সাম্প্রতিক প্রসঙ্গ

পথে চলতে

আমার বাসার খুব কাছেই সবুজে ঘেরা সুন্দর একটা জায়গা আছে। এর পাশে সুন্দর একটা মসজিদ। মসজিদের সামনে শান বাঁধানো পুকুর ঘাট। পুকুরের চারপাশে অনেক গাছগাছালি আর হাঁটার জায়গা। মসজিদের গা ঘেঁষে বিশাল খেলার মাঠ। ছোট ছোট ছেলেরা প্রতিদিন সেখানে খেলাধুলা করে।

যেদিন আবু আওয়ানের ছুটি থাকে সেদিন বিকালবেলা আমরা হাটতে বের হই। আলহামদুলিল্লাহ ইট পাথরের শহরে ঐ জায়গাটাকে আমার মনে হয় এক টুকরো শান্তির পরশ। সেখানে অনেকেই হাঁটাহাঁটি করে, কেউ আবার পুকুরপাড়ে বসে থাকে, বাচ্চাদের অনেকেই ছোট সাইকেল চালায়।

প্রায় সময় প্রবেশ পথে দু’জন নিরাপত্তারক্ষী থাকে যাতে কোন রিক্সা না গাড়ি ঢুকতে না পারে। তারপরও কিছু মানুষ সিকিউরিটির চোখ ফাঁকি দিয়ে গাড়ি নিয়ে ঢুকে পরে।

যা হোক, আসল ঘটনায় আসি। গতকাল বিকেল বেলা গিয়েছিলাম সেখানে। আমরা যাওয়ার কিছুক্ষণ পর হঠাৎ করেই একটা প্রাইভেট কার খুব জোরে গান বাজাতে বাজাতে ওখানে ঢুকে পড়ল। মেয়েটা ওর বাবার সাথে পেছনে ছিল। ভাবছিলাম মেয়েকে বলবো যে কানে হাত দিয়ে দ্রুত হাঁটো। পেছনে তাকিয়ে দেখি মেয়ে অলরেডি কানে হাত গুঁজে দ্রুত পায়ে হেঁটে আমার দিকে এগিয়ে আসছে। মনে মনে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করলাম। আর ভাবতে লাগলাম, আল্লাহ না করুক এই মুহূর্তে যদি প্রাইভেট কারটা কোনো অ্যাক্সিডেন্টের স্বীকার হয় তাহলে কী অবস্থা হবে? একটা হারাম কাজ করতে করতে ঐ মানুষগুলো রবের কাছে ফিরে যাবে! কতই না দুঃখজনক! আল্লাহ মাফ করুন।

এবার আসি গতকাল উত্তরায় ঘটে যাওয়া ঘটনায়। নববিবাহিত দম্পতি, সাথে একজন পুরুষ একজন মহিলা আর দুটো বাচ্চা যাচ্ছিল গাড়িতে করে। নিশ্চয়ই ওরা খুব আনন্দে ছিল! দু’চোখ ভরা অনেক স্বপ্ন ছিল! কিন্তু মুহূর্তেই সেটা একটা দুঃস্বপ্ন হয়ে উঠল! হঠাৎ করেই ক্রেন থেকে একটা গার্ডার পড়ে যায় ওদের গাড়ির উপর। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রজিউন।

আরও দেখুন:  এক ডিভোর্সি বোনের খোলাচিঠি

ভিডিওটা দেখে সেই জায়গায় নিজেকে কল্পনা করে আঁতকে উঠেছিলাম। মাত্র এক সেকেন্ড আগেও তারা কল্পনা করতে পারেনি যে তাদের সাথে এরকম একটা ঘটনা ঘটবে!

ভিডিওটা দেখে বারবার একটা কথাই মনে হচ্ছে। ওরা কি ঘর বের হওয়ার সময় দোয়া পড়ে বেরুতে পেরেছিল? সফরের সুন্নত গুলো কি ওরা জানত? মৃত্যুর আগে কি ওদের মনে একটুও খটকা লেগেছিল? ওরা কি আল্লাহর কাছে সন্তুষ্টচিত্তে ফিরে গেছে?
আল্লাহু আকবার। রাস্তায় বের হলে কানে ইয়ারফোন গোঁজা মানুষ চোখে পড়বে না তা হয় না। বাস, ট্রেন, গাড়ি–যেদিকে চোখ যায় প্রায় সবার কানে ইয়ারফোন। কেউ গান শুনছে, কেউ মুভি দেখছে, কেউ নাটক দেখছে, কেউবা আবার গেমস নিয়ে ব্যাস্ত। আবার যাদের নিজেদের প্রাইভেট কার আছে তারা জোরে জোরে গান বাজিয়ে নিজেরাও হারামে ডুবে থাকছে অন্যদেরকেও হারাম শুনিয়ে নিজেকে স্মার্ট প্রমাণ করার চেষ্টায় মত্ত থাকছে।

আবার এর ব্যাতিক্রমও আছে। অনেকেই চলতি পথে জিকির করে, দ্বীনি আলোচনায় মত্ত থাকে। কিছু মানুষ পকেট কুরআন সাথে রাখে জ্যামে বসে পড়ার জন্য। কানে ইয়ারফোন লাগিয়ে অনেকেই কুরআন তেলাওয়াত বা ইসলামিক লেকচার শোনে।

আল্লাহই ভালো জানেন কত উত্তম মৃত্যু কুরআন তেলাওয়াত শুনতে শুনতে মৃত্যুবরণ। সুবহানাল্লাহ!

আর যদি ইয়ারফোন লাগিয়ে মিউজিক ভিডিও দেখতে দেখতে কারো মৃত্যু এসে যায়? আল্লাহ মাফ করুন আমি আর কল্পনা করতে পারছি না। আল্লাহ সকলকে হেদায়েত দান করুন।

আচ্ছা রাস্তায় বের হলেই আমরা এত বেপরোয়া হয়ে যাই কেন? যানজট, প্রতিযোগিতা, কার আগে কে যাবে পাল্লা দেওয়া! একটুতেই গালিগালাজ, চিল্লাচিল্লি, মারামারি! আচ্ছা এগুলো করলেই কি স্মার্ট হওয়া যায়? কিংবা গেমস খেললে, মুভি দেখলে, ইয়ারফোন গুঁজে গান শুনলে?

আল্লাহ মাফ করুন। স্মার্ট তো সে-ই, যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সুন্নাহ মেনে চলে। স্মার্ট তো তাকেই বলা যায় যে আল্লাহ জিকিরে মগ্ন থেকে প্রকৃত ঈমান নিয়ে আল্লাহর কাছে ফিরে যেতে পারে।

আরও দেখুন:  ইহুদি হয়েও আমি কেন ইসরাইলকে সমর্থন করি না

আল্লাহ সুবহানু ওয়া তায়ালা আমাদের জন্য কতই না সুন্দর জীবনব্যবস্থা দান করেছেন। জীবিকার তাগিদে, বিভিন্ন প্রয়োজনে, দাওয়াতে, বিপদ-আপদে আমাদের প্রতিনিয়ত বাড়ির বাইরে যেতে হয়। বাড়ি থেকে বাইরে বের হওয়ার সময় দুআ পড়ে বের হতে বলা হয়েছে। সালাম দিয়ে ঘরে প্রবেশের কথা বলা হয়েছে।

চলতি পথে, সফরকালে কী করতে হবে তাও আল্লাহ তা’আলা বলে দিয়েছেন। সর্বাবস্থায় জিকির দ্বারা জিহ্বাকে সিক্ত রাখতে বলেছেন।

তিনি বলেন, ‘হে ঈমানদারগণ, তোমরা আল্লাহকে অধিক পরিমাণে স্মরণ কর’। [১]

কেন বলেছেন? কারণ আমাদের কার, কীভাবে, কোন অবস্থায় মৃত্যু হবে আমরা কেউ জানিনা। আল্লাহর জিকির করা অবস্থায় রাস্তাঘাটে/ বাসে/ট্রেনে/গাড়িতে/লিফটে/আগুনে পুড়ে যদি কারো মৃ-ত্যুও এসে যায় তাহলেও যেন সে নাজাত পায়। অথচ আমরা নিজেরাই নিজেদেরকে কঠিন পরিণতির দিকে নিয়ে যাই। আল্লাহ মাফ করুন।

জাবির রা. বলেন, ‘আমরা যখন উপরের দিকে উঠতাম, “আল্লা-হু আকবার” ও যখন নিচের দিকে নামতাম তখন “সুবহানাল্লাহ” বলতাম।’ [২]

অন্য হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, হজরত ইবনে উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সৈন্যবাহিনী যখন উঁচু জায়গায় চড়তেন তখন ‘আল্লাহু আকবার’ বলতেন। আর যখন নিচু জায়গায় নামতেন তখন ‘সুবহানাল্লাহ’ বলতেন।[৩]

সুতরাং সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠার সময়, নামার সময়, পায়ে হেঁটে অথবা গাড়িতে চলার ক্ষেত্রে উপরে যাওয়ার সময় আল্লাহর বড়ত্ব প্রকাশে তাকবীর এবং নিচে নামার সময় আমরা খুব সহজ এই সুন্নতের অনুশীলন করতে পারি।

আর সমতল রাস্তায় চলতে-ফিরতে, আলহামদুলিল্লাহ, সুবহানাল্লাহ, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু, আল্লাহু আকবার আর আস্তাগফিরুল্লাহ-কে আমাদের জিহ্বার অভ্যেস বানিয়ে নিই। আল্লাহ তৌফিক দান করুন আমিন।

– শেফাত-ই-সুলতানা

১। [সুরা আহযাব : ৪১]
২। [বুখারী হা/২৯৯৩]
৩। [আবু দাউদ ২৫৯৯, মুসলিম ১৩৪২, তিরমিজি ৩৪৪৭]

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

মন্তব্য করুন

Back to top button