সাম্প্রতিক প্রসঙ্গহাইলাইটস

ইডেন কলেজ এবং সেক্স স্লেভারি

ইডেনের ঘটনায় দুই ধরণের প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে –

  1. সিরিয়াস প্রতিক্রিয়া : এই সেক্স স্লেভারির বিরুদ্ধে কথা বলতে হবে।
  2. ফান প্রতিক্রিয়া – ট্রল, মেমে ও অন্যান্য।

প্রথম প্রতিক্রিয়ার ব্যাপারে কিছু কথা :

আমার আম্মা অনেক বছর ইডেনের শিক্ষক ছিলেন, ইডেন থেকেই প্রফেসর হিসেবে অবসরে যান।

আম্মা যখন প্রথম জয়েন করেন তখন তিনি বিএনপির তৎকালীন এমপি নাসিরুদ্দিন পিন্টু কেন রাতের বেলা ছাত্রী হলে রাত কাটাবে এটা নিয়ে কথা বলে প্রিন্সিপালের বিরাগভাজন হয়েছিলেন।

তাই দোষটা শুধু ছাত্রলীগের না বরং ক্ষমতার। ক্ষমতা খাটিয়ে বিএনপির লোকজনও পিম্পগিরি করত। ছাত্রলীগ বেশিদিন ক্ষমতায় থাকার সুবাদে দেহব্যবসাকে জাপানি কাইজেন লেভেলের এফেকটিভনেসে নিয়ে গেছে। টাকা বা ক্ষমতার দ্বন্দ্ব না হলে এটা পাবলিক হতো না।

আমি কয়েকদিন আগে একজন প্রাইভেট ভার্সিটির শিক্ষকের কাছ থেকে জানতে পারি তাদের ভার্সিটি থেকে কোনো কোনো মেয়েকে আর্থিক সুবিধা মানে বেতনে ছাড় এবং কাউকে ভালো গ্রেডের বিনিময়ে বিভিন্ন পুরুষের কাছে রাত্রিযাপনের জন্য প্লেসমেন্টে পাঠানো হয়।

যেসব মেয়েরা এই সার্ভিস দেয় তারা কে কতটা বাধ্য হয়ে দেয় আর কতটা মজা পেতে দেয় – এটা আমি জানি না।

সমাজ যখন খারাপ হয়, তখন পুরুষ একা খারাপ হয় না, মেয়েরাও খারাপ হয়।

কতটা অভাব থাকলে শরীর বেচা জাস্টিফাইড – এটা নিয়ে কথা বলতে আমার প্রবৃত্তি হয় না – কারণ বাংলার আনাচেকানাচে ঘোরার সুবাদে আমি যে দরিদ্রতা দেখেছি সেটা খুব কম মানুষই দেখেছেন।

সব গরীব শরীর বেঁচে না – কষ্ট করে বেঁচে থাকে, ভিক্ষা করে জীবন ধারণ করে কিন্তু শরীর বেঁচে দেয় না। শরীর বেঁচে তারাই যারা আরামে থাকতে চায়। কায়িক শ্রম এবং দারিদ্রের ওপরে তারা ‘ভালো থাকা’কে বেছে নেয়। এই ভালো থাকা আদতে কতটা ভালো থাকা সেটা অবশ্য এই গাড্ডায় না ঢুকলে তারা বুঝতে পারে না। পরে যখন বোঝে তখন গাড্ডা থেকে বের হওয়াটা কষ্টকর।

সেকুলার-বাম-প্রগতিবাদীদের একটা বড় অ্যাজেন্ডা হচ্ছে দেহব্যবসাকে স্বাভাবিক করে দেখানো। ‘ব্যাচেলর পয়েন্ট’ নাটকে ‘… অ্যাই যৌনকর্মীর ছেলে … ‘ – গালিটা ট্রেন্ডে পরিণত হচ্ছে কেন? ‘যৌনকর্ম’ও একটা পেশা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার ব্যাপারে এদেশে এনজিও অ্যাকটিভিজম পর্যন্ত আছে।

আরও দেখুন:  এ যেন ‘অন্ধ ছেলের নাম পদ্মলোচন’!

আমি এমন টিশার্ট পর্যন্ত দেখেছি যাতে পতিতাবৃত্তির ব্যাপারে লেখা আছে –

“দেহ খাটিয়ে খাই, শ্রমিকের মর্যাদা চাই।”

যারা ইডেনের ঘটনাটাকে সেক্স স্লেভারি বা ধর্ষণের সমমানের বলে বলছেন, তারা এই ঘটনার পেছনে সেকুলার ভিত্তিটা কেন উপেক্ষা করছেন তা বোধগম্য নয়।

যত সেক্স স্লেভারি, পতিতাবৃত্তি, ফ্রি সেক্স – সব কিছু সমাজের ডি-ইসলামাইজেশন এবং সেকুলারাইজেশনের ফসল।

নারীবাদিরা টিপ পরার অধিকার নিয়ে হাউকাউ করে পুলিশ কন্সটেবলের চাকরি খেয়ে দিলেও ইডেনের ব্যাপারে কেন নীরব – এটা বোঝার বুদ্ধি তো আপনার থাকার কথা। তারা পতিতা হতে চায়, করতে চায়, বানাতে চায়। এটার বিরুদ্ধে তারা কথা বলবে না – এটাই তো স্বাভাবিক।

দ্বিতীয় প্রতিক্রিয়ার ব্যাপারে কিছু কথা :

জীবনে কোনো কিছুই সিরিয়াসলি না নেওয়ার প্রবণতা আমাদের জেনারেশনে তৈরি করা হয়েছে পপুলার কালচারের মাধ্যমে।

‘Why Serious, just chill!’

কিংবা

‘মেয়েটা হঠাৎ রেগে গেলে কেন?’

– এগুলো কিছু উদাহরণ, আরো অনেক আছে।

যারা এই ফান প্রতিক্রিয়ার প্রতিপ্রতিক্রিয়াও দেখাচ্ছেন তারা রুট কসটা মিস করে যাচ্ছেন – কেন পুরুষেরা মেয়েদের হয়রানি বা কষ্টকে কষ্ট হিসেবে দেখছে না।

কারণ পুরুষরা মেয়েদের সম্মান করে না।

আমি সেন্ট যোসেফ স্কুল, কলেজ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। বিশ্বাস করেন, আমি জীবনে কোথাও মেয়েদের সম্মান করার শিক্ষা পাইনি।

আমরা শিখেছি মেয়েরা ছেলেদের সমান, কিছু ক্ষেত্রে মেয়েরা ছেলেদের থেকে এগিয়ে – কারণ তারা ভালো রেজাল্ট করে – আমরা করি না।

মেয়েরা উইক, তাদের প্রটেক্ট করার দরকার – এই কনসেপ্ট এর বিরুদ্ধে আমাদের বয়ান দেওয়া হয়েছে। যে আমার কম্পিটিটর তাকে তো সম্মান করার কিছু নাই বরং মারি অরি পারি কৌশলে – এটাই মহাভারতের শিক্ষা; হোক সে ছেলে বা মেয়ে।

ছেলে-মেয়ে সম্পর্ক কতটা ক্যাজুয়াল হয়ে গিয়েছিল আমাদের সময়েই তার একটা উদাহরণ দিই। ইউনিভার্সিটিতে থাকতে এক ক্লাসমেট মেয়ে আমাকে কোনো একটা ইস্যুতে লাথি মেরেছিল।

আরও দেখুন:  অক্টোবর বিপ্ল­ব (গর্বাচেভ কি বিশ্বাসঘাতক?)

মুখে ফাজলামো এক জিনিস আর লাথি মারা অন্য জিনিস। তখন আমি খুব ইসলাম বুঝি এমন না কিন্তু তাও আমার আত্মসম্মানবোধ ভয়ংকরভাবে আঘাত পেয়েছিল। আমি তাকে প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য লাথি মারিনি আউট অফ মাই ডিসেন্সি কিন্তু তার সাথে বহুদিন কথা বলিনি। এখনকার ভার্সিটির পরিবেশ এবং পরিস্থিতি নিয়ে ভাবতে গেলেও আসলে আমার ভয় লাগে।

আমার বিয়ের পরেও মেয়েদের ব্যাপারে এই ধারণা আমার মধ্যে ছিল। আমি আমার বন্ধুদের মতো সিহিন্তার পিঠে জোরে একটা থাপ্পর মেরে আবিষ্কার করলাম সে ব্যাথা পায়, মজা পায় না – যেটা ছেলে বন্ধুরা পেত।

আমি আবিষ্কার করলাম আমার পুরুষবন্ধুদের সাথে আমার আচরণ আমি তার সাথে করি – এটা সে একেবারেই পছন্দ করে না। আমার ছোটভাইয়ের সাথে মিলে সিহিন্তাকে পচাই এটাতে সে কষ্ট পায়। সে বন্ধুত্বমূলক সম্পর্ক চায় ঠিক কিন্তু সম্মান চায় আরো বেশি।

মেয়েদের সম্মান করতে হয়, তারা সম্মান চায় – এটা আমাকে শিখিয়েছে সিহিন্তা।

আমার বিবাহিত জীবনের ১৩ বছর ধরে আমি নিজেকে ট্রেইন করে এখন এই অবস্থায় এনেছি যে আমি মেয়েদের আপা বলি, কমবয়সী মেয়েদের মা বলি, এবং সবাইকে আপনি করে বলি।

মেয়েদের সম্মান করা এবং প্রটেকশন দেওয়া – এই দুটো কনসেপ্ট ইসলামি কনসেপ্ট। সেকুলার সমাজ এবং চিন্তা – এই দুটো কনসেপ্টের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে।

সে মেয়েদের পণ্য হিসেবে মার্কেটে তোলে এবং সেলস টুল হিসেবে ব্যবহার করে। সম্মান করলে এটা করা যাবে না। আর প্রটেকশন দেওয়া মানে তো মেয়েরা ছেলেদের সমান – এই দর্শনের সরাসরি কুফরি – সুতরাং সেকুলাররা ঘাড় ত্যাড়া করে মেয়েদের ক্যারাতে শেখাতে বলে যাবে। কখনও ছেলেদের বলবে না – মেয়েদের নিরাপত্তা দাও।

সমাজ এখন এভাবেই চলছে।

এখন আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে – আমি আপনি কি সেকুলার সমাজে থাকব না ইসলামি সমাজে থাকব।

আরও দেখুন:  হোদায়বিয়ায় রাসূল (ছাঃ)-এর মু‘জেযা এবং ছাহাবীগণের অতুলনীয় বীরত্ব

ইসলামি সমাজে থাকলে মুসলিম ছেলেদের দায়িত্ব দিতে হবে মেয়েদের সম্মান এবং নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য। একই সাথে মেয়েদের সেকুলার শিক্ষা, সেকুলার কর্মস্থলের দুনিয়াবি উচ্চাকাংখা ত্যাগ করতে হবে কারণ মুসলিম পুরুষরা কো-এডুকেশনে বা ফ্রি-মিক্সিং জবে থাকা মেয়েদের সম্মান এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে না।

এখানে একটা ট্রেড অফ আছে – সম্মান না টাকা? নিরাপত্তা না জনপ্রিয়তা?

একই সাথে সেকুলার এবং ইসলামি – হওয়া যাবে না। সিদ্ধান্তটা বোনদের নিতে হবে।

আর মুসলিম পুরুষদেরও স্ত্রী, বোন, মা এবং কমিউনিটির বোনদের ইজ্জত, সম্মান এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তার দায়িত্ব নিতে হবে। হাবা-গোবা-অপদার্থ হয়ে থাকলে হবে না। সেকুলার এবং বিপদ সংকুল সমাজের সাথে মুখোমুখি হয়ে রিযক বের করে আনার দায়িত্ব আপনার-আমার, মেয়েদের না।

কাওয়ামুন আলান নিসা এর সাথেই আছে অর্থ খরচের ব্যাপারটা। এখানে দুর্বলতা এবং অলসতার কোনো সুযোগ নাই। দাড়ি আছে বলে পারি না – বলে সমাজের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে দায়িত্ব অবহেলার সুযোগ নাই।

আর সম্মানের ব্যাপারটা প্র্যাকটিসের ব্যাপার। আগে সম্মানের ব্যাপারটা বুঝতে হবে – তারপর নিজেকে শেখাতে হবে। তাহলে আমাদের ছেলেরাও শিখবে।

ছেলে-মেয়ে সমান না। ছেলে-মেয়ের মধ্যে জেন্ডার ডিফারেন্স থাকবেই – ইসলামের এই কথাগুলো মানুষের কাছে স্পষ্ট করতে হবে।

এরপর মানুষ তার ফ্রি উইল দিয়ে বেছে নিক – সেকি দুনিয়াতে নিরাপত্তা-সম্মান এবং আখিরাতে জান্নাতের পথে চলবে না দুনিয়াতে চুলোচুলি-সেক্স স্লেভারি এবং পরিবারহীনতাসহ আখিরাতে জাহান্নামের পথে চলবে।

Md Sharif Abu Hayat

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

মন্তব্য করুন

Back to top button