বিভ্রান্তির সমাধান

কুরআনে বিভিন্ন স্থানে আল্লাহ নিজেকে বোঝাতে “আমরা” শব্দটি ব্যবহার করেছেন কেন?

পবিত্র কুরআনে বহুবচনের ব্যবহার এবং একটি সন্দেহের জবাব

সমস্ত প্রশংসা একমাত্র আল্লাহর জন্য।
আমরা এমন একটা বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে যাচ্ছি যে বিষয়টি শুধু অমুসলিম নয়, অনেক মুসলিমের কাছেও স্পষ্ট নয়। অনেক অমুসলিম প্রশ্ন করে থাকেন, ইসলাম কি একের চেয়ে অধিক সংখ্যক আল্লাহতে বিশ্বাসী? কারণ পবিত্র কুরআনে প্রায়ই আল্লাহ সুবহানুওয়া তায়ালার বক্তব্যে "আমরা" শব্দটির বহুল প্রচলন প্রদর্শিত হয়।

এবিষয়ে অনেকের বাড়াবাড়ি তো এ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে যে, তারা বলে, কুরআনে আসলে ত্রিতত্ত্ব বা ট্রিনিটির কথা বলা হয়েছে আর মুসলিমরা নাকি গত ১৪০০ বছর ধরে এর ভুল ব্যাখ্যা করে যাচ্ছে! আবার অামেরিকার একদল ভ্রান্ত লোক এতে নাকি এশিয়ান কালো মানুষদের প্রতি ইংগিত খুঁজে পাচ্ছেন! আসলে ব্যাপারটা কি?

আমরা তো জানি ইসলাম একটি কঠিন মনোথিস্টিক (শুধুমাত্র একজন আল্লাহতে গভীর বিশ্বাস)

ধর্ম। ইসলাম বিশ্বাস করে যে- আল্লাহ তাঁর যোগ্যতায় এক এবং অদ্বিতীয় । তাহলে? এর ব্যাখ্যা কি?

শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবন তাইমিয়্যা এর ব্যাখ্যয় বলেছেন, "আরবি সাহিত্যের একটি বৈশিষ্ট্য হলো, কোন ব্যক্তি নিজের সম্মান বা গৌরব বুঝাতে নিজেকে নাহনু (আমরা) সর্বনাম দিয়ে প্রকাশ করতে পারেন। আবার তিনি একত্ব বুঝাতে আনা (আমি) অথবা তৃতীয় পুরুষ হুয়া (সে) সর্বনামগুলোও ব্যবহার করতে পারেন। আল্লাহ আরবদের যখন তাদের ভাষাতেই সম্বোধন করছেন, তিনি কুরআনে এই তিন ধরনের স্টাইলই ব্যবহার করেছেন।

আল্লাহ সুবহানুওয়া তায়ালা নিজেকে কিংবা নিজের নাম এবং গুণসমূহ প্রকাশ করার জন্য কখনো একবচন আবার কখনো বহুবচন ব্যবহার করেছেন। যেমন, "নিশ্চয়ই আমরা আপনাকে এক সুস্পষ্ট বিজয় দান করেছি।" [সূরা ফাতহ্ ৪৮:১] বা এধরনের আরো অনেক আয়াত। কিন্তু আল্লাহ কখনোই দ্বৈত বা দ্বিবচন ব্যবহার করেননি। কারণ বহুবচন যেখানে আল্লাহর মর্যাদা, তাঁর নাম এবং গুণসমূহের মাহাত্ম্যকে প্রকাশ করে, দ্বিবচনাত্মক শব্দ সেখানে শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট সংখ্যাকেই (দুই) নির্দেশ করে, যা থেকে তিনি অনেক উর্ধ্বে। [আল আকিদাহ আল তাদমুরিয়্যা, পৃষ্ঠা ৭৫]

আরও দেখুন:  ধর্ম = ভয়?

ইমাম তাইমিয়্যা আরো বলেন, "ইন্না (নিশ্চয়ই আমরা) বা নাহনু (আমরা) এবং বহুবচনাত্মক অন্যান্য শব্দগুলোর বিভিন্ন রূপ যেমন একটি দল বা সমষ্টির পক্ষে একজনের বক্তব্যের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয় তেমনি কোন ব্যক্তির সম্মান এবং মর্যাদা প্রকাশেও ব্যবহৃত হয়। যেমন কোন সম্রাট যখন কোন আদেশ জারি করেন, তখন সেখানে বলা হয়, 'আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে … …' এক্ষেত্রে যদিও একজন মানুষই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন কিন্তু তার সম্মানার্থে বহুবচন ব্যবহার করা হচ্ছে। যিনি সবার চেয়ে বেশি সম্মানিত হবার যোগ্য, তিনি হলেন আল্লাহ সুবহানুওয়া তায়ালা। তাই তিনি যখন কুরআনে ইন্না বা নাহনু ব্যবহার করেন তা তাঁর সম্মান আর মর্যাদাকেই প্রকাশ করে, সংখ্যাধিক্যকে নয়।

যদি এধরনের কোন আয়াত কারো মনে সন্দেহ সৃষ্টি করে তাহলে তার উচিত হবে অন্যান্য স্পষ্ট এবং পরিষ্কার আয়াতগুলোর দিকে দৃষ্টি দেয়া। যেমন একজন খৃষ্টান যদি উদাহরণস্বরূপ কুরআনের এই আয়াত সামনে নিয়ে আসে যে, "আমরাই উপদেশ (সম্বলিত কুরআন) নাজিল করেছি এবং আমরাই তার সংরক্ষণকারী।" [সূরা হিজর ১৫:৯] এখানে বহুবচন ব্যবহার করা হয়েছে। তাহলে আমরা "বলো, তিনি আল্লাহ, এক ও অদ্বিতীয়।" [সূরা ইখলাস ১১২:১] এবং এধরনের আরো যেসব সুস্পষ্ট আয়াত রয়েছে সেগুলো দ্বারা এসব যুক্তি খন্ডন করবো, যে আয়াতগুলোর অন্য কোন ব্যাখ্যা সম্ভব নয়। এর ফলে যে আসলেই সত্যের সন্ধান করছে তার মনের সব সন্দেহ দূর হয়ে যাবে। প্রতিবার আল্লাহ যখন বহুবচন ব্যবহার করেন, তা তাঁর মহান মর্যাদা আর তাঁর অসংখ্য নাম এবং গুণকেই বুঝায়।" [আল আকিদাহ আল তাদমুরিয়্যা, পৃষ্ঠা ১০৯]

আমরা এই সম্মানসূচক বহুবচন কিন্ত অন্যান্য ভাষায়ও দেখতে পাই। যেমন বৃটেনের রাণী এলিজাবেথের লিখিত বক্তব্যগুলোতে সবসময় We এর ব্যবহার দেখতে পাওয়া যায়। ইংরেজিতে একে Royal We বলা হয়। এছাড়া অন্যান্য দেশের প্রধানদের রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তগুলো জানানোর সময়ও বহুবচন ব্যবহৃত হয়ে থাকে।

আরও দেখুন:  পশু জবাই করার ইসলামীপদ্ধতি - দৃশ্যতঃ নির্দয়

আল্লাহই সর্বজ্ঞানী এবং তিনিই সবচেয়ে ভালো জানেন।

– ইমরান হেলাল

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

৩টি মন্তব্য

  1. আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা সরাসরি কোনো কাজ বা কথা বলেন না। তিনি ফেরেশতা ও মনোনীত বান্দা দ্বারা দায়িত্ব পালন করিয়ে থাকেন। আল্লাহ হলো হুকুমদাতা আর কাজ করিয়ে থাকেন ফেরেশতাদের মাধ্যমে। সুতরাং আমি মনে করি যেসব দায়িত্বগুলো আল্লাহ ফেরেশতাদের মাধ্যমে পালন করিয়েছেন সেগুলোর ক্ষেত্রেই আল্লাহ আমরা শব্দটি বার বার ব্যাহহার করেছেন। তবে আল্লাহ ইচ্ছা করলে সরাসরি ও করতে পারেন। তবে ইমাম তাইমিয়্যার মতটিও যুক্তিপূর্ণ।

  2. আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা সরাসরি কোনো কাজ বা কথা বলেন না। তিনি ফেরেশতা ও মনোনীত বান্দা দ্বারা দায়িত্ব পালন করিয়ে থাকেন। আল্লাহ হলো হুকুমদাতা আর কাজ করিয়ে থাকেন ফেরেশতাদের মাধ্যমে। সুতরাং আমি মনে করি এজন্যই আল্লাহ আমরা শব্দটি বার বার ব্যাহহার করেছেন।

মন্তব্য করুন

Back to top button