মুসলিম জাহান

সৌদি আরবের রমজানচিত্র

সৌদি আরবে রমজান মানেই ঈদের আনন্দ। রমজানের চাঁদ উঠতেই শুরু হয় একে অন্যের কল্যাণ কামনা করে খুদে বার্তা বিনিময়। শহরগুলো সাজে নতুন সাজে। বিজ্ঞাপনী বিলবোর্ড এবং পত্রিকার পাতাজুড়ে থাকে রমজানকে স্বাগত জানিয়ে লেখা বিভিন্ন বাক্যমালা। ঘরবাড়ি সংস্কার এবং ধোয়ামোছাসহ আমরা ঈদের আগে যা যা করি সৌদিয়ানরা রমজানের শুরুতে ঠিক তাই করেন।

রমজান এলে তাদের দৈনন্দিন রুটিন বদলে যায়। দিনের কোলাহল থাকে রাতভর, আর দিন থাকে নীরব। বেশিরভাগ লোক রমজানের রাতে ঘুমায় না। দোকান, শপিংমল, হোটেল-রেস্তোরাঁসহ অনেক অফিস-আদালতও সারারাত খোলা থাকে। ফজরের পরে সবাই ঘুমিয়ে পড়েন।

কল্যাণকামীরা জেগে থাকেন ইবাদতের জন্য। আর অনেকে জাগেন, যেন রোজা রেখে দিনে কষ্ট করতে না হয়। এ মাসে দানদক্ষিণার নীরব প্রতিযোগিতা চলে প্রায় সবার মাঝে। রোজাদারকে ইফতার করানোর ঐতিহ্যবাহী সৌদিয়ান সংস্কৃতি রমজানের সবচেয়ে মনোমুগ্ধকর দৃশ্য। পথের মোড়ে মোড়ে এবং মসজিদে মসজিদে স্থাপন করা হয় ইফতারের জন্য বিশেষ শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত তাঁবু। বছরজুড়ে যেসব ভিনদেশি শ্রমিক সৌদিয়ানদের সেবায় নিয়োজিত থাকে, রমজান মাসে এসব তাঁবুতে দেখা যায় তার উল্টো চিত্র। মেহমান হয়ে বসে থাকেন বাঙালি ইন্ডিয়ান ও অন্যান্য প্রবাসী রোজাদার শ্রমিক। আর খাদেমের মতো তাদের সামনে ইফতার বিতরণের কাজে লেগে যান সৌদিয়ানরা। নিজ হাতে রোজাদারের সেবা করেন অনেকে। বহু তাঁবু ব্যক্তিগত কিংবা পারিবারিক উদ্যোগে স্থাপন করা হয়। সে ক্ষেত্রে মজার বিষয় হলো, কোন তাঁবু কে স্থাপন করেছেন সাধারণত তা জানার কোনো উপায় থাকে না। সবাই নিজের দান গোপন করতে সচেষ্ট থাকেন। অনেক বেসরকারি এনজিও ট্রাফিক সিগন্যাল ও চেকপোস্টগুলোতে ইফতার বিতরণের ব্যবস্থা করে।

রোজাদারকে ইফতার করানোর সবচেয়ে নয়নাভিরাম দৃশ্য দেখা যায় মদিনায়, মসজিদে নববীর আশপাশে। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলেই মদিনার মানুষরা ছোটাছুটি করেন রোজাদারকে নিজের দস্তরখানে বসানোর জন্য। শেষ দশ দিনে মসজিদগুলোতে তারাবির নামাজের পর প্রায় দুই ঘণ্টার বিরতি দিয়ে পুনরায় শুরু হয় কিয়ামুল্লাইল। সেহরির পূর্ব পর্যন্ত চলতে থাকে তা। এ সময় মাইক থেকে ভেসে আসা সুমধুর কণ্ঠের তেলাওয়াতের সূরের মূর্ছনা গোটা শহর মুখরিত করে রাখে। আল্লাহ ভীরুদের কান্নার রোল যে কোনো পাষাণকেও কোমল হতে বাধ্য করে।

আরও দেখুন:  ব্রুনাইয়ে মহানবী (সা.)-কে কটাক্ষ করলে মৃত্যুদণ্ড

রমজানে গ্রোসারি শপিং মলগুলোর দৃশ্যপট থাকে আমাদের দেশের সম্পূর্ণ উল্টো। গ্রোসারি কোম্পানিগুলো ছাড় দেওয়ার এক অপূর্ব প্রতিযোগিতায় নেমে পড়ে রমজান মাসে। অকল্পনীয় মূল্য সরবরাহ করে বিভিন্ন পণ্য। শ্রমিকদের রমজান মাসের ডিউটি থাকে দুই ঘণ্টা কম অর্থাৎ ছয় ঘণ্টা।

বন্দিদের মুক্ত করা ইসলামের দৃষ্টিতে অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। যেসব বন্দি অর্থের অভাবে মুক্ত হতে পারছেন না, সারা বছর তাদের মুক্ত করার নীরব প্রতিযোগিতা থাকে এক শ্রেণির কল্যাণকামী লোকের মাঝে। তবে রমজান মাসে তা বেড়ে যায় বহুগুণে। এতে যোগ দেন স্বয়ং দেশটির বাদশাহ নিজে। প্রতি বছরের মতো এ বছরও সৌদির বাদশাহ রমজানের প্রথম দিন বিপুলসংখ্যক বন্দিকে মুক্তি দিয়েছেন।

সৌদিতে সমাজের অভাবী লোকদের সহযোগিতার জন্য প্রতিটি এলাকায় সরকার অনুমোদিত বিভিন্ন সংস্থা আছে। তারা অভাবীদের তালিকা করে এবং তাদের দ্বারে দ্বারে খাদ্যদ্রব্য ইত্যাদি পেঁৗছে দেয়। রমজান মাসে এসব সংস্থার কার্যক্রম থাকে বছরের যে কোনো সময়ের চেয়ে অনেক গুণ বেশি। এ মাসে অভাবীরা এত অধিক পরিমাণ খাদ্যদ্রব্য ইত্যাদি পেয়ে থাকেন যে, অনেক ক্ষেত্রে তারা তা বিক্রি করতে বাধ্য হয়। এভাবে রমজানজুড়ে সৌদি আরবের সমাজে চলতে থাকে কল্যাণ ও মহৎকর্মের নানামুখী আয়োজন ও প্রতিযোগিতা। গোটা দেশ কল্যাণমূলক কাজের পুণ্যভূমিতে রূপ নেয়। আর এমন নুরানি পরিবেশ দেখে এখানে প্রতি বছর রমজানে বহু অমুসলিম শ্রমিক ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে মুসলিমদের কাতারে শামিল হন। আহ, এমন দৃশ্য ও পরিবেশ যদি সব মুসলিম সমাজে থাকত এবং বছরজুড়ে যদি এর ধারা অব্যাহত থাকত!

– আহমাদুল্লাহ

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

মন্তব্য করুন

Back to top button