ছোটগল্প/উপন্যাস

পুরষ্কার

EWA A103 Bluetooth Speaker

রোজ ভোরবেলা সি এন জি নিয়ে বের হয় রুস্তম আলি। আলো ভাল করে ফোটার আগেই। ঘন্টা দুয়েক চালিয়ে তারপর কোন রাস্তার পাশের দোকান থেকে চা খেয়ে নেয়। সাথে কোনদিন পাউরুটি, কোনদিন দুইটা শিঙাড়া। ঘরে স্ত্রী আছে আর ছেলে মেয়ে তিনজন।

ছোটটার পোড়াশোনার বয়স হয়নি এখনো, বড় দুইজন স্কুলে যায়। ছেলেটার এখন বারো চলছে, ক্লাস ফাইভে পড়ে। নামাযটা পড়েই বেরুবার জন্য তৈরি হয় রুস্তম। আর তখনি ঘুমঘুম চোখে ছেলেটা এসে বলে, ‘বাবা, আইজ কিন্তু টাকা আনন লাগবই। তুমি এক মাস সময় নিসো। আইজ এক মাস পূর্ণ হইসে।’

রুস্তম অস্পষ্ট হাসে, ‘হ, মনে আছে।’

ছেলেকে আর কথা বাড়ানোর সুযোগ দেয়না রুস্তম।গ্যারাজে গিয়ে সি এন জি স্টার্ট দেয়। গলির মুখেই দেখা হয় রফিকুল আলম স্যারের সাথে। মাথায় টুপি, পরনে সাদা পাঞ্জাবী – স্যারকে এ সময় প্রায়ই এই বেশে দেখা যায়। মোড়ের মসজিদ থেকে ফজর পড়ে আস্তে ধীরে বের হন। রুস্তম এর সি এন জিতে সূযোগ পেলেই চড়েন তিনি। এ পাড়ায় যতজন মোটামুটি ভদ্রগোছের হাসিখুশি মানুষ আছেন, তাদের সবার মধ্যে এই স্যারকে বেশি ভাল লাগে তার। দেখা হতে আগেই সালাম দিয়ে ফেলল রুস্তম। জবাব দিয়ে আলম সাহেব বললেন, ‘রুস্তম ভাল আছ?’

‘জ্বি স্যার, ভাল। আফনে ভাল?’

‘আছি।’

রুস্তম হাসিমুখে পাড়া থেকে বের হল। এই পাড়ার সামনের অংশে ছিমছাম সব বাড়ি। আলম স্যাররা যেসব বাড়িতে থাকেন। পেছনের দিকে কিছু বস্তি আছে যেখানে রুস্তমদের মত দশ পনেরটা পরিবার থাকে। হাসিমুখে বের হলেও রুস্তম এর মনের ভেতরটা খচখচ করছে। ছেলেটার জুতা ছিঁড়ে গেছে। এক জোড়া জুতা কিনে দেয়ার কথা বহুদিন থেকে। ও যে জুতা চাইছে সেটার দাম এগারো শ’ টাকা। রুস্তম জুতা কেনার টাকা জমাচ্ছে বহুদিন ধরে, কিন্তু সংসার চালিয়ে এগারো শ’ টাকা এক করতে পারছেনা কিছুতেই।

ছেলেটা জীবনে বলতে গেলে এই প্রথম কিছু চাইল। দিতে না পারলে মনটাতে স্বস্তি আসবেনা কিছুতেই। অভাবের সংসারে তার এই ছেলেটা যথেষ্ট বুঝদার। ছোট ভাইবোনকে খাওয়ায় নিজে না খেয়ে, নিজের শখ বাদ দিয়ে ওদের শখ পূরণ করে। এবারই শুধু নিজের জন্য কিছু চেয়েছে। এবার রুস্তম কিছুতেই হারতে চায়না। কিন্তু আসলে ওর কাছে মাত্র চারশ টাকা আছে। সি এন জির ভাড়া প্রতিদিন আটশ’ টাকা। প্রতিদিনের আয় থেকে এই টাকা এবং গ্যাস এর টাকা বাদ দিয়ে আর যা থাকে তা দিয়ে কোনরকমে সংসার চলছে। কিছু টাকা জমেছিল, ছোটটার অসুখে চলে গিয়েছে সব হাত পিছলে। রুস্তমের স্বপ্ন ছিল নিজে একটা সি এন জি কিনবে। কিন্তু তার এই স্বপ্ন পুরণ হবার তেমন কোন পথ সামনে খোলা নেই।

দুপুরবেলা তার যাত্রী হল মধ্যবয়সী এক ভদ্রলোক। উঠে বসার পর থেকেই বারবার ফোনে কথা বলছিল। তার হাতে কিছু ফাইলপত্র। মনে হল কোন দাপ্তরিক কাজে কোথাও যাচ্ছে আর সেটা নিয়েই বেচারা একটা দুশ্চিন্তায় আছে। পঁয়ত্রিশ মিনিটের যাত্রাপথে লোকটা প্রায় পঁচিশ মিনিটই কথা বলল। গন্তব্য এলে নেমে গেল যথানিয়মে।

তাকে নামিয়ে দিয়েই গ্যাস নেবার জন্য গেল রুস্তম। সিএনজি সিরিয়ালে রাখতে গিয়ে ভেতরে কালো রঙ এর কিছু পড়ে থাকতে দেখল সীটের নিচে। পেছনের দরজা খুলে জিনিষটা হাতে নিয়ে রুস্তম অবাক। লোকটা মানিব্যাগ ফেলে গেছে! অথচ তাকে ভাড়া দেবার সময় শার্টের সামনের পকেট থেকে টাকা দিয়েছে মনে আছে রুস্তমের।

মানিব্যাগটা বেশ মোটা। একটু খুলতেই অনেকগুলো হাজার টাকার নোট দেখা গেল ওখানে, লম্বালম্বিভাবে ভাঁজ করে রাখা। রুস্তমের বুকটা কেমন দুরুদুরু করতে লাগলো। তার মাত্র এক হাজার টাকার দরকার ছিল আজ। আর এখানে তো অনেকগুলো নোট!

রুস্তম একটা ছোট্ট নিশ্বাস ফেলে মানিব্যাগটা পকেটে রাখল। সি এন জি সিরিয়ালে রেখে চিন্তা করতে লাগলো কি করা যায়। ভদ্রলোককে অস্থির মনে হয়েছিল। এইজন্যেই ভুল করে মানিব্যাগ ফেলে গেছে। আজ হয়ত এই টাকাটা দিয়ে সে বেচারা অনেক কাজ করার পরিকল্পনা নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল।

রুস্তম ব্যাগ খুলে কোন ঠিকানা বা নম্বর পাওয়া যায় কিনা খুঁজে দেখল। হ্যাঁ, একটু দেখতেই ইংরেজিতে নাম লেখা কার্ড পাওয়া গেল, ওখানে ফোন নম্বরও আছে। রুস্তম নিজের মোবাইল বের করে ঐ নম্বরে ডায়াল করল। প্রথমবারেই পাওয়া গেল লোকটাকে। মানিব্যাগের খবর শুনে সে খুব খুশি হয়েছে বোঝা গেল।

মিনিট সাত আট পরেই লোকটা গ্যাস স্টেশনে চলে এল। রুস্তম মানিব্যাগ বের করে লোকটার হাতে দিয়ে বলল, ‘দেইখা নেন। আমি টাকাপয়সাতে হাত দেইনাই। শুধু আপনার হদিস পাওয়ার লাইগা ঠিকানা বা নম্বর আছে কিনা খুঁইজা দেখছি।’

লোকটা আমায়িক ভঙ্গিতে হাসলো, ‘ভাই, তুমি যদি টাকাপয়সা চাইতে, তাহলে আমাকে আর ডাকতে না। অনেকদিন হল একজন আমার কাছ থেকে ধার নেয়া বিশ হাজার টাকা দিতে পারছিল না। আজই টাকাটা দিয়েছে সে, তাই মানিব্যাগে এত টাকা। নইলে এযুগে কেউ এত ক্যাশ নিয়ে রাস্তায় ঘুরে না। মানিব্যাগে হাত না দেয়ার জন্য আমি কিছু টাকা আলাদা করে শার্টের পকেটে রেখে দিয়েছিলাম। অথচ দেখো মানিব্যাগটাই পকেট থেকে পড়ে গেল! তুমি সৎ মানুষ বলেই আমাকে ফোন করে ডেকে এনেছ। তোমার মত মানুষ দুই চারজনই আছে ভাই। নাও তুমি এক হাজার টাকা রাখো। ‘

রুস্তম সামনে বাড়ানো হাতটার দিকে তাকালো। এক হাজার টাকার পরিস্কার একটা নোট। তার আজ এই টাকাটা হলেই চলে। কিন্তু কেন জানি মন সায় দিচ্ছেনা। আল্লাহ্‌ তাকে হয়ত পরীক্ষা করেছেন। এতগুলি টাকা সামনে পেয়ে তার লোভী হতে ইচ্ছা করে কিনা সেই পরীক্ষা। কষ্ট করেই সেই পরীক্ষাটা পাশ করেছে সে। এখন সামান্য এক হাজার টাকার জন্য আর লোভ করতে ইচ্ছা করছেনা। বড় হতে ইচ্ছা করছে। লোভকে ছাড়িয়ে যাবার লোভ!

‘না ভাই, মাপ করেন। এইভাবে টাকা নিতে পারুম না আমি। আপনার জিনিষ পাইয়া এইটা ফিরায়া দেওয়া আমার কর্তব্য আছিল। এই টাকায় আমার কোন হক্ক নাই।’

লোকটা কয়েক মুহুর্ত তাকিয়ে থেকে টাকাটা ফিরিয়ে নিল। রুস্তমের কন্ঠে এবং বলার ভঙ্গিতে যে অদ্ভুত একটা দৃঢ়তা ছিল তা সে টের পেয়েছে।

‘ঠিক আছে, তুমি বরং আমার সাথে কোন একটা আইস্ক্রীম পার্লারে চল। আমি আর তুমি আইস্ক্রীম খাব। খুব গরম পড়েছে!’

‘না ভাই। আমার খ্যাপ ধরতে হইব, আপনি যান। এখন আর কোথাও যামু না। আপনের মত মানুষও দুই চারজনই আছে!’ বলে রুস্তম হাসলো।

‘সত্যিই যাবেনা তুমি তাহলে?’

‘জ্বি না ভাই। আপনে বাসায় যান।’

‘ঠিক আছে। ভাল থাকো তাহলে।’

লোকটা আর দাঁড়ালো না। হনহন করে হেঁটে অদৃশ্য হয়ে গেল।

বাকী সময়টা কেন জানি অন্যমনস্কতায় কাটলো রুস্তমের। বারবার মনে হচ্ছিল এক হাজার টাকা নিলে এমন কিছু ক্ষতি হত না। নিশ্চিন্তে ছেলের জুতা কিনে নিয়ে আসতে পারত, সংসার খরচে আঁচও পড়ত না। আবার মনের আরেকটা অংশ বলছিল যা করেছে ঠিক করেছে সে। লোভের গর্তে পড়ার পরীক্ষায় পাশ করেছে, তারপর এর জন্য কোন পুরস্কার তার পাওনা ছিল না। পুরস্কার কিছু পাওয়ার থাকলে তা হাশরের মাঠের জন্য তোলা থাকুক।

সন্ধ্যার মুখে বাড়ি ফেরে রুস্তম। রোজ। আজ ফেরার মুখে আলম স্যারের সাথে আবার দেখা। সকালে স্যারের হাসিটা যেন একটু ম্লান ছিল, এখন একেবারে উজ্জ্বল। তাকে দেখেই বললেন, ‘বাহ ভালই হল রুস্তম, তোমাকে পেয়ে গেলাম। শোন, জরুরী কথা আছে।’
‘বলেন স্যার।’

‘তুমি সেদিন বলছিলে না, তোমার ছেলের জন্য জুতা কিনতে পারছনা, হাজারখানেক টাকা লাগছে?’

‘জ্বি স্যার।’

‘এটা রাখো। এখানে এক হাজার টাকা-ই আছে। তোমাকে ব্যপারটা খুলে বলি। আমি আজকে একটা খুশির খবর পেয়েছি। এটা নিয়ে গত দুই মাস টেনশানে ছিলাম। আজ টেনশান দূর হল। ভাবলাম এক হাজার টাকা সাদাকা করব এমন কাউকে যার এই মুহুর্তে টাকাটা দরকার। কাকে দেব ভাবছিলাম, ঠিক সেইসময় তোমাকে দেখতে পেলাম। আমি জানি তুমি এমনি এমনি কারো কাছ থেকে টাকা নাও না। কিন্তু এটা আমার সাদাকার টাকা, তুমি নিলে আমি খুশি হব।’

রুস্তম দুই এক মুহুর্ত ভেবে টাকাটা হাতে নিল, ‘আচ্ছা দ্যান স্যার।’ মনে মনে ভাবল, এটা আল্লাহ্‌র বিশেষ রহমত। নইলে একইদিনে বারবার এরকম সুযোগ কেন আসবে! তার মনটা ভাল হয়ে গেল। এখন বাসায় গিয়ে ছেলেকে সুখবরটা দিতে পারবে। নিজেকে খুব হাল্কা লাগছিল তার।

নাহ, সে সারাদিন কোন ভুল করেনি!

#roudromoyee_jibonergolpo

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

মন্তব্য করুন

আরিও দেখুন
Close
Back to top button