মনীষী চরিত

ইমাম নাসাঈ (রহঃ)

(১ম অংশ)

ভূমিকা : ইমাম  নাসাঈ (রহঃ) ইলমে হাদীছের আকাশে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তিনি সুনানে নাসাঈ সহ অনেক  মূল্যবান গ্রন্থ প্রণয়ন করে মুসলিম বিশ্বে অবিস্মরণীয় হয়ে আছেন। সততা, বিশ্বস্ততা,  আমানতদারিতা, ন্যায়পরায়ণতা ও আল্লাহভীরুতায় তিনি ছিলেন অনন্য। হাদীছ চর্চায় তিনি  নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন।

নাম ও পরিচিতি : ইমাম নাসাঈ-এর প্রকৃত নাম আহমাদ, পিতার নাম শো‘আইব।[1] উপাধি اَلْاِمَامُ الْحَافِظُ (আল-ইমামুল হাফেয)[2], اَلْحَافِظُ الْحُجَّةُ (আল-হাফেযুল হুজ্জাহ),[3] উপনাম আবু  আব্দুর রহমান[4], নিসবতী নাম  আল-খোরাসানী[5], আন-নাসাঈ[6]। ‘নাসা’-এর দিকে  সম্বন্ধিত করে তাঁকে নাসাঈ বলা হ’ত। ‘নাসা’ খোরাসানের একটি প্রসিদ্ধ শহর। আরবের  লোকেরা কখনো কখনো এটাকে ‘নাসাবী’ (النَّسَوِي) বলে থাকে। কিয়াস হিসাবে উচ্চারণ এভাবেই হওয়া  উচিত। তবে নাসাঈ উচ্চারণটিই সর্বাধিক প্রসিদ্ধ।[7] তাঁর পুরো বংশপরিক্রমা  হ’ল- আবু আব্দুর রহমান আহমাদ ইবনু শো‘আইব ইবনে আলী ইবনে সিনান ইবনে বাহার  আল-খোরাসানী আন-নাসাঈ।[8]

কোন কোন ঐতিহাসিক  ইমাম নাসাঈ (রহঃ)-এর বংশপরিক্রমায় আহমাদ ইবনু শো‘আইব ইবনে আলী-এর পরিবর্তে আহমাদ  ইবনু আলী ইবনে শো‘আইব উল্লেখ করেছেন।[9] এ দু’টো বর্ণনার  মধ্যে সমন্বয় সাধন এভাবে করা যায় যে, দাদার প্রসিদ্ধি ও পরিচিতির কারণে পুত্রের  সম্পর্ক কখনো কখনো দাদার প্রতি আরোপ করা হ’ত।[10]

জন্ম : ইমাম নাসাঈ (রহঃ)  ২১৫ হিজরী মুতাবিক ৮৩০ খ্রিষ্টাব্দে[11] মতান্তরে ২১৪  হিজরীতে খোরাসানের ‘নাসা’ নামক স্থানে জন্মগ্রহণ করেন।[12] এ স্থানের দিকে  সম্বন্ধিত করে তাঁকে আন-নাসাঈ বলা হয়। এ নামেই তিনি সমধিক প্রসিদ্ধি লাভ করেছেন।[13]

আল্লামা ইবনুল আছীর ও জালালুদ্দীন সুয়ূতী (রহঃ) বলেন, তিনি ২২৫ হিজরীতে  জন্মগ্রহণ করেন।[14] কিন্তু ইবনু মানযূর, আল-মিযযী ও আল্লামা যাহাবী (রহঃ) বলেন,انه ولد عام ২১৫هـ وهو الراجح، ‘তিনি ২১৫ হিজরীতে জন্মগ্রহণ করেছেন। এটিই প্রাধান্যযোগ্য  অভিমত’।[15]

শিক্ষা জীবন : ইমাম নাসাঈ (রহঃ)-এর সময়ে খোরাসান ও তার পার্শ্ববর্তী  এলাকা সমূহ জ্ঞান-বিজ্ঞান ও ইলমে হাদীছের কেন্দ্রভূমি হিসাবে পরিচিত ছিল। সেখানে  অনেক খ্যাতনামা বিদ্বানের সমাবেশ ঘটেছিল। ইমাম নাসাঈ (রহঃ) স্বীয় জন্মভূমিতেই  প্রখ্যাত আলেমগণের তত্ত্ববধানে পড়া-লেখা শুরু করেন।[16] পনের বছর বয়স পর্যন্ত তিনি স্বদেশেই কুরআন মাজীদ হিফয ও প্রাথমিক শিক্ষা অর্জন  করেন।[17]

দেশ ভ্রমণ : ইমাম নাসাঈ (রহঃ) নিজ এলাকায় প্রাথমিক শিক্ষা  সমাপনের পর বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ করে ইলমে হাদীছে ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন। তিনি ২৩০ হিজরী  মুতাবিক ৮৪৪ খ্রিষ্টাব্দে উচ্চশিক্ষা অর্জনের জন্য মাতৃভূমির মায়া ত্যাগ করে  তৎকালীন সময়ের বিভিন্ন দেশ ও জনপদের খ্যাতিমান মনীষীদের দরজায় কড়া নাড়েন।[18]

ইমাম নাসাঈ (রহঃ) নিজেই বলেছেন, رحلتي  الأولى إلى قتيبة كانت في سنة ثلاثين ومائتين أقمت عنده سنة وشهرين ‘আমি ২৩০  হিজরীতে সর্বপ্রথম কুতায়বা ইবনু সাঈদের নিকট গমন করি এবং তাঁর সান্নিধ্যে এক বছর  দু’মাস অবস্থান করি’।[19] এ সময় তাঁর বয়স ছিল মাত্র পনের বছর।[20]

শাহ আব্দুল আযীয মুহাদ্দিছ দেহলভী (রহঃ) বলেন, ‘তিনি অনেক বড় বড় শায়খের  সাথে সাক্ষাৎ করেন। তিনি খুরাসান, হিজায, ইরাক, জাযীরা, শাম, মিশর প্রভৃতি শহরে  পরিভ্রমণ করেন’।[21]

হাফেয ইবনু কাছীর (রহঃ) বলেন,رَحَلَ إِلَى الْآفَاقِ،  وَاشْتَغَلَ بِسَمَاعِ الْحَدِيْثِ وَالِاجْتِمَاعِ بِالْأَئِمَّةِ الْحُذَّاقِ، وَمَشَايِخُهُ  الَّذِيْنَ رَوَى عَنْهُمْ مُشَافَهَةً. ‘তিনি পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ভ্রমণ করেন এবং অভিজ্ঞ ইমামগণের নিকট থেকে  হাদীছ শ্রবণে মনোনিবেশ করেন। আর যাদের নিকট থেকে তিনি মুখে মুখে হাদীছ বর্ণনা  করেছেন, তাঁদের নিকট থেকেও হাদীছ শ্রবণ করেন।[22] আল্লামা ইউসুফ  আল-মিযযী ‘তাহযীবুল কালাম’ গ্রন্থে লিখেছেন, طاف البلاد وسمع بخراسان والعراق والحجاز ومصر والشام والجزيرة من جماعة ‘তিনি বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছেন এবং খোরাসান,  ইরাক, হিজায, মিসর ও জাযীরার একদল মুহাদ্দিছের নিকট থেকে হাদীছ শ্রবণ করেছেন’।[23]

ইমাম যাহাবী (রহঃ) বলেন, ‘জ্ঞান অন্বেষণের জন্য তিনি  খোরাসান, হিজায, মিসর, ইরাক, জাযীরা, সিরিয়া এবং সীমান্ত এলাকায় ভ্রমণ করেন। অতঃপর  মিসরে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন’।[24]

শিক্ষকমন্ডলী : ইমাম নাসাঈ (রহঃ) স্বদেশে হুমাইদ ইবনে মাখলাদ (মৃঃ ২৪৪ হিঃ), আম্মার ইবনুল  হাসান (মৃঃ ২৪২ হিঃ) প্রমুখ খ্যাতিমান শায়খের নিকট শৈশবকালে শিক্ষার্জন করেন।[25]

ড. তাকীউদ্দীন নদভী স্বীয় ‘আ‘লামুল মুহাদ্দিছীন’ গ্রন্থে  লিখেছেন,  ‘তিনি অসংখ্য মনীষী থেকে হাদীছ  শ্রবণ করেছেন। তিনি সর্বপ্রথম বিদেশে পরিভ্রমণ করে কুতাইবা ইবনু সাঈদ (মৃঃ ২৪০  হিঃ)-এর নিকট থেকে জ্ঞানার্জন করেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য শিক্ষকের মধ্যে রয়েছেন  ইসহাক ইবনু রাহওয়াইহ (ইমাম বুখারী (রহঃ)-এরও উস্তায), মুহাম্মাদ ইবনু নযর, আলী  ইবনু হাজার, ইউনুস ইবনু আব্দুল আলা, মুহাম্মাদ বিন বাশার, ইমাম আবূ দাঊদ  সিজিস্তানী প্রমুখ। ইবনু হাজার আসক্বালানী (রহঃ) ইমাম বুখারী (রহঃ)-কেও ইমাম নাসাঈ  (রহঃ)-এর শিক্ষক হিসাবে গণ্য করেছেন। অনুরূপভাবে আবু যুর‘আ ও আবু হাতিম আর-রাযী  থেকেও তার হাদীছ বর্ণনা প্রমাণিত হয়েছে।[26] তাঁর উল্লেখযোগ্য শিক্ষকমন্ডলীর মধ্যে আরো রয়েছেন, বিশর  ইবনে হেলাল, আল-হাসান ইবনুস সাববাহ আল-বাযযার, আম্মার ইবনে খালেদ আল-ওয়াসিতী,  ইমরান ইবনে মূসা আল-কাযযায প্রমুখ।[27]

সুনানে কুবরাতে ইমাম নাসাঈ (রহঃ) ৪০৩ জন শিক্ষকের নিকট থেকে এবং সুনানে  ছুগরা তথা সুনানে নাসাঈতে ৩৩৫ জন শায়খের নিকট থেকে হাদীছ বর্ণনা করেছেন। তবে ইবনু  আসাকিরের বর্ণনা মতে তাঁর শিক্ষকের সংখ্যা ৪৪৪ জন।[28]

ছাত্রবৃন্দ : দেশ-বিদেশে  উচ্চশিক্ষা গ্রহণের পর ইমাম নাসাঈ (রহঃ) হাদীছের দরস প্রদান শুরু করেন। অনেক  শিক্ষার্থী তাঁর নিকট থেকে ইলমে হাদীছ শিক্ষা লাভ করেছে।

আব্দুল হক মুহাদ্দিছ দেহলভী (রহঃ) বলেন, ‘মিসরে তিনি স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু  করেন এবং সেখানে তাঁর রচনাবলী প্রসার লাভ করে। বহু জ্ঞান পিপাসু তাঁর নিকট থেকে  জ্ঞান আহরণ করেছেন। অতঃপর তিনি দামেশকে চলে যান’।[29]

তাঁর ছাত্রদের  মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন হ’লেন- ‘আমালুল ইয়াওম ওয়াল লায়লাহ’ গ্রন্থের খ্যাতিমান  লেখক ইবনুস সুন্নী, আহমাদ ইবনুল হাসান আর-রাযী, আবুল হাসান আহমাদ আর-রামলী, আবু  জা‘ফর আহমাদ ইবনে মুহাম্মাদ আন-নাহবী, আবু সাঈদ আহমাদ ইবনে মুহাম্মাদ ইবনুল আরাবী,  আবু জা‘ফর আহমাদ আত-তাহাবী প্রমুখ।[30]

সুনানু নাসাঈ  সংকলন : ইমাম নাসাঈ (রহঃ) প্রথমে ‘আস-সুনানুল কুবরা’ নামে একটি বৃহৎ হাদীছগ্রন্থ  সংকলন করেন। যাতে ছহীহ ও যঈফ হাদীছের সংমিশ্রণ ছিল। এ সম্পর্কে আল্লামা আবু যাহূ বলেন,  ‘ইমাম নাসাঈ (রহঃ) বিশুদ্ধ ও ত্রুটিযুক্ত হাদীছ সম্বলিত ‘আস-সুনানুল কুবরা’ গ্রন্থ  প্রণয়ন করেন। অতঃপর একে সংক্ষেপ করে ‘আস-সুনানুছ ছুগরা’ সংকলন করেন। এর নাম দেন ‘আল-মুজতাবা’।  ইমাম নাসাঈ (রহঃ)-এর নিকটে এ গ্রন্থের সব হাদীছই ছহীহ’।[31]

ইমাম নাসাঈ (রহঃ) বলেন,لما عزمت على جمع كتاب السنن استخرت الله تعالى في الرواية عن شيوخ كان في  القلب منهم بعض الشيء فوقعت الخيرة على تركهم فنزلت في جملة من الحديث كنت أعلو فيه عنهم- ‘যখন আমি সুনানে নাসাঈ সংকলন করতে  দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হ’লাম, তখন কিছু শায়খ থেকে হাদীছ বর্ণনা করার ব্যাপারে আমার অন্তরে  খটকা সৃষ্টি হ’লে আমি আল্লাহর দরবারে ইস্তেখারা করলাম। অতঃপর তাদের হাদীছ  পরিত্যাগের বিষয়ে কল্যাণকর ইঙ্গিত পেলাম। ফলে আমি তাতে এমন কিছু হাদীছ সন্নিবেশিত  করিনি, যেগুলো তাদের নিকট থেকে আমার নিকট উচ্চতর সনদে পৌঁছেছিল’।[32]

সাইয়িদ  জামালুদ্দীন বলেন, ‘ইমাম নাসাঈ (রহঃ) প্রথমে ‘আস-সুনানুল কাবীর’ নামক একটি গ্রন্থ  সংকলন করেন। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ। হাদীছের বিভিন্ন সূত্র সংবলিত এমন  গ্রন্থ আর কেউ রচনা করতে সক্ষম হয়নি’।[33]

ইবনুল আছীর বলেন, ফিলিস্তীনের রামাল্লার আমীর ইমাম নাসাঈ (রহঃ)-কে জিজ্ঞেস  করলেন, আপনার সংকলিত ‘আস-সুনানুল কুবরা’-তে সন্নিবেশিত সকল হাদীছই কি ছহীহ? উত্তরে  তিনি বললেন, না। এতে ছহীহ ও যঈফ মিশ্রিত আছে। তখন আমীর তাঁকে বললেন, এ গ্রন্থ থেকে  শুধু ছহীহ হাদীছগুলো চয়ন করে আমাদের জন্য একটি বিশুদ্ধ হাদীছগ্রন্থ সংকলন করুন। এ  প্রেক্ষিতে তিনি আস-সুনানুল কুবরার যে সকল হাদীছের সনদে ত্রুটি আছে বলে অভিযোগ  ছিল, সেগুলো বাদ দিয়ে ‘সুনানুল মুজতাবা’ সংকলন করেন’।[34]

ড. তাকীউদ্দীন নাদভী লিখেছেন, উপরোক্ত কাহিনী আল্লামা ইবনুল আছীর স্বীয়  ‘জামিউল উছূল’ গ্রন্থে এবং মোল্লা আলী ক্বারী মিশকাতের ভাষ্যগ্রন্থ ‘মিরক্বাত’-এ  উল্লেখ করেছেন। কিন্তু আল্লামা যাহাবী বলেছেন, উপরোক্ত বর্ণনা সঠিক নয়; বরং সুনানে  কুবরাকে সংক্ষেপ করে ‘মুজতাবা’ সংকলন করেছেন ইমাম নাসাঈর সুযোগ্য ছাত্র ইবনুস  সুন্নী।[35]

আল্লামা ইবনু আসাকির বর্ণনা করেছেন, এ গ্রন্থটির নাম اَلْمُجْتَنَى অথবা اَلْمُجْتَبَى উভয়টিই সমার্থক শব্দ। তবে শেষোক্ত اَلْمُجْتَبَى শব্দটিই অধিক প্রসিদ্ধ। যখন কোন মুহাদ্দিছ  হাদীছ বর্ণনা শেষে বলবেন, اِنَّ النَّسَائِىَّ رَوَى حَدِيْثًا ‘ইমাম নাসাঈ (রহঃ) হাদীছটি স্বীয় কিতাবে  বর্ণনা করেছেন, তখন এটা দ্বারা ‘সুনানুল মুজতাবা’কেই বুঝাবে, সুনানুল কুবরাকে নয়।[36] উল্লেখ্য, এটিই ‘সুনানে নাসাঈ’ নামে পরিচিত। ‘মুজতাবা’ শব্দের অর্থ হ’ল  বাছাইকৃত চয়নকৃত, নির্বাচিত এবং ‘মুজতানা’ শব্দের অর্থ হ’ল সংগৃহীত বা আহরিত ফল।[37]

সুনানে নাসাঈর হাদীছ ও অধ্যায় সংখ্যা : ইবনুল  আছীরের মতে, সুনানে নাসাঈতে সংকলিত হাদীছ সংখ্যা ৪৪৮২টি।[38] শায়খ নাছিরুদ্দীন আলবানীর গণনা অনুযায়ী নাসাঈর মোট হাদীছ সংখ্যা ৫৭৫৮।[39] এতে মোট একান্নটি কিতাব (অধ্যায়) রয়েছে।[40]

সুনান  গ্রন্থসমূহের মধ্যে আলোচ্য বিষয় এবং হাদীছের দিক দিয়ে সুনানে নাসাঈ বিশদ ও ব্যাপক।[41] ইমাম নাসাঈ  (রহঃ) এ গ্রন্থ সংকলনে ইমাম বুখারী (রহঃ) ও ইমাম মুসলিম (রহঃ)-এর রীতি অনুসরণ  করেছেন এবং তাঁদের উভয়ের প্রবর্তিত মানহাজ বা নীতির মধ্যে সমন্বয় সাধন করেছেন।[42]

সুনানে নাসাঈর  সত্যায়ন ও মূল্যায়ন : ইমাম নাসাঈ (রহঃ) তাঁর সংকলিত ‘সুনানুল কুবরা’-কে  পরিমার্জন ও সংক্ষেপ করে ‘সুনানুছ ছুগরা’ তথা ‘সুনানে নাসাঈ’ সংকলন করে দৃঢ়তার  সাথে বলেছেন, كتاب  السنن كله  صحيح وبعضه معلول والمنتخب المسمى  بالمجتبى صحيح كله- ‘সুনানুল কুবরা’-এর সব হাদীছ ছহীহ। তবে কিছু  কিছু হাদীছের সনদ ত্রুটিযুক্ত। আর ‘মুজতাবা’ তথা ‘সুনানে নাসাঈ’তে নির্বাচিত সব  হাদীছই ছহীহ’।[43]

ইমাম আবু আব্দুল্লাহ ইবনে রুশাইদ (মৃঃ ৭২১ হিঃ) বলেন, ‘সুনান পর্যায়ে  হাদীছের যত গ্রন্থ প্রণয়ন করা হয়েছে, তন্মধ্যে এ গ্রন্থটি অভিনব রীতিতে প্রণয়ন করা  হয়েছে। আর এর সজ্জায়নও চমৎকার। এতে বুখারী ও মুসলিম উভয়ের রচনারীতির মধ্যে সমন্বয়  করা হয়েছে। সাথে সাথে হাদীছের ‘ত্রুটি’ও এতে বর্ণনা করা হয়েছে।[44]

আবু যাহূ ‘আল-হাদীছ  ওয়াল মুহাদ্দিছূন’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘মোদ্দাকথা, ‘মুজতাবা’ তথা ‘সুনানে নাসাঈ’তে অনুসৃত  ইমাম নাসাঈ (রহঃ)-এর শর্ত ছহীহাইনের পর সবচেয়ে বেশী সুদৃঢ় শর্ত। যা তাঁকে  মুহাদ্দিছগণের দৃষ্টিতে মহান করেছে।[45] তিনি আরো বলেন, ‘মুজতাবা  তথা সুনানে নাসাঈতে যঈফ এবং সমালোচিত রাবী বর্ণিত হাদীছ খুবই কম রয়েছে। এ গ্রন্থের  মর্যাদা ছহীহাইনের পরে এবং এটি সুনানে আবূ দাঊদ ও সুনানে তিরমিযীর চেয়ে অগ্রগণ্য।[46]

হাফেয আবুল হাসান  মু‘আফেরী বলেন, ‘মুহাদ্দিছগণের  বর্ণিত হাদীছ সমূহের প্রতি যখন তুমি লক্ষ্য করবে, তখন এ কথা বুঝতে পারবে যে, ইমাম  নাসাঈ (রহঃ)-এর সংকলিত হাদীছ অপরের সংকলিত হাদীছের তুলনায় বিশুদ্ধতার অধিক  নিকটবর্তী’।[47]

তাজুদ্দীন সুবকী স্বীয় পিতা তাকীউদ্দীন সুবকী ও উস্তায হাফিয যাহাবী থেকে  বর্ণনা করেছেন,وان سننه أقل السنن  بعد الصحيحين حديثا ضعيفا- ‘ছহীহাইনের পর অন্যান্য সুনান  গ্রন্থ সমূহের চেয়ে সুনানে নাসাঈতে কম সংখ্যক যঈফ হাদীছ রয়েছে’।[48]

মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মুহাম্মাদ ইবনু মাত্বার  আয-যাহরানী বলেন, ‘মোদ্দাকথা হ’ল, ছহীহাইন তথা বুখারী-মুসলিমের পর অন্যান্য সুনান  গ্রন্থের তুলনায় ‘সুনান নাসাঈ’-তে যঈফ হাদীছ ও সমালোচিত রাবী কমই আছে। এর নিকটবর্তী  হ’ল সুনানে আবূ দাঊদ ও তিরমিযী। অন্যদিকে সুনান ইবনু মাজাহ তার বিপরীত’।[49]


(২য় অংশ)

হাদীছ গ্রহণে ইমাম নাসাঈ (রহঃ)-এর শর্তাবলী :

১. ছহীহ হাদীছের প্রধান দু’টি গ্রন্থ বুখারী ও মুসলিমে যেসব হাদীছ সন্নিবেশিত হয়েছে সেসব সনদসূত্রে বর্ণিত হাদীছ অবশ্যই গ্রহণযোগ্য।

২. প্রধান হাদীছ গ্রন্থদ্বয়ে হাদীছ গ্রহণের যে শর্ত অনুসৃত হয়েছে তাতে উত্তীর্ণ সকল হাদীছই গ্রহণযোগ্য।

৩. যেসব হাদীছ সর্বসম্মতভাবে ও মুহাদ্দিছীনের ঐক্যমতের ভিত্তিতে পরিত্যক্ত তা গ্রহণীয় নয়। পক্ষান্তরে হাদীছের যেসব সনদ ‘মুত্তাছিল’ তথা ধারাবাহিক বর্ণনা পরম্পরাসূত্রে কোন বর্ণনাকারীই উহ্য নয়, তা অবশ্যই গ্রহণীয়। মূল হাদীছ ছহীহ হ’লে এবং ‘মুরসাল’ (مُرْسَلٌ) কিংবা ‘মুনকাতি‘ (مُنْقَطِعٌ) না হ’লে তাও গ্রহণযোগ্য।

৪. চতুর্থ পর্যায়ের বর্ণনাকারীদের মধ্যে উত্তম বর্ণনাকারী হ’তে বর্ণিত হাদীছও গ্রহণযোগ্য। এসব শর্ত ইমাম নাসাঈ (রহঃ) ও ইমাম আবূদাঊদ (রহঃ)-এর নিকট সমভাবে গৃহীত। কিন্তু কয়েকটি ক্ষেত্রে ইমাম নাসাঈ (রহঃ)-এর আরোপিত শর্ত ইমাম আবূদাঊদ অপেক্ষাও অধিক শক্তিশালী। ইমাম নাসাঈ (রহঃ) হাদীছ গ্রহণের ব্যাপারে বর্ণনাকারীদের সম্পর্কে অধিক সতর্কতা অবলম্বন করেছেন। তাদের অবস্থা সম্পর্কে অধিকতর খোঁজ-খবর নেয়ার প্রয়োজন মনে করেছেন। এ কারণেই ইমাম নাসাঈ (রহঃ) এমন অনেক বর্ণনাকারীর বর্ণিত হাদীছ গ্রহণ করেননি, যাদের নিকট থেকে ইমাম আবূদাঊদ (রহঃ) ও ইমাম তিরমিযী (রহঃ) হাদীছ গ্রহণ করেছেন।[1]

এ সম্পর্কে হাফেয ইবনে হাজার আসক্বালানী (রহঃ) বলেন, ‘এমন অনেক বর্ণনাকারী আছেন, যাদের নিকট থেকে ইমাম আবুদাঊদ ও তিরমিযী (রহঃ) হাদীছ বর্ণনা করেছেন। কিন্তু ইমাম নাসাঈ (রহঃ) তাঁদের বর্ণিত হাদীছ গ্রহণ করা হ’তে বিরত থেকেছেন; বরং বুখারী ও মুসলিমের একদল বর্ণনাকারীর নিকট থেকে হাদীছ বর্ণনা থেকেও ইমাম নাসাঈ (রহঃ) বিরত থেকেছেন।[2] হাফেয আবু আলী আন-নিসাপুরী বলেন,للنسائي شرط في الرجال أشد من شرط البخاري ومسلم ‘হাদীছ গ্রহণে ইমাম নাসাঈ (রহঃ)-এর শর্ত ইমাম বুখারী ও মুসলিম (রহঃ)-এর শর্তের চেয়েও কঠিন’।[3]

আরও দেখুন:  ইমাম আবূ হানীফা (রহঃ)

ড. আবু জামীল আল-হাসান বলেছেন, ‘এটা সুস্পষ্ট যে, আবু আলী আন-নিসাপুরীর উক্ত কথা অতিরঞ্জন ও বাড়াবাড়ি। কেননা হাদীছ গ্রহণে ইমাম বুখারী ও মুসলিমের শর্তাবলী শীর্ষস্থানীয়’।[4]

আল্লামা হাযেমী (রহঃ) বলেন, ‘ইমাম আবুদাঊদ ও নাসাঈ (রহঃ) প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্তরের রাবীদের হাদীছ গ্রহণ করেছেন। তবে তাঁরা চতুর্থ স্তর অতিক্রম করেননি’।[5]

সুনানে নাসাঈর বৈশিষ্ট্য :

সুনানে নাসাঈর এমন কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা তাকে অপরাপর হাদীছ গ্রন্থ থেকে পৃথক স্বাতন্ত্র্য দান করেছে। নিম্নে সুনানে নাসাঈর কতিপয় বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করা হ’ল।-

১. প্রায় তাকরার বা দ্বিরুক্তিমুক্ত : কুতুবুস সিত্তার অন্যান্য গ্রন্থের ন্যায় সুনানে নাসাঈতে তাকরার তথা পুনঃউল্লিখিত হাদীছের সংখ্যা কম। এতে তাকরার হাদীছ নেই বললেই চলে।[6]

২. হাদীছের দুর্বোধ্য শব্দের ব্যাখ্যা : এ গ্রন্থে কোন কোন স্থানে হাদীছের দুর্বোধ্য শব্দের ব্যাখ্যা করা হয়েছে। যেমন একটি হাদীছ উল্লেখ করার পর তিনি বলেন,الركس : طعام الجن ‘আর-রিকসু’ অর্থাৎ জিনের খাদ্য।[7] অনুরূপভাবে রাসূল (ছাঃ)-এর বাণী, لاَ تُزْرِمُوْهُ  ‘তার পেশাবে বাধা দিও না’। এর অর্থে তিনি বলেন, لاَ تَقْطَعُوْا عَلَيْهِ অর্থাৎ তার পেশাব বন্ধ করে দিও না।[8]

৩. অধিক রাবী সম্বলিত হাদীছ : ইমাম নাসাঈ স্বীয় গ্রন্থে শক্তিশালী ও ছহীহ সনদের ভিত্তিতে হাদীছ সন্নিবেশিত করেছেন। এক্ষেত্রে তিনি দশজন রাবী বিশিষ্ট হাদীছও উল্লেখ করেছেন। যেমন তিনি একটি হাদীছ উল্লেখ করে বলেন,ما أعرف إسنادا أطول من هذا ‘এর চেয়ে দীর্ঘ সনদ বিশিষ্ট হাদীছ আমার জানা নেই।[9]

৪. ফিক্বহী বিন্যাস : এ গ্রন্থের হাদীছগুলো ফিক্বহী তারতীব অনুযায়ী সুবিন্যস্ত করা হয়েছে।[10] এ গ্রন্থ শুরু হয়েছে ‘পবিত্রতা’ অধ্যায় দ্বারা এবং শেষ হয়েছে ‘পানীয় দ্রব্যের বর্ণনা’ দ্বারা। অধ্যায় বিন্যাসে মৌলিক অর্থের দিকে বিশেষভাবে লক্ষ্য রাখা হয়েছে।

৫. সকল বিষয়ের হাদীছের সন্নিবেশ : ইমাম নাসাঈ (রহঃ) এ গ্রন্থে জীবনের সকল দিক সম্পর্কিত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র শাখা-প্রশাখায় হাদীছ সন্নিবেশিত করেছেন।[11]

৬. ইলালুল হাদীছ বর্ণনা : এ গ্রন্থে ইমাম নাসাঈ (রহঃ) পৃথকভাবে শিরোনাম নির্ধারণ করে হাদীছের ইল্লত (ত্রুটি) সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।[12] হাদীছের ত্রুটি বর্ণনার পর তিনি সঠিকটা উল্লেখ করেছেন। মতানৈক্যের ক্ষেত্রে অধিক প্রাধান্যযোগ্য বিষয়টি উল্লেখ করেছেন।

৭. অনুচ্ছেদ রচনা : সুনানে নাসাঈর হাদীছের অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-পরিচ্ছেদগুলো ধারাবাহিকভাবে বিন্যস্ত। এ গ্রন্থের অনুচ্ছেদ-পরিচ্ছেদের শিরোনাম অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত ও সহজবোধ্য। হাদীছ ও শিরোনামের মধ্যে সাযুজ্য বিদ্যমান। এ গ্রন্থে তরজমাতুল বাব সংযোজনে ইমাম বুখারী (রহঃ)-এর ফিক্বহী ধারাকে অনুসরণ করা হয়েছে।[13]

৮. স্বল্পসংখ্যক তা‘লীক হাদীছ : এ গ্রন্থে ইমাম নাসাঈ (রহঃ) অতি স্বল্প সংখ্যক তা‘লীক হাদীছ[14] উল্লেখ করেছেন। এ গ্রন্থে প্রায় ১৮০টি তা‘লীক হাদীছ উল্লিখিত হয়েছে।

৯. হাদীছের মান ও স্তর বর্ণনা : এ গ্রন্থে কখনো কখনো হাদীছের স্তর ও মান বর্ণিত হয়েছে। যেমন একটি হাদীছ উল্লেখ করে তিনি বলেন, هذا حديث منكر ‘এ হাদীছটি মুনকার বা প্রত্যাখ্যাত’।[15] অনুরূপভাবে আরেকটি হাদীছ উল্লেখ করে তিনি বলেন, حديث يحيى بن سعيد هذا إسناده حسن، وهو منكر وأخاف أن يكون الغلط من محمد بن فضيل. ‘ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদ বর্ণিত এই হাদীছের সনদ হাসান। কিন্তু তিনি প্রত্যাখ্যাত। আমি আশংকা করছি যে, মুহাম্মাদ ইবনে ফুযাইলের ভ্রান্তি রয়েছে’।[16]

কখনো তিনি রাবীর ত্রুটি বর্ণনা করেছেন। যেমন তিনি বলেন, الأوزاعي لم يسمع هذا الحديث من الزهري وهذا حديث صحيح قد رواه يونس، عن الزهري. ‘আওযাঈ (রহঃ) এই হাদীছ যুহরী থেকে শুনেননি। এই হাদীছটি ছহীহ, যা ইউনুস যুহরী থেকে বর্ণনা করেছেন’।[17]

১০. সনদের অবস্থা বর্ণনা : এতে মুত্তাছিল, মুনকাতি‘, মুরসাল ইত্যাদি অবস্থা বর্ণনা করা হয়েছে। যেমন একটি হাদীছ উল্লেখ করে তিনি বলেন, مخرمة لم يسمع من أبيه شيئا ‘মাখরামাহ তার পিতা থেকে কিছুই শুনেনি’।[18] অন্যত্র একটি হাদীছ উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, الحسن، عن سمرة كتابا، ولم يسمع الحسن من سمرة إلا حديث العقيقة، ‘হাসান সামুরা (রাঃ)-এর সংকলন থেকে হাদীছটি গ্রহণ করেছেন। আর হাসান সামুরা থেকে কেবল আক্বীক্বা সম্পর্কিত হাদীছটিই শুনেছেন’।[19]

১১. অধিক সনদ উল্লেখ : ইমাম নাসাঈ (রহঃ) কোন হাদীছের একাধিক সনদ কিংবা একই হাদীছের বিভিন্ন সনদ থাকলে তাও উল্লেখ করেছেন।

১২. আহকাম সম্বলিত হাদীছ : ইমাম নাসাঈ (রহঃ) স্বীয় সুনান গ্রন্থে আহকাম সম্বলিত হাদীছ সন্নিবেশিত করেছেন।[20] ড. তাকীউদ্দীন নাদভী বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) থেকে আহকাম সম্বলিত যে সকল হাদীছ ছহীহ সাব্যস্ত হয়েছে সে সকল হাদীছ স্বীয় সুনানে নাসাঈতে একত্রিত করা ইমাম নাসাঈ (রহঃ)-এর উদ্দেশ্য ছিল। যাতে সেগুলো দ্বারা ফক্বীহগণ দলীল গ্রহণ করতে পারেন। এভাবে তিনি হাদীছ ও ফিক্বহের মাঝে সমন্বয় সাধন করেছেন’।[21]

১৩. নসবনামা উল্লেখ :

সুনানে নাসাঈতে রাবীর নাম উল্লেখের সাথে সাথে কখনো কখনো তার বংশপরিক্রমাও উল্লেখ করা হয়েছে।

১৪. কুরআনের আয়াতের উদ্ধৃতি :

এ গ্রন্থে ‘অনুচ্ছেদ’-এর অনুকূলে কুরআনুল কারীমের কোন আয়াত থাকলে তা সন্নিবেশিত করা হয়েছে। যেমন ‘তাহারাত’ অধ্যায়ে ‘ওযূ অনুচ্ছেদে’ ওযূর ফরয সমূহ বর্ণনায় সূরা মায়েদার নিম্নোক্ত আয়াত উল্লেখ করেছেন, يَا أَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُوْا إِذَا قُمْتُمْ إِلَى الصَّلاَةِ فَاغْسِلُوْا وُجُوْهَكُمْ وَأَيْدِيَكُمْ إِلَى الْمَرَافِقِ وَامْسَحُوْا بِرُءُوْسِكُمْ وَأَرْجُلَكُمْ إِلَى الْكَعْبَيْنِ ‘হে ঈমানদারগণ! যখন তোমরা ছালাতের জন্য প্রস্ত্তত হও, তখন তোমাদের মুখমন্ডল ও হস্তদ্বয় কনুইসহ ধৌত কর এবং তোমাদের মাথা মাসাহ কর এবং পদযুগল টাখনু সহ ধৌত কর’ (মায়েদাহ ৫/৬)[22]

১৫. নাসিখ-মানসূখ দৃষ্টিকোণে অনুচ্ছেদ প্রণয়ন :

ড. তাকীউদ্দীন নাদভী বলেন, ‘ইমাম নাসাঈ (রহঃ)-এর অন্যতম একটি রীতি হ’ল অনুচ্ছেদ রচনা করে তথায় মানসূখ হাদীছ সন্নিবেশিত করা। অতঃপর অপর বাবে তার নাসিখ (রহিতকারী) হাদীছ উল্লেখ করা। যেমন ‘আগুনে পাকানো খাদ্য খেয়ে ওযূ করা অনুচ্ছেদ’-এ আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে হাদীছ এনেছেন, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে বলতে শুনেছি, ‘আগুনে পাকানো খাদ্য খেয়ে তোমরা ওযূ করবে’।[23] অতঃপর আরেক বাব রচনা করেছেন এভাবে ‘আগুনে পাকানো খাদ্য খেয়ে ওযূ না করা অনুচ্ছেদ’। অত্র অনুচ্ছেদে তিনি উম্মে সালমা (রাঃ) থেকে বর্ণিত হাদীছ এনেছেন, ‘রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) (আগুনে পাকানো) রান খেলেন। অতঃপর বেলাল (রাঃ) আসলে তিনি ছালাতের জন্য বেরিয়ে গেলেন, পানি স্পর্শ করলেন না’।[24] এতে আগুনে পাকানো খাদ্য খেয়ে ওযূ না করার ইঙ্গিত রয়েছে। আল্লামা সিন্ধী বলেন, هذا نص في النسخ، ‘এ হাদীছটি নাসিখ বা রহিতকারী হওয়ার প্রমাণ বহন করে’।[25]

কুতুবে সিত্তায় সুনানে নাসাঈর স্থান :

সুনানে নাসাঈ কুতুবে সিত্তার অন্যতম গ্রন্থ। এ সম্পর্কে হাজী খলীফা স্বীয় ‘কাশফুয যুনূন’ গ্রন্থে লিখেছেন, وهو أحد الكةب السةة ‘এটা কুতুবে সিত্তার অন্যতম গ্রন্থ’।[26] তবে এটা কুতুবে সিত্তার কততম কিতাব এ ব্যাপারে বিস্তর মতভেদ আছে। যেমন খ্যাতনামা বিদ্বান আল্লামা মোল্লা আলী ক্বারী (রহঃ) ‘মিরক্বাত’ গ্রন্থে লিখেছেন, إِذَا قَالُوا: الْكُتُبُ الْخَمْسَةُ، أَوْ أُصُولُ الْخَمْسَةِ فَهِيَ: الْبُخَارِيُّ، وَمُسْلِمٌ، وَسُنَنُ أَبِي دَاوُدَ، وَجَامِعُ التِّرْمِذِيِّ، وَمُجْتَنَى النَّسَائِيِّ. ‘যখন বলা হবে কুতুবিল খামসা বা উছূলিল খামসা তখন এর মধ্যে পরিগণিত হবে যথাক্রমে বুখারী, মুসলিম, সুনানে আবু দাঊদ, জামে আত-তিরমিযী ও মুজাতাবা আন-নাসাঈ তথা সুনানে নাসাঈ।[27]

ড. সুবহী ছালেহ স্বীয় ‘উলূমুল হাদীছ’ গ্রন্থে কুতুবুস সিত্তার ধারাক্রম লিখেছেন এভাবে, أماكتب الصحاح فهي تشمل الكتب الستة البخاري ومسلم وأبي داوود والترمذي والنسائي وابن ماجة ‘ছহীহ হাদীছ গ্রন্থের মধ্যে পরিগণিত হ’ল বুখারী, মুসলিম, সুনানে আবুদাঊদ, জামে তিরমিযী, সুনানে নাসাঈ এবং সুনানে ইবনে মাজাহ’।[28]

مَعَارِفُ السُّنَن প্রণেতা বলেন, أن أول مراتب الصحاح منزلة صحيح البخاري ثم صحيح مسلم وأبي داود والترمذي والنسائي وابن ماجة- ‘ছহীহ গ্রন্থের প্রথম স্তরে রয়েছে ছহীহ বুখারী, অতঃপর ছহীহ মুসলিম, অতঃপর সুনানে আবু দাঊদ, তিরমিযী, নাসাঈ, ইবনু মাজাহ।[29] উল্লেখ্য যে, প্রচলিত ‘ছিহাহ সিত্তাহ বলা ঠিক নয়। কারণ বুখারী ও মুসলিম সুনানে আরবা‘আতে অনেক যঈফ বা দুর্বল হাদীছ রয়েছে। এর পরিবর্তে ‘কুতুবে সিত্তাহ’ বলা যেতে পারে।

আবু যাহু স্বীয় اَلْحَدِيْثُ وَالْمُحَدِّثُوْنَ গ্রন্থে লিখেছেন, ودرجته في الحديث بعد الصحيحين فهو مقدم على سنن أبي داود وسنن الترمذي ‘হাদীছশাস্ত্রে সুনানে নাসাঈর অবস্থান ছহীহায়নের পরে এবং এটা সুনানে আবু দাঊদ ও তিরমিযীর উপর অগ্রগন্য।[30] অর্থাৎ তৃতীয়।

ড. তাকীউদ্দীন নাদভী বলেন, وإن سنن النسائي ثالث الستة عند العلامة الكشميري وكذا الحازمي- ‘আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মীরী ও হাযেমীর মতে, কুতুবে সিত্তায় সুনানে নাসাঈর স্থান তৃতীয়’।[31]

যঈফ ও মাওযূ প্রসঙ্গ :

সুনানে নাসাঈতে কিছু যঈফ হাদীছ রয়েছে। তবে তা অন্যান্য সুনান গ্রন্থের তুলনায় কম। এ সম্পর্কে আললামা আবু যাহু ‘আল-হাদীছ ওয়াল মুহাদ্দিছূন’ গ্রন্থে লিখেছেন,كتاب المجتبى أقل السنن حديثا ضعيفا ورجلا مجروحا- ‘কিতাবুল মুজতাবা তথা সুনানে নাসাঈতে যঈফ হাদীছ এবং সমালোচিত রাবী কর্তৃক বর্ণিত হাদীছ নিতান্তই কম’।[32] ইবনে হাজার আসক্বালানী (রহঃ) বলেন, وفي الجملة فكتاب النسائي أقل الكتب بعد الصحيحين حديثاً ضعيفاً ورجلاً مجروحاً ويقاربه كتاب أبي داود وكتاب الترمذي ‘মোদ্দাকথা হল, নাসাঈ ছহীহাইনের পরে সবচেয়ে কম যঈফ হাদীছ ও সমালোচিত বর্ণনাকারী সম্বলিত গ্রন্থ। যা আবুদাঊদ ও তিরমিযীর নিকটবর্তী।[33]

আল-বুকাঈ شرح الألفية গ্রন্থে আল্লামা ইবনে কাছীর থেকে বর্ণনা করেছেন, إن في النسائي رجلا مجهولين أما عينا أو حالا وفيهم المجروح وفيه أحاديث ضعيفة ومعللة ومنكرة- ‘সুনানে নাসাঈতে অপরিচিত রাবী রয়েছে। সে রাবী প্রকৃতই অজ্ঞাত বা অবস্থার দিক দিয়ে অজ্ঞাত। অনুরূপভাবে এতে সমালোচিত রাবীও রয়েছে। এতে যঈফ, মু‘আল্লাল (ত্রুটিযুক্ত) ও মুনকার হাদীছ রয়েছে।[34]

ইমাম শাওকানী, ইমাম যাহাবী ও আল্লামা তাকীউদ্দীন সুবকী বলেন, ‘ছহীহাইনের পরে সুনানে আরবা‘আর অন্যান্য গ্রন্থের তুলনায় নাসাঈর সুনানগ্রন্থে যঈফ হাদীছ কম’।[35]

আল্লামা নাছিরুদ্দীন আলবানী (রহঃ) স্বীয় ‘যঈফ সুনানে নাসাঈ’ গ্রন্থে সুনানে নাসাঈর ৪৪০টি হাদীছকে যঈফ ও মাওযূ সাব্যস্ত করেছেন।[36]

আল্লামা ইবনুল জাওযী (রহঃ) সুনানে নাসাঈর দশটি হাদীছকে মাওযূ সাব্যস্ত করেছেন।[37]

ইমাম নাসাঈ (রহঃ) রচিত অন্যান্য গ্রন্থ :

ইমাম নাসাঈ (রহঃ) সুনানে নাসাঈ ছাড়াও কয়েকটি মূল্যবান গ্রন্থ রচনা করেছেন। যেমন- ১. আস-সুনানুল কুবরা, ২. আস-সুনানুছ ছুগরা, ৩. মুসনাদে আলী (রাঃ), ৪. কিতাবুল আসমা ওয়াল কুনা, ৫. কিতাবুল মুদাল্লিসীন, ৬. কিতাবুয যু‘আফা ওয়াল মাতরূকীন, ৭. ফাযায়িলুছ ছাহাবা, ৮. কিতাবুত তাফসীর, ৯. মুসনাদে ইমাম মালেক, ১০. কিতাবুল জুম‘আ, ১১. কিতাবুল খাছায়িছ ফী ফাযলে আলী ইবনি আবী তালিব ওয়া আহলিল বায়ত, ১২. কিতাবু আমালিল ইয়াওমি ওয়াল লাইলাহ, ১৩. তাসমিয়াতু ফুকাহাইল আমছার মিন আছহাবি রাসূলিল্লাহ (ছাঃ) ওয়া মান বা‘দাহুম মিন আহলিল মাদীনা, ১৪. তাসমিয়াতু মান লাম ইয়ারবী আনহু গায়রু রাজুলিন ওয়াহিদিন।[38]

চরিত্র ও তাক্বওয়া :

ইমাম নাসাঈ (রহঃ) নির্মল চরিত্র মাধুর্যের অধিকারী মুত্তাক্বী-আল্লাহভীরু মুহাদ্দিছ ছিলেন। তিনি সদাসর্বদা আল্লাহ তা‘আলার ভয়ে ভীতবিহবল থাকতেন। একদিন পরপর তিনি সারা বছর নফল ছিয়াম পালন করতেন। তিনি দিনের বেলায় ছিয়াম পালন করতেন এবং রাতে তাহাজ্জুদ ছালাতে নিমগ্ন থাকতেন। তাঁর চারজন স্ত্রী ছিল। তিনি চার স্ত্রীর মধ্যে সর্বদা সমতা বিধান করে চলতেন। পালাক্রমে তাঁদের সাথে রাত যাপন করতেন। আল্লাহ তা‘আলার ইবাদত-বন্দেগীতে তিনি সদা মশগূল ছিলেন। তিনি একাধিকবার হজ্জব্রত পালন করেছেন। হামযাহ ইবনে ইউসুফ আস-সাহমী বলেন, ولم يكن في الورع مثله- ‘আল্লাহভীরুতায় তাঁর সমকক্ষ কেউ ছিলেন না’।[39]

ইমাম দারা-কুতনী (রহঃ) আরো বলেন,وكان في غاية من الورع والتقى ‘তিনি আল্লাহভীরুতা ও পরহেযগারিতায় চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছেছিলেন’।[40]

ইমাম নাসাঈ (রহঃ)-এর অনুপম চরিত্র মাধুর্য সম্পর্কে ড. আবু জামীল লিখেছেন, ইমাম নাসাঈ (রহঃ) মিসরে গমন করে জীর্ণ-শীর্ণ পোশাকে গোপনে শায়খ হারিছ ইবনু মিসকীনের দরবারে প্রবেশ করেছিলেন। হারিছ ইবনু মিসকীন তাকে শাসনকর্তার গুপ্তচর মনে করে তাকে তাড়িয়ে দেন। অতঃপর তিনি (ইমাম নাসাঈ) হারিছ ইবনু মিসকীনের মজলিসে এসে এমন দূরত্বে অবস্থান করতেন যাতে শায়খ তার কথা-বার্তা ও আগমন বুঝতে না পারেন। তাই তিনি হারিছ ইবনু মিসকীন থেকে হাদীছ বর্ণনার ক্ষেত্রে أخبرنا বা حدثنا শব্দ ব্যবহার না করে هكذا قرئ عليه وأنا أسمع অর্থাৎ ‘এভাবেই তাঁর নিকট পড়া হয়েছে। আর এমতাবস্থায় আমি তা শুনি’ বাক্য ব্যবহার করেছেন। আর এটি তার অনন্য সাধারণ তাক্বওয়ার পরিচয়।[41]

ড. তাকীউদ্দীন নাদভী বলেন,كان على مكانة رفيعة من الورع والتقوى والإنابة والتضرع إلى الله فأوصله الله بذلك إلى المكانة العالية من العز والشرف- ‘তিনি আল্লাহভীরুতা, পরহেযগারিতা, তওবা ও বিনয়-নম্রতায় উচ্চ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত ছিলেন। তাই আল্লাহ রাববুল আলামীন তাঁকে সম্মান ও মর্যাদায় শীর্ষস্থানে উপনীত করেছিলেন।[42]

উসামা রাশাদ ওয়াছফী বলেন, ‘ইমাম নাসাঈ (রহঃ) ইবাদত-বন্দেগীতে চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছেছিলেন। রাতের বেলায় তাঁকে নফল ছালাতে দন্ডায়মান, দিনের বেলায় নফল ছিয়াম পালনকারী ব্যতীত পাওয়া যেত না। তিনি ছিলেন নিয়মিত হজ্জব্রত পালনকারী। আল্লাহর রাস্তায় জিহাদে সাড়া দানের জন্য সদা প্রস্ত্তত, সুন্নাতের পাবন্দ এবং তার সমস্ত কাজে মুত্তাকী ও মনোযোগী’।[43]

আরও দেখুন:  ইমাম ইবনে তাইমিয়্যা (রহঃ)

ড. তাকীউদ্দীন নাদভী বলেন, ‘তিনি ছিলেন সুন্নাহ প্রেমিক ও তার প্রচার-প্রসারে আগ্রহী এবং বিদ‘আত ও এতদসংশ্লিষ্ট যাবতীয় কিছু অপসন্দকারী। তাঁর কষ্ট-ক্লেশ ও শাহাদত বরণ ছিল এ বিষয়ের উত্তম দলীল। এটা তাঁর সাহসিকতা ও হক প্রকাশে দৃঢ়তার প্রমাণ। এটাই আল্লাহর মুত্তাক্বী বান্দাদের নিদর্শন।[44]

আক্বীদা :

ইমাম নাসাঈ (রহঃ) নির্ভেজাল তাওহীদের প্রচার ও প্রসারে আত্মনিয়োগ করেছিলেন। আক্বীদাগত দিক থেকে তিনি আহলেহাদীছ তথা কুরআন-সুন্নাহর একনিষ্ঠ অনুসারী বিশুদ্ধ আক্বীদায় বিশ্বাসী ছিলেন।

উসামা রাশাদ ওয়াছফী লিখেছেন, ‘ইমাম নাসাঈ (রহঃ) আক্বীদা ও মানহাজে আহলেহাদীছ ও আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। সুনানে কুবরা ও মুজতাবা তথা সুনানে নাসাঈতে উক্ত আক্বীদার প্রতিফলন ঘটেছে’।[45]

তাঁর বিশুদ্ধ আক্বীদার দৃষ্টান্ত স্বরূপ মুহাম্মাদ ইবনু আইয়ুন (রহঃ) বলেন, ‘আমি আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক (রহঃ)-কে বললাম, অমুক ব্যক্তি বলে থাকেন, যে ব্যক্তি ধারণা করে, আল্লাহ তা‘আলা বাণী,إِنَّنِيْ أَنَا اللهُ لاَ إِلَهَ إِلاَّ أَنَا فَاعْبُدْنِيْ وَأَقِمِ الصَّلاَةَ لِذِكْرِيْ ‘আমিই আল্লাহ, আমি ব্যতীত কোন মা‘বূদ নেই। অতএব আমার ইবাদত কর এবং আমার স্মরণার্থে ছালাত কায়েম কর’ (ত্ব-হা ২০/১৪) এটি মাখলূক তথা সৃষ্ট সে ব্যক্তি কাফের। তখন আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক (রহঃ) বললেন, সে সত্য বলেছে। ইমাম নাসাঈ (রহঃ) বলেন, ‘আমিও এমনটিই বলি’। আল্লাহর ছিফাতের বিষয়ে তাঁর এ মন্তব্য তাঁর আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সাক্ষ্য দেয়। যে ব্যক্তি তাঁর প্রণীত كتاب النعوت সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে দেখবে সে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট প্রমাণ পাবে’।[46]

অনুসৃত মাযহাব :

ইমাম নাসাঈ (রহঃ) কোন নির্দিষ্ট মাযহাবের অনুসারী ছিলেন, নাকি একজন মুজতাহিদ ছিলেন এ ব্যাপারে ওলামায়ে কেরামের মাঝে মতভেদ রয়েছে। শাহ আব্দুল আযীয মুহাদ্দিছ দেহলভী (রহঃ) স্বীয় ‘বুস্তানুল মুহাদ্দিছীন’ গ্রন্থে, নওয়াব ছিদ্দীক হাসান খান ভূপালী ‘আল-হিত্তাহ ফী যিকরিছ ছিহাহ সিত্তাহ’ গ্রন্থে এবং আল্লামা আনওয়ার শাহ কাশ্মীরী স্বীয় ‘ফায়যুল বারী’ গ্রন্থে ইমাম নাসাঈ (রহঃ)-কে শাফেঈ মাযহাবের অনুসারী বলে তাদের অভিমত ব্যক্ত করেছেন’।[47]

আল্লামা ইবনুল আছীর ‘জামেঊল উছূল’ গ্রন্থে লিখেছেন, وكان شافعيا، له مناسك على مذهب الشافعي، ‘তিনি শাফেঈ মাযহাবের অনুসারী ছিলেন। শাফেঈ মাযহাবের নিয়ম অনুযায়ী তাঁর হজ্জ রয়েছে।[48]

কতিপয় হানাফী আলেম বলেন,أما أبوداود والنسائي فالمشهور أنهما شافعيان ولكن الحق أنهما حنبليان- ‘ইমাম আবুদাঊদ ও ইমাম নাসাঈ (রহঃ) শাফেঈ মাযহাবের অনুসারী হিসাবে প্রসিদ্ধি লাভ করেছেন। কিন্তু সত্য কথা হ’ল, তাঁরা দু’জন হাম্বলী মাযহাবের অনুসারী ছিলেন’।[49]

আল্লামা আব্দুর রহমান মুবারকপুরী (রহঃ) তুহফাতুল আহওয়াযী গ্রন্থে লিখেছেন, لم يثبت أيضا بدليل صحيح كون الامام أبي داود والنسائي مقلدين للإمام أحمد بن حنبل في الاجتهاديات وانما هو ظن من هذا البعض وإن الظن لا يغني من الحق شيئا- ‘ছহীহ দলীলের আলোকে এ কথা সাব্যস্ত হয় না যে, ইজতেহাদী মাসআলাসমূহে ইমাম আবুদাঊদ ও নাসাঈ (রহঃ) ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (রহঃ)-এর মুক্বাল্লিদ বা অনুসারী ছিলেন। এটা কতিপয় ব্যক্তির ধারণামাত্র। আর ধারণা সত্যের কোন কাজে আসে না’।[50]

আল্লামা মুবারকপুরী আরো বলেন, كما ان البخاري رحمه الله تعالى كان متبعا للسنة عاملا بها مجتهدا غير مقلد لأحد من الأئمة الأربعة وغيرهم كذلك مسلم والترمذي وأبو داود والنسائي وابن ماجة كلهم كانوا مةبعين للسنة عاملين بها مجتهدين غير مقلدين لأحد- ‘ইমাম বুখারী (রহঃ) যেমন ছিলেন সুন্নাতের অনুসারী, তদনুযায়ী আমলকারী এবং মুজতাহিদ। ইমাম চতুষ্টয় বা অন্য কারো মুক্বাল্লিদ ছিলেন না। অনুরূপভাবে ইমাম মুসলিম, তিরমিযী, আবু দাঊদ, নাসাঈ এবং ইবনু মাজাহ (রহঃ) প্রত্যেকেই সুন্নাতের অনুসারী, তদনুযায়ী আমলকারী এবং মুজতাহিদ ছিলেন। তাঁরা কারো মুক্বাল্লিদ ছিলেন না’।[51]

সুনানে নাসাঈর আধুনিক ব্যাখ্যাকার মুহাম্মাদ বিন আগা বিন আদম (ইথিওপিয়া) বলেন, ৪২ খন্ডে সমাপ্তكان رحمه الله تعالى سالكا مسلك أهل الحريث عقيرة ومزحبا غير سقلد لأحد، كسائر أئمة الحديث، ‘ইমাম নাসাঈ (রহঃ) আক্বীদা ও মাযহাবগতভাবে আহলেহাদীছ মাসলাকের অনুসারী ছিলেন। সকল মুহাদ্দিছের ন্যায় তিনিও কারো তাক্বলীদকারী ছিলেন না’।[52]


(৩য় অংশ)

মনীষীদের দৃষ্টিতে ইমাম নাসাঈ (রহঃ)

ইলমে হাদীছ সহ ইসলামের অন্যান্য শাখায় অবদান রাখার কারণে সমসাময়িক ও পরবর্তী মনীষীগণ ইমাম নাসাঈ (রহঃ)-এর প্রশংসায় অনেক মূল্যবান উক্তি পেশ করেছেন। তন্মধ্যে কয়েকজনের উক্তি নিম্নে উল্লেখ করা হ’ল।-

১. হাফেয আলী ইবনে ওমর বলেন,كَانَ النَّسَائِيُّ أَفْقَهَ مَشَايِخِ مِصْرَ فِيْ عَصْرِهِ وَأَعْرَفَهُمْ بِالصَّحِيْحِ وَالسَّقِيْمِ وَأَعْلَمَهُمْ بِالرِّجَالِ. ‘ইমাম নাসাঈ (রহঃ) সমকালীন মিসরীয় মনীষীদের মধ্যে সবচেয়ে বড় ফকীহ, ছহীহ ও যঈফ হাদীছ সম্পর্কে সবচেয়ে বিজ্ঞ এবং রিজালশাস্ত্রে সবচেয়ে বেশী জ্ঞানী ছিলেন’।[1]

২. হাফেয যাহাবী বলেন,

وَلَمْ يَكُنْ أَحَدٌ فِيْ رَأْسِ الثَّلاَثِمِائَةِ أَحْفَظَ مِنَ النَّسَائِيِّ، وَهُوَ أَحْذَقُ بِالْحَدِيْثِ وَعِلَلِهِ وَرِجَالِهِ مِنْ مُسْلِمٍ، وَمِنْ أَبِيْ دَاوُدَ، وَمِنْ أَبِيْ عِيْسَى، وَهُوَ جَارٍ فِيْ مِضْمَارِ البُخَارِيِّ وَأَبِيْ زُرْعَةَ.

‘হিজরী তৃতীয় শতকের প্রারম্ভে ইমাম নাসাঈ (রহঃ)-এর চেয়ে হাদীছের অধিক সংরক্ষক অন্য কেউ ছিল না। হাদীছ, ইলালুল হাদীছ (হাদীছের ত্রুটি-বিচ্যুতি) এবং রিজালশাস্ত্রে তিনি ইমাম মুসলিম, আবূ দাঊদ এবং আবূ ঈসা আত-তিরমিযী (রহঃ)-এর চেয়েও পারদর্শী ছিলেন। তিনি ইমাম বুখারী ও আবূ যুর‘আ (রহঃ)-এর সমপর্যায়ের মুহাদ্দিছ ছিলেন’।[2] তিনি আরো বলেন, وكان من بحور العلم، مع الفهم، والاتقان، والبصر، ونقد الرجال، وحسن التأليف. ‘ইমাম নাসাঈ (রহঃ) ইলমে হাদীছের সমুদ্রতল্য মহাজ্ঞানী, সূক্ষ্মজ্ঞানী, সূক্ষ্মদর্শী, ইলমুর রিজালের সমালোচক ও বরেণ্য গ্রন্থপ্রণেতা ছিলেন’।[3]

৩. মানছূর আল-ফকীহ ও আবূ জা‘ফর আহমাদ ইবনে মুহাম্মাদ আত-তাহাবী বলেন, أبو عبد الرحمن النسائي إمام من أئمة المسلمين، وكذلك أثنى عليه غير واحد من الأئمة وشهدوا له بالفضل والتقدم في هذا الشأن. ‘ইমাম আবূ আব্দুর রহমান আন-নাসাঈ (রহঃ) হাদীছ শাস্ত্রের ইমামগণের মধ্যে অন্যতম ইমাম ছিলেন। অনুরূপভাবে অনেক মনীষী তাঁর ভূয়সী প্রশংসা করেছেন এবং এ বিষয়ে তাঁর মর্যাদা ও অগ্রগামিতার স্বীকৃতি দিয়েছেন’।[4]

৪. হাফেয আবূ আলী আন-নীসাপুরী বলেন,

رأيت من أئمة الحديث أربعة في وطني وأسفاري: النسائي بمصر، وعبدان بالأهواز، ومحمد بن إسحاق، وإبراهيم بن أبي طالب بنيسابور.

‘আমি স্বদেশে ও প্রবাসে চারজন প্রখ্যাত মুহাদ্দিছকে দেখেছি। তাঁরা হলেন, মিসরে ইমাম নাসাঈ (রহঃ), আহওয়াযে আবদান (রহঃ), নীসাপুরে মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক এবং ইবরাহীম ইবনে আবূ তালিব (রহঃ)।[5] তিনি আরো বলেন, اَلنَّسَائِيُّ إِمَامٌ فِي الْحَدِيثِ بِلاَ مُدَافَعَةٍ، ‘নাসাঈ ইলমে হাদীছের অপ্রতিদ্বন্দ্বী ইমাম ছিলেন’।[6]

৫. ইমাম দারাকুতনী (রহঃ) বলেন, أبو عبد الرحمن الإمام النسائي مقدم على كل من يذكر بعلم الحديث، وبجرح الرواة وتعديلهم في زمانه. ‘স্বীয় যুগে ইলমে হাদীছ, রাবীদের সমালোচনা এবং তাঁদের ন্যায়পরায়ণতা সাব্যস্তকরণে যাঁদেরকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করা হয়, ইমাম আবূ আব্দুর রহমান আন-নাসাঈ (রহঃ) তাঁদের সকলের উপরে অগ্রগামী ছিলেন’।[7]

৬. মুহাম্মাদ ইবনে সাঈদ আল-বারুদী বলেন,ذكرت النسائي لقاسم المطرز فقال هو إمام أو يستحق أن يكون إماما ‘আমি কাসেম আল-মুতরাযের নিকট ইমাম নাসাঈ (রহঃ)-এর কথা উল্লেখ করলাম। তখন তিনি বললেন, ইলমে হাদীছের তিনি একজন ইমাম অথবা ইমাম হওয়ার যোগ্য’।[8]

৭. হাফেয আবূ আব্দুল্লাহ ইবনে মানদাহ বলেন,

اَلَّذين أخرجُوا الصَّحِيحَ وميزوا الثَّابِتَ من الْمَعْلُولِ وَالْخَطَأَ من الصَّوَابِ أرْبَعَةٌ : البُخَارِيّ، وَ مُسلم، أَبُو دَاوُد، وَأَبُو عبد الرَّحْمَن النَّسَائِيُّ

‘যাঁরা ছহীহ হাদীছ সংকলন করেছেন এবং ত্রুটিযুক্ত থেকে নির্ভরযোগ্য হাদীছগুলো পৃথক করেছেন এবং ভুল থেকে সঠিক বের করেছেন, তাঁরা হ’লেন চার জন। যথা- ১. ইমাম বুখারী (রহঃ), ২. ইমাম মুসলিম (রহঃ), ৩. ইমাম আবূ দাঊদ (রহঃ), ৪. ইমাম আবূ আব্দুর রহমান আন-নাসাঈ (রহঃ)।[9]

৮. আবু সাঈদ ইবনে ইউনুস বলেন, كَانَ إِمَامًا فِي الْحَدِيْثِ ثِقَةً ثَبْتًا حَافِظًا-  ‘ইমাম নাসাঈ (রহঃ) ইলমে হাদীছের ইমাম, নির্ভরযোগ্য, বিশ্বস্ত ও হাফেয ছিলেন’।[10]

৯. আল্লামা তাজুদ্দীন সুবকী (রহঃ) বলেন,

سمعت شيخنا أبا عَبد الله الذهبي الحافظ، وسألته: أيهما أحفظ: مسلم بن الحجاج صاحب الصحيح، أو النَّسَائي؟ فقال: النَّسَائي. ثم ذكرت ذلك للشيخ الإمام الوالد تغمده الله برحمته، فوافق عليه.

‘আমি আমাদের উস্তাদ হাফেয আয-যাহাবী থেকে শুনেছি, আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ছহীহ মুসলিমের সংকলক ইমাম মুসলিম ইবনুল হাজ্জাজ (রহঃ) এবং ইমাম নাসাঈ (রহঃ)-এর মধ্যে ইলমে হাদীছের অধিক সংরক্ষক কে? উত্তরে তিনি বললেন, ইমাম নাসাঈ (রহঃ)। অতঃপর এ বিষয়টি আমার পিতা তাকীউদ্দীন সুবকী-এর নিকট আলোচনা করলে তিনি ইমাম যাহাবীর অভিমতকে সমর্থন করেন’।[11]

১০. আবূ আবদির রহমান মুহাম্মাদ ইবনুল হোসাইন আস-সুলামী বলেন,

سألت أَبَا الْحَسَن علي بْن عُمَر الدَّارَقُطْنِيَّ الْحَافِظَ، فقلت: إذا حدث مُحَمَّد بْن إسحاق بْن خزيمة وأَحْمَد بْن شعيب النَّسَائي حديثا من تقدم منهما؟ قال: النَّسَائي لأنه أسند، على أني لا أقدم على النَّسَائي أحدا وإن كَانَ ابْن خزيمة إماما ثبتا معدوم النظير.

‘হাফেয আবুল হাসান আলী ইবনে ওমর আদ-দারাকুতনী (রহঃ)-কে জিজ্ঞেস করলাম, যখন মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক ইবনে খুযায়মা (রহঃ) ও ইমাম আহমাদ ইবনে শো‘আইব আন- নাসাঈ (রহঃ) কোন হাদীছ বর্ণনা করবেন, তখন এ দু’জনের মধ্যে কার বর্ণিত হাদীছকে আপনি অগ্রাধিকার দিবেন? উত্তরে তিনি বললেন, ইমাম নাসাঈ (রহঃ)-এর হাদীছকে। কেননা তাঁর হাদীছের সনদ অত্যন্ত সুদৃঢ় ও মুত্তাছিল। আমি ইমাম নাসাঈ (রহঃ)-এর ওপর অন্য কাউকে অগ্রাধিকার দিব না। যদিও ইবনে খুযায়মা নির্ভরযোগ্য ও অতুলনীয় ইমাম ছিলেন’।[12]

১১. হাকিম (রহঃ) বলেন,كلام النسائي على فقه الحديث كثير، ومن نظر في سننه تحير في حسن كلامه. ‘ফিকহুল হাদীছ সম্পর্কে ইমাম নাসাঈ (রহঃ)-এর অনেক মূল্যবান বাণী রয়েছে। যে ব্যক্তি তাঁর সংকলিত সুনানের প্রতি দৃষ্টিপাত করবে, সে তাঁর মনোহরী কথামালা দেখে বিস্ময়াভিভূত হয়ে যাবে’।[13]

১২. নওয়াব ছিদ্দীক্ব হাসান খান (রহঃ) বলেন,

وكان أحد أعلام الدين وأركان الحديث، إمام أهل عصره ومقدمهم وعمدتهم وقدوتهم بين أصحاب الحديث وجرحه وتعديله، معتبر بين العلماء-

‘ইমাম নাসাঈ (রহঃ) দ্বীন ইসলামের একজন সুপন্ডিত, ইলমে হাদীছের স্তম্ভ, স্বীয় যুগের ইমাম, তাঁদের মধ্যে অগ্রগামী, মুহাদ্দিছগণের স্তম্ভ ও তাদের আদর্শ ছিলেন। তিনি জারাহ ওয়াত তা‘দীল বিশেষজ্ঞদের ইমাম এবং বিদ্বানগণের মাঝে গ্রহণযোগ্য ছিলেন’।[14]

১৩. আল্লামা ইবনুল জাওযী (রহঃ) বলেন,وكان إماما في الحديث ثبتا حافظا فقيها- ‘ইমাম নাসাঈ (রহঃ) হাদীছের ইমাম, নির্ভরযোগ্য, হাফেয ও ফক্বীহ ছিলেন’।[15]

শী‘আ অপবাদ আরোপ :

ইমাম নাসাঈ (রহঃ) মুসলিম বিশ্বের জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রসমূহে ব্যাপকভাবে পরিভ্রমণ শেষে মিসরে বসতি স্থাপন করেন। দীর্ঘদিন মিসরে বসবাস করার পর প্রতিকূল অবস্থার কারণে ৩০২ হিজরীতে দামেশকে চলে আসেন। দামেশকে পৌঁছে তিনি দেখতে পেলেন যে, জনসাধারণের অধিকাংশই বনী উমাইয়ার পক্ষে এবং আলী (রাঃ)-এর বিপক্ষে। তখন তিনি জনগণের মনোভাব ও আক্বীদা সংশোধনের লক্ষ্যে আলী (রাঃ) ও তাঁর পরিবারের প্রশংসায় ‘কিতাবুল খাছায়িছ ফী ফাযলে আলী ইবনি আবী তালিব ওয়া আহলিল বায়ত’ নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন। তিনি এ গ্রন্থটি দামেশকের জামে মসজিদে সকলকে পড়ে শুনানোর ইচ্ছা করেন। যাতে বনী উমাইয়ার শাসনের ফলে সাধারণ লোকদের মাঝে যে ঈমানী দুর্বলতা সৃষ্টি হয়েছে, তা দূর হয়ে যায়। কিন্তু এর সামান্য অংশ পড়ার পর এক ব্যক্তি তাঁকে জিজ্ঞেস করে, আপনি কি আমীরুল মুমিনীন মু‘আবিয়া (রাঃ)-এর প্রশংসায় কিছু লিখেছেন? জবাবে ইমাম নাসাঈ (রহঃ) বললেন, মু‘আবিয়ার জন্য তো এটাই যথেষ্ট যে, সে এ থেকে সবসময় বাদ পড়ুক। তাঁর প্রশংসায় লেখার তো কিছু নেই। এ কথা শোনার সাথে সাথেই লোকেরা তাঁর ওপর হামলা চালায় এবং শী‘আ শী‘আ বলে তাঁকে মারধর করতে থাকে। ফলে তিনি মরণাপন্ন হয়ে পড়েন।[16]

মূলতঃ তিনি শী‘আ ছিলেন না। এটি ছিল তাঁর প্রতি চরম মিথ্যা অপবাদ। তিনি যে শী‘আ ছিলেন না তার জাজ্বল্য প্রমাণ হ’ল, তিনি স্বীয় فضائل الصحابة গ্রন্থে ছাহাবীদের তালিকায় আলী (রাঃ)-কে অন্যান্য বিশিষ্ট ছাহাবী তথা খলীফা চতুষ্টয়ের অন্যান্যদের উপর প্রাধান্য দেননি। তিনি যদি শী‘আ হ’তেন তাহ’লে আলী (রাঃ)-এর আলোচনা সর্বাগ্রে করতেন। যেমনটি অন্যান্য শী‘আরা করে থাকে।

উসামা রাশাদ ওয়াছফী আগা বলেন,

ثم إنه قد صنف كتاب فضائل الصحابة وبدأ بأبي بكر ثم عمر ثم عثمان ثم جعل عليا رضي الله عنه رابعهم وهذا يدل على أنه لا يقدم عليا حتى على عثمان-

‘অতঃপর তিনি ফাযাইলুছ ছাহাবা গ্রন্থ প্রণয়ন করেন এবং এতে আবূ বকর (রাঃ)-এর (জীবনী ও মর্যাদা শীর্ষক আলোচনার) মাধ্যমে শুরু করেন। অতঃপর ওমর (রাঃ), তারপর ওছমান (রাঃ), তারপর চতুর্থ পর্যায়ে আলী (রাঃ)-এর আলোচনা করেছেন। এটা প্রমাণ বহন করে যে, তিনি আলী (রাঃ)-কে অন্যদের চেয়ে এমনকি ওছমান (রাঃ)-এর চেয়েও প্রাধান্য দেননি’।[17]

অনুরূপভাবে ড. তাকীউদ্দীন নাদভী বলেন,أنه صنف كةاب فضائل الصحابة فاةضح بذلك أن شبهة الةشيع لا أساس لها في الحقيقة-  ‘ইমাম নাসাঈ (রহঃ) ‘ফাযাইলুছ ছাহাবা’ গ্রন্থ প্রণয়ন করেছেন। এতে সুস্পষ্ট হয়েছে যে, তাঁর প্রতি শী‘আবাদের সন্দেহ করার কোন প্রকৃত ভিত্তি নেই’।[18]

আরও দেখুন:  মুহাম্মাদ বিন সালেহ আল-উসাইমীন (রহ:)

শুধু তাই নয়, মু‘আবিয়া (রাঃ) সম্পর্কেও তাঁর খারাপ ধারণা ছিল না। আবূ আলী আল-হাসান ইবনু আবূ হেলাল বলেন, ইমাম নাসাঈ (রহঃ)-কে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর ছাহাবী মু‘আবিয়া ইবনু আবূ সুফিয়ান (রাঃ) সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হ’লে  তিনি বলেন, ইসলাম একটি গৃহের ন্যায় যার একটি দরজা রয়েছে, আর ইসলামের সে দরজা হ’ল ছাহাবায়ে কেরাম। অতঃপর যে ব্যক্তি ছাহাবায়ে কেরামকে দিয়ে ইসলাম পেতে চায় সে ঐ ব্যক্তির মত যে দরজায় করাঘাত করে গৃহে প্রবেশ করতে চায়। তিনি আরও বলেন, যে ব্যক্তি মু‘আবিয়া (রাঃ)-কে কষ্ট দিয়ে ইসলাম পেতে চায়, সে যেন ছাহাবায়ে কেরামকে কষ্ট দিয়ে ইসলাম পেতে চায়।

উপরোক্ত কথাগুলো তার চূড়ান্ত বদান্যতার পরিচয়। কেননা তিনি এটা সন্দেহাতীতভাবে বর্ণনা করেছেন যে, ইমাম নাসাঈ (রহঃ)-এর উপর শী‘আ মতাবলম্বী হওয়ার যে মিথ্যারোপ করা হয়েছে তা থেকে তিনি সম্পূর্ণরূপে মুক্ত’।[19]

ইমাম নাসাঈ (রহঃ) মু‘আবিয়া (রাঃ)-এর প্রতি বিরাগ ছিলেন না, তার আরো একটি সমুজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হ’ল, তিনি সুনানে কুবরাতে মু‘আবিয়া (রাঃ)-এর সূত্রে ৬৩টি হাদীছ বর্ণনা করেছেন। যদি মু‘আবিয়া (রাঃ) সম্পর্কে তাঁর বিরূপ মনোভাব থাকত, তাহ’লে তিনি কিছুতেই তাঁর সূত্রে হাদীছ বর্ণনা করতেন না।[20]

মৃত্যু ও দাফন :

শী‘আ অপবাদের অভিযোগে তাঁকে বেদম প্রহার করা হ’লে তিনি মরণাপন্ন হয়ে পড়েন। খাদেম তাঁকে সেখান থেকে উঠিয়ে বাড়িতে নিয়ে যায়। বাড়িতে পৌঁছে তিনি বলেন, আমাকে মক্কায় পৌঁছে দাও, যাতে আমার মৃত্যু মক্কায় বা মক্কার রাস্তায় হয়। কথিত আছে যে, মক্কায় পৌঁছার পর তিনি মৃত্যুবরণ করেন’।[21]

হাফেয যাহাবী ‘তাযকিরাতুল হুফ্ফায’ গ্রন্থে লিখেছেন, وَتُوُفِّيَ بِفِلِسْطِينَ يَوْمَ الْاثْنَيْنِ لِثَلاَثِ عَشْرَةَ خَلَتْ مِنْ صَفَرٍ سَنَةَ ثَلاَثٍ وَثَلاَثِمِائَةٍ. ‘ইমাম নাসাঈ (রহঃ) ৩০৩ হিজরীর ছফর মাসের ১৩ তারিখ সোমবার ফিলিস্তীনে মৃত্যুবরণ করেন’।[22]

ঐতিহাসিক ইবনে খাল্লিকান বলেন, إِنَّهُ تُوُفِّيَ فِيْ شَعْبَانَ مِنْ هذِهِ السَّنَةِ ‘একই বছরের শা‘বান মাসে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।[23] মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৮ বছর[24] মতান্তরে ৮৯ বছর’।[25]

ছাফা ও মারওয়া পাহাড়ের পাদদেশে তাঁকে দাফন করা হয়।[26] অন্য বর্ণনায় এসেছে, হাফেয আবূ আমির মুহাম্মাদ ইবনে সাদুন আল-আবদারী বলেন,

مَاتَ أَبُو عَبْدِ الرَّحْمَنِ النَّسَائِيُّ بِالرَّمْلَةِ مَدِينَةِ فِلِسْطِيْنَ يَوْمَ الْإِثْنَيْنِ لِثَلاَثِ عَشْرَةَ لَيْلَةً خَلَتْ مِنْ صَفَرٍ سَنَةَ ثَلاَثٍ وَثَلاَثِمِائَةٍ، وَدُفِنَ بِبَيْتِ المقدسِ.

‘ইমাম আবূ আব্দুর রহমান আন-নাসাঈ (রহঃ) ফিলিস্তীনের রামলা নগরীতে ৩০৩ হিজরীর ১৩ই ছফর সোমবার রাত্রে মৃত্যুবরণ করেন এবং বায়তুল মুক্বাদ্দাসের সন্নিকটে তাঁকে দাফন করা হয়’।[27]

ইমাম নাসাঈ (রহঃ)-এর জীবনী থেকে শিক্ষণীয় বিষয়

ইলমে হাদীছের প্রচার-প্রসার, হাদীছ সংকলন ও সংরক্ষণ এবং জারহ ও তা‘দীল নির্ণয়ে ইমাম নাসাঈ (রহঃ)-এর অবদান অতুলনীয়। এ ক্ষণজন্মা মহামনীষীর জীবনের প্রতিটি পরতে পরতে রয়েছে আমাদের জন্য বহু শিক্ষণীয় বিষয়। নিম্নে কিছু শিক্ষণীয় বিষয় উল্লেখ করা হ’ল।-

১. সত্য আপোষহীন : সত্য-মিথ্যার দ্বন্দ্ব চিরন্তন। বাতিলের ধ্বজাধারী তাগূতী শক্তি সত্যের আলোকে নির্বাপিত করার লক্ষ্যে সর্বশক্তি নিয়োগ করতে সচেষ্ট, এটাই স্বাভাবিক। এক্ষেত্রে মিথ্যার সাথে আপোষ না করে সত্যের পথে হিমাদ্রির ন্যায় অটল ও অবিচল থাকতে হবে। যেমনিভাবে ইমাম নাসাঈ (রহঃ) মিথ্যার সাথে আপোষ না করে সত্যের উপর অটল ও অবিচল ছিলেন।

২. পার্থিব জীবন কুসুমাস্তীর্ণ নয় : এ পৃথিবীতে কারো জীবনই কুসুমাস্তীর্ণ নয়। কণ্টকাকীর্ণ পিচ্ছিল পথ মাড়িয়েই অভীষ্ট লক্ষ্যে পেঁঁŠছতে হয়। এক্ষেত্রে ইমাম নাসাঈ (রহঃ) ছিলেন এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

৩. মিথ্যা অপবাদ আরোপ : এ পৃথিবীতে নবী-রাসূল থেকে শুরু করে যাঁরাই সত্য প্রচারে ব্রতী হয়েছেন, তাঁরাই মিথ্যা অপবাদে অভিযুক্ত হয়েছেন। সত্য প্রচারকের বিরুদ্ধে মিথ্যা

অপবাদ আরোপ করা তাগূতী শক্তির চূড়ান্ত হাতিয়ার। যা থেকে ইমাম নাসাঈ (রহঃ)ও রক্ষা পাননি। সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে তাঁকে ‘শী‘আ’ অপবাদে অভিযুক্ত করা হয়েছিল। এ যুগেও যারা সত্য প্রচার-প্রসারে ব্রতী হবেন তাদের বিরুদ্ধে লা-মাযহাবী, জঙ্গী, কাদিয়ানী, রাষ্ট্রদ্রোহী স্থান-কাল-পাত্র ভেদে ইত্যাকার মিথ্যা অভিযোগ আরোপিত হবে, এটাই স্বাভাবিক। সেক্ষেত্রে ধৈর্য ধারণ করতে হবে।

৪. আত্মোৎসর্গ : হক প্রচার ও প্রতিষ্ঠায় সর্বদা জীবনের শেষ রক্তবিন্দু বিসর্জন দিতে প্রস্ত্তত থাকতে হবে। যেমনিভাবে ইমাম নাসাঈ (রহঃ) জীবনের শেষ রক্তবিন্দু সত্য প্রতিষ্ঠায় ব্যয় করেছিলেন।

৫. দ্বীন ও দুনিয়ার মাঝে সমন্বয় সাধন : দ্বীন-দুনিয়ার মাঝে সমন্বয় সাধনে ইমাম নাসাঈ (রহঃ) এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। দুনিয়াবী ক্ষেত্রে তাঁর যেমন চারজন স্ত্রী ছিল। তেমনি দ্বীন পালনের ক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন তাহাজ্জুদগুযার এবং নফল ছিয়ামে অভ্যস্ত।

৬. অধ্যবসায় : শিক্ষার্জন ও গ্রন্থ প্রণয়নে ইমাম নাসাঈ (রহঃ) কঠোর অধ্যবসায়ের পরিচয় দিয়েছেন। শিক্ষার্জনে শুধু নিজ দেশের গন্ডিতে আবদ্ধ না থেকে পিপাসিত চাতকের ন্যায় দেশ-বিদেশের সমকালীন মহামনীষীদের দ্বারস্থ হয়েছেন। তিনি জীবনের অধিকাংশ সময় ব্যয় করেছেন শিক্ষার্জন ও গ্রন্থ প্রণয়নে। যার জ্ঞান সাগরে এখনও আমরা অবগাহন করে চলছি।

পরিশেষে দরবারে ইলাহীতে প্রার্থনা জানাই আল্লাহ রাববুল আলামীন ইমাম নাসাঈ (রহঃ)-এর এ অনবদ্য অবদান কবুল করুন এবং তাঁকে জান্নাতুল ফেরদাউস দান করুন-আমীন!

 

লেখক: কমারুযযামান বিন আব্দুল  বারী

প্রধান মুহাদ্দিছ, বেলটিয়া কামিল মাদরাসা, জামালপুর।



   


ফুটনোট:

(১ম অংশ)

[1]. হাজী খলীফা, কাশফুয যুনূন (বৈরূত : দারু ইহইয়াইত তুরাছিল আরাবী, তাবি), ১/১০০৬ পৃঃ।

[2]. তারীখুত তাশরীইল ইসলামী, পৃঃ ৯৫।

[3]. জালালুদ্দীন সুয়ূতী, মুকাদ্দামাতু যাহারুর রিবা আলাল মুজতাবা (বৈরূত : দারু ইহইয়াইত তুরাছিল আরাবী, তাবি), ২ পৃঃ।

[4]. কাশফুয যুনূন, ১/১০৬ পৃঃ; মিফতাহুল উলূম ওয়াল ফুনূন, পৃঃ ৬৫।

[5]. হাফেয শামসুদ্দীন আয-যাহাবী, তাযকিরাতুল হুফফায (বৈরূত : দারুল কুতুবিল ইলমিয়াহ, তাবি), ২/৬৯৮ পৃঃ; ইবনুল ইমাদ হাম্বলী, শাযারাতুয যাহাব ফী আখবারে মান যাহাবা (বৈরূত : দারুল ফিকার, তাবি), ২/২৩৯ পৃঃ।

[6]. হাফেয ইবনু কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়াহ (বৈরূত : দারু ইহইয়াইত তুরাছিল আরাবী, ১৯৯৩ খ্রিঃ/১৪১৩হিঃ), ১১/১৪০ পৃঃ; হাফেয ইবনু হাজার আসক্বালানী, তাহযীবুত তাহযীব (বৈরূত : দারু ইহইয়াইত তুরাছিল আরাবী, ১৯৯৩ খ্রিঃ/১৪১৩হিঃ), ১/২৭ পৃঃ।

[7]. শাহ আব্দুল আযীয মুহাদ্দিছ দেহলভী, বুস্তানুল মুহাদ্দিছীন, বঙ্গানুবাদ: ড. আ.ফ.ম. আবু বকর সিদ্দীক (ঢাকা : ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ২০০৪খ্রিঃ/১৪২৫হিঃ), পৃঃ ২৪৪।

[8]. হাফেয শামসুদ্দীন আয-যাহাবী, সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা (বৈরূত : মুআস্সাসাতুর রিসালাহ, ১৯৯৬ খ্রিঃ/১৪১৭হিঃ), ১৪/১২৫ পৃঃ।

[9]. তারীখুত তাশরীইল ইসলামী, পৃঃ ৯৫।

[10]. ইসলামী বিশ্বকোষ, ১৪/৩৯ পৃঃ।

[11]. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়াহ, ১১/১৪১ পৃঃ; তাহযীবুত তাহযীব, ১/২৮ পৃঃ।

[12]. নওয়াব ছিদ্দীক হাসান খান কন্নৌজী, আল-হিত্তাহ ফী যিকরিছ ছিহাহ সিত্তাহ (বৈরূত : দারুল কুতুবিল ইলমিয়াহ, ১৯৮৫ খ্রিঃ), ২৫৩ পৃঃ।

[13]. মুহাম্মাদ আবু যাহূ, আল-হাদীছ ওয়াল মুহাদ্দিছূন (আল-মাকতাবাতুত তাওফীকিয়াহ, তাবি), ৩৫৭ পৃঃ।

[14]. ড. আব্দুল্লাহ মুছতফা মুরতাযা, রুবাঈয়্যতুল ইমাম আন-নাসাঈ ফিস সুনানিল কুবরা, অপ্রকাশিত এম.এ থিসিস, গাযা : জামে‘আতুল আযহার, ২০১২ ইং/১৪৩৩ হিঃ, পৃঃ ১৩।

[15]. ঐ।

[16]. ড. তাকীউদ্দীন নাদভী, আ‘লামুল মুহাদ্দিছীন, (বৈরূত : দারুল বাশায়ির আল-ইসলামিয়্যাহ, ২০০৭ ইং/১৪২৮ হিঃ), পৃঃ ২৫০-২৫১।

[17]. রুবাঈয়্যাতুল ইমাম আন-নাসাঈ ফিস সুনানিল কুবরা, পৃঃ ১৪।

[18]. হায়াতুল মুছান্নিফীন, পৃঃ ৬২।

[19]. প্রাগুক্ত, ১৪ পৃঃ।

[20]. বুস্তানুল মুহাদ্দিছীন, ২৪৪ পৃঃ।

[21]. আ‘লামুল মুহাদ্দিছীন, ২৫১ পৃঃ।

[22]. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়াহ, ১১/১৪০ পৃঃ।

[23]. তাহযীবুল কামাল, ১/৩২৯ পৃঃ।

[24]. সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা, ১৪/১২৭ পৃঃ।

[25]. রুবাঈয়্যাতুল ইমাম আন-নাসাঈ ফিস সুনানিল কুবরা, পৃঃ ১৪।

[26]. আ‘লামুল মুহাদ্দিছীন, পৃঃ ২৫২।

[27]. প্রাগুক্ত, ১৪/১২৫-২৭ পৃঃ।

[28]. রুবাঈয়্যাতুল ইমাম আন-নাসাঈ ফিস সুনানিল কুবরা, পৃঃ ২৩।

[29]. প্রাগুক্ত,  পৃঃ ২৫২।

[30]. তাহযীবুল কামাল ফী আসমাইর রিজাল, ১৪/৩২৯-৩৩৩ পৃঃ।

[31]. আল-হাদীছ ওয়াল মুহাদ্দিছূন, পৃঃ ৪০৯।

[32]. ড. আবু জামীল আল-হাসান আল-আলামী, উম্মাহাতু কুতুবিল হাদীছ ওয়া মানাহিজুত তাছনীফ ইনদাল মুহাদ্দিছীন (২০০৫ইং/১৪২৬ হিঃ), পৃঃ ১২৪; ড. মুহাম্মাদ ইবনু মাত্বার আয-যাহরানী, তাদভীনুস সুন্নাতিন নাবাবিয়্যাহ (মদীনা মুনাওয়ারাহ : দারুল খুযায়রী, ১৯৯৮ খ্রিঃ), পৃঃ ১৫৯-১৬০।

[33]. মুকাদ্দামাতু তুহফাতিল আহওয়াযী, ১/১০৫ পৃঃ।

[34]. আল-হিত্তাহ ফী যিকরিছ ছিহাহ আস-সিত্তাহ, পৃঃ ২১৯।

[35]. আ‘লামুল মুহাদ্দিছীন, পৃঃ ২৫৯।

[36]. মুকাদ্দামাতু তুহফাতিল আহওয়াযী, ১/১০৫ পৃঃ।

[37]. বুস্তানুল মুহাদ্দিছীন, পৃঃ ২৪৫।

[38]. মিফতাহুল উলূম ওয়াল ফুনূন, পৃঃ ৬৮।

[39]. শায়খ নাছিরুদ্দীন আলবানী কৃত তাহকীক সুনান নাসাঈ দ্রঃ।

[40]. মিফতাহুল উলূম ওয়াল ফুনূন, পৃঃ ৩২।

[41]. ইসলামী বিশ্বকোষ, ১৪/৩৯ পৃঃ।

[42]. মাওলানা আব্দুর রহীম, হাদীস সংকলনের ইতিহাস, পৃঃ ৩৮৮।

[43]. আল-হাদীছ ওয়াল মুহাদ্দিছূন, পৃঃ ৪০৯।

[44]. আ‘লামুল-মুহাদ্দিছীন, পৃঃ ২৬০।

[45]. আল-হাদীছ ওয়াল মুহাদ্দিছূন, পৃঃ ৪১০।

[46]. ঐ।

[47]. মুকাদ্দামাতু যাহরির রুবা আলাল মুজতাবা, পৃঃ ৪।

[48]. আল-হাদীছ ওয়াল মুহাদ্দিছূন, পৃঃ ৩৫৮।

[49]. তাদভীনুস সুন্নাহ, পৃঃ ১৬০-১৬১।

 

(২য় অংশ)

[1]. হাদীস সংকলনের ইতিহাস, পৃঃ ৪৪৮; মুক্বাদ্দামাতু যাহরির রুবা আলাল মুজতাবা, পৃঃ ৩।

[2]. আবু যাহূ, আল-হাদীছ ওয়াল মুহাদ্দিছূন, পৃঃ ৪১০।

[3]. মুক্বাদ্দামাতু তুহফাতিল আহওয়াযী, ১/১০৫ পৃঃ; কাশফুয যুনূন, ১/১০০৬ পৃঃ; মুক্বাদ্দামাতু যাহরির রিবা আলাল মুজতাবা, পৃঃ ৪।

[4]. উম্মাহাতুল কুতুবিল হাদীছ, পৃঃ ১২২।

[5]. ঐ, পৃঃ ১২৪।

[6]. আত-তুহফাতু লিতালিবিল হাদীছ, পৃঃ ৩০।

[7]. নাসাঈ হা/২৪।

[8]. নাসাঈ হা/৫৩।

[9]. নাসাঈ হা/৯৯৬।

[10]. আত-তুহফাতু লিতালিবিল হাদীছ, পৃঃ ৩০।

[11]. ইসলামী বিশ্বকোষ, ১৪/৩৯ পৃঃ।

[12]. মুকাদ্দামাতু যাহরির রুবা আলাল মুজতাবা, ৪ পৃঃ।

[13]. আত-তুহফাতু লিতালিবিল হাদীস, পৃঃ ৩০, ৩১, ৬০।

[14]. কোন কোন গ্রন্থকার কোন হাদীছের পূর্ণ সনদকে বাদ দিয়ে কেবল মূল হাদীছটিই বর্ণনা করেছেন। এরূপ করাকে তালীক বলে। কখনো কখনো তালীকরূপে বর্ণিত হাদীছকেও ‘তালীক’ বলে।

[15]. নাসাঈ হা/১৭৮২।

[16]. নাসাঈ হা/২১৫১।

[17]. নাসাঈ হা/৩২১৫।

[18]. নাসাঈ হা/৪৩৮।

[19]. নাসাঈ হা/১৩৮০।

[20]. উম্মাহাতু কুতুবিল হাদীছ, পৃঃ ১২১।

[21]. আ‘লামুল মুহাদ্দিছীন, পৃঃ ২৬৩।

[22]. ঐ, পৃঃ ২৬৫।

[23]. নাসাঈ হা/১৭১, ১৭২, ১৭৩।

[24]. নাসাঈ হা/১৮২, ১৮৪।

[25]. আ‘লামুল মুহাদ্দিছীন, পৃঃ ২৭৩-২৭৪।

[26]. কাশফুয যুনূন, ১/১০০৬ পৃঃ।

[27]. মুকাদ্দামাতু তুহফাতিল আহওয়াযী, ১/৮৯ পৃঃ।

[28]. উলূমুল হাদীছ ওয়া মুছতালাহু, পৃঃ ১১৭-১৮।

[29]. মা‘আরিফুযু সুনান, ১/১৬ পৃঃ।

[30]. আল-হাদীছ ওয়াল মুহাদ্দিছূন, পৃঃ ৪১০।

[31]. আলামুল মুহাদ্দিছীন, পৃঃ ২৬২।

[32]. আল-হাদীছ ওয়াল মুহাদ্দিছূন, পৃঃ ৪১০।

[33]. ইবনু হাজার আসক্বালানী, আন-নুকাত আলা কিতাবি ইবনিছ ছালাহ, ১/৭৬; মাতার আয-যাহরানী, তাদবীনুস সুন্নাহ ১/১৪২।

[34]. কাশফুয যুনূন, ১/১০০৬ পৃঃ; আল-হিত্তাহ ফী যিকরিছ ছিহাহ সিত্তাহ, পৃঃ ২১৯।

[35]. মুকাদ্দামাতু তুহফাতিল আহওয়াযী, ১/১০৫ পৃঃ; আল-হাদীছ ওয়াল মুহাদ্দিছূন, পৃঃ ৩৫৮; মুকাদ্দামাতু হাশিয়ায়ে নাসাঈ, পৃঃ ৬।

[36]. মাসিক আত-তাহরীক, এপ্রিল ২০০০ সংখ্যা, পৃঃ ১৭।

[37]. উম্মাহাতু কুতুবিল হাদীছ, পৃঃ ১২৩।

[38]. সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা, ১৪/১৩৩ পৃঃ; শাযারাতুয যাহাব ফী আখবারি মান যাহাব, ২/২৪০, ২৪৯ পৃঃ।

[39]. তাহযীবুল কামাল ফী আসমাইর রিজাল, ১/৩৩৫ পৃঃ।

[40]. আল-হিত্তাহ ফী যিকরিছ ছিহাহ সিত্তাহ, ২৫৩ পৃঃ; মুকাদ্দামাতু হাশিয়ায়ে নাসাঈ, ৬ পৃঃ; মিফতাহুল উলূম ওয়ালফুনূন, ৬৬ পৃঃ।

[41]. উম্মাহাতু কুতুবিল হাদীছ, পৃঃ ১১৯।

[42]. আ‘লামুল মুহাদ্দিছীন, পৃঃ ২৫৩।

[43]. রুবাঈয়্যাতুল ইমাম নাসাঈ, পৃঃ ২০।

[44]. আ‘লামুল মুহাদ্দিছীন, পৃঃ ২৫৪।

[45]. রুবাঈয়্যাতুল ইমাম নাসাঈ, পৃঃ ১৫।

[46]. ঐ, পৃঃ ১৫।

[47]. বুস্তানুল মুহাদ্দিছীন, ২৪৪ পৃঃ; মুকাদ্দামাতু হাশিয়ায়ে নাসাঈ, পৃঃ ৬।

[48]. সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা, ১৪/১৩০ পৃঃ; মুকাদ্দামাতু হাশিয়ায়ে নাসাঈ, (দেওবন্দ : মাকতাবাতুল আশরাফিয়া)।

[49]. মুকাদ্দামাতু তুহফাতুল আহওয়াযী, ১/২৭৯ পৃঃ।

[50]. ঐ, ১/২৭৯ পৃঃ।

[51]. ঐ, ১/২৭৯ পৃঃ।

[52]. যাখীরাতুল উকবা ফী শারহিল মুজতাবা, পৃঃ ১৭, ভূমিকা দ্রঃ।

(৩য় অংশ)

[1]. মুকাদ্দামাতু তুহফাতিল আহওয়াযী, ১/১০৭ পৃঃ; তাযকিরাতুল হুফফায, ২/৭০১ পৃঃ; তাহযীবুল কামাল, ১/৩৩৮ পৃঃ।

[2]. সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা, ১৪/১৩৩ পৃঃ।

[3]. ঐ, ১৪/১২৭ পৃঃ।

[4]. তাহযীবুত তাহযীব, ১/২৭ পৃঃ; আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ, ১১/১৪০ পৃঃ।

[5]. শাযারাতুয যাহাব, ২/২৪০ পৃঃ; তাহযীবুত তাহযীব, ১/২৭ পৃঃ।

[6]. আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ, ১১/১৪০ পৃঃ; তাযকিরাতুল হুফফায, ২/৬৯৯ পৃঃ।

[7]. আল-হিত্তাহ ফী যিকরিছ ছিহাহ সিত্তাহ, ২৫৩ পৃঃ; সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা, ১৪/১৩১ পৃঃ।

[8]. মুকাদ্দামাতু তুহফাতিল আহওয়াযী, ১/১০৬ পৃঃ; তাহযীবুত তাহযীব, ১/২৭ পৃঃ।

[9]. সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা, ১৪/১৩৫ পৃঃ; তাহযীবুত তাহযীব, ২/৩৯১ পৃঃ; মুকাদ্দামাতু সুনানি আবূ দাঊদ লিল-আইনী, ১/১০৬ পৃঃ।

[10]. তাহযীবুল কামাল, ১/৩৪০ পৃঃ; আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ, ১১/১৪০ পৃঃ; আল-হিত্তাহ, পৃঃ ২৫৪।

[11]. তাহযীবুল কামাল, ১/২৪০ পৃঃ (টীকা দ্রষ্টব্য)।

[12]. প্রাগুক্ত, ১/৩৩৪-৩৫ পৃঃ।

[13]. সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা, ১৪/১৩০ পৃঃ।

[14]. আ‘লামুল মুহাদ্দিছীন, পৃঃ ২৫৪।

[15]. রুবাঈয়্যাতুল ইমাম আন-নাসাঈ, পৃঃ ২৬।

[16]. বুস্তানুল মুহাদ্দিছীন, পৃঃ ২৪৫; তাহযীবুত তাহযীব, ১/২৮ পৃঃ; রুবাঈয়্যাতুল ইমাম আন-নাসাঈ, পৃঃ ১৬-১৭।

[17]. ঐ, পৃঃ ১৮।

[18]. আ‘লামুল মুহাদ্দিছীন, পৃঃ ২৫৬।

[19]. রুবাঈয়্যাতুল ইমাম আন-নাসাঈ, পৃঃ ১৮-১৯।

[20]. প্রাগুক্ত, পৃঃ ১৯।

[21]. বুস্তানুল মুহাদ্দিছীন, পৃঃ ২৪৫; তাহযীবুত তাহযীব, ১/২৮ পৃঃ।

[22]. তাযকিরাতুল হুফফায, ২/৭০১ পৃঃ; তাকরীবুত তাহযীব, পৃঃ ৯। কাশফুয যুনূন, ১/১০০৬ পৃঃ।

[23]. আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ, ১১/১৪১ পৃঃ।

[24]. তাহযীবুত তাহযীব, ১/২৮ পৃঃ; তাকরীবুত তাহযীব, পৃঃ ৯।

[25]. আল-হাদীছ ওয়াল মুহাদ্দিছূন, পৃঃ ৩৫৯।

[26]. শাযারাতুয যাহাব, ২/২৪০।

[27]. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়াহ, ১১/১৪১ পৃঃ; আল-হিত্তাহ, পৃঃ ২৫৫।

 

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

মন্তব্য করুন

Back to top button