ঠা বা হারাম প্রতিরোধের সওয়াবের সমান হবে না। আল্লাহতা’য়ালার নির্ধারিত হালাল প্রতিষ্ঠা এবং হারাম প্রতিরোধের মাধ্যমেই কেবল ইসলামকে প্রকৃত ফিতরাতের ধর্ম হিসাবে তুলে ধরা যেতে পারে। ন‍্যায়, কল‍্যাণ ও হালাল প্রতিষ্ঠা এবং অন‍্যায়, অকল‍্যাণ ও হারাম নিধনের মধ‍্যেই মানবজাতির কল‍্যাণ নিহিত। আল্লাহ বলেনঃ তোমরাই সর্বোত্তম দল; মানবজাতির কল্যাণের জন্য তোমাদের উদ্ভব ঘটানো হয়েছে। তোমরা সৎকার্যের নির্দেশ দেবে এবং অন্যায় প্রতিহত করবে এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে। আলে-ইমরানঃ১১০।

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

মন্তব্য করুন

Back to top button