সাম্প্রতিক প্রসঙ্গ

My body, My mind, My choice !!

প্রায় প্রতিদিন সামাজিক মাধ্যমগুলোর কল্যাণে মেয়েদের শ্লীলতাহানির খবর পড়ছি। জঘন্য সব বর্ননা। এসব ঘটনা ভিড়ের মাঝে মেলায় ঘটছে, রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় ঘটছে, নিজের বাড়ির মাঝেই ঘটছে।

যখনই এমন ধরণের কোন ঘটনা ঘটে, নিয়মমাফিক তার দায়ভার দেওয়া হয় মেয়েদের উপর। প্রথম কথাই হচ্ছে মেয়েরা শালীনতা বজায় না রেখে চলাফেরা করেছে, তাই এই ঘটনা ঘটেছে।

তাহলে তিন বছরের বাচ্চা মেয়ে যখন নির্যাতিত হয় অথবা ঘরের একান্ত আপনজন কর্তৃক মেয়ে যখন নির্যাতিত হয়, তখনও কি মেয়েদের অশালীন পোশাক পরিধানের ব্যাপারটা মুখ্য থাকে ?

একজন ছেলে একটি মেয়েকে দেখে আকৃষ্ট হতেই পারে অথবা একটি মেয়ে একটি ছেলেকে দেখে আকৃষ্ট হতেই পারে, এটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। সেজন্য আল্লাহ্ আদেশ করেছেন দৃষ্টি অবনমিতের কথা। আর এই আদেশ তিনি দিয়েছেন প্রথমে ছেলেদের, তারপর মেয়েদের।

এরপর পর্দার ব্যাপারেও আদেশ এসেছে। কীভাবে কাপড় পরিধান করতে হবে, কোন বয়সে ছেলেমেয়েদের বিছানা আলাদা করতে হবে, এক চাদরের নীচে শুয়ে থাকা চলবে না, বাবা মায়ের ঘরে প্রবেশ করার সময় অনুমতি নেওয়া, এমনকি কোন বয়স পর্যন্ত বাচ্চাকে মায়ের দুধ খাওয়াতে হবে, পর্দার এমন সব সুক্ষ ব্যাপারগুলোর নির্দেশ এসেছে।

লিখতে লজ্জা লাগছে যে, আমরা কয়জন মুসলিম এসব জানি এবং জেনে মেনে চলার চেষ্টা করি? আর শুধু কি পর্দাই সব ? ইসলামের সব বিধান একটি মুক্তার মালার মত। প্রতিটি বিধান একটির সাথে অন্যটি জড়িত। মালার একটি পুঁতি ছিঁড়ে পড়ে গেলে অন্যগুলোও পড়ে যাবে। একটি বিধান মানবো না তো অন্য বিধানগুলো বাধাগ্রস্ত হবে।

চিন্তা করে দেখুন, ২০ বছর আগেও কিন্তু প্রতিদিন এমন নির্যাতনের ঘটনা শোনা যেত না। যেমনটা এখন প্রতিদিন দেখি ও শুনি। কোন কোন দিন একইসাথে অনেকগুলো এমন ঘটনার কথা শুনি। সমাজে এই পরিবর্তন হঠাত করে হয়নি। খুব ধীরে ধীরে এমন পরিবর্তন এসেছে এবং তার ফলাফল আমরা এখন পাচ্ছি।

আরও দেখুন:  নেতৃত্বহীন জাতি : মুক্তির পথ কোথায়?

আমাদের চারপাশে প্রতিটি ঘরে ঘরে যদি তাকাই, কি দেখতে পাই আমরা ? ঘৃণা, হতাশা, ডিভোর্স, অসম্মান, কীভাবে আরো ভোগ করা যায় ইত্যাদি। উচ্চবিত্ত থেকে শুরু করে নিম্নবিত্তে ‘নৈতিক মূল্যবোধ’ শব্দটি মুছে গিয়ে ‘প্রতিযোগিতা’ শব্দটি এখন আমাদের ডিকশনারিতে স্থান করে নিয়েছে।

কিসের এই প্রতিযোগিতা ? ভোগ করার প্রতিযোগিতা। যেমন করেই হোক আমাকে সব কিছু ভোগ করতেই হবে। সেটা ভালো না খারাপ, হালাল না হারাম বুঝি না। কারণ এত কিছু বুঝতে গেলে তো ভোগ করা যাবে না। আজকাল মানুষ জীবনের কোন ক্ষেত্রেই হালাল হারাম মানে না। তাই সমাজের এত অবক্ষয়। মানুষের নৈতিকতাবোধ কমে গেলে সামাজিক অস্থিতিশীলতা অবশ্যম্ভাবী। সেই পরিস্থিতিই আমাদের এখানে চলছে।

ধর্মীয় অনুশাসন এ ধরনের কাজ থেকে মানুষকে বিরত রাখতে সহযোগিতা করে। শুধু ইসলাম ধর্মেই না, অন্য সব ধর্মেই কিছু আদেশ নিষেধ আছে। যখনই এসব আদেশ নিষেধ মানতে যাব, তখনই সব ভোগ করার মানসিকতা পরিহার করতে হবে।

তারমানে ধর্মটা তখন বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ধর্ম মানতে গিয়ে তখন নিজের ইচ্ছামত চলতে পারবো না। তাই নিজের ইচ্ছামত চলার জন্য মানুষকে আস্তে আস্তে তৈরি করা হয়েছে।

মানুষের মন, মগজ, চোখ, কান কে প্রস্তুত করা হয়েছে। কীভাবে ? নাটক, সিনেমা, গান অর্থাৎ মিডিয়া একটা বড় ভূমিকা রেখেছে এই ক্ষেত্রে। মিডিয়া এখন আমাদের ভাবতে শিখায় ‘ My body, My mind, My choice’ ।

মেয়েরা এখন বলে, আমি কাপড় পরবো নাকি পরবো না, বিয়ে করবো নাকি করবো না, সন্তান নিব নাকি নিব না, বিবাহ বহির্ভূত শারীরিক সম্পর্ক রাখবো কিনা সেটা আমার ইচ্ছার ব্যাপার। ঠিক এই কথাগুলোই পাল্লা দিয়ে ছেলেরাও বলা শুরু করেছে। আসলে এসব মানা শুরু হয়ে গিয়েছে অনেক আগেই। এখন এসব প্রকাশ্যে আনা হচ্ছে এবং মানুষকে এটাতেই অভ্যস্ত করে ফেলার চেষ্টা করা হচ্ছে।

আরও দেখুন:  ইসলামী বিচারব্যবস্থার যৌক্তিকতা : প্রসঙ্গ সঊদী আরবে ৮ বাংলাদেশীর মৃত্যুদন্ড

খুব ইচ্ছা হয় এ ধরণের মানুষকে জিজ্ঞেস করতে যে, সবই যখন নিজের ইচ্ছায় চলবে, তো নিজের ইচ্ছায় এক মিনিটের জন্য নিজের রক্ত চলাচল বন্ধ করে দেখান দেখি অথবা এক মিনিটের জন্য কিডনি আর হার্ট টা বন্ধ রাখুন তো !

My body, My mind, My choice থিম আমাদের সমাজকে পর্নোগ্রাফির দিকেই অভ্যস্ত করে দিচ্ছে। কোন মানুষ যদি সারাক্ষণ পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত থাকে তাহলে সে আর তার নিজের মাঝে থাকে না। পশু হয়ে যায়। আজকালকার হিন্দি সিনেমাগুলি কি পর্নোগ্রাফির থেকে কিছু কম ?

কি ছেলে বা মেয়ে, বয়স্ক অথবা বাচ্চা, সারাক্ষণ হিন্দি সিনেমায় মানুষ বুদ হয়ে আছে। চোখে দেখছে, নয়তো কানে শুনছে। রিকশাওয়ালা, কাজের বুয়া থেকে শুরু করে কর্পোরেট অফিসার পর্যন্ত বাদ নেই। হয় বাসায়, নয় অফিসে, নয়তো কোনো অনুষ্ঠানে, এমন কি চলতি পথে। প্রযুক্তি তাদেরকে সহযোগিতা করছে। হিন্দি সিনেমার কথা যদি বাদ দেই, পথে ঘাটে তাকালেই তো অনেক কিছু নজরে চলে আসে, যেটা কিনা আত্মাকে কুলুষিত করে, সেটা একটা বিলবোর্ডও হতে পারে।

একটা বিলবোর্ড কীভাবে আত্মাকে কুলুষিত করে সেটাও অনেকের মাথায় আসবে না। আর এখন তো হাতে হাতে মোবাইল ফোন আর ইন্টারনেট। যখন ইচ্ছা তখনই মন মত কিছু দেখে নেওয়া যায়।

এখন সমাজের চিন্তাধারাই হচ্ছে একটু টাকা পয়সা হলেই ফুর্তি করা, যেমনটা সিনেমায় দেখা যায় আর কি। আর ফুর্তির সংজ্ঞা হচ্ছে ছেলেদের জন্য মদ ও নারী, মেয়েদের জন্য মদ ও পুরুষ। এই ফুর্তির জন্য উচ্চবিত্তরা চলে যায় ইউরোপ অ্যামেরিকার কোন দেশে, মধ্যবিত্তরা যায় ব্যাংকক অথবা মালয়শিয়া, আর নিম্নবিত্তরা এক শহর থেকে আরেক শহরে। যে মানুষটা এমন ভোগের নেশায় বুঁদ হয়ে থাকে, তার সামনে দিয়ে তার মেয়ে অথবা মা হেটে বেড়ালে নেশার ঘোরে তাদের সে সম্মান দিতে শিখবে কি করে ?

আরও দেখুন:  করোনা ও রামাযান

ভাবতে অবাক লাগে, আমরা আমাদের সভ্য, প্রগতিশীল ভাবি। আসলেই কি আমরা সভ্য ? হ্যাঁ, শুনতে খারাপ লাগে, কিন্তু এটাই সত্যি যে, ভোগের নেশার প্রতিযোগিতায় নৈতিকতা আজ হারিয়ে গিয়েছে। আমরা মানসিক ভাবে অসুস্থ এক জাতিতে পরিণত হয়েছি, এখনো যদি আমাদের বোধদয় না হয়, তবে কবে হবে?

My mind, my body, my choice..

– তাহনিয়া ইসলাম খান

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

মন্তব্য করুন

আরিও দেখুন
Close
Back to top button