স্রষ্টা ও সৃষ্টি

নিদর্শনের সন্ধানে

প্রমাণ প্রমাণ প্রমাণ চাই- মক্কার মানুষ শোরগোল তুলল।

চল্লিশ-চল্লিশটা বছর ধরে এই আমাদের সাথেই ছিল তার ওঠাবসা। জন্মের পর আমাদের শিশু-বাচ্চাদের মতই সে বেদুইনদের ঘরে বড় হল, হাঁটতে শেখার পর এই আমাদেরই মাঠে-প্রান্তরে মেষ চড়াল, বয়স আরেকটু বাড়তেই তার চাচার কাফেলায় বাণিজ্য করতে সিরিয়া গেল- ঠিক যেভাবে আমরা যাই। আমাদেরই মেয়ে খাদীজাকে বিয়ে করে সংসারী হল, আমাদেরই ঘরে নিজের মেয়ের বিয়ে দিল একদম আমাদের কাছের মানুষ ছিল এই মুহাম্মাদ। এখন  সে দাবী করে বসছে, সে নাকি নবী- সেই মহাপুরুষ ইবরাহীমের মত নবী। বললেই হল? তা বলবেই যদি, একটু প্রমাণ তো দিতে হয়, নাকি? বেশি কিছু তো চাইছি না আমরা- এই যে যেদিকে চোখ যায় শুধু ধূলা আর বালু, জায়গাটাকে আচ্ছামত বৃষ্টি-বন্যায় ভাসিয়ে শস্যশ্যামল করে দিলেই তো হয়। অথবা আমাদের বিখ্যাত বিখ্যাত যত পূর্বপুরুষ গত হয়ে গেছেন, যাদের কেচ্ছাকাহিনী কবিদের মুখে মুখে ফেরে, তাদেরকে জিন্দা করে দেখাক না কেন! তাহলেই তো আর বাপু সন্দেহ থাকে না, আমরাও সবাই ঘাড় কাত করে মেনে নিই- তুমি নবী।[১]

মক্কার সেই ডাকসাইটে বুদ্ধিজীবী মহল এখন ধূলো, কিন্তু অভিযোগটা কেমন যেন চিরন্তন- দেশে দেশে কালে কালে যেখানেই ধর্মকে যুক্তির কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়েছে, সেখানেই এর পুনরুত্থান। আলোকপ্রাপ্তির সময়কার (Age of Enlightenment) দার্শনিকরা ধরলেন এই ব্যাপারটাই- তোমার ধর্ম সত্য? শুনে খুশি হলাম, তা প্রমাণটা কোথায় বাছা? এই আজ পর্যন্ত অ্যাকাডেমিয়া থেকে শুরু করে ব্লগারদের চিন্তাখাতায় ঘুরে ফিরে একই প্রশ্ন – ধর্ম যদি সত্যিই হয়, তবে শক্ত কোন প্রমাণ আসছে না কেন? মাঝারি সাইজের একটা মির‍্যাকেল- এই যেমন আকাশ থেকে পটাশ করে জ্বলজ্যান্ত একখানা ফেরেশতা নেমে আসলেন- এরকম কিছু হলেই তো সবার মনের সব সন্দেহ চুকে যায়, এক ধাক্কায় সব মানুষ মুসলিম। যদি আল্লাহ আসলেই চান আমরা বিশ্বাস করি, তবে এই সহজ রাস্তাটা নিতে সমস্যা কোথায়?

চলুন দেখি উত্তর বের করা যায় কিনা।

তবে দেখুন, প্রশ্নটা যেহেতু করা হচ্ছে আল্লাহর কাছে, কাজেই উত্তর খুঁজতে আমাদের সেই কুর’আনেই কিন্তু  প্রথম যাওয়া উচিত।

কীরকম প্রমাণ?

প্রথমত, অদেখা স্রষ্টায়[২] যেমনটি বলেছিলাম, আল্লাহ কিন্তু ইসলামের পক্ষে প্রমাণ দিয়েছেন ঠিকই। তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ যে ব্যাপারটা সেটা হল মক্কাবাসীর কাছে এই প্রমাণগুলোর গ্রহণযোগ্যতাও ছিল।

ইসলামের সত্যতার পক্ষে একদম প্রধান একটা প্রমাণ ছিল কুর’আনের অনন্য সাহিত্য- মানুষের পক্ষে যার অনুকরণ করা অসম্ভব। দাবিটা কিন্তু কুরাইশরা অস্বীকার করেনি একদম। যেমন ওয়ালিদের কথাই ধরুন। ওয়ালিদ ইবন মুগিরাহ ছিলেন যাকে বলে খেতাবপ্রাপ্ত বুদ্ধিজীবী- আরবি ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতিতে তার মত গভীর জ্ঞান মক্কায় দ্বিতীয় কারো ছিল না। তো একদিন কুর’আন সম্পর্কে ওয়ালিদের বিশেষজ্ঞের মতামত চাওয়া হল। নাটুকে ভাব আনার জন্য ওয়ালিদের উত্তর সাধু ভাষায় দিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

“আমি আর কী কহিব! আল্লাহর শপথ- কাব্য এবং ইহার অসংখ্য শাখাপ্রশাখা-   সম্পর্কে আমার হইতে তোমরা কেহই অধিক জ্ঞাত নও। এমনকি জ্বীন সম্প্রদায়ের কবিতাও ইহার মধ্যে পড়ে। কুর’আন যা বলিতেছে তাহার সহিত উহাদের কাহারোই তুলনা হইবার নহে। আল্লাহর শপথ! ইহার বক্তব্য অপরূপ সুন্দর, জাঁকজমকপূর্ণ- ইহার রচনাশৈলীর অবস্থান আর সকল সাহিত্যরূপ হইতে বহু ঊর্ধ্বে।”

মক্কার নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিত্ব আবু জাহল এই বক্তব্য শুনে বিচলিত। ওয়ালিদের এই কথাবার্তা যদি আমজনতার কানে যায়, আর দেখতে হবে না- বাপ-দাদার ধর্মের দিন শেষ। কাজেই সমাধান হচ্ছেঃ যে করেই হোক, ওয়ালিদকে দিয়ে কুর’আন সম্পর্কে খারাপ কিছু একটা বলাতেই হবে।

বিচক্ষণ ওয়ালিদ ব্যাপার বুঝলেন। বাপ-দাদার ধর্মের মায়া তারও কম নয়। আবু জাহলকে জানালেন- একটু সময় দাও, ভেবে দেখি।

এই “ভেবে দেখার” সময়টা ছিল মক্কার মানুষের জন্য ক্রুশাল- ওয়ালিদ কি কুর’আনের পক্ষে সাফাই গাইবেন? নাকি কটূক্তি করবেন? করলে কী ধরণের কটূক্তি? আর যাই হোক, মক্কার পণ্ডিতকুল শিরোমণি, তার কথা ফেলা যাবে না কিছুতেই। ঠিক এই সময়টাতে ওয়ালিদ ইবন আল মুগীরাহর চিন্তামগ্ন চেহারার উপর কুর’আনের ক্যামেরা জুম করে এলঃ

আরও দেখুন:  আল্লাহ্‌ সম্পর্কে মিথ্যাচার!

“সে চিন্তা করেছে এবং মনঃস্থির করেছে, ধ্বংস হোক সে, কীভাবে সে মনঃস্থির করেছে! আবার ধ্বংস হোক সে, কীভাবে সে মনঃস্থির করেছে! সে আবার দৃষ্টিপাত করেছে; অতঃপর সে ভ্রূকুঞ্চিত করেছে ও মুখ বিকৃত করেছে, অতঃপর পৃষ্ঠপ্রদর্শন করেছে ও অহংকার করেছে।”[৩]

নাটকটা একটু কল্পনা করুনঃ মক্কার মানুষের সামনে ওয়ালিদ ইবন আল মুগীরাহ চিন্তিতমুখে পায়চারি করে চলেছেন। তার উদ্দেশ্যঃ মক্কার মানুষকে বোঝানো যে এই কুর’আন এমন ইম্প্রেসিভ কিছু নয়। এখন হুট করে “কুর’আন ফালতু” বলে বসলে মানুষ নাও মানতে পারে। কাজেই একটু অভিনয় প্রয়োজন। ওয়ালিদের প্রথম চেহারাটা হচ্ছে নিবিষ্ট চিন্তায় ডুবে থাকা মনীষীর- অন্তত প্রত্যক্ষদর্শীদের চোখে। কুর’আন অবশ্য জানে তার ভেতরে কি চলছে। চিন্তার ভান করতে করতে মহা সিরিয়াস মুখে অবশেষে ওয়ালিদ তাকালেন- যেন তার মাথায় নতুন কোন আইডিয়া এসেছে- কিন্তু না, তাকে আরো ভাবতে হবে। যে কারণে এরপর ভ্রুকুঞ্চন আর মুখের বিকৃতি। তো এই facial drama বেশ খানিকক্ষণ চলার পর ওয়ালিদ থামলেন, থেমে এক ধাপ পিছিয়ে বেশ নেতা-নেতা চেহারা নিয়ে বললেনঃ

“…এ তো অনুকরণ করা জাদু ছাড়া আর কিছুই নয়! এ মানুষের বক্তব্য বৈ নয়।”[৪]

জাদু। শেষ পর্যন্ত কুর’আনের বক্তব্য হয়ে গেল জাদু। কারণ জানেন? কারণ ওয়ালিদের মত কুর’আনোফোবিকরাও বুঝেছিলেন, কুর’আনের মধ্যে অতিপ্রাকৃতিক কিছু একটা আছে। খালি ওয়ালিদ একা নয়, সাধারণ মক্কাবাসীও কুর’আনকে হেয় প্রতিপন্ন করতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত জাদুর নিচে নামতে পারে নি-

“…অবিশ্বাসীদের কাছে যখন সত্য আগমন করে তখন তারা বলে, এ তো সুস্পষ্ট জাদু ছাড়া কিছুই নয়!”[৫]

আর সেই গল্প হয়ত অনেকেই জানেন- খোদ আবু জাহল পর্যন্ত রাতবিরেতে আল্লাহর রাসূলের কামরায় কান ঠেকিয়ে রাখত- কুর’আন শুনবে বলে। তাই কুর’আনের সেই যে চ্যালেঞ্জ- পারলে এর মত কিছু বানিয়ে দেখাও তা একটা সূরাও হোক, তা অপ্রতিদ্বন্দ্বীই থেকে গেল।

কাজেই মক্কাবাসীর কাছে কিন্তু কুর’আনই ছিল যথেষ্ট প্রমাণ[৬]। মক্কাবাসীদের “প্রমাণ প্রমাণ” রবের উত্তরে কুর’আন তাই বলে দিলঃ আরে বাবা তোমাদের তো প্রমাণ দেওয়া হয়েই গেছে[৭]– তোমরা নিজেই তো দেখিয়ে দিলে কুর’আন অতিপ্রাকৃতিক, মানুষ তার প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ব্যর্থ।

কাজেই মক্কার মানুষের দাবিটা এরকম ছিল না যে- ইসলাম আদৌ কোন প্রমাণ দেয় নি; বরং এরকম- প্রমাণ আরো অনেক স্পষ্ট হওয়া উচিত ছিল। ওদের দাবিগুলো দেখলেই সেটা বোঝা যায়- মরুভূমিকে সবুজ বানিয়ে দাও, পূর্বপুরুষদের জীবন্ত করে দাও, পাহাড়কে সোনা বানিয়ে দাও ইত্যাদি- বলতে পারেন এমন পর্যায়ের প্রমাণ যা সবরকম বিতর্কের ঊর্ধ্বে। ওদের কাছে যে প্রমাণ এসেছে তা এমনিতেই যথেষ্ট স্পষ্ট- তার জন্য তারা জাদু ছাড়া অন্য কোন ট্যাগই খুঁজে পেল না- কিন্তু না, আরো শক্ত প্রমাণ চাই।

কুর’আনে এসব দাবির উত্তর একাধিকভাবে এসেছে। আমরা এই লেখায় একটিমাত্র দিক নিয়ে কথা বলব। একটা ব্যাপার ভুলবেন নাঃ আমাদের আলোচনা মক্কাবাসী বনাম কুর’আনের কনটেক্সটে চলছে ঠিকই, কিন্তু লেখার শুরুতে যেমনটা বললাম- ধর্মের কাছ থেকে এরকম অবিসংবাদিত স্পষ্ট প্রমাণ লাভের দাবিটা কিন্তু চিরসবুজ। কুর’আনের উত্তরগুলো তাই এখনকার কনটেক্সটেও লাগসই। বিচারের ভার পাঠকের ওপর ছেড়ে দিলাম।

তবে কুর’আনে ঢোকার আগে একটু জ্ঞানতত্ত্ব (epistemology) ঘুরে আসা যাক।

বিশ্বাসের মনস্তত্ব

আচ্ছা, মানুষ বিশ্বাস করে কীভাবে?

কোনকিছুতে বিশ্বাস কি স্বতঃস্ফূর্তভাবেই তৈরি হয়, নাকি মানুষ কোনভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে তার বিশ্বাসগুলোকে? মাথার কোথাও কি কোন কন্ট্রোল মেকানিজম আছে- যে বলে দেয় অমুকটাতে বিশ্বাস কর, অমুকটাতে বিশ্বাস করো না?

সরাসরি থট এক্সপেরিমেন্টে চলে যাই। মনে করুন, কেউ এসে আপনাকে বললঃ আপনি যদি বিশ্বাস করতে পারেন যে এই মুহূর্তে আপনার সাথে এই ঘরটাতে একটা গোলাপি রঙের হাতি আছে, তাহলে আমি আপনাকে এখনই দশ লাখ টাকা নগদ ধরিয়ে দেব। চেষ্টা করে দেখতে পারেন, তবে আপনি কিছুতেই ওরকম কিছু বিশ্বাস করতে পারবেন না। যে ব্যাপারগুলো একদম obvious- যেমন ২+২=৪, বা মানুষ মরণশীল, বা আপনি এই মুহূর্তে পিসি স্ক্রীনের দিকে তাকিয়ে আছেন- সেই বিশ্বাসগুলো মাথায় স্বতঃস্ফূর্তভাবেই জন্ম নেয়। সুন্দরবন ট্যুরে গেছেন- দলের থেকে কখন যে একটু দূরে চলে এসেছেন খেয়ালও করেননি। এমন সময় হঠাৎ করে আপনার সামনে বাঘ মামা এসে উপস্থিত। আপনি যতই প্রাণপণ চেষ্টা করেন নিজেকে বোঝাতে- আমি ভুল দেখছি, কিছুতেই পারবেন না। কারণ এ ধরণের বিশ্বাসের ওপর কোন নিয়ন্ত্রণ থাকে না।

আরও দেখুন:  আল্লাহর সতর্কবাণী

নিয়ন্ত্রণ থাকে সেইসব ক্ষেত্রে- যেখানে বিশ্বাসগুলো একটু জটিল, এরকম একধাপে তৈরি হয় না। মনে করুন, আপনি সাধারণত পরীক্ষায় এর-ওর খাতা দেখাদেখি করেন না। কিন্তু আজ ইনকোর্সের প্রশ্ন এত বেখাপ্পা রকমের কঠিন হয়েছে, যে ফেল ছাড়া সামনে আর পথ নেই। আপনার পাশেই সর্বোচ্চ সিজিপিএ-ওয়ালা ছেলেটা কলমে ধোঁয়া তুলে লিখে যাচ্ছে। সময়ও আর সেরকম বেশি নেই। ঠিক এই মুহূর্তটাতে যদি আপনাকে জিজ্ঞেস করা হয়- পরীক্ষায় অন্যদের খাতা দেখাদেখি করা কি নীতি-বহির্ভূত? আপনি হঠাৎ উত্তর দিতে পারবেন না। এ ব্যাপারে আপনি যে আসলে কী বিশ্বাস করেন, তা একদিক থেকে আপনার নিয়ন্ত্রণে। আপনি আপনার জেনারেল নৈতিকতাকে যদি পাশ-ফেলের উপরে স্থান দেন, তাহলে বলবেন যে হ্যাঁ, নীতি-বহির্ভূত। কিন্তু যদি সিজিপিএ আপনার কাছে বড় হয় তাহলে হয়ত অন্যরকম উত্তর দেবেন। এখানে আপনার বিশ্বাসটা তৈরি হচ্ছে একটা দ্বন্দ্বের ফলাফল হিসেবে- স্বার্থ বনাম নৈতিকতা। অর্থাৎ সবসময় যে বিশ্বাস স্রেফ সম্ভাব্যতা গুনে তৈরি হয় তা নয়, ইমোশন খেলতে এবং খেলাতে জানে ভালই। আমরা সবাই জানি ঘুষ খাওয়া খারাপ- কিন্তু একজন স্বার্থান্বেষী ব্যক্তি হয়ত সেটা বিশ্বাস করেন না, কারণ এই বিশ্বাসটা তৈরির পেছনে স্বার্থ বা অর্থলিপ্সা নামের একটা ব্যাপার কাজ করেছে। আসলে কোন একটা খারাপ জিনিস যে আসলেই খারাপ- এই বিশ্বাস নিয়েও কাজটা করে, এমন মানুষের সংখ্যা নিতান্তই কম।

একইভাবে যেকোন বড় সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে কোনদিকটা আমরা বিশ্বাস করব সেটা অনেকাংশেই নির্ভর করে আপনার অনুভূতিগুলোর ওপর, কোন অনুভূতিটাকে আপনি অন্যদের ওপর প্রাধান্য দিচ্ছেন তার ওপর। আমাদের মন আবার এসব ব্যাপারে খুব ওস্তাদ, আপনি যা-ই বিশ্বাস করেন, ভাল হোক খারাপ হোক সাথে সাথে সে তার পক্ষে র‍্যাশনালাইজ করা শুরু করবে। ঘুষখোরকে জিজ্ঞেস করুন, ভাই আপনি যে মনে করেন ঘুষ খাওয়া ভাল, এর পেছনে যুক্তি কি? “আসলে সেরকম কোন যুক্তি নেই” জাতীয় উত্তর আশা করলে হতাশ হবেন। যুক্তি আসলে সবারই থাকে- যে যা বিশ্বাস করে সবাই কোন না কোন যুক্তির কারণেই বিশ্বাস করে। আমরা আমাদের অনুভূতিগুলোকে যদি যথার্থভাবে ব্যবহার করতে না জানি, তাহলে সে একদম খোঁড়া যুক্তিকেও শক্ত প্রমাণ বানিয়ে ছাড়বে, আর খুব শক্ত প্রমাণকেও তখন মলিন দেখাবে।

ইসলামের বিশ্বাসমতে- এই পৃথিবী হচ্ছে একটা পরীক্ষাস্থল। পরীক্ষাটা দু’টো জিনিসের- বিশ্বাস এবং কর্ম। আল্লাহ আমাদের জ্ঞান-বুদ্ধি-বিবেক দিয়ে পাঠিয়েছেন, সোয়া লাখ বার্তাবাহক পাঠিয়ে তাঁর বক্তব্য জানিয়ে দিয়েছেন, এখন পরীক্ষাটা হল আমরা কি সত্য বার্তায় বিশ্বাস করলাম কিনা, আর সে অনুযায়ী কাজ করতে পারলাম কিনা। সঠিক বার্তাটা ঠিক কী- সেটা উদ্ঘাটনের জন্য আল্লাহ টুলবক্সের মধ্যে মন আর মস্তিষ্ক বলে দু’টো জিনিস দিয়েছেন। আমাদের কর্তব্য, এই টুলবক্সকে আন্তরিকতা ও প্রজ্ঞার সাথে ব্যবহার করা। আল্লাহ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন- কেউ যদি সত্যকে পাওয়ার জন্য আন্তরিকভাবে পরিশ্রম করে, তার পরিশ্রম বৃথা যাবে না আদৌ। যেহেতু এই বিশ্বাস করাটা একটা পরীক্ষা- কাজেই আমরা ইসলামে বিশ্বাস করব কি করব না, সে ব্যাপারে আমাদের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। ইসলামের মতে, আপনি যদি আসলেই আপনার মন-মস্তিষ্ক এবং আপনার হৃদয়ে থেকে যাওয়া আল্লাহর শাশ্বত চেতনাটুকুর প্রতি দায়িত্বশীল হোন, তবে আপনার কাছে প্রতীয়মান হবে যে ইসলাম সত্য। অন্যদিকে যদি আপনি সত্যানুসন্ধানের এই স্পৃহার উপরে অন্য কোন অনুভূতিকে স্থান দেন- ওয়ালিদের মত হতে পারে তা খ্যাতি-যশের মোহ, অর্থলিপ্সা, উগ্র জাতীয়তাবাদ- তাহলে আপনার কাছে ইসলামের সত্যতা অতটা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হবে না। খুব ভাল প্রমাণ আপনার সামনে আসলেও আপনার মন তাকে ছোট করে দেখাবে।  আল্লাহর রাসূল যখন আবু জাহলের চোখের সামনে আল্লাহর নির্দেশে চাঁদকে দু’ভাগ করে ফেললেন- আবু জাহল বলল, বোঝাই যাচ্ছে আব্দুল্লাহর ব্যাটা মুহাম্মাদ আকাশে জাদু করেছে। এত বড় অলৌকিক ঘটনার পরেও কেন এরকম মনে হল আবু জাহলের? কারণ তার কাছে সত্য ছিল গৌণ, পার্থিব লোভ-লালসা ছিল মুখ্য। এটাই বিশ্বাসের পরীক্ষা- এভাবেই আল্লাহ পরীক্ষা নেন কে আসলে আন্তরিক, আর কে অসৎ স্বার্থান্বেষী।

আরও দেখুন:  অ্যারিস্টটলের ঈশ্বর

একটা ব্যাপার এখন চিন্তা করুনঃ এই যে বিশ্বাসের পরীক্ষা, এটা কিন্তু কোনদিনও সম্ভব হত না যদি আল্লাহ সবাইকে স্রেফ “দেখিয়ে দিতেন” যে ইসলাম সত্য। মক্কাবাসী যেসব অলৌকিক ব্যাপার দাবি করছিল, সেগুলো যদি আল্লাহ একের পর এক দেখিয়ে যেতেন, তাহলে চোর-বাটপার থেকে শুরু করে সাধু-সন্ন্যাসী পর্যন্ত সবাই হয়ে যেত বিশ্বাসী- বিশ্বাস করায় তখন আর কোন পরীক্ষা থাকত না। আবু জাহল আর আবু বাকর তখন এক কাতারে থাকতেন। কিন্তু আল্লাহর উদ্দেশ্য তো মানুষকে জোর করে বিশ্বাস করানো নয়, বরং পরীক্ষা করে দেখা যে কে প্রকৃতই ভাল, আর কে শুধু তার স্বার্থকেই বোঝে। এই আয়াতটা একবার দেখুনঃ

“আর যদি তাদের (সত্য থেকে) বিমুখতা আপনার পক্ষে (মেনে নিতে) কষ্টকর হয়, তবে আপনি যদি ভূতলে কোন সুড়ঙ্গ অথবা আকাশে কোন সিঁড়ি অনুসন্ধান করতে সমর্থ হন, অতঃপর (সেখান থেকে) তাদের কাছে কোন একটি অলৌকিক নিদর্শন আনতে পারেন, তবে নিয়ে আসুন। আল্লাহ ইচ্ছা করলে সবাইকে সরল পথে সমবেত করতে পারতেন। অতএব, আপনি নির্বোধদের অন্তর্ভুক্ত হবেন না।”[৫]

লক্ষ্য করুন আল্লাহ কি বলছেন- আল্লাহ ইচ্ছা করলেই সবাইকে সরল পথে নিয়ে আসতে পারতেন- শুধু কয়েকটা অলৌকিক নিদর্শন দেখিয়ে। কিন্তু সেটা তো আল্লাহর উদ্দেশ্য নয়। আল্লাহ তাঁর রাসূলকে তাই বলছেন- দেখুন, ওরা নিদর্শন চাচ্ছে বটে, এবং ইচ্ছে করলেই আমি পারি ওদের পছন্দমত নিদর্শন দিতে। কিন্তু ওরকম স্পষ্ট নিদর্শন দিয়ে ভাল-খারাপ সবাইকে এক জমায়েতে নিয়ে আসা তো জীবনের উদ্দেশ্য নয়। এ কারণেই- বিশ্বাসের পরীক্ষাটাকে functional রাখার জন্যই একদম বিতর্কের ঊর্ধ্বে কোন অলৌকিক নিদর্শন পাঠানো হয়নি।

ইসলামের পক্ষে আল্লাহ যথেষ্ট প্রমাণ দিয়েছেন- কুর’আনের অনবদ্য সাহিত্য দিয়েছেন, তাঁর রাসূলের জীবন দিয়েছেন, এমনকি গোটা প্রকৃতিজুড়েই স্রষ্টার নিদর্শন ছড়িয়ে দিয়েছেন[৮]। কুর’আনের দাবি, এসব থেকে যথেষ্ট স্পষ্টভাবেই বোঝা যায় যে ইসলাম সত্য। কাজেই এর পর আর নিদর্শন চাওয়াটা ছেলেমানুষি। সত্য অর্জন করতে হয় আন্তরিকতা দিয়ে, পরিশ্রম দিয়ে- এর উপহারস্বরূপই আসে বিশ্বাস, আসে স্বর্গ।

“আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে অনেক নিদর্শন রয়েছে- যেগুলো তারা অতিক্রম করে, অথচ এদের প্রতি মনোনিবেশ করে না।”[৯]


ফুটনোট:
১. সূরা আন’আম, ৬:১০৯
২. অদেখা স্রষ্টা 
৩. সূরা মুদ্দাসসির, ৭৪:১৮-২৩
৪. সূরা মুদ্দাসসির, ৭৪:২৪-২৫
৫. সূরা সাবা, ৩৪:৪৩
৬. অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণও ছিল এবং আছে, যেমন আল্লাহর রাসূলের সত্যবাদিতা আর আন্তরিকতা। যিনি মানুষের সাথে লেনদেনের ব্যাপারে ছিঁটেফোটাও প্রতারণা বা মিথ্যাচার করেন না, তিনি কেন আল্লাহর সম্পর্কে মিথ্যা বলতে যাবেন? আর তার জীবনধারণ ইত্যাদি থেকে বোঝাই যায়, তার ইসলাম প্রচারে কোন স্বার্থ ছিল না। কাজেই খামোখা একজন সৎ মানুষ কোন স্বার্থ ছাড়াই সুস্থ মস্তিষ্কে একটা মিথ্যা কথা প্রচার করে বেড়াবে- সেটা আদৌ বিশ্বাসযোগ্য নয়। এই দাবিও মক্কাবাসী মেনেছিল, তারা নিজেরাই তাঁকে নাম দিয়েছিল আল আমিন বা বিশ্বস্ত।
৭. সূরা আনকাবুত, ২৯:৫০-৫১
৮. “অদেখা স্রষ্টা” এর ফুটনোট ২ দেখুন।
৯. সূরা ইউসুফ, ১২:১০৫

(Ahobaan.com)

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

মন্তব্য করুন

Back to top button