ফানুস উড়ানো : ভয়াবহ বিপর্যয়ের সম্ভাবনা

ফানুস হল কাগজে তৈরি একটি ছোট উষ্ণ বায়ু বেলুন, যেখানে নিচের দিকে একটি ছিদ্রে একটি ছোট অগ্নিকুণ্ড স্থাপন করা থাকে। এশিয়া এবং বিশ্বের সর্বত্র, বহু শতাব্দী ধরে ঐতিহ্যগতভাবে ফানুস তৈরি করা হয়েছে যা খেলা বা প্রাচীন উৎসবের অংশ হিসাবে উড়ানো হয়েছে। আকাশ লণ্ঠন নামটি একটি চীনা শব্দের অনুবাদ কিন্তু এটিকেআকাশ মোমবাতি বা অগ্নি বেলুন নামেও উল্লেখ করা হয়েছে।
ফানুস উড়ানোর সূচনা যেভাবে
বৌদ্ধ পরিভাষায় এর নাম হলো, ‘আকাশ-প্রদীপ’। রাজকুমার সিদ্ধার্থ (পরবর্তীতে গৌতম বুদ্ধ) জাগতিক সকল দুঃখমুক্তি লাভের আশায় রাজ্য, রাজত্ব, ভোগ-বিলাস, ধনকুম্ভ সব ত্যাগ করে সংসার পরিত্যাগ করেছিলেন শুভ আষাঢ়ী পূর্ণিমা তিথিতে। তিনি সারথি ছন্দককে সঙ্গে নিয়ে অশ্ব কন্থকের পিঠে চড়ে অনোমা নদীর তীরে পৌঁছালেন। রাজ-আবরণ ছন্দককে বুঝিয়ে দিয়ে তিনি সন্ন্যাস-ব্রত গ্রহণ করলেন। এরপর ভাবলেন, ‘আমি এখন সন্ন্যাসী, রাজকীয় বাহারি চুল কী-বা প্রয়োজন?’
তরবারি দিয়ে চুলের গোছা কেটে নিয়ে মনে মনে অধিষ্ঠান করলেন, ‘যদি বুদ্ধ হওয়ার মতো গুণ আমার মধ্যে থেকে থাকে তাহলে ঊর্ধ্বদিকে নিক্ষিপ্ত চুলের গোছা মাটিতে না পড়ে আকাশে স্থিত থাকুক।’
এই সংকল্প করে তিনি চুলের গোছা উপরের দিকে নিক্ষেপ করলেন। বড়ই আশ্চর্যের ব্যাপার! একটা চুলও মাটিতে পড়ল না। বৌদ্ধধর্ম মতে, স্বর্গের ইন্দ্ররাজা চুলগুলো হীরা, মণি, মানিক্যখচিত স্বর্ণপাত্রে ধারণ করে তাবতিংস স্বর্গে উক্ত কেশ-ধাতু স্থাপন-পূর্বক একটি চৈত্য নির্মাণ করেন এবং এই চৈত্যের নাম রাখা হয় ‘চুলামনি চৈত্য’। স্বর্গের দেবতারা এখনও এর পূজা করে থাকেন। কিন্তু মর্ত্যরে বুদ্ধভক্ত পূজারীরা স্বর্গে তো আরোহণ করতে পারেন না। তাই তারা পরম শ্রদ্ধায় কাগুজে ফানুস তৈরি করে একটি বিশেষ দিনে ধর্মীয় রীতি-নীতি মেনে চুলামনি চৈত্যকে পূজা করার উদ্দেশ্যে আকাশ-প্রদীপ হিসেবে ফানুস বাতি উত্তোলন করে থাকেন। ধর্মীয় গাথা বা মন্ত্র পাঠ করে উৎসর্গ করে খালি পায়ে বৌদ্ধরা ফানুস উড়িয়ে দেন। মন্ত্রপাঠের মাধ্যমে সাধু-ধ্বনির সুরে সুরে ফানুস উড়ানো হয়। আষাঢ়ী পূর্ণিমাতে বৃষ্টি ও আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকায় অনেক সময় ফানুস ওড়ানোর পরিবেশ এবং সুযোগ কোনোটিই থাকে না। তাই প্রবারণা পূর্ণিমা বা আশ্বিনী পূর্ণিমায় দিনে ফানুস ওড়ানো হয়।
ফানুসের ক্ষতিকর দিকসমূহ
- ফানুস জ্বলন্ত অবস্থায় মাটিতে পড়লে অগ্নিকান্ডের ঝুঁকি সৃষ্টি হয়।
- ফানুসটি হেলে পড়লে (বায়ুপ্রবাহ অথবা কোন কিছুর সাথে ধাক্কা লাগার ফলে), এটিতে বাতাসে ভাসমান অবস্থাতেই আগুন লেগে যেতে পারে।
- ফানুসে থাকা কেরোসিন বাতি না নিভেই বিভিন্ন জায়গায় পড়তে পারে। এতে আগুন লাগাসহ বিভিন্ন ধরনের নিরাপত্তাজনিত হুমকি তৈরি হয়।
- ফানুস মাটিতে পড়ার পর, অবশিষ্ট পাতলা তারের ফ্রেম খুব ধীরে ধীরে ক্ষয় হয়, যা বন্য প্রাণীরা গিলে ফেললে তা বিপদের কারণ হতে পারে।
- ফানুস বিমানচালনার সময় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
ফানুসের কারনে সৃষ্ট অগ্নিকান্ড
- ২০১৩ সালের ১লা জুলাই ইংল্যান্ডের ওয়েস্ট মিডল্যান্ডসে সেখানকার ‘ সবথেকে বড় অগ্নিকান্ডে ‘ ১০০,০০০ টন পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপাদান পুড়ে যায় এবং আনুমানিক ছয় মিলিয়ন পাউন্ডের সমপরিমাণ ক্ষতি হয়। স্মেথউইকের একটি প্লাস্টিকের রিসাইক্লিং প্লান্টে জ্বলন্ত ফানুস এসে পড়ায় এই আগুনের সূত্রপাত ঘটে। ফানুসের কারণে আগুন লাগার ছবি সিসিটিভি ক্যামেরায় ধরা পড়ে। এ ঘটনার প্রতিক্রিয়ায়, পাউন্ডল্যান্ড ফানুস বিক্রি বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয় এবং ২০১৩ সালের ৬ই জুলাই তাদের সমস্ত মজুদ সরিয়ে নেয়।
- ২০১৮ সালে ব্রাজিলের রিও ডি জেনেইরো শহরের কাছে রিওসেন্ট্রো কনভেনশন সেন্টারের একটি প্যাভিলিয়নের ছাদে জ্বলন্ত ফানুস এসে পড়ায় প্যাভিলিয়নটি সম্পূর্ণরূপে ভস্মীভূত হয়।
- ২০২২ ইংরেজি নববর্ষ উদযাপনে ওড়ানো ফানুসে ঢাকার অন্তত ১০টি স্থানে আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছে। আবাসিক ভবনের পাশাপাশি পুরান ঢাকার ধোলাইখাল এলাকার কয়েকটি দোকানে আগুন লেগেছে।
যেসব স্থানে ফানুস উড়ানো নিষিদ্ধ
শতাব্দীকাল ধরে ফানুসের ব্যবহার সত্ত্বেও, এগুলো ফসল বা বাড়িঘরে আগুন লাগা এবং পশুদের ক্ষতির সম্ভাব্য কারণ হিসেবে উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে, কারণ মনে করা হয় যে জন্তুরা ফানুসের পোড়া অবশিষ্টাংশ খেয়ে ফেলতে পারে। এসব কারণে অনেক এলাকায় ফানুসের যথেষ্ট প্রচলন না থাকলেও সেখানে এগুলো নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
- চীন ও সানিয়া শহরে বিমান চালনা ও আকাশসীমা বিঘ্নিত হওয়ার কারণে ফানুস নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
- জার্মানির বেশিরভাগ অংশে ফানুস উড়ানো বেআইনি। তবে হারফোর্ড শহরের মত যেসব স্থানে এগুলো অবৈধ নয়, সেখানেও ফানুস উড়াতে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের থেকে অগ্রিম অনুমতি গ্রহণ করতে হয়।
- অস্ট্রিয়ায় ফানুস উৎপাদন, বিক্রয়, আমদানি বা বিতরণ করা সম্পূর্ণ অবৈধ।
- আর্জেন্টিনা, চিলি, কলম্বিয়া, স্পেন এবং ভিয়েতনামেও ফানুস উড়ানো অবৈধ।
- ১৯৯৮ সাল থেকে ব্রাজিলে ফানুস উড়ানো একটি পরিবেশগত অপরাধ, যার ফলে ৩ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে।
- ২০১১ সালের ১লা ফেব্রুয়ারি থেকে অস্ট্রেলিয়ায় উন্মুক্ত শিখাযুক্ত ফানুস খুচরা বিক্রি করা নিষিদ্ধ করা হয়েছে (কিন্তু সাথে রাখা ও ব্যবহার অবৈধ নয়)।
- ২০১৩ সালের ২০শে জুন ওয়াশিংটনের কিটিটাস কাউন্টিতে ফানুস নিষিদ্ধ করা হয় এরপর, সমগ্র ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যে ফানুস নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
- ২০১৮ সালের ৬ জানুয়ারি ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে রাজধানী ঢাকায় ফানুস ওড়ানোয় নিষেধাজ্ঞা জারি করে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ফানুসে থাকা কেরোসিন বাতি না নিভেই মহানগরীর বিভিন্ন জায়গায় পড়ছে। এতে আগুন লাগাসহ বিভিন্ন ধরনের নিরাপত্তাজনিত হুমকি তৈরি হচ্ছে। ফানুস ওড়ানো অব্যাহত রাখলে যেকোনও সময় বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটতে পারে। সে কারণে ফানুস ওড়ানো থেকে সবাইকে বিরত থাকার অনুরোধ জানিয়েছে ডিএমপি।
- হাই পিক জেলার লেবার এমপি রুথ জর্জ ২০১৯ সালের ২৭শে মার্চ যুক্তরাজ্যের হাউস অব কমন্সে ফানুস নিষিদ্ধ করার আহবান জানিয়ে একটি টেন মিনিট রুল বিল উত্থাপন করেন। বিলটি এর প্রথম পাঠে পাস করা হয়।
Discover more from ইসলামিক অনলাইন মিডিয়া
Subscribe to get the latest posts sent to your email.






