সাম্প্রতিক প্রসঙ্গ

স্মৃতিতে বৈরুত

eid live

বৈরুতে যখন প্রথম পা ফেলি, সেই মুহুর্ত টা আমি কখনোই ভুলবো না। অদ্ভুত ভালো লাগায় আপ্লুত হচ্ছিলাম। বারবার মনে হচ্ছিলো, আমার আব্বুটা এই পথ দিয়ে হেঁটে গিয়েছিলো, এই দেশের আলোবাতাসে কাটিয়েছিলো অনেকগুলো বছর। কখনো কি ভেবেছিলো, প্রায় তিন দশক পর তার আদরের কণ্যা, তারই স্মৃতি খুঁজে বেড়াতে এ প্রবাসের মাটিতে পা রাখবে!

স্মৃতি হাতড়ে বেড়ালে, বাবাকে খুব কম খুঁজে পাই। ছবি, গল্প এসবই দিয়ে পরিচয়, বাবা নামক প্রায় অদেখা চরিত্রটির সাথে। আব্বু বৈরুতের AUB তে পড়াশোনা করেছেন, সেখানে বিভিন্ন হাসপাতালে রোগীদের চিকিৎসা দিয়েছেন। দেখেছেন সিভিল ওয়ারের ভয়াবহতা।

ইসরায়েলের পাশে হওয়াতেই হয়তোবা, এতো যুদ্ধ বিগ্রহ হয় সেখানে। তার উপর আছে শিয়াদের হিজবুল্লাহ। এতো রাজনৈতিক অশান্তির জন্য লেবাননে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনী সব সময় নিয়োজিত থাকে।

এদেশের শান্তি রক্ষায়, আমাদের নৌবাহিনী থেকে প্রতিবছর প্রচুর সদস্যকে পাঠানো হয়। বাংলাদেশ থেকে প্রথম যে বছর লেবাননে মিশন শুরু হয়, আবু ফাওযান সেই বছরেই গিয়েছিলো। ওর পেছন পেছন উড়াল দিয়েছিলাম আমিও।

জীবনের প্রথম বিদেশ ভ্রমণ হওয়াতেই কি না জানি না, যা দেখেছি, তাতেই মুগ্ধ হয়েছি। ভূমধ্যসাগরের সাথে লাগোয়া লেবানন আসলেই অদ্ভুত সুন্দর একটি দেশ! যেমন গভীর নীল সাগরের জল, তার চেয়ে সুনীল বিস্তৃত আকাশ।

ওর পোস্টিং ছিলো ইজরায়েল বর্ডারে। কি যে প্রচণ্ড ঘৃণা নিয়ে গোলান হাইটসে বর্ডার দেখতে গিয়েছিলাম! বর্ডারের কাঁটাতারের দু পাশে দেখেছি সম্পূর্ণ বিপরীত দৃশ্য। উন্নত ইজরায়েলের পাশে লেবানন কে মনে হচ্ছিলো, নিতান্তই গরীব আত্মীয়!

উইকেন্ডে বৈরুত বেড়াতে যেতাম। পোর্টের কাছেই ‘হামরা’ তে বাংলাদেশ হাউজে থাকতাম অতিথি হয়ে। হামরা রাজধানীর অভিজাত আর ঝলমলে এলাকার অংশ। ডিপ্লোম্যাটিক এরিয়া হওয়ায়, সব কিছুই পাওয়া যেতো হাতের নাগালে।

প্রচণ্ড শীতের রাতে কত হেঁটেছি হামরার অলিগলি দিয়ে…. পাথরের বড় বড় চাঁই এর ওপর বসে, বরফ শীতল সমুদ্রের ঢেউ এর আছড়ে পরা… দেড় ডলারের শর্মা খাওয়া, আলো আঁধারিতে ঢাকা মার্গারিটা পিৎজা কর্নার থেকে শুরু করে পুরোনো হ্যাট পড়া গোলাপ বিক্রেতা বুড়োটার কথাও দিব্যি মনে আছে এখনো।

কিন্তু আজ বোমা বিস্ফোরণে এ ঝলমলে শহরের কতটুকু অক্ষত আছে, জানি না। পোর্ট ও আশে পাশের এলাকা হয়তো পরিণত হয়েছে ধ্বংসস্তুপে….. এক লহমায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে সব….

ব্যাঙের ছাতাকৃতির অতিকায় বিস্ফোরণ দেখে বিশ্বাস হতে চায় না, এটি সিনেমার কোন কল্পিত দৃশ্য নয়…. বরং ভয়ংকর নিষ্ঠুর বাস্তব…. বিশ্বাস হতে চায় না, অপরূপ সাজে সজ্জিত যায়গাগুলোর অস্তিত্ব নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে…

আল্লাহ ই জানেন, কারা আছে এই জঘন্য ধ্বংসলীলার পেছনে…

– হাসনীন চৌধুরী

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

মন্তব্য করুন

Back to top button