সৌদি আরব সম্পর্কে শায়খ আহমাদুল্লাহ’র সাক্ষাৎকার

শায়খ আহমাদুল্লাহ – সৌদি আরবে অবস্থানকারী একজন বাঙালি আলেম। বিশ্ববিখ্যাত একজন দাঈ। ৫৬ হাজার বর্গমাইলের সীমান পেরিয়ে যে কজন বাঙালি আলেমের বিশ্বময় পরিচিতি ঘটেছে, শায়খ আহমাদুল্লাহ তাঁদের অন্যতম। বর্তমানে তিনি সৌদি আরবের পশ্চিম দাম্মাম ইসলামি সেন্টারের সম্মানিত দাঈ হিসেবে কর্মরত আছেন। বিখ্যাত ইসলামিক চ্যানেল পিস টিভির একজন নিয়মিত আলোচক শায়খ আহমাদুল্লাহ বিন দেলোয়ার হুসাইন। লেখালেখি, সভা-সেমিনারে লেকচার প্রদান করা, নানামুখি দাওয়াতি কার্যক্রম পরিচালনা করা, উম্মুক্ত ইসলামি প্রোগ্রাম ও ইসলামি প্রশ্নোত্তরমূলক অনুষ্ঠানে অংশ গ্রহণ করা এবং টিভি অনুষ্ঠানে সময় দেওয়াসহ বহুমুখি সেবামুলক কাজে জড়িত রয়েছেন গুণী এই আলেমেদ্বীন। কর্মব্যস্ত জীবনের ফাঁকে সুদুর প্রবাসে অবস্থান করেও প্রিয়.কমকে সময় দিয়েছেন তিনি। সৌদি আরবে বাংলাদেশিদের অবস্থান ও অবস্থা, সেখানকার ইসলাম ও মুসলিমদের নানাবিদ কথকতা এবং বিশ্বব্যাপি ইসলামের অগ্রযাত্রাসহ নানা বিষয় নিয়ে দীর্ঘ সময় কথা হয় তার সাথে। প্রযুক্তির পিঠে ভর করে গুণী এই আলেমের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন প্রিয়.কম প্রিয় ইসলামের এডিটর ইনচার্জ মাওলানা মিরাজ রহমান
প্রিয়.কম : সৌদি আরবে আপনার র্বতমান র্কাযক্রম সম্পর্কে জানতে চাই ।
শায়খ আহমাদুল্লাহ : সৌদি আরবে আমি পশ্চিম দাম্মাম ইসলামি সেন্টারে বাংলা ভাষার দায়ী হিসেবে কর্মরত আছি। এখানে প্রবাসী বাংলাদেশিদের ইসলামি সেবা দান করা আমার কাজ। যেমন, কোনো বিশেষ বিষয়ে নিয়মিত আলোচনা, প্রশিক্ষণ, উম্মুক্ত ইসলামি প্রোগ্রাম ও ইসলামি প্রশ্নোত্তর এবং বিষয়ভিত্তিক বই-পুস্তক ও লিফলেট ইত্যাদি অনুবাদ ও বিতরণ ব্যবস্থাপনা।
প্রিয়.কম : সেখানে প্রথমবার কী উদ্দেশ্যে গিয়েছিলেন ?
শায়খ আহমাদুল্লাহ : সৌদিতে আমি প্রথমবার ইসলামি সেন্টারের চাকুরিতে যোগদানের জন্যেই গিয়েছি।
প্রিয়.কম : আপনার লেখাপড়া কি সৌদিতেই হয়েছে, নাকি বাংলাদেশে? কোথায় কী কী পড়েছেন ?
শায়খ আহমাদুল্লাহ : আমি সৌদিতে লেখাপড়া করিনি। বাংলাদেশেই পড়েছি। হাতেখড়ি নিজ গ্রাম লক্ষ্মীপুরের বশিকপুর গ্রামে, এরপর প্রাথমিক পড়াশোনা হাতিয়ার ঐতিহ্যবাহী ফয়জুল উলুম মাদরাসা থেকে গ্রহণ করি। মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা হাটহাজারী মাদরাসা থেকে আর যশোরের প্রাচীন দীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দড়াটানা মাদরাসা থেকে দাওরায়ে হাদিস শেষ করি। সবশেষে খুলনা দারুল উলুম থেকে ইফতা কোর্স কমপ্লিট করি।
প্রিয়.কম : সৌদিতে এখন কী পরিমাণ বাংলাদেশি বাস করছেন এবং তাদের দীনি পরস্থিতি কেমন ?
শায়খ আহমাদুল্লাহ : আশ্চর্য হলেও সত্য, সৌদি আরবে প্রবাসী বাংলাদেশিদের প্রকৃত সংখ্যা কেউই বলতে পারেন না। তবে যে কয়টি সূত্রে এ বিষয়ে তথ্য পাওয়া যায়, তার কোনোটিতেই ২০ লাখের কম উল্লেখ নেই। বাস্তব সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি। দুঃখের বিষয়, সৌদি আরবে দীন পালনের সকল সুযোগ-সুবিধা বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও এই বিপুল সংখ্যক প্রবাসীদের বেশিরভাগ দীনি বিষয়ে অত্যন্ত উদাসীন। যেমন, আইন অনুযায়ী নামাজের সময় সকল অফিস আদালত ও দোকান-পাঠ বন্ধ থাকলেও অনেক বাংলাদেশিকে নামাজের সময় রাস্তায় দাঁড়িয়ে আড্ডায় মশগুল থাকতে দেখা যায়। অবশ্য হারামাইনের দেশের দীনি পরিবেশ পেয়ে নিজেকে বদলানোর লোকের সংখ্যাও কম নয়।
প্রিয়.কম : সৌদিতে যেসব বাংলাদেশি র্দীঘদিন বসবাস করছেন, তারা তাদরে সন্তানদের সাধারণত কোনো মাধ্যমে পড়ালেখা করান এবং এ ক্ষেত্রে তাদের সুবিধা-অসুবিধাগুলো কী কী?
শায়খ আহমাদুল্লাহ : প্রবাসীদের যারা পরিবারসহ থাকেন, তাদের সন্তানদের শিক্ষাদান একটি বিরাট সমস্যা। সৌদির সাধারণ স্কুলগুলোয় ভাষাগত প্রতিবন্ধকতা এবং নানাবিধ কারণে সন্তানদের পড়ানো সম্ভব হয় না। বাংলাদেশ অ্যাম্বাসির তত্ত্বাবধানে প্রধান প্রধান শহরগুলোতে কিছু বাংলাদেশি স্কুল রয়েছে। এসব স্কুলই প্রবাসীদের একমাত্র ভরসা। তবে এক্ষেত্রেও বেশ কিছু বিপত্তি রয়েছে। যেমন, অনেকগুলো শহরের জন্য একটি বা দুটি স্কুল থাকে; যা ছোট ছোট শহর থেকে অনেক দূরে অবস্থিত। সেক্ষেত্রে প্রতিদিন শিশুদের আসা-যাওয়া একটি কঠিন ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। আর এসব স্কুলের বেশিরভাগ ইংলিশ মিডিয়াম বা ব্রিটিশ কারিকুলামের। সেক্ষেত্রে ছাত্ররা বাংলা ভাষায় অত্যন্ত দুর্বল থেকে যায়। তাছাড়া কোনো কারণে প্রবাসীকে দেশে ফিরে যেতে হলে সন্তানকে দেশের কারিকুলামের সাথে খাপ খাওয়ানো অসম্ভবপ্রায় হয়ে যায়।
প্রিয়.কম : বাংলাদেশ থেকে যারা সেখানে পড়তে যেতে চায়, তাদের সম্ভাবনা কতটুকু এবং সমস্যাগুলো কী?
শায়খ আহমাদুল্লাহ : সৌদিতে উচ্চ শিক্ষা, বিশেষ করে দীনি বিষয়ে সুযোগ অনেক। বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা যে-কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠান কিংবা সংশ্লিষ্ট সৌদি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান থেকে মাধ্যমিক-উচ্চমাধ্যমিক পাশ করলেই এ সুযোগ গ্রহণ করতে পারে। সবগুলো বিশ্ববিদ্যালয়েই স্কলারশিপের ব্যবস্থা রয়েছে। অনলাইনে দরখাস্ত করতে হয়। এক্ষেত্রে সব বিশ্ববিদ্যালয়েরই নিজস্ব কিছু রিকোয়্যারমেন্ট আছে, সেগুলো পরিপূর্ণ করতে হয়। প্রতিষ্ঠিত ও পুরাতন বিশ্ববিদ্যালয়ে (যেমন মদিনা ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় ও রিয়াদের আল-ইমাম বিশ্ববিদ্যালয়) ভর্তি প্রতিযোগিতা অনেক বেশি থাকায় চান্স পাওয়া একটু কঠিন। তবে নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি অত্যন্ত সহজ।
প্রিয়.কম : আমরা জানি, সৌদি একটি ইসলামি দেশ, সেখানে নামাজের সময় কাজর্কম বন্ধ রাখতে হয়, সঠিক মুসলিম হিসেবে গড়ে ওঠার বহু ধরনের র্কাযক্রম রয়েছে সেখানে, তারপরও একজন শ্রমিক দেশে ফিরে আসার পরে দেখা যায়, সে আগের মতোই ইবাদতে অলস, এর কারণ কী?
শায়খ আহমাদুল্লাহ : এর প্রধাণ কারণ হচ্ছে, জীবনের শুরু হতে দীনি চেতনাশূন্য থাকা এবং অর্থলিপ্সা। আগে থেকেই দীনি বিষয়ে আগ্রহ না থাকায় বেশিরভাগ লোক এখানকার দীনি পরিবেশের সুবিধা ভোগের চেষ্টা করেন না। আর সৌদিতে এসে প্রায় প্রতিটি বাংলাদেশি নিজের আশার চেয়ে বহুগুণ বেশি উপার্জন করলেও চাহিদা কখনোই কমে না। তাছাড়া দেশে থাকা আত্মীয় স্বজনের চাহিদাও থাকে অনেক। এজন্য অনেক প্রবাসী মনে করেন, এখানে রোজগার করতে এসেছি, এর বাইরে আর কোনো কিছু গায়ে মাখাতে চাই না। দীন সম্পর্কে উদাসীন এসব প্রবাসীদের দীনি দিক্ষাদান করা আমার মতো ইসলামি সেন্টারের দায়ীগণের দায়িত্ব। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ইসলামি সেন্টারগুলো প্রবাসীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য দীনি চেতনা সৃষ্টি করতে পারলেও সামগ্রিকভাবে দীনি স্রোত তৈরিতে সফল বলা যায় না। সমাজের সাধারণ ধারাকে আমরা পরিবর্তন করতে পারিনি।
প্রিয়.কম : এখন সৌদি যে যুদ্ধের সঙ্গে জড়িয়েছে, তাতে সেখানকার আলেমদের ভূমিকা কেমন?
শায়খ আহমাদুল্লাহ : সৌদি আরব একটি ইসলামি দেশ। এদেশের সংবিধান সরাসরি কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে পরিচালিত হয়। আইন প্রণয়ন ও সকল আদালতগুলোতে এখনো বিচারকার্য পরিচালনা করেন স্থানীয় শীর্ষস্থানীয় ওলামায়ে কেরাম। আর ইসলামি সরকারের নির্দেশ মান্য করা কুরআনের নির্দেশ। তাই সরাসরি কুরআন-সুন্নাহ বিরোধী কিছু না থাকলে সরকারের সাধারণ কর্মকাণ্ডের প্রতি সমর্থন থাকে স্থানীয় ওলামায়ে কেরামের। সে হিসেবে ইয়েমেন ও সিরিয়ায় অত্যাচারী শিয়া সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের পরিচালিত যুদ্ধের প্রতি স্থানীয় ওলামাদের পূর্ণ সমর্থন রয়েছে। কারণ শিয়াদের কোনো কোনো গোষ্ঠী ইতিপূর্বে ঘোষণা দিয়েছে যে, তাদের টার্গেট হারামাইন দখল করে কারবালার মাটি ফেলে সেটাকে পবিত্র করা। সে লক্ষেই তারা ইয়েমেন দখল করেছে। তাই তাদের থামানোর কোনো বিকল্প নেই বলেই তারা মনে করেন।
প্রিয়.কম : এই যুদ্ধের ফলে সেখানে বসবাসরত মানুষ, বিশেষ করে বাইরের দেশেরে শ্রমিকরা কোনো কারণে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে কি না?
শায়খ আহমাদুল্লাহ : সৌদি আরবের ভেতরে দৈনন্দিন জীবন যাপনে যুদ্ধের তেমন কোনো প্রভাব পড়েনি। তাই প্রবাসীরাও উল্লেখযোগ্য কোন ক্ষতির সম্মুখিন হয়নি। তবে ইয়েমেন সীমান্তবর্তী লোকদের কেউ কেউ সামান্য ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। তাদের মধ্যে প্রবাসীদেরও দু-একজন ছিলেন। তাদের সংখ্যা খুবই নগণ্য।
প্রিয়.কম : বাংলাদেশে আপনারা যারা সেখানে বসবাস করেন, তাদের চিন্তাধারা কী এই যুদ্ধ স¤র্পকে?
শায়খ আহমাদুল্লাহ : এখানে বসবাসরত প্রবাসীরা মূলত সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে খুব কমই ভাবে। তারা নিজেদের দেশের রাজনীতি নিয়ে সব সময় ব্যস্ত থাকে। অবশ্য বেশিরভাগ অভিজ্ঞ প্রবাসীরা অভ্যন্তরীণ স্বার্থরক্ষা ও নিরাপত্তার ব্যপারে সৌদি সরকারের ওপর পূর্ণ আস্থা রাখেন।
প্রিয়.কম : সৌদি আরবে ভিনদেশি কাউকে স্থায়ীভাবে থেকে যাওয়ার অনুমতি দেয়া হয় না, যেমনটা ইউরোপ-আমরেকিায় হচ্ছে। এর কারণ কী ?
শায়খ আহমাদুল্লাহ : এর প্রকৃত কারণ আমার জানা নেই। তবে বাহ্যিক দৃষ্টিতে একটি কারণ থাকতে পারে। সৌদি আরব আর পশ্চিমা দেশগুলোর মাঝে অনেক পার্থক্য। পশ্চিমারা খোলামেলা। তারা ‘যা খুশি করো’ নীতিতে বিশ্বাসী। সৌদি আরবের নিজস্ব সংস্কৃতি আছে। তারা সব সময় সেই সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রক্ষার চেষ্টা করে থাকেন। ভিনদেশিরা সৌদিতে যুগ যুগ ধরে বসবাস করেন এবং অনেকটা একজন নাগরিকের মতোই বেশিরভাগ সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে থাকেন। তবে স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ পেলে সৌদি আরবের ঐতিহ্যগত পরিবেশ বজায় নাও থাকতে পারে। যেমন ৪ লাখ রোহিঙ্গাদের সৌদি সরকার স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতি দিয়েছেন। তাদের কর্মকাণ্ড যে-কোনো প্রবাসীরাই জানেন। তাদের কিছু কিছু কাজের পরিণতি বাংলাদেশিদেরও ভোগ করতে হয়। এ কারণে হয়তো সৌদি আরব সেখানে বহিবাগতদের নাগরিকত্ব দেয় না।
প্রিয়.কম : আপনার নিজের কি সেখানে থেকে যাওয়ার ইচ্ছে হয় না ? নাকি বাংলাদশে থাকাটাই আপনি ভালো মনে করেন, কেনো ?
শায়খ আহমাদুল্লাহ : সৌদি আরবের মতো নিরাপদ দ্বিতীয় কোনো দেশ বিশ্বে নেই। তাই যে-কোনো শান্তিকামী মানুষই সৌদিতে থেকে যেতে চাইবেন। তবে মাতৃভূমির প্রতি সহজাত টান কার না থাকে? সে কারণে বাংলাদেশে থাকার বাসনা কি আর মিটে যায়!
প্রিয়.কম : সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় র্কাযক্রমে বাংলাদেশিদের কোনো ভূমিকা রাখার সুযোগ আছে কি না?
শায়খ আহমাদুল্লাহ : না। সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমে বাংলাদেশীদের কোনো ভূমিকা রাখার সুযোগ সাধারণভাবে নেই। তবে সৌদি সরকার চাইলে যে-কোনো কাজে বাংলাদেশিদের নিযোগ করতে পারেন।
প্রিয়.কম : আপনারা যারা সেখানে থাকেন তাদের প্রতি আরবদের দৃষ্টিভঙ্গী কেমন?
শায়খ আহমাদুল্লাহ : সব জাতির মধ্যেই ভালোমন্দ থাকে। আরবদের বেলায়ও তাই। ভালো লোকেরা ভিনদেশি শ্রমিকদের তুচ্ছতার নজরে দেখেন না। বরং মানুষকে তার কাজের মাধ্যমে মূল্যায়ন করেন। অবশ্য ভিনদেশিদের প্রতি কিছুটা ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি লালন করা আরবের সংখ্যাও কম নয়। তবে মজার বিষয় হলো, এরপরও বাংলাদেশি প্রবাসীরা বিশ্বের যে-কোনো দেশ থেকে সৌদি আরবে বসবাস ও চাকুরিকে প্রাধান্য দিয়ে থাকেন। কারণ একটাই, যোগফল এখানে ভালো।
প্রিয়.কম : আপনার নিজের জীবন স¤র্পকে কিছু বলুন। যেমন, আপনার বেড়ে ওঠা, স্মৃতি, প্রাপ্তি বা অপ্রাপ্তি…
শায়খ আহমাদুল্লাহ : আমি অত্যন্ত সাধারণ একটি আলেম পরিবারে জন্ম গ্রহণ করি। গর্বের বিষয়, দেশের প্রচলিত কওমি মাদরাসায় লেখাপড়ার সৌভাগ্য অর্জন করি। ছাত্র জীবনে প্রথম দিক থেকেই ভালো শিক্ষকদের সন্নিধান লাভে ধন্য হই। সেজন্য ছাত্র জীবনে বেশিরভাগ ক্লাসে প্রথম কিংবা দ্বিতীয় স্থান অধিকারের সুযোগ লাভ করি। কওমি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড (বেফাক)-এর অধীনে ৩টি পরিক্ষায় অংশগ্রহণ করি। উচ্চ মাধ্যমিকে ১০ম, ফজিলতে ৩য় এবং তাকমিলে (২০০১/২) সম্মিলিত মেধা তালিকায় ২য় স্থান অধিকারের তওফিক হয়। ফালিল্লাহিল হামদ। সব শেষে ইফতা শেষ করি খুলনা দারুল উলুম থেকে। কর্ম জীবন শুরু করি রাজধানী ঢাকার দারুর রাশাদ মাদরাসায় শিক্ষক হিসেবে যোগদানের মাধ্যমে। পাশাপাশি মিরপুর ১০নং-এর কবরস্থান মসজিদের খতিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করি। পরে মনিপুর বাইতুল ফালাহে ইমাম ও খতিব হিসেবে অনেক দিক দায়িত্ব পালন করি। মাঝে এক বছর ঢাকার আরজাবাদ মাদরাসায় শিক্ষকতা করি। এরপর থেকে সৌদি আরবে ইসলামিক অ্যাফেয়ার্স মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত ইসলামি গাইডেন্স অফিসের পশ্চিম দাম্মাম শাখায় বাংলা বিভাগে দায়ী হিসেবে কাজ করছি। জীবনের বেশিরভাগ অংশেই আল্লাহর অনেক নেয়ামত প্রাপ্তির তওফিক হয়েছে। যার বেশিরভাগের যোগ্য আমি নিজেকে মনে করি না। কোনো কোনো চাওয়া তো অপূর্ণ থেকেছে-ই। কিন্তু তা পরিমাণে খুবই কম। যেসব স্মৃতি সবচে’ বেশি নাড়া দেয়-তার অন্যতম হলো ছাত্র জীবনে কোনো কোনো শিক্ষকের ইখলাস, তাকওয়াত এবং সততা ও দুনিয়া বিমুখতার বাস্তব নজির নিজের চোখে দেখেছি এবং কাছে থেকে উপলব্ধি করেছি। সত্যিই এখনো মাদরাসাগুলোর চৌহদ্দিতে এমন কিছু লোক বাস করেন যাদের ব্যক্তিত্বের উচ্চতা স¤পর্কে সমাজের মানুষের কোনো ধারণাই নেই। তাদের খুব মিস করি।
প্রিয়.কম : বাংলাদেশের ইসলামি শিক্ষাব্যবস্থা এবং সমস্যা ও প্রয়োজনীয় সংস্কার স¤র্পকে আপনার মূল্যায়ন জানতে চাচ্ছি… ।
শায়খ আহমাদুল্লাহ : এ বিষয়ে আমার মতো ক্ষুদ্র মানুষের মন্তব্য খুব বেশি মানায় না। তবু এটুকু বলবো, বাংলাদেশের ইসলামি শিক্ষা ব্যবস্থা নানা কারণে অনন্য। বিশেষ করে হিফজুল কুরআনের দিক থেকে বাংলাদেশের মাদরাসাগুলোর অবদান বিশ্বের অনেক দেশ থেকে বেশি। অনুরূপ মাদরাসা শিক্ষার্থীদের তরবিয়াতও গর্ব করার মতো। শিক্ষা কারিকুলামে যুগোপযোগী বিষয়গুলোর অন্তর্ভুক্তি সময়ের দাবি। শিক্ষাদান পদ্ধতিতে প্রাচীন ধারার বদলে যুগোপযোগী ধারা সংযুক্ত হলে আরো বেশি উপকারী হবে বলে মনে হয়।
প্রিয়.কম : আপনি একটি আরব দেশ গিয়ে কেনো দীনি কাজ করছেনে? আপনার কি মনে হয় না, সেখানকার তুলনায় এখানে দীনের প্রয়োজনীয়তা অনেকে বেশি? যেহেতু সেখানের ইসলামি পরিস্থিতি আমাদের দেশের থেকে অনেক ভালো বলেই আমরা মনে করি ?
শায়খ আহমাদুল্লাহ : এটা বিশ্বায়নের যুগ। আপনি কোন দেশে বসে কাজ করছেন এটা মুখ্য বিষয় নয়। কাজের সুবিধা থাকাটাই মুখ্য। তাছাড়া সৌদি আরবের দুই মিলিয়নেরও বেশি বাংলাদেশি বসবাস করেন। তাদের দীনি চাহিদা মেটানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আমাদের কাজের ক্ষেত্র মূলত বাংলাদেশিরাই। সুতরাং দেশে যাদের মাঝে কাজ করতাম প্রবাসেও তাদের মাঝেই কাজ করছি। বরং দেশের তুলনায় এখানে প্রয়োজনটা কোনো কোনো দিক থেকে আমার মনে হয় বেশি। কারণ এখানে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সংখ্যার তুলনায় আনুপাতিক হারে আলেমদের সংখ্যা কম। আমি মনে করি, দীনি কাজ করার ক্ষেত্রে দেশগত ও জাতিগত কোনো সীমানা থাকা উচিত না।
প্রিয়.কম : ভবিষ্যতে দেশের জন্যে কিংবা বিশ্বের জন্যে কী করার পরকিল্পনা রয়ছে আপনার ?
শায়খ আহমাদুল্লাহ : কুরআন ও সুন্নাহর আলো সুন্দর উপায়ে ছড়িয়ে দেওয়া এবং সত্যমিথ্যার চক্রে বিভ্রান্ত হওয়া থেকে মানবতাকে মুক্ত করার জন্য সত্য, সুন্দর ও শক্তিমান যুগোপযোগী মিডিয়ার বিশাল জগত গড়ে উঠবে- এটা আমার স্বপ্ন।
প্রিয়.কম : আমাদের দেশে মুক্তিযুদ্ধ-কেন্দ্রিক ইসলামপন্থীদের জড়িয়ে যে একটা সমস্যা রয়েছে, এ স¤র্পকে আপনার চিন্তাধারা কি ? আপনি যেহেতু র্দীঘদিন সৌদিতে আছেন, সেখোনকার আরবদের এ স¤র্পকীয় কোনো দৃষ্টিভঙ্গীর কথা আপনার জানা আছে কি না..
শায়খ আহমাদুল্লাহ : বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধকে ইসলাম ও আলেম সমাজের বিপক্ষে দাঁড় করানোর অপচেষ্টা বহুদিনের। এটি ইসলাম বিদ্বেষী মহলের চক্রান্তমাত্র। সৌদি ওলামা ও গণ্যমান্য ব্যক্তিগণ বাংলাদেশের অস্তিত্বকে যেমন সম্মানের সঙ্গে স্বীকার করেন, তেমনি বাংলাদেশের আলেমদের প্রতিও তাদের রয়েছে অগাধ শ্রদ্ধা। এর কোনো একটিকেই তারা খাটো কিংবা সাংঘর্ষিক মনে করেন না।
প্রিয়.কম : বাংলাদেশ যারা ইসলামি নানা এক্টিভিটির সঙ্গে জড়িত, নানা দলে বিভক্ত আলেম সমাজ, তাদের উদ্দেশ্যে আপনার কিছু বলার আছে কি না ?
শায়খ আহমাদুল্লাহ : নিজের লক্ষ্য বাস্তবায়নের স্বার্থেই ঐক্য এবং পরমত সহিষ্ণুতার ব্যপারে সচেষ্ট থাকা দরকার। অন্যের ব্যাপারে চিন্তার চেয়ে নিজের কাজে মনোনিবেশ করা উচিত বেশি। সাময়িক আবেগের চেয়ে দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনার কথা মাথায় রাখা ভালো বলে মনে হয়।
প্রিয়.কম : আমাদের এতক্ষণ সময় দিয়েছেন বলে আপনাকে ধন্যবাদ।
শায়খ আহমাদুল্লাহ : আপনাকেও ধন্যবাদ।
Discover more from ইসলামিক অনলাইন মিডিয়া
Subscribe to get the latest posts sent to your email.






