সাম্প্রতিক প্রসঙ্গ

আরবে মোদির সমাদর ব্যক্তি নয় শক্তির পুজো

আফসোস আরব শাসকদের জন্য। তাদের মধ্যে না দেখা যাচ্ছে ঐতিহ্য সচেতনতা, না হৃত গৌরব পুনরুদ্ধারের প্রত্যয়। রাজত্বের লোভ এ সিংহদের বানিয়ে দিয়েছে বিড়ালছানা। এ অথর্ব ভোগবিলাসী আরব নেতৃত্ব নিজ জাতি ও উম্মাহর জন্য আরও দুর্ভোগ বয়ে আনবেন বলেই মনে হচ্ছে। ঐতিহ্য সচেতন আধুনিকমনস্ক স্বাজাত্য ও স্বধর্মবোধসম্পন্ন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমুখী তরুণ নেতৃত্ব ছাড়া অবস্থা পরিবর্তনের আশা শুধু দুরাশা। আরব বসন্ত নয়, আরবে দরকার শিক্ষা বিপ্লব ও চেতনা বিপ্লব।

প্রথমবারের মতো ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আরব আমিরাত ও বাহরাইন সফর করলেন। উভয় দেশ তাকে সর্বোচ্চ পদক ও সম্মাননা দিল। এ সফরে যাওয়ার আগে চলতি মাসেই তার সরকার মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জনপদ ভূস্বর্গ কাশ্মীরের প্রায় পৌনে শতাব্দী ধরে চলমান স্বায়ত্তশাসন বাতিল করে দিয়েছে। দুই টুকরো করে হুমকিতে ফেলে দিয়েছে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতা ও মুসলিম জাতিসত্তাকে। সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিক পন্থায় বন্দুকের নলের মাধ্যমে কাশ্মীরকে জিম্মি ও অবরুদ্ধ করে ফেলেছে। বিশ্ব থেকে এ জনপদকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়ে ঘোর অমানিশা ডেকে আনা হয়েছে কাশ্মীরিদের জন্য।

পৃথিবীর তাবৎ বিবেকবান ও ইতিহাস সচেতন মানুষ মোদি সরকারের এহেন তৎপরতায় ক্ষুব্ধ-হতবাক। উপরন্তু গুজরাটে মুসলিম নিধনমূলক দাঙ্গার জন্যও ভারতীয় কোর্টের বিচারে দায়ী করা হয় তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী এ মোদিকে। আরবজাহানে সেই মুসলিম হন্তারক মোদির এমন সমাদরকে আরব ও উপমহাদেশের চেতনাসম্পন্ন মুসলিমরা রক্তের সঙ্গে গাদ্দারি হিসেবে দেখছেন। কাশ্মীরের নিরীহ মুসলিমদের হাত-পায়ে যখন শিকল পরাচ্ছে মোদি সরকার, তখন তার গলায় আরবের কাঁচা সোনার মালা পরানোর দৃশ্য বুকে শেলের মতো বিঁধছে মুসলিম জাহানের। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোয় তাই বিশ্বজুড়ে নিন্দা ও ধিক্কারের স্রোত বইছে আরব আমিরাত ও বাহরাইন সরকারের বিরুদ্ধে।

তবে আবেগের ধিক্কারের বাইরে বাস্তবতা হলো দেশ দুটির এমন মোদি তোষণ আসলে ‘শক্তির পুজো’। ‘শক্তের ভক্ত’ বলে একটা কথা আছে না? মানুষ যখন বেয়াক্কেল-বেওকুফ হয়, দুর্বলচিত্ত ও সাহসহীন হয়, দুরদর্শিতা ও বিচক্ষণতার অভাব হয় তার মাঝে, আশাবাদী ও উচ্চাকাক্সক্ষী না হয়, তাদের অবস্থা হয় আজকের এ আমির-বাদশাহদের মতো। আরবদের অতীত শৌর্য-বীর্য, সাহসিকতা ও পৌরুষত্বের যে ঐতিহ্য ছিল বর্তমান আরব শাসকদের রক্তে তার ছিটেফোঁটাও প্রবাহিত নেই। আল্লাহর ইচ্ছায় মুসলিমরা আরও একবার ঘুরে দাঁড়াতে পারে, বিশ্বনেতৃত্বে আসীন হতে পারে এবং পুরো জাহানকে ন্যায় ও শান্তির শাসন করতে পারে, সেই বিশ্বাস আরব শাসকদের মধ্যে নেই। আত্মবিশ্বাস নেই নিজেদের ওপর। বুদ্ধিসুদ্ধিও কিছু খেলছে না তাদের মাথায়। বিজাতির বিজ্ঞান-প্রযুক্তির উন্নতি ও সমরপ্রস্তুতি দেখে এদের মোকাবিলা করার কল্পনাও তারা করতে পারে না। ভয়ে তাদের অবস্থা জবুথবু।

আরও দেখুন:  ক্যালেন্ডার উল্টানোর আগে একটু ভাবুন

এমন অবস্থায় মানুষ কী করে? মানুষ তখন শক্তির পুজো ছাড়া কিছুই আর করে না। শক্তিশালীদের ভক্তি করে, সম্মান করে, পুজো করে, দাসত্ব করে এবং তাদের দয়া-দাক্ষিণ্যের ওপর নির্ভর করে বসে থাকে। তাদের অনুগ্রহে বাঁচে-মরে। কিছুদিন আগে কিং সালমান ও ক্রাউন প্রিন্স বিন সালমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে রিয়াদে ডেকে এনে ভরি ভরি স্বর্ণের মেডেল দিয়েছিলেন, এটাও ছিল শক্তিশালীর পুজো। ভারতও একটি উদীয়মান শক্তি আর ভারতের নাগরিকরা আরব দেশগুলোর ব্যবসা-বাণিজ্যের হর্তকর্তা। ফলে এ দেবতারও পুজো দেওয়া কর্তব্যবোধ করেছে। তাই আমিরশাহি গুজরাটের কসাই নরেন্দ্র মোদিকে সম্মানিত করছে।

মোদিকে আমিরশাহির সম্মানিত করায় আমি আশ্চর্য হইনি। আমি বরং হাহাকারে ভুগি, যদি এমন একটি মুসলিম শক্তির উদয় হতো! ইসলামি মূল্যবোধসম্পন্ন, বিশ্ব মুসলিম ভ্রাতৃত্বে বিশ্বাসী, বিজ্ঞান-প্রযুক্তিতে সমৃদ্ধ, পরমাণু অস্ত্রধর, মহাকাশ গবেষণায় সফল, অর্থনীতিতে উন্নত, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন ও ইনসাফপূর্ণ বিচারব্যবস্থাসম্পন্ন। তবে কি আমিরশাহিদের আজ মোদিপুজো করতে হতো! ট্রাম্পের গলায় সোনার মেডেল পরাতে হতো শাহ সালমানদের!

উসমানি তুরস্কের খলিফা আবদুল হামিদ (রহ.) নিঃসন্দেহে একজন উত্তম শাসক ছিলেন। মুসলিম দরদি নেতা ছিলেন। প্রিয়নবীর পরম ভক্ত ও আশেক ছিলেন। খেলাফতামলে তার এক অমর কীর্তি হেজাজ রেললাইন। পতনোন্মুখ উসমানি খেলাফতের প্রতি মুসলিম বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ এবং তাকে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত রাখাও এ হেজাজ রেলওয়ের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল। তুরস্ক থেকে মদিনা শরিফ পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার ৩২০ কিলোমিটার রেললাইন স্থাপনে সেই সময় কয়েক মিলিয়ন তুর্কি লিরা ব্যয় করতে হয়েছিল। কিছু অভ্যন্তরীণ কালেকশন, হায়দরাবাদের নিজামের অনুদান ছাড়া বাকি বেশিরভাগ অর্থ সংগৃহীত হয়েছিল বিভিন্ন ব্রিটিশ কোম্পানি থেকে ঋণ হিসেবে। প্যানইসলামের উদ্দেশ্যে হেজাজ রেলওয়ে স্থাপিত হলেও তুরস্কের সেই লক্ষ্যপূরণ হয়নি। উসমানি খেলাফতের পতন রক্ষা করা যায়নি। রেলওয়ে স্থাপন নিশ্চয়ই একটি মহৎ কাজ ছিল; কিন্তু তার চেয়ে এ পরিমাণ অর্থ যদি প্রযুক্তি গবেষণায় খরচ করা হতো এবং পরমাণু গবেষণার প্রকল্প নেওয়া হতো, তাহলে তুরস্কের ইতিহাস অন্যরকম হতে পারত।

আরও দেখুন:  মূর্তি অপসারণ ও পুনঃস্থাপন

কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলোÑ সুলতান আবদুল হামিদ (রহ.) এর পক্ষে ইস্তানবুুলে যে সিপাহি বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল এবং যারা সেই বিপ্লবে শরিয়া শরিয়া বলে চিল্লাচিল্লি করেছিল তারাই প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানে চরম অনাগ্রহী ছিল, আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র ব্যবহারের ঘোর বিরোধী ছিল। আজ আমরা অনেকে ইসলাম প্রতিষ্ঠার কথা বলি; কিন্তু মুসলমানদের শক্তিশালী হওয়ার কথা কয়জনে বলি? মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করছি, ছেলেসন্তানদের মুহাক্কিক আলেম হওয়ার প্রতি গুরুত্ব দিই; কিন্তু দেশের প্রয়োজনে উম্মাহকে শক্তিশালীকরণের স্বার্থে কয়টা স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছি? দেশে স্কুল-কলেজ অহরহ আছে, বিজ্ঞান-প্রযুক্তি বিষয়ে লেখাপড়াও হচ্ছে; কিন্তু উন্নত গবেষণা এবং সেজন্য যথাযথ বরাদ্দ নেই কেন, সে প্রশ্ন কয়জনে করছি? আজ আমাদের অনেককে বলতে শোনা যায়, মাদ্রাসায় কেন বিজ্ঞানী-প্রযুক্তিবিদ হবে? অথচ আমরা যাদের মুফাসসির-মুহাদ্দিস ও ফকিহ হিসেবে জানি-চিনি এসবই তাদের একমাত্র পরিচয় ছিল না, তাদের অনেকই ছিলেন মহাকাশ গবেষক, জ্যোতির্বিজ্ঞানী, উদ্ভিদবিজ্ঞানী, চিকিৎসক। তাহলে এ যুগের ফকিহ-মুহাদ্দিস ও মুফাসসিররা কেন উম্মাহর জন্য সেই অবদান রাখতে পারবেন না?

স্কুল-কলেজে পড়লে শিক্ষার্থীরা ধর্মীয় মূল্যবোধ থেকে বঞ্চিত হয়, সেই পরিবেশে যারা বিজ্ঞান-প্রযুক্তির জ্ঞান পায় তাদের ভেতর উম্মাহর চেতনা থাকে না। যদি মাদ্রাসা থেকেও একদল বিজ্ঞানী-প্রযুক্তিবিদ বের হতো কিংবা (আরও ভালো হতো) যদি স্কুল-কলেজগুলোয় ইসলামি মূল্যবোধ সঞ্চারিত করা যেত; তবে তাদের দ্বারা মুসলিম উম্মাহ ও সমগ্র মানবতা ব্যাপক উপকৃত হতো।

তুরস্কের ইসলামি আন্দোলনের নেতা ড. নাজমুদ্দীন আরবাকান ছিলেন একজন বিজ্ঞানী। বিদেশ থেকে শিক্ষা ও গবেষণা জীবন শেষে করে দেশে ফিরে মোটর পাম্প তৈরি করেছিলেন, যা আগে বিদেশ থেকে আমদানি করতে হতো, এতে দেশের অনেক পয়সা বেঁচে যায়। তার শায়খ ছিলেন একজন আলেমে দ্বীন, তিনি তার শায়খের দরবারে গেলে শায়খ তাকে মসজিদের বাইরে দাঁড়ানো কয়েক লাইন গাড়ি দেখিয়ে বললেন, এ গাড়িগুলোর মোটরগুলোও সব বিদেশ থেক আমদানি করা, তোমরা চেষ্টা করে দেখ এসব মোটরও দেশে তৈরি করা যায় কি না! এতে দেশের আরও পয়সা বাঁচবে, দেশ সমৃদ্ধ হবে। এটা কামালিজমের সময়কার ঘটনা। একজন আলেমে দ্বীন হয়ে তিনি কত বাস্তব ও দেশপ্রেমী চিন্তা করেছেন! কামালিজমের পতন তো অবশ্যম্ভাবী; কিন্তু ওই মহান শায়খের ভাবনার বদৌলতে আগামীর তুরস্ক যে শক্তির উচ্চতায় পৌঁছাবে তাতে কি সন্দেহ আছে?

আফসোস আরব শাসকদের জন্য। তাদের মধ্যে না দেখা যাচ্ছে ঐতিহ্য সচেতনতা, না হৃত গৌরব পুনরুদ্ধারের প্রত্যয়। রাজত্বের লোভ এ সিংহদের বানিয়ে দিয়েছে বিড়ালছানা। এ অথর্ব ভোগবিলাসী আরব নেতৃত্ব নিজ জাতি ও উম্মাহর জন্য আরও দুর্ভোগ বয়ে আনবেন বলেই মনে হচ্ছে। ঐতিহ্য সচেতন আধুনিকমনস্ক স্বাজাত্য ও স্বধর্মবোধসম্পন্ন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমুখী তরুণ নেতৃত্ব ছাড়া অবস্থা পরিবর্তনের আশা শুধু দুরাশা। আরব বসন্ত নয়, আরবে দরকার শিক্ষা বিপ্লব ও চেতনা বিপ্লব।

আরও দেখুন:  নেতৃত্বহীন জাতি : মুক্তির পথ কোথায়?

– আলী হাসান তৈয়ব ও মু. সগির চৌধুরী

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

মন্তব্য করুন

Back to top button