যাকাত ও ছাদাক্বা

যাকাত সম্পর্কিত বিবিধ মাসায়েল – ২

যে সকল মালের যাকাত ওয়াজিব হওয়ার জন্য এক বছর পূর্ণ হওয়া শর্ত নয় :

যাকাত ফরয হওয়ার জন্য যেসব মালে পূর্ণ এক বছর মালিকানার শর্তারোপ করা হয়েছে এবং যেসব মালে করা হয়নি, এ দু’টির মধ্যে পার্থক্য হ’ল, বর্ধনশীল ও অবর্ধনশীল হওয়া। অর্থাৎ বর্ধনশীল মালের যাকাত ফরয হওয়ার জন্য পূর্ণ এক বছর মালিকানায় থাকা শর্ত। আর অবর্ধনশীল মাল পূর্ণ এক বছর মালিকানায় থাকা শর্ত নয়।

মাটি থেকে উৎপন্ন শস্য ও ফল :  যে সকল শস্য ও ফল মাটি থেকে উৎপন্ন হয় সেগুলোর যাকাত ওয়াজিব হওয়ার জন্য এক বছর পূর্ণ হওয়া শর্ত নয়। বরং শস্য কর্তনের পরেই তা নিছাব পরিমাণ হ’লে তার যাকাত দিতে হবে। কেননা শস্য কর্তনের পরে তা বৃদ্ধি হয় না। বরং তা পর্যায়ক্রমে কমে যায়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

وَهُوَ الَّذِيْ أَنْشَأَ جَنَّاتٍ مَعْرُوْشَاتٍ وَغَيْرَ مَعْرُوْشَاتٍ وَالنَّخْلَ وَالزَّرْعَ مُخْتَلِفًا أُكُلُهُ وَالزَّيْتُوْنَ وَالرُّمَّانَ مُتَشَابِهًا وَغَيْرَ مُتَشَابِهٍ كُلُوْا مِنْ ثَمَرِهِ إِذَا أَثْمَرَ وَآتُوْا حَقَّهُ يَوْمَ حَصَادِهِ وَلَا تُسْرِفُوْا إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُسْرِفِيْنَ

‘তিনিই লতা ও বৃক্ষ-উদ্যানসমূহ সৃষ্টি করেছেন এবং খেজুর বৃক্ষ, বিভিন্ন স্বাদ বিশিষ্ট খাদ্যশস্য, যায়তুন ও ডালিম সৃষ্টি করেছেন- এগুলি একে অপরের সদৃশ এবং বিসদৃশও। যখন তা ফলবান হয় তখন তার ফল আহার করবে আর ফসল তুলবার দিনে তার হক (যাকাত) প্রদান করবে এবং অপচয় করবে না; নিশ্চয়ই তিনি অপচয়কারীদেরকে ভালবাসেন না’ (আন‘আম ৬/১৪১)

অনুরূপভাবে গবাদি পশুর বাচ্চা ও ব্যবসায়িক মালের লভ্যাংশের যাকাত ফরয হওয়ার জন্য পূর্ণ এক বছর মালিকানায় থাকা শর্ত নয়। বরং এটা তার মূলের অনুসরণ করবে। অর্থাৎ গবাদি পশুর বাচ্চা তার মায়ের হিসাবের অন্তর্ভুক্ত হবে এবং ব্যবসায়িক মালের লভ্যাংশ তার মূলধনের সাথে হিসাব হবে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ছাহাবায়ে কেরামকে পশু পালনকারীদের নিকট থেকে যাকাত আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু বয়স এক বছর পূর্ণ হয়েছে কি-না তা জিজ্ঞেস করতে বলেননি।[1]

বছর পূর্ণ হওয়ার পূর্বেই যাকাত আদায়ের হুকুম

যাকাত ওয়াজিব হওয়ার জন্য শর্ত হ’ল, পূর্ণ এক বছর অতিবাহিত হওয়া। কিন্তু এক বছর পূর্ণ হওয়ার পূর্বেই যাকাত আদায় করলে তার উপর অর্পিত ওয়াজিব আদায় হবে কি-না এ ব্যপারে ওলামায়ে কেরামের মধ্যে মতভেদ পরিলক্ষিত হয়। তবে ছহীহ মত হ’ল, এক বছর পূর্ণ হওয়ার পূর্বে যাকাত আদায় করলে তার উপর অর্পিত ওয়াজিব আদায় হয়ে যাবে। হাদীছে এসেছে,

عَنْ عَلِىِّ بْنِ أَبِيْ طَالِبٍ أَنَّ الْعَبَّاسَ سَأَلَ النَّبِىَّ صلى الله عليه وسلم فِيْ تَعْجِيْلِ صَدَقَتِهِ قَبْلَ أَنْ تَحِلَّ فَرَخَّصَ لَهُ فِيْ ذَلِكَ-

আলী ইবনু আবী ত্বালেব (রাঃ) হতে বর্ণিত, নিশ্চয়ই আববাস (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে এক বছর পূর্ণ হওয়ার পূর্বেই যাকাত আদায় সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি তাকে অনুমতি দিলেন।[2]

অন্য হাদীছে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, لاَ زَكَاةَ فِيْ مَالٍ حَتَّى يَحُوْلَ عَلَيْهِ الْحَوْلُ- ‘এক বছর পূর্ণ হওয়ার পূর্বে মালের যাকাত নেই’।[3]

এ হাদীছে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এক বছর পূর্ণ হওয়ার পূর্বে যাকাত আদায়কে নিষিদ্ধ করেননি। বরং এর দ্বারা উদ্দেশ্য হ’ল, এক বছর পূর্ণ হওয়ার পূর্বে যাকাত ওয়াজিব নয়। অর্থাৎ এক বছর পূর্ণ হওয়ার সাথে সাথেই তার উপর যাকাত ওয়াজিব হয়ে যাবে। উক্ত ওয়াজিব আদায় না করলে সে পাপী হবে। কিন্তু যাকাত ওয়াজিব হওয়ার সময়ের পূর্বে আদায় করা জায়েয।

যদি বলা হয় যে, ছালাত যেমন সময়ের পূর্বে আদায় করলে ছহীহ হয় না, যাকাত তেমন এক বছর পূর্ণ না হ’লে ছহীহ হয় না। তাহ’লে বলা হবে যে, ইবাদতের ক্ষেত্রে এক ইবাদত অন্য ইবাদতের উপর কিয়াস করা বৈধ নয়।[4]

এক বছর পূর্ণ হওয়ার পূর্বে নিছাব পরিমাণ মালের কিছু অংশ ব্যয় হয়ে গেলে অথবা বিক্রি করে দিলে তার হুকুম :  

কারো নিকট ৪০ টি ছাগল অথবা ৭.৫০ ভরি স্বর্ণ রয়েছে। কিন্তু এক বছর পূর্ণ হওয়ার পূর্বে একটি ছাগল অথবা স্বর্ণের কিছু অংশ বিক্রি করে দিল। ফলে তার মালিকানায় নিছাব পরিমাণ মাল পূর্ণ এক বছর থাকল না। এক্ষেত্রে তার উপর যাকাত ওয়াজিব নয়। কেননা নিছাব পরিমাণ মাল পূর্ণ এক বছর তার মালিকানায় ছিল না। তবে যাকাত দেওয়ার ভয়ে এক বছর পূর্ণ হওয়ার পূর্বে কিছু মাল বিক্রি করার কৌশল অবলম্বন করা জায়েয নয়। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,

إِنَّمَا الأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ وَإِنَّمَا لِكُلِّ امْرِئٍ مَا نَوَى، فَمَنْ كَانَتْ هِجْرَتُهُ إِلَى دُنْيَا يُصِيْبُهَا، أَوْ إِلَى امْرَأَةٍ يَنْكِحُهَا، فَهِجْرَتُهُ إِلَى مَا هَاجَرَ إِلَيْهِ-

‘নিশ্চয়ই প্রত্যেক কাজ নিয়তের উপর নির্ভরশীল। আর মানুষ তার নিয়ত অনুযায়ী প্রতিফল পাবে। তাই যার হিজরত হবে ইহকাল লাভের অথবা কোন মহিলাকে বিবাহ করার উদ্দেশ্যে, তার হিজরত সেদিকেই গণ্য হবে, যে জন্য সে হিজরত করেছে’।[5]

যে সকল মালের যাকাত ফরয

আল্লাহ তা‘আলা তাঁর বান্দাদেরকে ধন-সম্পদ দান করেছেন এবং সেই সম্পদের কিছু অংশ গরীবদের জন্য নির্ধারণ করেছেন। তবে সকল সম্পদের উপর যাকাত ফরয করেননি। বরং পাঁচ প্রকার মালের যাকাত আদায় করার নির্দেশ এসেছে। যা নিম্নরূপ-

আরও দেখুন:  আল্লাহকে উত্তম ঋণ

(১) بهيمة الأنعام তথা গৃহপালিত পশু : কারো নিকট গৃহপালিত পশু নিছাব পরিমাণ থাকলে তার উপর যাকাত আদায় করা ফরয। আর তা হ’ল, (ক) উট, (খ) গরু ও (ঘ) ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,

مَا مِنْ رَجُلٍ تَكُوْنُ لَهُ إِبِلٌ أَوْ بَقَرٌ أَوْ غَنَمٌ لاَ يُؤَدِّى حَقَّهَا إِلاَّ أُتِىَ بِهَا يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَعْظَمَ مَا تَكُوْنُ وَأَسْمَنَهُ، تَطَؤُهُ بِأَخْفَافِهَا، وَتَنْطَحُهُ بِقُرُوْنِهَا، كُلَّمَا جَازَتْ أُخْرَاهَا رُدَّتْ عَلَيْهِ أُوْلاَهَا، حَتَّى يُقْضَى بَيْنَ النَّاسِ-

‘প্রত্যেক উট, গরু ও ছাগলের অধিকারী ব্যক্তি যে তার যাকাত আদায় করবে না, নিশ্চয়ই ক্বিয়ামতের দিন তাদেরকে আনা হবে বিরাটকায় ও অতি মোটাতাজা অবস্থায়। তারা দলে দলে তাকে মাড়াতে থাকবে তাদের ক্ষুর দ্বারা এবং মারতে থাকবে তাদের শিং দ্বারা। যখনই তাদের শেষ দল অতিক্রম করবে, পুনরায় প্রথম দল এসে তার সাথে এরূপ করতে থাকবে, যাবৎ না মানুষের বিচার ফায়ছালা শেষ হয়ে যায়।[6]

(২) النقدان তথা স্বর্ণ ও রৌপ্য : কারো নিকট নিছাব পরিমাণ স্বর্ণ ও রৌপ্য থাকলে অথবা এর সমপরিমাণ অর্থ থাকলে তার উপর যাকাত ফরয। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

وَالَّذِيْنَ يَكْنِزُوْنَ الذَّهَبَ وَالْفِضَّةَ وَلَا يُنْفِقُوْنَهَا فِيْ سَبِيْلِ اللهِ فَبَشِّرْهُمْ بِعَذَابٍ أَلِيْمٍ- يَوْمَ يُحْمَى عَلَيْهَا فِيْ نَارِ جَهَنَّمَ فَتُكْوَى بِهَا جِبَاهُهُمْ وَجُنُوْبُهُمْ وَظُهُوْرُهُمْ هَذَا مَا كَنَزْتُمْ لِأَنْفُسِكُمْ فَذُوْقُوْا مَا كُنْتُمْ تَكْنِزُوْنَ

‘যারা স্বর্ণ ও রৌপ্য পুঞ্জীভূত করে এবং তা আল্লাহ্র পথে ব্যয় করে না তাদেরকে মর্মন্তুদ শাস্তির সুসংবাদ দাও। যেদিন জাহান্নামের অগ্নিতে তা উত্তপ্ত করা হবে এবং তা দ্বারা তাদের ললাট, পার্শ্বদেশ ও পৃষ্ঠদেশে দাগ দেওয়া হবে। সেদিন বলা হবে, এটা তাই, যা তোমরা নিজেদের জন্য সঞ্চয় করতে। সুতরাং তোমরা যা সঞ্চয় করেছিলে তা আস্বাদন কর’ (তওবা ৯/৩৪-৩৫)

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,

مَا مِنْ صَاحِبِ ذَهَبٍ وَلاَ فِضَّةٍ لاَ يُؤَدِّى مِنْهَا حَقَّهَا إِلاَّ إِذَا كَانَ يَوْمُ الْقِيَامَةِ صُفِّحَتْ لَهُ صَفَائِحَ مِنْ نَارٍ فَأُحْمِىَ عَلَيْهَا فِىْ نَارِ جَهَنَّمَ فَيُكْوَى بِهَا جَنْبُهُ وَجَبِينُهُ وَظَهْرُهُ كُلَّمَا بَرَدَتْ أُعِيْدَتْ لَهُ فِىْ يَوْمٍ كَانَ مِقْدَارُهُ خَمْسِيْنَ أَلْفَ سَنَةٍ حَتَّى يُقْضَى بَيْنَ الْعِبَادِ فَيُرَى سَبِيْلُهُ إِمَّا إِلَى الْجَنَّةِ وَإِمَّا إِلَى النَّارِ-

‘প্রত্যেক স্বর্ণ ও রৌপ্যের মালিক যে তার হক (যাকাত) আদায় করে না, নিশ্চয়ই ক্বিয়ামতের দিন তার জন্য আগুনের বহু পাত তৈরী করা হবে এবং সে সমুদয়কে জাহান্নামের আগুনে গরম করা হবে এবং তার পাঁজর, কপাল ও পিঠে দাগ দেওয়া হবে। যখনই তা ঠান্ডা হয়ে যাবে তখন পুনরায় তাকে গরম করা হবে (তার সাথে এরূপ করা হবে) সে দিন, যার পরিমাণ হবে পঞ্চাশ হাযার বছরের সমান। (তার এ শাস্তি চলতে থাকবে) যতদিন না বান্দাদের বিচার নিষ্পত্তি হয়। অতঃপর সে তার পথ ধরবে, হয় জান্নাতের দিকে, না হয় জাহান্নামের দিকে’।

(৩) عروض الةجارة তথা ব্যবসায়িক মাল : যে সকল মাল লাভের আশায় ক্রয়-বিক্রয় করা হয় সে সকল মালের যাকাত ফরয। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, يَا أَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُوْا أَنْفِقُوْا مِنْ طَيِّبَاتِ مَا كَسَبْتُمْ وَمِمَّا أَخْرَجْنَا لَكُمْ مِنَ الْأَرْضِ وَلاَ تَيَمَّمُوْا الْخَبِيْثَ مِنْهُ تُنْفِقُوْنَ وَلَسْتُمْ بِآخِذِيْهِ إِلاَّ أَنْ تُغْمِضُوْا فِيْهِ وَاعْلَمُوْا أَنَّ اللهَ غَنِيٌّ حَمِيْدٌ-  ‘হে মুমিনগণ! তোমরা যা উপার্জন কর এবং আমি যা ভূমি হ’তে তোমাদের জন্য উৎপাদন করে দেই তন্মধ্যে যা উৎকৃষ্ট তা ব্যয় কর এবং এর নিকৃষ্ট বস্ত্ত ব্যয় করার সংকল্প কর না; অথচ তোমরা তা গ্রহণ করবে না, যদি না তোমরা চোখ বন্ধ করে থাক। আর জেনে রেখ যে, নিশ্চয়ই আল্লাহ অভাবমুক্ত, প্রশংসিত’ (বাক্বারাহ ২/২৬৭)

অত্র আয়াতে বর্ণিত مَا كَسَبْتُمْ অর্থাৎ ‘তোমরা যা উপার্জন কর’ দ্বারা ব্যবসায়িক মালকে বুঝানো হয়েছে।

(৪) الحبوب والثمار তথা শস্য ও ফল : অর্থাৎ যে সকল শস্য ও ফল গুদামজাত করা যায় এবং ওযনে বিক্রি হয় সে সকল শস্য ও ফলের যাকাত ফরয। যেমন- গম, যব, খেজুর, কিসমিস ইত্যাদি। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘তিনিই লতা ও বৃক্ষ-উদ্যানসমূহ সৃষ্টি করেছেন এবং খেজুর বৃক্ষ, বিভিন্ন স্বাদ বিশিষ্ট খাদ্যশষ্য, যায়তুন ও ডালিম সৃষ্টি করেছেন- এগুলি একে অপরের সদৃশ এবং বিসদৃশও। যখন তা ফলবান হয় তখন তার ফল আহার করবে আর ফসল তুলবার দিনে তার হক (যাকাত) প্রদান করবে এবং অপচয় করবে না; নিশ্চয়ই তিনি অপচয়কারীদেরকে ভালবাসেন না’ (আন‘আম ৬/১৪১)

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, فِيْمَا سَقَتِ السَّمَاءُ وَالْعُيُوْنُ أَوْ كَانَ عَثَرِيًّا الْعُشْرُ، وَمَا سُقِىَ بِالنَّضْحِ نِصْفُ الْعُشْرِ- ‘বৃষ্টি ও প্রবাহিত পানি দ্বারা সিক্ত ভূমিতে উৎপাদিত ফসল বা সেচ ব্যতীত উর্বরতার ফলে উৎপন্ন ফসলের উপর ‘ওশর’ (দশ ভাগের এক ভাগ) যাকাত ওয়াজিব। আর সেচ দ্বারা উৎপাদিত ফসলের উপর ‘অর্ধ ওশর’ (বিশ ভাগের এক ভাগ) যাকাত ওয়াজিব’।[7]

আরও দেখুন:  ইসলামের আলোকে সম্পদ বৃদ্ধির উপায়

(৫) المعادن والركاز তথা খনিজ ও মাটির ভেতরে লুক্কায়িত সম্পদ : المعادن হ’ল খনিজ সম্পদ, যা আল্লাহ তা‘আলা মানুষের জন্য সৃষ্টি করে মাটির নিচে রেখেছেন। যেমন- স্বর্ণ, রৌপ্য, তামা ইত্যাদি। আর الركاز হ’ল পূর্ববর্তী যুগের মানুষের রাখা সম্পদ, যা মানুষ মাটির ভেতরে পেয়ে থাকে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, يَا أَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُوْا أَنْفِقُوْا مِنْ طَيِّبَاتِ مَا كَسَبْتُمْ وَمِمَّا أَخْرَجْنَا لَكُمْ مِنَ الْأَرْضِ ‘হে মুমিনগণ! তোমরা যা উপার্জন কর এবং আমি যা ভূমি হ’তে তোমাদের জন্য উৎপাদন করে দেই তন্মধ্যে যা উৎকৃষ্ট তা ব্যয় কর’ (বাক্বারাহ ২/২৬৭)। অত্র আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম কুরতুবী (রহঃ) বলেন, ভূমি হ’তে উৎপাদন বলতে শস্য, খনিজ সম্পদ ও মানুষের লুকিয়ে রাখা সম্পদকে বুঝানো হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, الْعَجْمَاءُ جُبَارٌ، وَالْبِئْرُ جُبَارٌ، وَالْمَعْدِنُ جُبَارٌ، وَفِىْ الرِّكَازِ الْخُمُسُ- ‘চতুষ্পদ জন্তুর আঘাত দায়মুক্ত। কূপ (খননে শ্রমিকের মৃত্যুতে মালিক) দায়মুক্ত, খণি (খননে কেউ মারা গেলে মালিক) দায়মুক্ত। রিকাযে (মানুষের লুক্কায়িত সম্পদ) এক-পঞ্চমাংশ ওয়াজিব।[8]

প্রদানকৃত ঋণের যাকাত : কোন ব্যক্তি কাউকে ঋণ প্রদান করলে এবং তা এক বছর অতিক্রম করলে উক্ত টাকার যাকাত আদায় করতে হবে কি-না এ ব্যাপারে ওলামায়ে কেরামের মধ্যে মতভেদ পরিলক্ষিত হয়। তবে ছহীহ মত হ’ল, ঋণদাতা সম্পদশালী হ’লে তার উপর উক্ত অর্থের যাকাত আদায় করা ওয়াজিব। সে চাইলে প্রত্যেক বছরের জন্য পৃথকভাবে যাকাত আদায় করতে পারে অথবা উক্ত অর্থ করায়ত্ত করার পরে অতিবাহিত বছরগুলি হিসাব করে এক সঙ্গে যাকাত আদায় করতে পারে। আর ঋণদাতা গরীব হ’লে অর্থাৎ প্রদানকৃত ঋণের অর্থ নিছাব পরিমাণ হ’লেও এ অর্থ ব্যতীত তার নিকট অন্য অর্থ না থাকলে উক্ত অর্থ করায়ত্ত হওয়ার পরে এক বছরের জন্য যাকাত আদায় করলেই তা আদায় হয়ে যাবে।[9]

ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির যাকাতের হুকুম : কোন ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির নিছাব পরিমাণ সম্পদ থাকলেও ঋণ পরিশোধ করার কারণে যদি নিছাব পরিমাণ সম্পদ থেকে কমে যায়, এ ধরনের ব্যক্তির উপর যাকাত ফরয কি-না এ ব্যাপারে ওলামায়ে কেরামের মধ্যে মতভেদ পরিলক্ষিত হয়। তবে ছহীহ মত হ’ল, উক্ত ব্যক্তির উপর যাকাত ফরয। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, خُذْ مِنْ أَمْوَالِهِمْ صَدَقَةً تُطَهِّرُهُمْ وَتُزَكِّيْهِمْ بِهَا ‘তাদের সম্পদ হ’তে ছাদাক্বা (যাকাত) গ্রহণ করবে। যার দ্বারা তুমি তাদেরকে পবিত্র করবে এবং পরিশোধিত করবে’ (তওবা ৯/১০৩)

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) মু‘আয ইবনু জাবাল (রাঃ)-কে ইয়ামেনের উদ্দেশ্যে প্রেরণ করে বললেন, তুমি তাদেরকে জানিয়ে দিবে, أَنَّ اللهَ افْتَرَضَ عَلَيْهِمْ صَدَقَةً فِيْ أَمْوَالِهِمْ، تُؤْخَذُ مِنْ أَغْنِيَائِهِمْ وَتُرَدُّ عَلَى فُقَرَائِهِمْ- ‘আল্লাহ তা‘আলা তাদের উপর তাদের সম্পদের মধ্য থেকে ছাদাক্বা (যাকাত) ফরয করেছেন। যেটা তাদের ধনীদের নিকট থেকে গৃহীত হবে আর তাদের দরিদ্রদের মাঝে বণ্টন করা হবে’।[10]

তিনি অন্যত্র বলেন, فِيْمَا سَقَتِ السَّمَاءُ وَالْعُيُوْنُ أَوْ كَانَ عَثَرِيًّا الْعُشْرُ، وَمَا سُقِىَ بِالنَّضْحِ نِصْفُ الْعُشْرِ- ‘বৃষ্টি ও প্রবাহিত পানি দ্বারা সিক্ত ভূমিতে উৎপাদিত ফসল বা সেচ ব্যতীত উর্বরতার ফলে উৎপনণ ফসলের উপর ‘ওশর’ (দশ ভাগের এক ভাগ) যাকাত ওয়াজিব। আর সেচ দ্বারা উৎপাদিত ফসলের উপর ‘অর্ধ ওশর’ (বিশ ভাগের এক ভাগ) যাকাত ওয়াজিব’।[11]

উল্লিখিত দলীলসমূহে যাকাত আদায়ের সাধারণ নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এথেকে ঋণগ্রস্ত ব্যক্তিকে পৃথক করা হয়নি। এছাড়াও রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ছাহাবায়ে কেরামকে কৃষক ও পশুপালনকারীদের নিকটে যাকাত আদায়ের জন্য পাঠাতেন। কিন্তু কখনই তিনি ঋণের কথা জিজ্ঞেস করার নির্দেশ দেননি। বরং নিছাব পরিমাণ মালের অধিকারী সকল ব্যক্তির নিকট থেকেই যাকাত আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন।[12] কেননা ঋণ ব্যক্তির সাথে সম্পর্কিত, মালের সাথে নয়। অর্থাৎ সম্পদ থাকুক বা না থাকুক তার উপর ঋণ পরিশোধ করা ওয়াজিব। পক্ষান্তরে যাকাত মালের সাথে সম্পর্কিত, ব্যক্তির সাথে নয়। অর্থাৎ নিছাব পরিমাণ মাল থাকলেই কেবল তার উপর যাকাত ওয়াজিব; অন্যথা ওয়াজিব নয়।

যাকাত ওয়াজিব হওয়ার পরে তা আদায়ের পূর্বে মালিক মৃত্যুবরণ করলে তার হুকুম : কোন ব্যক্তির নিকট নিছাব পরিমাণ মাল এক বছর যাবৎ গচ্ছিত রয়েছে, যার উপর এখন যাকাত ওয়াজিব। কিন্তু যাকাত আদায়ের পূর্বেই মালিক মৃত্যুবরণ করলে পরিত্যক্ত সম্পদ থেকে তার উপর ওয়াজিব হওয়া যাকাত আদায় করতে হবে। যাকাত আদায়ের পূর্বে ওয়ারিছগণ উক্ত সম্পদের কিছুই গ্রহণ করতে পারবে না। কেননা যাকাত ঋণের অন্তর্ভুক্ত, যা পরিশোধ করা ওয়াজিব।[13]

হাদীছে এসেছে, ইবনু আববাস (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, أَتَى رَجُلٌ النَّبِىَّ صلى الله عليه وسلم فَقَالَ لَهُ إِنَّ أُخْتِيْ نَذَرَتْ أَنْ تَحُجَّ وَإِنَّهَا مَاتَتْ فَقَالَ النَّبِىُّ صلى الله عليه وسلم لَوْ كَانَ عَلَيْهَا دَيْنٌ أَكُنْتَ قَاضِيَهُ قَالَ نَعَمْ قَالَ فَاقْضِ اللهَ، فَهْوَ أَحَقُّ بِالْقَضَاءِ-   অর্থাৎ এক ব্যক্তি নবী (ছাঃ)-এর নিকট এসে বলল, আমার বোন হজ্জ করতে মানত করেছিলেন; কিন্তু তা আদায় করার পূর্বে তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, তোমার বোনের উপর কারো ঋণ থাকলে তুমি কি তা আদায় করতে? সে বলল, হাঁ, (তা আদায় করতাম)। তখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, তবে আল্লাহ্র ঋণ আদায় কর। এটা আদায়ের অধিক হকদার।[14]

আরও দেখুন:  ছাদাক্বাতুল ফিতরের বিধান

অত্র হাদীছ থেকে প্রমাণিত হয় যে, মৃত ব্যক্তির ঋণ থাকলে তা পরিশোধ করা ওয়াজিব। আর যাকাত আল্লাহ্র ঋণের অন্তর্ভুক্ত, যা আদায়ের অধিক হকদার।

যাকাত ওয়াজিব হওয়ার পরে তা আদায়ের পূর্বে নষ্ট বা হারিয়ে গেলে তার হুকুম : কোন ব্যক্তির নিছাব পরিমাণ সম্পদ থাকায় তার উপর যাকাত ওয়াজিব। কিন্তু যাকাত আদায়ের পূর্বেই তা নষ্ট হ’লে বা হারিয়ে গেলে তার উপর উক্ত সম্পদের যাকাত আদায় করা ওয়াজিব কি-না এ ব্যাপারে ওলামায়ে কেরামের মধ্যে মতভেদ পরিলক্ষিত হয়। তবে ছহীহ মত হ’ল, যদি তার অবহেলা বা অসতর্কতার কারণে নষ্ট বা হারিয়ে যায়, তাহ’লে তার উপর যাকাত আদায় করা ওয়াজিব। আর যদি সতর্কতার সাথে সংরক্ষণের পরেও তা নষ্ট হয় বা হারিয়ে যায় তাহ’লে তার উপর যাকাত আদায় ওয়াজিব নয়।[15]

যাকাতের নির্দিষ্ট অংশ বের করার পরে তা হকদারের নিকট পৌঁছানের পূর্বে নষ্ট হ’লে বা হারিয়ে গেলে তার হুকুম : নিছাব পরিমাণ মাল হ’তে যাকাতের নির্দিষ্ট অংশ পৃথক করার পরে তার অধিকারী ব্যক্তিদের নিকট পৌঁছানোর পূর্বে নষ্ট বা হারিয়ে গেলে তাকে পুনরায় বাকী সম্পদ থেকে যাকাত আদায় করতে হবে কি-না এ ব্যাপারে ওলামায়ে কেরামের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। তবে ছহীহ মত হ’ল, যদি যাকাতের নির্দিষ্ট অংশ বের করার পরে তার হকদারদের নিকট পৌঁছাতে অনেক দেরী করে এবং তা অরক্ষিত অবস্থায় ফেলে রাখার কারণে নষ্ট হয় বা হারিয়ে যায় তাহ’লে তাকে পুনরায় যাকাত আদায় করতে হবে। আর সতর্কতার পরেও নষ্ট হ’লে বা হারিয়ে গেলে তাকে যাকাত আদায় করতে হবে না।

যাকাত ওয়াজিব হওয়ার পরে তা আদায়ের পূর্বে বিক্রি করলে তার হুকুম : কোন ব্যক্তির উপর যাকাত ওয়াজিব হয়েছে। কিন্তু যাকাত আদায়ের পূর্বেই তা বিক্রি করে দিয়েছে। এক্ষেত্রে উক্ত বিক্রয় বৈধ হবে কি-না? আর কার উপর উক্ত সম্পদের যাকাত আদায় করা ওয়াজিব? এ ব্যাপারে ওলামায়ে কেরামের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। তবে ছহীহ মত হ’ল, উক্ত বিক্রয় বৈধ। তবে বিক্রেতার উপর উক্ত সম্পদের যাকাত আদায় করা ওয়াজিব। অর্থাৎ অবশ্যই তাকে উক্ত বিক্রয়কৃত সম্পদের যাকাত আদায় করতে হবে।

ঋণগ্রস্ত নিছাব পরিমাণ সম্পদের মালিক মৃত্যুবরণ করলে কোনটি আগে আদায় করবে? : ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি যার উপর যাকাত ওয়াজিব, এরূপ ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করলে তার পরিত্যক্ত সম্পদ থেকে প্রথমে যাকাত আদায় করবে, না প্রথমে ঋণ পরিশোধ করবে? এ ব্যাপারে ওলামায়ে কেরামের মধ্যে মতভেদ পরিলক্ষিত হয়। তবে ছহীহ মত হ’ল, ঋণ ও যাকাত উভয়টিকেই সমান মর্যাদায় রাখতে হবে। অর্থাৎ কারো যদি ১০০ টাকা ঋণ ও ১০০ টাকা যাকাত ওয়াজিব হয়ে থাকে। আর পরিত্যক্ত সম্পদের পরিমাণ যদি ১০০ টাকা হয়। তাহ’লে ৫০ টাকা ঋণ পরিশোধ করতে হবে। আর ৫০ টাকা যাকাত দিতে হবে। পক্ষান্তরে রাসূল (ছাঃ)-এর বাণী- فَاقْضِ اللهَ، فَهْوَ أَحَقُّ بِالْقَضَاءِ ‘আল্লাহ্র ঋণ আদায় কর। এটা আদায়ের অধিক হকদার’।[16] এর দ্বারা ঋণের পূর্বে যাকাত আদায়ের কথা বুঝানো হয়নি। বরং বুঝানো হয়েছে যে, মৃত্যুর পরে মানুষের ঋণ পরিশোধ করা অপরিহার্য হ’লে আল্লাহর ঋণ (যাকাত) পরিশোধ করাও অপরিহার্য।[17]        [চলবে]



[1]. মুসলিম হা/১০৪৫।

[2]. আবুদাউদ হা/১৬২৪; তিরমিযী হা/৬৭৮; ইবনু মাজাহ হা/১৭৯৫; মিশকাত হা/১৭৮৮, বঙ্গানুবাদ (এমদাদিয়া ঐ, লইব্রেরী) ৪/১৩২ পৃঃ, সনদ হাসান।

[3]. তিরমিযী হা/৬৩২; ইবনু মাজাহ হা/১৭৯২; সনদ ছহীহ।

[4]. আবু মালেক কামাল বিন সায়্যেদ সালেম, ছহীহ ফিক্বহুস সুন্নাহ ২/৬৪ পৃঃ।

[5]. বুখারী হা/১, ‘আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)-এর প্রতি কিভাবে অহী শুরু হয়েছিল’ অধ্যায়।

[6]. বুখারী হা/১৪৬০, বঙ্গানুবাদ (তাওহীদ পাবলিকেশন্স) ২/১০৭ পৃঃ; মুসলিম হা/৯৯০; মিশকাত হা/১৭৭৫, ঐ, বঙ্গানুবাদ ৪/১২৬ পৃঃ।

[7]. বুখারী হা/১৪৮৩, ‘যাকাত’ অধ্যায়, বঙ্গানুবাদ (তাওহীদ পাবলিকেশন্স) ২/১১৯ পৃঃ; মিশকাত হা/১৭৯৭।

[8]. বুখারী হা/১৪৯৯, ‘যাকাত’ অধ্যায়, বঙ্গানুবাদ (তাওহীদ পাবলিকেশন্স) ২/১২৭ পৃঃ; মুসলিম হা/১৭১০; মিশকাত হা/১৭৯৮।

[9]. মুহাম্মাদ বিন ছালেহ আল-উছাইমীন, শারহুল মুমতে আলা জাদিল মুসতাকনি ৬/২৭ পৃঃ।

[10]. বুখারী হা/১৩৯৫, ‘যাকাত’ অধ্যায়, ‘যাকাত ওয়াজিব হওয়া’ অনুচ্ছেদ, বঙ্গানুবাদ, তাওহীদ পাবলিকেশন্স ২/৭৫ পৃঃ; মুসলিম হা/১৯।

[11]. বুখারী হা/১৪৮৩, ‘যাকাত’ অধ্যায়, বঙ্গানুবাদ (তাওহীদ পাবলিকেশন্স) ২/১১৯ পৃঃ; মিশকাত হা/১৭৯৭।

[12]. মুসলিম হা/১০৪৫।

[13]. ফাতাওয়া উছায়মীন ‘যাকাত’ অধ্যায় প্রশ্ন নং ৩৪; আল-মাওয়ার্দী, আল-হাবী ফি ফিক্বহীশ শাফেঈ ৩/২১৩ পৃঃ।

[14]. বুখারী হা/৬৬৯৯, ‘শপথ ও মানত’ অধ্যায়, বঙ্গানুবাদ (তাওহীদ পাবলিসেশন্স) ৬/১৩২ পৃঃ; মিশকাত হা/২৫১২, বঙ্গানুবাদ (এমদাদিয়া) ৫/১৭৭ পৃঃ।

[15]. ছালেহ আল-উছায়মীন, শারহুল মুমতে ৬/৪৫ পৃঃ; ইবনু কুদামা, আল-মুগনী ২/৭০৭ পৃঃ।

[16]. বুখারী হা/৬৬৯৯, ‘শপথ ও মানত’ অধ্যায়, বঙ্গানুবাদ (তাওহীদ পাবলিসেশন্স) ৬/১৩২ পৃঃ; মিশকাত হা/২৫১২, বঙ্গানুবাদ (এমদাদিয়া) ৫/১৭৭ পৃঃ।

[17]. শারহুল মুমতে আলা যাদিল মুসতাকনি ৬/৪৮ পৃঃ।

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

মন্তব্য করুন

Back to top button