সাম্প্রতিক প্রসঙ্গ

এনআরসি : শতাব্দীর নিকৃষ্টতম আইন

‘জাতীয় নাগরিক নিবন্ধন’ তথা National Register of Citizens (NRC) নামে ভারতে সর্বপ্রথম আসাম প্রদেশে আইন রচিত হয়েছে। যে আইনের বিধান মতে ১৯৭১-এর ২৪শে মার্চ মধ্যরাতের পর থেকে যারা আসামে এসে বসবাস করছে, তারা সবাই বিদেশী। বিগত সাড়ে ৪৮ বছর ধরে যারা সেখানে বসবাস করছে এবং সে দেশের উন্নয়নে অবদান রেখেছে, সবকিছুকে এক কলমের খোঁচায় উড়িয়ে দেওয়া হ’ল। অতঃপর তাদের জন্য ডিটেনশন ক্যাম্প তৈরী করা হচ্ছে। সেখানেই তারা বাকী জীবন বিদেশী বন্দী হিসাবে থাকবে। তাদের যে সন্তানটি মুক্ত ভারতের স্বাধীন নাগরিক হিসাবে জন্মগ্রহণ করেছিল এবং ভারতীয় নাগরিক হিসাবে গর্ববোধ করত, তারা রাতারাতি ভারতের কয়েদী হয়ে গেল। কি মর্মান্তিক! যা চিন্তা করতেও কষ্ট হয়। কোন কোন মন্ত্রী হুমকি দিচ্ছেন, তাদের বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। হ্যাঁ, বাংলাদেশকে তারা তাদের করদ রাজ্য মনে করে বলেই এত বড় স্পর্ধা দেখানোর সাহস পেয়েছে। আইনের নামে মানুষের প্রতি মানুষের এই আসুরিক নিষ্ঠুরতার কোন তুলনা নেই। এসবই হিংস্র জাতীয়তাবাদের বিষাক্ত ফল ব্যতীত কিছুই নয়। এই সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদ মানুষের জীবনে অভিশাপ ডেকে এনেছে। হিন্দুত্ববাদী বিজেপি সরকার ১৩০ কোটি ভারতবাসীকে জোর করে হিন্দু বানাতে চায়। অথচ হিন্দুদেরই অধিকাংশ এই সংকীর্ণতার ঘোর বিরোধী। কারণ ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে ও সে দেশের উন্নয়নে সেখানে যুগ যুগ ধরে বসবাসকারী সকল ধর্ম ও বর্ণের মানুষের বিপুল অবদান রয়েছে। যাদেরকে বাদ দিলে স্বাধীন ভারতের কল্পনাই করা যেত না। বিজেপি নেতারা ক্ষমতায় যাওয়ার নেশায় হিন্দুত্বের জোশকে উস্কে দিয়ে তাদের উদ্দেশ্য হাছিল করেছে। এ ব্যাপারে পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র মিয়ানমার সম্ভবতঃ তাদের পূর্বসূরী হ’তে পারে।

বার্মার স্বাধীনতা সংগ্রামকালে যে শ্লোগানটি সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করেছিল, তা ছিল ‘বার্মা ফর বার্মিজ’। অর্থাৎ বার্মা কেবল বার্মার অধিবাসীদের জন্যই। ১৯৩৬ সালে রেঙ্গুন বিশ্ববিদ্যালয়ে তোলা একটি ঐতিহাসিক ছবিতে দেখা যায় যে, বার্মার স্বাধীনতা এসেছিল যাদের হাত ধরে, সেই অল বার্মা স্টুডেন্টস ইউনিয়নের সভাপতি ছিলেন রোহিঙ্গা নেতা আব্দুর রশীদ। যার পাশে বসে আছেন সাধারণ সম্পাদক সুচির পিতা অং সান। তার বাম পাশে আছেন বার্মা মুসলিম লীগের সভাপতি আব্দুর রাযযাক। এই রোহিঙ্গা নেতা আব্দুর রাযযাক-ই ছিলেন আজকের মিয়ানমারের সংবিধানের খসড়া প্রণয়নকারী। বার্মার জাতির জনক ও সুচির পিতা জেনারেল অং সানের গঠিত বার্মার স্বাধীনতা-পূর্ব অন্তর্বর্তীকালীন মন্ত্রীসভার শিক্ষা ও পরিকল্পনা মন্ত্রী ছিলেন আব্দুর রাযযাক।

আরও দেখুন:  মানবতা ভাসছে নাফ নদীতে!

১৯৪৭-এর ১৯শে জুলাই জেনারেল অং সানের সাথে যে ৬ জন মন্ত্রী নিহত হন তাদের মধ্যে আব্দুর রাযযাক ছিলেন অন্যতম। বার্মা আজও রাষ্ট্রীয়ভাবে ১৯শে জুলাইকে ‘শহীদ দিবস’ হিসাবে পালন করে থাকে। কেবল আব্দুর রাযযাক-ই নন,  সুচির পিতা জেনারেল অং সানের সবচেয়ে ঘনিষ্ট রাজনৈতিক সহযোগীদের মধ্যে আরও অনেক মুসলমান ছিলেন। অথচ মিয়ানমারের বর্তমান শাসকবৃন্দ জাতিগত ঘৃণার প্রকাশ ঘটাতে গিয়ে কার্যত বার্মার রাজনৈতিক ইতিহাসকেই অস্বীকার করলেন। পৃথিবীতে সম্ভবতঃ এমন কোন ভূখন্ড পাওয়া যাবে না, যেখানে বিভিন্ন ধর্ম, বর্ণ, ভাষা ও জাতিগোষ্ঠীর লোকেরা সহাবস্থান করছে না। রাজনৈতিক দুর্বৃত্তরাই কেবল তাদের হীন স্বার্থে এগুলোকে ইস্যু করে মানুষে মানুষে বিভেদ সৃষ্টি করে ফায়েদা লুটে থাকে।

২০১৯ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে মোদীর শ্লোগান ছিল ‘সবকা সাথ সবকা বিকাশ’। অর্থাৎ সকলকে সাথে নিয়ে সকলের উন্নয়ন’। উক্ত জোশে উস্কে দিয়ে জনগণের ভোট নিয়ে ক্ষমতায় গিয়ে এখন ভারতকে মুসলিম মুক্ত করতে চাচ্ছেন। হ্যাঁ তাদের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী রাজনাথ সিং সম্প্রতি একটি কুকুরের মৃত্যুতে শোকাতুর হয়ে তার লাশের উপর ফুল দিয়ে সম্মান দেখিয়েছেন। অথচ ঘরে গরুর গোশত আছে এই গুজবে তারা মুসলমানকে পিটিয়ে হত্যা করছে। অর্থাৎ তাদের কাছে মুসলমানের চাইতে কুকুরের মূল্য বেশী। ধিক শত ধিক নেতা নামধারী এইসব অমানুষদের। মোদীর জন্মের শত শত বছর পূর্ব থেকে যে কোটি কোটি মুসলমান সে দেশে বসবাস করে আসছে, তারা কি আজ হঠাৎ করে বিদেশী হয়ে যাবে? মোদী কি ভারতের ভাগ্য বিধাতা হয়ে বসেছেন? ২৫ কোটি মুসলমান ও আরও কয়েক কোটি নানা ধর্ম ও বর্ণের মানুষ রাতারাতি ভিন দেশী হয়ে যাবে? মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের সাথে যে অমানবিক আচরণ করেছে, সেটি বিশ্বব্যাপী ধিকৃত হয়েছে। মোদীও এই মুহূর্তে এনআরসি-র কারণে ও কাশ্মীরের স্বাধিকার হরণ করার কারণে বিশ্বব্যাপী ধিকৃত নেতা। একইভাবে ‘America First’ অর্থাৎ ‘আমেরিকা সবার আগে’ শ্লোগান দিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প আমেরিকার ক্ষমতায় আসীন হয়েছেন। যার নিত্যদিনের মিথ্যাচার ও অভিবাসীদের প্রতি অমানবিক আচরণ বিশ্বব্যাপী ঘৃণা কুড়াচ্ছে। অথচ আমেরিকা যারা গড়ে তুলেছিল, সেই বৃটিশদের আজ আর সেখানে কোনই গুরুত্ব নেই। বিশ্ববাসীর নিকটে আমেরিকা এখন একটি হিংস্র দৈত্যের নাম। যার পাশে নাম লিখালো মিয়ানমারের পর ভারত।

আরও দেখুন:  বাংলার  আকাশে  পরাধীনতার  কালো  মেঘ

মুসলমানরা সাড়ে ছয়শো বছর অখন্ড ভারতবর্ষ শাসন করেছে। কোনদিন কাউকে ধর্মীয় পরিচয়ে নির্যাতন করেনি। তাদের আমলেই প্রধান সেনাপতি ছিলেন মানসিংহ। অথচ এখন পাঁচ বছরের জন্য দিল্লীর ক্ষমতায় বসে ধরাকে সরা জ্ঞান করছেন মোদী সরকার। সকল অহংকারীর পতন হয়েছে। এদেরও পতন অবশ্যম্ভাবী। কিন্তু তাদের এই দুঃশাসন কলঙ্ক তিলক হয়ে থাকবে ভারতের ইতিহাসে চিরদিন। ইতিমধ্যেই আসাম থেকে মুসলিম বিতাড়নের উদ্দেশ্যে তাদের রচিত এনআরসি তাদের প্রতি বুমেরাং হয়ে দেখা দিয়েছে। তাদের সরকারী হিসাবেই প্রমাণিত হয়েছে যে, বাদ পড়া ১৯ লক্ষ ৬ হাযার ৬৫৭ জনের মধ্যে ৬০ শতাংশ হিন্দু। ফলে বিজেপি সরকার বলতে বাধ্য হয়েছে, ভুলে ভরা এই এনআরসি আমরা মানিনা’। আসামের দেখাদেখি প্রতিবেশী পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, মিজোরাম ও দিল্লী সহ অন্যান্য প্রদেশগুলি যদি এনআরসি করে, তাহ’লে সারা ভারতে যে কি ধরনের অস্থিরতা শুরু হবে, তা ভাবতেও অবাক লাগে। কোন সভ্য দেশ কি তার নিজ দেশের নাগরিকদের উপর এরূপ হিংস্রতা দেখাতে পারে? জাহেলী যুগে হাবশার খৃষ্টান নেতা নাজাশী এবং ইয়াছরিবের পৌত্তলিকরা মক্কা থেকে বিতাড়িত মুসলমানদের সানন্দে আশ্রয় দিয়েছিল। এমনকি তারা ইসলামের সাম্যের বাণী গ্রহণ করে মুসলমান হয়ে গিয়েছিল। অথচ আধুনিক হওয়ার গর্বে স্ফীত আমেরিকা, মিয়ানমার ও ভারতের নেতারা সেটা করতে ব্যর্থ হয়েছেন।

মনে রাখা আবশ্যক যে, এ পৃথিবী আল্লাহর সৃষ্টি। এখানে যেকোন স্থানে বসবাসের অধিকার আল্লাহর সকল বান্দার। সকল মানুষ একই পিতা-মাতা আদম ও হাওয়ার সন্তান। এখানে সাদা-কালো কোন ভেদাভেদ নেই। ভেদাভেদ থাকবে কেবল সৎ ও অসৎ ব্যক্তির ক্ষেত্রে। অহিন্দু খুনী আর হিন্দু খুনী দু’জনেই সমান। একইভাবে ভাষা, বর্ণ ও অঞ্চলের ভেদাভেদ থাকলেও সেখানে সকল মানুষের অধিকার সমান। সবাই আল্লাহর দেওয়া মাটি, পানি, সূর্য কিরণ, চন্দ্রের জ্যোতি ও মৃদুমন্দ বায়ু সেবন করে থাকে। অতএব আল্লাহ প্রেরিত ইসলামী বিধান মেনে নিয়ে সকলকে আল্লাহর আনুগত্যে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহবান জানাই। স্মরণ করুন বিদায় হজ্জের ভাষণে শেষনবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর উদাত্ত আহবান! ‘হে জনগণ! নিশ্চয় তোমাদের পালনকর্তা মাত্র একজন। তোমাদের পিতাও মাত্র একজন।  মনে রেখ! আরবের জন্য অনারবের উপর, অনারবের জন্য আরবের উপর, লালের জন্য কালোর উপর এবং কালোর জন্য লালের উপর কোনরূপ প্রাধান্য নেই আল্লাহভীরুতা ব্যতীত’। নিশ্চয়ই তোমাদের মধ্যে আল্লাহর নিকট সর্বাধিক সম্মানিত সেই ব্যক্তি, যে তোমাদের মধ্যে সর্বাধিক আল্লাহভীরু’। তিনি আরও বলেন, ‘হে জনগণ! আল্লাহ তোমাদের থেকে জাহেলিয়াতের অংশ ও পূর্ব পুরুষের অহংকার দূরীভূত করে দিয়েছেন। মানুষ দু’প্রকারের : মুমিন আল্লাহভীরু অথবা পাপাচারী হতভাগা। তোমরা আদম সন্তান। আর আদম ছিলেন মাটির তৈরী’ (আর মাটির কোন অহংকার নেই) (তিরমিযী হা/৩২৭০)। ভাষণের শেষে তিনি বলেন, আমি কি তোমাদের নিকট পৌঁছে দিলাম? লোকেরা বলল, হ্যাঁ, হে আল্লাহর রাসূল! তিনি বললেন, অতএব উপস্থিতগণ যেন অনুপস্থিতদের নিকট পৌঁছে দেয়’ (ছহীহাহ হা/২৭০০)। আমরাও শেষনবীর উক্ত ভাষণ আল্লাহর বান্দাদের নিকটে পৌঁছে দিলাম। হে আল্লাহ! তুমি মযলূমদের সাহায্য কর ও যালেমদের প্রতিহত কর- আমীন!

আরও দেখুন:  বিশ্বকাপ না বিশ্বনাশ?

– ড. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

মন্তব্য করুন

Back to top button