সাম্প্রতিক প্রসঙ্গ

চাঁদের দেশে জমি কিনবেন?

12.12

(১)

কয়েকদিন থেকে একটা খবর চাউর হয়েছে— দেশের কেউ কেউ পৃথিবীর সীমানা ছাপিয়ে চাঁদের দেশে জমি কিনছেন। প্রথমদিকে ব্যাপারটাকে নিছক তামাশা মনে হয়েছিলো। কিন্তু পর পর কয়েকটা মেইনস্ট্রীম মিডিয়ায় ঘটনাগুলোর পুনরাবৃত্তি দেখে কৌতূহল থেকে ব্যাপারটাকে ঘেঁটে দেখলাম। এখন পর্যন্ত মনে হলো ব্যাপারটা গুজব নয়, সত্যি।

আপনি হয়তো ভাবছেন, ‘চাঁদের জমি বিক্রি করছে কোন এলিয়েন, তাই তো?’

আপনার ধারণা সত্যি নয়। যিনি চাঁদে জমি বিক্রি করছেন তিনি কোন এলিয়েন নন, আমাদের মতোই রক্ত-মাংশের মানুষ। তার নাম ডেনিস হোপ। আমেরিকার এই নাগরিক লুনার অ্যাম্বেসী ডট কম নামে একটা সাইট খুলে দেদারসে বিক্রি করে দিচ্ছেন সৌরজগতের সকল গ্রহ-উপগ্রহ আর নক্ষত্রকে। একমাত্র তেজস্বী সূর্যকেই তিনি এখন অবধি নিলামে তুলতে পারেন নি। বাদ বাকি মঙ্গল, শনি, বৃহস্পতি, বুধ থেকে শুরু করে রোমান্টিকতার সর্বোচ্চ সম্বল চাঁদকেও তিনি বিক্রিবাট্টা করে ইউরোপ-আমেরিকায় প্লট বাগাচ্ছেন। সৌরজগতের যে অংশ আপনি কিনবেন তার একটা ম্যাপ, ক্রয়ের একটা সার্টিফিকেট এবং সেখানকার একটা পাসপোর্টও তারা আপনাকে ইস্যু করে দেবে।

ব্যাপারটার মধ্যে যে একটা উষ্ণ আবেগ আর গদগদ আত্মম্ভরিতা আছে তা বুঝতেই পারছেন। যেহেতু হাল আমলের ট্রেন্ড, সেহেতু অনেক উষ্ণ আবেগী লোকজন সেটাকে ‘কী পেয়েছি না কী পেয়েছি’ ধরে সেদিকে ঝুঁকতে শুরু করেছে। ট্রেন্ডের ছোঁয়ার বাইরে থাকেনি বাংলাদেশও। আমাদের দেশের কয়েকজনও ইতোমধ্যেই চাঁদের নাগরিক হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেছেন বলে সংবাদমাধ্যম তরফে জানতে পেরেছি।

(২)

তবে, প্রিয় পাঠক— মহাজাগতিক কোন এক জগতে বাস করবার আপনার যে উদগ্র বাসনা, সেই বাসনায় আমি কোনোভাবেই পানি ঢেলে দিতে চাই না। অনুর্বর মরা মরুভূমির ভগ্নাংশের মতো জীর্ণকায় চেহারার চাঁদে বসবাসের চাইতে আপনাকে আমি দিতে পারি এমন এক মহাজাগতিক জগতের সন্ধান, যে জগতে আলো-বাতাসের কোন কমতি নেই। যে জগত ফুলে-ফলে সুশোভিত। যেখানে আছে কলকল ধ্বনির ঝর্ণা যা প্রবাহিত হবে আপনার পায়ের নিচ দিয়ে। যেখানে আছে স্বর্ণ-রৌপ্য-মুক্তো খচিত অপরূপ দালানকোঠা! আছে দিগন্তবিস্তৃত নানান রঙের সমাহার!

আমার বাতলে দেওয়া সেই মহাজাগতিক জগতের সন্ধান পেতে আপনাকে আমি ডেনিস হোপের লুনার অ্যাম্বাসীতে ঢুঁ মারতে বলবো না। আপনার ঘরের আলমিরার কোণে বড্ড অযত্ন-অবহেলায় পড়ে থাকা কুরআনটা খুলে, সুরা আর রাহমানের ৪৬ নাম্বার আয়াতটাতে আপনাকে চোখ বুলাতে বলবো শুধু। সেখানে আমাদের রব সেই মহাজাগতিক জগতে আমাদের ভূমি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি শোনাচ্ছেন এভাবে—
‘যারা তাদের প্রতিপালকের সামনে দাঁড়াতে ভয় করে, তাদের জন্য সেখানে আছে দুটো বাগান’।

চাঁদে জমি কিনতে হলে ডেনিস হোপের অ্যাকাউন্টে আপনাকে পাঠাতে হবে বেশ অনেকগুলো টাকা। কিন্তু, আপনার রব আপনার অনন্ত আবাসস্থল হিশেবে যে মহাজাগতিক জগত তৈরি করে রেখেছেন, তাতে জমি পেতে হলে আপনাকে কোন টাকা খরচা করতে হবে না। তিনি চান কেবল আপনার লাইফস্টাইল মডিফিকেশন।

ভাবছেন— লাইফস্টাইল মডিফিকেশনটা আবার কী, তাই তো?

খুব সহজ! আপনাকে আপনার রবের সামনে দাঁড়াতেই হবে। আপনি স্বীকার করুন আর না-করুন, এটা এক অনিবার্য বাস্তবতা। তাঁর সামনে আপনাকে যেহেতু দাঁড়াতে হবেই, তিনি চান— সেই মাহেন্দ্রক্ষণকে যেন আপনি ভয় করেন।

সাধারণত কাউকে ভয় পেলে আমরা তার কাছ থেকে পালিয়ে বেড়াই। দূরে দূরে থাকি। কিন্তু আল্লাহকে ভয় পাওয়াটা একেবারেই অন্য জিনিস! এই ভয় যতো বেশি প্রকট হয়, আমরা ততোই আল্লাহর কাছাকাছি চলে আসি৷

আপনার রব চান যে আপনি যেন তাঁর সামনে দাঁড়ানোকে ভয় করে চলেন। তার মানে এটা নয় যে আপনি তাঁর কাছ থেকে পালিয়ে বেড়াবেন। বরং— আপনি পালিয়ে বেড়াবেন সেই সকল কাজ থেকে, সেই সকল ঘটনা থেকে, সেই সকল বস্তু আর ব্যক্তি থেকে যা আপনাকে আল্লাহর কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। এই ভয় পাওয়ার অর্থ হলো— আপনি আলিঙ্গন করবেন সেই সকল জিনিস, সেই সকল ঘটনা, সেই সকল বস্তু আর ব্যক্তিকে যা আপনাকে আপনার রবের আরো অধিক নিকটবর্তী করে দেয়। ‘তাঁর সামনে দাঁড়ানোর ভয়’— এর মূল কথা হলো এটাই।
যা আপনাকে আপনার রব থেকে দূরে সরিয়ে দেয় সেগুলোকে যদি জীবন থেকে বাদ দিতে পারেন, এবং আপনাকে আপনার রবের অধিক নিকটবর্তী করে দেয় এমন জিনিসকে যদি বানাতে পারেন জীবনের সারথী, তাহলে আপনার জন্যেই আপনার রবের ওয়াদা— ‘তাদের জন্য আছে দুটো বাগান’।

(৩)

চাঁদের ভূমির যে ছবিগুলো দেখেছি তাতে করে সেটাকে একটা মরা-মরুভূমির ভগ্নাংশ ব্যতীত অন্যকিছু কখনোই মনে হয়নি আমার। চাঁদে কোন বাতাস নেই। বুঝতেই পারছেন— ‘দখিনা হাওয়া’ নিয়ে কোন গান আর কবিতা কিন্তু চাঁদের নাগরিকেরা লিখতে বা পড়তে পারবেন না। দিনের বেলা চাঁদের ভূমি অসম্ভব গরম থাকে আর রাতের বেলা সেটা হয়ে পড়ে একেবারে হিমশীতল ঠান্ডা! এমন বিদঘুটে আবহাওয়ায় আর যা-ই হোক— সজ্ঞানে কোন লোক থাকতে চাইবেন বলে আমার বিশ্বাস হয় না। দুঃখিত— যেখানে অক্সিজেন-ই নেই, সেখানে থাকবার প্রশ্নটা বাতুলতা বৈকি!

আর, আপনার রব আপনাকে যে মহাজাগতিক জগতে ‘দুটো বাগান’ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন, তার সৌন্দর্য সম্পর্কে নবিজী সাল্লাললাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘কোন চোখ তা কোনোদিন দেখেনি, কোন কান তা সম্পর্কে কোনোদিন শুনেনি’। অর্থাৎ, সেই জগতের সৌন্দর্য এতো মনোরম-মনোহর যে, মানুষ তার কল্পনাতেও তা কোনোদিন আঁকতে পারবে না!

পকেটের টাকা খরচা করে ডেনিস হোপের লুনার অ্যাম্বেসী থেকে আপনি কী একটুকরো বায়বীয় বালির স্তুপ কিনবেন নাকি লাইফস্টাইল মডিফাই করে মহাজগতের মালিক আল্লাহর প্রতিশ্রুত দুটো বাগানের মালিক হবেন— সেই সিদ্ধান্ত আপনার।

‘কুরআন থেকে নেওয়া জীবনের পাঠ-০৮’
– আরিফ আজাদ

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

২টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

Back to top button