ছোটগল্প/উপন্যাস

ঝরাফুল

12.12

আমার মা…
তখন সবে মাত্র ১৮ পেরিয়ে ১৯ এ পা রেখেছে। অনার্স প্রথম বর্ষ। চারিদিকে বিয়ের খবরাখবর। পাত্রও জুটে গেল একটা। স্বভাব চরিত্র ভাল। বংশ বুনিয়াদ ভাল। আয় ভাল। ভাল পাত্র এই অজুহাতে বিয়েতে বাধ্য হয় মা। শুরুতে খারাপ লাগা থাকলেও আস্তে আস্তে মেনে নিয়েছিলেন।মেনে নিতে শিখেছিলেন। সবই ভাল চলছিল।
হটাৎ সব এলোমেলো হয়ে যায়।

সে মাসে পিরিয়ডের ডেইট ছিল ৩ তারিখ। ৩ তারিখ পেরিয়ে ৫ তারিখ। ৬ তারিখ, ৭ তারিখ। ১০ তারিখ। না… কোন খবর নাই।
১১ তারিখে মা অস্থির। টেনশনে শেষ। পড়ায় মনোযোগ নেই। ঘুমও আসেনা ঠিক মত।
বাবাকে বিষয়টা জানায়। স্বামীর লাপাত্তা ভাব। বলে, আরে ভয়ের কিছু না। অনেক সময় হয় এমন। অপেক্ষা কর, ঠিক হয়ে যাবে।
অলরেডি ৮দিন। আর কত অপেক্ষা করবে সে। দোকান থেকে প্রেগনেন্সি টেস্টের স্ট্রিপ কেনে।
১২ তারিখ সকালে ঘুম থেকে উঠেই টেস্ট করে। আঁৎকে উঠে মা। প্রেগনেন্সি পজিটিভ! হার্টবিট বেড়ে যায়। অস্থিরতা ভীড় করে সারা শরীরে। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে যায়। এক সময় মাথায় রাগ উঠে। সব রাগ ক্ষোভের ঢেউয়ে রুপ নেয়। আঁচড়ে পড়ে স্বামীর উপর।
বলতে পারেন এটাই ছিল আমার পৃথিবীতে আসার প্রথম আগমনী বার্তা। কিন্তু মা সেটা স্বাভাবিকভাবে মেনে নেয়নি। মানবেই বা কিভাবে। সব কিছুরই একটা প্রস্তুতি থাকে। মা হওয়াটা অনেক বড় ব্যাপার। এটার প্রস্তুতিও তাই বড় আকারে হওয়া উচিত।
কিন্তু মা তো বিয়েতেই রাজী ছিলেন না। মা হওয়া তো অনেক পরের ব্যাপারে।
পড়ালেখা শেষ করবে। চাকরী করবে। নিজের পায়ে দাঁড়াবে। তারপর না হয় বাচ্চা নেয়ার বিষয়টা ভাবা যেতে পারে। না হয় স্বপ্নটা অতদূর যেতে পারল না। না পারুক। পড়ালেখাটাকে তো অন্তত একটা লেভেলে নিয়ে তারপর ভাবলেও একটা কথা ছিল। আর বিয়েটাই বা হয়েছে কয়দিন হল!
এখন সে একটু ঘুরবে,ফিরবে। মৌজ মাস্তি করবে।অথচ জীবনের কিছুই উপভোগ করা হল না। এর মধ্যেই মা হওয়াটা অনেক ঝামেলার। তাছাড়া স্বামী নামক লোকটার সাথে সম্পর্কটাও ভাল যাচ্ছে না তার। হুটহাট ঝগড়া, ভুল বোঝাবুঝি লেগেই আছে। দাম্পত্যকলহ তেমন না থাকলেও টুকটাক এডজাস্টমেন্ট প্রবলেম তো আছেই!
বাচ্চা নেয়ার সিদ্ধান্তটা তাই মেনে নিতে রাজী নয় মা। প্রথম দুই একদিন বাবা মায়ের সুরে কথা বললেও আস্তে আস্তে গলার সুর চেঞ্জ হয়ে যায়। বিষয়টা মেনে নেয়ার জন্য মাকে বোঝানোর চেষ্টা করে। অভয় দেয়। পড়ালেখা চালিয়ে নেয়ার গ্যারান্টি দেয়। সব রকমের সহযোগিতার আশ্বাস দেয় বাবা।
কিন্তু মা অনড়।
অনেক ক্ষোভ তার বাবার উপর। পুরুষ লোকদের এই স্বভাবটা জানা আছে তার। যতই মিষ্টি কথা বলুক। এক সময় ঠিকই ব্যস্ত হয়ে পড়ে নিজ জগতে। সব কষ্ট বহন করতে হয় মেয়েদেরকেই। নিজের মায়ের ক্ষেত্রেও এমন ঘটনা ঘটেছিল।
একসময় আমার নানী পড়ালেখা সব ছেড়ে দিয়ে সন্তান পালনে মনোনিবেশ করে। সন্তান পালনই তার ব্রত হয়ে উঠে। পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সব গৌণ হয়ে যায়। আর উঠে দাঁড়াতে পারেনি নানী। সারাজীবনই গৃহিণী হয়েই কাটাতে হয় তাকে। একটা টাকাও সন্তানের পিছনে খরচ করতে পারত না। স্বামীর কাছে হাত পাততে হত সামান্য খরচের জন্যও।
আমার মা অতো বোকা না। তাই সে চায়না প্রেগনেন্সি কন্টিনিউ করতে। বাবা শেষ অস্ত্র হিসেবে তার শাশুড়ির কাছে যায়। নিজের ইচ্ছার কথা জানায়। মেয়েকে বোঝাতে বলে।কিন্তু মেয়ে নাছোড়বান্দা। কিছুতেই সে মা হতে রাজী নয়। যদি নিতেই হয় তবে অন্তত আরো এক দুই বছর পর!

সেদিন ছিল বৃহস্পতিবার।
মা সবার অজান্তে দোকান থেকে ঔষধ নিয়ে আসে। বাচ্চা নষ্ট করার ঔষধ। কাউকে না জানিয়ে খেয়ে ফেলে।
হটাৎ আমি দেহে বিষক্রিয়া অনুভব করি। ওহহো আমার পরিচয় দেয়া হয়নি। কোন নাম নাই আমার। এই মুহুর্তে আমাকে ঝরাফুল ডাকতে পারেন। হুম ঝরাফুল। মায়ের গর্ভের পিছনের দেয়ালে ছোট্ট একটা জায়গায় আমার বাস। মাত্র কয়েকদিন হল আমার বয়স। বলতে পারেন মাসের কাছাকাছি। নিজের থাকার জায়গাটা এখনো ঠিকমতো দখলে নিতেই পারিনি। কোনরকমে গর্ভের দেয়াল আঁকড়ে ধরতে শিখেছি! মাত্র কয়েকদিন হল আমার হৃদপিন্ডটা স্পন্দিত হচ্ছে। সারা শরীরে তাই প্রাণের স্পন্দন। বিন্দু থেকে সবেমাত্র বড় হতে শুরু করেছি।
ক্ষুদ্র এই দেহটুকুন কিভাবে সইবে এত্তো বিষের জালা!
আমি যন্ত্রণায় কুঁকড়ে উঠলাম। আমার কচি হৃদপিন্ডটাও যেন থেমে যেতে চায়। রক্তক্ষরণ হতে থাকে হৃদপিন্ডে! আমার সমস্ত বাধ ভেঙে যেতে থাকে। আমার ছোট্ট আকাশটা বিন্দু বিন্দু রক্তে লালচে হয়ে যায়। রক্ত বৃষ্টি হয়ে এক সময় তা ঝরে পড়ে।

রক্ত দেখে মা ভয় পেয়ে যায়। এই প্রথম মা আমার জন্য একটা খারাপ লাগা অনুভব করেন। শরীরে একটা ঝাঁকুনি ভাব।
আমি কি সত্যিই মা হতে যাচ্ছিলাম! পুলক জাগে মায়ের মনে! একটা অজানা আনন্দে নেচে উঠে তার মন!
কিছুক্ষণের মাঝেই সহ্নিত ফিরে পায় মা!
-ধুর! কি সব ভাবছি! যে এখনো পূর্ণভাবে জন্ম নেয়নি, যার অস্তিত্বই নাই তাকে নিয়ে এতো ভাবার কি আছে! বরং ভালই হয়েছে। ঝামেলা চুকে গেছে। এ যাত্রায় পার পাওয়া গেল!
গত কয়েকদিনে অজানা আতংকে ঠিকমতো ঘুম হইনি মায়ের। আজ একটু আগে তাই ঘুমিয়ে পড়েছে। মাকে খুব সুন্দর লাগছিল। একেবারে হাত পা ছেড়ে দিয়ে বেহুঁশের মত ঘুমাচ্ছে। চুলগুলো পুরো মুখে ছড়িয়ে। ফ্যানের বাতাসে এলোমেলো ভাবে উড়ছিল । রক্তাক্ত শরীরে তখনো আমার প্রাণের স্পন্দন। মনে হচ্ছিল এই বুঝি মরে যাব। ভুমিষ্ট হয়ে কখনো বলতে পারব না -মা তোমাকে ভালবাসি। প্রাণভরে ডাকতে পারব না মা বলে!
আজব এক স্বপ্নের রাজ্যে মাকে নিয়ে গেলাম!
মা আর আমি একটা সরু পথ ধরে হাঁটছি! দু’পাশে অনেক গভীরখাদ। পা পিছলে গেলে একেবারেই শেষ! মা আমার কচি হাত দু’টো শক্ত করে ধরে হাঁটছে! বৃষ্টি হচ্ছে। অনেক বৃষ্টি। ঝুম বৃষ্টি। হটাৎ একটা বজ্রপাতের শব্দ! কেঁপে উঠে মায়ের হাত। আমি ছিটকে পড়ি। গভীর থেকে গভীরে! মা…আ…আ…!
লাফ দিয়ে উঠে যায় মা।
কে? কে? কে ডাকল মা বলে!
মা কাঁপছে। ঘামে ভিজে গেছে। হার্টবিট বেড়ে গেছে। বেড়ে গেছে শ্বাস প্রস্বাসের গতি! তলপেটে হাত দেয়। প্রচন্ড একটা ব্যথা কুণ্ডলী পাকিয়ে উপরে উঠে। রক্তে ভিজে যায় মা। জেগে উঠেছিল বাবাও। ঘুম চোখে বিরক্তি নিয়ে তাকায় মায়ের দিকে।
স্বপ্ন দেখছো নাকি?
মা কিছু বলে না। মাথা ঘুরছে তার। স্বামীকে রক্ত দেখায়। ভয় পেয়ে যায় বাবা। শাশুড়িকে ফোন দেয়। একে ফোন দেয়। ওকে ফোন দেয়। খুব ভোরেই হাসপাতালে নেয়া হয় মাকে। আল্ট্রাসনোগ্রাম করা হয়। ডাক্তার জানিয়ে দেন, বাচ্চা নষ্ট হয়ে গেছে। তবে ভিতরে কিছু প্রডাক্ট রয়ে গেছে। ডিএন্ডসি করতে হবে। নয়ত ব্লিডিং বন্ধ হবে না।

সুস্থ হয়ে মা ঘরে ফিরে আসে। স্বামী স্বান্তনা দেয়। কপালে যা ছিল মেনে নিতে বলে। মা মেনেও নেয়। সময় এগিয়ে যায় তার নিয়মে। দিন, মাস, বছর।
সেদিন ছিল সোমবার।
বাসায় কেউ নেই। যে যার কাজে ব্যস্ত। বাইরে বৃষ্টি হচ্ছিল। মা জানালার পাশে দাঁড়ায়। আনমনে তাকিয়ে থাকে ভেজা আকাশের পানে। হটাৎ মনের কোণে ভেসে উঠে আমার স্মৃতি!
আচ্ছা বেঁচে থাকলে কেমন হত সে?
দেখতে কার মত হত?
ও কি ছেলে হত?
নাকি মেয়ে?
ভাবতে ভাবতে চোখের আঙিনায় অশ্রুর আনাগোনা বেড়ে যায়। অস্থির হয়ে উঠে মনটা।
আজ শুক্রবার।
পুরো বাড়ীটা আনন্দে মৌ মৌ করছে। আনন্দে ভাসছে মা, বাবা, বাড়ীর সবাই। সবাই আছে। নেই শুধু আমি! কি আশ্চর্য! সেটা কারো মাথাতেই নেই। থাকবেই বা কি করে। আমি ছিলাম অপ্রত্যাশিত! বিন্দুতেই তাই ঝরে পড়েছি। ফিরে এসেছি আমার স্রষ্টার কাছে।
প্রাণের উপর হাড় মাংশের আবারণকেই তো দেহ বলে। প্রাণের উপস্থিতিতে সে দেহ সচল হয়। প্রাণ বায়ু চলে গেলে সে দেহ নিশ্চল হয়ে পড়ে থাকে! তাকে লাশ বলে। আমিও একটা লাশ। প্রাণময় লাশ! স্মৃতিময় লাশ।
বাড়ীতে আনন্দ আয়োজনের মূল কারণ আমার বোনের জন্মদিন। কত খুশী সবাই!
আমার না খুব কষ্ট হচ্ছে! মনে হচ্ছে এই আত্নার উপর শরীর বিছিয়ে দেই। জীবন্ত হয়ে উঠি। মায়ের সামনে গিয়ে জিজ্ঞেস করি। মা, বোনের আজ প্রথম জন্মদিন পালন করছ!
আচ্ছা, বলত আজ ওর বয়স কত?
মা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করবে, কী যে বলিস! প্রথম জন্মদিন মানেই তো ওর বয়স আজ এক বছর পূর্ণ হল!
উত্তরে আমি হেসে উঠব। খিলখিল করে। মাকে বলব, মা তুমি ভুলেই গেলে! ও যে তোমার পেটে ৯ মাস ছিল! সেটাও যে জীবন মা!
দিদির বয়স তাই এখন ১ বছর ৯ মাস! মা তখন একটু চিন্তিত হবে! হুম, ঠিকই তো! ১ বছর ৯ মাস!
তখনই আমি কেঁদে ফেলব…হাটু গেড়ে মায়ের পায়ের কাছে বসে পড়ব…মা আমিও তো তখন ৩০ দিনের ছিলাম!
আমার জন্মদিন পালন করবে না মা? আমাকে কেন মেরে ফেললে? বাঁচিয়েই যদি না রাখবে তবে কেনই বা এনেছিলে তোমার গর্ভে?
পারলাম না আমি। পারলাম না আত্মা থেকে মানুষে পরিণত হতে। ফিরে এলাম সে গৃহ ত্যাগ করে। আমার প্রভুর কাছে। পিছনে তখন হাসির শব্দ। হাত তালির শব্দ। হ্যাপি বার্থডে দিদি। হ্যাপি বার্থডে! বাবা ভাল থেকো।
মা তুমিও। শুধু অনুরোধ। যখন কেউ জিজ্ঞেস করবে, তোমার সন্তান কয়টি?
প্লিজ মা দুটি বলিও। নয়ত এপারে এলে কাকে মা বলে ডাকব? আমি যে তোমার অপেক্ষায় থাকব মা। আমার প্রভুর দরবারে!


লেখাটা কাল্পনিক। তবে ঠিক এমনটাই ঘটে। কখনো বাবার কারণে, কখনো মায়ের কারণে এভাবেই প্রাণ হারায় ভ্রুণ নামের অপূর্ণাঙ্গ মানুষগুলো! চাওয়া না থাকলে না আনাই ভালো। এসে গেলে স্বাগতম জানানোই যে শ্রেয়।

ভাল থাকুক সবার মা। এমনকি ঝরাফুলের মায়েরাও। মা দিবসে এবং সব দিবসে।

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

মন্তব্য করুন

Back to top button