মুসলিম জাহান

তুরস্কের যে শহরে কাউকে না খেয়ে থাকতে হয় না

আগস্টের রৌদ্দোজ্জ্বল একটি বিকাল। শনিবার। তুরস্কের পূর্বাঞ্চলের একটি ছোট্ট শহরের একটি রেস্তোরাঁ অপেক্ষায় আছে তার ‘সবচেয়ে মূল্যবান কাস্টমার’-এর জন্য।

শহরের স্থাপনাগুলোর মধ্যে এটি একটি, যেখানে অভাবী মানুষদের আমন্ত্রণ জানানো হয় বিনামূল্যে খাদ্য গ্রহণের জন্য। এ ঐতিহ্যটি চলে আসছে শতবছর ধরে বংশানুক্রমিকভাবে।

ইলাজিং প্রদেশের কেন্দ্র থেকে উত্তর দিকে গাড়িতে ৭০ মিনিটের দূরত্বে অবস্থিত কারাকোকান শহর। শহরটি বর্তমান সময়ে সবার মনোযোগ আকর্ষণ করেছে অভাবগ্রস্তদের এই বিনামূল্যের খাদ্য খাইয়ে। স্থানীয়দের জন্য, কাস্টমারদের জন্য ভাগ্যাহতদের সাহায্য করার এটি একটি উপায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কারাকোকানের ব্যস্ততম রেস্তোরাঁ মেরকেজের মালিক ও ম্যানেজার ৫৫ বছর বয়সী মেহমেদ ওজতুর্ক। তিনি ৩৫ বছর ধরে চালাচ্ছেন রেস্তোরাঁটি। তিনি বলছিলেন, তিনি অভাবীদের জন্য অন্তত তিনটি টেবিল রিজার্ভ রেখে দেন। কাস্টমারের প্রচুর চাপ থাকলেও এ টেবিলগুলো তাদের জন্য সংরক্ষিতই থাকে। ওজতুর্কের মতে, ‘গরিবরা কখনোই এখানে আসতে ব্যর্থ হয় না’।

তিনি বলছিলেন, কখনো কখনো দিনে ১৫ জন গরিব মানুষ তার রেস্তোরাঁ থেকে বিনামূল্যে খাবার গ্রহণ করে থাকে। স্থানীয় বাসিন্দাদের তথ্য অনুসারে, শহরটিতে প্রতিদিন অন্তত ১০০ লোক বিনামূল্যে খাবার পেয়ে থাকে। সরকারি হিসাব মতে, শহরটিতে মোট জনসংখ্যা ২৮ হাজার।

এ রেস্তোরাঁয় খাবার গ্রহণকারীদের মধ্যে একজন পরিচিত মুখ গালিপ। তিনি গত ১০ বছর ধরে প্রায় প্রতিদিনই এ খাবার খেয়েছেন। ‘তিনি এখানে সকালের নাস্তা খেয়েছেন এবং সম্ভবত রাতের খাবারের জন্যও আসবেন’, বলছিলেন রেস্তোরাঁটির একজন তরুণ ওয়াইটার।

মানসিকভাবে অসুস্থ গালিপ এ বিষয়ে বেশি কিছু জানালেন না। তিনি শুধু বললেন, ‘শহরে মারকেজ আমার প্রিয় একটি জায়গা। কারণ এর খাবার খুব ভালো’।

রেস্তোরাঁটি শুধু খাবার বিতরণই করে না, এ খাবার গ্রহণকারীদের জন্য পছন্দের স্বাধীনতাও দিয়েছেন। এমনকি কাবাব, চিকেন, সোপ, ভাত ও সালাতও তারা পছন্দ করতে পারেন।

ওজতুর্ক জানান, ‘৭০ বছর আগে থেকে এ ঐতিহ্য এখানে সব সময় পালন করে আসা হয়েছে। এটা আমরা আমাদের পূর্বসুরীদের কাছ থেকে পেয়েছি।’

আরও দেখুন:  সাড়ে ৪ শ’ বছর পরও মাধুর্য ছড়াচ্ছে সুলায়মানি মসজিদ

শহরের বাসিন্দাদের মতে, মেরকেজ রেস্তোরাঁর এ ঐতিহ্য চালু হয়েছে ১৯৪০ সালে। তখন থেকেই এটি শহরের অন্যতম প্রধান খাবারের দোকান। তখনকার মালিকরা বিনামূল্যের এ খাবার খাওয়ানো চালু করলে রেস্তোরাঁটি ব্যাপক প্রসার পেতে থাকে। তাদের এ উদ্যোগে পরে হাত মিলায় সে এলাকার অন্য রেস্তোরাঁগুলোও।

ওজতুর্ক বলছিলেন, ‘আমি বেশ ছোটবেলায় একদিন সে রেস্তোরাঁর একটি টেবিলে খাবারের জন্য অপেক্ষায় ছিলাম। তখন দেখলাম রেস্তোরাঁটির তখনকার মালিক হাচি হোসেন রাস্তায় অভাবী লোকদের খুঁজছিলেন খাবার খাওয়ানোর জন্য। তিনি সেসব মানুষদের দলবেঁধে নিয়ে আসতেন এবং খাবার দিতেন। দিনে সেটা তিন থেকে পাঁচ বারও হতো।’

১৯৮২ সালে ওজতুর্কের বড় ভাই জার্মানি থেকে দেশে ফিরে আসেন। তারপর তারা মেরকেজ রেস্তোরাঁটি কিনে নিয়ে পারিবারিক ব্যবসা শুরু করেন। শেষে ওজতুর্কই হয়ে উঠেন খাবারের দোকানটির মালিক।

মনোরম লোকেশনের শহরটিতে পাঁচটি বড় রেস্তোরাঁ রয়েছে। প্রত্যেকেই ঐতিহ্যবাহী এ ধারা অব্যাহত রেখেছে।

মেরকেজ রেস্তোরাঁয় খাবার গ্রহণকারীদের মধ্যে একজন পরিচিত মুখ গালিপ।

 

ওজতুর্ক বলেন, এ খাবার গ্রহণকারীদের মধ্যে বেশিরভাগ হচ্ছে চলাচলে অক্ষম ব্যক্তি, মানসিকভাবে অসুস্থরা। রেস্তোরাঁগুলোতে পার্শ্ববর্তী শহর বিঙ্গল ও টানসেলি থেকেও কাস্টমাররা আসেন।

রেস্তোরাঁগুলো এ খাবার বিতরণকে নিজেদের জন্য কল্যাণের বিষয় হিসেবে মনে করে।

এ শহরের সাথে গভীর সম্পর্ক রয়েছে হাসান গুলবাসনের। তারা কয়েক পুরুষ থেকেই এ শহরের বাসিন্দা। তিনি তার ১৪ বছর বয়সে রেস্তোরাঁয় কাজ শুরু করেন বাসনকোসন ধোয়ার কাজ দিয়ে। তিনি কাজ করেছেন কারাকোকানসহ পাঁচটি রেস্তোরাঁয়। বর্তমানে তিনি ‘সরাই লোকানতাসিত’ নামে একটি রেস্তোরাঁর মালিক।

গুলবাসন বলেন, তিনি তুরস্কের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ফোন পেয়েছেন, যারা এ ঐতিহ্যের কথা জানতে পেরে তাকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। ‘আমি তাদের বলেছি যে, এটা বিশেষ কোনো কাজ না। গরীব লোকদের খাবার খাওয়ানোতে আমার আয়ে কোনো প্রভাব পড়ে না। এটা আরো সৌভাগ্য বয়ে আনে’, বলছিলেন তিনি।

স্থানীয় বলেন, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ শহরটির বাসিন্দারা এ বিশ্বাস ধারণ করেন যে, অভাবগ্রস্তদের সাহায্য করলে বরকত হয়।

আরও দেখুন:  বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম মসজিদ নির্মিত হচ্ছে আলজেরিয়ায়

৬৫ বছর বয়সী এ ব্যক্তি বলেন, কারাকোকানের বদান্যতার এটিই শুধু একমাত্র উদাহরণ নয়, সিরিয়ার আলোপ্পোতে গত বছর বড় ধরনের একটি সাহায্য গেছে এ শহর থেকে। এমনকি দক্ষিণ-পূর্ব তুরস্কে ২০১১ সালে ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য এখান থেকে সাহায্য পাঠানো হয়েছে। এ ভূমিকম্পে ৫০০ জনের অধিক নিহত হন এবং গৃহহীন হয়ে পড়েন হাজারো মানুষ।

গুলবাসন বলেন, ‘ইলাজিগের যাকেই জিজ্ঞাসা করবেন তিনিই বলে দিবেন কারাকোকানের বদান্যতার কথা।’

ইলাজিদের অন্যান্য শহরের তুলনায় কারাকোকান হয়ে উঠেছে ধনী ব্যবসায়ীদের আবাসস্থল। এসব ব্যবসায়ীর বেশিরভাগই জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, ফ্রান্স ও অস্ট্রিয়া থেকে রেমিট্যান্সের মাধ্যমেই তারা আজ ধনী।

‘এখানকার লোকদের অন্তত একজন হলেও ইউরোপে থাকে, যারা নিয়মিত রেমিট্যান্স পাঠান। আপনি যদি ইলাজিগের কেন্দ্রীয় জেলাগুলোতে যান তাহলে সহজেই এ উন্নতি চোখে পড়বে’, বলছিলেন জেলা কর্মকর্তা চেলাল কায়া, যিনি গ্রামীণসেবা প্রদানকারী সংস্থা ইউনিয়ন অব প্রভাইডিং সার্ভিসেস টু ভিলেজ-এরও প্রধান।

কায়ার দায়িত্ব হলো কারাকোকানের ৮৯ জন বাসিন্দার কাছে গিয়ে তারা তাদের প্রয়োজনীয় সেবা পাচ্ছেন কি না তা নিশ্চিত করা। তিনি বলছিলেন, গরিবদের সাহায্য করা এ শহরের ধনীরা তাদের দায়িত্ব মনে করে। আর এ কাজের জন্য তারা নিজস্বভাবে গড়ে তুলেছেন একটি সামাজিক কল্যাণ ব্যবস্থাপনা।

কায়া জানান, সম্প্রতি আমরা একটি রেস্তোরাঁকে বলেছিলাম যেন তারা গরিব একটি পরিবারের খাবারের বিল সরকারের কাছ থেকে গ্রহণ করে। কিন্তু তারা তা প্রত্যাখ্যান করে তারা সে পরিবারটির দায়ভার নেয়।

বাসিন্দাদের অভিবাসী আত্মীয়-স্বজনদের পাঠানো রেমিট্যান্সে কারাকোকান তার সুপ্রসিদ্ধ আতিথেয়তা ও উদারতা বজায় রেখেছে। স্থানীয়দের কেউ জানান, তারাই একমাত্র ২০০১ সালের তুরস্কের অর্থনৈতিক সঙ্কট দ্বারা আক্রান্ত হননি।

তবে স্থানীয়দের মধ্যে একটা দুশ্চিন্তাও ভর করেছে। আর তা হলো পরিস্থিতির পরিবর্তন। ৭০ ও ৮০-এর দশকে যারা উন্নত জীবনযাপনের জন্য কারাকোকান ছেড়ে ইউরোপে পাড়ি দিয়েছেন তাদের মতো তাদের দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রজন্মও এখন আর কারাকোকানে আসেন না। এমনকি গ্রীষ্মের ছুটির দিনগুলোতে তারা তুরস্কের রিসোর্ট শহর আন্তলিয়া ও ইজমির এলেও এখানে আসে না।

আরও দেখুন:  চীনে শুধু নারীদের জন্য মসজিদ শত শত বছর ধরে

‘যেহেতু এ শক্ত বাঁধনগুলো দিন দিন ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে, তাই এক সময় রেমিট্যান্স আসাও বন্ধ হয়ে যেতে পারে’, বলছিলেন কায়া।

কায়ার দাবি, ‘গল্পের এ দিকটি কিছুটা উদ্বেগের। এখানে এমন একটি পরিবারও পাবেন না যে, তারা ইউরোপ থেকে রেমিট্যান্স পান না। আর তাই তারা তাদের স্বজনদের উপর বেশ নির্ভরশীল।’

কায়া আরো বলেন, এখানকার অনেকের বিদেশে থাকা স্বজনরা এখানে ব্যবসায় অংশীদার হন। তাদের পরিবারকে সাহায্য করার জন্য অনেক অর্থও পাঠিয়ে থাকেন। অনেক ক্ষেত্রে সেটা বিনিয়োগ হিসেবে।

পরিশেষে বলা যায়, কারাকোকানের অর্থনীতি একসময় অনিশ্চয়তায় পড়লেও এখানকার সমাজের মূলে প্রোথিত সাহায্যের প্রবণতা কখনো হারিয়ে যাবে না। এটা তাদের ধর্মীয় ও মানবাধিকার দায়িত্ব হিসেবেই থাকবে।

তথ্যসূত্র : মিডলইস্ট আই

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

মন্তব্য করুন

Back to top button