সাম্প্রতিক প্রসঙ্গ

বাংলার  আকাশে  পরাধীনতার  কালো  মেঘ

নাস্তিক্যবাদ ও হেফাজতে ইসলাম প্রসঙ্গ

-আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রাযযাক

আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশের স্বাধীনতা এমনিতেই আসেনি। বরং হাজারো মানুষের খুনরাঙ্গা পথ বেয়ে, শত মা ও  বোনের অশ্রুসিক্ত পথ মাড়িয়ে এসেছে এই স্বাধীনতা। ইতিহাস যার সাক্ষী। কিন্তু কথায় আছে স্বাধীনতা অর্জন করার চেয়ে তাকে রক্ষা করা বেশী কঠিন। আজ মনে হয় আমরা বাংলাদেশী মুসলমানরা আমাদের স্বাধীনতা রক্ষার এই কঠিন যুদ্ধে হেরে যাচ্ছি। দেশের আকাশে আজ আনগোনা করছে পরাধীনতার কালো মেঘ, যা দেশের দেশপ্রেমিক জনগণের কাছে অজানা নয়। ২০০৯ সালের ২৫শে ফেব্রুয়ারী পিলখানায় দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় বদ্ধপরিকর এদেশের সেনাবাহিনীর উপর চালানো গণহত্যার পরই বিষয়টি    চিন্তাশীল মহলের নজরে পড়ে এবং গত ৫ মে দিবাগত রাত ২.৩০-এর দিকে দেশের স্বাধীনতা রক্ষার প্রাণভোমরা ইসলামপ্রিয় জনতার উপর চালানো নৃশংস গণহত্যা এই সন্দেহকে আরো ঘণীভূত করেছে। দেশ ও জাতির এই ক্রান্তিলগ্নে এসে বক্ষমান প্রবন্ধে এ বিষয়ে বিশ্লেষণমূলক আলোচনা করার প্রয়াস পাব ইনশাআল্লাহ।   

নাস্তিকদের উত্থান : নাস্তিকতা অর্থ হচ্ছে ঈশ্বরের অস্তিত্বহীনতা। যাকে ইংরেজীতে Atheism বলে। Oxford dictionery-তে এর অর্থ বলা আছে The belief that God does not exist। অনেকেই কমিনিজম আর নাস্তিক্যতাবাদকে গুলিয়ে ফেলেন যা আসলে ভুল। ইউরোপ ও এশিয়ায় দার্শনিক আলোচনায় এই তত্ত্বের উৎপত্তিকাল যদিও খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম অথবা ষষ্ঠ শতাব্দীতে ধারণা করা হয়, কিন্তু পশ্চিমে আধুনিককালে আঠারো শতকেই এর সর্বাধিক বিস্তারলাভ ঘটেছে। সমাজবিজ্ঞানের অনেক পন্ডিত ধারণা করেন যে, প্রধানত মূর্তিপূজার বিরুদ্ধেই নাস্তিকতাবাদের উৎপত্তি। এই মতবাদে বিশ্বাসী নাস্তিকদের সংখ্যা সারা পৃথিবীর মূল জনসংখ্যার শত ভাগের এক ভাগও নয়। সব ধর্মের আস্তিকরা এদের ঘৃণা করে। আমাদের দেশে নাস্তিকদের উত্থান শুরু হয় গত ৭/৮ বছর আগে থেকে। এই দেশের নাস্তিকরা অন্য ধর্মকে অস্বীকার করুক বা না করুক তাদের মূল টার্গেট ইসলাম। তারা ইন্টারনেটের ব্লগ সাইটগুলোকে তাদের মিশন পরিচালনার মূল অভয়ারণ্যে পরিণত করে। আর জনগণের চোখের আড়ালে নাস্তিক্যবাদের ভয়ংকর বিষ ছড়াতে থাকে। যার মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মক ব্যাপার হল এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের প্রাণপ্রিয় ধর্ম ও তার নবী মুহাম্মদ (ছাঃ)-কে নিয়ে তাদের জঘন্যতম অশ্লীল বিভিন্ন ধরনের কটূক্তি।

গত ১৫ ফেব্রুয়ারী’১৩ আততায়ীদের হাতে নাস্তিক রাজিব হায়দারের নিহত হওয়ার মধ্যে দিয়ে বেরিয়ে আসে সব অজানা ভয়ংকর তথ্য। যা ১৭ ফেব্রুয়ারী দৈনিক ইনকিলাবে এবং ১৮ ফেব্রুয়ারী দৈনিক আমার দেশ পত্রিকায় ‘ভয়ংকর ইসলামবিদ্বেষী ব্লগার চক্র’ এবং ঐ একই পত্রিকায় ২০ ফেব্রুয়ারী ‘ব্লগে নাস্তিকতার নামে কুৎসিত অসভ্যতা’ শিরোনামে প্রকাশ পায়। সাথে সাথে তোলপাড় শুরু হয়ে যায় দেশের ধর্মপ্রাণ মানুষের মাঝে। এরই সূত্র ধরে সচল হয়ে উঠে হেফাজতে ইসলাম এবং ১৯ ফেব্রুয়ারীতে ঐ পত্রিকাতে দেশবাসী ও সরকারের প্রতি আল্লামা আহমাদ শফির খোলা চিঠি প্রকাশ করা হয়।

ব্লগের নাস্তিকদের অপকর্ম সম্পর্কে ধারণা পেতে দু’একটি উদাহরণ দেয়া হল। যেমন- তারা রাসূল (ছাঃ) কে ‘মোহাম্মক’ (মহা+আহম্মক) বলে এবং তার খতমে নবুওতের মোহরকে খাদীজা (রাঃ) এর পায়ের জুতার হিল বলে চরম ধৃষ্টতার পরিচয় দেয়। তারা কুরআনের আয়াতকে নিয়ে যথেচ্ছ ব্যঙ্গ প্যারোডী রচনা করে এবং কুরআনকে বাজেয়াপ্ত করার দাবী জানায়। হাদীছকে হা-হা হাদীছ বলে টিটকারী করে। রাসূল (ছ:)-এর ব্যক্তিজীবন নিয়ে জঘন্য কুরুচিপূর্ণ কথাবার্তা লেখে।

ব্লগের এসকল নাস্তিকদের মধ্যে সবচেয়ে কুখ্যাত আসিফ মহিউদ্দীন মসজিদ সম্পর্কে ঢাকা শহরের সব মসজিদকে পাবলিক টয়লেট বানানো উচিত (নাউযুবিল্লাহ)। সে সিজদা সর্ম্পকে আলোচনা করতে গিয়ে লেখে মোহাম্মক তাহার ইয়ারদোস্ত লইয়া প্রায়শই কাবা প্রাঙ্গণে আরবি (মদ) খাইয়া পড়িয়া থাকিত (নাউযুবিল্লাহ)। প্রথম আলো পত্রিকার যুগ্ম সম্পাদক আনিসুল হকের ‘ছহি রাজাকারনামা’ শিরোনামে তার একটি ব্যঙ্গাত্মক রচনায় পবিত্র কুরআনের কয়েকটি আয়াতকে সম্পূর্ণ বিদ্রুপাত্মক ভাষায় লিখেছে। বইটিতে পর্দানশিন নারী ও দাড়ি-টুপিধারী আলেমদের নিয়ে ব্যঙ্গচিত্র এঁকেছে শিশির ভট্টাচার্য। বইটি উৎসর্গ করা হয়েছে আওয়ামীপন্থী সাংবাদিক, একাত্তর টিভির ব্যস্থাপনা পরিচালক মোজাম্মেল বাবু ও সাবেক ছাত্রনেতা জাহাঙ্গীর সাত্তার টিংকুকে। ‘সচলায়তন’ ব্লগে শাহবাগ আন্দোলনের পক্ষে লেখাটি পুনঃপ্রকাশ করা হয়। পবিত্র কোরআনের প্রথম সুরার প্রথম আয়াতে বলা হয়েছে ‘সমস্ত প্রশংসা জগতের প্রতিপালক আল্লাহর’। আনিসুল হক তার ‘সহি রাজাকারনামা’য় এই আয়াতের প্যারোডি লিখেছে, ‘সমস্ত প্রশংসা রাজাকারগণের’। সূরা ফাতেহার আরেকটি আয়াতে বলা হয়েছে, আমরা কেবল তোমারই ইবাদত করি এবং তোমারই কাছে সাহায্য চাই। আনিসুল হক ব্যঙ্গ ও বিকৃত করে লিখেছে, ‘আর তোমরা রাজাকারের প্রশংসা করো, আর রাজাকারদের সাহায্য প্রার্থনা করো’।

এরকম হাজারো নমুনা জঘন্য ও নিকৃষ্টতম কথাবার্তার নমুনা এখনও ব্লগ ও ফেসবুক জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। ইসলামবিদ্বেষী ব্লগগুলো হচ্ছে সামহোয়্যার ইন ব্লগ, আমার ব্লগ, মুক্তমনা ব্লগ, নাগরিক ব্লগ, ধর্মকারী ব্লগ, নবযুগ ব্লগ, সচলায়তন ব্লগ, চুতরাপাতা ব্লগ, মতিকণ্ঠ ইত্যাদি। এ ব্লগ সাইটগুলোর অধিকাংশই পরিকল্পিতভাবে বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে তৈরি। সামহোয়্যার ইন ব্লগসহ অন্যান্য ব্লগের মূল কাজই হচ্ছে পবিত্র ইসলামের প্রতি বিদ্বেষ ছড়ানো। এই সমস্ত ব্লগারদের মধ্যে বর্তমানে সবচেয়ে ভয়ংকর হচ্ছে আসিফ মহিউদ্দিন। পবিত্র ইসলাম সম্পর্কে মিডিয়ায় বিদ্বেষ, অপপ্রচার, অপবাদ, কুৎসা রটনা এবং অত্যন্ত কুরুচিপূর্ণ অশালীন ভাষায় কটূক্তিকারী সর্বাপেক্ষা সমালোচিত ব্লগ সাইট ‘ধর্মকারী’র অন্যতম লেখক এই আসিফ মহিউদ্দিন। নাস্তিকবান্ধব প্রায় সব ব্লগেই তার সক্রিয়তা থাকলেও সে সামহোয়্যার ইন ব্লগ এবং ফেসবুকে সবচেয়ে বেশি সক্রিয়। এ ছাড়া বাংলাদেশকে একটি সমকামী রাষ্ট্রে পরিণত করার জন্য ‘মুক্তমনা’‘সামহোয়্যার ইন ব্লগে’ সে বেশ কিছু পোস্ট করেছিল, যা এখনও রয়েছে। ধারণা করা হয়, কুখ্যাত নাস্তিক আসিফের ইসলামবিদ্বেষী কর্মকান্ডে বাংলাদেশের প্রথম সামাজিক ব্লগ ‘স্যামহায়ার ইন ব্লগ’-এর মালিক দম্পতি সব সময় ইন্ধন  জুগিয়েছে। ইহুদী অর্থায়নে পরিচালিত জার্মান সংবাদ সংস্থা ডয়েচেভেলের ২০১২ সালের আন্তর্জাতিক ব্লগার প্রতিযোগিতায় শ্রেষ্ঠ ব্লগারের পুরস্কার পায় বাংলাদেশের কুখ্যাত নাস্তিক আসিফ মহিউদ্দিন। ধারণা করা হয় তার এ পুরস্কার পাওয়ার ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখেন ‘সামহোয়্যার ইন ব্লগে’র কর্তৃপক্ষ দম্পতি।

অপর একটি ব্লগ ‘আমার ব্লগ’-এর মালিক হল সুশান্ত দাস গুপ্ত। ইসলামের বিরুদ্ধে ইচ্ছামতো অশ্লীল লেখা প্রকাশ করে আসছে এ ব্লগটি। সিলেটে ধর্মপ্রাণ মুসলমানের বিরুদ্ধে ও শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে মূর্তি স্থাপনের পক্ষে শক্ত অবস্থান নেয় এ ব্লগটি। এ ব্লগেই মহানবী (সা.)-এর ব্যঙ্গচিত্র প্রকাশ করা হয়। এই সমস্ত ব্লগারদের পদচারণা এতদিন নেটজগতেই সীমাবদ্ধ ছিল কিন্তু যখন বাংলাদেশের বিচার বিভাগ জামাআতে ইসলামীর নেতা আব্দুল কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেয় তখন তারা তাঁর ফাঁসির দাবিতে ‘ব্লগার অ্যান্ড অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট ফোরাম’ নামের একটি সংগঠনের ব্যানার খাড়া করে গত ৫ ফেব্রুয়ারী থেকে রাজধানীর শাহবাগে কথিত ‘শাহবাগ চত্বর’ ওরফে ‘প্রজন্ম চত্বর’ ওরফে ‘গণজাগরণ মঞ্চ’ নাম দিয়ে অবস্থান শুরু করে। এদের আন্দোলন শুরু হওয়ার সাথে সাথে ভারতেরও সমর্থনও মিলতে থাকে। পশ্চিমবঙ্গের একসময়ের জনপ্রিয় সাময়িকী ‘দেশ’ শাহবাগীদের বন্দনায় মাত্রাজ্ঞান হারিয়ে ফেলে। ‘জয় বাংলা’ শিরোনামে সংবাদপত্রটির গত ১৭ মার্চ সংখ্যার প্রচ্ছদ প্রতিবেদনে শাহবাগীদের বন্দনা করা হয়। একই সংখ্যায় সম্পাদকীয়তেও শাহবাগীদের আন্দোলনকে মহিমান্বিত করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হয়। অন্যদিকে দেশটির সর্বাধিক প্রচারিত ইংরেজী দৈনিক ‘টাইমস অব ইন্ডিয়া’তে  Protesters at Shahbagin bangladesh backed by India– শিরোনামে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে শাহবাগ আন্দোলন ভারতের মদদপুষ্ট বলে জানিয়েছে (The Times of India, ২৬.২.২০১৩)। ভারতের বিখ্যাত লেখক কুলদিপ নায়ার শাহবাগীদের প্রশংসা করে একটি প্রবন্ধ লিখেন। তিনি সেখানে এই আন্দোলনকে ‘বাংলাদেশীদের মূল ধারায় ফিরে যাওয়ার আন্দোলন’ বলে অভিহিত করেন। অন্যদিকে রাজীব হত্যার পরদিন ১৬ ফেব্রুয়ারি ১৪ দলের পদযাত্রা কর্মসূচি পালনকালে টঙ্গীতে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘ব্লগার রাজীব হায়দার দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধের প্রথম শহীদ’।

স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী তার বাসায় গিয়ে সমবেদনা জানান এবং শাহবাগীদেরকে ১৯৭১-এর মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে তুলনা করেন। হায় আফসোস! কোথায় ক্ষুর্ধাত, হতদরিদ্র মুক্তিযাদ্ধারা, আর কোথায় পোলাও-বিরিয়ানী খাওয়া ইসলামের ভয়ংকর শত্রুরা!

এই শাহবাগীদের পৃষ্ঠপোষকতায় আছে বিখ্যাত বিজ্ঞান বিষয়ক কল্পকাহিনী লেখক জাফর ইকবাল, ইসলাম ও দেশবিরোধী চলচিত্র নির্মাতা শাহরিয়ার কবির, ফতোয়া নিষিদ্ধের রায়প্রদান করা বিচারক গোলাম রববানী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক পাঁড় বামপন্থী মুনতাসির মামুনের মত সঘোষিত নাস্তিকরা। খুঁদকুড়ো খাওয়া ‘ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি’ (ঘাদানিক) নামক দলটি এদের সহযোগিতায় ক’দিন মিডিয়াকে খুব মাতিয়ে রাখে। যারা ইতিপূর্বে ২০০৭ সালে কট্টর ইসলাম বিরোধী ব্লগ ‘মুক্তমনা’’-কে ‘জাহানারা ইমাম স্মৃতিপদক’ পুরস্কার প্রদান করেছিল।

নাস্তিকদের ধৃষ্ঠতা : এসব ব্লগ বন্ধ ও চিহ্নিত ব্লগারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার আবেদন জানিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক রাতুল সরওয়ার ও ঢাকা সেন্ট্রাল কলেজের অধ্যক্ষ নুরুল ইসলাম হাইকোর্টে একটি রিট (নং ৮৮৬/১২) দায়ের করেন। রিটে স্বরাষ্ট্র সচিব, তথ্য সচিব, পুলিশের আইজি, র‌্যাবের ডিজি এবং বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশনকে (বিটিআরসি) বিবাদী করা হয়। বিচারপতি মির্জা হোসাইন হায়দার ও বিচারপতি মুহাম্মাদ খুরশিদ আলম সরকারের দ্বৈত বেঞ্চ অবিলম্বে এই সকল ওয়েবসাইট ও ব্লগ বন্ধ এবং অপরাধীদের গ্রেফতারের নির্দেশ দিয়ে রুল জারি করেন। হাইকোর্টের আদেশে বলা হয়, “Pending hearing of the Rule, the respondents are hereby directed to take all necessary steps to block the above noted facebooks/websites/webpages and URL and/or any other similar internet sites and also to initiate investigation to identify the perpetrators of all such offensive websites, at once and submit a report along with compliance within 2 weeks from the date of receipt of this order” (রুল নিষ্পত্তি প্রক্রিয়া চলাকালে বিবাদী পক্ষকে নির্দেশ দেয়া যাচ্ছে যে, তারা যেন এই মুহূর্তে আপত্তিকর সকল ফেসবুক/ ওয়েবসাইট/ ওয়েব এবং ইউআরএল এবং/অথবা অন্যান্য ইন্টারনেট সাইট বন্ধ করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে এবং এই সকল ওয়েবসাইটের হোতাদের খুঁজে বের করে। একই সঙ্গে আদালতের আদেশে ওইসব ওয়েবসাইট, ব্লগ ও ওয়েবপেজের স্বত্বাধিকারী এবং ধর্মদ্রোহী ব্লগারদের অনুসন্ধান করে তাদের নাম-ঠিকানাসহ পূর্ণ পরিচয় আদালতে পেশ করে। এই আদেশ প্রাপ্তির দুই সপ্তাহের মধ্যে নির্দেশ প্রতিপালন ও প্রতিবেদন পেশ করার নির্দেশ দেয়া হলো)। হাইকোর্টের এই রায়ের জবাবে আসিফ তার ফেসবুকে লেখে ‘‘আমি সম্পূর্ণ সজ্ঞানে সচেতনভাবে ঐ যুক্তিহীন অন্ধ ষাঁড়ের মতো উৎকট দুর্গন্ধময় ধর্মীয় অনুভূতি এবং ঐ যুক্তিহীন ধর্মীয় অনুভূতির রক্ষক আদালত, দুই জিনিসেরই অবমাননা করলাম’’। হাইকোর্টকে কটূক্তি করে আসিফ আরও লিখেছে যে, ‘‘তোমাদের যুক্তিহীন হাস্যকর অনুভূতি এবং তা রক্ষণাবেক্ষণের দায় আমার নয়, অযৌক্তিক সমস্ত বিষয় নিয়ে প্রশ্ন তোলা, তা যাচাই করা, প্রয়োজনে ছুড়ে ফেলা আমার বাকস্বাধীনতা এবং আমার অধিকার। কোন সভ্য আদালত আমার এই অধিকার কেড়ে নিতে পারে না’’ (দৈনিক আমার দেশ, ধর্ম ও আদালতের অবমাননা করছে ব্লগার চক্র, ২২.২.২০১৩)।  এছাড়াও শাহবাগীরা সেখান থেকে বিভিন্ন পত্রিকার সম্পাদককে ধমক দিতে থাকে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে একটি দেশের ৯০% মানুষের ধর্মকে ঘৃণা করে, তার বিরুদ্ধে লিখে কিভাবে তারা প্রকাশ্য আন্দোলন করার দুঃসাহস পায়? শুধু ধর্ম বিরোধিতা নয়, অত্যন্ত দাপটের সাথে স্বীকারোক্তি করছে ধর্ম ও আদালত দুটোরই অবমাননা করলাম (!!)। একদিকে  এই স্বল্পসংখ্যক নাস্তিকের রাষ্ট্রের ধর্ম ও উচ্চ আদালত নিয়ে ধৃষ্টতা, অন্যদিকে সরকারের তাদের ব্যাপারে নীরব প্রতিক্রিয়াই শুধু নয় তাদের দাবীগুলো একের পর এক মেনে নেওয়াতে মনের কোনে অজান্তে এক প্রশ্ন জেগে উঠে তাহলে এরা কি আন্দোলনকারী না হুকুমদাতা? তাদের শক্তি কি তাহলে হাইকোর্ট এর চেয়েও বড়? এখন আবার শোনা যাচ্ছে সরকার তাদেরকে জেল থেকে ছেড়ে আমেরিকা পাঠাচ্ছে (আমার দেশ, অনলাইন সংস্করণ, ১৬.২.২০১৩)। এদের যত আক্রোশ কেবল ইসলাম ধর্মের প্রতি কেন? আযান, ছালাত এদের চক্ষুশূল হলে হিন্দু ধর্মীয় মঙ্গল প্রদীপ জ্বালানোতে এত উৎসাহ কেন? ইসলাম নিয়ে সমালোচনার ভাষাই বা এত অশ্লীল, এত কুরুচিপূর্ণ হয় কী করে? যে সব ব্লগার এই অপকর্ম করছে, তারা কি সব মানুষরূপী শয়তান? এদের পিতা-মাতার পরিচয়ই-বা কী? সেসব পিতা-মাতা পুত্র-কন্যাদের এই বিকৃত মানসিকতা সম্পর্কে কি অবহিত? না এদের মগজ ধোলাইয়ের কাজে কোনো বিশেষ বিদেশী রাষ্ট্র কিংবা গোয়েন্দা সংস্থার সংযোগ আছে? সেই রহস্যের উদ্ঘাটনই-বা কে করবে? কিছু ব্লগের মালিকানায় বিদেশি অস্তিত্বের সন্ধান মিলেছে। এ নিয়ে এখনই বিশদভাবে তদন্ত করা দরকার। কথিত ‘গণজাগরণ প্রকল্প’ বাস্তবায়নে সরকারের সঙ্গে ঢাকার কোন্ কোন্ বিদেশী রাষ্ট্রের দূতাবাস জড়িত ছিল এবং খাদ্য, পানীয় ও নোংরা আমোদ-ফূর্তির বিপুল অর্থায়ন কোথা থেকে হয়েছে সে তথ্যটি পাওয়া গেলেই থলের বিড়াল বেরিয়ে যাবে। পবিত্র কুরআনে  আল্লাহ বলেছেন, ‘তিনিই সর্বোত্তম কৌশলী’। অতএব, তার কৌশলের কাছে এই শক্তিদের হার মানতেই হবে, সত্যের জয় হবেই, এসব প্রশ্নের জবাবও একদিন মিলবে ইনশাআল্লাহ্।

আরও দেখুন:  গভীর চক্রান্তে পোশাক খাত

হেফাজতে ইসলাম : বর্তমানে হেফাজতে ইসলাম ও আল্লামা আহমাদ শফি বহুল পরিচিত দুটি নাম। নাস্তিকদের উত্থানের পর তাদের বিরুদ্ধে হেফাজতের সাহসী ভূমিকা দেশব্যাপী সাড়া ফেলে দেয়। তাদের স্মরণকালের বৃহত্তম লংমার্চ এবং ঐতিহাসিক ঢাকা অবরোধ সহ দেশ ব্যাপী বিভিন্ন যেলায় ‘শানে রিসালাত’ নামে করা সফল সম্মেলনগুলোতে লাখো জনতার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণই প্রমাণ করে তারা আপামর মুসলিম জনতার কতটা সমর্থন ও ভালবাসা লাভ  করেছে। তাই এ পর্যায়ে এসে তাদের পরিচয় সম্পর্কে দুটি কথা না বললেই নয়। হেফাজতে ইসলাম মূলত বাংলাদেশের বৃহত্তম কওমী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ‘মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারী’ আরবী বিশ্ববিদ্যালয় ভিত্তিক একটি অরাজনৈতিক সংগঠন। এরা মাযহাবগত ভাবে হানাফী। উল্লেখ্য উপমহাদেশের হানাফীদের মধ্যে আবার দুটি মাযহাব রয়েছে। ১-ব্রেলভী, ২-দেওবন্দী। হেফাজতে ইসলাম দেওবন্দী মাযহাবের অনুসারী। নিমেণ তাদের সংক্ষিপ্ত পরিচয় দেয়া হল। 

১. ব্রেলভী : এই মাযহাবের অনুসারীরা নিজেদেরকে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত বা সুন্নী বলে থাকে। ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশে হানাফী মাযহাবের অনুসারী সবচেয়ে বেশী আর হানাফীদের মধ্যে এই ব্রেলভী মাযহাবের অনুসারীর সংখ্যা বেশী। ব্রেলভীদের সবচেয়ে বড় পরিচয় হল তারা কবরপূজারী। কবরে সিজদা দেওয়া, মানত মানা, কবরে চাওয়া, চাদর চড়ানো ইত্যাদি শিরকী কর্মকান্ড হল তাদের প্রধান কাজ। তাদের মারকায হচ্ছে খাজা মঈনুদ্দীন চিশতীর মাযার, যা ‘আজমীর শরীফ’ নামে বিখ্যাত। এটা শুধু তাদের দ্বিতীয় মক্কা নয় বরং এই মাযার জিয়ারত করলে একবার হজ্জ করার সমান নেকী হয় বলে তারা বিশ্বাস করে (নাউযুবিল্লাহ)

২. দেওবন্দী : দেওবন্দীদের সেন্টার বা মারকায হচ্ছে ভারতের উত্তর প্রদেশের সাহারানপুর জেলার অর্ন্তগত দেওবনদ নামক জায়গায় অবস্থিত বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দারুল উলুম দেওবন্দ। দেওবন্দীদের ‘দ্বিতীয় মক্কা’ হিসেবে খ্যাত এই মাদরাসাটি। উপরোক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাযহাবকে ‘মাসলাকে দারুল উলূম’ বা ‘মাসলাকে উলামায়ে দেওবন্দ’ বলা হয় এবং এর অনুসারীদেরকে ‘দেওবন্দী’ বলা হয় এবং উক্ত প্রতিষ্ঠান থেকে পাশ করা ছাত্রদের ‘কাসেমী’ বলা হয়। উল্লেখ্য যে, দেওবন্দী মাযহাবটাই কওমী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ভিত্তিক, যারা সরকারী কোন অনুদান গ্রহণ করেনা। যেমন আমাদের দেশে হাটহাজারী, পটিয়া ভারতে দেওবন্দ, সাহারানপুর এবং পাকিস্তানে দারূল উলুম করাচী ইত্যাদি। উক্ত মাযহাবের বর্তমান সবচেয়ে মান্যবর ব্যক্তি হচ্ছেন দারুল উলুম করাচীর মুহতামিম জাস্টিস তাকী উসমানী। আশরাফ আলী থানবী, আনোয়ার শাহ কাশ্মীরী, রশীদ আহমাদ গাঙ্গুহী, আবুল হাসান আলী হাসান নাদভী (র.) এই মাযহাবেরই ধারক-বাহক এবং প্রচারক ছিলেন। দেওবন্দীদের লিখিত বই পুস্তক পড়লে এবং তাদের দারসে বসলে যে কেউ বুঝতে পারবে যে, তারা যেকোন ফতওয়ায় নিজেদের উপরোক্ত উপমহাদেশীয় আলেমদের বক্তব্য বেশী প্রাধান্য দেন এবং তাদের কথাকেই দলীল হিসেবে পেশ করেন। এই সমস্ত ওলামায়ে কেরামকে তারা নিজেদের ভাষায় ‘আকাবির’ বলেন। অন্যদিকে উপমহাদেশ পেরিয়ে আরব বিশ্বের বড় বড় আলেম যেমন ইবনে তাইমিয়া, ইবনুল কাইয়িম, ইবনে কাছীর, নাছিরুদ্দীন আলবানী, ইবনে বায, শায়খ উছায়মীন (র.) প্রমুখের মতামতকে পাশ কাটিয়ে চলার চেষ্টা করেন এবং তেমন মূল্যায়ন করেন না।

ব্রেলভী ও দেওবন্দী উভয়েই হানাফী হওয়ার পরেও কিছু কিছু মাসআলায় কঠিন বির্তক হওয়ার জন্য তাদের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটে। তন্মধ্যে অন্যতম কয়েকটি হচ্ছে-

১. কবরপূজা ব্রেলভীদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। দেওবন্দীরা এটাকে শিরক বলে।

২. ব্রেলভীরা রাসূল (ছাঃ)-কে সর্বত্র বিরাজমান বলে বিশ্বাস করে। দেওবন্দীরা এটাকে অস্বীকার করে।

৩. ব্রেলভীরা বিশ্বাস করে রাসূল (ছাঃ) গায়েবের খবর জানেন তথা আল্লাহ তাআলার মত প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সবকিছুর জ্ঞান রাখেন। দেওবন্দীরা এটাকে শিরক বলে।

এইরূপ কয়েকটি মাসআলায় বিরোধ ছাড়া প্রায় বাকী সব মাসআলাতেই তারা হানাফী ফিকহের তাক্বলীদ (অন্ধ অনুসরণ) করেন এবং যারা এই অন্ধ অনুসরণকে অস্বীকার করে তাদেরকে দমন করতে তারা উভয়েই একাট্টা। যাইহোক হেফাজতে ইসলামের ভাইয়েরা এই দ্বিতীয়টির অনুসারী। যদিও হাটহাজারী অন্যান্য দেওবন্দীদের থেকে কিছু স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যও রাখে। যেমন ফরয ছালাতের পর একসাথে হাত তুলে দোআ করার ব্যাপারে হাটহাজারীর ফতওয়া হচ্ছে এটা বিদআত এবং এই ফতওয়ার উপরই তাদের আমল। অন্যদিকে তাদের মারকায দেওবন্দসহ অন্যান্য জায়গায় অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে এই দোআর উপর আমল করা হয়ে থাকে।

অন্যান্য ইসলামী দলের সাথে হেফাজতের আদশির্ক সর্ম্পকের ব্যাপারেও কিছুটা ইংগিত না দিলেই নয়। প্রথমত জামাআতে ইসলামীকে তারা ভ্রান্ত ফেরকা বলেই জানে। তার অন্যতম কারণ হচ্ছে ছাহাবায়ে কেরাম সম্পর্কে মাওলানা মওদুদীর বিরূপ মন্তব্য এবং তারা জামাআতে ইসলামীকে ইসলামী জ্ঞান শুন্য মনে করে। কোন প্রকার মূল্যায়নই করেনা।

দ্বিতীয়ত তারা আহলেহাদীছদের কঠোর বিরোধী এবং বর্তমানে উপমহাদেশব্যাপী তাদের আহলেহাদীছ বিরোধিতা তুঙ্গে। আহলেহাদীছদের সাথে তাদের মৌলিক বির্তক তাক্বলীদে শাখছী বা অন্ধ ব্যক্তি পূজা নিয়ে। তাদের মধ্যে সাইয়েদ আশরাফ আলী থানভী এটাকে ফরয বলেছেন এবং সাইয়েদ আহমাদ পালানপুরী এটাকে ওয়াজিব লি গায়রিহী বলেছেন। আর আহলেহাদীছ ওলামায়ে কেরাম এটাকে বিদআত বলেছেন। এই তাক্বলীদকে অস্বীকার করার উপর ভিত্তি করে তারা আহলেহাদীছদেরকে ‘গায়রে মুকাল্লিদ’ বলে থাকে। যা তাদের কাছে গালি-র সমতুল্য। গত ১৩.২.২০১৩ তারিখে দারুল উলুমে অনুষ্ঠিত পরামর্শসভা থেকে সালাফী বা আহলেহাদীছদের উত্থান দমনে তারা সাংগঠনিক পদক্ষেপ গ্রহণের ঘোষণা দেন। ডা. জাকির নায়েকের বক্তব্য শুনাকে তারা হারাম ঘোষণা করেছেন। অন্যদিকে আলবানী (র)-এর ইলমী খিদমতও তাদের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু তাঁর লেখনির ইলমী জবাব দেওয়াও দুঃসাধ্য।

তৃতীয়ত তাবলীগ জামাআতের সাথে তাদের সম্পর্কের বিশ্লেষণ করা কিছুটা জটিল। তাবলীগ জামাআতের প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা ইলিয়াস যিনি দেওবন্দীদের পরিচালিত বড় বড় মাদরাসা (যেমন পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে)-এর কোন শিক্ষক ছিলেন না বা তাদের নিকটে মান্যবর কোন বড় আলেমও ছিলেন না। উভয়ের সেন্টার বা মারকায এবং দলীয় আমীরও আলাদা। যেমন ভারতে তাবলীগ জামাআতের মারকায নিযামুদ্দীন, আর দেওবন্দীদের দারুল উলূম। বাংলাদেশে তাবলীগের মারকায কাকরাইল আর দেওবন্দীদের হাটহাজারী। কিন্তু এ কথা সত্য যে, দেওবন্দীদের আশ্রয়েই চলছে তাবলীগ জামাআত। সর্বপ্রথম এই আশ্রয় দেওয়ার কাজটা করেন মাযাহিরুল উলুম সাহারানপুরের মুহাদ্দিছ মাওলানা যাকারিয়া। তিনিই ‘তাবলীগী নিসাব’কে জমা করে ‘ফাযায়েল আমল’ নাম দেন এবং তাদের মধ্য থেকে অনেকেই তাবলীগ জামাআতের উপর আহলেহাদীছ আলেমদের আপত্তির জবাবে বইও লিখেছেন। যদিও অদ্যাবধি তাবলীগ জামাআত কোন ‘দারুল ইফতা’ খুলেনি বরং এখনো ফতোয়া ও মাসআলা-মাসায়েলের বিষয়ে দেওবন্দীদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর শরণাপন্ন হন কিন্তু অচিরেই হয়তোবা তারা এ পথে পা বাড়াবেন। কেননা তারা অভ্যন্তরীণভাবে অনেক মাসআলা-মাসায়েল নিজেরাই পরামর্শ করে সমাধান করে নেন। যেমন মহিলাদের চিল্লায় বের হওয়ার বিষয়টি তারা জায়েয বলেছেন। যদিও দারুল উলুম অনেক শর্তারোপের মাধ্যমে জায়েয করার চেষ্টা করেছেন কিন্তু ‘দারুল উলূমে’ই এই মাসআলার কঠিন বিরোধী আলেম-ওলামা আজও মওজুদ আছেন। এখানে সবচেয়ে সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে দুটি বিষয়। প্রথমত চিল্লা লাগানোর ব্যাপারে তাবলীগী ভাইদের বাড়াবাড়ি, যেমন তারা দাওরা পাশ করার পরে ১ বছর চিল্লা না লাগালে পূর্ণ আলেম মনে করেননা। এমনকি তাদের পরিচালিত মাদরাসা ও মসজিদের ছাত্র ও শিক্ষক এবং ইমাম হওয়ার জন্য ১ বছর চিল্লা লাগানো শর্ত। এমনকি বিশ্ব ইজতেমায় চিল্লার বরকতে দ্বীন সম্পর্কে অজ্ঞ পাকিস্তানী ক্রিকেটার সাঈদ আনোয়ার বয়ান বা বক্তব্য দেয়ার সুযোগ পেলেও দেশবরেণ্য আলেমে দ্বীন আল্লামা আহমাদ শফি কোন কথা বলার সুযোগ পাবেন না। কেননা তিনি যে চিল্লা লাগান না। শুধু বিশ্ব ইজতেমা নয় তাদের ছোট-খাট বৈঠকে চিল্লা না লাগানো কোন ব্যক্তি কথা বলতে পারেনা।

দ্বিতীয়ত মাদরাসা ছাত্রদের অত্যধিক হারে চিল্লা লাগানোর প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। ফলত যেখানে প্রতি বৃহস্পতিবার ও শুক্রবারে পুরাতন পড়া রিভাইজ দেয়া দরকার, সেখানে তারা ৩ দিনের চিল্লায় বের হন। অন্যদিকে যেখানে আগের জামানার শিক্ষকরা বলতেন ‘জিসনে ছুটি কো ছুটি সামঝা উসনে ইলম কো খোয়া আওর জিসনে ছুটি কো গানীমাত সামঝা উসনে ইলম কো হাসিল কিয়া’ তথা ‘যে ছুটিকে ছুটি মনে করল সে বিদ্যা হারিয়ে ফেলল আর যে ছুটিকে ইলম অর্জনের জন্য সুযোগ মনে করল সেই ইলম অর্জন করল’, সেখানে সকল ছুটিতে চিল্লায় বের হওয়ার পূর্ব প্রস্ত্ততি চলতে থাকে। আমি এখানে অনেক মেধাবী পড়ুয়া ছেলেকে দেখেছি যারা তাবলীগী ভাইদের ভয়ে পালিয়ে বেড়ান। ফলত ধীরে ধীরে ছাত্রদের মাঝ থেকে ইলম উঠে যাচ্ছে। উপরোক্ত দুটি কারণে দেওবন্দী আলেম- ওলামা চিন্তিত। যেমন মাওলানা হোসাইন আহমাদ মাদানীর ছেলে জমঈয়তে উলামায়ে হিন্দ এর আমীর মাওলানা আরশাদ মাদনী এ বিষয়ে অত্যন্ত কড়া অবস্থান নেন। ছাত্রদের চিল্লায় যাওয়াতে পড়া শোনা নষ্ট হওয়ায় একে ছাত্রদের জন্য গুনাহের কাজ বলেছেন। তিনি আশংকা প্রকাশ করে বলেন, একটা ছেলে দাওরা পাশ করার পর টানা ১ বছর চিল্লা লাগানোতে ৬-৭ বছরে যা শিখেছিল তা ভুলে জাহেলে পরিণত হয় এবং এই কারণেই বর্তমানে আর বড় বড় আলেম তৈরী হচ্ছনা। অন্যদিকে ‘ফাযায়েলে আমলে’ বর্ণিত জাল ও যঈফ হাদীসের উপর আহলেহাদীছ আলেমদের কড়া সমালোচনাও তাদের পেরেশানীর কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেননা তাতে এমন অনেক হাদীছ আছে যা তারাও মানতে পারেন না।

যাইহোক উপরোক্ত সংক্ষিপ্ত আলোচনায় দেওবন্দীদের সাথে অন্যদের সম্প©র্কর দিকটি ফুটে উঠেছে বলে বিশ্বাস করি। এখন আমরা মূল আলোচনায় ফিরে আসি। হেফাজতে ইসলাম এবং তার সাথে একতাবব্ধ হওয়া বাংলাদেশের বিভিন্ন ইসলামী সংগঠন যেমন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিস ইত্যাদি সবাই মাযহাবগতভাবে দেওবন্দী। এর মধ্যে আহলেহাদীছ, ব্রেলভী বা জামাআত-শিবির নেই। কিন্তু দেশ ও জাতির এই ক্রান্তিলগ্নে তাদের উত্থানকে জামাআত-শিবির, আহলেহাদীছসহ প্রায় সব ইসলামী দল আন্তরিক সমর্থন জানায় এমনকি এই কাজে নেমে জামাআত তার অন্ধের ষষ্ঠি ‘দিগন্ত টিভি’ হারায়। অন্যদিকে ভ্রান্ত কবরপূজারী ব্রেলভীরা ন্যক্কারজনকভাবে হেফাজতের এই পদক্ষেপের বিরোধিতা করলেও পীর-মাযার সমর্থক দৈনিক ইনকিলাব তাদের বিরোধিতাকে উপেক্ষা করে হেফাজতের কর্মসূচীকে পূর্ণ সমর্থন জানায়। তারপরও কথায় আছে ‘দশে মিলে করি কাজ হারি জিতি নাহি লাজ’। এই উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেই ‘আহলেহাদীছ আন্দোলন বাংলাদেশে’র আমীরে জামাআত প্রফেসর ড. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব ‘সম্মিলিত সংগ্রাম পরিষদ’ গঠনের আহবান জানান। তাঁর এই আহবানে সাড়া দিয়ে যদি ‘সম্মিলিত সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন করা হত তাহলে হয়তোবা ৫মে দিবাগত রাতের পরিস্থিতি অন্যরকমও হতে পারতো। তাই এখনো হেফাজতে ইসলাম যদি মাযহাবী দ্বন্দ্বের ঊর্ধ্বে উঠে সকল ইসলামী দলকে নিয়ে মাঠে নামে, তাহলে ইনশাআল্লাহ এই ইসলামী বিরোধী শক্তির ধ্বংস সুনিশ্চিত হবে এবং ইসলামী বিপ্লবের পথ সুগম হবে ইনশাআল্লাহ।  

আরও দেখুন:  আমাদের সমাজ ব্যবস্থা ও ঈদ উৎসব

৫/৫ আলেম-ওলামার রক্তে লাল হল বাংলার মাটি : ৫মে দিবাগত রাতটি পৃথিবীর ইতিহাসে ঐতিহাসিক কালো রাত হিসেবে লিপিবদ্ধ থাকবে। কারো মনে থাক আর না থাক এদেশের ইসলামপ্রিয় জনতা চিরদিন মনে রাখবে ঐ রাতকে। নিরস্ত্র ছালাতরত কিংবা দোআয় মগ্ন  মানুষদের উপর মধ্য রাতের নিকষ আধারে গণহত্যা চালানোর এক নজিরবিহীন দৃশ্যের অবতারণার রাত এটি। নাস্তিকদের ফাঁসির দাবীতে হেফাজতে ইসলাম কর্তৃক আহূত লংমার্চে জনগণের বিপুল সমর্থন ও হৃদয়নিংড়ানো ভালবাসা এবং নাস্তিকদের প্রতি বাংলার জনগণের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশের মাধ্যমে ঘোষণা আসে ৫ মে  ঢাকা অবরোধের। এরপর দেশব্যাপী প্রায় ২০-এরও অধিক ‘শানে রিসালাত’ নামে মহাসম্মেলন করে হেফাজত। তারপর আসে ৫ মে।  আগের দিন বিএনপির ৪৮ ঘন্টার আল্টিমেটামে পরিবেশ একটু গরম গরম ছিল। এর মাঝেই শুরু হয় হেফাজতের ঢাকা অবরোধ, যা মূলত ঢাকায় প্রবেশের ৬টি পয়েন্ট ঘিরে অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশের ইতিহাসে স্মরণকালের সবচেয়ে বৃহত্তম অবরোধ বলা যেতে পারে এটিকে। দুপুরের পর সরকারী কূটচালে পড়ে অবরোধ ছেড়ে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে সমাবেশ করার পরিকল্পনা করে হেফাজতে ইসলাম। যোহর ছালাতের পর লক্ষ লক্ষ ধর্মপ্রিয় মানুষের যাত্রা শুরু হয় মতিঝিল অভিমুখে। যাত্রা শুরু হওয়ার পরে অনেকটা অপ্রত্যাশিতভাবে পুলিশ এবং সরকারদলীয় সন্ত্রাসীরা পথে পথে হামলা করে তাদেরকে বাধা দেয়। একদিকে অনুমতি অন্যদিকে বাধা এই দ্বিমুখী নীতি সবাইকে আশ্চর্য করেছে। ফেসবুকে প্রকাশিত একটি ছবিতে দেখা যাচ্ছে একজন মহিলা ও কিছু দুর্বৃত্ত একজন মাদরাসার ছেলেকে মাটিতে ফেলে সাপের মত পিটাচ্ছে। হেফাজতে ইসলামের সদস্যরা মোমবাতি নয় যে আগুন লাগালেও চুপচাপ বসে থাকবে। তারা মানুষ। সুতরাং মানুষ হিসেবে আত্মরক্ষার চেষ্টা তারা করবে। সেই হিসেবে তারা সাধ্যমত আত্মরক্ষার চেষ্টা করলে পুলিশ গুলি ছোড়া শুরু করে। এভাবে রাস্তায় রাস্তায় সংঘর্ষ, ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া শুরু হয়। অন্যদিকে মতিঝিলে শান্তিপূর্ণ সমাবেশ চলতে থাকে। মূলত আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সরকারদলীয় সন্ত্রাসীরা গায়ে পড়ে পরিকল্পিতভাবে পরিবেশকে বিশৃংখল করে তুলে। তাইতো কথায় বলে ‘ষাড়কে লালশালু দেখাতে নেই’।

অন্যদিকে সমাবেশে আল্লামা আহমাদ শফির আসার কথা থাকলেও পলাশীর মোড় থেকে কোন অজ্ঞাত কারণে তাকে নিরাপত্তার সমস্যা দেখিয়ে ফেরত পাঠানো হয়। আর সমাবেশস্থলে আহমাদ শফির নামে আন্দোলনরত কর্মীদের দাবী অনুযায়ী লাগাতার অবস্থানের ঘোষণা দেওয়া হয়। এরপর সারাদিনের অবরোধ, সংঘর্ষে ক্লান্ত হেফাজত কর্মীরা রাস্তায় শুয়ে পড়ে। এদিকে শাপলা চত্বর এলাকায় লাইট বন্ধ করে দিয়ে এক ভুতুড়ে পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়। ঠিক রাত দুইটার সময় শুরু হয় মূল অপারেশন। যার নাম পুলিশের পক্ষ থেকে দেয়া হয়েছিল ‘অপারেশন সিকিউরড শাপলা’; অন্যদিকে বিজিবি একই অপারেশনের নাম দেয় ‘অপারেশন ক্যাপচার শাপলা’। এর আরও একটি নাম শোনা যায় অপারেশন ফ্লাশ আউট। হ্যান্ডমাইক থেকে শাপলা চত্বর ছেড়ে দেয়ার আহববান জানানো হয়। এই আহবানে ঘুমন্ত মানুষগুলো জেগে উঠল কি উঠলনা তা না দেখেই শুরু হয় তিনদিক থেকে পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবির স্মরণকালের ভয়াবহ নিকৃষ্ট গণহত্যা। এই গণহত্যার দৃশ্য সরাসরি সম্প্রচার করার দায়ে বন্ধ করে দেয়া হয় ইসলামিক টিভি ও দিগন্ত টিভি। আরও আগে থেকেই বন্ধ ছিল আমার দেশ। অনেকেই এই গণহত্যাকে হিটলারের ইহুদী হত্যার সাথে তুলনা করেছেন, অনেকেই আবার জালিয়ানওয়ালাবাগের সাথে আবার অনেকেই ২৬ মার্চের কালো রাতের সাথে। আমি বলব এগুলোও গণহত্যা ছিল। মানবিক দিক থেকে এগুলোও অন্যায় ছিল। কিন্তু তা ৫ই মের গণহত্যার সাথে তুলনীয় নয়। কেননা হিটলার তার ধর্মবিরোধী এবং তার বিশ্বাসে তার নবীকে হত্যাকারী, আল্লাহর অভিশাপপ্রাপ্ত জাতিকে হত্যা করেছিল। কিন্তু এখানে হত্যা করা হয়েছে কুরআনের হাফেজকে, হাদীছের পাঠককে। আর কোন বিজাতীয় লোকেরা হত্যা করেনি, করেছে স্বজাতি। জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকান্ড যারা ঘটিয়েছিল তারা ছিল ইংরেজ। তারা তো এদেশে অত্যাচার করার জন্যই এসেছে। আর এখানে জান-মাল রক্ষার ওয়াদা দিয়ে জনগণের ভোট নিয়ে ক্ষমতায় যাওয়া সরকার সেই জনগণের উপর হত্যাকান্ড চালিয়েছে। আর ২৬ মার্চের কালো রাত সেখানে আমরা ধর্মগতভাবে এক হলেও ভাষাগতভাবে আলাদা জাতি ছিলাম এবং আমাদের দ্বন্দ্ব ছিল রাজনৈতিক। তারা আমাদের প্রাপ্য হক্ব না দিয়ে অন্যায়ভাবে আমাদের শাসন করতে চাইছিল আর আমরা তাদের থেকে স্বাধীনতা লাভ করতে চেয়েছিলাম। সুতরাং সেখানে দ্বন্দ্ব ও যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী। বিনা প্রতিরোধে যেমন আমরা স্বাধীনতা লাভ করতে পারতামনা, তেমনি বিনা আক্রমণে তারা আমাদের তাদের অধীনে রাখতে পারতনা। কিন্তু এখানে তো কারো ক্ষমতা ছিনিয়ে নিতে যাওয়া হয়নি, কারো কাছে আলাদা রাষ্ট্র গঠনের দাবী জানানো হয়নি। আপনি বলতে পারেন তারা যে শাপলা চত্বরে লাগাতার অবস্থাানের ঘোষণা দিয়েছিল। আমি বলব যদি অবস্থান গ্রহণ অপরাধ হয়, তাহলে এক অপরাধের দুই সাজা এটা আবার কোন ইনসাফ? যারা শাহবাগে অবস্থান করল তারা পাবে বিরিয়ানী আর যারা মতিঝিলে অবস্থান করল তারা পাবে গুলি। সত্যিকারেই স্মরণকালের ভয়াবহ গণহত্যা এটি যার কোন তুলনা নেই। তারা কি অপরাধ করেছিল যে সরকার এত বেপরোয়া হয়ে উঠল? কোন অপরাধই খুঁজে বের করতে পারবে না। তবে হ্যা একটা অপরাধ আছে যেই অপরাধের জন্য আপনাদের এত আক্রোশ। আর সেটা হচ্ছে এরা ছিল মুসলমান। একজন মুসলমান হিসেবে তাদের প্রাণপ্রিয় নবীকে কটূক্তিকারীদের বিচার চাইতে এসেছিল। এটাই আর সহ্য হয়নি। তাই তাদের হত্যা করে মনের ঝাল মিটালেন। তাইতো মনের মধ্যে প্রশ্ন জাগে এদেশে তাহলে ইসলাম কি পরাধীন? পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম ইসলামী রাষ্ট্রে ইসলাম পরাধীন! তাহলে এই দেশ চালাচ্ছে কারা? মুসলমানরা না অন্য কেউ?

সে যাইহোক উক্ত ঘটনায় অনেক প্রশ্ন জনমনে ঘুরপাক খাচ্ছে। সবচেয়ে বড় ও জটিল প্রশ্ন হচ্ছে সেই ঘটনায় কত মানুষ মারা গিয়েছিল এবং তাদের লাশ কি করা হয়েছে। সে বিষয়ে নানা মুণির নানা মত। ৮ মে বুধবার রাশিয়ার সরকার নিয়ন্ত্রিত চ্যানেল ‘আরটি’ জানিয়েছে নিহতের সংখ্যা ৪০০-এর মত। বাংলাদেশের মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’ বলেছে, শাপলা চত্বরে শত শত লোককে হত্যা করা হয়। এরপর ট্রাক ও কাভার্ডভ্যানে করে লাশ  সরিয়ে ফেলা হয়। হেফাজতে ইসলাম নিহত ও নিখোঁজের মিলে ৩ হাজারের মতো হবে বলে জানিয়েছে। হংকংভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন এশিয়ার ‘হিউম্যান রাইটস কমিশন’ জানিয়েছে, নিহতের সংখ্যা আড়াই হাজারেরও বেশি হতে পারে। প্রভাবশালী ব্রিটিশ পত্রিকা ইকোনমিস্ট বলছে, অন্তত ৫০ জন লোক নিহত হয়েছে। এটাকে ‘গণহত্যা (ম্যাসাকার) বলেই মনে হচ্ছে’ বলে মন্তব্য করেছে ইকোনমিস্ট। বার্তা সংস্থা এপির বরাত দিয়ে মার্কিন টিভি স্টেশন সিএনএন জানায়, নিহতের প্রকৃত সংখ্যা হয়তো কখনোই জানা যাবে না। উপরোক্ত তথ্যগুলো দেশের বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।

অন্যদিকে সরকার ও তার পদলেহী মিডিয়াগুলো এই ঘটনা ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করে। তারা হতাহতের সংখ্যাকে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করেন। এমনকি অনেকেই চরম মিথ্যাচার করে বলেন কেউ হতাহত হয়নি। যেমন- ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের মুখপাত্র মাহবুব-উল আলম হানিফ অবলীলায় নিশ্চিত ভঙ্গিতে বলে বসলেন শাপলা চত্বরে কোনো লোক হতাহত হয়নি। তার এই মন্তব্যকে নিউএজ পত্রিকার সম্পাদকীয়তে outrageous (নিষ্ঠুর, নির্লজ্জ, মর্মান্তিক) বলা হয়েছে।

দেশীয় মিডিয়ার লুকোচুরি : অপারেশনের সময় নিরস্ত্র ও ঘুমিয়ে থাকা হেফাজতকর্মীদের উপর যৌথবাহিনীর নৃশংসতা নিয়ে দেশের মিডিয়া ভয়ঙ্কর লুকোচুরি করে। সবচেয়ে লক্ষ্যণীয় ব্যাপারটি হল, ৬ মে’র প্রায় সবক’টি পত্রিকা অপারেশন সংক্রান্ত খবরগুলোর বহু নাটকীয় শিরোনাম দেয়ার চেষ্টা করলেও বেশিরভাগ পত্রিকাই তাদের শিরোনামে হতাহতের কোনো তথ্যই দেয়নি। শিরোনামগুলো পড়ে মনে হবে অপারেশনটি অত্যন্ত ‘শান্তিপূর্ণ’ ছিল! যেমন- জনকণ্ঠের শিরোনাম ‘দশ মিনিটেই শাপলা চত্বর মুক্ত’, সমকালের শিরোনাম, ‘১০ মিনিটের সাঁড়াশি অভিযান’, কালেরকণ্ঠ ‘রুদ্ধশ্বাস আধাঘণ্টা’, যুগান্তর ‘অপারেশন মিডনাইট : শ্বাসরুদ্ধকর ১ ঘণ্টা’। অন্যান্য পত্রিকার অবস্থাও তথৈবচ। আশ্চর্যের বিষয় হলো, কালের কণ্ঠ, জনকণ্ঠ, যুগান্তর নিহতের কোনো তথ্যই দেয়নি! কেবল নিউএজ পত্রিকা কমপক্ষে একশ’ জন নিহত হয়েছে বলে জানায়।

এখন বিশ্লেষণ করে দেখা যাক, কত মানুষ নিহত হতে পারে ঐ ভয়াল রাতে। প্রথমত সেইদিন কত রাউন্ড গুলি ছোড়া হয়েছিল তা জানা যাক। ১২ মে রোববারের যুগান্তর পত্রিকায় ৬ কলামে লিড খবরের শিরোনাম ছিল ‘দেড় লক্ষাধিক গোলাবারুদ ব্যবহার, হেফাজত দমনে সরাসরি অংশ নেয় ৭ হাজার ৫৮৮ সদস্য’। একইদিনে ঢাকার কাঁচপুর, সিদ্ধিরগঞ্জ, সানারপাড় এলাকা এবং হাটহাজারী ও বাগেরহাটে হেফাজতকর্মীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে ব্যবহৃত গোলাবারুদসহ সারাদেশে হেফাজতকর্মীদের শায়েস্তা করতে ব্যবহৃত গোলাবারুদের সংখ্যা যোগ করলে সেটা ২ লাখ ছাড়িয়ে যাবে। ২ লক্ষ গোলাবারুদে কত মানুষ মারা যেতে পারে তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। আর কেউ মারা যায়নি এই কথা কত নিচু মানের মিথ্যুক হলে বলতে পারে তাও প্রশ্নাতীত। দুঃখ লাগে যখন সেই মিথ্যুক হয় একজন মন্ত্রী, অপমানবোধ হয় যখন দেখি সেই মিথ্যুক হচ্ছে জাতির বিবেক বলে পরিচিত সাংবাদিক সমাজ। আর আশ্চর্য হই যখন ভাবি, যে সরকার মিডিয়ার স্বাধীনতাকে গলাচিপা হত্যা করতে চায় সেই মিডিয়া কিভাবে সরকারের গোলামী করে!!

এ সময় কাতারভিত্তিক আল জাযীরা এই বিষয়ে সবচেয়ে প্রশংসিত ভূমিকা পালন করেছে। আল জাযীরা স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে, মতিঝিলের শাপলা চত্বরে নিহতের প্রকৃত সংখ্যা প্রকাশ করেনি বাংলাদেশ সরকার। চ্যানেলটির কাছে যে নতুন ভিডিও ফুটেজ এসেছে, তাতে দেখা যাচ্ছে নিহতের প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি। সেই সাথে ফেসবুক, টুইটারের বিভিন্ন পেজও যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এবং হত্যাকান্ডের ফুটেজ তুলে ধরে। যাই হোক সরকার যতই চেষ্টা চালাক না কেন সত্য কোনদিন লুকিয়ে থাকেনা। তাকে যতই চাপানোর চেষ্টা করা হোক তা একদিন প্রকাশ হবেই। 

এছাড়া জনমনে আরো বহু প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। তবে সবচেয়ে যেটা অবাক লেগেছে তা হ’ল, অতীতে পত্রিকায় প্রকাশিত কোনো উদ্বেগজনক বা মর্মান্তিক ঘটনায় সুয়োমোটো রুল জারি করেছে হাইকোর্ট। সম্প্রতি সাভারের রানা প্লাজা ধসের ঘটনায়ও হাইকোর্ট রুল জারি করেছে। এর আগে রাজধানীর ল্যাবএইড হাসপাতালে হিন্দু সম্প্রদায়ের একজন শিক্ষকের মৃত্যু, ইবনে সিনা হাসপাতালে এক নবজাতকের মৃত্যু, কলেজের মেয়েদের বোরকা পরতে বলা, গ্রাম্য সালিশ, বিচারপতিকে পুলিশের সালাম না দেয়া প্রভৃতি ঘটনায় হাইকোর্ট সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতরসহ প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধানের বিরুদ্ধে সুয়োমোটো রুল জারি করেছে। কিন্তু সম্প্রতি মতিঝিলে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গণহত্যা চালিয়েছে, অথচ হাইকোর্ট এ বিষয়ে কোন প্রকার রুল জারি করল না কেন? তাহলে হাইকোর্টের মোটিভটা কি? কেবলই ইসলাম বিরোধিতা?

আরও দেখুন:  করোনা ভাইরাস

মিডিয়ার মিথ্যাচার : দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, যেখানে এতবড় একটা গণহত্যার পর মিডিয়ার উচিৎ ছিল আহত-নিহত পরিবারের পাশে দাঁড়ানো এবং এই গণহত্যার প্রতিবাদ জানানো। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দেশীয় মিডিয়াগুলো ভয়ংকর তথ্যসন্ত্রাসে লিপ্ত হয়। তারা উল্টা নাশকতা সৃষ্টি, বিশৃংখলা তৈরী, গাছ কাটা, ব্যাংক লুট ও কুরআন পুড়ানোর মত অভিযোগে অভিযুক্ত করে হেফাজতকে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, প্রথম আলোর কথা। ৭ মে পত্রিকাটি শাপলা চত্বরের অভিযান ও হেফাজতের অবস্থানের বিভিন্ন দিক এবং এর প্রেক্ষিতে বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্য সংবলিত মোট ৩৩টি সংবাদ ছাপিয়েছে। এর মধ্যে মাত্র তিনটি ছিল হেফাজতের পক্ষে দেয়া বিএনপি, জামায়াত ও হেফাজতের বিবৃতিমূলক। এছাড়া ১২টি বিশেষ প্রতিবেদন ছিল যার কয়েকটির শিরোনাম হলো, ‘হেফাজতের ধ্বংসযজ্ঞে নিঃস্ব অনেক ব্যবসায়ী’, ‘তান্ডবে বাদ যায়নি রাস্তার গাছও’, ‘ধ্বংস, তান্ডব আর সবুজ উপড়ানোর চিত্র’, ‘যেন যুদ্ধ-পরবর্তী ধ্বংসলীলা’, ‘শিশুদের অরক্ষিত রেখে চলে যান নেতারা’, ‘হাজারো কর্মী নিয়ে মাঠে নামে ডিসিসি’, ‘ধ্বংসযজ্ঞের সাক্ষী হাউস বিল্ডিং’, ‘হেফাজতের কর্মীদের রোষানলে ব্যাংক’, ‘৪০০ বছর বয়সী ঢাকায় এ এক কালো অধ্যায়’ ইত্যাদি। বাকি সংবাদগুলো হেফাজতের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করে সরকারের ও সরকার সমর্থক বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠনের দেয়া বক্তব্য ভিত্তিক। সঙ্গে রয়েছে পুরো এক পাতার ফটোফিচার। এরপরের দু’দিনও পত্রিকাটিতে এ ধরনের প্রতিবেদন অব্যাহত রেখেছে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের ব্যাপার হলো, যে কয়জন লোকের নিহতের কথা পত্রিকাটি স্বীকার করেছে তাদের মৃত্যুপরবর্তী কোনো ‘ফলোআপ’ সংবাদ ছাপায়নি! অন্যান্য হত্যাকান্ডের পর নিহতের পরিবারের সদস্যদের সাক্ষাৎকারভিত্তিক বহু রকমের ‘মানবিক সংবাদ’ পরিবেশনে প্রথম আলো সবার চেয়ে অগ্রগণ্য হলেও ঘুমন্ত অবস্থায় হত্যাকান্ডের শিকার হেফাজতের কর্মীদের ক্ষেত্রে প্রথম আলো একেবারেই নীরব! অবশ্য সেদিন মতিঝিল এলাকায় কয়েকটি ছোট ছোট গাছ কাটার জন্য হেফাজতকে দায়ী করে পত্রিকাটির সে কী মায়াকান্না!

অন্যান্য পত্রিকা যেমন কালেরকণ্ঠ, সমকাল, বাংলাদেশ প্রতিদিন, জনকণ্ঠ, সকালের খবর, যায়যায়দিন ইত্যাদি সবার চিত্রও প্রায় একই রকম। টিভিগুলোর সংবাদ ও অন্যান্য প্রোগ্রামেও চলছে হত্যাকান্ডের ঘটনায় নীরবতা এবং সরকারদলীয়দের অপকর্মকে হেফাজতের ওপর চাপিয়ে দেয়ার প্রতিযোগিতা। আর এদিকে সরকার দেশব্যাপী হাজার হাজার মামলা দিয়ে মাদরাসার ছাত্র ও শিক্ষকদের গণগ্রেফতার শুরু করে। কিন্তু এসব ‘গল্প’ যে সম্পূর্ণ মিথ্যা, তা ভিন্নমতের দু’একটি পত্রিকার প্রতিবেদনে এরই মধ্যে উঠে এসেছে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে ৭ মে ইনকিলাব ‘স্বার্থবাদী মিডিয়া যুবলীগের সন্ত্রাসীদের বাঁচাতে মরিয়া’ শীর্ষক প্রতিবেদনে জানায়, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় অফিস সংলগ্ন বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ গেটে যুবলীগের কিছু সন্ত্রাসী বইয়ের দোকানে আগুন দেয়। এ সময় সেসব দোকানে থাকা বিভিন্ন ইসলামী বইয়ের সঙ্গে পবিত্র কুরআনের অনেক কপিও পুড়ে যায়। ঐদিন হাউস বিল্ডিং করপোরেশনের ‘কার পার্কিংয়ে’ আগুন দিয়ে অর্ধশত গাড়ি পুড়িয়ে দেয়ার দায় হেফাজতের উপর চাপিয়ে ৮ মে প্রথম আলো ‘ধ্বংসযজ্ঞের সাক্ষী হাউস বিল্ডিং’ শীর্ষক একটি বিশেষ প্রতিবেদন ছাপে। কিন্তু একইদিন ইন্টারনেটে লিক হওয়া একটি ভিডিও ক্লিপে দেখা যায়, জিন্সের প্যান্ট-শার্ট ও মাথায় হেলমেট পরা কিছু যুবক দীর্ঘ সময় ধরে প্রথমে পার্কিংয়ে থাকা গাড়িগুলো ভাংচুর করে এবং পরে আগুন ধরিয়ে দেয়। এরা যে হেফাজতের সমাবেশে আসা কওমী মাদরাসার পাঞ্জাবী-পায়জামা-টুপি পরা লোকজন নয়, তা সবার কাছে পরিষ্কার। এই ভিডিওটি আমারদেশ পত্রিকা কর্তৃপক্ষের কাছে আছে বলে তারা জানায়। সবচেয়ে বড় কথা যারা কুরআনের ইযযত রক্ষার জন্য জীবন দিতে কুণ্ঠাবোধ করে না, তারা কিভাবে কুরআন পুড়াতে পারে? মিথ্যা বলারও তো একটা সীমা থাকা চাই। লক্ষ্যণীয় বিষয় হচ্ছে তারা মানুষ হত্যা করার জন্য হেফাজতকে দায়ী করছেনা। দায়ী করছে শুধু জ্বালাও-পোড়াও ও ভাংচুরের ব্যাপারে। কেননা মানুষ মারার কথা বললে তো লাশ দেখাতে হবে কিন্তু যত লাশ সব যে দাড়ি টুপি ওয়ালার। আর তান্ডবের ক্ষেত্রে শুধু ধ্বংস হওয়া জায়গাটার ছবি দেখালেই চলবে। হায়রে মিথ্যুক মিডিয়া!

হেফাজত নেতাদের ভূমিকা : অনেকেই প্রশ্ন করেছেন হেফাজতে ইসলাম কেন এমন ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ নিতে গেল? কী উদ্দেশ্য ছিল এর পেছনে? এই প্রসঙ্গে সামগ্রিক অবস্থার পর্যালোচনায় যা বেরিয়ে আসে তা হলো, প্রথমত: ইসলামের পক্ষে বড় কিছু অর্জনের সম্ভাবনা। বাংলাদেশের ইতিহাসে হেফাজতে ইসলামের ব্যানারে যে বহত্তম গণজাগরণ সৃষ্টি হয়েছে নিকট অতীতে এর আর নজির নেই। তাই ধারণা ছিল প্রচন্ড চাপ সৃষ্টি করতে পারলে ইসলাম ও মহানবী (ছাঃ)-এর বিরুদ্ধে কটূক্তিকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইন পাসের দাবিটি অন্তত আদায় করা সম্ভব হবে। শাহাবাগীদের শাহবাগে বসিয়ে রেখে সরকার যেমন নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য আইন সংশোধন করেছে, তেমনই শাপলায় অবস্থানের মাধ্যমে সরকারকে রাজনৈতিকভাবে চাপে ফেলা যাবে। কারণ সরকারী প্রশ্রয়ে শাহবাগে টানা অবস্থান এবং শোডাউন হয়েছে। সরকার অবস্থান কর্মসূচীকে সমীহ করেছে। কাজেই এমন কর্মসূচীর ব্যাপারে সরকারের নৈতিকভাবে দুর্বল থাকার কথা। সেই সাথে মাঠপর্যায়ের  জনশক্তির পক্ষ থেকে এমন কর্মসূচির চাপ ছিল। সব সময় ইসলামপন্থীরা আন্দোলন করে। কিন্তু কোনো দাবিদাওয়া আদায় হয় না। এবারের জাগরণ নজিরবিহীন হওয়ায় মানুষের প্রত্যাশাও ছিল বেশি। তা ছাড়া লাখ লাখ মানুষের শান্তিপূর্ণ অবস্থানের ওপর সরকার এমন নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালাবে এমনটি তাদের কল্পনায়ও ছিল না।

হেফাজতের নেতাদের রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ ছিল ও আছে মর্মে যে প্রচারণা কোনো কোনো মহল চালায় সে ব্যাপারে আমাদের ধারণা হল, হেফাজতের বয়োজ্যেষ্ঠ নেতৃবৃন্দ রাজনৈতিক চিন্তার ঊর্ধ্বেই ছিলেন।

বিরোধী দলের ভূমিকা : হেফাজতে ইসলামের ব্যাপারে প্রধান বিরোধী দল বিএনপির ভূমিকা ছিল চরম মুনাফেকীপূর্ণ। এক দিকে তারা হেফাজতের কোনো একটি দাবির ব্যাপারেও ইতিবাচক দৃষ্টি দেখায়নি, কিন্তু গায়ে মেখে আবার হেফাজতের আন্দোলনের ফসল নিজেদের ঘরে তুলতে চায়। হেফাজতের আন্দোলনে গড়ে ওঠা সেন্টিমেন্টকে এমনি এমনিই নিজেদের পকেটে নিতে সস্তা ঘোষণাও দেয়। হেফাজতের পক্ষে মাঠে নামার জন্য বিরোধীদলীয় নেত্রীর ঘোষণায় বিএনপির কোনো জনশক্তি তো মাঠে নামেইনি, উপরন্তু হেফাজত সরকারের আরো বেশি টার্গেটে পরিণত হয়েছে। হেফাজতে ইসলামের সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক ও ঈমানী ইমেজ নষ্ট করতেই বরং বেশি ভূমিকা রেখেছে বিএনপির এসব কার্যক্রম। বিএনপির যদি সাহায্য করার ইচ্ছাই থাকে তাহলে সে ঘোষণা না দিয়েই গোপনে নিজের কর্মীদের মাঠে নামার র্নিদেশ দিতে পারত। কেননা বিপক্ষ পার্টি ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা জেনে গেলে আগেই শক্ত হয়ে যায়।

অজানা আশংকা : ইসলামের নাম নিয়ে ক্ষমতায় যাওয়ার প্রবণতা পাকিস্তান যুগ থেকে আজ অবধি চলে আসছে। সবাই ধর্মকে ক্ষমতায় যাওয়ার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে। সেই হিসেবে ৫ বছরের মেয়াদে যে যাই করুক না কেন যখন মেয়াদ শেষ হওয়ার সময় আসে, তখন ধর্মের প্রতি ভালবাসা দেখানোর চেষ্টা করে। কিন্তু বর্তমান সরকারের সময় শেষ হয়ে আসলেও সেই ধরনের মনোভাব বুঝা যাচ্ছেনা। বরং সরকার নিজেকে চরম ইসলামবিরোধী হিসেবে তুলে ধরেছে। অথচ সরকার জানে যে ইসলামের বিরোধিতা করলে সে ভোট পাবে না। তাহলে সরকার কি দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসতে চায় না? না, এটা তো হতেই পারে না। তাহলে সরকারের কাছে কি কারো পক্ষ থেকে এমন কোন গ্যারান্টি আছে যা তাকে ভোট ব্যাংকের চিন্তা থেকে নিশ্চিন্ত করেছে? কে সেই গ্যারান্টি দাতা?  শাহবাগী আন্দোলন যা এদেশের ৯০% মানুষের কলিজায় আঘাত করা আন্দোলন; কিন্তু সরকার, ভারত ও মার্কিনীরা এর পক্ষ গ্রহণ করে এবং স্বপ্নের জাল বুনতে থাকে যে যাক বাংলাদেশকে তাহলে ইসলাম মুক্ত করতে পারা যাবে। কিন্তু তাদের অতি আশা যখন মুসলমানের রক্তের বিনিময়ে গুড়ের বালিতে পরিণত হওয়ার পথে, তখন আন্তর্জাতিক বিশ্বের সংলাপ ও সংযমের পরামর্শ ইসলাম বিরোধীদের প্রতি তাদের সহানুভূতির বহিঃপ্রকাশ। এছাড়াও টাকাকে রুপিয়ায় পরিণত করার প্রস্তাব, ভারতের সাথে ট্রানজিট ও অসম সমুদ্র বন্দর চুক্তি, ফারাক্কা বাধের মাধ্যমে ভারতের পানি আগ্রাসনের ব্যাপারে সরকারের নীরবতা, টিপাইমুখ বাঁধের ব্যাপারে সরকারের মৌনতা, সীমান্তে নির্বিচারে মানুষ হত্যা ও বিজিবির নিষ্ক্রিয়তা অন্যদিকে বিজিবিকে দেশের ভিতরে মানুষ মারার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা, নাস্তিকদের পৃষ্ঠপোষকতা, নিরীহ মুসলমানদের গণহারে হত্যা, পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে সার্বভৌমত্ব বিরোধী সিদ্ধান্ত সবকিছুই যেন এক অজানা বিপদের ইংগিত বহন করছে? একদিকে ভারত, শাহবাগ এবং ক্ষমতাসীন সরকার এবং তাদের বেপরোয়া ইসলাম বিরোধিতা এবং দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের বিরোধী চুক্তি সম্পাদন, অন্যদিকে এগুলোর প্রতিবাদকারী ইসলামপন্থী দেশের বৃহত্তর জনসমাজের উপর বিন্দুমাত্র সহানুভূতির বিপরীতে গণহত্যা ও গণগ্রেফতারের আশ্চর্যজনক খেলা এবং মাঝখানে জাতিসংঘের সংলাপ ও সংযমের পরামর্শ। এক অজানা আশংকার ইংগিত দিচ্ছে। বাংলাদেশ কি তাহলে পরাধীনতার পথে এগুচ্ছে?  

উদাত্ত আহবান : পরিশেষে বলতে চাই, এই গণহত্যায় শুধু বাংলাদেশের মুসলমান নয় পৃথিবীর সকল মুসলমানের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়েছে। মুসলিম বিশ্ব হতভম্বের মত তাকিয়ে আছে বাংলাদেশের দিকে। এটাই কি সেই বাংলাদেশ যেখানে পৃথিবীর ১৬ কোটি মুসলমান বাস করে? এটা মুসলিম দেশ? অন্যদিকে সারা বাংলাদেশ আজ শোকে মুহ্যমান। দুঃখিত ও মনোকষ্টে জর্জরিত। মসজিদ ও মাদ্রাসাগুলো থেকে যেন প্রাণচাঞ্চল্য বিদায় নিয়েছে। মসজিদে মসজিদে হচ্ছে কুনূতে নাযেলাহ। নিজের অজান্তেই সকলের হাত উঠে যাচ্ছে আল্লাহর দরবারে। চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে অশ্রু। যেই জাতি একদিন ফিলিস্তীন, ইরাক, আফগানের জন্য কাঁদত, আজ তারা নিজের ভাইয়ের জন্য কাঁদছে। সেই দিন বেশী দূরে নয় যেই দিন এই অশ্রু অভিশাপ হয়ে নামবে মানুষ নামের হায়েনা নরপিশাচদের উপর। সেই দিন আর রক্ষা হবে না। যালিমের তখত তাউস ভেঙ্গে যাবে ইনশাআল্লাহ। আমাদের হতাশ হওয়ার কিছু নেই। আমাদের শোককে শক্তিতে পরিণত করতে হবে। দেশকে এই পরাধীনতা থেকে বাঁচানোর জন্য আমাদের তরুণ সমাজকে মাঠে নামতে হবে, সকল প্রকার মাযহাবী দ্বন্দ্ব ভুলে বৃহত্তর স্বার্থে সকল ইসলামী দলকে সম্মিলিত হয়ে সংগ্রাম করতে হবে। বিজয় ইনশাআল্লাহ ইসলামের হবেই। তাই তরুণ ছাত্রসমাজের প্রতি আহবান জানাচ্ছি ইসলামের পরাধীনতা আমাদের পরাধীনতা। আমাদের আর বসে থাকার সময় নেই। আমাদের এই পরাধীনতার জিঞ্জির ভাংতেই হবে। আমরা তারিক, খালেদ, মূসার বংশধর। ইসলাম ও তার নবীর মান বাঁচাতে জীবন দেয়া তো আমাদের ইতিহাস। তুমি ভুলে গেলে ‘রংগীলা রাসূল’ বইয়ের লেখককে হত্যা করার অপরাধে যখন তোমাকে আদালতে দাঁড় করিয়ে বলা হল যে তুমি এই হত্যাকান্ডের কথা অস্বীকার কর, তোমাকে মুক্তি দেয়া হবে। তখন তুমি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেছিলে, আমি জানিনা আমার জীবনে আমি এই আমলটি ছাড়া তথা নবীকে নিয়ে ব্যঙ্গকারী লেখককে হত্যার নেকআমল ছাড়া অন্য কোন নেকআমল করেছি কিনা। আর আজ কিনা সেই একটি নেকআমলকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করব? এরপর হাসি মুখে ফাঁসিকে বরণ করে নিয়েছিলে। আর আজ তুমি বেঁচে থাকতে বাংলার মাটিতে মুহাম্মদ (ছাঃ)-কে অপমান করা হবে? তাহলে এই বেঁচে থাকার চেয়ে মরে যাওয়ায় শ্রেয়। অতএব হে তরুণ! উঠ! গর্জে উঠ! ঝেড়ে ফেল সব সংকোচ! মুক্তির সংগ্রামের জন্য তৈরী হও! বাংলাদেশের ইসলামকে সাম্রাজ্যবাদী, ব্রাক্ষণ্যবাদীদের শ্যেনদৃষ্টি থেকে রক্ষার জন্য তৈরী হও! আল্লাহ আমাদের সহায় হৌন। আমীন!

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

মন্তব্য করুন

Back to top button