ছোটগল্প/উপন্যাস

স্বপ্নভঙ্গ

আজ কয়েক সপ্তাহ পর ঘরে ফিরে রাহির প্রথমেই মনে হলাে কথা। কতদিন মিনার সাথে কথা হয় না! অথচ বাসায় থাকলে দয় প্রতিদিনই দেখা হয়। দেখা না হলেও নিদেনপক্ষে ফোনে তাে কথা হয়ই। বহুদিন পর ছুটি পেয়ে দাদুর বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিল সে। সেখানে থাকতে ভালােই লাগছিল। শিকড়ের কাছে গেলে কার না ভালাে লাগে! কিন্তু ছুটিতে থেকেও সে মিনাকে ভীষণ মিস করছিল।

ঘরে ফেরা মাত্রই হাতমুখ ধুয়ে কাপড় বদলে মিনাকে ফোন করল রাহি। মায়ের চোখ রাঙ্গানী উপেক্ষা করে ফোনটা নিয়ে ড্রইংরুমে বসল আয়েশ করে। লম্বা আলাপের প্রস্তুতি। ওদিক থেকে মিনার কথা যেন উপচে পড়ছে!

“কিরে, কোথায় যে গেলি! ফোন নেই, মােবাইল নেই। মনে হয় একেবারে পৃথিবীর বাইরে’!

না রে, তাের কথা প্রতিদিন মনে হয়েছে। কিন্তু তুই তাে জানিস আমরা ছাড়া আমাদের আত্মীয়স্বজন আর কেউ চট্টগ্রামে থাকে না। এতদিন পর আমাকে পেয়ে কোনাে ছাড়াছাড়ি নেই। সবাই মিলে খাওয়া-দাওয়া । বেড়ানাে, গল্পগুজব। তবে তােকে সত্যিই খুব মিস করেছি রে! দেখছিস না? এইমাত্র এলাম, ভাতও খাইনি, ফোন নিয়ে বসলাম। আম্মু চোখ গােল গােল করে তাকিয়ে আছে, হি হি হি।

তাহলে যা, তাড়াতাড়ি ভাত খেয়ে আয়। তারপর আমি ফোন করব, কথা আছে।

‘তাহলে তাে খাওয়াই যাবে না। কথা না শুনে ভাত খেতে গেলে আমার পেটের গণ্ডগােল হয়ে যাবে! তাড়াতাড়ি বলা শুরু কর।

কী মুশকিল! আচ্ছা, শােন তাহলে, আমার বিয়ে ঠিক হয়েছে…’

মিনা আ আ আ’, খুশিতে লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ালাে রাহি, তুই এতক্ষণ কী করে এই কথাটা চেপে রাখলি? কবে কী হলাে? ছেলে কেমন? আঙ্কেল-আন্টি খুশি তাে?’

“আহ, এত প্রশ্নের উত্তর একবারে কীভাবে দেব? এক এক করে বলতে দে রে বাবা! গত সপ্তাহে ওরা আমাকে দেখে গেলাে। আবার গতকাল এসে আংটি পরিয়ে দিলাে। ছেলে ডাক্তার। সুতরাং, বুঝতেই পারছিস, আম্মু খুশিতে আটখানা।

তুই খুশি? ‘হ্যাঁ, অবশ্যই’! ‘ছেলের সাথে কথা বলেছিস? নাহ, আমার বােন বলেছে। ‘ছেলে দেখতে কেমন? জানি না, আমি তাে দেখিনি। আমার বােন দেখেছে, ও বলেছে ভালােই।

‘আমি বুঝলাম না, বিয়ে কি তাের না তাের বােনের? তুই তাে ইসলাম সম্পর্কে আমার চেয়ে ভালাে জানিস। যার সাথে সারাজীবন থাকবি তাকে একনজর দেখবি না? একবার কথা বলে বুঝার চেষ্টা করবি না। তার সাথে তাের মনের মিল হবে কি না? ছেলে ডাক্তার, ফেরেস্তা তাে না!

সত্যি কথা বলি, কথাটা আমারও মনে এসেছে। কিন্তু আম্বু আম্মুকে কী করে বলি?

‘আন্টিকে ফোন দে, আমি বলছি।’

“ধুর, তুই আসায় এখন আমি সাহস পাচ্ছি। তুই ভাত খেতে যা, আমি আম্মুর সাথে কথা বলে তােকে জানাচ্ছি।’

রাহি ভাত বেড়ে নিতে নিতেই মিনার ফোন এলাে। আম্মুর একটা ভ্রু একটু উঁচু হয়ে গেল। কিন্তু তিনি তাঁর মেয়েকে জানেন, তাই কিছু বললেন না। ওপাশ থেকে মিনার স্বর শুনে ওর মনের ভেতরকার আন্দোলন টের পাওয়া যাচ্ছে, আম্মুকে বলার সাথে সাথে আম্মু রাজি হয়ে গেল, যেহেতু অলরেডি আংটি পরানাে হয়ে গেছে। ঘটক পাশের বাসার আমিন চাচা। উনার সাথে কথা বলতেই উনি জানালেন ছেলে এখন উনার বাসায় আছে। তাই আমি এখন যাচ্ছি, আমার ভবিষ্যৎকে নিজ চোখে দেখতে। দোয়া করিস, যেন প্রথম দেখাতেই ভালাে লাগে। আমি এসেই তােকে ফোন করব।

ভাতের টেবিলে ফিরে গিয়ে রাহি যেন কল্পনার রাজ্যে অবগাহন করতে লাগল। ওর বান্ধবীটি হবু স্বামীর সাথে কথা বলে আনন্দে আপ্লুত। ওর শ্বশুরবাড়ি যাবার ব্যাপারে যে ভয়-দ্বিধা-সংকোচ সব এই সাক্ষাতের মাধ্যমে দূর হয়ে গেল। তারপর Happily ever after! ওর কল্পনায় ছেদ ঘটিয়ে মিনার ফোন। এবার আম্মু টেবিল থেকে উঠে চলে গেলেন। বেচারি, রাহির জ্বালায় তাঁর জীবনটা অতিষ্ঠ হয়ে গেল! কিন্তু ওপাশে মিনার অস্বাভাবিক কণ্ঠস্বর রাহিকে আপাতত আম্মুর দুশ্চিন্তার কথা ভুলিয়ে দিল।

“কিরে! তুই গেলি কখন, এলি কখন, কথা বললি কখন? মিনা হাঁপাচ্ছিল, ‘তুই চুপচাপ আমার কথা শােন। তারপর বল . আমার কী করা উচিত?

মিনার সিরিয়াসনেস রাহিকে সটান অ্যাটেনশন ভঙ্গীতে দাঁড় করিয়ে দিল, বল।

‘আমি দুরাকাত নামায পড়ে দোয়া করলাম যেন ছেলেকে আমার পছন্দ হয়। তারপর পাশের বাসায় গেলাম। চাচা বাসায় ছিল না। চাচী দরজা খুলে দিয়ে আমাদের কিছুটা আড়াল দেয়ার জন্য বেডরুমে চলে গেলেন। বুয়া ডাইনিং টেবিল মুছে রান্নাঘরে চলে গেল। ড্রইংরুমে কেউ নেই। ডাইনিং রুমে দেখি হুজুর বসা। আমি কিছুক্ষণ এদিক সেদিক তাকিয়ে আর কাউকে দেখলাম না। তারপর চিন্তা করলাম, ‘এ বাসায় তাে কোনো বাচ্চা নেই! তাহলে ঐ হুজুরই নিশ্চয় আমার হবু বর’! তুই তাে জানিস, আমি দাড়ি পছন্দ করি। কিন্তু এই লােকটার গুটিকয়েক দাড়ি, অযত্নে এদিক সেদিক ছড়িয়ে আছে। তার না আছে ছাঁট, না আছে যত্ন! লােকটা একটা পাতলা ফিনফিনে পাঞ্জাবী পরে আছে। না জানি কতদিন মার দেয়া বা ইস্ত্রি করা হয় না। কে বলবে সে একজন ডাক্তার? পরে জানলাম, সে সবসময় পাজামা পাঞ্জাবীই পরে। পাজামা পাঞ্জাবীর ব্যাপারে আমার কোনাে আপত্তি নেই। কিন্তু একটা পরিচ্ছন্নতার ব্যাপার আছে না? মনে মনে ভাবলাম, যাই হােক, বিয়ের পর দাড়ি ঠিকঠাক করে, আড়ং থেকে পাঞ্জাবী পাজামা কিনে লােকটাকে মানুষ করতে হবে।

‘দেখা হবার পর সালাম দিলাম, সে কোনাে জবাব দিলাে না। যেন সালামটা তার প্রাপ্য। বসে থেকেই বলল, বস। আমার তাে অতটুকুতেই মাথা খারাপ! প্রথমত, এই লােক মহিলাদের সম্মান করতে জানে না; দ্বিতীয়ত, এঙ্গেজমেন্ট হতেই সে ধরে নিয়েছে সে একটা অপরিচিত মেয়েকে প্রথম দেখাতেই তুমি বলতে পারে! বিয়ে হলে তাে এই লােক আমাকে পাত্তাই দেবে না!

তুই যদি ভাবিস এতটুকুতেই আমি ভেঙ্গে পড়লাম, তাহলে শােন তারপর কী হলাে। আমাকে কিছু জিজ্ঞেস না করে সে নিজেই গড়গড় করে বলতে শুরু করল, তােমাকে পর্দা করতে হবে, নামায পড়তে হবে, বাসায় টিভি রাখা যাবে না। সুতরাং তােমাকে টিভি দেখা ছেড়ে দিতে হবে…।’

সে দেখতেই পাচ্ছে আমি পর্দা করি। এতে ধরে নেয়া যায় আমি নামাযও পড়ি। টিভি দেখার প্রতি আমার তেমন নেশা নেই, অনার্সের ছাত্রীদের এতাে সময় কোথায়? কিন্তু যে লােকের অ্যাটিচ্যুড প্রথম থেকেই স্বৈরাচারী ধরনের তার সাথে কী করে ঘর করব? সবশেষে সে আমার কিছু জিজ্ঞাসা আছে কিনা বা আমাকে কিছু বলার সুযােগ না দিয়েই বলল, এবার তুমি যেতে পার। আমি হতভম্ব হয়ে চলে এলাম।

সত্যি কথা, রাহি, আমি যদি বাসর রাতে এই লােককে প্রথম দেখতাম তবে হার্টফেল করে মারা যেতাম! আল্লাহ তােকে রহমত করুন যে, তুই আমাকে দেখার পরামর্শ দিয়েছিলি। আমি এখন বুঝলাম, নিজে দেখা আর কাছের মানুষের দেখাতেও অনেক তফাৎ। আব্বুর সামনে নিশ্চয় সে খুব ভদ্র ছেলের মতাে চুপচাপ বসেছিল। সুতরাং আব্বুর মনে হয়েছে বাহ, কত ভালাে ছেলে, মুরুব্বীদের কত সম্মান করে’! আম্মুর তাে ডাক্তার দেখে আর কোনাে কিছু জানার বা চাওয়ার ছিল না। আমার বােন যেহেতু ইসলাম সম্পর্কে অতটা সচেতন নয়। তাই হয়তাে ওর মনে হয়েছে, মিনা যেহেতু পর্দা করে ওর নিশ্চয় অ্যাপিয়ারেন্সের ব্যাপারে কোনাে মাথাব্যথা নেই! সবচেয়ে বড় কথা, সে আমাকে যা বলেছে এসব তাে আর কারাে সাথে বলার কথা না। তাহলে ওরা বুঝবে কী করে যে এরকম একজন শিক্ষিত মানুষের মধ্যে এমন এক… সত্ত্বা লুকিয়ে আছে?

‘রাহি, আমি এই বিয়ে করতে পারব না! সারাজীবন আগুনের মধ্যে বসবাস করা কি সম্ভব? কিন্তু আম্মুকে বুঝাবে কে?

রাহি শেষ পর্যন্ত কথা বলল, মিনা, তুই যদি মনে করিস তুই কোনােভাবেই এই লােকের সাথে সংসার করতে পারবি না, তাহলে সিদ্ধান্ত নেয়ার এখনই সময়। তুই আন্টির সাথে কথা বল। সংসার যেহেতু তুই করবি, তাের হক সবার আগে।

তারপর তিনদিন মিনাদের বাসায় ঝড় চলল। মিনার আম্মু কিছুতেই এই বিয়ে ভাঙতে দেবেন না। মিনার রাজ্যের বান্ধবীরা এসে ওর আম্মুকে বুঝানাের চেষ্টা করল। উনার এক কথা, ‘ছেলে ডাক্তার। তাছাড়া আংটি পরানাে হয়ে গিয়েছে। এখন এই বিয়ে হবেই।

তিনদিন পর মিনা রাহিকে ফোন করে বলল, এবার তােকে আসতে হবে, আমি জানি আম্মু তাের ছাড়া আর কারাে কথা শুনবে না।’

রাহি এই জিনিসটাই ভয় পাচ্ছিল। আন্টি রাহিকে এতাে ভালােবাসেন যে, তাঁকে কষ্ট দিতে ওর ইচ্ছে হচ্ছিল না। কিন্তু মিনাকে সাহায্য করতে হলে এই কঠিন কাজটিই ওকে করতে হবে।

সেদিন বিকেলে সে মিনাদের বাসায় গেল। ঘরভর্তি মিনার বান্ধবীদের দল, মাঝখানে আন্টি অনড়। রাহিকে দেখে আন্টি সম্বিত ফিরে পাবার মতাে দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরলেন, কেমন আছিস মা? এতদিন পর এলি? আয়, আগে ভাত খাবি।’

রাহিকে নিয়ে আন্টি ডাইনিং টেবিলে বসিয়ে দিলেন। আন্টিকে কী বলবে এই টেনশনে রাহি তখনও খেতে পারেনি। কিন্তু কথাগুলাে সে সবার সামনে বলতে চাইছিল না। তাই খাবার ছলে সে কিছু সময় ব্যয় করতে চাইল যেন অন্যরা সবাই চলে যায়। আন্টি সব সময়কার মতাে আদর করে ওকে মুরগির রান তুলে দিয়ে অন্যদের বিদায় করতে চলে গেলেন। সে এত বছরে যা বলতে পারেনি তা আজও বলতে পারল না। আন্টি, আমি রান পছন্দ করি না। বুকের মাংস পছন্দ করি।’

আন্টি চলে যেতেই মিনা কাছে এল। আস্তে করে বলল, “Thank you’!

রাহি বলল, শােন, তাড়াতাড়ি সবাইকে বিদায় কর। আমি আন্টির সাথে একা কথা বলব। তুই তাে জানিস আমার বাসায় সান্ধ্য-আইন, মাগরিবের আগেই ফিরতে হবে।’

মিনার বান্ধবীরা ব্যর্থ মনােরথে ফিরে যাবার সময় ডাইনিং টেবিলের কাছে এসে করুণ চেহারা করে রাহির কাছে বিদায় নিয়ে যেতে লাগল। সবাই চলে গেলে আন্টি এসে ওর পাশে বসলেন, “দেখ তাে মা, মিনা কী শুরু করেছে! ডাক্তার ছেলে, সে বলে কিনা বিয়ে করবে না! বল তাে মা আমি ওকে কী করে বুঝাই?

মিনা কিছু বলতে যাচ্ছিল, রাহি ওকে চোখের ইশারায় থামিয়ে দিল। একটু হেসে বলল, আন্টি, আপনার খুশি দেখে আমার যে কী মজা লাগছে! মনে হচ্ছে, আপনারই বিয়ে হচ্ছে!

আন্টি একগাল হেসে বললেন, তুই না খুব দুষ্টুমি করিস। তবে এই বিয়েতে আমি খুব খুশি, এতে কোনাে সন্দেহ নেই।

‘আন্টি, একটা জিনিস ভেবে দেখুন তাে, সংসার তাে আপনি করবেন না, করবে মিনা। তাহলে আপনার পছন্দের পাশাপাশি ওর পছন্দ হওয়াটাও কি জরুরি নয়?

আন্টি মাথা ঝাঁকালেন , “সে তাে শুধু শুধুই বিয়েতে অমত করছে!”

রাহি বলে চলল, এটাতাে মিনার জীবনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটা ব্যাপার, আন্টি! ধরুন, ছেলের সবকিছু ভালাে, তারপরও মিনা তাকে সহ্য করতে পারে না। কী হবে বলুন তাে? সে অসুখী হবে, কদিন পর পর বাপের বাড়ি চলে আসবে। ওর অনিচ্ছাসত্ত্বেও আপনি ওকে আবার ফেরত পাঠাতে বাধ্য হবেন। সে কান্নাকাটি করে আপনাকে দোষারােপ করবে। বলুন তাে আন্টি, আপনার মেয়ে যদি সুখী না হয়, আপনি কি সুখী হবেন?

আন্টি মরিয়া হয়ে বললেন, কিন্তু ছেলে যে ডাক্তার’!

আন্টির ছেলেমানুষি দেখে হাসল রাহি, আন্টি, ডাক্তার তাে বাংলাদেশে অনেক আছে। হয়তাে ওর জন্য এমন ডাক্তার আপনি পেয়ে যেতে পারেন যাকে ওর পছন্দ হবে। আর যদি কোনাে ডাক্তার পাওয়া নাই যায় , তাহলেও বলুন তাে ওর খুশি হওয়া বড় নাকি জামাই ডাক্তার হওয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ? যে মেয়েকে আপনি এত আদর দিয়ে যত্ন করে বড় করেছেন, তাকে চোখের সামনে অশান্তির আগুনে জ্বলতে দেখে শুধু জামাই ডাক্তার বলেই কি আপনি শাস্তি পাবেন আন্টি?’

আন্টি কিছুক্ষণ ভাবলেন, একবার মিনার দিকে আরেকবার রাহির দিকে তাকালেন, তারপর অশ্রুসংবরণ করতে না পেরে উঠে বেডরুমে চলে গেলেন। পরদিন মিনা আংটি ফেরত দিয়ে দিল।

– রেহনুমা বিনতে আনিস

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

মন্তব্য করুন

Back to top button