হযরত মুহাম্মাদ (ছাঃ)

বানুল মুছত্বালিক্ব অথবা মুরাইসী‘ যুদ্ধ

পূর্বের অংশ পড়ুন: খন্দক ও বনু কুরায়যার যুদ্ধের উল্লেখযোগ্য দিক ও শিক্ষণীয় ঘটনাবলী

সর্বাধিক বিশুদ্ধ মতে এই যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল ৬ষ্ঠ হিজরীর শা‘বান মাসে। কারণ ছিল এই যে, এ মর্মে মদীনায় খবর পৌঁছে যে,  বানুল মুছত্বালিক্ব গোত্রের সর্দার হারেছ বিন আবু যাররাব রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য নিজ গোত্র এবং সমমনা অন্যান্য আরব বেদুঈনদের সাথে নিয়ে মদীনা অভিমুখে যাত্রা করেছেন। বুরাইদা আসলামীকে পাঠিয়ে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) উক্ত খবরের সত্যতা যাচাই করলেন। তিনি সরাসরি গোত্র নেতা হারেছ-এর সঙ্গে কথা বলে নিশ্চিত হয়ে রাসূলকে উক্ত বিষয়ে অবহিত করেন। অতঃপর আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) ৩রা শা‘বান তারিখে মদীনা হ’তে সসৈন্যে রওয়ানা হন। সৈন্যসংখ্যা সম্পর্কে কোন তথ্য জানা যায়নি। তবে ওহোদ যুদ্ধ থেকে পিছু হটার পর এ যুদ্ধেই প্রথম মুনাফিকদের একটি দল রাসূলের সঙ্গে যুদ্ধে গমন করে। ইতিপূর্বে তারা কোন যুদ্ধে গমন করেনি। এ সময় মদীনার দায়িত্ব যায়েদ বিন হারেছাহ অথবা আবু যার গেফারী অথবা নামীলাহ বিন আব্দুল্লাহ লায়ছীর উপরে অর্পণ করা হয়।

যাত্রা পথে গোত্র নেতা হারেছ প্রেরিত একজন গুপ্তচর আটক হয় ও নিহত হয়। এ খবর জানতে পেরে হারেছ বাহিনীতে আতংক ছড়িয়ে পড়ে এবং তার সঙ্গে থাকা আরব বেদুঈনরা সব পালিয়ে যায়। ফলে বানুল মুছত্বালিকের সাথে ক্বাদীদ -এর সন্নিকটে সাগর তীরবর্তী মুরাইসী‘ নামক ঝর্ণার পার্শ্বে মুকাবিলা হয় এবং তাতে সহজ বিজয় অর্জিত হয়। মুশরিক পক্ষে ১০ জন নিহত ও ১৯ জন আহত হয় এবং মুসলিম পক্ষে একজন শহীদ হন। জনৈক আনছার ছাহাবী তাকে শত্রুসৈন্য ভেবে ভুলষমে হত্যা করেন।

উক্ত যুদ্ধ সম্পর্কে জীবনীকারগণের বক্তব্য উক্ত রূপ। তবে হাফেয ইবনুল ক্বাইয়িম বলেন যে, উক্ত বর্ণনা ভ্রমাত্মক মাত্র। কেননা প্রকৃত প্রস্তাবে বানুল মুছত্বালিকের সাথে মুসলিম বাহিনীর কোনরূপ যুদ্ধই হয়নি। বরং মুসলিম বাহিনী তাদের উপরে আকস্মিক হামলা চালালে তারা সব পালিয়ে যায় ও তাদের নারী-শিশুসহ বহু লোক বন্দী হয়।[1] বন্দীদের মধ্যে গোত্রনেতা হারেছ বিন যাররাবের কন্যা জুওয়াইরিয়া ছিলেন। যিনি ছাবেত বিন ক্বায়েস-এর ভাগে পড়েন। ছাবেত তাকে ‘মুকাতিব’ হিসাবে চুক্তিবদ্ধ করেন। মুকাতিব ঐ দাস বা দাসীকে বলা হ’ত, যে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ স্বীয় মনিবকে দেয়ার শর্তে চুক্তি সম্পাদন করে এবং উক্ত অর্থ পরিশোধ করার পর সে স্বাধীন হয়ে যায়। নবী করীম (ছাঃ) তার পক্ষ থেকে চুক্তি পরিমাণ অর্থ প্রদান পূর্বক তাকে মুক্ত করেন এবং তাকে বিয়ে করে স্ত্রীর মর্যাদা দেন। এই বিবাহের ফলশ্রুতিতে মুসলমানগণ বনু মুছত্বালিক গোত্রের বন্দী একশত পরিবারের সবাইকে মুক্ত করে দেন এবং তারা সবাই মুসলমান হয়ে যায়। এর ফলে তারা সবাই ‘রাসূলের শ্বশুর গোত্রের লোক’ বলে পরিচিতি পায়।[2] বনু মুছত্বালিক যুদ্ধের এটাই হ’ল সংক্ষিপ্ত বিবরণ।

মুনাফিকদের অপতৎপরতা

বানুল মুছত্বালিক যুদ্ধেই প্রথম মুনাফিকদের একটি দলকে যুদ্ধে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়। বদর, ওহোদ, খন্দক প্রভৃতি যুদ্ধের পরে এবং সর্বোপরি মুনাফিকদের সবচেয়ে বড় সহযোগী ইহুদী গোত্রগুলিকে মদীনা থেকে বিতাড়নের পর রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) হয়ত ভেবেছিলেন যে, মুনাফিকদের স্বভাবে এখন পরিবর্তন আসবে। কিন্তু কারু অন্তরে একবার কপট বিশ্বাস দানা বাঁধলে তা থেকে নিস্তার পাওয়া যে নিতান্তই অবাস্তব ব্যাপার, মুনাফিকদের আচরণ দ্বারা আবারো তা প্রমাণিত হয়ে গেল। বনু মুছত্বালিক্ব যুদ্ধে এসে মুনাফিকদের আচরণে কোন পরিবর্তন তো দেখাই যায়নি, বরং তা আরও নগ্নভাবে প্রকাশিত হয়। নিম্নে আমরা তাদের পূর্বেকার আচরণ ও পরের আচরণ একই সাথে বর্ণনা করব।

পূর্বেকার আচরণ কতগুলি ঘটনার সাহায্যে তুলে ধরাই উত্তম হবে। যেমন-

(১) আউস ও খাযরাজ উভয় গোত্র মিলিতভাবে তাদের নেতা হিসাবে আব্দুল্লাহ ইবনে উবাইকে বরণ করে নেবার জন্য যখন মণিমুক্তাখচিত মুকুট তৈরী করছিল, সে সময় হিজরত সংঘটিত হওয়ার ফলে সকলে আব্দুল্লাহকে ছেড়ে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে নেতৃত্বে বরণ করে নেয়। এতে রাসূলকেই সে তার নেতৃত্ব ছিনিয়ে নেওয়ার জন্য পরোক্ষভাবে দায়ী করে। ফলে শুরু থেকেই সে রাসূলের বিরুদ্ধে তার দলবল নিয়ে চষান্ত শুরু করে। যেমন একদিন আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) খাযরাজ গোত্রের অসুস্থ নেতা সা‘দ বিন ওবাদাহকে দেখার জন্য গাধার পিঠে সওয়ার হয়ে যাচ্ছিলেন। তখন পথিপার্শ্বে সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে বসা আব্দুল্লাহ বিন উবাই নাকে কাপড় চাপা দিয়ে রাসূলকে তাচ্ছিল্য করে বলে ওঠে, ‘আমাদের উপরে ধূলোবালি উড়িয়ো না’।[3]

(২) যখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) কোন মজলিসে লোকদের কুরআন শুনাতেন, তখন সেখানে সে উপস্থিত হয়ে বলত, ‘তোমার বাড়ীতে তুমি বসো। আমাদের মজলিসে ঢুকো না’। এগুলি ছিল তার ইসলাম গ্রহণের পূর্বেকার আচরণ। অতঃপর ২য় হিজরীর ১৭ রামাযান শুষবার বদরযুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর অকল্পনীয় বিজয় লাভে সে ভীত হয়ে পড়ে এবং দলবল সহ দ্রুত এসে রাসূলের নিকটে ইসলাম কবুল করে। কিন্তু এটা ছিল বাহ্যিক, তার মনের ব্যাধি আগের মতই অক্ষুণ্ণ ছিল। তবে তার প্রকাশভঙ্গীতে কিছুটা পরিবর্তন আসলো। যেমন-

(৩) জুম‘আর দিন খুৎবা দানের উদ্দেশ্যে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) মিম্বরে দন্ডায়মান হওয়ার পূর্বেই আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই অযাচিতভাবে উঠে দাঁড়িয়ে মুছল্লীদের উদ্দেশ্যে বলত, ‘ইনি আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) তোমাদের মাঝে উপস্থিত। আল্লাহ তাঁর মাধ্যমে তোমাদেরকে সম্মানিত করেছেন ও গৌরবান্বিত করেছেন। অতএব তোমরা তাঁকে সাহায্য করবে ও তাঁকে শক্তিশালী করবে। তোমরা তাঁর কথা শুনবে ও তাঁকে মেনে চলবে’। বলেই সে বসে পড়ত। তারপর রাসূল (ছাঃ) উঠে দাঁড়িয়ে খুৎবা দিতেন।

(৪) ৩য় হিজরীর ৭ই শাওয়াল শনিবার ওহোদ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। ঐদিন ফজরের সময় পথিমধ্যে শাওত্ব নামক স্থান হ’তে যুদ্ধের ময়দানে রওয়ানাকালে সে তার ৩০০ সৈন্য নিয়ে পিছে হটে যায়। সে ভেবেছিল বাকীরাও তার পথ ধরবে এবং মুহাম্মাদ (ছাঃ) পর্যুদস্ত হবেন। কিন্তু তা হয়নি। বরং কুরায়েশরা কেবল সাময়িক বিজয়ের সান্ত্বনা নিয়ে ফিরে যায় শূন্য হাতে। তাতে রাসূল (ছাঃ) ও মুসলিম বাহিনীর মনোবলে সামান্যতম চিড় ধরেনি। বরং যুদ্ধের পরের দিনই তারা কুরায়েশ বাহিনীর পশ্চাদ্ধাবনে বের হয়ে হামরাউল আসাদ পর্যন্ত ধাওয়া করেন। খবর পেয়ে আবু সুফিয়ান ভয়ে তার বাহিনী নিয়ে দ্রুত মক্কা অভিমুখে পালিয়ে যায়। এসব দেখে শুনে আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই আবারো  ভীত হয়ে পড়ে। ফলে পরবর্তী জুম‘আর দিন সে পূর্বের ন্যায় উঠে দাঁড়িয়ে রাসূলের প্রশংসাসহ তাঁর প্রতি আনুগত্য প্রদর্শনের আহবান জানায়। কিন্তু এবার মুছল্লীগণ তাকে আর ছাড় দিল না। মসজিদের সকল প্রান্ত হ’তে আওয়ায উঠল ‘বস হে আল্লাহর দুশমন! তুমি একাজের যোগ্য নও। তুমি যা করেছ তাতো করেছই’। লোকদের বিক্ষোভের মুখে সে বকবক করতে করতে মসজিদ থেকে বের হয়ে যাওয়ার সময় বলতে থাকল, আমি যেন এখানে কোন অপরাধী এসেছি। আমি তাঁরই সমর্থনে বলার জন্য দাঁড়িয়েছিলাম’। তখন বাইরে দাঁড়ানো জনৈক আনছার তাকে বললেন, তোমার ধ্বংস হৌক! ফিরে চল। আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) তোমার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করবেন। মুনাফিক নেতা বলল, ‘আল্লাহর কসম! আমি চাই না যে তিনি আমার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন’। এ প্রসঙ্গে সূরা মুনাফিকূন ৫-৬ আয়াত নাযিল হয়।

(৫) বনু নাযীর ইহুদী গোত্রকে মুনাফিক নেতা আব্দুল্লাহ উস্কে দিয়ে বলেছিল, তোমরা রাসূলের কথামত মদীনা থেকে বের হয়ে যেয়ো না। বরং রাসূলের বিরুদ্ধে  যুদ্ধের প্রস্ত্ততি নাও। আমার দু’হাযার সৈন্য রয়েছে, যারা তোমাদের পক্ষে যুদ্ধ করবে। এছাড়াও বনু কুরায়যা ও বনু গাত্বফানের লোকেরা সাহায্য করবে। আল্লাহর ভাষায়, ‘আপনি মুনাফিকদের দেখেননি যারা তাদের কিতাবধারী কাফের ভাইদের বলে, তোমরা যদি বহিষ্কৃত হও, তবে আমরাও তোমাদের সাথে অবশ্যই বের হবো এবং তোমাদের ব্যাপারে আমরা কখনোই কারু কথা মানব না। আর যদি তোমরা আষান্ত হও, তবে আমরা অবশ্যই তোমাদের সাহায্য করব’। আল্লাহ সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, ওরা নিশ্চয়ই মিথ্যাবাদী’ (হাশর ৫৯/১১)।

আরও দেখুন:  শিশু, যুবক ও ব্যবসায়ী মুহাম্মাদ

মুনাফিকদের উষ্কানিতে বনু নাযীর সহজভাবে বেরিয়ে না গিয়ে যুদ্ধের  ঘোষণা দিল। ফলে তারা মুসলিম বাহিনীর অবরোধের মুখে পড়ে অবশেষে ৪র্থ হিজরী রবীউল আউয়াল মাসে চিরদিনের মত মদীনা থেকে নির্বাসিত হ’ল। অথচ মুনাফিকরা কেউ তাদের সাহায্যে এগিয়ে যায়নি। এ প্রসঙ্গে সূরা হাশর ১৬-১৭ আয়াত নাযিল হয়।

(৬) ৫ম হিজরীর শাওয়াল ও যুলক্বা‘দাহ মাসে সংঘটিত খন্দকের যুদ্ধের সময় মুনাফিকেরা নানাবিধ কথা বলে সাধারণ মুসলমানদের মন ভেঙ্গে দিতে চেষ্টা করে। এমনকি খাযরাজ গোত্রের বনু সালমা গোত্রের লোকদের মন ভেঙ্গে যায় ও তারা ফিরে যাবার চিন্তা করতে থাকে। তারা এতদূর পর্যন্ত বলে ফেলে যে, রাসূল আমাদেরকে যেসব ওয়াদা দিয়েছেন, সবই প্রতারণা বৈ কিছু নয়। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ সূরা আহযাব ১২ হ’তে ২০ আয়াত পর্যন্ত নাযিল করে মুনাফিকদের মুখোশ খুলে দেন।

(৭) ৫ম হিজরীতে যখন যয়নব বিনতে জাহশের সঙ্গে রাসূলের বিবাহ হয়, তখন উক্ত ঘটনাকে কেন্দ্র করে মুনাফিক নেতা আব্দুল্লাহ রাসূলের চরিত্র হননের চেষ্টা করে। এমনকি তারা এমন নোংরা কথাও রটিয়ে দেয় যে, ‘যয়নবকে হঠাৎ দেখা মাত্র মুহাম্মাদ তার সৌন্দর্যে এমন মুগ্ধ হয় যে, সঙ্গে সঙ্গে উভয়ের মন দেয়া-নেয়া হয়ে গেল। পোষ্য পুত্র যায়েদ একথা জানতে পেরে সাথে সাথে স্ত্রী যয়নবকে তালাক দিয়ে দিল এবং মুহাম্মাদ যয়নবকে বিয়ে করে নিল’।

যায়েদ ছিল নবুঅতের পূর্বকাল থেকেই রাসূলের পোষ্যপুত্র। জাহেলী যুগে পোষ্যপুত্রের স্ত্রী নিজ পুত্রের স্ত্রীর ন্যায় হারাম গণ্য হ’ত। এই অযৌক্তিক কুপ্রথা ভাঙ্গার জন্যই আল্লাহর হুকুমে এই বিবাহ হয় (আহযাব ৩৩/৩৭)। কিন্তু মুনাফিকেরা উল্টা ব্যাখ্যা দিয়ে কুৎসা রটাতে থাকে। তাদের এই কুৎসা  রটনা সাধারণ মুসলমানদের প্রভাবিত করে। যা আজও কিছু মুনাফিক কবি-সাহিত্যিক ও রাজনীতিকদের উপজীব্য হয়ে রয়েছে। যয়নবকে বিয়ে করার এই ঘটনার মধ্যে ইহুদী-নাছারাদেরও প্রতিবাদ ছিল। যারা নবী ওযায়ের ও ঈসাকে ‘আল্লাহর পুত্র’ মনে করত (তওবাহ ৯/৩০)। অথচ সৃষ্টি কখনো সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর পুত্র হ’তে পারে না। যেমন অপরের ঔরসজাত সন্তান কখনো কারু নিজ সন্তান হ’তে পারে না। তৃতীয়তঃ ইসলামে চারটির অধিক স্ত্রী একত্রে রাখা নিষিদ্ধ। আর যয়নব ছিলেন রাসূলের পঞ্চম স্ত্রী। অথচ এটি যে ছিল রাসূলের জন্য বিশেষ কারণে বিশেষ অনুমতি (আহযাব ৩৩/৫০) সেকথা তারা পরোয়া করত না। ফলে এটিও ছিল তাদের অপপ্রচারের অন্যতম সুযোগ। এসবই হচ্ছিল আব্দুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের নেতৃত্বে।

উপরোক্ত ঘটনাগুলি ছিল বানুল মুছত্বালিক যুদ্ধের পূর্বেকার। এক্ষণে আমরা দেখব প্রথম বারের মত বানুল মুছত্বালিক্ব যুদ্ধে যাবার অনুমতি পেয়ে এই মুনাফিকেরা সেখানে গিয়ে কি ধরনের অপতৎপরতা চালিয়েছিল।

(৮) ৬ষ্ঠ হিজরীর শা‘বান মাসে বানুল মুছত্বালিক্ব যুদ্ধ হয়। এ সময় মুনাফিক নেতা আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই ও তার সাথীরা প্রধানতঃ ২টি বাজে কাজ করে। এক- তার ভাষায় নিকৃষ্ট ব্যক্তিদের অর্থাৎ মুহাজিরদের মদীনা থেকে বের করে দেবার হুমকি এবং দুই- হযরত আয়েশার চরিত্রে কালিমা লেপন করে কুৎসা রটনা, যা ইফকের ঘটনা বলে পরিচিত। প্রথমটির বিবরণ নিম্নরূপ:

(১) মুহাজিরদের মদীনা থেকে বের করে দেবার হুমকি : বানুল মুছত্বালিক যুদ্ধ শেষে তখন রাসূল (ছাঃ) মুরাইসী‘ ঝর্ণার পাশে অবস্থান করছেন, এমন সময় কিছু লোক পানি নেওয়ার জন্য সেখানে আসে। আগতদের মধ্যে হযরত ওমরের একজন কর্মচারী জাহজাহ আল-গেফারী (جهجاه الغفاري) ছিল। তার সঙ্গে সেনান বিন অবার আল-জুহানী (سنان بن وبر الجهني) নামের জনৈক ব্যক্তির সাথে হঠাৎ ঝগড়া ও ধস্তাধস্তি শুরু হয়ে যায়। তখন জুহানী ব্যক্তিটি يا معشر الأنصار ‘হে আনছারগণ’ এবং গেফারী ব্যক্তিটি يا معشر المهاجرين ‘হে মুহাজিরগণ’ বলে চিৎকার দিতে থাকে। চিৎকার শুনে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলে উঠলেন, أبدعوي الجاهلية وأنا بين أظهركم؟ دعوها فانها منتنه- ‘একি, জাহেলিয়াতের আহবান? অথচ আমি এখনো তোমাদের মাঝে অবস্থান করছি। ছাড়ো এসব। এসব হ’ল দুর্গন্ধ বস্ত্ত’। এর দ্বারা বুঝা যায় যে, দলীয় বা গোত্রীয় পরিচয়ে অন্যায় কাজে প্ররোচনা দেওয়া নিষিদ্ধ। পক্ষান্তরে উক্ত পরিচয়ে ন্যায়কর্মে প্রতিযোগিতা করা সিদ্ধ। সেকারণ জিহাদের ময়দানে শ্রেণীবিন্যাসের সময় আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) মুহাজির, আনছার এমনকি আনছারদের মধ্যে আউস ও খাযরাজদের জন্য পৃথক পতাকা ও পৃথক দলনেতা নির্ধারণ করে দিতেন। (দ্রঃ ওহোদের যুদ্ধ অধ্যায়)

যাই হোক উপরোক্ত ঘটনা আব্দুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের কর্ণগোচর হ’লে সে ক্রোধে অগ্নিশর্মা হয়ে বলে উঠলো, কি আশ্চর্য! তারা এমন কাজ করেছে? আমাদের শহরে বসে তারা আমাদের তাড়িয়ে দিতে চাচ্ছে? ওরা আমাদের সমকক্ষ হ’তে চাচ্ছে? আমাদের ও তাদের মধ্যে কি তাহ’লে সেই প্রবাদ বাক্যটি কার্যকর হ’তে যাচ্ছে যে, سَمِّنْ كَلْبَكَ يَأكُلْكَ، ‘তোমার কুত্তাকে খাইয়ে হৃষ্টপুষ্ট কর, সে তোমাকে খেয়ে ফেলবে’। অতঃপর সে বলল, أما والله لئن رجعنا إلى المدينة ليخرجن الأعز منها الأذل، ‘শোনো! আল্লাহর কসম! যদি আমরা মদীনায় ফিরে যেতে পারি, তাহ’লে অবশ্যই সেখানকার সম্মানিত ব্যক্তিরা নিকৃষ্ট ব্যক্তিদের সেখান থেকে বের করে দেবে’। অতঃপর উপস্থিত লোকদের উদ্দেশ্যে বলে, দেখো তোমরাই নিজেরা একাজ করেছ। তোমরাই তাদেরকে তোমাদের শহরে প্রবেশ করিয়েছ। তোমরাই তাদেরকে তোমাদের মাল-সম্পদ বণ্টন করে দিয়েছ। এক্ষণে তোমাদের হাতে যা কিছু আছে, তা যদি ওদের দেওয়া বন্ধ করে দাও, তাহ’লে অবশ্যই  ওরা অন্য কোন এলাকায় চলে যাবে’।

যায়েদ বিন আরক্বাম নামক এক তরুণ গিয়ে সবকথা তার চাচাকে জানালো। চাচা গিয়ে রাসূলকে জানিয়ে দিলেন। সেখানে উপস্থিত ওমর (রাঃ) সঙ্গে সঙ্গে রাসূলকে বললেন, مُرْ عَبَّاد بن بشر فليقتله ‘আববাদ বিন বিশরকে হুকুম দিন, সে গিয়ে ওটাকে শেষ করে দিয়ে আসুক’। কিন্তু রাসূল (ছাঃ) বললেন, كيف يا عمر إذا تحدث الناس أن محمداً يقتل أصحابه؟ لا ولكن أَذِّنْ بالرحيل- ‘সেটা কেমন করে হয় হে ওমর! তখন লোকেরা বলবে যে, মুহাম্মাদ তাঁর সাথীদের হত্যা করছে। না। বরং এখন চলো রওয়ানা দাও’। অথচ তখন রওয়ানা দেওয়ার সময় নয়। এটা তিনি এজন্য করলেন, যাতে মুনাফিকরা কোনরূপ জটলা পাকানোর সুযোগ না পায় এবং পরিস্থিতি আরও খারাবের দিকে না যায়। অতঃপর দীর্ঘ একদিন একরাত একটানা চলার পর এক জায়গায় তিনি থামলেন বিশ্রামের জন্য। ক্লান্ত-শ্রান্ত সাথীগণ মাটিতে দেহ রাখতে না রাখতেই ঘুমে অচেতন হয়ে পড়ল। ফলে মুনাফিকেরা আর ষড়যন্ত্র পাকানোর সুযোগ পেল না। গৃহবিবাদ এড়ানোর জন্য দ্রুত ও দীর্ঘ ভ্রমণ ছিল রাসূল (ছাঃ)-এর একটি দূরদর্শী ও ফলপ্রসু সিদ্ধান্ত।

আরও দেখুন:  তৎকালীন আরবের অবস্থা

অতঃপর ইবনে উবাই যখন জানতে পারল যে, যায়েদ বিন আরক্বাম গিয়ে সব কথা বলে দিয়েছে, তখন সে রাসূল (ছাঃ)-এর নিকটে এসে আল্লাহর কসম করে বলল, ما قلت ما قال، ولا تكلمت به، ‘আমি ঐসব কথা বলিনি, যা সে আপনাকে বলেছে এবং উক্ত বিষয়ে কোন আলোচনা করিনি’। তার সাথী গোত্রের লোকেরা বলল, হে রাসূল! হ’তে পারে ছোট ছেলেটি ধারণা করে অনেক কথা বলেছে। অথবা সে সব কথা মনে রাখতে পারেনি যা মুরববী বলেছেন’। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাদের কথা বিশ্বাস করলেন। যায়েদ বলেন, فأصابني هَمٌّ لم يصبني مثله قط،   ‘তাদের এসব কথায় আমি এমন দুঃখ পেয়েছিলাম, যা ইতিপূর্বে কখনো পাইনি’। অতঃপর আমি মনোকষ্টে বাড়িতেই বসে রইলাম। ইতিমধ্যে সূরা মুনাফিকূন (৭-৮ আয়াত) নাযিল হ’ল। তখন রাসূল (ছাঃ) আমার নিকটে লোক পাঠিয়ে সূরাটি শুনিয়ে দিলেন এবং বললেন, إن الله قد صدقك ‘আল্লাহ তোমার কথার সত্যায়ন করেছেন’।[4]

ওদিকে মদীনার প্রবেশমুখে ইবনে উবাইয়ের ছেলে আব্দুল্লাহ যিনি অত্যন্ত সৎ এবং মর্যাদাসম্পন্ন মুমিন ও তার পিতার বিপরীতমুখী চরিত্রের মানুষ ছিলেন, তিনি উন্মুক্ত তরবারি হাতে দাঁড়িয়ে পিতাকে আটকে দিয়ে বললেন, لا تنقلب حتى تقر أنك الذليل ورسول الله صلى الله عليه وسلم العزيز- ‘আপনি এখান থেকে আর অগ্রসর হ’তে পারবেন না। যতক্ষণ না আপনি স্বীকার করবেন যে, আপনি নিকৃষ্ট ও রাসূল (ছাঃ) সম্মানিত’। অতঃপর সে এ স্বীকৃতি প্রদান করলে তার পথ ছেড়ে দেওয়া হয়।[5]

এ সময় পুত্র আব্দুল্লাহ বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! যদি আপনি তাকে হত্যা করতে চান, তবে আমাকে নির্দেশ দিন। আল্লাহর কসম! আমি আপনাকে তার মাথা এনে দিব’ (لو شئت لأتيت برأسه)।

(২) ইফকের ঘটনা (حديث الإفك) :

রাসূল (ছাঃ)-এর নিয়ম ছিল কোন যুদ্ধে যাওয়ার আগে স্ত্রীদের নামে লটারি করতেন। লটারিতে যার নাম উঠতো, তাকে সঙ্গে নিতেন। সে হিসাবে বানুল মুছত্বালিক্ব যুদ্ধে হযরত আয়েশা (রাঃ) রাসূল (ছাঃ)-এর সফরসঙ্গিনী হন। যুদ্ধ শেষে মদীনায় ফেরার পথে বিশ্রামস্থলে তার গলার স্বর্ণহারটি হারিয়ে যায়। যা তিনি তাঁর বোনের কাছ থেকে ধার হিসাবে নিয়ে এসেছিলেন। প্রকৃতির ডাকে তিনি বাইরে গিয়েছিলেন, সেখানেই হারটি পড়ে গেছে মনে করে তিনি পুনরায় সেখানে গমন করেন। ইতিমধ্যে কাফেলার যাত্রা শুরু হ’লে তাঁর হাওদা উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। দায়িত্বশীল ব্যক্তি ভেবেছিলেন, তিনি হাওদার মধ্যেই আছেন। তাছাড়া তিনি ছিলেন হালকা-পাতলা গড়নের। ফলে ঐ ব্যক্তির মনে কোনরূপ সন্দেহের উদ্রেক হয়নি যে, তিনি হাওদার মধ্যে নেই। হযরত আয়েশা (রাঃ) হার পেয়ে যান এবং দ্রুত নিজের স্থানে ফিরে এসে দেখেন যে, সব ফাঁকা (ليس به داع ولا مجيب)। তখন তিনি নিজের স্থানে শুয়ে পড়লেন এই ভেবে যে, নিশ্চয়ই তাঁর খোঁজে এখুনি লোকেরা এসে যাবে। অতঃপর তিনি ঘুমিয়ে গেলেন।

ওদিকে আরেকজন ঘুমকাতুরে (كثير النوم) লোক ছিলেন ছাফওয়ান বিন মু‘আত্ত্বাল (صفوان بن معطل)। তিনি সবশেষে জেগে উঠে ত্রস্তপদে যেতে গিয়ে হঠাৎ মা আয়েশার প্রতি নযর পড়ায় জোরে ‘ইন্না লিল্লাহ’ পাঠ করেন ও নিজের উটটি এনে তাঁর পাশে বসিয়ে দেন। আয়েশা (রাঃ) তার ‘ইন্নালিল্লাহ’ শব্দে জেগে ওঠেন ও কোন কথা না বলে উটের পিঠে হাওদায় গিয়ে বসেন। অতঃপর ছাফওয়ান উটের লাগাম ধরে হাঁটতে থাকেন। পর্দার হুকুম নাযিলের আগে তিনি আয়েশাকে দেখেছিলেন বলেই তাঁকে সহজে চিনতে পেরেছিলেন। দু’জনের মধ্যে কোন কথাই হয়নি এবং মা আয়েশাও কোন কথা শুনেননি ‘ইন্না লিল্লাহ’ শব্দ ছাড়া। দুপুরের খরতাপে যখন রাসূল (ছাঃ)-এর সেনাদল বিশ্রাম করছিল, তখনই গিয়ে মা আয়েশা (রাঃ) তাদের সঙ্গে মিলিত হ’লেন। সৎ ও সরল প্রকৃতির লোকেরা বিষয়টিকে সহজভাবে গ্রহণ করলেন। কিন্তু কুটবুদ্ধির লোকেরা এবং বিশেষ করে মুনাফিক নেতা আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই এটাকে কুৎসা রটনার একটি বিশেষ হাতিয়ার হিসাবে গ্রহণ করল। মদীনায় ফিরে এসে তারা এই সামান্য ঘটনাকে নানা রঙ চড়িয়ে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে জোটবদ্ধভাবে প্রচার করতে লাগল। তাতে দুর্বলচেতা বহু লোক তাদের ধোঁকার জালে আবদ্ধ হ’ল। এই অপবাদ ও অপপ্রচারের জবাব অহি-র মাধ্যমে পাবার আশায় আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) সম্পূর্ণ চুপ রইলেন। কিন্তু দীর্ঘ দিন অপেক্ষার পরেও কোনরূপ অহী নাযিল না হওয়ায় তিনি একদিন কয়েকজন ছাহাবীকে ডেকে পরামর্শ চাইলেন। তাতে হযরত আলী (রাঃ) ইশারা-ইঙ্গিতে তাকে পরামর্শ দিলেন আয়েশাকে তালাক দেবার জন্য। অপরপক্ষে উসামা ও অন্যান্যগণ তাঁকে রাখার এবং শত্রুদের কথায় কর্ণপাত না করার পরামর্শ দেন। এরপর তিনি আব্দুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের অব্যাহত কুৎসা রটনার মনোকষ্ট হ’তে রেহাই পাবার জন্য একদিন মিম্বরে দাঁড়িয়ে সকলের সহযোগিতা কামনা করলেন। তখন আউস গোত্রের পক্ষে উসায়েদ বিন হুযায়ের (রাঃ) তাকে হত্যা করার অভিমত ব্যক্ত করেন। একথা শুনে খাযরাজ নেতা সা‘দ বিন ওবাদাহর মধ্যে গোত্রীয় উত্তেজনা জেগে ওঠে এবং তিনি এ প্রস্তাবের ঘোর বিরোধিতা করেন। উল্লেখ্য যে, আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই ছিল খাযরাজ গোত্রের লোক। এর ফলে মসজিদে উপস্থিত উভয় গোত্রের লোকদের মধ্যে উত্তেজিত বাক্য বিনিময় শুরু হয়ে যায়। তখন আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) তাদেরকে থামিয়ে দেন।

এদিকে যুদ্ধ থেকে ফিরে আসার পর মা আয়েশা (রাঃ) অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং একটানা মাসব্যাপী পীড়িত থাকেন। বাইরের এতসব অপবাদ ও কুৎসা রটনা সম্পর্কে তিনি কিছুই জানতে পারেননি। তবে অসুস্থ অবস্থায় রাসূল (ছাঃ)-এর কাছ থেকে যে আদর-যত্ন ও সেবা-শুশ্রূষা পাওয়ার কথা ছিল, তা না পাওয়ায় তিনি মনে মনে কিছুটা অস্বস্তি বোধ করতে থাকেন। দীর্ঘ রোগভোগের পর কিছুটা সুস্থতা লাভ করে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেবার জন্য একরাতে তিনি উম্মে মিসতাহর সাথে নিকটবর্তী এক মাঠে গমন করেন। এ সময় উম্মে মিসতাহ নিজের চাদরে পা জড়িয়ে পড়ে যান এবং নিজের ছেলেকে বদ দো‘আ করেন। হযরত আয়েশা (রাঃ) এটাকে অপসন্দ করলে উম্মে মিসতাহ তাকে সব খবর বলে দেন (কেননা তার ছেলে মিসতাহ উক্ত কুৎসা রটনায় অগ্রণী ভূমিকায় ছিল)। হযরত আয়েশা ফিরে এসে রাসূল (ছাঃ)-এর নিকটে পিতৃগৃহে যাবার অনুমতি চাইলেন। অতঃপর অনুমতি পেয়ে তিনি পিতৃগৃহে চলে যান। সেখানে সব কথা জানতে পেরে তিনি কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। দুই রাত ও একদিন নির্ঘুম কাটান ও অবিরতধারে কাঁদতে থাকেন। এমতাবস্থায় রাসূল (ছাঃ) তার কাছে এসে তাশাহহুদ পাঠের পর বললেন, ‘হে আয়েশা! তোমার সম্পর্কে কিছু বাজে কথা আমার কানে এসেছে। যদি তুমি নির্দোষ হও, তবে সত্বর আল্লাহ তোমাকে দোষমুক্ত করবেন। আর যদি তুমি কোন পাপকর্মে জড়িয়ে থাক, তাহ’লে আল্লাহর নিকটে ক্ষমা প্রার্থনা কর ও তওবা কর। কেননা বান্দা যখন দোষ স্বীকার করে ও আল্লাহর নিকটে তওবা করে, তখন আল্লাহ তার তওবা কবুল করে থাকেন’।

আরও দেখুন:  রাসূল (ছাঃ) -এর দাওয়াতী কার্যক্রম

রাসূল (ছাঃ)-এর এ ভাষণ শুনে আয়েশার অশ্রু শুকিয়ে গেল। তিনি তার পিতা-মাতাকে এর জবাব দিতে বললেন। কিন্তু তাঁরা এর জবাব খুঁজে পেলেন না। তখন আয়েশা (রাঃ) বললেন, আল্লাহর কসম! যে কথা আপনারা শুনেছেন ও যা আপনাদের অন্তরকে প্রভাবিত করেছে এবং যাকে আপনারা সত্য বলে মেনে নিয়েছেন- এক্ষণে আমি যদি বলি যে, فلئن قلت لكم إني بريئة، والله يعلم أني بريئة، لا تصدقونني بذلك، ‘আমি নির্দোষ এবং আল্লাহ জানেন যে, আমি নির্দোষ’- তবুও আপনারা আমাকে বিশ্বাস করবেন না। পক্ষান্তরে আমি যদি বিষয়টি স্বীকার করে নিই, অথচ আল্লাহ জানেন যে, আমি এ ব্যাপারে নির্দোষ- তাহ’লে আপনারা সেটাকে বিশ্বাস করে নিবেন। এমতাবস্থায় আমার ও আপনার মধ্যে ঐ উদাহরণটাই প্রযোজ্য হবে যা হযরত ইউসুফের পিতা (হযরত ইয়াকূব) বলেছিলেন, فَصَبْرٌ جَمِيْلٌ وَاللهُ الْمُسْتَعَانُ عَلَى مَا تَصِفُوْنَ ‘অতএব ধৈর্য ধারণই উত্তম এবং আল্লাহর নিকটেই সাহায্য কাম্য, যেসব বিষয়ে তোমরা বলছ’ (ইউসুফ ১২/১৮)। একথাগুলো বলেই হযরত আয়েশা (রাঃ) অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে শুয়ে পড়লেন এবং ঐ সময়েই রাসূল (ছাঃ)-এর উপরে অহী নাযিল শুরু হয়ে গেল (ونزل الوحي ساعته)।

অহি-র অবতরণ শেষ হ’লে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) হাসিমুখে আয়েশাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, يا عائشة، أما الله فقد برأك ‘আল্লাহ তোমাকে অপবাদ থেকে মুক্ত ঘোষণা করেছেন’। এতে খুশী হয়ে তার মা বললেন, আয়েশা ওঠো, রাসূলের কাছে যাও’। কিন্তু আয়েশা অভিমান ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলে উঠলেন, والله لا أقوم إليه ولا أحمد إلا الله ‘না আমি তাঁর কাছে যাব না। আমি আল্লাহ ছাড়া কারু প্রশংসা করব না’। এটা ছিল নিঃসন্দেহে তার সতীত্বের তেজ এবং তার প্রতি রাসূল (ছাঃ)-এর প্রগাঢ় ভালোবাসার উপরে গভীর আস্থার বহিঃপ্রকাশ। উল্লেখ্য যে, এই সময় সূরা নূরের ১১ হ’তে ২০ পর্যন্ত ১০টি আয়াত নাযিল হয়।
এরপর মিথ্যা অপবাদের দায়ে মিসতাহ বিন আছাছাহ (مسطاح بن أثاثة) , কবি হাসসান বিন ছাবেত ও হামনা বিনতে জাহশের উপরে ৮০টি করে দোররা মারার শাস্তি কার্যকর করা হয়। কেননা ইসলামী শরী‘আতের বিধান অনুযায়ী কেউ যদি কাউকে ব্যভিচারের অপবাদ দেয়, অতঃপর তা প্রমাণে ব্যর্থ হয়, তাহ’লে মিথ্যা অপবাদের শাস্তি স্বরূপ তাকে আশি দোররা বা বেত্রাঘাতের শাস্তি প্রদান করা হয়। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে ইফকের ঘটনার মূল নায়ক (رأس أهل الإفك) মুনাফিক নেতা আব্দুল্লাহ ইবনে উবাইকে দন্ড হ’তে মুক্ত রাখা হয়। এর কারণ এটা হ’তে পারে যে, আল্লাহ পাক তাকে পরকালে কঠিন শাস্তি দানের ঘোষণা আগেই দিয়েছিলেন। অতএব এখন শাস্তি দিলে পরকালের শাস্তি হালকা হয়ে যেতে পারে। অথবা অন্য কোন মাছলাহাতের কারণে তাকে শাস্তি প্রদান করা হয়নি’।[6] কিন্তু অন্য যাদের শাস্তি দেওয়া হয়, সেটা ছিল তাদের পাপের কাফফারা স্বরূপ। এর ফলে এবং তাদের তওবার কারণে তারা পরকালের শাস্তি হ’তে আল্লাহর রহমতে বেঁচে যেতে পারেন।

ইফকের ঘটনায় কুরআন নাযিলের ফলে সমাজে শান্তির সুবাতাস প্রবাহিত হ’তে থাকে। সর্বত্র হযরত আয়েশার পবিত্রতা ঘোষিত হ’তে থাকে। অন্যদিকে আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই সর্বত্র অপমানিত ও লাঞ্ছিত হ’তে থাকে। কোন জায়গায় সে কথা বলতে গেলেই লোকেরা ধরে জোর করে বসিয়ে দিত। এই অবস্থা দেখে একদিন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) হযরত ওমরকে বললেন, হে ওমর! তোমার ধারণা কি? আল্লাহর কসম! যেদিন তুমি ওকে হত্যা করার জন্য আমার কাছে নির্দেশ চেয়েছিলে, সেদিন তাকে মারলে অনেকে নাক সিটকাতো। কিন্তু আজ যদি আমি তাকে হত্যার নির্দেশ দেই, তবে তারাই তাকে হত্যা করবে’। তখন ওমর (রাঃ) বলেন,قد والله علمت لأمر رسول الله صلى الله عليه وسلم أعظم بركة من أمري- ‘আল্লাহর কসম! আমি জেনেছি যে, আল্লাহর রাসূলের কাজ অধিক বরকতমন্ডিত আমার কোন কাজের চেয়ে’।[7]

মুনাফিকেরা বুঝেছিল যে, মুসলমানদের বিজয়ের মূল উৎস ছিল তাদের দৃঢ় ঈমান ও পাহাড়সম চারিত্রিক শক্তি। প্রতিটি খাঁটি মুসলিম ছিলেন আল্লাহর দাসত্বে ও রাসূলের প্রতি আনুগত্যে নিবেদিত প্রাণ। তাই সংখ্যায় অল্প হওয়া সত্ত্বেও শত চক্রান্ত, ষড়যন্ত্র ও যুদ্ধ সম্ভার দিয়েও তাদেরকে টলানো বা পরাজিত করা যায়নি। সেকারণ তারা নেতৃত্বের মূল কেন্দ্র রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ও তাঁর পরিবারের চরিত্র হননের মত নোংরা কাজের দিকে মনোনিবেশ করে। কিন্তু আল্লাহর মেহেরবানীতে সেখানেও তারা চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ ও পর্যুদস্ত হ’ল। অথচ ঐসব মুনাফিকদের পুচ্ছধারী বর্তমান যুগের মুসলিম নামধারী বহু কবি ও দার্শনিক ঐসব বাজে কথার ভিত্তিতে রাসূল (ছাঃ) ও তাঁর পরিবারের কুৎসা রটনা করে চলেছে। সেই সাথে ইসলামের শত্রুতায় অমুসলিমদের চাইতে এগিয়ে রয়েছে।

বানুল মুছত্বালিক্ব যুদ্ধের গুরুত্ব

যুদ্ধের বিচারে বানুল মুছত্বালিক্ব যুদ্ধ তেমন গুরুত্ববহ না হ’লেও মুনাফিকদের অপতৎপরতা সমূহ এবং তার বিপরীতে নবী ও তাঁর পরিবারের পবিত্রতা ঘোষণা এবং মুনাফিকদের মুখোশ উন্মোচন ও চরম সামাজিক পরাজয় সূচিত হওয়ার মত বিষয়গুলির কারণে গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ হিসাবে পরিগণিত হয়েছে। যার ফলে ইসলামী সমাজের মর্যাদা বৃদ্ধি হয় এবং মুসলমান নর-নারীদের মধ্যে আত্মশুদ্ধির চেতনা অধিকহারে জাগ্রত হয়। সাথে সাথে মুনাফেকীর নাপাকি থেকে সবাই দূরে থাকতে উদ্বুদ্ধ হয়।

শিক্ষণীয় বিষয় সমূহ :

১। কোন ইসলামী দলের জন্য সবচাইতে বড় ক্ষতিকর হ’ল দলের মধ্যে ঘাপটি মেরে থাকা কপট বিশ্বাসী মুনাফিকের দল। এদেরকে চিহ্নিত করা নেতৃত্বের জন্য অপরিহার্য। নইলে এরাই দলকে ডুবিয়ে দিতে পারে।

২। গুরুত্বপূর্ণ অভিযানে বা পদে মুনাফিক চরিত্রের কাউকে দায়িত্ব দেয়া যাবে না।

৩। মুনাফিকরা সর্বদা মূল নেতৃত্বকে টার্গেট করে থাকে। এমনকি তাঁর পরিবারের চরিত্র হনন করতেও তারা পিছপা হয় না। ভিত্তিহীন ও মিথ্যা প্রচারণাই তাদের প্রধান হাতিয়ার হয়ে থাকে।

৪। মুনাফিক নেতাদের শাস্তি দিলে হিতে বিপরীত ঘটার সম্ভাবনা থাকলে শাস্তি না দিয়ে অপেক্ষা করা যেতে পারে। যাতে সমাজের নিকটে তাদের মুখোশ উন্মোচিত হয়ে যায়।

৫। নারী হৌক পুরুষ হৌক সকলের ব্যাপারে সুধারণা রাখা কর্তব্য। যথার্থ প্রমাণ ব্যতীত কারু চরিত্রে কালিমা লেপন করা কিংবা অন্যায় সন্দেহ পোষণ করা নিতান্ত গর্হিত কাজ।

৬। সমাজের কোন কুপ্রথা ভাঙ্গার জন্য প্রয়োজনে ইসলামী আন্দোলনের নেতাকেই এগিয়ে আসতে হবে। এ ব্যাপারে সর্বদা আল্লাহ ভীতিকেই অগ্রাধিকার দিতে হবে।

৭। দুনিয়া পূজারী মুনাফিকরাই সর্বদা নিজেদেরকে  সম্মানিত এবং দ্বীনদার গরীবদের অসম্মানিত মনে করে থাকে। অথচ ইসলামের নিকটে মুত্তাক্বীদের সম্মান সর্বাধিক।

পরবর্তী অংশ পড়ুন: হোদায়বিয়ার ঘটনা


[1] বুখারী হা/২৫৪১; ফৎহুলবারী ৭/৩৪১-৪৩১।

[2] আবুদাঊদ হা/৩৯৩১, সনদ হাসান।

[3] বুখারী হা/৬২০৭।

[4] আল-বিদায়াহ ৪/১৫৭ পৃঃ, ইবনু ইসহাক্ব থেকে মুরসাল সুত্রে; ইবনে হিশাম ২/২৯০-৯২; তবে সংক্ষিপ্তভাবে বর্ণিত হয়েছে বুখারী হা/৪৯০৭; মুসলিম হা/২৫৮৪; আহমাদ হা/১৪৬৭৩

[5] তিরমিযী হা/৩৩১৫

[6] বুখারী হা/২৬৬১,৪১৪১; মুসলিম হা/২৭৭০, ইবনে হিশাম ২/২৯৭-৩০৭

[7] ইবনে হিশাম ২/২৯৩

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

মন্তব্য করুন

Back to top button