বিভিন্ন ধর্ম ও মতবাদ

পীরতন্ত্র

To Desired Deals

পীর শব্দটি ফার্সি। আরবীতে বলা হয় মুর্শীদ। মুর্শীদ শব্দের অর্থ হলো পথপ্রদর্শক। যিনি আল্লাহর আদেশ-নিষেধ আল্লাহ তায়ালা যেভাবে চান সেভাবে পালন করার প্রশিক্ষণ দেন তার নাম মুর্শীদ বা পথপ্রদর্শক। যাকে ফার্সীতে বলে পীর। মুরীদ শব্দটিও আরবী। যার অর্থ হল ইচ্ছাপোষণকারী। যে ব্যক্তি আল্লাহর আদেশ-নিষেধ আল্লাহ যেভাবে চান সেভাবে পালন করার ইচ্ছা পোষন করে কোন বুযুর্গ ব্যক্তির হাত ধরে শপথ করে, সে ব্যক্তিকে বলা হয় মুরীদ। – এই হলো মোটামুটি পীরগণের ভাষ্যমতে পীর-মুরীদির সংজ্ঞা।

এখানে পবিত্র কুরআন ও হাদীছের আলোকে পীর-মুরীদি সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচোনা তুলে ধরা হলো:-
স্মরণ করুণ পরম করুণাময় অসীম দয়ালু, মহান আল্লাহ তায়ালা’র বানী,

“আর সেদিনের ভয় করো, যখন কেউ কারো সামান্য উপকারে আসবে না এবং তার পক্ষে কোন সুপারিশও কবুল হবে না; কারো কাছ থেকে কোন ক্ষতিপূরণ নেওয়া হবে না এবং তারা কোন সাহায্যও পাবে না”। (বাক্বারা ২:৪৮)

“তোমরা অনুসরণ করো যা তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে অবতীর্ণ হয়েছে এবং আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্য সাথীদের অনুসরণ করো না”। (আ’রাফ ৭:৩)

শরিয়াহ মানার প্রয়োজন: কুরআন-সুন্নাহ মোতাবেক সহীহ আক্বিদাহ হলো আল্লাহ (সুব:) কর্তৃক প্রদত্ত ও রাসূলুল্লাহ (সা:) কর্তৃক প্রদর্শিত শরিয়ার আইন-বিধান কঠোরভাবে মান্য করা জরুরী। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ (সুব:) বলেন:

شَرَعَ لَكُمْ مِنَ الدِّينِ مَا وَصَّى بِهِ نُوحًا وَالَّذِي أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ وَمَا وَصَّيْنَا بِهِ إِبْرَاهِيمَ وَمُوسَى وَعِيسَى أَنْ أَقِيمُوا الدِّينَ وَلَا تَتَفَرَّقُوا فِيهِ 

অর্থ: “তিনি তোমাদের জন্য দ্বীন (জীবন ব্যবস্থা) বিধিবদ্ধ করে দিয়েছেন; (তা হচ্ছে ঐই জীবন ব্যবস্থা) যার ব্যাপারে তিনি নূহ (আ:) কে নির্দেশ দিয়েছিলেন। আর আমি (আল্লাহ) তোমার কাছে যে ওহী পাঠিয়েছি এবং ইবরাহীম, মূসা ও ঈসাকে যে নির্দেশ দিয়েছিলাম তা হল, তোমরা দ্বীন কায়েম করো এবং এই ব্যাপারে একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ো না।” (সুরা শু’রা ২৬:১৩)

এই আয়াত দ্বারা বুঝা গেল, আল্লাহ (সুব:) জীবন ব্যাবস্থা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। এবং ঐ জীবন ব্যাবস্থাই কায়েম করা আদেশ করেছেন। সুতরাং মুসলিমের কর্তব্য হলো আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত জীবন ব্যাবস্থাই পালন করবে এবং কায়েম করবে। অন্য কারো হুকুম যদি আল্লাহর হুকুমের বিরোধি হয় তাহলে তা প্রত্যাখান করবে।

কিন্তু পীর-মাশায়েখগণ বলেন: পীর যদি হুকুম করেন তা মানতে হবে যদিও আল্লাহ প্রদত্ত শরিয়তের প্রকাশ্য বিরোধী হয়। যেমন চরমোনাই পীর বলেন:

بمی سجادہ رنگن کن گرت پیر مغاں گوید+کہ سالک بےخبر نہ بود زراہ ورسم منزل

অর্থ: “কামেল পীরের আদেশ পাইলে নাপাক শারাব দ্বারাও জায়নামাজ রঙ্গিন করিয়া তাহাতে নামাজ পড়। অর্থাৎ শরীয়তের কামেল পীর সাহেব যদি এমন কোন হুকুম দেন, যাহা প্রকাশ্যে শরীয়তের খেলাফ হয়, তবুও তুমি তাহা নিরাপত্তিতে আদায় করবে। কেননা, তিনি রাস্তা সব তৈরী করিয়াছেন। তিনি তাহার উঁচু-নিচু অর্থাৎ ভালমন্দ সব চিনেন, কম বুঝের দরুন জাহেরিভাবে যদিও তুমি উহা শরীয়তের খেলাফ দেখ কিন্তু মূলে খেলাফ নহে।” (‘আশেক মাশুক’ মাওলানা সৈয়দ মোহাম্মদ এছহাক রচিত ৩৫ নং পৃষ্ঠায়।)

অথচ আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূল (সা:) এর হুকুমের বিরূদ্ধে কারো হুকুম মানার কোন সুযোগ নেই। হাদীসে ইরশাদ হয়েছে:

عَنْ أُمِّ حُصَيْنٍ قَالَتْ قَالَ رَسُولُ الله صَلَّى الله عَلَيه وسَلَّم لاَ طَاعَةَ لِمَخْلُوقٍ في مَعْصِيَةِ الخَالِقِ

অর্থ: “উম্মে হুসাইন (রা:) থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (সা:) ইরশাদ করেছেন: স্রষ্টাকে অমান্য করে সৃষ্টিজগতের কারো আনুগত্য চলবে না”। (জামেউল আহাদীস: হা: ১৩৪০৫, মুয়াত্তা: হা: ১০, মু’জামূল কাবীর: হা: ৩৮১, মুসনাদে শিহাব: হা: ৮৭৩ আবি শাইবা: হা: ৩৩৭১৭, কানযুল উম্মাল: হা: ১৪৮৭৫।)

এছাড়া নিম্নের হাদীসটিতে বিষয়টিকে আরও স্পষ্ট করা হয়েছে:

عَنْ عَلِىٍّ قَالَ بَعَثَ رَسُولُ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- سَرِيَّةً وَاسْتَعْمَلَ عَلَيْهِمْ رَجُلاً مِنَ الأَنْصَارِ وَأَمَرَهُمْ أَنْ يَسْمَعُوا لَهُ وَيُطِيعُوا فَأَغْضَبُوهُ فِى شَىْءٍ فَقَالَ اجْمَعُوا لِى حَطَبًا. فَجَمَعُوا لَهُ ثُمَّ قَالَ أَوْقِدُوا نَارًا. فَأَوْقَدُوا ثُمَّ قَالَ أَلَمْ يَأْمُرْكُمْ رَسُولُ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- أَنْ تَسْمَعُوا لِى وَتُطِيعُوا قَالُوا بَلَى. قَالَ فَادْخُلُوهَا. قَالَ فَنَظَرَ بَعْضُهُمْ إِلَى بَعْضٍ فَقَالُوا إِنَّمَا فَرَرْنَا إِلَى رَسُولِ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- مِنَ النَّارِ. فَكَانُوا كَذَلِكَ وَسَكَنَ غَضَبُهُ وَطُفِئَتِ النَّارُ فَلَمَّا رَجَعُوا ذَكَرُوا ذَلِكَ لِلنَّبِىِّ صلى الله عليه وسلم فَقَالَ لَوْ دَخَلُوهَا مَا خَرَجُوا مِنْهَا إِنَّمَا الطَّاعَةُ فِى الْمَعْرُوفِ

অর্থ: “আলী (রা:) থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (সা:) একটি সেনাদল যুদ্ধাভিযানে প্রেরণ করলেন। এক আনসারী ব্যক্তিকে তাদের সেনাপতি নিযুক্ত করলেন। এবং সাহাবীদেরকে তার কথা শুনা ও মানার জন্য নির্দেশ দিলেন। অতপর তাদের কোন আচরণে সেনাপতি রাগ করলেন। তিনি সকলকে লাকড়ি জমা করতে বললেন। সকলে লাকড়ি জমা করলো এরপর আগুন জ্বালাতে বললেন। সকলে আগুন জ্বালালো। তারপর সেনাপতি বললো রাসূলুল্লাহ (সা:) কি তোমাদেরকে আমার আনুগত্য করার এবং আমার কথা শুনা ও মানার নির্দেশ দেন নাই? সকলেই বললো, হ্যা। তিনি বললেন, তাহলে তোমরা সকলেই আগুনে ঝাঁপিয়ে পড়। সাহাবীগণ একে অপরের দিকে তাকাতে লাগলেন। এবং বললেন, আমরাতো আগুন থেকে বাঁচার জন্যই রাসূলুল্লাহ (সা:) এর কাছে এসেছি। এ অবস্থায় কিছুক্ষন পর তার রাগ ঠান্ডা হলো এবং আগুনও নিভে গেল। যখন সাহাবারা মদীনায় প্রত্যাবর্তণ করলেন তখন বিষয়টি রাসূলুল্লাহ (সা:) এর কাছে উপস্থাপন করা হলো। উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সা:) বললেন ‘তারা যদি আমীরের কথা মতো আগুনে ঝাঁপ দিতো তাহলে তারা আর কখনোই তা থেকে বের হতে পারতো না। প্রকৃতপক্ষে আনুগত্য কেবল ন্যায় এবং সৎ কাজেই।”(সহীহ মুসলিম হা:নং: ৪৮৭২, সহীহ বুখারী হা: নং: ৪৩৪০, সহীহ মুসলিম বাংলা; ইসলামিক ফাউন্ডেশন কতৃক তরজমা; হা: নং: ৪৬১৫।)

এ হাদীস থেকে পরিষ্কার হয়ে গেল যে, শরিয়তের বিরূদ্ধে কারো হুকুমের আনুগত্য করা যাবে না। অথচ পীর সাহেবদের কাছে কুরআন ও হাদীসে বর্নিত এসকল বিষয়ের কোনই গুরুত্ব নেই। এমনকি তাদের ধর্ম ও মাযহাব ভিন্ন বলে তারা দাবী করে থাকে। যেমন: ‘ভেদে মারেফাত বা ইয়াদে খোদা’ এর ৭২ নং পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে

عاشقاں را ملت و مذہب جداست+عاشقاں را ملت و مذہب خداست

অর্থ: “মাওলানা রুমি ফরমাইয়াছেন: প্রেমিক লোকদের জন্য মিল্লাত ও মাজহাব ভিন্ন। তাহাদের মিল্লাত ও মাজহাব শুধু মা’বুদ কেন্দ্রিক।”

উল্লেখ্য যে, সকল মুসলিমদের দ্বীনই আল্লাহ কেন্দ্রিক এবং আল্লাহর কর্তৃক নির্ধারিত। এখানে গোপন কোন বিষয় নেই বরং দ্বীনে ইসলাম স্বচ্ছ এবং পরিষ্কার একটি ধর্ম। তাহলে পীর সাহেবরা খোদা কেন্দ্রিক কোন ধর্মের কথা বলতে চাচ্ছেন যা অন্যদের ধর্ম থেকে আলাদা? তাহলে দ্বীনে ইসলামের মধ্যে এমনো কোন বিষয় আছে কি যা রাসূলুল্লাহ (সা:) উম্মতের সকলের সামনে প্রকাশ করেননি? এটাতো শীয়াদের বক্তব্য । পীর সাহেবরাও কি শীয়াদের মতাদর্শকে সমর্থণ করছে?

তাছাড়া ছয় লতিফা সম্পর্কে চরমোনাইয়ের পীর মাওলানা সৈয়দ মোহাম্মদ ইসহাক সাহেব বলেন, ‘ছয় লতিফার কথা কুরআনে পাক ও হাদীস শরীফে নাই, তবে আল্লাহ পাকের ওলীগণ আল্লাহ পাককে পাইবার জন্য একটা রাস্তা হিসাবে ইহা বাহির করিয়াছেন। যদি লতীফার ছবক আদায় করিতে চান, তবে একজন উপযুক্ত পীরের দরবারে থাকিতে হইবে। (‘ভেদে মা’রেফাত বা ইয়াদে খোদা’ পৃষ্ঠা নং: ৫০।)

তাহলে প্রশ্ন থেকে যায়, আল্লাহ (সুব:) কে পাইবার জন্য রাসূলুল্লাহ (সা:) কি কোন রাস্তা বলে দেননি? যদি বলে দিয়ে থাকেন তাহলে নতুন করে রাস্তা বানানোর দরকার পরলো কি? তাছাড়া আল্লাহকে পাওয়ার রাস্তা উম্মতের সামনে স্পষ্ট করে দেয়া সাধারণ কোন শাখাগত বিষয় নয় যে, বিষয়টি উম্মতের ইজতিহাদের উপর ছেড়ে দেওয়া হবে।

পীরের কাছে মুরীদ হওয়া ফরজ:

কুরআনের নির্দেশ অনুযায়ী ফরজ বিধান দেওয়ার মালিক একমাত্র আল্লাহ (সুব:)। ইরশাদ হচ্ছে:
 إِنِ الْحُكْمُ إِلَّا لِلَّهِ অর্থ: “বিধান দিবার অধিকার আল্লাহরই।”(সূরা ইউসুফ ১২:৪০)
আল্লাহ (সুব:) আরও ইরশাদ করেছেনঃ
 أَلَا لَهُ الْخَلْقُ وَالْأَمْرُ অর্থ: “জেনে রেখো সৃষ্টি এবং বিধান তাঁরই।”(সূরা আরাফ ৭:৫৪।)

পীর-সূফীদের আক্বীদাহ হলো পীরের কাছে মুরীদ হওয়া ফরজ। যেমন চরমোনইয়ের পীর সাহেব ‘মাওয়ায়েজে এসহাকিয়া’ নামক কিতাবে বলেন: ‘পীরের কাছে মুরীদ হওয়া ফরজ’। তিনি আরও বলেন, ‘যদি কারো দুইজন পীর হয় তবে দুই পীর তোমার দুই ডানা ধরে বেহেশতে নিয়ে যাবেন। কোনই ক্ষতি নাই।’ (‘মাওয়ায়েজে এছহাকিয়া’ সৈয়দ মা:মো: মোমতাজুল করীম রচিত: পৃষ্ঠা নং: ৫৫-৫৬ ) এছাড়া তিনি আরও বলেন: ‘যার কোন পীর নাই তার পীর শয়তান।’ এজন্য তারা একটি আরবী বাক্য তৈরী করেছে যাতে সাধারণ মানুষের আরবী দেখে এটাকে কুরআন-হাদীস মনে করে বিনা আপত্তিতে মেনে নেয়। সে বাক্যটি হলো: مَنْ لَيْسَ لَهٌ شَيْخٌ فَشَيْخُه شَيْطَانٌ  অর্থ: “যার কোন পীর নাই তার পীর শয়তান।” (‘ভেদে মারেফাত বা ইয়াদে খোদা’ মাওলানা সৈয়দ মোহাম্মদ এছহাক রচিত: পৃষ্ঠা নং: ২৩।)

এ আরবী বাক্য শুনে অনেকেই এটিকে হাদীস বলে বিশ্বাস করে অথচ এটি কোন হাদীস নয় পীর-সূফীদের মনগড়া একটি বাক্য মাত্র। পীরদের যতগুলো সিলসিলা রয়েছে প্রায় সকলের আক্বিদাই এরকম । যেমন চরমোনাই পীরদের আক্বিদাহ তাদের বই থেকে উপরে উল্লেখ করা হলো।

এনায়েতপুরী পীর ও তার অনুসারীদের আক্বীদাহ-বিশ্বাসও একই রকম। তাদের রচিত কিতাব ‘শরীয়তের আলো’ নামক কিতাবে উল্লেখ আছে, ‘পীর ধরা সবার জন্য ফরজ’।( ‘শরীয়তের আলো’ খাজা বাবা এনায়েতপুরী সাহেবের অনুমোদন ক্রমে মাওলানা মো: মকিম উদ্দিন প্রণীত। প্রকাশক পীরজাদা মৌ: খাজা কামার উদ্দিন (নুহ মিয়া)।)

সুরেশ্বরী পীর লিখেছেন: ‘পীরের নিকট দীক্ষিত না হইলে কোন বন্দেগী কবূল হয় না।'(নুরে হক গঞ্জে নুর, পৃষ্ঠা নং ২৫, সুরেশ্বর দরবার এর পক্ষে সৈয়দ শাহ নূরে মঞ্জুর মোর্শেদ (মাহবুবে খোদা) ও ভ্রাতাগণ কর্তৃক প্রকাশিত, একদশ সংস্করণ ১৯৯৮।)

ভায়া মাধ্যম:

আল্লাহ (সুব:) পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেছেন মানুষ যত বড় পাপ ও গুনাহ করুক না কেন যদি তারা খাঁটি মনে আল্লাহর কাছে তওবা করেন তবে আল্লাহ (সুব:) অবশ্যই তাকে ক্ষমা করে দিবেন। এজন্য কোন ভায়া মাধ্যমের প্রয়োজন নাই। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ (সুব:) ইরশাদ করেন:

وَمَنْ يَعْمَلْ سُوءًا أَوْ يَظْلِمْ نَفْسَهُ ثُمَّ يَسْتَغْفِرِ اللَّهَ يَجِدِ اللَّهَ غَفُورًا رَحِيمًا 

অর্থ: “আর যে ব্যক্তি মন্দ কাজ করবে কিংবা নিজের প্রতি যুলম করবে তারপর আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইবে, সে আল্লাহকে পাবে ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” (সুরা নিসা: ১১০)

এখানে সরাসরি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কোন প্রকারের ভায়া মাধ্যমের কথা নেই। আল্লাহ (সুব:) আরও ইরশাদ করেন:

 قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَى أَنْفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِنْ رَحْمَةِ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ

অর্থ: “বল, ‘হে আমার বান্দাগণ, যারা নিজেদের উপর বাড়াবাড়ি করেছ তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। অবশ্যই আল্লাহ সকল পাপ ক্ষমা করে দেবেন। নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।”(সুরা যুমার ৩৯:৫৩।)

কিন্তু পীর-মাশায়েখগণ বলেন, বান্দা অসংখ্য গুনাহ করলে পীরের মাধ্যম ছাড়া আল্লাহ (সুব:) মাফ করতে চান না। যেমন: চরমোনাইয়ের পীর বলেন: ‘বান্দা অসংখ্য গুনাহ করার ফলে আল্লাহ পাক তাহাকে কবুল করিতে চান না। পীর সাহেব আল্লাহ পাকের দরবারে অনুনয় বিনয় করিয়া ঐ বান্দার জন্য দোয়া করিবেন, যাহাতে তিনি কবুল করিয়া নেন। ঐ দোয়ার বরকতে আল্লাহ পাক তাহাকে কবুল করিয়া নেন।’ (‘ভেদে মা’রেফাত বা ইয়াদে খোদা’ মাওলানা সৈয়দ মোহাম্মদ এসহাক রচিত, পৃষ্ঠা নং ৩৪।)

তাদের এই বক্তব্য স্পষ্ট কুরআনের আয়াতের পরিপন্থি। ছোট বেলায় একটি কৌতুক শুনেছিলাম এক লোক শয়তানকে জিজ্ঞাসা করেছিলো; ওহে শয়তান! এক লোক সারা জীবন অন্যায় করেছে, পাপ করেছে এখন সে বৃদ্ধ বয়সে এসে তওবা করেছে আর কখনো গুনাহ করবে না বলে দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। তুমি তাকে কিভাবে গোমরাহ করো? শয়তান হেসে বললো, এতো খুবই সহজ বিষয়। আমি তাকে বুঝাই তুমি সারা জীবন অন্যায় করেছ, পাপ করেছ। পাপ করতে করতে সীমালঙ্ঘন করেছ। তোমাকে আল্লাহ (সুব:) এইভাবে ক্ষমা করবেন না বরং তোমাকে একজন পীর ধরতে হবে। ঐ পীর যদি তোমার জন্য অনুনয়-বিনয় করিয়া আল্লাহর কাছে তোমার জন্য ক্ষমা চান তাহলেই কেবলমাত্র তুমি ক্ষমা পাইতে পার। এভাবে বুঝাইয়া-সমঝাইয়া তাকে একজন পীর ধরাইয়া দেই। এরপরে আমার বাকী কাজ ঐ পীর সাহেবই আঞ্জাম দিয়ে থাকেন। এটি একটি কৌতুক। এর কোন বাস্তবতা জানা ছিল না। কিন্তু চরমোনইয়ের পীর সাহেবের ‘ভেদে মারেফাত বা ইয়াদে খোদা’ নামক বই পড়ার পরে শয়তানের এই অভিনব কৌশলের বাস্তব দলীল পাওয়া গেল।

আল্লাহর আন্দাজ নাই:

মুসলিম জাতির ঈমান-আক্বিদার একটি মূল ভিত্তি হলো যে, আল্লাহ (সুব:) সকল কাজ সুপরিকল্পিত ও সুপরিমিতভাবে করেন। আল্লাহ (সুব:) পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন: إِنَّا كُلَّ شَيْءٍ خَلَقْنَاهُ بِقَدَرٍ
অর্থ: “নিশ্চয় আমি সব কিছু সৃষ্টি করেছি নির্ধারিত পরিমাণ অনুযায়ী (কোন ধরণের অসঙ্গতী ছাড়া)।” (সুরা ক্বামার: ৪৯)
এছাড়াও আল্লাহ (সুব:) পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন: لَا يُسْأَلُ عَمَّا يَفْعَلُ وَهُمْ يُسْأَلُونَ
অর্থ: “তিনি যা করেন সে ব্যাপারে তাকে প্রশ্ন করা যাবে না; বরং তাদেরকেই প্রশ্ন করা হবে।” (সুরা আম্বিয়া: ২৩)

কিন্তু চরমোনাইয়ের পীর সাহেব ‘ভেদে মারেফাত নামক বইতে মছনবীয়ে রূমীর বরাত দিয়ে শামসূ তাবরিজীর নকল শিরোনামে লিখেন: “বাদশাহ কুতুব সাহেবকে দরবারে হাজির করিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, হুজুর, আপনি কি বলিয়া বৃদ্ধের নাতিকে জেন্দা করিয়াছেন? তিনি বলিলেন যে আমি বলিয়াছি, হে ছেলে! আমার আদেশে জীবিত হইয়া যাও। বাদশাহ বলিলেন, আফসোস যদি আল্লাহর আদেশে জেন্দা হইতে বলিতেন। কুতুব সাহেব উত্তর করিলেন মাবুদের কাছে আবার কি জিজ্ঞাসা করিব তাহার আন্দাজ নাই। এই বৃদ্ধার একটি মাত্র পুত্র ছিল তাহাও নিয়াছে। বাকি ছিল এই নাতিটি যে গাভী পালন করিয়া কোনরূপ জিন্দেগী গুজরান করিত এখন এটিও নিয়া গেল। তাই আমি আলস্নাহ পাকের দরবার থেকে জোড়পূর্বক রূহ নিয়া আসিয়াছি।” (ভেদের মারেফাত বা ইয়াদে খোদা ১৫ পৃষ্ঠা।) এই ধরণের ঘটনা বর্ণনা করা এবং এর উপরে বিশ্বাস রাখা যে কুরআন বিরোধী তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

১২৬ তরীকা:

আল্লাহ (সুব:) কর্তৃক নাজিলকৃত বিধান অনুযায়ী মানব জাতির মুক্তির পথ কেবল মাত্র একটি। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হচ্ছে:

وَأَنَّ هَذَا صِرَاطِي مُسْتَقِيمًا فَاتَّبِعُوهُ وَلَا تَتَّبِعُوا السُّبُلَ فَتَفَرَّقَ بِكُمْ عَنْ سَبِيلِهِ ذَلِكُمْ وَصَّاكُمْ بِهِ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ 

অর্থ: “আর এটিই আমার সোজা পথ। সুতরাং তোমরা তার অনুসরণ কর এবং অন্যান্য পথ অনুসরণ করো না, তাহলে তা তোমাদেরকে তাঁর পথ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেবে। এগুলো তিনি তোমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে তোমরা তাকওয়া অবলম্বন কর।”(সুরা আনআ’ম ৬:১৫৩) 

এই আয়াতে আল্লাহ (সুব:) একটি তরীকাকেই অনুসরণ করতে বলেছেন। আল্লাহ (সুব:) বলেন:

وَعَلَى اللَّهِ قَصْدُ السَّبِيلِ وَمِنْهَا جَائِرٌ وَلَوْ شَاءَ لَهَدَاكُمْ أَجْمَعِينَ 

অর্থ: “আর সঠিক পথ বাতলে দেয়া আল্লাহর দায়িত্ব, এবং পথের মধ্যে কিছু আছে বক্র। আর তিনি যদি ইচ্ছা করতেন তবে তোমাদের সকলকে হিদায়াত করতেন।”(সুরা নহল ১৬:৯।)

রাসূলুল্লাহ (সা:) থেকে ‘সিরাতে মুস্তাকিম’ সর্ম্পকে হাদীস বর্ণিত হয়েছে:

عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ مَسْعُودٍ قَالَ خَطَّ لَنَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ خَطًّا ثُمَّ قَالَ هَذَا سَبِيلُ اللَّهِ ثُمَّ خَطَّ خُطُوطًا عَنْ يَمِينِهِ وَعَنْ شِمَالِهِ ثُمَّ قَالَ هَذِهِ سُبُلٌ قَالَ يَزِيدُ مُتَفَرِّقَةٌ عَلَى كُلِّ سَبِيلٍ مِنْهَا شَيْطَانٌ يَدْعُو إِلَيْهِ ثُمَّ قَرَأَ : إِنَّ هَذَا صِرَاطِي مُسْتَقِيمًا فَاتَّبِعُوهُ وَلَا تَتَّبِعُوا السُّبُلَ فَتَفَرَّقَ بِكُمْ عَنْ سَبِيلِهِ  

অর্থ: “আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা:) বলেন রাসূলুল্লাহ (সা:) আমাদেরকে (সিরাতে মুস্তাকিম বুঝানোর জন্য) প্রথমে একটি সোজা দাগ দিলেন। আর বললেন এটা হলো আল্লাহর রাস্তা । অতপর ডানে বামে অনেকগুলো দাগ দিলেন আর বললেন এই রাস্তাগুলো শয়তানের রাস্তা । এ রাস্তাগুলোর প্রতিটি রাস্তার মুখে মুখে একেকটা শয়তান বসে আছে যারা এ রাস্তার দিকে মানুষদেরকে আহবান করে। অতপর রাসূলুল্লাহ (সা:) নিজের কথার প্রমাণে উপরে উল্লেখিত প্রথম আয়াতটি তেলাওয়াত করলেন।” (মুসনাদে আহমদ ৪১৪২; নাসায়ী ১১১৭৫; মেশকাত ১৬৬।)

কিন্তু পীর-মাশায়েখ গণের তরীকা অনেক । যেমন: চরমোনাইয়ের পীর সৈয়দ মোহাম্মদ এসহাক সাহেব তার প্রায় সকল বইতেই উল্লেখ করেছেন যে, “আমার প্রিয় বন্ধুগণ! জানিয়া রাখিবেন, দোযখের আযাবের পথ বন্ধ করিয়া বেহেশতে যাইবার জন্য কেতাবে ১২৬ তরিক বয়ান করিয়াছেন। তন্মধ্যে চিশতিয়া ছাবেরিয়া তরিকা একেবারে শর্টকাট এই তরিকার প্রথম ছবকখানা লিখিয়া এজাজত দিলাম।” (‘আশেক মা’শুক’ সৈয়দ মাওলানা এসহাক রচিত পৃষ্ঠা নং ১১২, একই লেখকের কিতাব ‘ভেদে মারেফাত ইয়াদে খোদা’ পৃষ্ঠা নং ৬।)

আবার সূফীদের কোন কোন বইতে বলা হয়েছে, ‘তরীকার সংখ্যা অগনিত তবে বর্তমানে পৃথিবীতে প্রায় তিন শতাধিক তরীকা বিদ্যমান রয়েছে’।( ‘সূফী দর্শণ’ ড: ফকির আবদুর রশিদ রচিত, পৃষ্ঠা নং: ১৬৭।)

অথচ রাসূলুল্লাহ (সা:) বলেছেন:

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ كُلُّ أُمَّتِي يَدْخُلُونَ الْجَنَّةَ إِلَّا مَنْ أَبَى قَالُوا يَا رَسُولَ اللَّهِ وَمَنْ يَأْبَى قَالَ مَنْ أَطَاعَنِي دَخَلَ الْجَنَّةَ وَمَنْ عَصَانِي فَقَدْ أَبَى

অর্থ: আবু হুরায়রা (রাযিঃ) হতে বর্ণিত রাসূল (সাঃ) ইরশাদ করেছেন; আমার সকল উম্মতই জান্নাতে প্রবেশ করবে। তবে যে অস্বীকার করল (সে ব্যতিত)। সাহাবায়ে কেরাম প্রশ্ন করলেন, ইয়া রাসুলুল্লাহ! অস্বীকার করল কে? রাসূল (সাঃ) বললেন, যে ব্যক্তি আমার আনুগত্য করল সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর যে আমার আনুগত্য করল না সেই অস্বীকার করল (ফলে সে জাহান্নামে যাবে)। ( সহীহ বুখারী।)

এই হাদীস দ্বারা বুঝা গেল জান্নাতে যাওয়ার একমাত্র রাস্তা রাসূল (সা:) এর তরিকায় চলা। চরমোনাইয়ের পীরদের বাতলানো চিশতিয়া ছাবেরিয়া তরিকা নয়। এ সমস্ত তরিকার বয়ান পবিত্র কুরআনে ও হাদীসে নাই। তাহলে ১২৬ তরিকা ওনারা কোন কিতাবে পেলেন?

আল্লাহর সাথে মিশে যাওয়া:

ইসলামে তাওহীদের গুরুত্ব অপরিসীম। যার অর্থ হলো: এক ইলাহের সার্বভৌমত্ব ও এক ইলাহের বিধান মেনে নেওয়া। উলুহিয়্যাত, রুবুবিয়্যাত ও আসমা ওয়াস সীফাত সকল ক্ষেত্রে আল্লাহ (সুব) এর একাত্ব বজায় রাখা। কিন্তু পীর-সূফীদের পরিভাষায় তাওহীদ মানে হলো ‘আল্লাহর সাথে একাকার হয়ে যাওয়া’। অর্থাৎ বান্দা ইবাদত করতে করতে এমন এক পর্যায়ে চলে যায় যেখন বান্দা ও আল্লাহর মাঝে কোন পার্থক্য থাকে না । চিনি যেভাবে পানির সঙ্গে মিশে যায় সেভাবে আল্লাহওয়ালাগণ আল্লাহর সঙ্গে মিশে যান । এরা তাদের এই মতের সপক্ষে নিম্নের হাদীসটিকে প্রমাণ স্বরূপ পেশ করে থাকে:

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِنَّ اللَّهَ قَالَ مَنْ عَادَى لِي وَلِيًّا فَقَدْ آذَنْتُهُ بِالْحَرْبِ وَمَا تَقَرَّبَ إِلَيَّ عَبْدِي بِشَيْءٍ أَحَبَّ إِلَيَّ مِمَّا افْتَرَضْتُ عَلَيْهِ وَمَا يَزَالُ عَبْدِي يَتَقَرَّبُ إِلَيَّ بِالنَّوَافِلِ حَتَّى أُحِبَّهُ فَإِذَا أَحْبَبْتُهُ كُنْتُ سَمْعَهُ الَّذِي يَسْمَعُ بِهِ وَبَصَرَهُ الَّذِي يُبْصِرُ بِهِ وَيَدَهُ الَّتِي يَبْطِشُ بِهَا وَرِجْلَهُ الَّتِي يَمْشِي بِهَا وَإِنْ سَأَلَنِي لَأُعْطِيَنَّهُ وَلَئِنْ اسْتَعَاذَنِي لَأُعِيذَنَّهُ وَمَا تَرَدَّدْتُ عَنْ شَيْءٍ أَنَا فَاعِلُهُ تَرَدُّدِي عَنْ نَفْسِ الْمُؤْمِنِ يَكْرَهُ الْمَوْتَ وَأَنَا أَكْرَهُ مَسَاءَتَهُ

অর্থ: “আবূ হুরাইরা (রা:) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা:) বলেছেন: আল্লাহ তায়ালা বলেন, যে ব্যক্তি আমার কোন ওলীর সাথে শত্রুতা রাখবে, আমি তার সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করি । আমার বান্দা আমি তার উপর যা ফরয করেছি তার চেয়ে আমার কাছে বেশী প্রিয় কোন ইবাদত দ্বারা আমার নৈকট্য অর্জণ করতে পারে না। আমার বান্দা সর্বদা নফল ইবাদত দ্বারা আমার নৈকট্য অর্জণ করতে থাকে, এমন কি অবশেষে আমি তাকে আমার এমন প্রিয় পাত্র বানিয়ে নেই যে, আমিই তার কান হয়ে যাই, যা দিয়ে সে শুনে। আমিই তার চোখ হয়ে যাই, যা দিয়ে সে সবকিছু দেখে। আর আমিই তার হাত হয়ে যাই, যা দিয়ে সে ধরে। আমিই তার পা হয়ে যাই, যা দ্বারা সে চলে। সে যদি আমার কাছে কোন কিছু সাওয়াল করে, তবে আমি নিশ্চয়ই তাকে তা দান করি। আর যদি সে আমার কাছে আশ্রয় চায়, তবে অব্যশই আমি তাকে আশ্রয় দেই। আমি যে কোন কাজ করতে চাইলে এটাতে কোন রকম দ্বিধা সংকোচ করি না, যতটা দ্বিধা সংকোচ মু’মিন বান্দার প্রাণ হরণে করি। সে মৃত্যুকে অপছন্দ করে আর আমি তার কষ্ট অপসন্দ করি।” (সহীহ বুখারী ৬৫০২)

এই হাদীস দ্বারা দলীল দিয়েই ভারত বর্ষের প্রসিদ্ধ সুফীবাদী তাফসীর ‘তাফসীরে মাযহারী’ তে বলা হয়েছে:

اِنَّ اللَّه تَعَالَي يَسْتَوْدِعُ فِيْ قُلُوْبِ بَعْضِهِمْ مَحَبَةً ذَاتِيَّةً مِنْهُ تَعَالَيْ مُوْجِبَةً لِلمَعِيِّةِ الذَاتِيِّةِ

অর্থ: “আল্লাহ (সুব:) কোন কোন মানুষের অন্তরের মধ্যে তার জাতি (সত্ত্বাগত) মুহাব্বত তৈরী করে দেন ফলে সে সত্ত্বাগতভাবে আল্লাহর সাথে মিশে যায়।”(‘তাফসীরে মাযহারী’ প্রথম খন্ড ৫০ পৃষ্ঠায় إِنِّي أَعْلَمُ مَا لَا تَعْلَمُونَ আয়াতের তাফসীরে দ্রষ্টব্য।)

সূফীদের সকল তরীকার লোকদের কাছেই এ আক্বীদাহ ও বিশ্বাস গ্রহণযোগ্য। এ আক্বীদার প্রথম প্রবক্তা ও প্রতিষ্ঠাতা ‘মানসূর হাল্লাজ’ নামক এক ভন্ড সূফীকে বলা হয়ে থাকে। তিনিই সর্বপ্রথম এ আক্বীদাহ প্রকাশ করেন। এবং তিনি اَنَا الحَقُّ ‘আমিই আল্লাহ’ বলে যিকির করা শুরু করেন। তাছাড়া তিনি আরও কিছু কবিতা আবৃত্তি করেন যা থেকে তার এই আক্বীদাহর চুড়ান্ত ব্যাখ্যা জানা যায়। কবিতাগুলো এই:

أَنَا الْحَقُّ وَالْحَقُّ لِلْحَقِّ # لَابِسٌ ذَاتَهُ فَمَا ثَمَّ فَرْقٌ

অর্থ: আমিই হক্ব (আল্লাহ)। হক্ব হক্বের সঙ্গে একাকার হয়ে গেছে। সুতরাং তাদের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই।

أَنَا أَنْتَ بِلَا شَكِّ # فَسُبْحَانَكَ سُبْحَانِيْ فَتَوْحِيْدُكَ تَوْحِيْدِيْ # وَعِصْيَانُكَ عِصْيَانِيْ

অর্থ: নিঃসন্দেহে আমিই তুমি, তোমার পবিত্রতা সেতো আমারই পবিত্রতা, তোমার তাওহীদ সেতো আমারই তাওহীদ, তোমার অবাধ্যতা সেতো আমারই অবাধ্যতা।

أَنَا مَنْ أَهْوِىْ وَمَنْ أَهْوِى أَنَا # نَحْنُ رُوْحَانِ حَلَلْنَا بَدَنًا

অর্থ: “আমি যাকে চাই সেতো আমিই। আমরা দু’টো রুহ (প্রাণ) একই দেহে প্রবেশ করেছি।”

مَزَجَتْ رُوْحُكَ فِيْ رُوْحِيْ كَمَا … تَمْزَجُ الْخَمْرَةُ فِي الْمَاءِ الزَّلَالِ فَإِذَا مَسَّكَ شَيْءٌ مَسَّنِيْ … فَإِذَا أَنْتَ أَنَا فِيْ كُلِّ حَالٍ

অর্থ: তোমার রুহটা আমার রুহের সঙ্গে মিশে গেছে যেমনিভাবে শরাব স্বচ্ছ পানির সঙ্গে মিশে যায়। তাই তোমাকে কোন বিপদ-আপদ স্পর্শ করলে আমাকেই স্পর্শ করে। তুমি আর আমি সর্বাবস্থায় একই । ( মুহাব্বাতুর রাসূল বাইনাল ইত্তিবায়ে ওয়াল ইবতিদায়ে ১ম খন্ড ২১১পৃষ্ঠা।)

এভাবে ‘মানসূর হাল্লাজ’ এই জঘন্য শিরকি আক্বিদার গোড়াপত্তণ করেন। পরবর্তীতে সূফীদের শায়খে আকবার ‘মহিউদ্দীন ইবনে আরাবী’ এই আক্বীদাকে আরও সম্প্রসারণ করে ‘ওয়াহদাতুল অজুদ’ এর আক্বীদাহ মুসলিম জাতির মধ্যে ছড়িয়ে দেন। যার সারকথা হলো, ‘বান্দা এবং আল্লাহর অস্তিত্ব এক।’

বর্তমান পীর-সূফীদেরও একই আক্বীদাহ। যেমন: চরমোনাইয়ের পীর সাহেব বলেন: ‘মানছুর হাল্লাজ যখন আল্লাহ পাকের এশকের জোশে দেওয়ানা হইতেন, তখন তিনি এই শের পড়িতেন:

من تو شدم تو من شودی من تن شدم تو جاںشدی بعدازاں کسی نگوید کہ من دیگر م تو دیگری

ওগো আমার মা’শুক মাওলা! আপনি আপন কুদরাতী নজরে আমার দিকে চাহিয়া দেখুন। আমি এখন আমি নাই। আমি আপনি হইয়াছি আর আপনি আমি হইয়াছেন। আমি হইয়াছি তন্‌, আপনি হইয়াছেন জান। আমি শরীর আপনি প্রাণ। এরপর আর কেহ বলিতে পারে না যে, আমি একজন আপনি আর একজন। বরং আমি ও আপনি এক হইয়া গিয়াছি, অর্থাৎ আমি আপনার জামালের খুশীর মধ্যে ডুবিয়া গিয়াছি, আমার অজুদ ফানা হইয়া গিয়াছে এবং আমার রূহ আপনার নূরের সাথে মিশিয়া গিয়াছে। আমার আমিও যখন লয় হইয়া গিয়াছে, তখন আমি আর কোথায় আছি? আমি নাই। আপনিই ছিলেন, আপনিই আছেন, আপনিই থাকিবেন। আপনিতো আপনি, আমিও আপনি। আমি বলিতে আর কিছুই নাই।” (‘আশেক মাশুক বা ইশকে ইলাহী’ সৈয়দ মোহাম্মদ এসহাক রচিত, পৃষ্ঠা নং ৪২।)

অথচ এটি একটি মারাত্মক শিরকী আক্বিদাহ। কেননা আল্লাহ হচ্ছেন খালেক বা সৃষ্টিকর্তা। মানুষ হলো মাখলূক বা সৃষ্টি। সৃষ্ট্রা ও সৃষ্টির মধ্যে একাকার করে দেওয়া এটা হিন্দুদের আকিদাহ । তাদের বিশ্বাস, স্রষ্টার কোন স্বতন্ত্র অস্ত্মিত্ব নেই, সৃষ্টির সবকিছুর মধ্যেই তিনি বিরাজমান। এজন্য তারা বলে থাকে ‘সবকিছুই ঈশ্বর’ তাদের পরিচয়ও হলো ‘সর্বেশ্বরবাদী’ । অথচ মুসলিমদের আক্বিদাহ হলো ‘সবকিছুই আল্লাহর সৃষ্টি’। তবে আল্লাহ নয়। মনসূর হাল্লাজের এই ভ্রান্ত আকিদার কারণে বাগদাদের তৎকালিন সমস্ত আলেমদের সর্বসম্মতিক্রমে তাকে হত্যা করা হয়। আর বাগদাদ তখন ছিল বাগদাদ! অর্থাৎ ইসলামী জ্ঞানের প্রাণ কেন্দ্র । এমতাবস্থায় সমস্ত ওলামায়ে কেরামদের কুরআন-সুন্নাহ ভিত্তিক সর্বসম্মতিক্রমে দেওয়া ফাতওয়াকে উপেক্ষা করে মানসুর হাল্লাজকে আল্লাহর অলী বলে আক্বিদাহ পোষণ করা মূলত: ইসলামী শরিয়াহ ও আলেম ওলামাদের সর্বসম্মত রায়কে বৃদ্ধাঙ্গুলী প্রদর্শন করার শামিল । তাছাড়া পীর-সূফীদের এই মহান গুরু মানসুর হাল্লাজ সম্পর্কে ইসলামী ইতিহাসের সবচেয়ে গ্রহণ কিতাব ইমাম ইবনে কাসীর রচিত ‘আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া’তে বলা হয়েছে:

قَالَ الْخَطِيْبُ فَأَمَّا الْفُقَهَاءُ فَحَكَي عَنْ غَيْرِ وَاحِدٍ مِنَ الْعُلَمَاءِ وَالْاَئِمَّةِ إِجْمَاعُهُمْ عَلَى قَتْلِهِ، وَأَنَّهُ قُتِلَ كَافِرًا، وَكَانَ كَافِرًا مُمْخَرِقًا

অর্থ: “খতীবে বাগদাদী বলেন: ফুকাহায়ে কেরামদের অনেকেই বলেছেন যে, হাল্লাজকে কতল করার ব্যাপারে ওলামাদের ইজমা হয়েছিল এবং কাফের হিসেবেই তাকে কতল করা হয়েছে । সে ছিল কাফের, মিথ্যাবাদী ।” (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া ১১খন্ড ১১৫পৃষ্ঠা।)

এর পর ইবনে কাসির (র:) হাল্লাজের কিছু ভন্ডামি উল্লেখ করেছেন । যার দ্বারা এর স্পষ্ট হয়ে যায় যে হাল্লাজ কোন আল্লাহওয়ালা ছিল না । বরং সে ছিল প্রতারক। তাই যারা মনসুর হাল্লাজকে অনুসরণ করছেন তাদের ভেবে দেখা উচিত । বিশেষ করে বিদায় নিহায়ার ১১খন্ডে উল্লেখিত মানসুর হাল্লাজের জীবনি সকলের পড়া উচিত ।

সূফীদের দলীল হিসাবে পেশ করা আবূ হুরাইরা (রা:) এর উপরোক্ত হাদীসটির জবাবে আমরা বলবো: ঐ হাদীসে মূলত আল্লাহর নুসরাত-সাহায্যের কথা বল হয়েছে। আল্লাহর সঙ্গে একাকার হয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়নি। হাদীসের শেষ অংশে তা স্পষ্ট করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে ‘সে যদি আমার কাছে কোন কিছু সাওয়াল করে, তবে আমি নিশ্চয়ই তাকে তা দান করি । আর যদি সে আমার কাছে আশ্রয় চায়, তবে অবশ্যই আমি তাকে আশ্রয় দেই ।’ স্বত্তাগতভাবেই যদি আল্লাহ সঙ্গে মিশে যায় তাহলে আবার আল্লাহর কাছে সাওয়াল করা বা আশ্রয় চাওয়ার প্রয়োজন কি? মূলত: এ জাতীয় বাক্যগুলো সাহায্য-সহানুভূতি করার ক্ষেত্রেই ব্যবহার করা হয়ে থাকে। যেমন প্রধানমন্ত্রী কাউকে বললো, যাও! অমুক কাজটা তুমি করো আমি তোমার সঙ্গে আছি। এর অর্থ হলো আমার সাহায্য-সহানুভূতি তোমার সঙ্গে থাকবে। এর মানে এই নয় যে, প্রধানমন্ত্রী তার সঙ্গে স্বত্তাগতভাবে মিশে যায়। এ বিষয়টি একটি সাধারণ লোকেও বুঝে । কিন্তু সূফিবাদীরা নিজেদের ভ্রান্ত মতের স্বপক্ষে হাদীসটিকে অপব্যবহার করে থাকে ।

হাত ধরে বেহেশতে নিয়ে যাওয়া:
পীরগণ বলেন তারা মুরীদদেরকে হাত ধরে বেহেশতে নিয়ে যাবেন বা পীরগণের সুপারিশে মুরীদরা বেহেশতে যাবে!
কিন্তু আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন,

“আর সেদিনের ভয় করো, যখন কেউ কারো সামান্য উপকারে আসবে না এবং তার পক্ষে কোন সুপারিশও কবুল হবে না; কারো কাছ থেকে কোন ক্ষতিপূরণ নেওয়া হবে না এবং তারা কোন সাহায্যও পাবে না”। (বাক্বারা ২:৪৮)

আল্লাহ তায়ালা বলেছেন:

فَالْيَوْمَ لَا يَمْلِكُ بَعْضُكُمْ لِبَعْضٍ نَّفْعاً وَلَا ضَرّاً وَنَقُولُ لِلَّذِينَ ظَلَمُوا ذُوقُوا عَذَابَ النَّارِ الَّتِي كُنتُم بِهَا تُكَذِّبُونَ

অর্থাৎ, আজকে (কিয়ামতের দিন) তোমাদের কেউ কাউকে উপকার কিংবা ক্ষতি করতে পারবে না। আর আমি অপরাধীদেরকে বলব-জাহান্নামের আগুনের স্বাদ গ্রহণ কর দুনিয়ায় যাকে তোমরা মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছ। (সুরা সাবা: ৪২)

অন্য আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন:

يَوْمَ لَا يُغْنِي مَوْلًى عَن مَّوْلًى شَيْئاً وَلَا هُمْ يُنصَرُونَ

অর্থাৎ, সেটি এমন দিন যেদিন কোন নিকটতম প্রিয়জনও কোন নিকটতম প্রিয়জনের কাজে আসবে না। আর তাদেরকে সাহায্যও করা হবে না। (সুরা দুখান:৪১)

আল্লাহ তায়ালা বলেন:

يَوْمَ لَا تَمْلِكُ نَفْسٌ لِّنَفْسٍ شَيْئاً وَالْأَمْرُ يَوْمَئِذٍ لِلَّهِ

অর্থাৎ, সেদিন এমন একটি দিন যখন কারও জন্য কোন কিছু করার সাধ্য থাকবে না। ফায়সালার ভার সেদিন একমাত্র আল্লাহ তায়ালার হাতেই থাকবে। (সুরা ইনফিতার:১৯)

এর পরেও পীরগণ কিভাবে বলেন, তারা মুরীদদের জন্য সুপারিশ করবেন? তাদেরকে হাত ধরে বেহেশতে নিয়ে যাবেন? আল্লাহ কি তাদেরকে পৃথিবী থেকেই জান্নাতের সার্টিফিকেট দিয়ে দিয়েছেন? হাত ধরে বেহেশতে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে তারা কি আল্লাহ’কে মিথ্যাবাদী (আল্লাহ ক্ষমা করুন) প্রতিপন্ন করছেন না?

আল্লাহ আমাদেরকে ভ্রান্ত পথ থেকে সরল সঠিক পথে আসার তওফীক দান করুন… আমীন।

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

৩৪টি মন্তব্য

  1. পীর তন্ত্র বিষয়ে পোষ্টটির ভিন্নরূপ ব্যাখ্যা করা হয়েছে ৷ যা পোষ্টকারির বিদ্যা ও গবেষণার কমতি আছে বলে মনে হচ্ছে ৷ পোষ্ট লেখার সময় তার মাথায় পীরের প্রতি হিংসা বিদ্বেষ ছিল বলে তার শুধু একটি চোখ খোলা ছিল ৷ সে পীরদের কথা নিয়ে একটু ভাবার চেষ্টা করেনি ৷ সে শুধুই তার মনোভাব প্রমাণ করার জন্য ব্যাস্ত ছিল ৷ যে ব্যাক্তি কথার সিয়াক -সাবাক বুঝেনা সে কি করে কলামিস্ট হতে চায় আমার বুঝে আসে না ৷

    1. কুরআন হাদীসে পীর মুরিদীর প্রমাণঃ-
      আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ
      করেছেন-
      ﻳَﺎ ﺃَﻳُّﻬَﺎ ﺍﻟَّﺬِﻳﻦَ ﺁَﻣَﻨُﻮﺍ ﺍﺗَّﻘُﻮﺍ ﺍﻟﻠَّﻪَ ﻭَﻛُﻮﻧُﻮﺍ ﻣَﻊَ ﺍﻟﺼَّﺎﺩِﻗِﻴﻦَ
      #অনুবাদ -হে মুমিনরা! আল্লাহকে ভয়
      কর, আর সৎকর্মপরায়নশীলদের সাথে
      থাক। {সূরা তাওবা-১১৯)
      এ আয়াতে কারীমায় সুষ্পষ্টভাবে
      বুযুর্গদের সাহচর্যে থাকার নির্দেশ
      দেয়া হয়েছে।
      ﺍﻫْﺪِﻧَﺎ ﺍﻟﺼِّﺮَﺍﻁَ ﺍﻟْﻤُﺴْﺘَﻘِﻴﻢَ ﺻِﺮَﺍﻁَ ﺍﻟَّﺬِﻳﻦَ ﺃَﻧْﻌَﻤْﺖَ ﻋَﻠَﻴْﻬِﻢْ
      অনুবাদ- আমাদের সরল সঠিক পথ
      [সীরাতে মুস্তাকিম] দেখাও। তোমার
      নিয়ামতপ্রাপ্ত বান্দাদের পথ। {সূরা
      ফাতিহা-৬,৭}
      সূরায়ে ফাতিহায় মহান রাব্বুল
      আলামীন তাঁর নিয়ামাতপ্রাপ্ত
      বান্দারা যে পথে চলেছেন সেটাকে
      সাব্যস্ত করেছেন সীরাতে মুস্তাকিম।
      আর তার নিয়ামত প্রাপ্ত বান্দা হলেন-
      ﺍﻟَّﺬِﻳﻦَ ﺃَﻧْﻌَﻢَ ﺍﻟﻠَّﻪُ ﻋَﻠَﻴْﻬِﻢْ ﻣِﻦَ ﺍﻟﻨَّﺒِﻴِّﻴﻦَ ﻭَﺍﻟﺼِّﺪِّﻳﻘِﻴﻦَ ﻭَﺍﻟﺸُّﻬَﺪَﺍﺀِ ﻭَﺍﻟﺼَّﺎﻟِﺤِﻴﻦَ
      #অনুবাদ -যাদের উপর আল্লাহ তাআলা
      নিয়ামত দিয়েছেন, তারা হল নবীগণ,
      সিদ্দীকগণ, শহীদগণ, ও নেককার
      বান্দাগণ। {সূরা নিসা-৬৯}
      এ দু’ আয়াত একথাই প্রমাণ করছে যে,
      নিয়ামতপ্রাপ্ত বান্দা হলেন নবীগণ,
      সিদ্দীকগণ, শহীদগণ, আর নেককারগণ,
      আর তাদের পথই সরল সঠিক তথা
      সীরাতে মুস্তাকিম। অর্থাৎ তাদের
      অনুসরণ করলেই সীরাতে মুস্তাকিমের
      উপর চলা হয়ে যাবে।
      যেহেতু আমরা নবী দেখিনি, দেখিনি
      সিদ্দীকগণও, দেখিনি শহীদদের। তাই
      আমাদের সাধারণ মানুষদের কুরআন
      সুন্নাহ থেকে বের করে সীরাতে
      মুস্তাকিমের উপর চলার চেয়ে একজন
      পূর্ণ শরীয়তপন্থী হক্কানী বুযুর্গের
      অনুসরণ করার দ্বারা সীরাতে
      মুস্তাকিমের উপর চলাটা হবে সবচেয়ে
      সহজ। আর একজন শরীয়ত সম্পর্কে প্রাজ্ঞ
      আল্লাহ ওয়ালা ব্যক্তির সাহচর্য গ্রহণ
      করার নামই হল পীর মুরিদী।
      রাসূলে কারীম (সাঃ) একাধিক স্থানে
      নেককার ব্যক্তিদের সাহচর্য গ্রহণ করার
      প্রতি গুরুত্বারোপ করেছেন। যেমন-
      ﻋﻦ ﺃﺑﻲ ﻣﻮﺳﻰ ﺭﺿﻲ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻨﻪ ﻋﻦ ﺍﻟﻨﺒﻲ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭ ﺳﻠﻢ
      ﻗﺎﻝ ‏( ﻣﺜﻞ ﺍﻟﺠﻠﻴﺲ ﺍﻟﺼﺎﻟﺢ ﻭﺍﻟﺴﻮﺀ ﻛﺤﺎﻣﻞ ﺍﻟﻤﺴﻚ ﻭﻧﺎﻓﺦ ﺍﻟﻜﻴﺮ
      ﻓﺤﺎﻣﻞ ﺍﻟﻤﺴﻚ ﺇﻣﺎ ﺃﻥ ﻳﺤﺬﻳﻚ ﻭﺇﻣﺎ ﺃﻥ ﺗﺒﺘﺎﻉ ﻣﻨﻪ ﻭﺇﻣﺎ ﺃﻥ ﺗﺠﺪ ﻣﻨﻪ
      ﺭﻳﺤﺎ ﻃﻴﺒﺔ ﻭﻧﺎﻓﺦ ﺍﻟﻜﻴﺮ ﺇﻣﺎ ﺃﻥ ﻳﺤﺮﻕ ﺛﻴﺎﺑﻚ ﻭﺇﻣﺎ ﺃﻥ ﺗﺠﺪ ﺭﻳﺤﺎ
      ﺧﺒﻴﺜﺔ )
      #অনুবাদ – হযরত আবু মুসা রাঃ থেকে
      বর্ণিত। রাসূল (সাঃ) ইরশাদ করেছেন-
      সৎসঙ্গ আর অসৎ সঙ্গের উদাহরণ হচ্ছে
      মেশক বহনকারী আর আগুনের পাত্রে
      ফুঁকদানকারীর মত। মেশক বহনকারী হয়
      তোমাকে কিছু দান করবে কিংবা তুমি
      নিজে কিছু খরীদ করবে। আর যে ব্যক্তি
      আগুনের পাত্রে ফুঁক দেয় সে হয়তো
      তোমার কাপড় জ্বালিয়ে দিবে, অথবা
      ধোঁয়ার গন্ধ ছাড়া তুমি আর কিছুই পাবে
      না।
      {সহীহ বুখারী, হাদীস নং-৫২১৪, সহীহ
      মুসলিম, হাদীস নং-৬৮৬০, মুসনাদুল
      বাজ্জার, হাদীস নং-৩১৯০, সুনানে আবু
      দাউদ, হাদীস নং-৪৮৩১, সহীহ ইবনে
      হিব্বান, হাদীস নং-৫৬১, মুসনাদে আবী
      ইয়ালা, হাদীস নং-৪২৯৫, মুসনাদে
      আহমাদ, হাদীস নং-১৯৬৬০, মুসনাদুল
      হুমায়দী, হাদীস নং-৭৭০, মুসনাদুশ
      শামীন, হাদীস নং-২৬২২, মুসনাদুশ
      শিহাব, হাদীস নং-১৩৭৭, মুসনাদে
      তায়ালিসী, হাদীস নং-৫১৫}
      :
      এছাড়াও অনেক হাদীস নেককার ও বুযুর্গ
      ব্যক্তিদের সাহচর্য গ্রহণের প্রতি
      তাগিদ বহন করে।
      আর সবচে’ বড় কথা হল-বর্তমান সময়ে
      অধিকাংশ মানুষই দ্বীন বিমুখ। যারাও
      দ্বীনমুখী, তাদের অধিকাংশই কুরআন
      হাদীসের আরবী ইবারতই সঠিকভাবে
      পড়তে জানে না, এর অর্থ জানবেতো
      দূরে থাক।
      আর যারাও বাংলা বা অনুবাদ পড়ে
      বুঝে, তাদের অধিকাংশই আয়াত বা
      হাদীসের পূর্বাপর হুকুম, বা এ বিধানের
      প্রেক্ষাপট, বিধানটি কোন সময়ের জন্য,
      কাদের জন্য ইত্যাদী বিষয়ে সম্যক
      অবহিত হতে পারে না। তাই বর্তমান
      সময়ে একজন সাধারণ মানুষের পক্ষে
      কুরআন সুন্নাহ থেকে নিজে বের করে
      আল্লাহ তাআলার উদ্দিষ্ট সীরাতে
      মুস্তাকিমে চলা বান্দার জন্য
      কষ্টসাধ্য। তাই আল্লাহ তাআলা সহজ পথ
      বাতলে দিলেন একজন বুযুর্গের পথ অনুসরণ
      করবে, তো সীরাতে মুস্তাকিমেরই
      অনুসরণ হয়ে যাবে।
      কিন্তু কথা হচ্ছে যার অনুসরণ করা হবে
      সে অবশ্যই সীরাতে মুস্তাকিমের পথিক
      হতে হবে। অর্থাৎ লোকটি {মুরশীদ বা
      পীর} এর মাঝে থাকতে হবে শরীয়তের
      পূর্ণ অনুসরণ। বাহ্যিক গোনাহ থেকে
      হতে হবে মুক্ত। কুরআন সুন্নাহ সম্পর্কে
      হতে হবে প্রাজ্ঞ। রাসূল সাঃ এর
      সুন্নাতের উপর হতে হবে অবিচল। এমন
      গুনের অধিকারী কোন ব্যক্তি যদি
      পাওয়া যায়, তাহলে তার কাছে গিয়ে
      তার কথা মত দ্বীনে শরীয়ত মানার
      নামই হল পীর মুরিদী। এরই নির্দেশ
      আল্লাহ তাআলা কুরআনে দিয়েছেন-
      ﻳَﺎ ﺃَﻳُّﻬَﺎ ﺍﻟَّﺬِﻳﻦَ ﺁَﻣَﻨُﻮﺍ ﺍﺗَّﻘُﻮﺍ ﺍﻟﻠَّﻪَ ﻭَﻛُﻮﻧُﻮﺍ ﻣَﻊَ ﺍﻟﺼَّﺎﺩِﻗِﻴﻦَ
      অনুবাদ-হে মুমিনরা! আল্লাহকে ভয় কর,
      আর সৎকর্মপরায়নশীলদের সাথে থাক।
      {সূরা তাওবা-১১৯)
      #বিঃদ্রঃ আখেরাতে নাজাত পাওয়ার
      জন্য মুরীদ হওয়া জরুরী নয়। তবে একজন
      হক্কানী পীরের কাছে মুরীদ হলে
      শরীয়তের বিধান পালন ও নিষিদ্ধ বিষয়
      ছেড়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে নিষ্ঠা আসে
      মুরুব্বীর কাছে জবাবদিহিতা থাকার
      দরুন। সেই সাথে আল্লাহর ভয়, ইবাদতে
      আগ্রহ সৃষ্টি হয়। পক্ষান্তরে বেদআতি,
      ভন্ড, মাজারপূজারী, বেপর্দা পীরের
      কাছে মুরিদ হলে ঈমানহারা হওয়ার সমূহ
      সম্ভাবনা থাকে। বিশেষ করে আটরশী,
      দেওয়ানবাগী, কুতুববাগী,
      মাইজভান্ডারী, রাজারবাগী, ফুলতলী,
      মানিকগঞ্জী, কেল্লাবাবা ইত্যাদী
      পীর সাহেবের দরবারে গেলে
      ঈমানহারা হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা
      রয়েছে। তাই সাবধান পীর নির্ধারণের
      ক্ষেত্রে।
      :

      1. ভাই পীরের মধ্যেই ফিরকা আছে তাই আসুন পিতলের অনুসরণ করি যাদের কথা কিতাব আল্লাহ রাসুলের কথা বলে এবং আমরা যাচাই করে দেখি তারা আসলে ও সঠিক বর্তমানে দেখা যায় হক্কানী পীরের নামে যারা বলে আমরা হক্কানী পীর তাদের বাপ দাদার লেখা এবং তাদের লেখা বইয়ে বিভিন্ন গুজব কাহিনী লেখা থাকে তাই আমরা এসব বাদ দিয়ে নেককার সলেহিন বান্দাদের কাছ থেকে ইসলামের কিছু শিখি এবং সেগুলো যাচাই করে মিলিয়ে নেই তারা কোরআন হাদিস থেকে বলছে কি না

  2. আর এ পথই আমার সরল পথ; সুতরাং তোমরা এ পথেরই অনুসরন কর। এ পথ ছাড়া অন্যান্য কোন পথের অনুসরণ করো না, অন্যথায় তোমাদেরকে তাঁর পথ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দূরে সরিয়ে দেবে, আল্লাহ তোমাদেরকে এই নির্দেশ দিলেন, যেন তোমরা বেঁচে থাকতে পার। (সূরা আন’আম আয়াত ১৫৩)

  3. এটা পীর সম্পর্কীত আমার পড়া প্রবন্ধগুলির মধ্যে অন্যতম ভাল প্রবন্ধ। এ’টি কম কথা, বেশী উদৃতি, ব্যক্তিগত বা দলগত আক্রমনহীন, সংগ্রহে রাখার মত একটি অনবদ্য প্রবন্ধ। দেরীতে হলেও এই লেখা পড়ে আমার অনেক তৃষ্ণা মিঠেছে। লেখককে ধন্যবাদ। আল্লাহ আপনাকে আরো বেশী বেশী ইসলামের খেদমত করার তৌফিক দান করুন………আমীন…………….

মন্তব্য করুন

আরিও দেখুন
Close
Back to top button