সচেতনতা

ছেলে-মেয়েদের বিয়ের বয়স

দ্বিতীয় প্রশ্নের ব্যাপারে যদি কোন ধরণের চিন্তা-ভাবনা ছাড়া চোখ বন্ধ করে উত্তর দিতে বলা হয়, তাহলে সাধারণত আমাদের উত্তর হবে- ৩০ বছর বয়স। অর্থাৎ ৩০ হলো ছেলেদের বিয়ের উপযুক্ত বয়স।
.
কিন্তু যদি বলা হয় যে, উত্তরটা দিতে হবে প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে। অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা মানবজাতিকে যে ফিতরত দিয়ে সৃষ্টি করেছেন, আল্লাহ তাআলা পৃথিবী নামের এ গ্রহটির প্রকৃতিতে যে মূলনীতি রেখে দিয়েছেন, উত্তরটা দিতে হবে সেই ফিতরত ও মূলনীতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে, তাহলে এর ভূমিকাস্বরূপ কিছু কথা আমাকে বলতেই হবে।
আগেই বলেছি আল্লাহ তাআলা মানবজাতিকে দু’টি মৌলিক চাহিদা দিয়ে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। এ চাহিদা দু’টি পূরণ করতে সে সৃষ্টিগতভাবে বাধ্য। এগুলোর মাধ্যমে সে পর্যায়ক্রমে তার অস্তিত্ব ও বংশের ধারাবাহিকতা টিকিয়ে রাখবে পৃথিবীর বুকে।
.
এ দু’টি চাহিদাই মানুষের মৌলিক ও অত্যাবশ্যকীয় চাহিদা। এই দৃষ্টিকোণ থেকে আমি যদি বলি যে, এ দু’টি বিষয়ে যাবতীয় আলোচনা ও পর্যালোচনার পদ্ধতি ও পন্থাও অনেকটা একই রকম, তাহলে মনে হয়না আমার সাথ কেউ দ্বিমত পোষণ করবে। অর্থাৎ আমি বলতে চাচ্ছি, মানুষ খাদ্য গ্রহণ করে কখন? স্বভাবতই উত্তর আসবে- যখন তার ক্ষুধা অনুভূত হয়। সুতরাং একইভাবে ছেলেদের বিয়ের ব্যাপারটাও এমনই হওয়া উচিত। অর্থাৎ যখন সে শারিরীক চাহিদা অনুভবের স্তরে উপনিত হবে, তখনই তার বিয়ে করা উচিত। অর্থাৎ ১৮ বছর বয়সে। আর এটাই প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
.
এখন যে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটা সামনে আসবে সেটা হলো, এ সময় যদি ছেলেটির বিয়ের আসবাব বা অর্থনৈতিক প্রস্তুতি না থাকে, তখন সে কী করবে?
উত্তর ঐ একই পদ্ধতিতে দেয়া যায়। অর্থাৎ একজন ক্ষুধার্ত মানুষ যদি খাবার না পায়, তাহলে সে ধৈর্য ধারণ করবে। খাবারের কোন একটা হালাল ব্যবস্থা হওয়ার আগ পর্যন্ত নিজেকে সংযত রাখবে। তেমনিভাবে ঐ যুবকও বিয়ের সামর্থ লাভ করার আগ পর্যন্ত সংযমী হবে। সবর করবে।
.
কিন্তু ক্ষুধার্ত মানুষটি যদি ধৈর্য রাখতে না পারে? যদি সে খাবারের জন্য কোন ক্ষতিকর এবং অবৈধ পন্থা অবলম্বন করে বসে? যদি এ জন্য কোন অপরাধ করে ফেলে? তখন আমাদের কি করা!
.
আমি এ ক্ষেত্রে আমাদের সমাজব্যবস্থার দিকে আঙ্গুল তাক করবো। সমাজের দায়িত্ব হলো একজন ক্ষুধার্ত ব্যক্তির খাবারের ব্যবস্থা করা, যেন সে ক্ষুধার তাড়নায় কোন অপরাধ সংঘটিত করতে বাধ্য না হয়। সমাজ যদি তার খাদ্যের ব্যবস্থা করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে এই সমাজের মানুষ যেন তার ব্যাপারে সাবধান থাকে। মানুষ যেন তাদের সম্পদ সামলে রাখে এই ক্ষুধার্ত মানুষ থেকে। একদিক থেকে সে অধিকারহারা, কারণ এই সমাজ তাকে তার প্রাপ্য অধিকার দেয়নি। অপরদিকে সে অপরাধী, কারণ সে অন্যায়ভাবে অন্যের সম্পদের দিকে হাত বাড়িয়েছে।
.
আর একইভাবে ছেলেদের বিয়ের ব্যাপারটিকেও ব্যাখ্যা করা যায়।
.
বিয়ের স্বাভাবিক ও প্রকৃত সময় হলো প্রাপ্তঃবয়ষ্ক হবার পরপর। কিন্তু এখনকার ছেলেদের জন্য এ সময়টা হলো —ছাত্রজীবন’। এ সময় তাদের ব্যক্তিগত সম্পদ বলতে কিছুই থাকে না এবং উপার্জনেরও কোন রাস্তা থাকে না। তাদের এই ছাত্রজীবনটা হয়ে থাকে কমপক্ষে ২৫ বছর বয়স পর্যন্ত। তো দেখা যাচ্ছে যে, বর্তমানে আমাদের যে সমাজব্যবস্থা, সেটা পুরোপুরি প্রকৃতির সাথে সাংঘর্ষিক এবং মানুষের স্বাভাবিক চাহিদার সম্পূর্ণ বিপরীত। এই যদি হয় আমাদের সমাজব্যবস্থা, তাহলে এর সমাধান কী? একটি প্রাপ্তঃবয়স্ক সুস্থ-সবল যুবক এই আট/দশ বছর বিয়ে-শাদী ছাড়া কীভাবে কাটাবে? অথচ এই সময়টাই হলো ছেলেদের শারিরীক চাহিদার সবচে’ বিপদজনক ও স্পর্শকাতর সময়।১
.
আল্লাহ তাআলা তার মাঝে একটি স্বাভাবিক চাহিদা রেখে দিয়েছেন। কিন্তু আমাদের অবহেলার কারণে সেটা জ্বলন্ত এক অগ্নিকুণ্ডে পরিণত হয়। এ আগুনে হয়ত সে নিজেই জ্বলে-পুড়ে শেষ হয়ে যায় কিংবা ব্যাভিচারের করে মানুষের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়। আর এটাই সবচে’ আশঙ্কা ও ভয়াবহ ব্যাপার। যত আলোচনা-পর্যালোচনা এবং গবেষণা রয়েছে, সব একেই কেন্দ্র করে হওয়া উচিত। ইজি চেয়ারে বসে ধূমায়িত কফির কাপে একটা চুমুক দিলাম, সিগেরেটে লম্বা একটা টান দিলাম, তারপর খুব একটা ভাব নিয়ে বললাম, ছেলেদের বিয়ের জন্য উপযুক্ত বয়স আসলে ৩০। কিন্তু এই ভাবের বক্তব্য দ্বারা তো সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। এ ধরণের বক্তব্য তো বিনামূল্যেই দেয়া যায়। যে বিচারক ফাঁসির আদেশ দেন, তিনি তো স্রেফ তার মুখটা খুলে জিহ্বটা একটু নাড়েন; ব্যাস, হয়ে গেল ফাঁসির রায়। আসল বিপদটা তো আসে বিচারাধিন ব্যক্তিটির উপর। আর আমাদের আলোচনায় বিচারাধিন ব্যাক্তিটি হলো যুবক এবং যুবতীও।
.
অনেক সময় এমনও হয় যে, শারিরীক গঠন ভাল হলে এবং দ্রুত বৃদ্ধি পেলে অনেক ছেলেরা ১৫ বছর বয়সেই প্রাপ্তঃবয়ষ্ক হয়ে যায়। তখন শারিরীক চাহিদাও সৃষ্টি হয়। কিন্তু আমাদের বুদ্ধিজীবিরা যদি এই দণ্ডাদেশ জারি করেন যে, ত্রিশের আগে ছেলেরা যেন বিয়ে না করে, তাহলে ঐ উঠতি বয়সী যুবক ছেলেটা বাকি ১৫টা বছর কীভাবে কাটাবে?
.
অথচ যে সমাজ তাকে এই সভ্যতা(!) শেখায়, যে সমাজ তাকে প্রকৃত সময়ে বিয়ে করতে বাধা দেয়, সে সমাজই তার সামনে অশ্লীলতা ও অবৈধ সম্পর্কের এমন শৈল্পিক পসরা সাজিয়ে রাখে, যা প্রতিনিয়ত তার কামনার আগুনকে আরও উসকে দিতে থাকে। সে বেচারা হয়ত নিজেকে সংযমী করার জন্য এসব থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখতে চায়। কিন্তু এই সমাজ তাকে কখনই এটা ভুলে থাকতে দেয় না। অশ্লীল মুভি, ড্রামাসিরিজ, পোস্টার, উপন্যাস, মুক্তমনা আর সভ্যতার নামে মেয়েদের খোলামেলা কাপড়ে চলাফেরা। রাস্তায়, বাসে, কলেজে, ভার্সিটিতে যেখানেই সে যায়, চারপাশে থাকে কামনাকে উসকে দেয়ার উপকরণ। আর আমরা ১০/১৫ বছরের জন্য তার উপর এই বোঝা চাপিয়ে দিয়ে বলি, এখন তোমার পড়ালেখার সময়। এসব অশ্লীল চিন্তাভাবনা এখন তোমার জন্য নয়। ভুলেও এগুলো নিয়ে ভাববে না, ধারে কাছেও যাবে না কখনও।
.
আল্লাহর কসম করে বলছি, সভ্যতার মোড়কে ১৫ বছরের যে শাস্তি আমরা তাকে দিচ্ছি, তারচে’ ১৫ বছরের স্বশ্রম কারাদণ্ড তার জন্য অনেক ভাল। তো এখন সমাধান কী?
.
সমাধান হলো প্রকৃতির মাঝে, প্রকৃতির কাছে ফিরে আসার মাঝে। যে প্রকৃতি দিয়ে মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে, সে প্রকৃতিকে নিজেদের মধ্যে ধারণ করার মাঝেই সমাধান। সৃষ্টিকর্তা এই গ্রহের প্রকৃতিকে যে মৌলিক নীতিতে পরিচালনা করেন, যে ফিতরত দিয়ে তিনি মানসজাতিকে সৃষ্টি করেছেন, সেই প্রকৃতি ও ফিতরতের বিরুদ্ধাচরণ করে মানবজাতি কখনই শান্তির জীবন পেতে পারে না।
.
আমাদের পূর্বপুরুষরা যেভাবে তাদের ছেলেদের ১৮ বছর বয়সে এবং মেয়েদের ১৬ বছর বয়সে বিয়ে দিয়ে দিতেন, সেটাই ছিল প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তাদের জীবন ছিল স্বচ্ছ পানির শান্ত দিঘির মত নির্মল সুখের। কিন্তু আমাদের দ্বারা যদি এটা সম্ভব না হয়, তাহলে আমরা অন্তত আমাদের সন্তানদের চারিত্র-গঠনের ব্যাপারে যেন আরও সাবধানী ও সচেতন হই। উন্নত ও চরিত্র ও সভ্যতার সঠিক অর্থ যেন আমরা তাদেরকে শিক্ষা দিই। ছোট থেকেই যেন আমরা তাদের অন্তরে আল্লাহ তাআলার ভয় ও ভালাবাসার বীজ বপন করি, যেন বয়সের সাথে সাথে তা একটি মযবুত ও ছায়াদার মহীরুহে পরিণত হয়। জীবনের সকল ক্ষেত্রেই যেন তারা এর শীতল ছায়ার পরশ লাভ করে তাদের অন্তরে।
.
আমরা আমাদের সমাজের রাস্তার আবর্জনা যেমন করে পরিষ্কার করি, তেমনিভাবে চরিত্রকে নোংড়া করে, এমন সকল আবর্জনা থেকেও যেন আমরা আমাদের সমাজকে পবিত্র রাখি। সবচে’ দামী সম্পদটিকে আমরা যেভাবে হেফাজত করি, তারচেয়ে আরও বহুগুণ বেশি সতর্কতার সাথে যেন আমরা আমাদের নারীদের হেফাজতের কথা চিন্তা করি।
দ্বিতীয় প্রশ্নের জবাবে আমার এইটুকুই বলার ছিল। আমি জানি যে, সবাই আমার সাথে একমত হবে, বলবে, শায়খ তো ঠিকই বলেছেন।
.
কিন্তু আমি এও জানি যে, কেউই আমার কথাগুলো তাদের জীবনে বাস্তবে রূপান্তরিত করবে না। আমার সাথে একমত হওয়া পর্যন্তই শেষ।

আরও দেখুন:  ‘বোবায় ধরা’ বা ‘ঘুমের পক্ষাঘাত’ থেকে রক্ষার উপায়

শায়খ আলী তানতাবী রহ. -এর مع الناس কিতাবটির দশম প্রবন্ধ السن المناسبة للزواج -এর অনুবাদ।

অনুবাদক সুহৃদকে আল্লাহ আজ্জা ওয়া যাল জাযায়ে খায়ের দান করুন।

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

মন্তব্য করুন

Back to top button