সমাজ/সংস্কৃতি/সভ্যতা

ধর্ম যার যার উৎসব সবার!! কিছু কথা- অতঃপর মুসলিম ও পূজা

বর্তমানে তথাকথিত সুশীলদের বাজারে বিখ্যাত হওয়া একটি উক্তি হল “ধর্ম যার যার উৎসব সবার।” আর এই উক্তিটা তখনই তাদের মুখে বেশি শোনা যায় যখন কি না সামনে এসে পড়ে দূর্গাপূজা বা অন্যান্য পূজা। আর এই কথার চাদরে মুখ লুকিয়ে নিজের পূজায় যাওয়ার বৈধতা খুজে বেড়ান আমদের কিছু তথাকথিত মুসলিম ভাই ও বোনেরা। এই মুসলিম ভাই বোনদের উদ্দ্যেশ্যেই আজকের লেখা।তার আগে চলুন আমরা ধর্ম আর ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ (সেকুলারিজম) সম্পর্কে জেনে আসি।

উইকিপিডিয়া অনুসারে –

“ধর্ম হল  লিপিবদ্ধ  শৃঙ্খলিত প্রত্যাদেশ কে বিশ্বাস ও ধর্মানুষ্ঠান  (প্রথা )  এঁর  উপর  আনুগত্য , যা  সাধারনত “আধ্যাত্মিক” ব্যাপারে “দৃঢ় বিশ্বাস” এঁর সাথে সম্পর্ক যুক্ত; এবং বিশেষ  পূর্বপুরুষ হতে  প্রাপ্ত  ঐতিহ্য , জ্ঞান এবং প্রজ্ঞা , রীতি ও প্রথা কে  মানা এবং গবেষণা করা যাতে মানবজীবন কে বোঝা যায় এবং সেভাবে চালানো যায়।”[১] 

তাহলে উইকিপিডিয়া অনুসারে ধর্ম হলঃ

১. লিপিবদ্ধ  শৃঙ্খলিত প্রত্যাদেশ কে বিশ্বাস ও ধর্মানুষ্ঠান  (প্রথা )  এঁর  উপর আনুগত্য।

২. বিশেষ  পূর্বপুরুষ হতে  প্রাপ্ত  ঐতিহ্য, জ্ঞান এবং প্রজ্ঞা, রীতি ও প্রথা কে  মানা।

আর ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের সংজ্ঞায় বলা হয়েছেঃ

“ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ  (Secularism) বলতে কিছু নির্দিষ্ট প্রথা বা প্রতিষ্ঠানকে ধর্ম বা ধর্মীয় রীতিনীতির বাইরে থেকে পরিচালনা করাকে বোঝানো হয়।” [২] “ধর্মনিরপেক্ষতা বা সেকুলারিজম” শব্দটি ১৮৫১ সালে ব্রিটিশ লেখক জর্জ জ্যাকব প্রথম ব্যবহার করেন। জর্জ জ্যাকব ধর্মের কোনো রকম সমালোচনা ছাড়া, সমাজে শৃঙ্খলা আনয়নের জন্য তার এই Secularism এর ধারণা প্রকাশ করেন।” [২]

সোজা কথায় বললে বলা যায়, তিনি বলতে চেয়েছেন ধর্ম দেশে বিশৃংখলা সৃষ্টি করে।

মোদ্দাকথা ধর্মনিরপেক্ষতা হল দেশের সরকার কোন ধর্মকে রিপ্রেজেন্ট করতে পারবে না আর ধর্মীয় নীতি অনুসারে দেশ পরিচালনা করতে পারবে না।

তাহলে এই ধর্মনিরপেক্ষতা যদি কোন ব্যক্তি নিজের জীবনে প্রয়োগ করতে চায় তাহলে তাকে অবশ্যই ধর্মহীন মানে সেকুলার হতে হবে।

যাহোক, এবার “ধর্ম যার যার উৎসব সবার” এই ছোট্ট কথাটার প্রতি একটু খেয়াল করি। গঠনশৈলী অনুসারে এ ধরনের শব্দে সবার যে জিনিসটা সেই জিনিসের উপর গুরুত্ব দেয়া হয়। আরেকটু ভালোভাবে বলতে গেলে ধরুন গ্রামের একটা যৌথ পরিবারে যে সংসারগুলো থাকে সেগুলার মাঝে ঝামেলা হল যার ফলে যৌথ পরিবার ভাঙার উপক্রম হল তখন কেউ উঠে বলল “সংসার যার যার পরিবার সবার”। এর মানে হল সে বড় পরিবারের মাঝে বিদ্যমান সংসার গুলোকে ক্ষুদ্র করে যৌথ পরিবার বিষয়টাকে বড় করে দেখছে। আর সবাই তখন ওই ব্যক্তির ঐ কথার উপরে কথা বলে না কারন ওই ব্যক্তি ক্ষুদ্র সার্থ রেখে বৃহৎ স্বার্থের কথা চিন্তা করতে বলছে।

আরও দেখুন:  বর্ষবরণ - ঈমান হরণ

তাহলে এবার যদি আমরা ওই  “ধর্ম যার যার উৎসব সবার” কথাটার দিকে তাকাই তাহলে দেখতে পাব যে এই কথার মধ্যে ধর্ম বিষয়টা হল ক্ষুদ্র স্বার্থ আর উৎসব বিষয়টা হল বৃহৎ স্বার্থ। যারা এই ধরনের কথা বলে তাদের কাছেও ধর্ম বিষয়টা নগন্য। আর এই বিষয়টা মিলে যাচ্ছে সেকুলারিজম বিষয়টার সাথে। কারন সেকুলার রাষ্ট্রেরও মূলণীতি হল রাষ্ট্রের চেয়ে ধর্ম নগন্য। এখন কোন ব্যক্তি যদি বলেন  “ধর্ম যার যার উৎসব সবার” তার মানে হল তার কাছে তার ধর্মের বিষয় খুবই ক্ষুদ্র মানসিকতার বিষয়, এর চেয়ে তার কাছে রাষ্ট্রের সকল ধর্মের উৎসব অনেক বড় বিষয়।

এবার চলুন ধর্ম তাদের কাছে কতটা ক্ষুদ্র বিষয় সেই বিষয়টা আরেকটু ভালোভাবে বুঝি।

ধরুন আমি যদি ধর্মের জায়গায় রাজনৈতিক দল কথাটা বসাই তাহলে কি “রাজনৈতিক দল যার যার উৎসব সবার” কথাটা বর্তমান প্রেক্ষাপটে তাদের কাছে সত্য হবে? কখনই না। এর উদাহরন হিসেবে বলা যায় বাংলাদেশের দুই রাজনৈতিক দলের একদলের শোক অনুষ্ঠানে অন্য দল শোক প্রকাশ করে না, আবার এক দলের নেতার জন্মানুষ্ঠানে অন্য দল অংশগ্রহন করে না।

এবার যদি আমি  ধর্মের জায়গায় রাষ্ট্র বসাই তাহলে কি কোনভাবে “রাষ্ট্র যার যার উৎসব সবার” সত্য হবে? তাও হবে না। যেমন ধরুন, বাংলাদেশের বিজয়ের দিনে কি পাকিস্তানিরা আনন্দ প্রকাশ করবে? তেমনি ইন্ডিয়ার বিজয় দিবসে পাকিস্তানীরা বা পাকিস্তানের বিজয় দিবসে ভারতীয়রা আনন্দ প্রকাশ করবে না।

তাহলে এখন মনে হয় না আর বলে দিতে হবে মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাসের স্থান আজ সেকুলার রাষ্ট্রের তথা সেকুলারদের কাছে কোথায়।

এক ধর্মের মানুষের অন্য ধর্মের অনুষ্ঠানে যাওয়া কি যৌক্তিক?

এই প্রশ্নের উত্তর পাবার আগে আপনারা একবার একেবারে প্রথমে দেয়া ধর্মের সংজ্ঞার দিকে তাকান। ওখানে স্পষ্ট ভাবে বলা আছে “ধর্ম হল  লিপিবদ্ধ শৃঙ্খলিত প্রত্যাদেশকে বিশ্বাস ও ধর্মানুষ্ঠান  (প্রথা )  এর  উপর  আনুগত্য।” তাহলে যেহেতু প্রত্যেক ধর্মের উৎসবই ঐ ধর্মের প্রতিফলন আবার যেহেতু কোন ধর্মের ব্যক্তিই বলে না যে তার ধর্ম বাদে অন্য ধর্ম সঠিক তাহলে  কিভাবে অন্য ধর্মের অনুষ্ঠানে যাওয়া যৌক্তিক হয়?

এবার আসি আমার লেখার মূল উদ্দেশ্য মুসলিমদের নিয়ে।

মুসলিম ও পূজাঃ

যারা ইসলাম নামক ধর্মকে বিশ্বাস করে, তারাই মুসলিম। আর মুসলিম হওয়ার প্রধান শর্ত হল আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাস করা অর্থাৎ

১. সৃষ্টি, রাজত্ব, কর্তৃত্ব্ব পরিচালনায় আল্লাহকে এক হিসেবে বিশ্বাস করা।

আরও দেখুন:  নষ্ট সংস্কৃতি : 'পহেলা বৈশাখ' প্রসঙ্গ

আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বলছেনঃ

“আল্লাহ ছাড়া কোন স্রষ্টা আছে কি যে তোমাদেরকে আকাশ ও যমীন হতে জীবিকা প্রদান করে প্রদান করে। প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ ছাড়া কোন মা’বূদ নেই। [সূরা ফাতিরঃ ৩]

“হে নবী! আপনি জিজ্ঞাসা করুন,সব কিছুর কর্তৃত্ব কার হাতে? যিনি আশ্রয় দান করেন এবং যার উপর কোন আশ্রয়দাতা নেই।” [সূরা মু’মিনূনঃ ৮৮]

“সৃষ্টি করা ও আদেশ দানের মালিক একমাত্র তিনিবিশ্বজাহানের প্রতিপালক একমাত্র আল্লাহ তা’আলা অতীব বরকতময়।” [সূরা আ’রাফঃ ৫৪]

২. আল্লাহ তা’আলা নিজেকে যে সমস্ত নামে গুনান্বিত করেছেন, সে সমস্ত নাম ও গুনাবলিতে তাঁকে এক ও অদ্বীতিয় বলে মেনে নেওয়া।

৩. ইবাদতের মালিক হিসেবে একমাত্র আল্লাহকে বিশ্বাস করা। তিনি আর ছাড়া আর কারো জন্য ইবাদত করা যাবে না। আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কাছে সিজদাহ করা যাবে না। আল্লাহ্‌ তা’আলা বলেনঃ

“তোমরা অনুসরণ কর, যা তোমাদের প্রতি পালকের পক্ষ থেকে অবতীর্ণ হয়েছে এবং আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্য সাথীদের অনুসরণ করো না।[সুরা আ’রাফঃ ৩]

“যে লোক ইসলাম ছাড়া অন্য কোন ধর্ম তালাশ করে, কস্মিণকালেও তা গ্রহণ করা হবে না এবং আখেরাতে সে ক্ষতি গ্রস্ত।” [সুরা আলে ইমরানঃ ৮৫]

সুতরাং একথা দ্ব্যার্থহীনভাবে প্রমানিত যে মুসলমান হতে হলে আল্লাহ্‌ ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করা যাবে না শুধু তাই নয় একথা মনে প্রানে বিশ্বাস করতে হবে যে ইবাদতের মালিক একমাত্র আল্লাহ।

উইকিপিডিয়ায় পূজার সংজ্ঞায় বলা হয়েছেঃ

“Pūjā or Poojan is a prayer ritual performed by Hindus to host, honour and worship one or more deities or to spiritually celebrate an event. Sometimes spelt phonetically as pooja or poojah, it may honour or celebrate the presence of special guest(s), or their memories after they pass away. The word pūjā (Devanagari: पूजा) comes from Sanskrit, and means reverence, honour, homage, adoration, and worship”[৩]

অর্থাৎ হিন্দু ধর্মানুসারে পূজা হল যেখানে দেবতা, বিশিষ্ট ব্যক্তি অথবা অতিথিদের অরাধনা করা হয়।

যা মুসলমানদের বিশ্বাসের ও কর্মের পরিপন্থি কারন মুসলমানরা এক আল্লাহর উপাসনা বা আরাধনা করে ও এর যোগ্য অন্য কেউ নেই বলে বিশ্বাস করে। সুতরাং  তেল আর নুন যেরকম একসাথে হতে পারে না সেরকম মুসলমানের উপস্থিতি ও আল্লাহ বাদে অন্য কারো উপাসনা এক সাথে খাতা-কলমে হতে পারে না।

যে মুসলমানদের পূর্বপুরুষ হযরত ইব্রাহীম (আঃ) মুর্তি ভেঙে প্রমান করেছেন যে মূর্তি নিজেকে বাঁচাতে পারে না সে, অন্যকে রক্ষা করতে পারবে না, যে মুসলমানদের পূর্বপূরুষ হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) কাবাঘর থেকে ৩৬০ টি মূর্তি সরিয়ে আল্লাহর একত্ববাদ ঘোষনা করেছিলেন, যে মুসলমানদের নবীরা সারাজীবন এক আল্লাহর উপাসনার বানী প্রচার করেছেন সেই মুসলমানরা শুধুমাত্র এক উপায়েই পূজার অনুষ্ঠানে যেতে পারে আর তা হল ইসলাম থেকে দূরে সরে যাওয়া। আর যারা ইসলাম বাদে অন্যকোন জীবনব্যবস্থার অনুসন্ধান বা অনুসরন করবে তারা কস্মিনকালেও মুক্তির স্বাদ আস্বাদন কর্তে পারবে না। কারন সৃষ্টিকর্তা তাঁর সর্বশেষ বানীর সংকলনে বলেনঃ

 “নিঃসন্দেহে আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য দ্বীন একমাত্র ইসলাম।” [সুরা আলে ইমরানঃ ১৯]

আর ইসলাম শুধু ধর্মই নয় পরিপূর্ন জীবন বিধান যেখানে আল্লাহ্‌ তা’আলা এখানে আমাদের জীবন চালানোর সূক্ষাতিসূক্ষ নির্দেশও দিয়েছেন।আল্লাহ্‌ তা’আলা ইবাদত সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে বলেনঃ

“বলুন, হে কাফেরকূল, আমি ইবাদত করিনা, তোমরা যার ইবাদত কর। এবং তোমরাও এবাদতকারী নও, যার ইবাদত আমি করি এবং আমি ইবাদতকারী নই, যার ইবাদত তোমরা কর। তোমরা ইবাদতকারী নও, যার এবাদত আমি করি। তোমাদের কর্ম ও কর্মফল তোমাদের জন্যে এবং আমার কর্ম ও কর্মফল আমার জন্যে।” [সূরা আল কাফিরুন: ১-৬]

অন্যদিকে আল্লাহ্‌ তা’আলা বাদে যারা অন্য কারো ইবাদত করে তাদের সাথে মুসলমানদের কোন সম্পর্ক ও থাকতে  পারে না, যেমনভাবে ইব্রাহীম (আঃ) ও তার সঙ্গীরা আল্লাহর পরিবর্তে যারা অন্য কারো ইবাদত করে তাদের এবং ইবাদতকারী বস্তুর সাথে সব সম্পর্ক ছিন্ন করেছিলেন। আল্লাহ্‌ তা’আলা বলেনঃ

তোমাদের জন্যে ইব্রাহীম ও তাঁর সঙ্গীগণের মধ্যে চমৎকার আদর্শ রয়েছে। তারা তাদের সম্প্রদায়কে বলেছিলঃ তোমাদের সাথে এবং তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে যার এবাদত কর, তার সাথে আমাদের কোন সম্পর্ক নেই। আমরা তোমাদের মানি না। তোমরা এক আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন না করলে তোমাদের মধ্যে ও আমাদের মধ্যে চিরশত্রুতা থাকবে। … ” [সুরা মুমতাহিনাঃ ৪]

মহান আল্লাহ্‌ তা’আলা যেখানে আল্লাহর পরিবর্তে যারা অন্য কারো ইবাদত করে তাদের এবং ইবাদতকারী বস্তুর সাথে সব সম্পর্ক ছিন্ন করাকে পছন্দ করেছেন সেখানে আমরা কি করে পূজা উৎসব, যেখানে আল্লাহ্‌ বাদে অন্য কারো ইবাদত করা হয়, সেখানে যাবার কথা মনে পর্যন্ত আনতে পারি?

আরও দেখুন:  মূল্যবোধের অবক্ষয়

আল্লাহ্‌ আমাদের মাফ করুন। আল্লাহ্‌ তা’আলা যেন আমাদের সকলকে বিষয়গুলা বোঝার ও তাঁর একত্ববাদের উপর অটল থাকার তৌফিক দান করেন। আমিন।

References:

[১] https:/bn.wikipedia.org/wiki/ধর্ম

[২] https:/bn.wikipedia.org/wiki/ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ

[৩] https:/en.wikipedia.org/wiki/Puja_(Hinduism)

 

লেখক:

এইচ, এম, ফাহাদ-বিন-ইসলাম, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

মন্তব্য করুন

Back to top button