সাম্প্রতিক প্রসঙ্গ

হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির খড়গ : আসামের এনআরসি এবং বাংলাদেশ

কিশোর শিক্ষার্থীদের নিরাপদ সড়ক দাবীর আন্দোলনে ঢাকাসহ সারাদেশে তীব্র রাজনৈতিক উত্তেজনা ও অনিশ্চয়তা দেখা যাচ্ছিল, ঠিক একই সময়ে ভারতের আসাম রাজ্যে নাগরিকত্ব তালিকা প্রকাশের মধ্য দিয়ে উপমহাদেশের বাংলা ভাষাভাষী মুসলমানদের জন্য অনেক বড় একটি সামাজিক-রাজনৈতিক বিপর্যয়কর পরিস্থিতি তৈরী করা হয়েছে। ভারতের আর কোন রাজ্যে এ ধরনের নাগরিকত্ব তালিকা না থাকলেও আসামের কথিত এনআরসি (ন্যাশনাল রেজিস্ট্রার অব সিটিজেনস) এ এলাকায় বড় ধরনের সামাজিক-রাজনৈতিক বিতর্ক ও সংঘাতের জন্ম দিতে পারে বলে সমাজতাত্ত্বিক ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। সাংবিধানিকভাবে ধর্মনিরপেক্ষ ভারতে হিন্দুত্ববাদী বিজেপি ক্ষমতাসীন হওয়ার লক্ষ্যে যে সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প ছড়িয়ে দেয়া হয়, তার প্রধান রাজনৈতিক ইনস্ট্রুমেন্ট হচ্ছে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের মধ্যে মুসলিম বিদ্বেষী হিন্দু জাতীয়তাবাদী ও সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ছড়িয়ে দেয়া। বিগত রাজ্যসভা নির্বাচনে আসামের সংখ্যাগরিষ্ঠ অসমীয় জাতিগোষ্ঠীর সমর্থন পেতে বিজেপি সেখানে অসমীয় ও বাঙ্গালীমুসলমান ইস্যু সৃষ্টি করে ভোটের ফলাফল নিজেদের অনুকূলে আনতে তা ট্রামকার্ডের মত ব্যবহার করে সফল হয়। নরেন্দ্র মোদি দিল্লীতে ক্ষমতাসীন হওয়ার পর থেকেই বিজেপি’র জন্য ব্যাকওয়ার্ড রাজ্যগুলোতে এ ধরনের সাম্প্রদায়িক প্রোপাগান্ডা শুরু হয়। এমন সাম্প্রদায়িক প্রপাগান্ডার মাধ্যমেই দীর্ঘদিন ধরে কংগ্রেস শাসিত আসামে ২০১৬ সালের নির্বাচনের ফলাফল বিজেপির পকেটে চলে যায়। বিজেপি সরকার গঠনের আগ থেকেই দিল্লীর বিজেপি নেতাদের প্রভাবে আসামে তীব্র সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি করা হয়। আসামে মুসলমানরা সংখ্যালঘু হ’লেও তেত্রিশটি প্রশাসনিক যেলার মধ্যে অন্তত ৯টি যেলায় মুসলমানরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। জনসংখ্যার দিক থেকে আসামে মুসলমানরা প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। বিজেপি অ্যাক্টিভিস্টরা সাধারণ অসমীয়দের কাছে এই ধারণা দিতে চাইছেন যে, সেখানকার বাংলা ভাষাভাষী মুসলমানরা বাংলাদেশ থেকে সেখানে গিয়েছিল। অতএব তাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নিয়ে অবিলম্বে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়ার এক উদ্ভট ভয়াবহ তৎপরতার অংশ হিসাবেই এনআরসি তালিকা প্রণয়নের প্রকল্প হাতে নেয়। হাযার কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়নাধীন নাগরিকত্ব তালিকায় অন্তর্ভুক্তির জন্য ৩ কোটি ২৯ লাখ মানুষ আবেদন করলেও প্রাথমিক তালিকায় প্রায় দেড়কোটি নাগরিককে তালিকার বাইরে রাখা হয়। শুধু আসাম ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলেই নয়, পুরো ভারত জুড়েই এই তালিকা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কের ঝড় বয়ে যায়। ব্যাপক জনবিক্ষোভের মুখে এনআরসি’র চূড়ান্ত খসড়ায় মোট ২ কোটি ৮৯ লাখ মানুষ স্থান পায়। অর্থাৎ প্রায় ৪০ লাখ মানুষের নাগরিকত্ব বাতিল করা হয়েছে। এ ছাড়া নাগরিকত্ব শনাক্তকরণে অযৌক্তিক প্রক্রিয়া বলবৎ রেখে লাখ লাখ বাঙ্গালী মুসলমানকে (ডি-ভোটার বা ডাউটফুল ভোটার) সন্দেহজনক ভোটারের তালিকায় রাখা হয়েছে। সে সব বাদ দিলেও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে একটি রাজ্যের চল্লিশ লাখ মানুষের নাগরিকত্ব বাতিলের মত ঘটনা সাম্প্রতিক ইতিহাসে নযীরবিহিন। আসামে বিজেপি সরকারের নাগরিকত্ব বাতিলের মূল টার্গেট বাংলা ভাষাভাষী মুসলমানরা হ’লেও বাংলাভাষী হাযার হাযার লিবারেল হিন্দু পরিবারকেও এই তালিকার বাইরে রাখা হয়েছে। বংশানুক্রমিকভাবে শত শত বছর ধরে আসামে বাস করে আসাম ও ভারতীয় সামাজিক-রাজনৈতিক ক্ষেত্রে অসামান্য অবদান রেখেছেন এমন অনেক মুসলমান ও হিন্দু পরিবার এনআরসি তালিকার বাইরে থাকায় এই তালিকার সাম্প্রদায়িক-রাজনৈতিক লক্ষ্য বা দূরভিসন্ধি সহজেই আঁচ করা যায়।

আসামের মুসলমানদের জন্য ২০১৮ সাল শুরু হয়েছিল সাম্প্রদায়িক রাজনীতি থেকে সৃষ্ট বিপর্যয়কর দুঃসংবাদ দিয়ে। বছরের প্রথম দিন প্রকাশিত নাগরিকত্বপঞ্জির প্রথম তালিকায় আসামে অবস্থানরত বাঙ্গালীদের শতকরা ৭০ জনের নাম বাদ দেয়া হয়। এই তালিকার রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া যাই হোক, সামাজিক প্রতিক্রিয়া অনেক গভীর ও সুবিস্তৃত। প্রথম তালিকা প্রকাশিত হওয়ার পর বাঙ্গালী মুসলমানদের মধ্যে যে হতাশা, ক্ষোভ ও আতঙ্ক দেখা দেয় তা যে কোন সমাজের শান্তি ও স্থিতিশীলতা বিনষ্টের জন্য যথেষ্ট। হতাশ ও অপমানিত নাগরিকদের মধ্যে দ’ুএকজনের আত্মহত্যার খবরও প্রকাশিত হয়েছে। ভারতীয় উপমহাদেশের ভৌগলিক ও রাজনৈতিক মানচিত্রের বিভিন্ন প্রান্তে যে বৈচিত্রময় ভাষা ও ধর্মীয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য গড়ে উঠেছে, সেখানে স্রেফ ভাষা ও ধর্মের মানদন্ডে কোন একপাক্ষিক জাতিয়তাবাদী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হ’লে তাতে বড় ধরনের সামাজিক-রাজনৈতিক বিপর্যয় অনিবার্য হয়ে উঠতে পারে। আঞ্চলিক ও ধর্মীয় রাজনৈতিক সাম্প্রদায়িকতার মেলবন্ধনের ফলে দীর্ঘদিনে আসামে এহেন পরিস্থিতি তৈরী হয়েছে। বরাক উপত্যকার ব্যাপক অর্থনৈতিক সম্ভাবনা থাকা সত্বেও আসামে অর্থনৈতিক উন্নয়ন অগ্রগতির ছোঁয়া লাগেনি। ৩০ শতাংশের বেশী নাগরিককে অবমাননা, হতাশা ও সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের মধ্যে রেখে কোন সমাজে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রত্যাশা করা যায় না। ভারতের অনগ্রসর অঞ্চলগুলোর মধ্যে আসাম অন্যতম। সম্ভবত এর অন্যতম কারণই হচ্ছে সেখানকার জাতিগত ও সাম্প্রদায়িক বিভাজন ও বিদ্বেষ। প্রায় ১ কোটি বাঙ্গালীকে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হিসাবে গণ্য করে অসমীয় জাতিগোষ্ঠীর হীন রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গির দ্বারা প্রত্যাশিত উন্নয়ন ও উন্নত সমাজ নির্মাণে সফল হয়নি। এনআরসি প্রণয়নে বিদ্যমান ত্রুটি ও সমস্যা সমাধানে পৌঁছতে ব্যর্থ হ’লে আসামসহ পুরো উত্তর-পূর্বাঞ্চল অশান্ত, অস্থিতিশীল হয়ে উঠার আশঙ্কা প্রবল। এমনটা যদি ঘটে যায়, আসাম ও বরাক উপত্যকার শান্তি, সমৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতা সুদূর পরাহত। উগ্র সাম্প্রদায়িক এজেন্ডা নিয়ে অনেক দূর থেকে বিজেপি নেতারা যা বলছেন অসমীয় জাতিয়তাবাদী নেতারা তার সাথেই সুর মিলিয়ে পরিবেশ ঘোলা করে রেখেছেন। দীর্ঘদিন ধরেই তারা ভোটের রাজনীতিতে সংখ্যাগরিষ্ঠ অসমীয়দের সমর্থন পাওয়ার জন্য আসাম থেকে বাঙ্গালী মুসলমান খেদানোর যিকর জারী রেখেছেন। গত ৩০ জুলাই প্রকাশিত নতুন এনআরসি তালিকায় ৪০ লাখ মানুষের নাগরিকত্ব বাতিল করতে যেসব অজুহাত বা পদ্ধতি খাড়া করা হয়েছে তা নিতান্তই খোঁড়া অজুহাত মাত্র। আসামের নাগরিকত্ব প্রমাণের জন্য যেসব প্রমাণপত্র চাওয়া হয়েছে তা শতকরা ৭০ ভাগ মানুষই দিতে পারবে না বলে মনে করেন সেখানকার সংশ্লিষ্টরা। এ কারণে প্রথমেই অসমীয়দের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা হিসাবে IavB (অরিজিনাল ইনহেবিটেন্ট) সার্টিফিকেট দেয়া হয়েছে। এরপর বলা হয়েছে, ২০১৪ সাল পর্যন্ত আসা হিন্দুরা নিশ্চিন্ত। অথচ শত শত বছর ধরে আসামে থাকা মুসলমানদেরকে এক কলমের খোঁচায় নাগরিকত্বহীন, উদ্বাস্তুতে পরিণত করে তাদের জন্য ডিটেনশন ক্যাম্প তৈরী করা হচ্ছে। এনআরসি’র চূড়ান্ত খসড়া তালিকা থেকে বাদ যাওয়া শতকরা ৭০ ভাগই বাঙ্গালী। আর এই বাঙ্গালীদের মধ্যে বেশীরভাগই মুসলমান। এনআরসি তালিকায় বাদ পড়া লাখ লাখ পরিবারের মধ্যে আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি তপোধির ভট্টাচার্য, শতবর্ষী নাগরিক চন্দ্রচুর দাস, এমনকি অল আসাম স্টুডেন্টস ইউনিয়নের (এএএসইউ) নেতা সমুজ্জ্বল দাসের পরিবারের কয়েকজন সদস্যের নামও রয়েছে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বিষ্ময়কর ঘটনাগুলো সংঘটিত হয়েছে মুসলমানদের বেলায়। লাখ লাখ মুসলমান পরিবারের মধ্যে ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি ফখরুদ্দীন আলী আহমাদের পরিবারও রয়েছে। এই একটি উদাহরণ থেকেই বুঝা যায়, আসামের এনআরসি তালিকা কোন দৃষ্টিভঙ্গিতে, কী লক্ষ্যে প্রণীত হয়েছে। আসাম চুক্তির দোহাই দিয়ে বলা হয়েছিল, ১৯৭১ সালের মার্চের আগে থেকে যেসব মুসলমান আসামে অবস্থান করছে তাদের কোন সমস্যা হবে না। মাঠের বাস্তবতা ভিন্ন রকম। বরপেটা যেলার নারায়ণগুড়ি গ্রামের স্কুল শিক্ষক আমজাদ আলী আসামের স্থায়ী বাসিন্দা হিসাবে ১৯৩৭ সালে তার বাবার মেট্টিক পাসের সার্টিফিকেট জমা দেয়ার পরও তার পরিবারের নাম ডি-ভোটার তালিকায় রাখা হয়েছে বলে তিনি সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন।

আরও দেখুন:  মালালার নোবেল প্রাইজ ও পশ্চিমা-মুখোশ প্রসঙ্গে

উপমহাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অবিস্মরণীয় ও গুরুত্বপূর্ণ মাস আগস্ট। বিশেষত: আগস্টের ১৪, ১৫, ১৬ তারিখগুলো নানাবিধ কারণে গুরুত্বপূর্ণ। প্রায় ২শ বছরের ঔপনিবেশিক শাসন থেকে পাকিস্তান ও ভারতের স্বাধীনতা লাভ হয়েছিল ১৯৪৭ সালে যথাক্রমে ১৪ ও ১৫ই আগস্ট। আর এই দুই রাষ্ট্রের প্রেক্ষাপট সৃষ্টির পেছনে কাজ করেছিল ১৯৪৬ সালের ১৬ই আগস্ট মুসলিম লীগের ডাকা প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবসে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস ও হিন্দু মহাসভা কর্মীদের মুসলিম বিরোধী দাঙ্গা। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের চলমান আন্দোলনের সময় দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে ভারতীয় সৈনিকরা বৃটিশদের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল, এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৪৬ সালের ১৬ই মে তারিখে বৃটিশ ক্যাবিনেট মিশন কংগ্রেস, মুসলিমলীগ ও অন্য প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি অন্তবর্তীকালীন সরকার গঠনের প্রস্তাব নিয়ে সৃষ্ট মতভেদ থেকে মুসলিমলীগ এই প্রত্যক্ষ সংগ্রামের ডাক দিয়েছিল। সেইদিন কংগ্রেস ও হিন্দু মহাসভার কর্মীরা শত শত উন্মুক্ত তরবারি হাতে মুসলমানদের উপর ঝাপিয়ে পড়েছিল। মাত্র ৭২ ঘন্টায় কলকাতার রাস্তায় হাযার হাযার মুসলমানকে হত্যা করা হয়েছিল, যা ইতিহাসে কলকাতা দাঙ্গা বা গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং নামে পরিচিত। উত্তর কলিকাতায় বসবাসরত হাযার হাযার বাঙ্গালী ও অবাঙ্গালী মুসলমান সে সময় নৃশংসতা থেকে বাঁচতে পূর্ববঙ্গে (বাংলাদেশে) চলে এসেছিল। এদের বেশীরভাগ ছিল মূলতঃ বিহার ও ভারতের অন্যান্য স্থান থেকে কর্মসংস্থানের জন্য আসা মুসলমান। সেই ভয়াল দাঙ্গার সময় প্রাণ বাঁচাতে কলকাতায় সহায়সম্বল সবকিছু ফেলে বাংলাদেশে আসা সেসব ঊর্দূভাষী বিহারী মুসলমানরাই একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের পর আটকে পড়া পাকিস্তানী নাগরিক হিসাবে পরিচিতি লাভ করেছে। যদিও এদের অনেকেই কোনদিন পশ্চিম পাকিস্তানের অধিবাসী ছিল না। উপমহাদেশের রাজনৈতিক ভাগ্য ও ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ বাঁক পরিবর্তনের সাথে জড়িয়ে আছে হিন্দু-মুসলমানের বিভেদ ও দাঙ্গার কলঙ্ক। কলকাতা দাঙ্গা ও গণহত্যা পরবর্তী সময়ে পুরো ভারত জুড়ে রক্তাক্ত সিরিজ দাঙ্গার অনুঘটকের ভূমিকা পালন করেছিল। আসামের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম নেই। ১৯৫০ সালে আসামে ভয়াবহ দাঙ্গায় হাযার হাযার মুসলমানকে হত্যা করা হয়। সে সময় সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের সমর্থনপুষ্ট উগ্রবাদী অসমীয় হিন্দুদের হাত থেকে প্রাণ বাঁচাতে হাযার হাযার মুসলমান পরিবার সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে (পশ্চিম পাকিস্তান) আশ্রয় নিয়েছিল। আসামের চরুয়া খেদা দাঙ্গার সময় গবেষক ভাস্কর নন্দি একটি মুসলমান গ্রামের ৮০০ মানুষকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনা নিজ চোখে দেখার অভিজ্ঞতার বর্ননা দিয়েছেন। তাঁর মতে, পরবর্তীতে লিয়াকত-নেহেরু চুক্তির আওতায় এসব ভারতীয় নাগরিক আসামে ফেরত গেলেও তাদেরকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র বা ডক্যুমেন্টস দেয়া হয়নি। অন্যদিকে বাংলাদেশ থেকে ফেরত যাওয়ার আগেই আসামে প্রথম এনআরসি বা জাতীয় নাগরিকপঞ্জি তালিকা প্রকাশিত হয়ে যায়, যেখানে দাঙ্গার সময় পালিয়ে যাওয়া বাঙ্গালী মুসলমানদের নাম ছিল না। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে ভোটের রাজনীতির সুযোগ সন্ধানীরা বাংলাভাষী লাখ লাখ মুসলমানকে ডি-ভোটার তালিকায় ঢুকিয়ে দেয়। আর উগ্র জাতীয়তাবাদীরা গত তিন দশক ধরে বাংলাদেশ থেকে আসা অনুপ্রবেশকারী আখ্যা দিয়ে তাদেরকে নাগরিকত্বহীন করার হুমকি অব্যাহত রাখে। সেই ১৯৫১ সালের পর আসামে আর কোন নাগরিকত্বপঞ্জি হয়নি। পঞ্চাশের দাঙ্গা ছাড়াও আরো বেশ কয়েকটি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, বাংলাদেশের স্বাধীনতাসহ গুরুত্বপূর্ণ নানা ঘটনাপ্রবাহে আসামের ডেমোগ্রাফিতে তেমন বড় ধরনের কোন পরিবর্তন ঘটেনি। তবে ভারতের অন্যান্য অংশের মত নানা রকম বঞ্চনার মধ্যেও ৬ দশকের বেশী সময়ে আসামেও মুসলমানদের সংখ্যা লক্ষ্যণীয়ভাবে বেড়েছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ থেকে আসামে গিয়ে অভিবাসী হওয়ার কোন রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক কারণ নেই। পাকিস্তান আমলে এবং বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর কোন মুসলমান পরিবারের বাংলাদেশ ছেড়ে আসামে গিয়ে বসতি গড়ার মত কোন পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটেনি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে লাখ লাখ ভারতীয় নাগরিক চাকুরি নিয়ে বাংলাদেশে অবস্থান করছে। সীমান্তবর্তী যেলাগুলোতে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ মুসলমান এটা সাম্প্রতিক সময়ের কোন ঘটনা নয়। আসাম, পূর্ববাংলা, পশ্চিমবঙ্গ মিলে যে গ্রেটার বেঙ্গল সেখানে মুসলমানরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। এই বিশাল বাংলাকে মুসলমানদের নেতৃত্বে ছেড়ে দিতে কলকাতা কেন্দ্রীক হিন্দুদের আপত্তির কারণেই ১৯৪৭ সালে বাংলা ভাগ হয়েছিল।

আরও দেখুন:  নেপালের হিম্মত আমরা কোথায়?

আসামে বাঙ্গালীদের মধ্যে মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। হিন্দুত্ববাদী সংঘপরিবারের রাজনৈতিক উস্কানীতে উগ্র অসমীয়রা ভারতের স্বাধীনতার পর থেকেই বাঙ্গালী খেদাও আন্দোলন শুরু করলেও ভারতের প্রচলিত আইন, ন্যায়সংগত অধিকারের প্রশ্নে ওরা সফল হ’তে পারেনি। বিশেষতঃ বিজেপি যখন আসামসহ উত্তর-পূর্বাঞ্চলে একটি সাম্প্রদায়িক যিকর তুলে ভোটের রাজনীতিতে বিজয়ী হওয়ার স্বপ্ন দেখছিল তখন কংগ্রেস, তৃণমূল কংগ্রেসসহ বামপন্থী রাজনৈতিক সংগঠনগুলো এই অপপ্রয়াসের বিরুদ্ধে কথা বলেছে। সাম্প্রতিক সময়ে আসামে বাঙ্গালী অসমীয় বিভাজন সৃষ্টিকারী বৈষম্যমূলক এনআরসি প্রস্তুতির সময়ও পশ্চিমবঙ্গের মূখ্যমন্ত্রী মমতা বন্ধ্যোপাধ্যায় বিভিন্ন সময়ে বলেছেন, আসামের বাঙ্গালী মুসলমানরা বাংলাদেশের অনুপ্রবেশকারী নন। আসামের সাবেক কংগ্রেসদলীয় মূখ্যমন্ত্রী তরুণ গগৈও বলেছেন, এরা বাংলাদেশ থেকে আসেনি। আসামে মুসলমানদের ইতিহাস প্রায় হাযার বছরের। সেই ত্রয়োদশ শতকের শুরুতে বখতিয়ার খিলজির বঙ্গ বিজয়ের শুরুতে, হযরত শাহজালাল ও সফরসঙ্গীদের মাধ্যমে এবং ষোড়শ শতকে ইরাক থেকে আগত আযান ফকীর আসামে ইসলাম প্রচারের মাধ্যমে সেখানে মুসলমান জনসংখ্যা বেড়ে উঠেছিল। পশ্চিমবঙ্গ ছাড়াও ত্রিপুরা, মেঘালয়, মণিপুর, মিজোরামেও বেশকিছু বাঙ্গালী মুসলমান বাস করেন। একই দেশের এক রাজ্যের অধিবাসী কর্মসংস্থানের জন্য অন্য রাজ্যে গমন ও স্থায়ীভাবে বসবাসের কোন বিধি নিষেধ ভারতীয় আইনে নেই। হিন্দু-মুসলমানের সহাবস্থান ও সম্মিলিত উদ্যোগে গড়ে উঠা আধুনিক উন্নয়নশীল ভারতে হিন্দুত্ববাদীরা ধর্মীয় বিভাজন সৃষ্টির মাধ্যমে যে মানবিক রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি করতে চলেছে তা ভারতের শান্তি ও স্থিতিশীলতার প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়াতে পারে। উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা পুরো ভারতজুড়ে একটি মুসলিমবিদ্বেষী জনমত গঠনের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা হাছিলের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আসামসহ বেশ কয়েকটি রাজ্যে বিজেপি সরকার গঠনের মধ্য দিয়ে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির সুফল বিজেপি’র পক্ষে গেলেও এর মধ্য দিয়ে একদিকে ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক সংস্কৃতি কলুষিত হচ্ছে অন্যদিকে সাম্প্রদায়িক সহাবস্থান ও সম্প্রীতির পরিবেশ ধ্বংস করে ভারতকে ভেতর থেকে অস্থিতিশীল ও দুর্বল করা হচ্ছে। ৪০ লাখ মানুষকে তালিকার বাইরে রেখে করা আসামের নতুন এনআরসি সেখানকার অসমীয়দের কোন সমস্যা না হ’লেও বাঙ্গালীদের জন্য বড় সংকট সৃষ্টি করেছে। পাশাপাশি বাংলা ভাষী হিন্দুদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থার কথা বলে অতি সূক্ষ্মভাবে ধর্মের ভিত্তিতে বাঙ্গালীদের মধ্যে একটি বিভাজন সৃষ্টি করতে চাইছে। বিজেপি ও আসামের রাজনৈতিক নেতাদের এহেন কর্মকান্ডের সবচেয়ে অস্বাভাবিক ও উদ্ভট দাবী হচ্ছে, লাখ লাখ বাঙ্গালী মুসলমানকে বিদেশী বা বাংলাদেশ থেকে যাওয়া অনুপ্রবেশকারী আখ্যায়িত করা। দেশভাগের পর বাংলাদেশের বাঙ্গালী মুসলমানরা যখন পাকিস্তানীদের চাপিয়ে দেয়া ঊর্দূর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল, সেই পদাঙ্ক অনুসরণ করে বরাক উপত্যকার বাঙ্গালীরাও তাদের উপর অসমীয় ভাষা চাপিয়ে দেয়ার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল। তবে ঘটনাক্রমের বিচারে বাংলাদেশ এবং আসামের ভাষা আন্দোলনের পটভূমি সমসাময়িক। ১৯৬১ সালের ১৯শে মে তারিখে আসামের শিলচরে বাংলাভাষার মর্যাদা রক্ষা ও তাদের অঞ্চলের দাফতরিক ভাষা হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করার দাবীতে এবং রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে ১০ হাযারের বেশী মানুষ রাস্তায় নেমেছিল। সেদিন শিলচর রেলস্টশনে পুলিশের গুলিতে ১১জন নিহত হয়েছিলেন। এর প্রায় একদশক পর বাংলা ভাষা আসামের অন্যতম সরকারী ভাষা হিসাবে স্বীকৃতি লাভ করে। গতে কয়েক বছর আগে আসামের শিলচর রেলস্টেশনটিকে ভাষাশহীদ স্টেশন হিসাবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিয়েছে ভারত সরকার। ভারতের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ইতিহাস সম্পর্কে বিজেপি বা আসামের নেতারা অজ্ঞ এমনটা মনে করার কোন কারণ নেই। আসামের নাগরিকত্বপঞ্জী নিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে রাজনৈতিক জটিলতার সাথে বাংলাদেশকেও জড়ানো হচ্ছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের সরকার, রাজনৈতিক দলগুলোর কোন প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে না। তারা হয়তো ভাবছেন এটা ভারতের আভ্যন্তরীন বিষয়। একইভাবে রোহিঙ্গা সমস্যাও মিয়ানমারের আভ্যন্তরীণ বিষয় ছিল। রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের প্রশ্নে বাংলাদেশসহ প্রতিবেশী ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নিরবতার সুযোগে উগ্রবাদী বৌদ্ধ ও সামরিক জান্তার হাতে জাতিগত নির্মূলের শিকার হয়েছে। ভারতের উগ্র হিন্দুত্ববাদীরাও রোহিঙ্গা ও বাঙ্গালী মুসলমানদের গুলি করে হত্যার হুমকি দিয়েছে। এহেন বাস্তবতায় ভারত ও বাংলাদেশের সরকার, সব রাজনৈতিক শক্তি ও নাগরিক সমাজকে আসামের এনআরসি এবং হিন্দুত্ববাদীদের সৃষ্ট সাম্প্রদায়িক সংকট সম্পর্কে সজাগ থাকতে হবে, ঐক্যবদ্ধভাবে রুখে দাঁড়াতে হবে। এক্ষেত্রে জাতিসংঘ, ওআইসি ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নযরদারীর উদ্যোগ থাকতে হবে।

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

মন্তব্য করুন

Back to top button