হযরত মুহাম্মাদ (ছাঃ)

খন্দক ও বনু কুরায়যার যুদ্ধের উল্লেখযোগ্য দিক ও শিক্ষণীয় ঘটনাবলী

পূর্বের অংশ পড়ুন: বনু কুরায়যার যুদ্ধ

১. ধূলি-ধূসরিত রাসূল : খন্দক যুদ্ধে প্রতি ১০ জনের জন্য ৪০ হাত করে পরিখা খননের দায়িত্ব ছিল। ছাহাবী বারা বিন আযেব (রাঃ) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহকে খন্দকের মাটি বহনরত অবস্থায় দেখেছি। যাতে তাঁর সারা দেহ বিশেষ করে পেটের চামড়া ধূলি-ধূসরিত হয়ে গিয়েছিল।[1]

২. রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) নিজে গান গেয়ে গেয়ে কাজ করছিলেন : বারা বিন আযেব (রাঃ) বলেন, খন্দকের মাটি বহনকালে আমি  রাসূলকে  টান দিয়ে দিয়ে আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহার কবিতার নিম্নোক্ত চয়নগুলি আবৃত্তি করতে শুনেছি-

‘হে আল্লাহ! যদি তোমার অনুগ্রহ না থাকত, তাহ’লে আমরা হেদায়াত প্রাপ্ত হ’তাম না এবং আমরা ছাদক্বাও দিতাম না, ছালাতও আদায় করতাম না’। ‘অতএব আমাদের উপরে শান্তি বর্ষণ কর এবং কাফিরদের সঙ্গে যদি আমাদের মুকাবিলা হয়, তাহ’লে আমাদের পা গুলি দৃঢ় রেখো’। ‘নিশ্চয়ই প্রথম পক্ষ আমাদের উপরে বাড়াবাড়ি করেছে। যদি তারা ফিৎনা সৃষ্টি করতে চায়, তাহ’লে আমরা তা অস্বীকার করব’।[2]

৩. গান গেয়ে প্রার্থনার সুরে উৎসাহ দিলেন রাসূল :

শীতের সকালে ক্ষুৎ-পিপাসায় কাতর খন্দক খননরত ছাহাবীদেরকে উৎসাহ দিয়ে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) প্রার্থনার সুরে গেয়ে ওঠেন, ‘হে আল্লাহ! নেই কোন আরাম-আয়েশ পরকালের আয়েশ ব্যতীত। অতএব তুমি মুহাজির ও আনছারদের ক্ষমা করে দাও’। জবাবে ছাহাবীগণ গেয়ে ওঠেন, ‘আমরা তারাই, যারা মুহাম্মাদের হাতে জিহাদের বায়‘আত গ্রহণ করেছি যতদিন আমরা বেঁচে থাকব’।[3]

৪. নেতা ও কর্মী উভয়েই ক্ষুধার্ত : হযরত জাবের (রাঃ) বলেন, খননকালে একটি বড় ও শক্ত পাথর সামনে পড়ে। যা ভাঙ্গা অসম্ভব হয়ে পড়ে। রাসূলকে বিষয়টি জানানো হ’লে তিনি এসে তাতে আঘাত করলেন, যাতে তা ভেঙ্গে চূর্ণ হয়ে স্তূপ হয়ে গেল। অথচ ঐসময় ক্ষুধার্ত রাসূলের পেটে পাথর বাঁধা ছিল। আমরাও তিনদিন যাবৎ অভুক্ত ছিলাম।[4]

৫. পরিখা খননকালে মু‘জেযা :

(ক) রাসূলের ক্ষুধার ব্যাপারটি অবগত হয়ে ছাহাবী জাবের বিন আব্দুল্লাহ একটি বকরীর বাচ্চা যবেহ করলেন এবং তাঁর স্ত্রী এক ছা‘ (আড়াই কেজি) যব পিষে আটা তৈরী করলেন। অতঃপর রান্না শেষে রাসূলকে কয়েকজন বিশিষ্ট ছাহাবী সহ গোপনে দাওয়াত দিলেন। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ঐ সময় পরিখা খননরত ১০০০ ছাহাবীর সবাইকে সাথে নিয়ে এলেন। অতঃপর সবাই তৃপ্তির সাথে খাওয়ার পরেও সাবেক পরিমাণ আটা ও গোশত অবশিষ্ট রয়ে গেল।[5]

(খ) নু‘মান ইবনু বাশীরের বোন তার পিতা ও মামার খাওয়ার জন্য একটা পাত্রে কিছু খেজুর নিয়ে এলো। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তার কাছ থেকে পাত্রটি নিয়ে খেজুরগুলি একটা কাপড়ের উপরে ছড়িয়ে দিলেন। অতঃপর পরিখা খননরত ছাহাবীদের সবাইকে দাওয়াত দিলেন। ছাহাবীগণ যতই খেতে থাকেন, ততই খেজুরের পরিমাণ বাড়তে থাকে। পূর্ণ তৃপ্তি সহকারে সকলের খাওয়ার পরেও কাপড়ের উপর ঐ পরিমাণ খেজুর অবশিষ্ট ছিল, যা প্রথমে ছিল। এমনকি কাপড়ের বাইরেও কিছু পড়ে ছিল।[6]

(গ) বারা বিন আযেব বলেন, আমাদের সামনে বড় একটা পাথর পড়ল। যাতে কোদাল মারলে ফিরে আসতে থাকে। তখন আমরা রাসূলকে বিষয়টি জানালে তিনি এসে ‘বিসমিল্লাহ’ বলে পাথরটিতে আঘাত করেন। তাতে তার একাংশ ভেঙ্গে পড়ল। তখন তিনি বলে ওঠেন- আল্লাহু আকবর, আমাকে সিরিয়ার চাবিসমূহ দান করা হয়েছে। আল্লাহর কসম! আমি এখন তাদের লাল প্রাসাদগুলো দেখতে পাচ্ছি’। অতঃপর দ্বিতীয়বার আঘাত করেন এবং বলে ওঠেন আল্লাহু আকবর। আমাকে পারস্যের সাম্রাজ্য দান করা হয়েছে। আল্লাহর কসম! আমি এখন মাদায়েনের শ্বেত প্রাসাদগুলো দেখতে পাচ্ছি। অতঃপর তৃতীয়বার ‘বিসমিল্লাহ’ বলে আঘাত করলেন এবং পাথরটির বাকী অংশ ভেঙ্গে পড়ল। তখন তিনি বলে উঠলেন, আল্লাহু আকবর! আমাকে ইয়ামন রাজ্যের চাবিসমূহ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহর কসম! আমি এখান থেকে রাজধানী ছান‘আর দরজা সমূহ প্রত্যক্ষ করছি’।[7]

৬. মুমিন ও মুনাফিকদের দ্বিবিধ প্রতিটিয়া :

খন্দক যুদ্ধে বিশাল শত্রু সেনাদল দেখে মুনাফিক ও দুর্বল চেতা ভীরু মুসলমানরা বলে ওঠে, রাসূলের দেওয়া ওয়াদা প্রতারণা বৈ কিছু নয়- এমনকি খাযরাজ গোত্রের বনু সালামারও পদস্খলন ঘটতে যাচ্ছিল। এদের সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, ‘এবং মুনাফিক ও যাদের অন্তরে ব্যাধি ছিল, তারা বলল, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল আমাদেরকে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তা প্রতারণা বৈ কিছু নয়’ (আহযাব ৩৩/১২)। ‘তাদের আরেক দল বলল, হে ইয়াছরিব বাসী! এখানে তোমাদের কোন স্থান নেই, তোমরা ফিরে চল। তাদের মধ্যে আরেক দল নবীর কাছে অব্যাহতি চেয়ে বলল, আমাদের বাড়ীঘর অরক্ষিত। অথচ সেগুলি অরক্ষিত ছিল না। মূলতঃ পালিয়ে যাওয়াই ছিল তাদের উদ্দেশ্য’ (আহযাব ৩৩/১৩)।

অপর পক্ষে মুমিনগণ এটাকে পরীক্ষা হিসাবে গ্রহণ করেন এবং তাদের ঈমান বৃদ্ধি পায়। যেমন আল্লাহর ভাষায়-

‘যখন তারা তোমাদের উপরে আপতিত হ’ল উচ্চভূমি থেকে ও নিম্নভূমি থেকে এবং যখন (ভয়ে) তোমাদের চক্ষু ছনাবড়া হয়ে গিয়েছিল ও প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়েছিল, আর তোমরা আল্লাহ সম্পর্কে নানারূপ ধারণা করতে শুরু করেছিলে (১০)’। ‘সে সময় মুমিনগণ পরীক্ষায় নিক্ষিপ্ত হয়েছিল এবং ভীষণভাবে ভীত-কম্পিত হয়েছিল’ (১১)। …‘অতঃপর যখন মুমিনরা শত্রু বাহিনীকে প্রত্যক্ষ করল, তখন তারা বলল, এতো সেটাই, যার ওয়াদা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল আমাদেরকে দিয়েছিলেন। আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সত্য বলেছেন। এমতাবস্থায় তাদের ঈমান ও আত্মসমর্পণ বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হ’ল’ (আহযাব ৩৩/১০-১১, ২২)।

আরও দেখুন:  বদর হ’তে ওহোদ

৭. মুসলিম বাহিনীর প্রতীক চিহ্ন : খন্দকের যুদ্ধে মুসলমানদের প্রতীক চিহ্ন ছিল হা-মীম। তারা সাহায্যপ্রাপ্ত হবে না’।[8] এতে প্রমাণিত হয় যে, যুদ্ধের পতাকা ছাড়াও প্রতীক চিহ্ন ব্যবহার করা যায়। যাকে আজকাল ‘ব্যাজ’ (Badge) বলা হয়।

৮. বর্শা ফেলে পালালেন কুরায়েশ সেনাপতি : যুদ্ধ ছাড়াই অবরোধে অতিষ্ঠ হয়ে এক সময় আবু জাহল পুত্র ও কুরায়েশ বাহিনীর অন্যতম দুর্ধর্ষ সেনাপতি ইকরিমা বিন আবু জাহল দু’জন সাথীকে নিয়ে দুঃসাহসে ভর করে একস্থান দিয়ে খন্দক পার হ’লেন। অমনি হযরত আলীর প্রচন্ড হামলায় তার একজন  সাথী নিহত হ’ল। এমতাবস্থায় ইকরিমা তার অন্য সাথীসহ ভয়ে পালিয়ে আসেন এবং তিনি এতই ভীত হয়ে পড়েন যে, নিজের বর্শাটাও ফেলে আসেন।

৯. ছালাত ক্বাযা হ’ল যখন : খন্দক যুদ্ধের সময় শত্রু পক্ষের বিরুদ্ধে অব্যাহত নযরদারি ও মুকাবিলার কারণে কোন কোন দিন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ও ছাহাবায়ে কেরামের ছালাত ক্বাযা হয়ে যায়। একবার আছর ও মাগরিবের ছালাত এবং একবার যোহর হ’তে এশা পর্যন্ত চার ওয়াক্ত ছালাত। এ সময় আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) মুশরিকদের বিরুদ্ধে বদদো‘আ করে বলেন, ‘আল্লাহ ওদের ঘর-বাড়ি ও কবরগুলিকে আগুন দ্বারা পূর্ণ করে দাও’।[9] উল্লেখ্য যে, তখন পর্যন্ত ছালাতুল খাওফ-এর বিধান নাযিল হয়নি। কেননা উক্ত বিধান নাযিল হয় ৬ষ্ঠ হিজরীর যিলক্বা‘দ মাসে হোদায়বিয়ার সফর কালে (নিসা ৪/১০১-১০২)।

১০. আহত সা‘দ বিন মু‘আযের প্রার্থনা :

উভয় পক্ষে তীর নিক্ষেপের এক পর্যায়ে আউস নেতা সা‘দ ইবনু মু‘আয তীর বিদ্ধ হন, যাতে তাঁর হাতের মূল শিরা কর্তিত হয়। যাতে প্রচুর রক্ত পাতের কারণে তিনি মৃত্যুর আশংকা করেন। তখন তিনি আল্লাহর নিকটে দো‘আ করেন এই মর্মে যে, হে আল্লাহ! যদি কুরায়েশদের সঙ্গে যুদ্ধ এখনো বাকী আছে বলে তুমি জানো, তাহ’লে তুমি আমাকে সে পর্যন্ত বাঁচিয়ে রাখো, যাতে আমি তোমার জন্য তাদের সাথে জিহাদ করতে পারি। ‘আর যদি যুদ্ধ শেষ হয়ে থাকে, তাহ’লে এই যখম প্রবাহিত করে দাও এবং এতেই আমার মৃত্যু ঘটিয়ে দাও’। এরপর তার মিত্র গোত্র বনু কুরায়যার বিশ্বাসঘাতকদের প্রসঙ্গে দো‘আর শেষাংশে তিনি বলেন, ‘সেই পর্যন্ত আমার মৃত্যু দিয়ো না, যে পর্যন্ত না বনু কুরায়যার ব্যাপারে আমার চক্ষু পরিতৃপ্ত হয়’।

পরবর্তীতে তাঁরই সিদ্ধান্তষমে বনু কুরায়যার ৬০০/৭০০ সাবালক ও সক্ষম পুরুষ ইহুদীকে হত্যা করা হয়। মানছূরপুরী এদের সংখ্যা ৪০০ বলেছেন। যা তিনি জাবের (রাঃ)-এর সূত্রে তিরমিযী, নাসাঈ ও ইবনে হিববানের বরাতে উল্লেখ করেছেন।[10]

১১. ভীতু পুরুষ ও সাহসী মহিলা :

খন্দকের যুদ্ধকালে মদীনার ফারে‘ নামক দুর্গে রাসূলের সভাকবি ও খ্যাতনামা ছাহাবী হাসসান বিন ছাবেতের তত্ত্বাবধানে মুসলিম মহিলা ও শিশুগণ অবস্থান করছিলেন। একদিন সেখানে চুক্তি ভঙ্গকারী বনু কুরায়যার জনৈক ইহুদীকে ঘোরাফিরা করতে দেখে রাসূলের ফুফু ছাফিয়া বিনতে আব্দুল মুত্ত্বালিব রক্ষীপ্রধান ছাহাবী হাসসানকে বলেন, আমাদের তত্ত্বাবধানে এখানে যে কোন সেনাদল নেই, সেকথা এই গুপ্তচর গিয়ে এখুনি তার গোত্রকে জানিয়ে দেবে। এই সুযোগে তারা আমাদের উপরে হামলা করতে পারে। এ সময় রাসূলের পক্ষে যুদ্ধের ময়দান ছেড়ে কাউকে পাঠানোও সম্ভব নয়। অতএব আপনি এক্ষুনি গিয়ে ঐ গুপ্তচরটিকে শেষ করে আসুন। জবাবে হাসসান বলেন, ‘আল্লাহর কসম! আপনি তো জানেন যে, আমি একাজের লোক নই’। তার একথা শুনে কালবিলম্ব না করে হযরত ছাফিয়া কোমর বেঁধে নিয়ে তাঁবুর একটা খুঁটি হাতে নিয়ে বের হয়ে যান এবং ইহুদীটির কাছে গিয়ে ভীষণ জোরে আঘাত করে তাকে শেষ করে দেন এবং হাসসানকে এসে বলেন, আপনি গিয়ে তার অস্ত্রশস্ত্র ও সরঞ্জামাদি খুলে নিয়ে আসুন। সে পুরুষ লোক বিধায় আমি তার গায়ে হাত দেইনি’। হাসসান বলেন, ‘তার সরঞ্জামের আমার কোন প্রয়োজন নেই’।[11] যাহাবী বলেন, রাবী ওরওয়অ বিন যুবায়ের (রাঃ) তাঁর দাদী ছাফিয়াহর সাক্ষাৎ পাননি’। তবে ঘটনাটি যে ছিল খুবই প্রসিদ্ধ এবং ছাফিয়াহ যে ছিলেন ইসলামের প্রথম মহিলা, যিনি একজন পুরুষকে হত্যা করেন, সেটা হাদীছের বর্ণনায় বুঝা যায়। উল্লেখ্য যে, ঐসময় তাসসানের বয়স ছিল ৭১ থেকে ৭৫-এর মধ্যে। সুহায়লী প্রমুখী জীবনীকারগণ উক্ত ঘটনায় হাসসানের ভূমিকা স্বীকার করেননি। তবে যুরক্বানী বলেন যে, ইবনু ইসহাকের উপরোক্ত বর্ণনা ছাড়াও অন্য বর্ণনা অবিচ্ছিন্ন সূত্রে ও ‘হাসান’ সনদে বর্ণিত হয়েছে, যা অত্র সনদকে শক্তিশালী করে।[12]

এই বীরমাতা হ’লেন রাসূলের আপন ফুফু এবং যুবায়ের ইবনুল আওয়ামের মা ও মহাবীর আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়ের (রাঃ)-এর দাদী। তিনি সাইয়িদুশ শুহাদা আল্লাহর সিংহ হযরত হামযাহ বিন আব্দুল মুত্ত্বালিবের আপন বোন। এতে প্রমাণিত হয় যে, ইসলামে মহিলাদের আত্মরক্ষার জন্য যেকোন প্রশিক্ষণ গ্রহণের অধিকার রয়েছে। একইভাবে রয়েছে জাতীয় সম্মান রক্ষায় তাদের অবদানের সুযোগ। তবে এসব ক্ষেত্রে পুরুষদের প্রথমে সুযোগ দিতে হবে।

আরও দেখুন:  রাসূল (ছাঃ) -কে হত্যার ষড়যন্ত্র এবং মদীনায় হিজরত

১২. যুদ্ধ হ’ল কুটকৌশলের নাম :

বনু কুরায়যার চুক্তিভঙ্গে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত রাসূলকে সান্ত্বনা দেবার জন্য এলাহী ব্যবস্থা স্বরূপ আবির্ভূত হন শত্রুপক্ষের জনৈক ব্যক্তি বনু গাত্বফানের নু‘আইম বিন মাসঊদ আশজাঈ। তিনি এসে ইসলাম কবুল করেন ও রাসূলের নিকটে যুদ্ধের জন্য নির্দেশ কামনা করেন। তখন রাসূল (ছাঃ) তাকে বনু কুরায়যা ও কুরায়েশ বাহিনীর মধ্যকার সহযোগিতা চুক্তি বিনষ্ট করার জন্য কৌশলের আশ্রয় নেবার নির্দেশ দিয়ে বলেন, ‘তুমি তোমার সাধ্যমত আমাদের পক্ষে তাদের মনোবল বিনষ্ট করে দাও। কেননা যুদ্ধ হ’ল কৌশলের নাম’।

১৩. সংকটকালের প্রার্থনা :

নু‘আইম ইবনে মাসঊদের সুন্দর কুটনীতির ফলে বনু কুরায়যা ও কুরায়েশ নেতৃবৃন্দের মধ্যে বিভেদ ও ভাঙ্গন সৃষ্টি হয় এবং উভয় দলের সাহস ও মনোবল ভেঙ্গে পড়ে। এ সময় মুসলমানগণ আল্লাহর নিকটে আকুলভাবে নিম্নোক্ত প্রার্থনা করেন, ‘হে আল্লাহ! তুমি আমাদের দোষ-ত্রুটি ঢেকে রাখো এবং আমাদের ভীতিসমূহ দূরীভূত কর’। এ সময় রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) সম্মিলিত শত্রু সেনাদলের বিরুদ্ধে নিম্নোক্ত প্রার্থনা করেন, ‘হে আল্লাহ! হে কিতাব অবতীর্ণকারী, দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী, সম্মিলিত সেনাদলকে পরাভূত কর। হে আল্লাহ, তুমি তাদের পরাজিত কর ও ভীত-কম্পিত কর’।[13]

১৪. আল্লাহর অদৃশ্য বাহিনী প্রেরণ :

নবী ও মুমিনদের দো‘আ আল্লাহ কবুল করেন এবং কাফেরদের ঐক্যে ফাটল সৃষ্টি করেন ও মনোবল ভেঙ্গে দেন। অতঃপর তাদের উপরে উত্তপ্ত বায়ুর ঝাঞ্চাবাত প্রেরণ করেন। যা তাদেরকে ময়দান থেকে উৎখাত করে দেয়। সেই সাথে ফেরেশতা বাহিনী প্রেরণ করেন, যারা তাদেরকে কম্পবান করে ফেলে ও তাদের অন্তরে ত্রাসের সঞ্চার করে। যেমন আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহের কথা স্মরণ কর, যখন শত্রুবাহিনী তোমাদের উপরে আপতিত হয়েছিল। অতঃপর আমরা তাদের বিরুদ্ধে ঝঞ্চাবায়ু এবং এমন এক সেনাবাহিনী প্রেরণ করি, যাদেরকে তোমরা দেখোনি। আল্লাহ তোমাদের সব কাজকর্ম দেখে থাকেন’ (আহযাব ৩৩/৯)।

১৫. যুগান্তকারী যুদ্ধ :

খন্দক যুদ্ধে ক্ষয়ক্ষতি তেমন না হ’লেও এটি ছিল একটি যুগান্তকারী যুদ্ধ। কেননা আরবদের সম্মিলিত বাহিনীর এই ন্যাক্কারজনক পরাজয় ছিল মদীনার মুসলিম শক্তিকে সমগ্র আরবে এক অনন্য ও অপ্রতিরোধ্য শক্তি হিসাবে স্বীকৃতি দানের শামিল। এতবড় বিশাল বাহিনী সংগ্রহ করা আরবদের পক্ষে আর কখনো সম্ভব হয়নি। সেদিকে ইঙ্গিত করেই শত্রুদের উৎখাতের পর রাসূল (ছাঃ) বলেছিলেন, ‘এখন থেকে আমরা ওদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব, ওরা আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে না। আমরাই ওদের দিকে সৈন্য পরিচালনা করব’।[14]

১৬. আবু লুবাবাহর তওবা :

অবরুদ্ধ বনু কুরায়যা গোত্র আত্মসমর্পণের পূর্বে পরামর্শের উদ্দেশ্যে ছাহাবী আবু লুবাবাহকে তাদের নিকটে প্রেরণের জন্য রাসূলের নিকটে প্রস্তাব পাঠালো। কেননা আবু লুবাবার বাগ-বাগিচা, সন্তান-সন্ততি এবং গোত্রীয় লোকেরা ঐ অঞ্চলের বাশিন্দা হওয়ায় তাঁর সাথে তারা মৈত্রীবন্ধনে আবদ্ধ ছিল। অতঃপর আবু লুবাবাহ সেখানে উপস্থিত হ’লে পুরুষেরা ব্যাকুল হয়ে ছুটে এল। নারী ও শিশুরা করুণ কণ্ঠে ষন্দন করতে লাগল। এতে তার মধ্যে ভাবাবেগের সৃষ্টি হ’ল। অতঃপর ইহুদীরা বলল, হে আবু লুবাবাহ! আপনি কি যুক্তিযুক্ত মনে করছেন যে, বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য আমরা মুহাম্মাদের নিকটে অস্ত্র সমর্পণ করি’। আবু লুবাবাহ বললেন, হ্যাঁ। বলেই তিনি নিজের কণ্ঠনালীর দিকে ইঙ্গিত করলেন। যার অর্থ ছিল ‘হত্যা’। কিন্তু এতে তিনি উপলব্ধি করলেন যে, একাজটি খেয়ানত হ’ল। তিনি ফিরে এসে রাসূলের কাছে না গিয়ে সরাসরি মসজিদে নববীতে গিয়ে খুঁটির সাথে নিজেকে বেঁধে ফেলেন ও শপথ করেন যে, রাসূল (ছাঃ) নিজ হাতে তার বন্ধন না খোলা পর্যন্ত নিজেকে মুক্ত করবেন না এবং আগামীতে কখনো বনু কুরায়যার মাটিতে পা দেবেন না’। ওদিকে তার বিলম্বের কারণ সন্ধান করে রাসূল (ছাঃ) যখন প্রকৃত বিষয় জানতে পারলেন, তখন তিনি বললেন, যদি সে আমার কাছে আসত, তাহ’লে আমি তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতাম। কিন্তু যেহেতু সে নিজেই একাজ করে বসেছে, সেহেতু আল্লাহ তার তওবা কবুল না করা পর্যন্ত আমি তাকে বন্ধনমুক্ত করতে পারব না’।

আবু লুবাবাহ এভাবে ছয় রাত্রি পর্যন্ত খুঁটির সাথে বাঁধা থাকেন। ছালাতের সময় তার স্ত্রী এসে বাঁধন খুলে দিতেন। পরে আবার নিজেকে বেঁধে নিতেন। এই সময় একদিন প্রত্যুষে তার তওবা কবুল হওয়া সম্পর্কে রাসূলের উপরে অহী নাযিল হয়। তিনি তখন উম্মে সালামাহর ঘরে অবস্থান করছিলেন। আবু লুবাবাহ বলেন, এ সময় উম্মে সালামা নিজ কক্ষের দরজায় দাঁড়িয়ে আমাকে ডাক দিয়ে বললেন, ‘হে আবু লুবাবাহ সুসংবাদ গ্রহণ করো! আল্লাহ তোমার তওবা কবুল করেছেন’। একথা শুনে ছাহাবীগণ ছুটে এসে আমার বাঁধন খুলতে চাইল। কিন্তু আমি অস্বীকার করি। পরে ফজর ছালাতের জন্য বের হয়ে রাসূল (ছাঃ) এসে আমার বাঁধন খুলে দেন।[15]

১৭. ইহুদীপুত্র ছাহাবী হ’লেন যারা :

হযরত ছাবেত বিন ক্বায়েস-এর সুফারিশে আব্দুর রহমান বিন যুবায়ের এবং উম্মুল মুনযির সালমা বিন ক্বায়েস-এর সুফারিশে রিফা‘আহ বিন সামওয়াল নামক দু’জন ইহুদীপুত্র হত্যাকান্ড থেকে বেঁচে যান ও তারা ইসলাম কবুল করে ছাহাবী হন।

আরও দেখুন:  রাসূল (ছাঃ)-কে হত্যা প্রচেষ্টা সমূহ

১৮. শাস্তি থেকে বাঁচলো যারা :

বনু কুরায়যার আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানের পূর্বেই তাদের কিছু সংখ্যক লোক ইসলাম কবুল করেছিল। কেউ কেউ দুর্গ থেকে বেরিয়েও এসেছিল। তাদের জীবন ও সম্পদ নিরাপদ থাকে। এতদ্ব্যতীত ‘আতিয়া কুরাযীর নাভির নিম্নদেশের লোম না গজানোর কারণে তিনি বেঁচে যান ও পরে ছাহাবী হবার সৌভাগ্য লাভ করেন।

১৯. ইহুদী মহিলার হাতে শহীদ হ’লেন যিনি :

অবরোধকালে বনু কুরায়যার জনৈকা মহিলা যাঁতার পাট নিক্ষেপ করে ছাহাবী খাল্লাদ বিন সুওয়াইদকে হত্যা করে। এর বিনিময়ে পরে উক্ত মহিলাকে হত্যা করা হয়। উল্লেখ্য যে, খাল্লাদ ছিলেন এই যুদ্ধে একমাত্র শহীদ।

২০. ইহুদী মহিলা রাসূলের স্ত্রী হ’লেন :

বনু কুরায়যার মহিলাদের মধ্য হ’তে রায়হানা বিনতে আমর ইবনে খানাক্বাহকে রাসূল (ছাঃ) নিজের জন্য মনোনীত করেন। কালবীর বর্ণনা মতে ৬ষ্ঠ হিজরীতে তাকে মুক্তি দিয়ে রাসূল (ছাঃ) তার সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। বিদায় হজ্জ পালন শেষে রাসূল (ছাঃ) যখন মদীনায় ফিরে আসেন, তখন তাঁর মৃত্যু হয় এবং রাসূল (ছাঃ) তাকে বাকী‘ গোরস্থানে দাফন করেন।[16]

২১. ‘তোমরা তোমাদের (অসুস্থ) নেতাকে এগিয়ে আনো’ বন্দী বনু কুরায়যা ইহুদীদের মিত্র আউস গোত্রের নেতারা রাসূলের নিকটে বারবার অনুরোধ করতে লাগল যেন তাদের প্রতি বনু কায়নুকার ইহুদীদের ন্যায় আচরণ করা হয়। অর্থাৎ সবকিছু নিয়ে মদীনা থেকে জীবিত বের করে দেওয়া হয়। বনু কায়নুকা ছিল খাযরাজ গোত্রের মিত্র। তখন রাসূল (ছাঃ) বললেন, তোমরা কি এতে সন্তুষ্ট নও যে, তোমাদেরই এক ব্যক্তি এ বিষয়ে ফায়ছালা করুন। তারা রাযী হ’ল। তখন তিনি আউস গোত্রের নেতা সা‘দ বিন মু‘আযের উপরে এর দায়িত্ব দিলে তারা খুব খুশী হ’ল। অতঃপর সা‘দ বিন মু‘আযকে মদীনা থেকে গাধার পিঠে বসিয়ে সেখানে আনা হ’ল। তিনি খন্দকের যুদ্ধে আহত হয়ে শয্যাশায়ী ছিলেন। সেকারণ তিনি বনু কুরায়যার যুদ্ধে আসতে পারেননি। সা‘দ কাছে এসে পৌঁছলে রাসূল (ছাঃ) সবাইকে বললেন, ‘তোমাদের (অসুস্থ) নেতাকে এগিয়ে আনো’। অতঃপর তাঁকে গাধার  পিঠ থেকে নামিয়ে আনা হ’ল। যখন তাকে গাধার পিঠ থেকে নামিয়ে আনা হ’ল তখন রাসূল (ছাঃ) তাকে বললেন, হে সা‘দ! ‘ঐসব লোকেরা তোমার ফায়ছালার উপরে নিজেদেরকে সমর্পণ করেছে’।[17] সা‘দ বললেন, ‘আমার ফায়ছালা কি তাদের উপরে প্রযোজ্য হবে? রাসূল বললেন, হাঁ। অতঃপর তিনি ফায়ছালা দেন এই মর্মে যে, এদের পুরুষদের হত্যা করা হবে, নারী ও শিশুদের বন্দী করা হবে এবং মাল-সম্পদ সব বন্টিত হবে’।[18] এ ফায়ছালা শুনে রাসূল (ছাঃ) বলে ওঠেন, ‘তুমি সাত আসমানের উপর থেকে আল্লাহর ফায়ছালা অনুযায়ী ফায়ছালা করেছ’।[19] এই ফায়ছালা যে কত বাস্তব সম্মত ছিল, তা পরে প্রমাণিত হয়। মদীনা থেকে মুসলমানদের নিশ্চিহ্ন করার জন্য তারা গোপনে তাদের দুর্গে ১৫০০ তরবারি, ২০০০ বর্শা, ৩০০ বর্ম, ৫০০ ঢাল মওজুদ করেছিল। যার সবটাই মুসলমানদের হস্তগত হয়।

অতঃপর উক্ত বিষয়ে সূরা আনফালের ৫৫-৫৭ এবং সূরা আহযাবের ২৬ ও ২৭ আয়াত নাযিল হয়। দুর্ভাগ্য একদল বিদ‘আতী লোক বাক্যটিকে মীলাদের মজলিসে রাসূলের রূহের আগমন কল্পনা করে তাঁর সম্মানে উঠে দাঁড়িয়ে ক্বিয়াম করার পক্ষে দলীল হিসাবে পেশ করে থাকে।

২২. যাঁর মৃত্যুতে আরশ কেঁপে ওঠে :

বনু কুরায়যার ব্যাপারে ফায়ছালা শেষে আহত নেতা সা‘দ বিন মু‘আযের যখম বিদীর্ণ হয়ে যায়। তখন তিনি মসজিদে নববীতে অবস্থান করছিলেন। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তার জন্য মসজিদেই চিকিৎসা শিবির স্থাপন করেন। অতঃপর ক্ষত স্থান দিয়ে রক্তস্রোত প্রবাহিত হওয়া অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন এবং এভাবে খন্দক যুদ্ধকালে করা তাঁর পূর্বেকার শাহাদাত নছীব হওয়ার দো‘আ কবুল হয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘সা‘দের মৃত্যুতে আল্লাহর আরশ কেঁপে ওঠে’।[20] ফেরেশতাগণ তার লাশ উত্তোলন করে কবরে নিয়ে যান।[21]

২৩. খন্দক যুদ্ধের বিষয়ে কুরআন :

খন্দকের যুদ্ধ ও বনু কুরায়যার যুদ্ধ সম্পর্কে আল্লাহ পাক সূরা আহযাবে অনেকগুলি আয়াত নাযিল করেছেন। যাতে এই দুই যুদ্ধের বহু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে।

পরবর্তী অংশ পড়ুন: বানুল মুছত্বালিক্ব অথবা মুরাইসী‘ যুদ্ধ


[1] বুখারী হা/৪১০৪।

[2] বুখারী হা/২৮৩৭।

[3] বুখারী হা/৪০৯৮-৯৯।

[4] বুখারী হা/৪১০১।

[5] বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/৫৮৭৭ ‘ফাযায়েল ও মাসায়েল’ অধ্যায়-২৯, মু‘জেযা অনুচ্ছেদ-৭।

[6] ইবনে হিশাম ২/২১৮।

[7] নাসাঈ হা/৩১৭৬, হাদীছ হাসান।

[8] আহমাদ, নাসাঈ, হাকেম, ছহীহুল জামে‘ হা/২৩০৮; মিশকাত হা/৩৯৪৮ ‘জিহাদ’ অধ্যায় ৪ অনুচ্ছেদ।

[9] বুখারী হা/৪১১১, ৪১১২; মিশকাত হা/৬৩৩।

[10] তিরমিযী হা/১৫৮২; আহমাদ হা/১৪৮১৫।

[11] সীরাতে ইবনে হিশাম ২/২২৮; হাকেম ৪/৫১ সনদ মুরসাল।

[12] দ্রঃ ইবনু হিশাম, টীকা ২/২২৮ পৃঃ।

[13] বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/২৪২৬।

[14] বুখারী, মিশকাত হা/৫৮৭৯।

[15] আল-বিদায়াহ ৪/১১৯ সনদ মুরসাল।

[16] আল-বিদায়াহ ৪/১২৬ সনদ মুরসাল।

[17] বুখারী হা/৩৫২০।

[18] মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/৩৯৬৩, ৪৬৯৫।

[19] হাকেম, সিলসিলা ছহীহাহ হা/২৭৪৫।

[20] বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/৬১৯৮।

[21] তিরমিযী, মিশকাত হা/৬২২৮।

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

মন্তব্য করুন

Back to top button