বিভ্রান্তির সমাধান

প্রসঙ্গ যখন ভয়চক্রব্যূহ

পথের ধারে পড়ে থাকা একটা পাথর তুলে সে বসিয়ে দিল কলেজের প্রবেশপথে। পকেটে থাকা পানের চুন, মশলা হয়ে গেল টিকা, সামনে ছড়ানো খুচরো পয়সা হলো “ইসভেস্টমেন্ট” – বাকি থাকলো শুধু একটু উৎকোচন, “বড়ই জাগ্রত ঈশ্বর। যা চাইবে তাই পাবে” বলে তাও পাথরের সামনে মাথানত করে – তারপর ব্যবসা জমে উঠলো! কেউ হাতজোড়ে বলে, “পাশ করিয়ে দাও প্রভু!”- কেউবা সটান প্রণাম যায়! আর এই বিশাল কর্মকান্ডে ট্রিগারিং পয়েন্ট কি হলো?- “ভয়”!

কি? ভাবছেন- কিসব পাগলের প্রলাপ বকছে!

আসলে আমি না, খুবই বাস্তব এই চিত্র তুলে ধরেছিলেন গত বছরের সাড়া জাগানো বলিউড মুভি “পিকে”তে রূপদানকারী ভীনগ্রহের বাসিন্দা তথা আমীর খান।

“ঈশ্বর”- সে কোথায়? সে কে? তাকে কি নামে ডাকবো? ভগবান? আল্লাহ্? ক্রাইস্ট? তাকে কি দিয়ে সন্তুষ্ট করবো? হাতজোড় করে মন্দিরে যাব? মসজিদে যাব? না কোন মানত পূরণের জন্যে মাটিতে গড়াগড়ি দিবো? কি করবো?

কে বানায় আমাদের মুসলিম, হিন্দু? কোনো বিশেষ চিহ্ন আছে কি আমাদের শরীরে? শুধু পোশাকই কি বলে দিবে আমাদের পরিচয়?

এমন নানা বোবা প্রশ্ন আর নিরুত্তর উত্তর দিয়ে হাস্যরসে পরিপূর্ণ এই মুভি দেখে বেশ আমোদ পেয়েছিলাম। আর বারবার কেন জানি ছাই মনে পড়ছিল আমার সেইদিনগুলোর কথা যখন “সত্য” খুঁজে ফিরেছি আমিও! কেন মানবো? কিভাবে জানবো? কোথায়, আমার স্রষ্টা কোথায়? কেন সাড়া পাই না! কেন আমাকে অন্ধকারে একা রেখেছেন তিনি? কি চান?

জন্ম মুসলিম পরিবারে আমাদের, নামটা মুসলিম। প্রতি জুম্মাবার নামাজে দাঁড়াই, কোরান-পাক পড়া সেই ছোটবেলায় হুজুরের কাছে শিখেছি- তাই ভুলভাল যা পারি বিপদে পড়লে মন্ত্র পাঠের মত পড়ি। আল্লাহ্ আমাদের পরম ক্ষমাশীল, সব মাফ করে দিবেন- বলে ধিনকাচিকা মার্কা গানের তালে কোনো সুন্দরীর দেহবল্লরী দেখে মনের চোখ জুড়াই-কখনো বা একটু নিজেই হয়ত নেচে নিই, আজান দিলে জিহ্বা কেটে “তওবা তওবা” বলে মাথায় একটু আলগা কাপড় তুলে দেই। আজান শেষে ঠুকাঠুক জায়নামাজে মাথা ঠুকে কুরআন শরীফটা চুমো খেয়ে তুলে রাখি- “বেয়াদবি হলো না তো?”এই ভেবে! এইভাবে দিন যায়, মাস যায়, বছর যায়- জানি না কেন এই রিচুয়ালগুলো করি। কেন নামাজ পড়েন- বহুদিন আগে একবার এই প্রশ্ন করতেই একজন চোখ কপালে তুলে বলেছিলেন- “বেয়াদব মেয়ে! দোজখের ভয় নাই?” বলেই তরুণসমাজের মুন্ডুপাত করতে করতে বিপুল বেগে একহাতে তসবী টানতে শুরু করলেন আর আরেক হাত টিভির রিমোট টিপে কোনো এক হিন্দি সিরিয়ালের লক্ষী বউয়ের দেবী বন্দনা দেখতে লাগলেন। এ নতুন কোনো দৃশ্য না, “কাহানী ঘার ঘার কি!”

আরও দেখুন:  মুসলমানেরা এতভাগে বিভক্ত কেন?  চিন্তাধারার বিভিন্নতার কারণ কি?

বয়স তখন ১৮ ছুঁই ছুঁই।এই বয়সটা খারাপ, না বড়রা বড়দের কাতারে ফেলতে চান, না ছোটদের মত উঠতে বসতে ‘জ্ঞান লাভ’ করতে ভালো লাগে! আর সঙ্গদোষে লোহাও ভাসে- সব মিলেমিশে একাকার হয়ে বিদ্রোহ ঘোষণা করে বসলাম স্বয়ং স্রষ্টার বিরুদ্ধে, নিজের শিকড়ের বিরুদ্ধে! হয়ে গেলাম “নাস্তিক”! সেইসময় এই টাইটেলটা বড্ড ফাটাফাটি ছিল আর যাই বলুন, কেউ ধর্মের কথা বলতে এলে বেশ একটা ভাব ধরে বলতাম, “প্রমাণ দেখাতে পারবেন যে কেউ এই প্রার্থনার উত্তর দিচ্ছেন?”

সাত আসমানের উপরে স্বমহিমায় মহিমান্বিত মহান সেই স্রষ্টা তাই ভাবলেন এই অবিশ্বাসীকে তাঁর প্রমাণ দেখাবেন। আর তাই এই কলুষিত উদ্ধত হৃদয়কে তিনি এমনভাবে তাঁর সামনে নত করলেন যে সৃষ্টির তাঁর হৃদয় শান্ত হয়ে গেল, সে জানলো সেই সুমহান অন্তর পরিবর্তনকারীকে, পরম করুণাময় সেই দাতাকে- যিনি সবার আশ্রয়দানকারী, ত্রাতা।

না, ভয় না- আল্লাহ্ এর সামনে প্রথম সিজদায় লুটিয়ে পড়েছিলাম আচ্ছন্নের মত সেই ৬ বছর আগে, এক শুভানুকাক্ষীর কথা শুনে! “আল্লাহ্ সবাইকে ভালবাসেন, তিনি সব জানেন; একবার বলেই দেখো বিশ্বাস এনে!” আজো মনে পড়ে দোজখের ভয়টা হয়ত সেইদিন এতোটা কাজ করেনি যতটা আল্লাহ্ এর রহমতের বিশ্বাস করেছিল! কেন জানি মনে হয়েছিল- হ্যাঁ, আমার না বলা সব কথা একজন শুনেছেন। বিক্ষিপ্ত মনটা একদম শান্ত হয়ে গেছিল, প্রশান্ত- একদম প্রশান্ত! যেই আশ্রয় খুঁজে ফিরেছি সৃষ্টির মাঝে, ঘাত প্রতিঘাত সয়েছি নানাভাবে মুখ বুজে, একদন্ড মানসিক শান্তি পাইনি- তা আজ পেয়েছি। যে স্বর্গলোকের চাবি খুঁজি জনে জনে, সে তো আমার কাছেই ছিল সবসময়! মাটিতে শুধু একবার নত হতে দেরী এই উদ্ধত শির, ব্যাস- এই তো আমার জান্নাত, আমার আশ্রয়।

আমাদের সমস্যা কি জানেন? জ্ঞান হওয়া থেকেই খালি ভয় পেয়ে এসেছি!

‘দুধ খাবে না?’- ‘দাঁড়াও, কালো বিড়াল আয় তো!’

আরও দেখুন:  শুকরের মাংস নিষিদ্ধ কেন?

‘অংক করোনি?’- ‘দাঁড়াও আজ তোমার বাবাকে বলেই দিবো’।

‘মাঠে খেলতে গেছো এই কাদামাটিতে!’- ‘আজকে যদি ধোলাই না দিয়েছি!’

ভয়ে ভয়েই জীবন কাটে আমাদের, তারপর একসময় “বয়সকালে” নতুন ভয়যুক্ত হয়- স্রষ্টার শাস্তির ভয়!

‘নামাজ পড়ছো না?’ – “ দোজখে যাবে!’

‘মা-বাবার অবাধ্য হয়েছো’ – ‘জাহান্নামী জাহান্নামী!’

‘এ তো কবিরা গুনাহ; তুই তো ব্যাটা নির্ঘাত দোজখের আগুনে অনন্তকাল পুড়বি’।

কেউ বলেনি- “আসো, আজান দিয়েছে- নামাজে দাঁড়াই। নামাজ এইভাবে পড়তে হয়!’

কেউ বলেনি- “কবিরা গুনাহ করলে তওবা করে আল্লাহ্ এর কাছে ক্ষমা চাইতে হয়’।

সবাই খালি ‘ভয়’ দেখিয়ে গেছে, কেউ বলেনি আল্লাহ্ এর দয়ার কথা, কেউ বলেনি তাঁর ক্ষমার আশ্বাসের কথা, কেউ বলেনি তাঁদের কথা যাঁরা অবিশ্বাসীদের কাতার থেকেই আল্লাহ্ এর উপর ঈমান এনেছেন, রাদিআল্লাহু আনহুম! শুধু ভয় আর ভয়!

কত ওয়াক্ত নামাজ না পড়লে কতবার আজদাহা সাপ দংশণ করবে, কোন গুনাহের জন্যে কত হাজার বছর জাহান্নামে থাকতে হবে- এই অংক কষে-হিসাব করে শুদ্ধ ভুল ইবাদত করেই জীবন যায় আমাদের।

আচ্ছা, বলুন তো- কাউকে খুব ভালবাসেন; সে দিন রাত শুধু নির্যাতন করে, কথায় কথায় শর্ত জুড়ে দেয়- ‘যদি ভালবাসো তো প্রমাণ দেখাও’ টাইপ; পারবেন কি সেই মানুষটাকে মনে প্রাণে ভালবাসতে? নাকি তাঁকে ভালবাসবেন, শ্রদ্ধা করবেন যিনি কোনো ভুলের জন্যে ক্ষমা চাইলেই প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন মার্জনার, প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন সাগরের ফেনার সমান অপরাধ নিয়ে এলেও, গগণচুম্বীও যদি তা হয়- শুধু ক্ষমা প্রার্থনার দেরিটুকু! তাঁকেই কি ভালবাসবেন না যিনি আপনার আমার সীমাহীন উদ্ধততা শর্তেও মাথার উপরের ছাদ কেড়ে নেননি, রিজিক কেড়ে নেননি – শারীরিক সুস্থতা দান করেছেন, পরনির্ভরশীল করে দেননি? তাঁকেই কি ভালবাসবেন না- যিনি আমাদের মায়ের চেয়েও আমাদের বেশি ভালবাসেন? যিনি সমগ্র সৃষ্টিকুলে ১ভাগ ভালবাসা বন্টন করে দিয়ে বাকি ৯৯ভাগ নিজের করে রেখেছেন? নিজেকে যিনি নাম দিয়েছেন ‘আল ওয়াদুদ, আল ওয়াহাব’! বলুন না, কাকে ভালবাসবেন? তাঁকে আমি ভালবাসবো, ভয় পাবো- এই নিয়েই তো আমার জীবন! ব্যালেন্সড! ঠিক কি না?

আরও দেখুন:  যদি সবকিছু পূর্ব নির্ধারিত হয়ে থাকে তাহলে সেগুলো সম্পাদনের জন্যে মানুষকে জবাবদিহি করতে হবে কেন?

আমাদের সমস্যা কি জানেন? ব্যালেন্স বা ভারসাম্য রাখতে আমরা পারি না। যা করি অতিরিক্ত করি। যখন ভয় পাই- তখন ভয়ে প্রাণ অষ্ঠাগত! আর যখন পাই না, তখন যেন পরোয়াই নেই! আর এই অতিরিক্ত ভয়ের সুযোগ নেন কিছু ধর্ম ব্যবসায়ী। ব্যবসায়ী এই জন্যেই বলছি কারণ তাঁদের “উৎকোচন এবং ইনভেস্টমেন্ট” দুইই আছে!

এই যেমন অমুক মাজারে গেলে, তমুক পীরের মুরিদ হলে বেহেশতে যাওয়া যাবে- ব্যাস আমাদের মত পাপী “ধর্ম ভীরু”দের ভীড় জমে যাবে! বাহ, কি সুন্দর ব্যবস্থা!

পাখিদের উড়তে তো দেখেছেন নিশ্চয়ই; বলুন তো যদি এক ডানা কোনো কারণে একদিকে হেলে যায় ভারসাম্যের তারতম্যের জন্যে- সে কি আর উড়তে পারবে? মুসলিমের জীবনও এই পাখির মত; পাখির মতই তার জীবনের এক অংশ আল্লাহের উপর পূর্ণ বিশ্বাস ও আশাতে পরিপূর্ণ, আর আরেক অংশ আল্লাহ্র ভয় দিয়ে। আশা আর ভয় দুইই কিন্তু হাতে হাত রেখে চলবে, একটাকে ছাড়া আরেকটা অপূর্ণ।

তবেই না মুসলিমের জীবন!

নকল ছেড়ে আসুন আসল ধর্মভীরু হই, যে ধর্মভীরুতা আমাদের সৎসাহসী হতে শেখায়, নম্র বিনয়ী হতে শেখায়, মানবতা শেখায়; শেখায় নিঃস্বার্থ হতে, কোমল হতে! শেখায় সত্যকে অনুসন্ধান করতে- বেছে নিতে সঠিক পথ। তবেই না “আশরাফুল মাখলুকাত” আমরা!

চোখে পট্টি বেঁধে অন্ধ সেজে বহুপথ চলেছি- কখনো ভয়ে, কখনো বা ভুলে; এখন কি পথ চিনে নেয়ার সময় আসেনি? সুযোগ কি আসেনি?

উপলব্ধি এখনও না হলে কবে হবে আমাদের?

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

মন্তব্য করুন

Back to top button