ছোটগল্প/উপন্যাস

দশ মিনিট

১।
সাধারণত বারান্দায় কোন কাজ থাকলে তাড়াতাড়ি সেরে চলে আসা হয়। আজ বিকেলে বারান্দায় শুকনো কাপড় তুলতে তুলতে গ্রিলের ফাঁকে বাইরে তাকালো দিয়া। বাড়িটা মেইন রোডের ওপরে হওয়াতে প্রতিদিন নানান দৃশ্য চোখে পড়ে।

কত মানুষ যাওয়া আসা করছে। প্রত্যেকটা জীবনে কত ব্যস্ততা, কত গল্প, কত কাহিনী… বিশেষ এক কারণে আজ মনটাও ভালো লাগছে না। হাতে এক গাদা কাপড়চোপড় নিয়ে দাঁড়িয়ে বাইরের রাস্তাটা দেখতে লাগল সে।

রাস্তার ওপারে একটা ফাস্টফুডের দোকান। দোকানের সামনে রিকশায় বসে আছে এক খোলা চুলের সুন্দরী। কিছুক্ষণ পর এক তরুন দোকান থেকে বের হয়ে এসে মেয়েটিকে কি যেন বলে আবার ভেতরে চলে গেল। মেয়েটির বয়ফ্রেন্ড মনে হচ্ছে।

রিকশাওয়ালা বিরক্তিমাখা চেহারা নিয়ে রিকশা ধরে দাঁড়িয়ে আছে আবার তাকিয়ে তাকিয়ে মেয়েটিকে দেখছে। এই শ্রেণির মানুষগুলি একটু কেমন যেন – সুন্দরী দেখলেই হা করে চেয়ে থাকে। মেয়েটিরও দোষ আছে, এভাবে খোলামেলা চলাফেরা না করলে কি হয় না?

বোরখা পরিহিতা কমবয়সী মেয়েটি ছোট বোনের হাত ধরে সাবধানে রাস্তা পার হওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছে। একটু আগায় তো আরেকটু পেছোয়। আপাদমস্তক কালোয় মোড়ানো মেয়েটির চোখ দুটো শুধু বের হয়ে আছে। পিচ্চি বোনটার মাথাতেও হিজাব জড়ানো।

আজকাল এই শহরে কম বয়সী পর্দানশীন মেয়েদের সংখ্যা ভালোই বেড়েছে দেখা যাচ্ছে। এধরনের মেয়ে দেখলে শান্তিতে মনটা ভরে যায়। তবে চার পাঁচটা প্যাচ মেড়ে মাথায় উঁচু পট্টি বাঁধা হিজাবি দেখলে অসহ্য লাগে দিয়ার।

এক ভদ্রমহিলা “আই সিএনজি যাবা?” হেকে হাঁটতে হাঁটতে সামনে এগিয়ে যাচ্ছেন, পেছন থেকে কড়া গলায় ধমক লাগালেন তার স্বামী – “সিএনজি যাবে বলার পরেও কথা না বলে চলে গেলা যে? কানে শুনো না, না কি?” ভদ্রলোকের চীৎকার রাস্তার এপার থেকে শুনতে পেল দিয়া।

রাস্তার উপর যে লোক তার স্ত্রীর সাথে এমন ব্যবহার করে – ঘরের ভেতর না জানি কত অত্যাচার সহ্য করতে হয়। তবে প্রতিনিয়ত এসব শুনতে শুনতে অভ্যস্ত মনে হলো ভদ্রমহিলাকে। নির্বিকারভাবে হেঁটে সিএনজিতে গিয়ে বসলেন।

আরও দেখুন:  ‘তোমরা মুশরিকদের যেখানেই পাও, হত্যা করো’ ...... অতঃপর

দোকানটার কর্মচারী এক ছেলে দাঁত বের করে হাসতে হাসতে বের হয়ে এলো ভেতর থেকে। হাতে এক গাদা প্লেইট। রাস্তার পাশে কাঁত করে পানি ফেলল। আবার হাসতে হাসতে ভেতরে চলে গেল। কিসের এত আনন্দ মনে – আল্লাহ ভালো জানেন। মজার কোন ঘটনা ঘটেছে হয়তো।

সেই ছেলেটি আবার বের হয়ে এসেছে রিকশার কাছে। মেয়েটিকে আবারো কী যেন বলে ভেতরে চলে গেল। এবার বিরক্তি প্রকাশ পাচ্ছে মেয়েটির মাঝেও। কতক্ষণ আর এভাবে বসে থাকা যায়। রিকশাওয়ালা নিশ্চয়ই অনেক বেশি ভাড়া চাইবে। কেমন আড়চোখে বার বার দেখছে তাকে লোকটা।

ফুটপাথে দাঁড়িয়ে এক বৃদ্ধ উঁচু স্বরে সেলফোনে কথা বলছেন। অপর পাশের কারো উদ্দেশ্যে আঙ্গুল তুলে উত্তেজিত ভঙ্গিতে বলে চলেছেন, “আর এক ঘন্টা পর বাসায় ফিরব আমি…জ্বি এক ঘন্টা পর…কাছাকাছিই আছি, তবে এক ঘন্টার আগে ফিরছি না আমি…।” কার উপর অভিমান করে আছেন তিনি? নিশ্চই স্ত্রীর উপর!

২।
সিএনজি অটোরিকশাতে মুখ অন্ধকার করে বসে আছে স্নিগ্ধা। শুনেছে মার অবস্থা ভালো না, হাসপাতাল থেকে বাসায় নিয়ে আসা হয়েছে। স্নিগ্ধার বড় ভাই এসেছে ওকে মার কাছে নিয়ে যেতে। স্বামী জরুরী কাজে শহরের বাইরে আছেন। মা’র কথা শোনার পর থেকে ঠিকমত মাথা কাজ করছিল না মেয়েটির। বাসা থেকে বের হয়ে একটা সিএনজি অটোরিকশা দেখে ডাক দিল।

লোকটা কি বলল ভালো করে না শুনেই কী মনে করে সামনে হাঁটা দিল। ঠিক তখনই পেছন থেকে ভাইয়ার ধমক খেতে হলো। ভাইয়ার এই স্বভাবটা যে কবে বদলাবে, অনেক দিন পর ভাইয়ের ঝাড়ি খেয়ে মনটা হঠাত ভালো হয়ে গেল স্নিগ্ধার!

আব্দুস সবুর মিয়া চৌদ্দ বছর ধরে এই শহরে রিকশা চালায়। প্রতিদিন কত রকমের মানুষ তার রিকশায় ওঠা-নামা করে। আজ এক প্যাসেঞ্জারকে দেখে চমকে উঠল সে। অবিকল সুমাইয়ার মত দেখতে। সুমাইয়া তার বড় আদরের মেয়ে ছিল। শ্বশুর-বাড়িতে নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করেছিল।

আরও দেখুন:  প্রশান্তি

এই মেয়েটির মুখের আদল, চোখ-নাক-মুখ সব সুমাইয়ার সাথে মিলে যায়। কি আশ্চর্য! বার বার আড়চোখে দেখতে লাগল সে কন্যারূপি মেয়েটিকে। বাড়ি ফিরে জামিলাকে বলতে হবে ঘটনাটা।

সানজিদা আজ খুব বিরক্ত। গতকালই ঠিক করে রেখেছে আজ ক্লাস ফাঁকি দিয়ে শৌরভের সাথে ঘুরতে বের হবে, অথচ বের হওয়ার আগ মুহুর্তে ভাবী তার মেয়েকে ধরিয়ে দিলেন কোচিং এ নিয়ে যেতে হবে। ভার্সিটির পাশেই ওর কোচিং সেন্টার কি না।

ভাগনীটা আবার রাস্তা পার হতে ভয় পায়। এমনিতেই দেরী হয়ে যাচ্ছে। রাগে ওর হাত শক্ত করে ধরে টেনে রাস্তা পার হওয়ার চেষ্টা করছে সানজিদা। সম্ভ্রান্ত ধার্মিক পরিবারে জন্ম হওয়ার কারনে ছোট থেকেই বাধ্য হয়ে কঠিন পর্দা করতে হয় ওকে। পরিবারের প্রত্যেকটা মেয়েকেই করতে হয়। এমনকি ছোট ভাগনিটাকেও ছাড় দেয়নি। কিছুদিন পর ওকেও সানজিদার মত প্যাকড হয়ে চলতে হবে। ছোট্ট একটা দির্ঘশ্বাস ফেলে আবারো হাত ধরে টানতে লাগল ওকে।

অনেক্ষণ হয়ে গেল রাহাত খাবার অর্ডার করতে ফাস্টফুডের দোকানটাতে ঢুকেছে, রিকশায় বসে চুলে হাত বোলাতে বোলাতে অপেক্ষা করছে ফারজানা। আজ ওদের বিয়ের এক বছর পূর্ণ হলো। দুইজন বাইরে খাবে ঠিক করেছিল। অথচ রাহাতের ইচ্ছা খাবার কিনে বাসায় নিয়ে বাবা-মাকে সাথে নিয়ে খাবে।

এভাবে বসে থাকতে অস্বস্তি লাগছে ওর, রিকশাওয়ালা কেমন করে বার বার তাকাচ্ছে ওর দিকে। নেমে রাহাতের কাছে যাবে কি না ভাবছে, এমন সময় বের হয়ে রাহাত জানতে চাইল খাবারের সাথে কি ড্রিংকস নেয়া যায়।

রফিক সাহেবের স্ত্রী মারা যাওয়ার পর থেকে তার মাথায় গন্ডগোল দেখা দিয়েছে। নিঃসন্তান এই বৃদ্ধ তার বৃদ্ধা স্ত্রীকে খুব ভালোবাসতেন, যদিও সারাজীবন তার সাথে অন্যায় করে গেছেন। ইদানিং যখন তখন ঘর থেকে কাউকে কিছু না বলে বের হয়ে যান, আবার কয়েক ঘন্টা রাস্তায় হাঁটাহাঁটি করে নিজেই ফিরে আসেন। কখনো কখনো সেলফোন কানে দিয়ে মৃত স্ত্রীর সাথে কাল্পনিক কথাবার্তা, মান-অভিমান চালিয়ে যান।

আরও দেখুন:  এক টুকরো সুখের খোঁজে-০৩

কালামের মনে আজ বড় আনন্দ। ছয় মাস আগে এই ফাস্টফুডের দোকানে কাজ নিয়েছিল। বেতন ঠিকমতই দেয়, তবে মালিকের ব্যাবহার খুব খারাপ। আজ তুচ্ছ একটা কারণে পেছনের কিচেনে সহকর্মীদের সামনে ঠাস করে একটা চড় বসিয়ে দিল। তখনই মনে মনে ঠিক করে রেখেছে কালাম, আজকেই কাজ ছেড়ে চলে যাবে সে। এবং বের হওয়ার আগে একটা প্রতিশোধ নিয়ে যাবে। ব্যাটা একটা প্লেইট ভাঙ্গার জন্য এত অপমান করলি, এখন ঠ্যালা সামলা!

৩।
দশ মিনিট বারান্দায় দাঁড়িয়ে থেকে পেছন ফিরল দিয়া। ঘরে ঢুকে হাতের কাপড়গুলো ভাঁজ না করেই স্তুপ করে ফেলে রাখলো এক কোণে। চারপাশের সবাই কত সুন্দর জীবন কাটাচ্ছে, যত সমস্যা শুধু আমার জীবনেই। অস্থির মনটা আরো অস্থির হয়ে গেল তার।
.
.
-রৌদ্রময়ী এডমিন

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

মন্তব্য করুন

Back to top button