সাম্প্রতিক প্রসঙ্গ

মালালার গল্প: ১৪ শত বছর আগে ও পরে, শুধু প্লেয়ার ভিন্ন, গেইম ইজ সেইম

মালালা আহত হওয়ার পর গোটা পশ্চিমা বিশ্ব তার প্রতি যে স্নেহ দরদ ও মায়া মমতা দেখিয়েছে তারা কি সত্যিই সকল শিশুর প্রতি, সকল নারীর প্রতি এমন স্নেহ ও মমতাময়ী, দরদী ও দায়িত্বশীল? না কি এই বিশেষ মেয়েটির জন্য এত বেশী দরদ উথলে ওঠার পেছনে বিশেষ কোন কারন রয়েছে? পূর্বে ইরাকের উপর ঔষধসহ জীবন রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন উপকরণের উপর ব্যপক অবরোধ আরোপ করে কিভাবে প্রায় দশ লক্ষ নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করেছে? যার প্রায় অর্ধেকই হল নারী ও শিশু!

১৪ শত বছর আগে ও পরেঃ শুধু প্লেয়ার ভিন্ন গেইম ইজ সেইম

মালালা ইউসুফজাই। মিডিয়ার বদৌলতে গোটা বিশ্বের সচেতন সমাজের কাছে সাম্প্রতিক সময়ে এমনই একটি আলোচিত নাম যে, এই মেয়েটির বাড়তি পরিচয় দেয়ার কোন প্রয়োজন নেই। গোটা পৃথিবীর আন্তর্জাতিক মেইনস্ট্রিম মিডিয়া থেকে নিয়ে শুরু করে বিভিন্ন দেশের স্থানীয় গণমাধ্যমেও এই মেয়েটির ঘটনাকে ফলাও করে প্রকাশ করা হয়েছে। শুধু প্রকাশই করা হয়নি; বরং এমন ভাবে প্রকাশ করা হয়েছে যেন মনে হয়েছে তার ঘটনাটি ইতিহাসের অত্যান্ত ন্যাক্কার জনক, বীভৎস, নারকীয়, নির্মম ও ভয়াবহ ঘটনা এবং এ ধরণের নিকৃষ্ট ও ঘৃণ্য সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড কেবল মানবতার শত্রু ‘মুসলমান সন্ত্রাসীদের’ পক্ষেই করা সম্ভব।

একইসাথে অত্যন্ত নিখুতভাবে তুলে ধরা হয়েছে যে, নারী-শিশুদের প্রতি ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে পশ্চিমারা এতটাই দরদী ও মমতাময়ী যে, পাকিস্তানের প্রত্যন্ত অঞ্চলের একটি আহত মেয়ের আর্তনাদ তাদের ‘কোমল হৃদয়কে’ বিগলিত করে ফেলেছে, ক্ষতবিক্ষত করে ফেলেছে। তাদের পক্ষে কিছুতেই এ ঘটনা নিরব দর্শকের মতো তাকিয়ে দেখা সম্ভব হয়নি। তারা এতটাই দরদী, মমতাময়ী, ও দায়িত্বশীল যে তারা নিছক দায়সারা গোছের আর্থিক সাহায্য করেই চুপ করে বসে থাকতে পারেনি, তারা তার উন্নত চিকিৎসার জন্য বিশেষ এয়ার এ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করে তাকে যুক্তরাজ্যে নিয়ে গেছে। এরপরের ঘটনা সকলেরই জানা। পদ্মায় অনেক জল গড়িয়েছে এতো দিনে।

মানবতার প্রতি তাদের এই ‘অসাধারণ মায়া মমতা ও দরদের জন্য’ তাদেরকে ধন্যবাদ না জানিয়ে নিজেকে অকারণ ছোট করার পক্ষে আমি নই। তবে আমি শুধু কয়েকটি বিষয় বিনয়ের সাথে আমার পাঠকদের কাছে তুলে ধরতে চাই। 

* পশিমাদের এই দরদী ও মমতাময়ী চেহারার অপর পাশ।
* আকস্মিক তাদের এই দরদ উথলে ওঠার কারন।
* আল্লাহ রব্বুল আলামীনের দৃষ্টিতে তাদের চরিত্র বিশ্লেষণ এবং প্রতিটি বিষয়কে যথাস্থানে রেখে সঠিক মুল্যায়নের বিধান।
* এ ধরণের পরিস্থিতিতে আমাদের করনীয়।

পশিমাদের এই দরদী ও মমতাময়ী চেহারার অপর পাশঃ মালালা আহত হওয়ার পর গোটা পশ্চিমা বিশ্ব তার প্রতি যে স্নেহ দরদ ও মায়া মমতা দেখিয়েছে তারা কি সত্যিই সকল শিশুর প্রতি, সকল নারীর প্রতি এমন স্নেহ ও মমতাময়ী, দরদী ও দায়িত্বশীল? না কি এই বিশেষ মেয়েটির জন্য এত বেশী দরদ উথলে ওঠার পেছনে বিশেষ কোন কারন রয়েছে? যদি তারা সত্যিই মানবতার প্রতি দরদের কারণে, নারী শিশুদের প্রতি তাদের দায়িত্বশীলতার কারনে এমন পদক্ষেপ নিয়ে থাকে তাহলে এই পশ্চিমারা প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধের পূর্বে ইরাকের উপর ঔষধসহ জীবন রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন উপকরণের উপর ব্যপক অবরোধ আরোপ করে কিভাবে প্রায় দশ লক্ষ নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করেছে? যার প্রায় অর্ধেকই হল নারী ও শিশু!

এরপর ইরাক যুদ্ধ আরম্ভ হওয়ার পর সেখানে কিভাবে লক্ষ লক্ষ নিরপরাধ মানুষকে পাখির মত গুলি করে হত্যা করেছে যা উইকিলিকস এর ফাস করা ভিডিও চিত্রে গোটা বিশ্ববাসী প্রত্যক্ষ করেছে?
কিভাবে তারা আফগানিস্তানে লক্ষ লক্ষ নারী শিশু নির্বিচারে গুচ্ছ বোমা ফেলে নির্মমভাবে হত্যা করেছে এবং এখনও করে চলছে?
এই ইউরোপ আমেরিকা তাদের ভাড়াটে সন্ত্রাসী ইসরায়েলকে দিয়ে প্রতিনিয়ত হাজার হাজার অসহায় ফিলিস্তিনী নারী শিশুদের উপর তারা তাদের নতুন নতুন আবিষ্কৃত মারণাস্ত্রের নির্মম পরিক্ষা চালাচ্ছে?

নিজ দেশের নাগরিক শায়েখ আনোয়ার আল আওলাকী ও তার কিশোর সন্তান আব্দুর রহমানসহ হাজার হাজার মানুষকে তারা ইয়েমেনে ড্রোন আক্রমন করে হত্যা করেছে এবং করছে।

এই লক্ষ লক্ষ নারী শিশুর কারও জন্য তো তাদের দরদ উথলে উঠল না!
কারও জন্য তো তাদের চোখের এক ফোটা পানি ঝরলো না!
কারও চিকিৎসার জন্য তো তারা উদগ্রীব হয়ে উঠল না!
কারও জন্য তো তারা এয়ার এ্যাম্বুলেন্স তো দুরের কথা একটি ঠেলা গাড়িও পাঠাল না!
মুসলিম জাতির লক্ষ লক্ষ অসহায় নারী ও নিস্পাপ শিশুর রক্তে যে রক্তপিপাসু ইউরোপ আমেরিকার হাত রঞ্জিত কেন তাদের এত দরদ উথলে উঠলো পাকিস্তানের প্রত্যন্ত অঞ্চলের আহত একটি মেয়ের জন্য!

আকস্মিক তাদের এই দরদ উথলে ওঠার কারনঃ তাদের এই দরদ উথলে ওঠার প্রথম কারণ হল তাদের বক্তব্যমতে এই মেয়েটি আহত হয়েছে পাকিস্তানী তালেবানদের হাতে। তারা তালেবানদের হাতে একটি মেয়ে আহত হওয়ার ঘটনাকে (যদি সত্যি হয়ে থাকে) বিশ্বব্যপি আলোচিত ঘটনায় পরিণত করে একই সাথে অনেক গুলো কাজ সমাধা করতে চায়। 
১. সাম্রাজ্যবাদী শক্তির হাত থেকে মুসলিম জাতিকে মুক্ত করার যুদ্ধে নিয়োজিত শক্তিকে কলংকিত করে নিজ জাতির কাছে তাদেরকে ঘৃণ্য ও প্রত্যাখ্যাত করা। 

আরও দেখুন:  ছাহাবী ও তাবেঈগণের যুগে মহামারী ও তা থেকে শিক্ষা

২. এই পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী শক্তির হাত যে এই মুসলিম জাতিরই লক্ষ লক্ষ অসহায় নারি ও নিস্পাপ মাসুম শিশুর রক্তে রঞ্জিত তা মুসলিম জাতির স্মৃতি থেকে মুছে দেয়া।

৩. তাদের পক্ষে কাজ করার জন্য তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করার জন্য মুসলিম জাতির মধ্যে যেসব আত্নবিক্রেতা মুনাফিক শ্রেণী রয়েছে তাদের মনে সাহস যোগানো। 

৪. সামান্য ঘটনাকে কেন্দ্র করে একটি মেয়েকে বিখ্যাত করে তুলে মুসলিম জাতির নারীদেরকে ধোকা দেওয়ার জন্য তাকে আইকন হিসেবে ব্যবহার করা।

এই দাজ্জালীয় মিডিয়ার যুগে যেখানে একটু খ্যাতি লাভ করার জন্য, স্থানীয় মিডিয়াতে একটি বার নিজের চেহারাটা একটু প্রদর্শনের জন্য অসংখ্য নারীরা নিজেদের মান মর্যাদা থেকে নিয়ে শরীর পর্যন্ত অবলিলায় বিক্রি করে দিচ্ছে সেখানে কুফফারদের এজেন্ট হয় কাজ করলে যদি বিশ্বব্যপী এমন তথাকথিত যশ খ্যাতি, অর্থ বিত্ত ও পাশ্চিমা নাগরিকত্ব লাভ করা যায় তাহলে এমন কাজে যোগদানের জন্য আত্নবিক্রেতাদের ঢল নামবে। পশ্চিমাদেরকে আর কাজ করার জন্য লোক খুজতে হবে না বরং তারা আগ্রহীদের মাঝে লটারী করে তাদের লোক নিয়োগ করতে পারবে। 

পশিমা ক্রুসেডার ও বিভিন্ন মুসলমান দেশে নিয়োজিত তাদের স্থানীয় এজেন্টদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নিয়োজিত কোন সংগঠন যখন এমন কোন ‘কম হিসেবী’ কাজ করে ফেলে, যেটাকে দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে মিডিয়া ওয়ার পরিচালনা করা যায়, তখন সাথে সাথে তারা এ ধরণের সামান্য ঘটনাকে বিশ্বব্যপি আলোচিত বিষয়ে পরিণত করে।

আল্লাহ রব্বুল আলামীনের দৃষ্টিতে তাদের চরিত্র বিশ্লেষণঃ রসুলুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদীনায় হিজরতের বছর দুয়েক পর তিনি আব্দুল্লাহ ইবনে জাহাশ (রা.) এর নেতৃত্বে কুরাইশদের একটি বানিজ্য বহরকে তাড়া করার জন্য একটি সারিয়া (ক্ষুদ্রাকৃতির সেনা অভিযান) প্রেরণ করেন। প্রেরণের সময় রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আব্দুল্লাহ ইবনে জাহাশের হাতে একটি পত্র দিয়ে তাকে সেটি দু’দিন পর খুলে পড়ার নির্দেশ দেন।

আব্দুল্লাহ ইবনে জাহাশ (রা.) ঠিক দু’দিন পর পত্রটি খুলে দেখতে পান যে রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদেরকে এমন একটি অঞ্চলের দিকে যাত্রা করতে নির্দেশ দিয়েছেন যেটি মক্কা এবং তায়েফের মঝামাঝি স্থানে অবস্থিত। পত্রে নির্দেশিত পথের দিকে অগ্রসর হয়ে কিছু দূর এগুনোর পর তারা সে বানিজ্য বহরটির অবস্থান সনাক্ত করতে পারেন। বানিজ্য বহরটিকে তীরের রেইঞ্জের মধ্যে রেখে তারা অবস্থান গ্রহণ করেন। তারা পর্যবেক্ষণ করে আরও দেখতে পেলেন যে কুরাইশের বানিজ্য বহরটি তেমন কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থাও গ্রহণ করেনি। তাদের নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছে মাত্র চারজন লোক।

কিন্তু বানিজ্য বহরের উপর আক্রমন করার ক্ষেত্রে একটি সংকটে পড়ে গেলেন। ঘটনাক্রমে সেই দিনটি ছিলো পবিত্র রজব মাসের শেষ দিন। আর রজব হল সেই চারটি পবিত্র মাসের একটি যে মাসে যুদ্ধ বিগ্রহ করাটা আরবে সর্বসম্মত ভাবে নিষিদ্ধ ছিলো এবং আরবের ইসলাম পূর্ব সমাজ ব্যবস্থায়ও বছরের পবিত্র চার মাসের বিধানকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পালন করা হত। এ মাসে কেউ কারো উপর আক্রমন করতো না, কোনো যুদ্ধ বিগ্রহ বাধাতো না। আব্দুল্লাহ বিন জাহাশ (রা.) তার সাথীদের সাথে করণীয় নির্ধারণ সম্পর্কে আলোচনা করলেন। কেউ কেউ এক দিন অপেক্ষা করে তার পরের দিন আক্রমন করার পরামর্শ দিলেন। কিন্তু হিসাব নিকাশ করে দেখা গেল এক দিন যদি অপেক্ষা করা হয় তাহলে এই এক দিনের মধ্যে বানিজ্য বহর মক্কার হারাম বা পবিত্র সীমানার মধ্যে ঢুকে পড়বে। সেক্ষেত্রেও তারা একই রকম আর একটি সমস্যার মধ্যে পড়ে যাবেন; কারণ হারামের সীমানার মধ্যেও তাদের উপর আক্রম করা বৈধ হবে না। 
অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে এখন তাদেরকে দু’টি পবিত্রতার যে কোনো একটি লঙ্ঘন করতে হবে। হয় মাসের অথবা স্থানের পবিত্রতা। তারা আলাপ আলোচনা করে স্থানের পবিত্রতা বজায় রেখে বাধ্য হয়ে পবিত্র মাসেই আক্রমনের সিদ্ধান্ত নিলেন এবং তারা কাফেলার উপর আক্রমন করলেন। তারা তীর নিক্ষেপ করলেন, চারজন নিরাপত্তারক্ষীর একজন হাদরামী নিহত হল, একজন প্রান নিয়ে কোনোক্রমে পালিয়ে গেলো, দু’জন গ্রেফতার হলো এবং গোটা বানিজ্য বহর মুসলমানদের কব্জায় চলে এলো। এরপর তারা গনীমত হিসেবে সব কিছু নিয়ে মদিনায় প্রত্যাবর্তন করলেন।

আরও দেখুন:  নেপালের ভূমিকম্প ও আমাদের শিক্ষণীয়

গোটা আরবে ব্রেকিং নিউজ হয়ে গেলো। বিষয়টি টক অব দি টাউনে পরিণত হলো, চারিদিকে হই চৈ পড়ে গেলো। কুরাইশরা এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ব্যপক মিডিয়া যুদ্ধে নেমে গেলো। তারা যত দ্রুত সম্ভব আরবের বিভিন্ন অঞ্চলে, বিভিন্ন গোত্রের কাছে দুত পাঠিয়ে এ ঘটনা প্রচার করলো। তারা বলতে লাগলো যে মুহাম্মাদ এবং তার সন্ত্রাসী বাহিনী হারাম মাসের পবিত্রতা লঙ্ঘন করেছে, তারা এই পবিত্র মাসে রক্তপাত ঘটিয়েছে, এই পবিত্র মাসে আমাদের বানিজ্য বহর লুটপাট করে নিয়ে গেছে, পবিত্র মাসে আমাদের লোকদেরকে বন্দি করেছে ইত্যাদি ইত্যাদি। ইমাম বায়হাকির বর্ণনা সুত্রে তাদের প্রপাগান্ডার হেড লাইন ছিলো এমন-
ক্বদ ইস্তাহাল্লা মুহাম্মাদ ওয়া আসহাবুহু আশ শাহ্‌রল হারাম ওয়া সাফাকূ ফীহিদ দাম
ওয়া আখাযু ফীহিল আমওয়াল ওয়া আসারূ ফীহির রিজাল

মদীনা প্রত্যাবর্তনের পর রসূলুল্লাহ স্বয়ং (সা.) তাদের হারাম মাসের পবিত্রতা লঙ্ঘনের কথা শুনে গ্রেফাতারকৃত যুদ্ধবন্দী এবং ধন-সম্পদ কিছুই গ্রহণ করলেন না। আল্লাহর রসূল (সা.) এর এ সিদ্ধান্ত সন্তুষ্টির সাথে মেনে নিলেও, স্বাভাবিকভাবেই আব্দুল্লাহ ইবন জাহাশ (রা.) তার কৃতকর্মের কারণে বেশ মনোকষ্টে ভুগছিলেন। জীবন বাজী রেখে কাজ করার পর এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে এটা যে কারোই হবে।

লোকেরা এসে এখন আল্লাহর রসূলকে হারাম বা পবিত্র মাসের বিধান সম্পর্কে তার বক্তব্য কি, এ মাসসমুহের ব্যপারে ইসলামী শরিয়তের বিধান কী তা জিজ্ঞাসা করতে লাগলো। আল্লাহ রব্বুল আলামীন সপ্ত আসমানের উপর থেকে এ ঘটনার বাস্তব ও নির্মোহ বিশ্লেষণ নাযিল করলেন।
“তারা হারাম মাসে যুদ্ধ-বিগ্রহ করার ব্যাপারে তোমাকে জিজ্ঞেস করে; তুমি তাদের বলো, ‘এ সময়ে যুদ্ধ করা গুরুতর অপরাধ বটে। তবে আল্লাহ্‌র পথ থেকে মানুষকে ফিরিয়ে রাখা, তাঁর সাথে কুফরী করা, মসজিদুল হারামে প্রবেশে বাধা দেওয়া এবং এর অধিবাসীদেরকে সেখান থেকে বের করে দেয়া আল্লাহ্‌র কাছে আরো বড় অপরাধ; আর হত্যাযজ্ঞের চেয়ে (আল্লাহর পথ থেকে মানুষকে ফিরিয়ে রাখার) ফিতনা বরং আরো বেশী খারাপ’। আর যদি তাদের পক্ষে সম্ভব হয় তাহলে তারা (আল্লাহ্‌দ্রোহিরা) তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ অব্যাহত রাখবে যতোক্ষণ না তারা তোমাদেরকে তোমাদের (ইসলামী) জীবন ব্যবস্থা থেকে (কুফরীর দিকে) ফিরিয়ে নিতে সক্ষম হয়। আর তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি তার দ্বীন থেকে ফিরে যাবে, অতঃপর কাফের অবস্থায় মৃত্যুবরণ করবে, তারাই হবে সেসব লোক- দুনিয়া ও আখেরাতে যাদের সকল আমল ধ্বংস হয়ে যাবে। আর তারাই হবে জাহান্নামের অধিবাসী, তারা সেখানে চিরকাল থাকবে”। (সূরা আল বাকারা, আয়াত ১১৭)

আল্লাহ তা’আলা এখানে প্রথমে আব্দুল্লাহ ইবনে জাহাশ রাঃ এর কাজকে একটি অপরাধ হিসেবে সাব্যস্ত করেছেন ঠিকই, কিন্তু এরপর তিনি কুফফারদের করা চারটি কাজকে তার কাজের চেয়ে আরও গুরুতর ও ভয়াবহ অপরাধ হিসেবে সাব্যস্ত করেছেন। সে চারটি কাজ হলঃ
১. আল্লাহর পথ থেকে মানুষকে ফিরিয়ে রাখা।
আজ গোটা পশ্চিমা বিশ্ব তাদের সর্ব শক্তি নিয়োগ করেছে মানুষকে আল্লাহর পথ থেকে ফিরিয়ে রাখতে। প্রচার প্রপাগান্ডা থেকে নিয়ে শুরু করে প্রত্যক্ষ যুদ্ধের মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ মানুষকে হত্যা করে হলেও ছলে বলে কলে কৌশলে তারা মুসলিম উম্মাহকে আল্লাহর দেয়া জীবন ব্যবস্থা থেকে সরিয়ে তাদের বস্তাপচা কুফুরী মতবাদ গ্রহণ করতে বাধ্য করছে। এক্ষেত্রে তাদের চক্রান্ত ষড়যন্ত্র ও নির্মমতা সেকালের মক্কার কুরাইশ কাফিরদের চেয়েও হাজারও গুন ঘৃণ্য ও ভয়াবহ।

২. আল্লাহর সাথে কুফুরী করা।
মক্কার কাফির মুশরিকরা আল্লাহর সাথে যে মাত্রার কুফরী করেছে তার চেয়ে বর্তমান কুফফারদের কুফরীর ধরণ প্রকৃতি আরও নিকৃষ্ট ও জঘন্য। কারণ মক্কার মুশরিকরা আল্লাহর সাথে শিরক করলেও কখনও তাঁর অস্তিত্বকে অস্বীকার করেনি। বর্তমান পশ্চিমা বিশ্ব নিজেদেরকে মুখে যদিও খৃস্টান বলে দাবী করে, তথাপিও তাদের ছত্রছায়াতেই বৈজ্ঞানিক নাস্তিকতাবাদ তথা আল্লাহর অস্তিত্ব অস্বিকার করার দুরারোগ্য ব্যাধি পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছে। বর্তমান সময়ের আলোচিত চরিত্র বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং ও তার ভাব শিষ্যরা লাখো মানুষের আদর্শ বিশ্বাস নীতি নৈতিকতাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। আর তাদের খৃষ্টবাদ, ইহুদীবাদ, পৌত্তলিকতা, সমাজতন্ত্র, গনতন্ত্র, পুজিবাদ, জাতীয়তাবাদসহ কুফুরীর বিভিন্ন ভার্শন তো রয়েছেই।
৩. মাসজীদুল হারামে প্রবেশে বাধা দেওয়া।
আজ মুসলমানদের প্রথম কেবলা বাইতুল মাকদিস এই পশ্চিমাদের ভাড়াটে সন্ত্রাসি ইহুদীরা অবরুদ্ধ করে রেখেছে, সেখানে মুসলমানদেরকে প্রবেশ করতে দেয়া হচ্ছে না। এবং এক্ষেত্রেও সেকালের কুরাইশ কাফিরদের উদারতার তুলনায় এদের আচার আচরণ অনেক বেশী নিকৃষ্ট সংকীর্ণতা, হিংসা বিদ্বেষ ও শত্রুতায় ভরা।

আরও দেখুন:  রাজনীতি করুন, ইসলামের অপব্যাখ্যা করবেন না

৪. মাসজিদুল হারামের অধিবাসীদেরকে সেখান থেকে বের করে দেয়া।
একথা কারো অজানা নয় যে আজ এই পশ্চিমাদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় ইহুদীরা পবিত্র জেরুসালেম থেকে আরব মুসলমানদেরকে উৎখাত করে তাদের নিজ দেশে পরবাসী করে রেখেছে। তাদেরকে, নিজেদের ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করেছে, গাজা ও পশ্চিম তীরে তাদের চতুর্দিক থেকে পরিবেষ্টিত করে রেখে তাদেরকে জেল খানার কয়েদীদের মত আবদ্ধ করে রেখেছে। যখন মন চায় তখন তাদেরকে পাখির মত গুলি করে হত্যা করছে।

অতএব বর্তমান সময়ের এই কুফফারদের ক্ষেত্রে আল্লাহ তা’আলার এই বিশ্লেষণ আরও অধিক ও ব্যপকভাবে প্রযোজ্য। এখানে শুধু রয়েছে স্থান, কাল ও চরিত্রের পার্থক্য। অন্যথায় গেইম ইজ সেইম। 

এ ধরণের পরিস্থিতিতে আমাদের করনীয়ঃ আল্লাহ রব্বুল আলামীন উল্লিখিত আয়াতে আমাদের দেখিয়ে দিয়েছেন কিভাবে প্রতিটি কাজকে যথাস্থানে রেখে তার সঠিক মুল্যায়ন করতে হয়। আমাদেরকে শিখিয়েছেন কিভাবে কোনো ঘটনার নির্মোহ বিশ্লেষণ করতে হয়। কিভাবে কুফফারদের প্রপাগান্ডার মোকাবেলা করতে হয়। এ আয়াতের শিক্ষা হলো, মুসলমানরা কখনোই কারো পক্ষপাতিত্ব করবে না; বরং মুসলমানদের পক্ষ একটাই; আর তা হল সত্যের পক্ষ। অন্ধ দলদারি মনোভাব ইসলামে মোটেই কাম্য নয়।

আমার দলের সকল কাজই ভাল, আর আমার বিরোধী দলের কিংবা অন্য দলের সকল কাজই খারাপ এমন সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি কোন মুসলমানের থাকা উচিত নয়। বরং ভাল কাজ সে যেই করুক তাকে ভাল বলার উদার মানসিকতা যেমন থাকতে হবে, তেমনি মন্দ কাজ তা যে-ই করুক তাকে মন্দ বলে প্রত্যাখ্যান করার মানসিকতা থাকতে হবে। প্রতিটি কাজকে তার যথাস্থানে রেখে মুল্যায়ন করতে হবে। কারও দশটি ভাল কাজের কারণে তার একটি মন্দ কাজকে যেমন ভালোর সার্টিফিকেট দেওয়ার সুযোগ নেই তেমনি কারও দশটি মন্দ কাজের কারনে তার একটি ভাল কাজকে মন্দ বলে প্রত্যাখ্যান করার সুযোগ নেই।

আল্লাহ রব্বুল আলামীন আব্দুল্লাহ ইবনে জাহশ (রা.) এর কাজটিকে যেমন অপরাধ সাব্যস্ত করেছেন তেমনি সেই অপরাধটি সংগঠিত হওয়ার আসল কারণও যে মুসলমানদের উপর কুফফারদের পরিচালিত যুলুম নির্যাতন তাও উল্লেখ করেছেন। আব্দুল্লাহ ইবনে জাহাশের কাজটি কেন ক্ষমাযোগ্য তাও বর্ণনা করেছেন। একই সাথে পর্দার আড়ালের আসল অপরাধীদের মুখোশও জনসমক্ষে উম্মোচন করে দিয়েছেন। 

মালালার উপর আক্রমন কে বা কারা করেছে তা এসব কুফফার মিডিয়া ছাড়া অন্য কোনোভাবে আমাদের পক্ষে জানা সম্ভব নয়; তালেবানদের বিরুদ্ধে মিডিয়া ওয়ার চালানোর জন্য তারা তাদের কোনো এজেন্ট দিয়ে এ কাজ করিয়েছে কি না তা আমরা জানি না। কারণ কোনো সংগঠনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এ ঘটনার কোন দায়ভার কেউ স্বীকার করেনি। আমরা এও জানি না যে, মিডিয়া এখানে কোনো মিথ্যাচার বা কোন ষড়যন্ত্র করেছে কি না। মিথ্যাচার আর ষড়যন্ত্রই যেখানে এদের মিডিয়া ব্যবসার মুল পুজি সেখানে এদের দেয়া এ ধরণের কোনো সংবাদ যাচাই বাছাই ছাড়া কোন অবস্থাতেই গ্রহনযোগ্য নয়। আল্লাহর কোরআনের বিধান মতে কোন পাপিষ্ঠ মুসলমানের পরিবেশিত সংবাদই যেখানে যাচাই বাছাই ছাড়া গ্রহণ নিষিদ্ধ সেখানে কুফফারদের এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত কুফফাের পরিবেশিত সংবাদকে যাচাই বাছাই ছাড়া কোনো অবস্থাতেই গ্রহণ করে নেয়ার সুযোগ নেই।
কোন নারী শিশু বা বয়বৃদ্ধদের উপর আক্রমন করা স্বাভাবিক অবস্থায় কখনোই ইসলামে অনুমোদিত নয়। কেবল ইমারজেন্সি বা বিশেষ কিছু পরিস্থিতেই তা বৈধ। সেরকম কোন বিশেষ পরিস্থিতি সেখানে সৃষ্টি হয়েছিল কি না তা আমরা জানি না; সেটা সে এলাকাতে যে মুজাহিদীনে কেরামগন রয়েছেন তারাই ভালো জানেন। সত্যিই যদি তালিবানরা মালালাকে আক্রমন করে থাকে তাহলে আমি বিশ্বাস করি তারা নিশ্চয়ই শর’ঈ বিধানের আলোকেই করেছেন। নিশ্চয়ই মালালা এমন কোনো কাজ করেছে যা তাকে হত্যা করার বৈধতা দিয়েছে। কারন যারা আল্লাহর দ্বীনকে বিজয়ী করার জন্য নিজেদের জানমাল সব কোরবানী করছেন তারা নিশ্চয়ই তাদের কাজকর্ম শরী’আর বিধানের আলোকেই করবেন এটাই স্বাভাবিক। যাচাই করা সম্ভব না হলে বেনিফিট অফ ডাউট অবশ্যই আমি মুসলিম মুজাহিদদেরকে দিবো, কাফিরদেরকে নয়।

তাই আমরা যেন শুধু মিডিয়ার নিউজ থেকে প্রভাবিত হয়ে কোন মন্তব্য না করি এবং কুফফারদের মিডিয়া যুদ্ধের শিকার হয়ে পক্ষপাতদুষ্ট কথাবার্তা না বলি। মনে রাখতে হবে বর্তমান যুগের এই মিডিয়া শক্তি মোটেই ইসলাম ও মুসলমানদের বন্ধুদের হাতে নিয়ন্ত্রিত নয় বরং তাদের শত্রুদের হাতে নিয়ন্ত্রিত।

আল্লাহ তাআ’লা আমাদেরকে কুফফারদের এই প্রোপাগান্ডা থেকে নিজেদের বিবেককে হিফাযত করার তাওফীক দান করুন

– আহমেদ রফিক

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

১টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

আরিও দেখুন
Close
Back to top button