অর্থনীতি/ব্যবসা-বাণিজ্য

ইসলামী দৃষ্টিকোণে ই-কমার্স : একটি পর্যালোচনা

To Desired Deals

মানব জাতির ঐতিহ্যগত একটি পেশা হচ্ছে ব্যবসা-বাণিজ্য। পেশার বিচারে ব্যবসার গুরুত্ব সর্বাধিক। এটি একটি ইবাদতও বটে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) নিজে ব্যবসা করতেন এবং খোলাফায়ে রাশেদীনের সদস্য সহ অনেক ছাহাবী ব্যবসার সাথে জড়িত ছিলেন। ইসলামের প্রথম যুগে মূলত মুসলিম বণিকদের মাধ্যমে এদেশে ইসলামের শুভাগমন হয়েছিল।

বর্তমান যুগ হচ্ছে তথ্য-প্রযুক্তি বিস্তারের সুবর্ণ যুগ। ইন্টারনেটের কল্যাণে সারা পৃথিবী গ্লোবাল ভিলেজে পরিণত হয়েছে। ফলশ্রুতিতে ঘরে বসে অনলাইনে ক্রয়-বিক্রয়ের এক নয়া দিগন্তের উন্মোচন হয়েছে। আধুনিক প্রজন্মের কাছে ই-কমার্স একটি জনপ্রিয় ধারণা। তবে ই-কমার্সে পণ্য ক্রয়-বিক্রয়, লেনদেন এবং অর্থ পরিশোধের বিষয়ে ইসলামের সতর্ক অবস্থানের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। কেননা এ ব্যবসায় আস্থার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামের অসংখ্য ইতিবাচক দিকের মধ্যে একটি দিক হচ্ছে ইসলাম সরাসরি কোন কিছু নিষিদ্ধ না করে বা কোন জিনিসের বৈধতা না দিয়ে সুনির্দিষ্ট শর্ত জুড়ে দেয়। আর সেই নীতিমালার আলোকে কোনটি বৈধ এবং কোনটি অবৈধ তা নির্ণীত হয়।

অনুরূপভাবে ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও ইসলামের কতিপয় নীতিমালা রয়েছে। বহুল প্রচলিত ই-কমার্স তথা অনলাইনে ক্রয়-বিক্রয় যদি সে নীতিমালা অনুযায়ী পরিচালিত হয়, তবে সেটি বৈধ, অন্যথা অবৈধ।

ই-কমার্সের সংজ্ঞা : ই-কমার্স হচ্ছে একটি বাণ্যিজ্য ক্ষেত্র। যেখানে ইলেক্ট্রনিক সিস্টেম তথা ইন্টারনেটের মাধ্যমে পণ্য ও সেবা ক্রয়-বিক্রয় হয়ে থাকে।

ইন্টারনেট ব্যবহার করে পণ্য ক্রয়-বিক্রয়, অর্থ লেনদেন ও ডাটা আদান-প্রদানই হচ্ছে ই-কমার্স বা ই-বাণিজ্য। বিশ শতকের শেষের দিকে উন্নত দেশগুলোতে ডিজিটাল বিপ্লব শুরু হ’লেও একুশ শতকে এসে উন্নয়নশীল দেশ সমূহে তার ছোঁয়া লাগে। ২০০৯ সাল পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের গ্রামে-গঞ্জে ইন্টারনেট বিস্তৃত হওয়ায় ই-কমার্স সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরী হয়। যান্ত্রিক জীবনে ব্যস্ত মানুষদের কাছে বর্তমানে ই-কমার্স হচ্ছে একটি জনপ্রিয় ক্রয়-বিক্রয়ের মাধ্যম। বিশেষ করে করোনা মহামারির দুর্যোগপূর্ণ এ সময়ে অনলাইনে ক্রয়-বিক্রয় বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে।

নতুন ও প্রতিযোগিতামূলক এ বিশ্বে ইন্টারনেট প্রধানত মানুষের আচরণ, ধ্যান-ধারণা এবং ব্যবসা-বাণিজ্যকে প্রভাবিত করে। যেহেতু বর্তমান পৃথিবীতে প্রায় ১.৮ বিলিয়ন মানুষ মুসলিম, সেহেতু ব্যবসা-বাণিজ্যের এ নতুন সংস্করণ ইসলামী শরী‘আত অনুযায়ী পরিচালিত হওয়া সময়ের দাবী।

এ বিষয়ে মুসলিম গবেষকদেরও সক্রিয় হওয়া যরূরী। যাতে করে ই-কমার্স থেকে সূদের অনুপস্থিতি এবং অবৈধ তথা হারাম পণ্য থেকে বেঁচে থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করা যায়।

ইসলামী শরী‘আতের মানদন্ডে ই-কমার্স : ইসলাম শুধুমাত্র ধর্ম নয়; বরং একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা। মানুষের চিন্তা-চেতনা, আচার-আচরণ, কৃষ্টি-কালচার সবকিছুর সমন্বয়েই হচ্ছে ইসলাম। ইসলাম মানুষকে কোন ক্ষেত্রেই লাগামহীন স্বাধীনতা দেয়নি। সর্বক্ষেত্রেই রয়েছে সুনির্দিষ্ট কিছু নীতিমালা। ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও এর ব্যত্যয় ঘটেনি। যেহেতু ই-কমার্স হচ্ছে ব্যবসা-বাণিজ্যের একটি নতুন সংস্করণ। সুতরাং ইসলামী নীতিমালার উপর ভিত্তি করে ই-কমার্সের একটি ধারণা রয়েছে, যা প্রচলিত বাণিজ্যনীতির অনুরূপ। আর ই-কমার্সের বিধি সমূহ অবশ্যই ইসলামী নীতিমালা অনুযায়ী হ’তে হবে। শরী‘আত কর্তৃক অনুমোদিত হ’তে হবে। যেমন কুরআন মাজীদে বিধৃত হয়েছে,فَإِذَا قُضِيَتِ الصَّلَاةُ فَانْتَشِرُوا فِي الْأَرْضِ وَابْتَغُوا مِنْ فَضْلِ اللهِ وَاذْكُرُوا اللهَ كَثِيرًا لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ- ‘অতঃপর ছালাত শেষ হ’লে তোমরা যমীনে ছড়িয়ে পড় এবং আল্লাহর অনুগ্রহ তালাশ কর। আর তোমরা আল্লাহকে অধিকহারে স্মরণ কর যাতে তোমরা সফলকাম হ’তে পার’ (জুম‘আ ৬২/১০)

উল্লেখিত আয়াত থেকে প্রতীয়মান হয় যে, আল্লাহ তাঁর বান্দাকে ততক্ষণ পৃথিবীতে যেকোন তৎপরতা চালানোর অনুমতি দেন, যতক্ষণ না এটি ইসলামী শরী‘আত বিরোধী হয়। সুতরাং নীতিগতভাবে ই-কমার্স যতক্ষণ না ইসলামী বিধানসমূহ লঙ্ঘন করে ততক্ষণ তা বৈধ। ই-কমার্স গ্রহণীয় বা বর্জনীয় হওয়ার ব্যাপারে প্রধান দু’টি মূলনীতি রয়েছে।

(১) মূলগত : ই-কমার্সে লেন-দেনকৃত পণ্যও উপাদান বৈধ হ’তে হবে। অবৈধ পণ্যের কারবার বা ব্যবসা বর্জন করতে হবে। যেমন মদ, জুয়া, সূদ ইত্যাদি। কারণ এসব বিষয় মৌলিকভাবে ইসলামে হারাম। আল্লাহ বলেন, يَا أَيُّهَا النَّاسُ كُلُوْا مِمَّا فِي الْأَرْضِ حَلَالًا طَيِّبًا وَلَا تَتَّبِعُوْا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُبِيْنٌ- ‘হে মানব জাতি! তোমরা পৃথিবী থেকে হালাল ও পবিত্র বস্ত্ত ভক্ষণ কর এবং শয়তানের পদাংক অনুসরণ করো না। নিশ্চয়ই সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু’ (বাক্বারাহ ২/১৬৮)

(২) পদ্ধতিগত : অনলাইনে ক্রয়-বিক্রয় সকল অবস্থায় বৈধ পন্থায় হ’তে হবে। অর্থাৎ সেখানে কোন ধরনের ধোঁকাবাজি, ভেজাল ও ফাঁক-ফোকর থাকতে পারবে না। কোন ধরনের মিথ্যার আশ্রয় নেওয়া যাবে না। আল্লাহ বলেন, يَا أَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُوا لَا تَأْكُلُوْا أَمْوَالَكُمْ بَيْنَكُمْ بِالْبَاطِلِ إِلَّا أَنْ تَكُوْنَ تِجَارَةً عَنْ تَرَاضٍ مِنْكُمْ- ‘হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করো না, তোমাদের পারস্পরিক সম্মতিতে ব্যবসা ব্যতীত’ (নিসা ৪/২৯)

উপরোক্ত আলোচনা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, হালাল ও হারাম সুস্পষ্ট। আর যেকোন হালাল পণ্যে যদি নিম্নোক্ত দু’টি শর্ত পাওয়া যায় তবে অনলাইনে ক্রয়-বিক্রয় জায়েয।

প্রথমত : বিক্রেতা যে পণ্যের বিজ্ঞাপন দিবে সেটি তার পূর্ণ মালিকানায় থাকতে হবে। কেননা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর বাণী- لَا تَبِعْ مَا لَيْسَ عِنْدَكَ ‘যা তোমার কাছে নেই তা বিক্রি কর না’।[1] তবে যদি এমন হয় যে, বিক্রেতার ফ্যাক্টরীতে উপকরণ সমূহ পূর্ণ মাত্রায় রয়েছে এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ক্রেতার হাতে পণ্য তুলে দিতে পারবে, তাহ’লে পণ্যের বিক্রির বিজ্ঞাপন দেওয়া বৈধ হবে।

দ্বিতীয়ত : পণ্যটি স্পষ্ট হ’তে হবে। অর্থাৎ যে পণ্যটি বিক্রয় করা হবে সেটির গুণ, পরিমাণ সহ বিস্তারিত বর্ণনা থাকতে হবে। কোন কিছু গোপন করা অথবা অস্পষ্ট রাখা যাবে না। নু‘মান বিন বশীর (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,الْحَلاَلُ بَيِّنٌ، وَالْحَرَامُ بَيِّنٌ وَبَيْنَهُمَا أُمُوْرٌ مُشْتَبِهَةٌ، ‘হালাল সুস্পষ্ট এবং হারামও সুস্পষ্ট। উভয়ের মাঝে রয়েছে বহু অস্পষ্ট বিষয়’।[2]

ই-কমার্সে কতিপয় সমস্যা ও উত্তরণের উপায় : সততা, একাগ্রতা ও বিশ্বস্ততা ইসলামী ব্যবসার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। ব্যবসায়িক লেনদেনে একজন উদ্যোক্তাকে সৎ এবং বিশ্বস্ত হওয়া বাঞ্ছনীয়। ক্রয়-বিক্রয় বা লেনদেনে মিথ্যা, প্রতারণা এবং ওয়াদা ভঙ্গ করার কোন অভিপ্রায় রাখা যাবে না। তাছাড়া প্রত্যেক উদ্যোক্তাকে তার দেওয়া শর্ত সমূহ যথাযথভাবে পূরণে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হ’তে হবে। পণ্য বিক্রয়ের বিজ্ঞাপনে অবশ্যই স্পষ্ট ছবি দিতে হবে এবং পণ্য সংশ্লিষ্ট কোন সত্য গোপন করা যাবে না। এ বিষয়গুলি অবলম্বন করে একটি আদর্শিক ই-কমার্সের নমুনা দাঁড় করানো সম্ভব। এ সম্পর্কে উৎসাহিত করে রাসূল (ছাঃ) বলেছেন,أطيب الكسب عمل الرجل بيده؛ وكل بيع مبرور، ‘উত্তম কামাই হ’ল একজন মানুষের তার নিজের হাতের কামাই এবং সব ধরনের বৈধ ব্যবসা-বাণিজ্যের উপার্জন’।[3]

কিন্তু তা সত্তেবও ধর্মীয় বিধানকে পাশ কাটিয়ে মানুষের অসত্য আচরণের কারণে ই-কমার্স নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। বাংলাদেশে ই-কমার্স যাত্রা শুরুর বয়স এক দশকের কম হ’লেও তা ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। ই-ক্যারের সভাপতি শমী কায়সারের দেওয়া তথ্য মতে, অনলাইনে মাসে প্রায় ৭০০ কোটি টাকার বেচাকেনা হচ্ছে। তবে করোনার সময় তা তিন গুণ বেড়েছে। নামে বেনামে কত প্রতিষ্ঠান ই-কমার্স সেবা দিচ্ছে তার ইয়ত্তা নেই। এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন অসাধু ব্যবসায়ীও সক্রিয় হয়ে উঠেছে।

এক ধরনের পণ্য দেখিয়ে অন্য ধরনের পণ্য দেওয়া, পণ্যের গুণাগুণ মান সম্পন্ন না হওয়া এবং নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ না করা এসব অভিযোগ রয়েছে ই-কমার্সের বিরুদ্ধে। বড় কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আছে তন্মধ্যে অনলাইনে যেই ধরনের পণ্য দেখাচ্ছে ভোক্তা ঠিক সেই পণ্যটি পাচ্ছে না। ভিন্ন পণ্য দেওয়া হচ্ছে বা পণ্যের আকার আকৃতি ঠিক থাকছে না।

লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, ই-কমার্সে সবচেয়ে বড় বিষয় হ’ল গ্রাহকদের বিশ্বস্ততা। তা যদি রক্ষা না করা যায়, তবে এ শিল্পের উপর মানুষ আস্থা হারাবে। তাই উল্লেখিত সমস্যা সমূহ সমাধানে কতিপয় করণীয় নিম্নে উল্লেখ করা হ’ল।-

ব্যবসায় কারো ক্ষতি সাধন না করা : মুসলিমরা তরবারি দিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন ভূখন্ড জয় করেছে তা যেমন ঠিক। আবার উন্নত চরিত্র, মাধুর্য, সাম্য, সততা প্রভৃতি গুণে সেসকল অঞ্চলের মানুষদের মন জয় করে নিয়েছিল এটাও ঠিক। অর্থাৎ তরবারির ব্যবহারে খেলাফত রাষ্ট্র সম্প্রসারিত হয়েছে আর আদর্শের জোরে মুসলিম অনুসারী বৃদ্ধি পেয়েছে।

অমুসলিমরা আমাদের ধর্মগ্রন্থের পৃষ্ঠা উল্টিয়ে যাচাই করবে না। বরং আমাদের আচরণে তারা প্রভাবিত হবে। Best Dawah of a muslim is his attitude. অতএব ব্যবসায় কারো ক্ষতি সাধন করা যাবে না। সেদিকে লক্ষ্য রেখে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, لَا ضَرَرَ وَلَا ضِرَارَ ‘নিজে ক্ষতিগ্রস্ত হয়োও না এবং অন্যের ক্ষতি করো না’।[4]

ধোঁকা ও প্রতারণা না করা : পণ্য বিক্রয়ে ধোঁকা ও প্রতারণার আশ্রয় নেওয়া যাবে না। কেননা এটি ইসলামে নিষিদ্ধ। আবু হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘একদিন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বাযারে গিয়ে একজন খাদ্য বিক্রেতার পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলেন। তিনি খাদ্যের ভিতরে হাত প্রবেশ করিয়ে দেখলেন ভিতরের খাদ্যগুলো ভিজা বা নিম্নমানের। এ অবস্থা দেখে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, হে পণ্যের মালিক! এটা কি? লোকটি বলল হে আল্লাহর রাসূল! এতে বৃষ্টি পড়েছিল। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, তুমি সেটাকে খাবারের উপরে রাখলে না কেন, যাতে লোকেরা দেখতে পেত? مَنْ غَشَّ فَلَيْسَ مِنِّي ‘যে ধোঁকা দেয়, সে আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়’।[5]

উল্লিখিত হাদীছ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, পণ্য ক্রয়-বিক্রয়ে দোষ-ত্রুটি ঢেকে রাখা ধোঁকা বা প্রতারণার শামিল।

নিজ স্বার্থ রক্ষায় পণ্যের গুণ ও পরিমাণ কম-বেশী না করা : পণ্য সরবরাহের সময় নিজ স্বার্থ রক্ষায় চুক্তির তুলনায় পণ্যের গুণগত মান এবং পরিমাণ কম দেওয়া যাবে না। এটি জঘন্য অপরাধ। আল্লাহ বলেন,وَيْلٌ لِلْمُطَفِّفِينَ، الَّذِينَ إِذَا اكْتَالُوا عَلَى النَّاسِ يَسْتَوْفُونَ، وَإِذَا كَالُوهُمْ أَوْ وَزَنُوهُمْ يُخْسِرُونَ، ‘দুর্ভোগ মাপে কম দানকারীদের জন্য। যারা লোকদের কাছ থেকে মেপে নেয়ার সময় পূর্ণ মাত্রায় নেয় এবং যখন লোকদের মেপে দেয় বা ওযন করে দেয়, তখন কম দেয়’ (মুতাফফিফীন ১-৩)। তিনি আরো বলেন,وَيَا قَوْمِ أَوْفُوا الْمِكْيَالَ وَالْمِيزَانَ بِالْقِسْطِ وَلَا تَبْخَسُوا النَّاسَ أَشْيَاءَهُمْ وَلَا تَعْثَوْا فِي الْأَرْضِ مُفْسِدِينَ، ‘হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা ন্যায়পরায়ণতার সাথে মাপ ও ওযন পূর্ণ করে দাও এবং মানুষকে তাদের প্রাপ্য বস্ত্ততে কম দিয়ো না। আর জনপদে বিশৃংখলাকারী হয়ে ঘুরে বেড়িয়ো না’ (হূদ ১১/৮৫)

রাসূল (ছাঃ) বলেন, ‘যখন কোন জাতি ওযন ও পরিমাপে কারচুপি করে তখন তাদের উপর নেমে আসে দুর্ভিক্ষ ও কঠিন বালা-মুছীবত’।[6]

ব্যবসা ও সূদ একীভূত করা না : সূদ পৃথিবীর প্রাচীনতম অপরাধ সমূহের অন্যতম। ব্যবসার নামে কোন প্রকার সূদ চালু করা যাবে না। যেমন নির্দিষ্ট সময়ে পণ্যের মূল্য পরিশোধ করতে না পারলে চুক্তির তুলনায় বেশী অর্থ আদায় করা। কিস্তিতে পণ্য বিক্রয়ের নামে বিভিন্ন হারে সূদ গ্রহণ করা বৈধ নয়। এ সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَأَحَلَّ اللهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا ‘আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন ও সূদকে হারাম করেছেন’ (বাক্বারাহ ২/২৭৫)। তিনি আরো বলেন,يَمْحَقُ اللهُ الرِّبَا وَيُرْبِي الصَّدَقَاتِ، ‘আল্লাহ সূদকে নিশ্চিহ্ন করেন এবং দান খয়রাতকে বর্ধিত করেন’ (বাক্বারাহ ২/২৭৬)। তাছাড়া রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) সূদ গ্রহণকারী, প্রদানকারী এবং সাক্ষী সকলকে অভিশাপ দিয়েছেন’।[7]

অপরের মাল হনন না করা : ই-কমার্সের জটিল মারপ্যাচে অন্যের মাল হরণ করা হারাম। প্রি-পেমেন্টের ক্ষেত্রে অনেক সময় দেখা যায় যে, পণ্যের অর্থ ক্রেতার কাছ থেকে কোম্পানির হাতে পৌঁছার পর সে আর পণ্যের ডেলিভারি দিচ্ছে না। আবার পোস্ট পেমেন্টের ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, পণ্যের ডেলিভারি গ্রাহকের হাতে পৌঁছানোর পর সে আর অর্থ পরিশোধ করছে না। অথচ আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা একে অপরের মাল অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করো না’ (নিসা ৪/২৯)

ইসলামের বিজনেস কনডাক্ট সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,رَحِمَ اللهُ رَجُلاً سَمْحًا إِذَا بَاعَ، وَإِذَا اشْتَرَى، وَإِذَا اقْتَضَى، ‘আল্লাহ ঐ ব্যক্তির উপরে রহম করুন যে লোক বিক্রয়ের ক্ষেত্রে ও ক্রয়ের ক্ষেত্রে এবং নিজের প্রাপ্য আদায়ের জন্য চাওয়ার ক্ষেত্রে সহনশীল হয়’।[8]

ই-কমার্সের অর্থ পরিশোধ পদ্ধতি : অনলাইনে পণ্য ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে অর্থ পরিশোধ করা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তবে ই-কমার্সের একমাত্র বিতর্কিত বিষয় হচ্ছে অর্থ পরিশোধ করার পদ্ধতি। যেখানে সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। এখানে সন্দেহের বিষয় হ’ল অর্থ পরিশোধ করার বিষয়টি ইসলামী পদ্ধতিতে হচ্ছে কি-না? ই-কমার্সে অর্থ লেনদেনের বেশ কয়েকটি পদ্ধতি রয়েছে।

মোবাইল ব্যাংকিং : বর্তমানে লেনদেনের সবচেয়ে সহজ মাধ্যম হ’ল মোবাইল ব্যাংকিং। সাধারণত এটি ব্যবহার করে বেচা-কেনা করতে ইসলামের কোন নিষেধাজ্ঞা নেই। কিন্তু ডাচ বাংলা, বিকাশের মতো কিছু সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান তাদের একাউন্টে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা জমা রাখলে এর বিনিময়ে সূদ প্রদান করে। যদি কারো একাউন্টে সূদের টাকা জমা থাকে তাহ’লে সেই টাকা দিয়ে পণ্য ক্রয়-বিক্রয় জায়েয হবে না।

ডেবিট কার্ড : ডেবিট কার্ডের মাধ্যমে যেহেতু ক্রেতা তার নিজের একাউন্টে বিদ্যমান টাকা খরচ করতে পারে তাই এই সিস্টেমে মূল্য পরিশোধ করা জায়েয। তবে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে সেখানে যেন সূদের টাকা মিশ্রিত না হয়।

ক্রেডিট কার্ড : বর্তমানে প্রচলিত ক্রেডিট কার্ড পদ্ধতি ব্যবহার করে অর্থ পরিশোধ করার ক্ষেত্রে বেশীরভাগ ইসলামী বিশেষজ্ঞ নিষেধ করেছেন। কেননা ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে পণ্যের অর্থ পরিশোধ করার অর্থ হচ্ছে, সূদে ঋণ নিয়ে সেই টাকায় পণ্যের অর্থ পরিশোধ করা।

পরিশেষে বলব, ব্যবসা-বাণিজ্যের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করা বৈধ ও উত্তম। ইসলাম কখনোই শিল্প, সভ্যতা এবং প্রযুক্তি বিকাশের অন্তরায় ছিল না। বরং সর্বদা সহায়ক ছিল। তাই ইসলাম ই-কমার্সকে কখনোই নিরুৎসাহিত করে না বরং এসব নতুনত্বকে স্বাগত জানায়। তবে যেসব কারণে ই-কমার্স হারাম হ’তে পারে সেগুলো সর্বতোভাবে বর্জন করার আপ্রাণ চেষ্টা করতে হবে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে নিজেদের সার্বিক জীবন পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছের আলোকে ঢেলে সাজানোর তাওফীক দান করুন-আমীন!

 

আব্দুল্লাহ আল-মুছাদ্দিক
বিএসএস (সম্মান), ৪র্থ বর্ষ, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
উৎস: মাসিক আত-তাহরীক

[1]. তিরমিযী হা/১২৩২; আবুদাঊদ হা/৩৫০৩; ছহীহুল জামে‘ হা/৭২০৬
[2]. বুখারী হা/২০৫১; মিশকাত হা/২৭৬২।
[3]. আহমাদ হা/১৭৩০৪; মিশকাত হা/২৭৮৩; ছহীহাহ হা/৬০৭
[4]. ইবনে মাজাহ হা/২৩৪১; ইরওয়া হা/৮৯৫; ছহীহাহ হা/২৫০।
[5]. মুসলিম হা/১০২; মিশকাত হা/২৮৬০; তিরমিযী হা/১৩১৫
[6]. ইবনু মাজাহ হা/৪০১৯; ছহীহাহ হা/১০৬; ছহীহুল জামে‘ হা/৭৯৭৮
[7]. মুসলিম হা/১৫৯৮; ইবনে মাজাহ হা/২২৭৯; মিশকাত হা/২৮০৭
[8]. বুখারী হা/২০৭৬; মিশকাত হা/২৭৯০

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

মন্তব্য করুন

Back to top button