সাম্প্রতিক প্রসঙ্গ

র‌্যাগ ডে: বিদায় অনুষ্ঠানের নামে স্কুলেও শুরু হয়েছে অপসংস্কৃতির চর্চা

বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে শিক্ষার্থীরা এ দিনে নানা আয়োজন করে থাকেন। শিক্ষার্থীদের কাছে দিনটি র‌্যাগ-ডে নামেও পরিচিত। এক সময় শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ে র‌্যাগ-ডে পালন করা হলেও সাম্প্রতিক সময়ে এসএসসি, এইচএসসি শিক্ষার্থীদের বিদায়ী অনুষ্ঠানকেও র‌্যাগ-ডে হিসেবে পালন করতে দেখা গেছে।

এসএসসি পরীক্ষার্থীদের বিদায় উপলক্ষে সম্প্রতি রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের র‌্যাগ-ডে পালনের খবর পাওয়া গেছে।

এতে ছেলে মেয়ের মাঝে কোন ধরনের পার্থক্য না করে বাংলা, হিন্দি, ইংরেজি গানে নাচানাচি, একে অপরকে রং মাখিয়ে দেওয়া, অন্যের কাপরে অশালীন বাক্য লিখে দেওয়া-সহ বেশকিছু ঘটনা চোখে পড়েছে যা দেশের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য বিরোধী। তরুণ শিক্ষার্থীদের মাঝে এসব ঘটনা সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতাও ছিল ব্যাপক। কোন কোন প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানির মত অপ্রীতিকর ঘটনাও সামনে এসেছে।

শিক্ষাঙ্গনে এসব ঘটনার প্রেক্ষিতে অনেকেই সমালেঅচনা করেছেন, কেউ বলেছেন, এক সময় কত সুন্দর করে স্কুলের শেষ দিনটি পালন করতাম। স্যারের দোয়া নিতাম, শিক্ষাঙ্গনে একসাথে দীর্ঘ সময় কাটানো বন্ধুরা একে অপরকে ছেড়ে যাওয়ার কষ্টে চোখের পানি চলে আসতো। সামনে পরীক্ষার কথা চিন্তা করে সবাই দোয়া-মুনাজাতে লিপ্ত থাকতো। বিভিন্ন ধরনের খাবারের আয়োজন হতো। অথচ আজ কোথায় গিয়ে ঠেকেছে আমাদের নীতি-নৈতিকতা ও সংস্কৃতি!

এসব দেখে কেউ আবার বলেছেন, নৈতিকতা ও সংস্কৃতি যখন আধুনিকতার নামে বন্দী করা হয়েছে, তখন অপসংস্কৃতির ভয়ানক অপব্যবহার গ্রাস করে নিচ্ছে শিশু-কিশোর তরুণ-যুবকদের। একসময় এসএসসি পরীক্ষা দিতে যাওয়া শিক্ষার্থীরা বড়দের দোয়া এবং ধর্ম পালন করে ভালো রেজাল্টের চেষ্টা করত; আজ সেখানে গান নাচ নষ্টামির মাধ্যমে উল্লাস করতে দেখা যায় র‌্যাগ-ডে নামক অনুষ্ঠানে।

‘শিক্ষাঙ্গনে বিজাতীয় সংস্কৃতি বন্ধে বিদ্যালয় প্রশাসনের পদক্ষেপ নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রশাসনের পদক্ষেপই কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে’ বলে মতামত দিয়েছেন ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির প্রফেসর শাহেদ হারুন।

তিনি বলেন, ‘প্রশাসনের কারণেই বুয়েট এবং বেশকিছু বিদ্যালয়ে এসব বন্ধ হয়েছে’।

‘তারুণ্য উন্মাদনা ও পাগলামিরই অংশ’ এই উদ্ধৃতি টেনে তিনি বলেছেন; তরুণদের মাঝে উচ্ছ্বাস-উন্মাদনা থাকবেই, তবে এসব নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনকেই পদক্ষেপ নিতে হবে। চাই তা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন হোক বা স্কুল প্রশাসন। তিনি মনে করেন, এক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স নীতি অবলম্বন করলেই তা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব।

‘শিক্ষার্থীদের ধর্মীয় নীতি-নৈতিকতার প্রতি আগ্রহী করতে হবে। তাদের মাঝে জাতি সত্ত্বা, সংস্কৃতিবোধ ও সচেতনতা তৈরি করতে হবে’- বলেন তিনি।

‘প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিধি-নিষেধ আরোপের সাথে সাথে শিক্ষার্থীদের মাঝেও তা মানার মানসিকতা থাকতে হবে। এক্ষেত্রে সচেতনতা মূলক সেমিনার, বিতর্ক অনুষ্ঠানও কার্যকরী ভূমিকা পালন করতে পারে’ সংযোগ করেন এই শিক্ষাবিদ।

এক্ষেত্রে অভিভাবকদের ভূমিকা পালনের প্রয়োজনীয়তা কতটুকু?

‘একজন শিক্ষার্থীকে গড়ে তোলার দায়িত্ব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের। যেহেতু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই এসব ঘটছে তাই সচেতনতা তৈরিতে অভিভাবকের থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব বেশি; বলছেন তিনি।

তার ভাষ্য, ‘র‌্যাগ- ডে’র নামে যা কিছু ঘটছে এসব অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষাঙ্গনের বাইরে ঘটে থাকে, তাই এসবের জন্য শিক্ষার্থীদের যথাযথ জবাবদিহীতার আওতায় আনার মাধ্যমেও তা বন্ধ হতে পারে’।

এদিকে রাজধানীর মাইলস্টোন কলেজের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মুহাম্মদ ছফিউল্লাহ হাশেমী আওয়ার ইসলামকে বলেছেন, ‘কোন বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কখনোই চান না শিক্ষার্থীরা নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য বিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ুন’।

তিনি বলেছেন, ‘তরুণদের বয়সটাই এমন যে তাদের গভীরভাবে কোন কিছু ভাবার সুযোগ থাকে না । বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, স্যাটেলাইট চ্যানেলের প্রভাবে তরুণদের সামনে রঙ্গিন আলো ঝলমলে দুনিয়া হিসেবে যা উপস্থাপন করা হচ্ছে তারা সেটাকেই গ্রহণ করতে চাইবে এটাই স্বাভাবিক। তবে আমাদের তরুণদের নিজস্ব সংস্কৃতি, এতিহ্য, শেকড় ও দ্বীন ধর্ম আগলে ধরার গুরুত্ব বোঝানো উচিত’।

‘পাশ্চাত্যের যা কিছু ভালো তা আমরা গ্রহণ করব; কিন্তু আমাদের সংস্কৃতি ঐতিহ্য ও শালীনতা বিরোধী কিছু থাকলে তা অবশ্যই পরিত্যাগ করা কর্তব্য’ বলে মনে করেন তিনি।

এদিকে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দীন আহমেদ গণমাধ্যমকে বলেছেন, আমাদের সাংস্কৃতি ও ঐতিহ্য বিরোধী সবকিছু পরিহার করা প্রয়োজন। শিক্ষার্থীদের এমন কিছু কখনোই করা উচিত নয় যা অন্যের চোখে নিজের জন্য লজ্জার কারণ হয়ে দাঁড়ায় এবং বাবা-মাকে পরবর্তীতে এর কারণে অপমানবোধ করতে হয়।

তিনি বলেন, ‘সামাজিক মাধ্যমে নিজেকে প্রকাশ করার, অন্যের থেকে নিজেকে ফুটিয়ে তোলার একধরণের প্রবণতা দেখা যায়; এই প্রবণতা এক ধরণের আচরণগত আসক্তি’ বলছেন তিনি।

তিনি বলছেন, মাদক গ্রহণ করাই শুধু আসক্তি নয়, তারুণদের সাথে সামাজিক মাধ্যমে নিজেকে ফুঠিয়ে তোলার যেই প্রবণতা এটিও এক ধরণের আচরণগত আসক্তি। এসব পরিহার করা উচিত বলে মতামত জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দীন আহমেদের।

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

মন্তব্য করুন

Back to top button