সাম্প্রতিক প্রসঙ্গ

মুসলিম বিশ্বের বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্র চলছে

“উগ্র মুসলিমদের” বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। তার আগে মিশরে খ্রিস্টানদের শিরোশ্ছেদের ভিডিও প্রকাশ করেছে জঙ্গিরা। তিনদিনের রাষ্ট্রীয় শোকও ঘোষণা করেছে মিশর। কিন্তু ঐ রাষ্ট্রীয় শোক কি শিরোশ্ছেদকৃত খ্রিস্টানদেরকে জীবিত করতে পারবে? যারা মারা গেছে তাদের আত্মীয়-স্বজন তো বটেই, তাদের জাতিভাইরা যে অসন্তুষ্ট হয়েছে, সেই অসন্তোষ দূর করার কোন উপায় কি মিশরের হাতে আছে? নেই। শুধুমাত্র মিশরই নয়, বিশ্বব্যাপী মুসলমানদের বিরুদ্ধে গোপন ও ভয়ঙ্কর ষড়যন্ত্র চলছে। ওই ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে উগ্র গোষ্ঠী সৃষ্টি করা হয়েছে। আর তাদের নামে প্রচারিত উগ্রতার দৃষ্টান্ত প্রচার করে মুসলমানদের শায়েস্তার করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
অনেক আগে থেকেই বলা হচ্ছে, বিশ্বব্যাপী মুসলিমদের অগ্রযাত্রা ঠেকানোর জন্যে ইহুদিবাদি ও খ্রিস্ট সাম্রাজ্যবাদিরা ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। তারা মুসলমানদের সমৃদ্ধি পছন্দ করছে না। মুসলমানদের সমৃদ্ধির সাথে মুসলিম উম্মাহর সম্পর্ক আছে। তারা মুসলিম উম্মাহ ধ্বংস করার জন্য মুসলিম ভাতৃত্ববোধকে দ্বিধাবিভক্ত করতে চায়। দ্বিধাবিভক্তির পরিকল্পনায় নতুন করে ক্রুসেডের মহাপরিকল্পনা করেছে। এই ক্রুসেডের আওতায় এবার পুরো মধ্যপ্রাচ্যের ভূগোলকে ব্যবহার করা হবে।
তাদের দৃষ্টিতে ইতিপূর্বে ইসলামী উগ্রবাদী হিসেবে পরিচিত ছিল তালেবান এবং আল কায়দা। এবার যুক্ত হয়েছে আইএসআই। কয়েকটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, মধ্যপ্রাচ্যের আইএসআই’র রাষ্ট্র বানানোর উদ্যোগের পেছনে রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। সিআইএ সরাসরি এই কাজে অর্থ ও অস্ত্র যোগান দিয়েছে। ইতিপূর্বে আরব বসন্ত নাম দিয়ে খ্রিস্টানরা সরাসরি আক্রমণ করে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশের সামাজিক স্থিতিশীলতা ধ্বংস করেছে। কিন্তু ওই কাজে সরাসরি জড়িত থাকার দায়ে খ্রিস্টান অধ্যুষিত রাষ্ট্রগুলোর যথেষ্ট বদনামও হয়েছে। বদনাম থেকে বাঁচতে এখন তারা মুসলমান দিয়ে মুসলমান হত্যার পরিকল্পনা করেছে। মধ্যপ্রাচ্যে আইএসআই এখন মূর্তিমান আতঙ্ক। কিন্তু আইএসআই’র কর্মকা-ের ওপরে নির্ভর করে বেশি দিন চুপ করে বসে থাকার সময় তাদের নেই। শান্তিপ্রিয় খ্রিস্টান দেশগুলোকে খেপিয়ে দেয়ার জন্য তারা তাদের দেশের মধ্যেও নাশকতার ঘটনা ঘটাবে জঙ্গিবাদের নাম দিয়ে, সাথে সাথে মুসলিম দেশগুলোতে বসবাসকারী খ্রিস্টান ও ইহুদিদেরকেও হত্যা করিয়ে তাদেরকেও খেপিয়ে তোলা হবে। তার নমুনাও দেখা যাচ্ছে।
সম্ভাব্য ক্রুসেডে অনেক মুসলমান মরবে, অনেক টাকাও ব্যয় হয়ে যাবে। একাজে কেবলমাত্র খ্রিস্টানদের তহবিল ব্যবহার করে তাদেরকে কপর্দকহীন করার ঝুঁকি তারা নেবে না। সে জন্য ভারতকেও তারা টার্গেট করেছে। ভারতের খ্রিস্টান, ইহুদি ও হিন্দুদের কয়েকটি স্থাপনায় তারা মুসলিমদের নামে আক্রমণ করাবে, উদ্দেশ্য বিশ্ব মুসলিমদের প্রতি হিন্দুদের খেপিয়ে তোলা এবং আসন্ন ক্রুসেডের বিশাল ব্যয়ভারের একাংশ ভারতীয় অর্থ দ্বারা নির্বাহ করা। ইহুদিদের কাছে হিসাব আছে যে, ভারতীয়রা বিশাল অঙ্কের অর্থের মালিক। এই অর্থের বড় অংশ বিদেশের ব্যাংকে গচ্ছিত। তাছাড়া, সম্প্রতি ভারতীয় অর্থনীতিতে ইহুদি পুঁজির দুর্ব্যবহার লক্ষ করা গেছে। শোনা যায়, মোদি তার নির্বাচনী প্রচারে ইহুদি অর্থ ব্যবহার করেছেন। গুজরাটে ইহুদিদের পুঁজি লগ্নীকৃত হয়েছে। ভারত এখন ইহুদিদের কবজায়। সেই আগেকার গান্ধীবাদী ভারত আর নেই। কাশ্মির অগ্নিগর্ভ হয়েই আছে। এই স্ফূলিঙ্গকেও দাবানলে রূপ দেওয়া হতে পারে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আইএসআই’র বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য কুয়েতে সেনাবাহিনী পাঠাচ্ছে। কুয়েতে মার্কিন সেনাবাহিনী আগে থেকেই আছে। আছে ইরাকেও। সৌদিতে তারা আরাম-আয়েশে দিন কাটাচ্ছে বহুদিন যাবত। এখন মাঝে মধ্যেই ঘোষণা দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে সেনাবাহিনী পাঠাবে তারা। ধীরে-সুস্থে মধ্যপ্রাচ্যে একটি বড় যুদ্ধ করার মতো সেনাদল তৈরি হলে তাদের পরিকল্পিত ক্রুসেডের চেহারা দৃশ্যমান হতে থাকবে। এখন তার সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং মনস্তাত্ত্বিক প্রস্তুতি পর্ব চলছে। একটা অদ্ভুত তত্ত্ব তৈরি করেছে তারা। ‘ক্লাস অব দ্যা সিভিলাইজেশন্স’ নামে এই তত্ত্বের মূল কথা হলো, খ্রিস্টান সভ্যতা ও মুসলিম সভ্যতা পরস্পরের সাথে যুদ্ধরত। এটি একটি কাল্পনিক তত্ত্ব। মুসলমান ও খ্রিস্টানদের মধ্যে যুদ্ধ বাধিয়ে দেওয়ার জন্য এই সাজানো উপাখ্যান রচনা করা হয়েছে।
মধ্যযুগের ক্রুসেডগুলো ছিল ইহুদিদের জেরুজালেম উদ্ধারের জন্য। যদিও খ্রিস্টানদের নবী তথা হযরত ঈসা (আ.)-এর জন্মস্থান জেরুজালেম, তবুও ইহুদিরাই জেরুজালেমের দাবিদার। কারণ, হযরত ঈসা (আ.) জন্মেছিলেন ইহুদি বংশেই। সুতরাং খ্রিস্টানরা এবং ইহুদিরা তাদের পবিত্রস্থান হিসেবে জেরুজালেমকে সম্মান করে। তাই তারা জেরুজালেমকে নিজেদের কাছে রাখতে চায়।
কিন্তু প্রশ্ন আসতে পারে যে, এখন তো জেরুজালেম তাদেরই আছে। তাহলে এই নয়া-ক্রুসেড কী জন্যে? এবারকার ক্রুসেড ইহুদিদের রাজ্যসীমা বাড়ানোর জন্য। তাদের কাল্পনিক রাজ্যসীমা বিশাল, এই সীমার ভেতরে খোদ মক্কা-মদিনাও আছে। সরাসরি মক্কা-মদিনা আক্রমণ করলে সারা বিশ্বের মুসলমানরা একত্রিত হয়ে ইহুদিদেরকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেবে। তাই ইহুদিরা নিজেরা কখনোই মক্কা-মদিনা আক্রমণ করবে না। এর আগে যখন ক্রুসেড হয়েছিল, তাও জেরুজালেমকে দখলে রাখার জন্য। মক্কা দখলের জন্য নয়।
তবে ধারণা করা যায়, এবারকার ক্রুসেডের লক্ষ্য হচ্ছে মক্কা-মদিনা দখল করা। ইহুদিরা তাদের কল্পিত ভূমির সীমানা এতই বড় করেছে যে, কয়েকটি পার্শ্ববর্তী দেশ তাদের রাজ্যভুক্ত হবে। পুরো সৌদি আরব ওই ম্যাপের মধ্যে আছে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর ইসরাইল যে ভূমি খ- পেয়েছিল, তা ছিল খুবই ছোট। তখন থেকেই তারা যেমন তাদের জনসংখ্যা বাড়িয়েছে, তেমনি তাদের রাজ্যসীমাও বাড়িয়েছে। প্রতিদিনই একটু একটু করে তারা তা বাড়াচ্ছে। সারা বিশ্ব থেকেই তারা ইহুদি কুড়াচ্ছে। আরাম-আয়েশে থাকার আশায় বিভিন্ন দেশের ইহুদিরা যারা গরিবিহালে দিন কাটাচ্ছে, তারা ইসরাইলে অভিবাসী হচ্ছে। খুব বড় ধরনের মাইগ্রেশন হয়েছিল জারের আমলে। আর এখন ঠিক তেমনি বড় ধরনের মাইগ্রেশন চলছে। যেহেতু দীর্ঘদিনব্যাপী মাইগ্রেশন চলছে, তাই সহজে চোখে পড়ে না। বিশাল ভূখ- তারা দখল করবে বলেই তারা জনসংখ্যা বাড়ানোর মহাপরিকল্পনা নিয়েছে। একই সাথে মধ্যপ্রাচ্যের মুসলমান জনসংখ্যা কমানোরও উদ্যোগ নিয়েছে।
তাদের বিশ্বাস, আইএসআই’র অমানবিক হত্যকা-ের প্রতিবাদে সারা বিশ্বই সোচ্চার হবে। ইউরোপ এখন দোমনাভাব নিয়ে আছে। কিন্তু বনেদী ধনতন্ত্রীদের দেশে বড় কিসিমের নাশকতার ঘটনা ঘটলে তারা ধৈর্যহারা হবেই। তখন ভালো-মন্দ বিবেচনা না করেই উদ্দিষ্ট ক্রুসেডে নিজেদের নাম লেখাবে। তাছাড়া, ইসরাইলের কোন নেতাই বিশ্ব নেতাদের কাতারে সম্মানজনক অবস্থানে নেই। তারা অসংখ্য অমানবিক কর্মকা- করে বিশ্বে নিন্দিত হয়েছে। প্যালেস্টাইনে নারী, শিশুসহ অসংখ্য সাধারণ মানুষকে হত্যার দায়ে তারা অভিযুক্ত। একই কুকর্ম তারা বারংবার করেছে। প্রতিবারই বিশ্ব নেতৃবৃন্দের নিন্দা তারা হজম করেছে এবং টাকার বিনিময়ে ও মার্কিন সহায়তায় ভাবমর্যাদা পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করেছে। কিন্তু বারবারই ব্যর্থ হয়েছে। তারপরও মধ্যপ্রাচ্যের সবদেশ তাদেরকে সমানভাবে ঘৃণা করেনি, বয়কটও করেনি। এমনকি কয়েকটি দেশের সাথে তাদের গোপন অর্থনৈতিক সম্পর্ক আছে। গোপন অর্থনৈতিক সম্পর্ক পাকিস্তানের সাথেও আছে। এ কারণে ইসরাইলি অমানবিক কুকর্ম ধামাচাপা পড়ে যায়। দীর্ঘদিনের কুকর্মের অভিজ্ঞতায় তারা একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে। সিদ্ধান্তটা হলো, আসন্ন ক্রুসেডে সব মুসলিম দেশ সমবেতভাবে যুদ্ধে অংশ নেবে না। এই সিদ্ধান্তে তাদের বিগত ২৫-৩০ বছরের অভিজ্ঞতার পুঞ্জিভূত ঘটনা বিশ্লেষণ করেই তারা এই পরিকল্পনা করেছে। যদিও এই মুহূর্তে ইসরাইলের প্রত্যক্ষ শত্রু ইরান ছাড়া আর কেউ নেই।
কিন্তু আইএসআই’র নামে নির্মম কর্মকা-ের প্রচার অব্যাহত থাকলে মুসলিম বিশ্ব বিপর্যস্ত হবেই। আর সেই সুযোগে ইসরাইল তার গোপন মিশন সার্থক করবে। ইসলাম নৃশংসতায় বিশ্বাসী নয়, শান্তির ধর্ম। মুসলিম উম্মাহর উচিৎ সেই শান্তির বাণী প্রচারে উদ্যোগী হওয়া এবং একই সাথে ইহুদিদের পরিকল্পিত ক্রুসেডকে ব্যর্থ করার উদ্যোগ নেওয়া।

আরও দেখুন:  রোহিঙ্গা ফেরৎ চুক্তি : তবে..

———–
ড. ইশা মোহাম্মদ
সহযোগী অধ্যাপক, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়
(ইনকিলাব)

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

১টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

Back to top button