ছোটগল্প/উপন্যাস

আমার বোরিং স্বামী!

To Desired Deals

আমার স্বামী আমার থেকে বয়সে বেশ বড়। নিজেকে আমি তার সাথে কিছুতেই খাপ খাওয়াতে পারিনি। বোরিং একটা মানুষ। মিষ্টি করে কথা বলতে জানে না। ভালোবাসা বোঝে না। একজন আনরোমান্টিক মানুষের মধ্যে যে যে গুন থাকা দরকার তার সবই আছে তার মধ্যে।
বিয়ের পর থেকে এখনো কোথাও তার সাথে আমার ঘুরতে যাওয়া হয়নি। রাত বেরাতে জ্যোৎস্নার আলোতে কখনো হাত ধরে হাঁটা হয়নি।
আমার খুব ইচ্ছা করতো দুজন মিলে একসাথে বৃষ্টিতে ভিজবো, কিন্তু তার নাকি ঠান্ডা লাগে। জোসনা হলে যদি বলি চলো ছাদে যেয়ে একটু জোসনা দেখে আসি, সে বলে জানালা দিয়ে দেখো। এতো রাতে ছাদে ভুত আছে। ঠ্যাং ধরে আকাশে নিয়ে নিচে ফেলে দেবে।

কখনো কক্সবাজার যাইনি আমি। যদি বলি এবার অফিস এর চাপ কমলে ছুটি নিয়ে চলোনা একটু কক্সবাজার ঘুরে আসি। সে বলে, পুকুরে গিয়ে ডুব দিয়ে আসলেই তো হয়। জিনিষ তো একই, ওখানেও পানি এখানেও পানি।

শাড়ি পরলে আমাকে সুন্দর লাগে, অন্তত সবাই তাই বলে। অথচ বিয়ের পর থেকে আজ পর্যন্ত সে আমার প্রসংসা করা তো দুরে থাক, শাড়ি পরলে আমার দিক ২ বার ফিরেও তাকায় না।

মুখভর্তি দাড়ি, আকর্ষনহীন একজন মানুষ। না বোঝো রোমান্টিকতা, না আছে কথায় মিষ্টতা। আমার বড় আশা ছিল, কোন হ্যান্ডসাম যুবক আমার জীবনে আসবে। কিন্তু তখন লজ্জায় মাথা নুয়ে যায় যখন আমার বান্ধবীরা আমাকে বলে হুজুরের বউ।

আমি সাজগোজ খুব পছন্দ করতাম। দামি পারফিউম ইউজ করতাম। কিন্তু এখন আমার এসব সখ মাটি হয়ে গেছে।

আমার ক্লাসমেট লায়লা, আমার অন্তরঙ্গ বান্ধবী। তার বিয়ে হয়েছে এক কোটি পতির ছেলের সাথে। বাড়ি আছে, গাড়ি আছে, ইন্ডাস্ট্রি আছে। কোন কিছুর তার অভাব নেই। প্রায়ই যখন তার সাথে আমার কথা হয়, আমাকে খোঁটা দেয়।

বিয়ের আগে আমিও স্বপ্ন দেখতাম, কোট প্যান্ট পরা এক হ্যান্ডসাম সুপুরুষ আমার স্বামী। অঢেল সম্পদের মালিক। নিজের গাড়ি আছে। উত্তরায় পাঁচতলা বাড়ি আছে। যে ঘরে আমি থাকি, রাজকীয় এক খাট। 52 ইঞ্চি থ্রিডি এলইডি টিভি আমার রুমে। শুধু আমার কাপড়চোপড় রাখা এবং সাজগোজের জিনিস এর জন্য আলাদা একটা রুম রয়েছে। যত দামি ব্র্যান্ডের পারফিউম রয়েছে সব আমার সংগ্রহে আছে। উষ্ণ গরম পানিতে বাথটবের ফেনায় আমি ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকি। যখন বাহিরে বের হই, জামা কোনটা রেখে কোনটা পরবো, ম্যাচিং করে জুতো আর কানের দুল, কালার মিল রেখে মেকআপ- এগুলো নির্বাচন করতেই আমার ঘণ্টা পার হয়ে যায়।

ও ড্রাইভ করছে। আমি ওর পাশে বসা। আমি জানালাটা খুলে দিলাম। আমার চুলগুলো বাতাসে উড়ে ওর মুখে আছড়ে পড়ছে। ও চোখ বন্ধ করে আমার চুলের ঘ্রাণ নিচ্ছে। আর বলছে, তোমার চুলের ঘ্রাণ আমাকে মাতাল করে দেয়। তার কথা যেন আমার কানেই পড়েনি, সে ভাব নিয়ে আমি বাইরের সবুজ ধান ক্ষেতের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি। কোন পার্টিতে গেলে তার বন্ধুরা আমার রূপের প্রশংসা করে। তার বন্ধুর স্ত্রীরা আমাকে ঘিরে ধরে- ভাবি! শাড়ীটা অনেক সুন্দর। কত টাকা দিয়ে কিনেছেন, ভাবি! কোন পার্লার থেকে সেজেছেন, আমি আপনার মত এমন হিল কোথায় পাবো! আরো কত কী! তখন গর্বে আমার বুকটা ফুলে উঠতো। বিয়ের পূর্বে প্রতিরাতে এমন স্বপ্ন দেখতে দেখতেই আমি ঘুমোতাম।
বিয়ের পরও অনেক রাতে আমি আমার অতীত স্বপ্নরাজ্যে বিচরণ করতাম। কিন্তু বেসুরে মোটা কন্ঠের ডাকে আমার স্বপ্ন ভঙ্গ হতো, সাবিহার মা! ওঠো, ফজরের আযান দিয়েছে। এভাবে কত রাতের মিষ্টি স্বপ্ন তিনি আমার ভঙ্গ করেছেন তার হিসেব নেই।

এর মধ্যে এক সকালে অনুভব করলাম আমার গর্বে তৃতীয় সন্তানের অস্তিত্ব। আমি ভেবেছিলাম সে খুশিতে আমাকে জড়িয়ে ধরবে বা কিছু একটা তো করবেই। কিন্তু ও কোনো রিয়াকশনই দেখালো না। খুশি হয়েছে, না রাগ হয়েছে, না অন্য কিছ- কিছুই বুঝলাম না। শুধু আলহামদুলিল্লাহ বলেই শেষ।

মেজাজ তো চরম খারাপ। মনে মনে সারাদিন নিজের কপালকে গালি দিয়েছি। আল্লাহ্‌ এই ছিলো আমার কপালে! তোমার দুনিয়াতে কি আর কোনো রোমান্টিক ছেলে ছিলো না! যে তুমি এই বুড়োর সাথেই আমার বিয়ে দিলে।

রাতে দেখলাম এক বস্তা ভরে ফলমূল নিয়ে এসেছে। আমিও দেখে মুখ ঝামটি দিলাম, হুহ!

এভাবেই দিন যাচ্ছিলো। আমার বার বার মনে হতো, বাচ্চা হওয়ার সময় যদি আমি মরে যাই! মাঝে মাঝে রাতে ওর বুকে মাথা রেখে বলতাম, আচ্ছা! বাবু হওয়ার সময় যদি আমি মরে যাই তাহলে কি তুমি আরেকটা বিয়ে করবে? ভাবতাম ও হয়তো গল্পের নায়কদের মতো আমার কপালে চুমু খেয়ে বলবে, আরে নাহ্ পাগলি। তুমি মরে গেলে আমিও মরে যাব। আর যদি বেঁচে থাকি, তাহলে সারা জীবন তোমার স্মৃতি নিয়ে থাকবো।
কিন্তু দেখা যেতো তার কোনো রিয়াকশনই নেই। চুপ করে থাকতো। যখন বুঝতাম চুপ করে থেকে ও মৌন সম্মতি দিচ্ছে তখন লাফ মেরে উঠে বলতাম, বুঝেছি তুমি তো এটাই চাও যে আমি মরে যাই। যেন আরেকটা বিয়ে করতে পারো। এই বলে তার দিকে পিঠ ফিরিয়ে শুয়ে বাকি রাতটা পার করে দিতাম।

দেখতে দেখতে ৫ মাস হয়ে গেলো। একদিন রুমে আমি একা ছিলাম। বাথরুমে গিয়েছি, হঠাৎ পা পিছলে কমডের উপর উপুর হয়ে পড়লাম। পেটে এক জোরে বাড়ি খেলাম। মনে হল অনেক উঁচু থেকে কোন এক বড় পাথর এসে আমার পেটে পড়েছে। এখনি মনে হয় আমার জানটা বের হয়ে যাবে। তারপর কিছু সময় অচেতন হয়ে সেখানেই পড়ে রইলাম।

কিছুক্ষণ পর যখন হুঁশ ফিরল। শরীরটা খুব হালকা লাগছিল। কিন্তু ওঠার শক্তি পাচ্ছিলাম না। অনেক কষ্টে এটা সেটা ধরে রুমে এসে আবার পড়ে গেলাম। চোখে সব ঝাপসা দেখছি। শাশুড়ি ছিলো অন্য রুমে, ডাকতে যাচ্ছি কিন্তু গলা দিয়ে আওয়াজ বের হচ্ছে না।

সাবিহা আর মালিহা ওদের দাদির সাথে ছিল। হঠাৎ মালিহা রুমে ঢুকে আমাকে দেখেই চিৎকার দিয়ে উঠল। বাড়ির সবাই দৌড়ে এলো আমার কাছে। দেখলাম আমার শাশুড়ি বাথরুম থেকে দলা পাকানো একটি রক্তখন্ড টাওয়েলে পেঁচিয়ে নিয়ে আসলেন। আমার মুখ দিয়ে কথা বের হচ্ছিলো না। ঝাপসা চোখে দেখলাম, লম্বা লম্বা হাত পা একদম ওর মতো। চোখ, ঠোঁট ,কান , সব কিছুই ছিলো। আমার ছেলেটা তখনও কাঁপছিলো। তারপর আস্তে আস্তে ওর কাঁপা থেমে গেলো। আমি আবার বেহুঁশ হয়ে পড়লাম।

আমার হুশ আসে ৪ দিন পর খুলনা আড়াইশ’বেড এর আইসিইউ তে। তখন আমার হাত পা ও পুরো শরীর বেডের সাথে ফিতে দিয়ে বাঁধা ছিল। মাথার পাশে সদ্য খোলা ভেন্টিলেশনের মোটা পাইপ ছিল। আমি চোখ মেলে তাকানোর পর একটা নার্স এসে আমকে নিরীক্ষণ করল, তারপর আমার বাঁধনগুলো খুলে দিল।

আমি সারাদিন অপেক্ষা করি, কিন্তু কেউ আমাকে দেখতে আসেনা। ভাবি, তাহলে সবাই কি আমাকে ভুলে গেল! একটা মানুষও আসলো না হাসপাতালে আমাকে দেখতা! দুঃখে কস্টে কান্না চলে আসলো। হয়তো এখন ওদের বাড়িতে নতুন বউ আনার আলোচনা চলছে। হয়তো সে পাত্রী তালাশে ব্যস্ত। আরও বিভিন্ন আজেবাজে চিন্তা আমার মাথায় ঘুরপাক খেতে লাগল।

তারপর দিন কেটে যায়, কেউ আসেনা। রাতে ডিউটি নার্স চেইঞ্জ হয়ে একজন বয়স্ক মহিলা আসেন। এসে আমার মাথায় হাত দিয়ে বলেন মা” আপনি ভালো আছেন? আমি মাথা নেড়ে সম্মতি জানাই।

উনি বললেন আপনাকে নিয়ে তো সবাই খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলো। ডাক্তাররা আপনাকে এডমিট করতে চায়নি। সবাই বলছিলো আপনি বড়জোর আর ২ ঘন্টার মতো বাঁচতে পারেন, তার বেশি না।

আমি বললাম কেনো? উনি বললেন, আমার ডায়াবেটিস আর প্রেসার দু’টোই নাকি অনেক বেশি হয়ে গিয়েছিলো। অনেক বেশি রক্তক্ষরণে আমি রক্তশূন্য হয়ে পড়েছিলাম। পালস খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। শেষে ওর কাছ থেকে বন্ড সই নিয়ে তারপর আমাকে আইসিইউতে নেয়া হয়।
তিনি আমাকে বললেন, ওই লম্বা হুজুরটা মনে হয় আপনার স্বামী! লোকটা আপনার জন্য অনেক কষ্ট করেছে। আজ চারদিন দিন রাত চব্বিশ ঘন্টা হাসপাতালে পড়ে আছে। আইসিইউর বারান্দায় সারাক্ষণ বসে থাকে। একবারের জন্যেও বাসায় যায়নি।

নার্সের কথা শুনতে শুনতে আমার গলা ভারী হয়ে আসছিল। প্রচণ্ড এক আবেগ যেন আমার গলা চেপে ধরছিল।

তিনি বলতে লাগলেন, আমরা তো সবাই হাল ছেড়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু উনি একবারের জন্যেও হাল ছাড়েনি। যখন এখানে আপনাকে এনেছিলো উনি খুব কান্নাকাটি করছিল। আমি মনে মনে ভাবছিলাম, এই লোকটি সত্যিই কি আমার জন্য কাঁদতে পারে!

তিনি বলছিলেন, আমরা তো সবায় উনার কান্না দেখে অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। আমি একপাশে মুখ ফিরিয়ে বললাম, তাওতো আমাকে একবার দেখতে এলো না!

তখন সেই নার্স আমার বামপাশের জানালার পর্দাটা সরিয়ে দিয়ে আমাকে হাত দিয়ে ইশারা করে বললেন, ওই যে দেখেন!

দেখলাম, বাইরে ও উস্কোখুস্কো চুলে জানালার দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পর্দা সরতে দেখে হাত দিয়ে ইশারা করে নার্সকে শুকরিয়া জানালো।
নার্স বললেন, আইসিইউতে বাইরের কেউ আসা নিষেধ। এভাবে রুগী দেখানোও নিষেধ। কিন্তু আপনার স্বামীর অনুরধে আমার খুব মায়া হলো। আপনার তো হুঁশ ছিলো না এই চারদিন‌। তিনি আমাকে খুব অনুরোধ করে বলেছিলেন যেন অন্ততঃ আমি একবার জানালার পর্দা সরিয়ে তাকে আপনাকে দেখার সুযোগ করে দেই। আমি বলেছিলাম, পর্দা সরালেওতো দূর থেকে চেহারা দেখতে পাবেন না। তিনি বলেছিলেন, অবয়বটা দেখতে পেলেই তিনি শান্তি পাবেন। তাই প্রতিদিন আমার শিফটে আমি আসার পর কিছুক্ষণের জন্য জানালার পর্দাটি সরিয়ে দেই। তখন দেখতে পাই তিনি অপেক্ষায় আছেন। তিনি হাত নেড়ে আমাকে শুকরিয়া জানান।

নার্সের কথা শুনতে শুনতে আমার বুক ফেটে যাচ্ছিল। আমি আর নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলাম না। হাউমাউ করে কেঁদে উঠলাম। তিনি আমাকে এতটা ভালোবাসেন!

বাম দিকে কাঁত হয়ে ওর দিকে তাকালাম। দূর থেকে মনে হল ও চোখ মুছছে।

আর একদিন পর আমাকে রিলিজ দেয়া হলো। কি এক অজানা অনুশোচনায় আমি তার চোখের সাথে চোখ মেলাতে পারছিলাম না। বাসায় ফেরার পর সারাক্ষণ ও আমার পাশে বসে রইল। ও আমাকে খাইয়ে দিত, আমার সব কাজ করে দিত।

আমার কাছে মনে হচ্ছিল, আমি একটি নতুন জীবন পেয়েছি। আর এই লোকটাকে প্রথমবারের মত অনুভব করছি। রাতে যখন সবাই ঘুমিয়ে পড়ল, তখনো ও আমার পাশে শুয়ে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল। আমি বললাম, আমি মরে গেলেই ভালো হতো, আর একটা বউ পেতেন। ও আমার ঠোঁটের উপর হাত রেখে মুখ চেপে ধরে বলল, আর কখনো এমনটা বলবে না। তারপর আমাকে বুকের সাথে চেপে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। মনে হচ্ছিল আমার শুকনো বুকটা সিঞ্চিত হচ্ছে ওর চোখের পানিতে। এক পরম শীতলতায় আমার দেহমন আন্দোলিত হয়ে উঠছিল। আমার মনে হচ্ছিল, তার চোখের অশ্রুগুলো আমার জীবনটা নতুন করে ধুয়ে পরিচ্ছন্ন করে দিয়েছে।

আমি বাসায় ফেরার দু’দিন পর হঠাৎ লায়লা ফোন দিল। ফোন রিসিভ করার পর ওপাশ থেকে তার কান্নার আওয়াজ পেলাম। বললাম, কিরে এতদিন পর! আর তুই কাঁদছিস কেন? সে বলল, দু’মাস হয় তাদের ডিভোর্স হয়ে গেছে। তাকে ডিভোর্স দিয়ে তার শিল্পপতি স্বামী তার অফিসের সুন্দরী পিএসকে বিবাহ করেছে।

আসলে ভালোবাসাটা বড় অদ্ভুত! যেটাকে আমরা ভালোবাসা বলি সেটা আসলে ভালোবাসা নয়। আর যেটা ভালোবাসা সেটা আমরা অনুভব করতে পারি না। আমাদের চারপাশে অসংখ্য ভালোবাসা ছড়িয়ে আছে। কিন্তু সেটা আমরা দেখি না।

আমি পূর্ণ সুস্থ হবার পর হঠাৎ তিনি রাতে বললেন, আজ পূর্ণিমা। চলো ছাদে যাই। চাঁদের আলোটা গায়ে মেখে আসি। আমি তার দিকে বাঁকা চোখে তাকিয়ে ঠোঁট বাঁকিয়ে বললাম, আমি কিন্তু সব বুঝি…… তারপর…..

(মূলগল্প এবং কিছু বাক্য অন্যের, তবে এ লেখাটা সংশোধিত, পরিমার্জিত ও পরিবর্ধিত।)
– Abul Hassan Pyash

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

১টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

Back to top button