মনীষী চরিত

ইবনে হাজার আল-আসকালানী (রহ:)

আহমদ বিন আলী বিন মুহাম্মদ , ইবনে হাজার আল আসকালানী নামে পরিচিত ও প্রসিদ্ধ, একজন বিখ্যাত হাদীস বিশারদ, শাফেয়ী মাযহাবের ফকীহ এবং মুসলিম ব্যক্তিত্ব। তাঁর রচিত ফতহুল বারী বুখারী শরীফের প্রসিদ্ধতম ব্যাখ্যাগ্রন্থগুলোর অন্যতম।

নাম ও পরিচয়:

তাঁর আসল নাম হলো আহমদ বিন আলী বিন মুহাম্মদ। আবুল ফজল হলো তাঁর উপনাম। শিহাবুদ্দীন হলো তাঁর উপাধি। এছাড়া তিনি হাফেজ উপাধিতেও ভূষিত হয়েছেন। তাঁর পরিবার মূলত তিউনিসিয়ার অন্তর্গত কাবেস এলাকার অধিবাসী ছিল। পরবর্তীতে তারা ফিলিস্তিনের অন্তর্গত আসকালান নামক এলাকায় বসতি গড়ে। তার পরিবার আসকালানের অধিবাসী ছিল বলে তাকে আসকালানী (আসকালান সংশ্লিষ্ট)বলা হয়, যদিও তাঁর জন্ম মিশরে।

জন্ম ও শৈশব:

তিনি ১৩৭২ খ্রিষ্টাব্দে মিশরের কায়রোতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা নুরুদ্দিন আলী ছিলেন একজন কবি এবং শাফেয়ী মাযহাবের ফকীহ। শৈশবেই পিতা-মাতা উভয়কেই হারান। তাঁর এক মামা তাঁর কুরআন শিক্ষার ব্যবস্থা করেন। তিনি প্রখর মেধার অধিকারী ছিলেন। শৈশবেই তিনি পুরো কুরআন শরীফ এবং আরো বেশকিছু গ্রন্থ মুখস্ত করে ফেলেন।

কর্মজীবন:

তিনি ছিলেন অসাধারন একজন জগৎ বরেন্য আলেম । তাকে মারজা আল-উলামা (পন্ডিতদের কেন্দ্রবিন্দু), হুজ্জাতুল ফুকাহা প্রভৃতি উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছে । তার লেখা ১৫০ এর অধিক গ্রন্হের সর্বশ্রেষ্ঠ ধরা হয় “ফাতহুল বারী” নামক বুখারী শরীফের ব্যাখ্যা গ্রন্হটিকে । ৩০ বছর পরিশ্রম করে ১২ খন্ডে তিনি কিতাবটি রচনা করেন । কায়রোর আমর ইবনে আস এবং আল আযহার মসজিদের খতিব থাকা অবস্থায় উনি এক হাজারেরও বেশী খুতবা দিয়েছেন । ৮২৭ হিজরী সনে তিনি কায়রোতে প্রধান বিচারপতির পদে অধিষ্ঠিত হন এবং ২১ বছর কার্যক্রম পরিচালনা করেন ।

মৃত্যু:

তিনি ৮ই জিলহজ্জ, ৮৫২ হিজরীতে ইন্তেকাল করেন।

রচনাবলী:

তাঁর রচিত গ্রন্থাবলীর সংখ্যা দেড় শতাধিক। নিচে তাঁর রচিত গ্রন্থাবলীর একটি তালিকা দেয়া হলো:

  1. তাগলীক আল-তা’লীক
  2. তাবাক্বাত আল-মুদাল্লিসীন
  3. নুখবাত আল-ফিকার ফী মুসতালাহি আহলি আল-আছর
  4. নুযহাত আন-নাযর ফী তাউযীহি নুখবাত আল-ফিকার
  5. আল-তালখীস আল-হাবীর
  6. ফাতহ আল-বারী
  7. তা’জীল আল-মানফাআ’ত
  8. আল-উ’জাব ফী বায়ানি আল-আসবাব
  9. তাহযীব আল-তাহযীব
  10. তাবসীর আল-মুতানাব্বিহ বিতাহরীরি আল-মুশতাবিহ
  11. আল-আমালী আল-মুতলাক্বাহ
  12. আল-ইমতা’ বি আল-আরবাঈ’না আল-মুতাবায়িনাতি আল-সামা’
  13. আল-আমালী আল-হালবিয়্যাহ্
  14. নুযহাত আল-আলবাব ফী আল-আলক্বাব
  15. আল-ঈছার বি মা’রিফাতি রুওয়াতি আল-আছার
  16. আল-দিরায়াহ্ ফী তাখরীজি আহাদীছি আল-হিদায়াহ্
  17. লিসান আল-মীযান
  18. আল-ইসাবাহ্ ফী তামায়ীযি আল-সাহাবাহ
  19. বুলূগ আল-মারাম মিন আদিল্লাতি আল-আহকাম
  20. তাক্বরীব আল-তাহযীব
  21. আল-নুকাত আ’লা কিতাবি ইবনে আল-সালাহ্
  22. নুযহাত আল-সামিঈ’ন ফী রিওয়ায়াতি আল-সাহাবাহ্ আ’ন আল-তাবিঈ’ন
  23. সিলসিলাতু আল-যাহাব
  24. আল-ক্বাওল আল-মুসাদ্দাদ ফী আল-যাব্বি আ’ন মুসনাদি আহমাদ
  25. আল-দুরার আল-কামিনাহ্ ফী আয়া’নি আল-মিআত আল-ছামিনাহ্
  26. তাসদীদ আল-ক্বাওস মুখতাসারু মুসনাদ আল-ফিরদাউস
আরও দেখুন:  ড. সালেহ আল-ফাওযান

একটি চমকপ্রদ ঘটনা:

ইবনে হাজার আসকালানী (রহ:) যখন প্রধান বিচারপতীর পদে সমাসীন তখন একটি মজার ও শিক্ষনীয় ঘটনা ঘটে।

একদিন তিনি কায়রো শহরের যে পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন তার পাশে ছিল জনৈক ইহুদীর তেলের মিল । ক্লান্ত শ্রান্ত দেহে তিনি তেলের মিলে কাজ করছিলেন । প্রধান বিচারপতিকে পথ দিয়ে যেতে দেখে সেই ইহুদী এগিয়ে এলেন । তিনি ইবনে হাজার আসকালানীকে বললেন “আমার একটি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে , প্রশ্নটি হলো আপনাদের নবী কি সত্যই বলেছেন , এ পৃথিবী মুমিন মুসলমানদের জন্য দোযখ স্বরূপ আর অবিশ্বাসীদের জন্য বেহেশত স্বরূপ ? ”

ইবনে হাজার আসকালানী (রহ:) বললেন – হ্যা তিনি ঠিকই তা বলেছেন ।

সেই ইহূদী লোকটি তখন বলল : “সেটা যদি হয় তাহলে আপনি আমাকে বলুন আপনি কোন দোযখে আছেন এবং আমি কোন বেহেশতে আছি” ।

ইবনে হাজার আসকালানী (রহ:) তৎক্ষনাৎ বললেন, “আল্লাহ তা’আলা মুমিন, বিশ্বাসীদের জন্য বেহেশতে যে নেয়ামতরাজী , অফুরন্ত সুখ-শান্তি রেখেছেন তার তুলনায় এই পার্থিব জীবন বিষাদময়, দোযখ-স্বরূপ । আর অবিশ্বাসীদের জন্য যে ভয়াবহ শাস্তি , ভীতি এবং দুর্বিষহ জবীন দোযখে রয়েছে তার তুলনায় এই পৃথিবী তাদের জন্য বেহেশত-স্বরূপ ।

ইবনে হাজার আসকালানী (রহ:) এর জবাব শ্রবণ করে সাথে সাথে ইহুদি লোকটি বলল “আমি আজই ইসলাম গ্রহণ করব, আমাকে ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় দিন”।

 

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

২টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

Back to top button