মুসলিম জাহান

থাইল্যান্ডে ইসলামি শিক্ষা

মোট জনসংখ্যার মাত্র ২ শতাংশ মুসলিম অধ্যুষিত থাইল্যান্ডের তিনটি প্রভিন্স মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বলে বিবেচিত। তার মধ্যে অন্যতম হলো ইয়ালা প্রভিন্স। সেখানকার মোট জনগোষ্ঠীর ৭৫ শতাংশ মুসলিম। এখানকারই একটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হলো ইয়ালা রাজাবাহাত বিশ্ববিদ্যালয়। সেখানকার কনফারেন্সে যাওয়ার উদ্দেশে যখন আমি ব্যাংকক থেকে ডমেস্টিক ফাইটে হাটইয়াই বিমানবন্দরে পৌঁছাই, তখন আমাকে নেয়ার জন্য সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক ও একজন ছাত্র সেখানে অপেক্ষারত ছিলেন। তাদের সাথে পরিচয় পর্বে দেখি, সেই শিক্ষক আমার সাথে ইংরেজিতে কথা বললেও ছাত্রটি আরবিতে কথা বলছে। আমি মনে করলাম হয়তো সে ইসলামিক স্টাডিজ কিংবা আরবি বিভাগে পড়ে। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, সে কোন প্রোগ্রামে এবং কোন বিভাগে অধ্যয়ন করছে? সে জানাল, এডুকেশন ডিপার্টমেন্টে মাস্টার্সে অধ্যয়নরত। আমি অবাক হয়ে সে কিভাবে আরবি শিখেছে তা জানতে চাইলাম। আমি যেমন অবাক হয়েছিলাম তার চেয়ে বোধ হয় তারা দু’জনই বেশি অবাক হলেন আমার প্রশ্ন শুনে। এরপর সেই শিক্ষক আমাকে যা জানালেন তা হলোÑ থাইল্যান্ডের এ অঞ্চলের সব মুসলিম ছাত্রই ইংরেজিতে ভালো কথা বলতে পারে না এটা ঠিক, কিন্তু আরবিতে মোটামুটি কমিউনিকেট করতে পারে। কারণ হলোÑ তাদের শিক্ষাজীবনের শুরুতেই আরবিকে এতটাই গুরুত্ব দিয়ে শেখে যে, শুধু কুরআন তিলাওয়াত বা হাদিস পড়তে পারাই তাদের সন্তুষ্ট করতে পারে না, বরং এটি তাদের জন্য সেকেন্ড ল্যাঙ্গুয়েজ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। আর তাই বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত প্রায় সব মুসলিম ছাত্রছাত্রীই আরবিতে কথোপকথন করতে পারে। বিষয়টি জানার পর থেকেই মনের মধ্যে কেমন যেন খচখচ করতে লাগল। আমাদের বহনকারী প্রাইভেট কারটি তখন নীল সমুদ্রের তীর ঘেঁষে ঘণ্টায় ১২০ কিলোমিটার বেগে এগিয়ে চললেও ক্ষণিকের জন্য লাল-সবুজে মোড়ানো এক লাখ ৫৫ হাজার বর্গমাইলের ৯২ শতাংশ মুসলিমের কথা মনে পড়ে আমার পৃথিবীটা যেন স্থীর হয়ে গেল। আমাদের মাদরাসায় পড়–য়ারাও যেখানে কুরআন শুদ্ধ করে পড়তে পারে না; সেখানে অন্যদের কথা কী-ই বা বলব!

আরও দেখুন:  সৌদি আরবের রমজানচিত্র

যা-ই হোক, যে বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার প্রোগ্রাম সেখানে মুসলিম ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা ৭৫ শতাংশ হলেও শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীর অনুপাত ৫০:৫০। তবে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হওয়াতে উচ্চপদস্থ প্রায় সবাই অমুসলিম। তবুও তাদের কনফারেন্স হলে যখন প্রবেশ করি, তখন থেকেই অবাক হতে থাকি। আমাকে অভ্যর্থনা থেকে শুরু করে রেজিস্ট্র্রেশন বুথসহ হলের মধ্যে যারা বসে আছেন তাদের পোশাক বিশেষ করে এমন একজন মুসলিম ছাত্রী কিংবা শিক্ষককে দেখলাম না, যে বা যারা হিজাব পরেনি। এমন পরিস্থিতি দেখব তা চিন্তাও করিনি। প্রো-ভাইস চ্যান্সেলরকে তারা ভাইস প্রেসিডেন্ট বলে। তিনি ছিলেন এ প্রোগ্রামে প্রধান অতিথি। সাথে আরো কিছু অমুসলিম কর্মকর্তাও ছিলেন। তাদের অপুস্থিতিতে প্রোগ্রাম শুরু হলো হামদ ও নাতে রাসূল সা:-এর সাথে। প্রায় ৩০ মিনিট যারা এই অনুষ্ঠানে পারফর্ম করলেন, তারা সবাই ইসলামি পোশাক পরা। বাজনা ব্যবহার করলেও হাদিসে বর্ণিত ‘দফ’ই দেখলাম এখানে। এটাকেই তারা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হিসেবে বিবেচনা করে।

পরবর্তী দিন ছিল শুক্রবার। দিনটি ছিল রমজানের আগে শাবানের শেষ জুমাবার। কর্তৃপক্ষ আমাকে অনুরোধ করলেন তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্ট্রাল মসজিদে খুতবা ও জুমার সালাত আদায়ের জন্য। একটু শঙ্কা বোধ থাকলেও তাদের বিশেষ অনুরোধ উপেক্ষা করতে পারিনি। মসজিদটি এত বড় নয়। দু’তলা মসজিদে সবমিলিয়ে পাঁচ থেকে ছয় শত মুসল্লি সালাত আদায় করতে পারেন। আমাকে যখন সেখানে নিয়ে যাওয়া হলো, আমি মসজিদে প্রবেশ করেই চার পাশে তাকিয়ে দেখিÑ তিন পাশে পুরোটাই বিভিন্ন বইয়ের শেলফে ঘেরা। একটু কাছে গিয়ে দেখলাম, কুরআন ও হাদিস গ্রন্থের পাশাপাশি রাসূল সা:-এর সিরাত, ফিকহ, মাসয়ালা-মাসায়েলের বইসহ ইসলামের বিভিন্ন বই। দেখলাম যারাই মসজিদে প্রবেশ করছে দুই রাকাত সালাত আদায় করেই কেউ কুরআন, কেউ হাদিস নিয়ে অধ্যয়ন করছে। এই তো সেই মসজিদ, যা রাসূলুল্লাহ সা: প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

পরবর্তীকালে একটা সময় তাদের জিজ্ঞাসা করলাম, ইসলামি শিক্ষা নামে কোনো বিভাগ তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে আছে কি না? আমাকে আবারো অবাক করে দিয়ে যা জানাল তা সত্যিই বিস্মিত হওয়ার মতো। এই ইয়ালাতেই নাকি একটা পূর্ণাঙ্গ ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় আছে, যার নাম পাটানি বিশ্ববিদ্যালয়। সেই রাতেই আমাকে নিয়ে যাওয়া হলো বিশ্ববিদ্যালয়টি দেখাতে। গেইট থেকে শুরু করে প্রত্যেকটা স্থাপত্যে ইসলামের একটা প্রভাব সুস্পষ্ট। এখানে শুধু কুরআন, হাদিস, ফিকহ, আরবি পড়ানো হয় না বরং অন্যান্য প্রত্যেকটা বিষয়ে ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েই পড়ানো হয়। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি তাদের আরো একটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হলো প্রিন্স সংখলা ইউনিভার্সিটি। সে বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ক্যাম্পাস আছে পাত্তানি প্রভিন্সে। সেখানে আরবি, ইসলামি স্টাডিজসহ, ইসলামি ল’, ইসলামি এডুকেশন নামে বিভাগ রয়েছে। এ ছাড়াও আরো অনেকগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা তারা বলল, যেখানে ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ শুধু নয়, ইসলামি আইন, ইসলামি এডুকেশনের পাশাপাশি বিশ্বধর্ম বিভাগে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে ইসলামি শিক্ষা পড়ানো হয়। কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে অমুসলিম ছাত্ররা আরবি শেখে। তা ছাড়া মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় সরকারি ও বেসরকারি মাদরাসার পাশাপাশি স্কুল-কলেজেও ইসলামি শিক্ষাকে গুরুত্বের সাথে পাঠদান করা হয়। এসব এলাকার অনেকেই আল-আজহার, উম্মুল কুরা, ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় মদিনা, আন্তর্জাতিক ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় মালয়েশিয়াসহ বিশ্বের নামকরা সব প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে ফিরে এসে নিজ এলাকায় ইসলামি শিক্ষা ও সংস্কৃতি, ইসলামি অনুশাসন ও তা চর্চার জন্য মানুষের মাঝে কাজ করে যাচ্ছে। এরকম শিক্ষাব্যবস্থার জন্য মানুষগুলোকে যেভাবে গড়ে তোলা হয়েছে, তা-ই ছিল ইসলামের কাম্য। সুতরাং এ পরিবেশ, শিক্ষাব্যবস্থা, বাস্তব জীবনে ইসলামি অনুশাসন সত্যিই অদূরভবিষ্যতে অন্যাদের জন্য শুধু অমুসলিম দেশে মুসলিমদের জন্য নয়, বরং মুসলিম দেশগুলোর জন্য অনুকরণীয় হবে বলে আমার বিশ্বাস।

আরও দেখুন:  মধ্য এশিয়ার বৃহত্তম মসজিদ তাজিকিস্তানে

লেখক : ড. মোহম্মদ ওবায়দুল্লাহ (শিক্ষাবিদ, গবেষক)

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

মন্তব্য করুন

Back to top button