সাম্প্রতিক প্রসঙ্গ

কি শেখানো হচ্ছে পাঠ্যপুস্তকে?

(১)

ইসলাম বিষয়ে সাধারণ জ্ঞানটুকুও নেই কিন্তু ‘গুরুত্বপূর্ণ’ মতামত না দিলে ঘুমও হয় না— এমন মানুষেরা যখন ইসলাম নিয়ে লিখতে বসেন তখন তা যে কী জগাখিচুড়ি হয় তা পড়তে দিলে সাধারণ বোধ সম্পন্ন মানুষের হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরে যাবে।

আমাদের বাচ্চাদের জন্য প্রণীত নতুন পাঠ্যপুস্তকের অথৈবচ অবস্থা দেখে আমার সেই একই অনুভূতি হচ্ছে। এমন কিছু মানুষ আমাদের বাচ্চাদেরকে ইতিহাস, বিজ্ঞান আর ধর্ম শেখানোর দায়িত্ব নিয়েছেন যারা না বুঝেন ইতিহাস, না বুঝেন ধর্ম।

সপ্তম শ্রেণীর ‘ইতিহাস ও সামাজিক বিজ্ঞান-অনুশীলন বই’— এ ‘অবরোধবাসিনীর কাহিনী’ শিরোনামে কয়েকটা গল্প শোনানো হচ্ছে বাচ্চাদের। গল্পটা কী? চলুন শুনি:



‘এক বাড়িতে আগুন লেগেছিলো। গৃহিণী বুদ্ধি করে তাড়াতাড়ি সব গয়না একটা বাক্সে ভরে ঘরের বাইরে বের হলেন। দরোজায় এসে দেখলেন একদল পুরুষ আগুন নেভানোর চেষ্টা করছে। তিনি তাদের সামনে বের না হয়ে আবার ঘরের ভেতরে গিয়ে খাটের নিচে বসলেন। সেই অবস্থায় পুঁড়ে মরলেন। তবু পুরুষের সামনে বের হলেন না’।

‘পর্দা-প্রথাকে’ খাটো করার প্রয়াস যে এখানে স্পষ্ট সেটা বুঝতে রকেট সায়েন্স জানবার দরকার নেই। কিন্তু এই গল্প যারা রচনা করেছেন তাদের বুদ্ধিসুদ্ধি নিয়ে আমি বেশ দ্বন্ধে পড়ে গেলাম। ঘরে আগুন লেগেছে জেনে মহিলা সবার আগে খুঁজে গয়না বের করে সাথে নিলেন। আচ্ছা বলেন তো— মানুষ ঘরের কোথায় আসলে গয়না রাখে? সুরক্ষিত জায়গায় নিশ্চয়। এমন জায়গায় যেখানে সাধারণের নজর পড়বে না। চাবি ছাড়া খোলা যাবে না।

আগুন লাগার পরে মহিলা সেই সুরক্ষিত জায়গা থেকে গহনা বের করে বাক্সে ভরার মতো যথেষ্ট সময় পেলেও, বাইরে বেরুনোর জন্যে বোরকাটা গায়ে জড়ানোর মতো সময় উনি পেলেন না। বাইরে যে পুরুষ মানুষ থাকবেই তা তো উনার জানা কথাই। আবার, গল্প মতে পুরুষ মানুষের সামনে উনি বেপর্দা যাবেনও না। তাহলে বাইরে বেরুনোর জন্যে উনি সুরক্ষিত জায়গা থেকে চাবি দিয়ে খুলে গহনা বের করে, সেই গহনাকে বাক্সে ভরে নিতে পারলেও, ঘরের কোণায় থাকা আলনা বা ড্রয়ার থেকে বোরকাটা নিতে পারলেন না কেনো? খুব দূর্বল প্লট।

তারপর, একটা মহিলা প্রাণ বাঁচানোর মতো জরুরি মুহূর্তে পুরুষ মানুষ দেখে ফেলবে বিধায় বাইরে যাওয়ার চাইতে আগুনে পুঁড়ে মরাটাকে শ্রেয় মনে করেছে— এই শিক্ষাটা আদৌ ইসলামের কী না, এটা সেই সকল রচয়িতাদের কে বোঝাবে?

কিন্তু এসমস্ত কিছু তো আমাদের কোমলমতি শিশুরা বুঝবে না। তারা স্কুলে এসব পড়বে, পরীক্ষায় এসব লিখবে। তাদের অবচেতন মনে এগুলো গেঁথে যাবে যা তাদেরকে প্রভাবিত করতে পারে বাকি জীবনে।

(২)

আরেকটা জায়গায় দেখলাম একজন ‘শরিফ’ ভাই জীবনের একপর্যায়ে ‘শরীফা’ আপা হয়ে গেছেন। স্তব্ধ না হয়ে উপায় নেই! ছোট ছোট বাচ্চাদের শেখানো হচ্ছে লিঙ্গভেদে নারী-পুরুষ নির্ধারিত হয় না, মনের খেয়াল-ভেদে নির্ধারিত হয় কে ছেলে আর কে মেয়ে! আস্তাগফিরুল্লাহ! আয়োজন করে আমাদের উঠতি প্রজন্মকে কী এক ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।

পশ্চিমের ‘ট্রান্সজেন্ডার’ টেণ্ডেন্সি, যা আবার বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের ব্যবসাপাতির হাতিয়ার, সেই সমস্ত আবর্জনা কীভাবে বাচ্চাদের পাঠ্যবইয়ে জায়গা পায়?

এই ট্রান্সজেণ্ডার টেন্ডেন্সি, অর্থাৎ সার্জারী করে লিঙ্গ পরিবর্তন করে ছেলে মেয়েতে পরিণত হওয়া, মেয়ে ছেলেতে পরিণত হওয়া— এটা শয়তানের একটা স্পষ্ট কৌশল মানবজাতিকে বিভ্রান্ত করার। সূরা আন-নিসার ১১৯ নম্বর আয়াতে শয়তান ওয়াদা করেছিলো চারভাবে সে মানুষকে ধোঁকায় ফেলবে, তন্মধ্যে একটা হলো— আল্লাহর সৃষ্টিকে বিকৃত করার কাজে সে ওয়াসওয়াসা দিবে। সার্জারীর মাধ্যমে লিঙ্গ পরিবর্তন স্পষ্ট আল্লাহর সৃষ্টিকে বিকৃত করার নামান্তর। আমাদের বাচ্চারা পাঠ্যবই পড়ে এমন শয়তানি কাজে উদ্বুদ্ধ হবে এটা মেনে নেওয়া যায়?

(৩)

অভিভাবকদের সমীপে সবচেয়ে বড় আর্জিটা জানাতে চাই। দুনিয়াটা আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই। ছোট-বড় সকলের জন্যই পদে পদে অপেক্ষা করে আছে ফিতনা। নিজেকে হেফাযত তো অবশ্যই, বাচ্চাকাচ্চা মানুষ করা যেকোন সময়ের চাইতে এখন অনেক অনেকবেশি কঠিন।

বাচ্চাকে পাঠ্যপুস্তকে ভালোকিছু পড়ালাম, কিন্তু খেলার নাম করে সে যাদের সাথে মিশে তারা তাকে কী শেখায় আর কী দেখায় তার খোঁজ আমরা রাখি? সে হয়তো ভালো সার্কেলে মিশছে, কিন্তু তার হাতে থাকা স্মার্টফোন কিংবা কম্পিউটারে সে কীভাবে সময় পার করে— সে ব্যাপারে আমরা কি ওয়াকিবহাল?

ফিতনার এমন চূড়ান্ত সময়ে নিজেকে আর নিজের ভবিষ্যতকে বাঁচাতে হলে সতর্কতা, সচেতনতার বিকল্প নেই। পরিবারগুলোতে বাচ্চাদের যদি আমরা সঠিকভাবে পরিচর্চা করতে পারি, সঠিক ইতিহাস, সঠিক মূল্যবোধ যদি আমরা ছোটবেলা থেকেই তাদের শেখাতে পারি— আসন্ন ক্ষতি অনেকাংশেই আটকানো সম্ভব। সবচেয়ে বড় ব্যাপার হলো— বাচ্চারা কিন্তু আমাদের দেখে দেখেই শেখে। বাচ্চাকে ‘ভালো’ বানাতে গেলে সবার আগে আমাকেই ‘ভালো’ হতে হবে— এটা যতো দ্রুত আমরা বুঝবো, ততোই মঙ্গল।

আরও দেখুন:  বই: চার ইমামের আক্বীদা

– আরিফ আজাদ

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

মন্তব্য করুন

Back to top button