সহজ

সালিম প্রামাণিককে অফিসে আজ বেশীই ব্যস্ত মনে হচ্ছে। একের পর এক ফোন আসছে।
‘আচ্ছা, আচ্ছা… খালডাঙা বাজারে নেমেই রিকশাওয়ালাকে বলবেন হাতের ডানে যে রাস্তাটা। আমার নাম বললেই নিয়ে আসবে। দশ মিনিটের মতো লাগবে ইনশাআল্লাহ। নইলে বাজারে নেমেই আমায় একটা ফোন দেবেন, কেমন?’ সালিম ফোনে বলে যাচ্ছিলেন। সালিমের বন্ধু ও সহকর্মী মুত্তাকিন ব্যাপারটা ডেস্কের ওপার থেকে লক্ষ করছিলেন। বার বার বলা কথাগুলো চা খেতে খেতে মনযোগ দিয়ে শুনছিলেন তিনি। চায়ে চুমুকের বদৌলতে দুয়েকটা কথা হয়ত ভুল শুনেছেন। দু’জনই খালডাঙ্গা সরকারী কলেজের সমাজবিজ্ঞানের সহকারী অধ্যাপক।
‘কী, রূপাকে কি কেউ দেখতে আসবে নাকি?’ মুত্তাকিন আঁচ করতে পেরে প্রশ্ন করলেন, ‘তা আমাকে জানালে না যে!’ ‘হ্যা, দেখতে আসবে বিকেলে। আসলে তোমাকে জানাতাম। কিন্তু ঘরোয়াভাবে ব্যাপারটা দেখছিলাম আর কী প্রাথমিকভাবে।’ সালিম উত্তরে বললেন।
– কিন্তু… পাত্র কোন জায়গার? কী করে?’
– কুমারখালির রমিজ মাস্টারের ছেলে। নলছিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে সিএসইতে পড়ছে।
– পড়ছে মানে?
– পড়ছে মানে পড়ছে! ভালো ছেলে। ফ্যামিলিগতভাবেই আমার জানাশোনা বহু দিনের। আমি যখন কুমারখালিতে ছিলাম তখন থেকেই তার বাবার সাথে পরিচয়। নিপাট ভদ্রলোক। আর ছেলেগুলোও সোনার টুকরা হয়েছে একেকটা। আচার ব্যবহার, নামাজ কালাম সব ঠিকঠাক। দাড়িও রেখে দিয়েছে সময়মত।
– দেইখো আবার। বেশি ভালো তো অনেককেই দেখা যায়। আজকাল মানুষ চেনা বড়ই টাফ।
– তা ঠিক। কিন্তু আশা করা যায় এখানে আত্মীয় হলে আমরা ঠকবো না।
.
পাত্রের নাম রাহিন। সালিম প্রামাণিক মেয়ের বাবা হয়েও নিজেই রাহিনকে প্রস্তাব দিয়েছেন। রাহিনের এলাকায় তিনি খোঁজ নিয়েছেন। যদিও সে এখনো ছাত্র, আর বলতে গেলে বেকার, তা সালিম সাহেব কিছুই মনে করেননি। তিনি যে নিতান্তই বোকামি করছেন মুত্তাকিন তা ইতোমধ্যে বুঝে গেছেন । নিজের একটামাত্র মেয়েকে চালচুলোহীন কারো কাছে বিয়ে দেয় এমন বাবাও দেখতে হচ্ছে। আর রূপাও ছাত্রী হিসেবে প্রথম সারির। মেয়েও লাখে একটা। বন্ধুর মেয়ে হওয়ায় এগুলো মুত্তাকিন জানেন। তাই তার কাছে ব্যাপারটা ভালো ঠেকছে না। আর রূপার কি বিয়ের বয়স হয়েছে নাকি? সবে তো মাত্র এইচএসসি দিয়েছে। ভালো কোথাও ভর্তি হলে কিছুদিন গেলেই কত ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার -বিসিএস ক্যাডার পেছনে পেছনে ঘুরবে!
.
মুত্তাকিন জানেন সালিমকে বোঝানো যাবে না। তবুও আগ্রহবশত জানতে চাইলেন, ‘মেয়েটাকে কি এখনই বিয়ে দিতে হবে? তার কি তেমন বয়স হয়েছে? আগে ভার্সিটি শেষ করুক। এরপর কত হাই প্রোফাইল ছেলে আসতে থাকবে তা কি ভেবেছো?’
‘তা হয়ত আসবে, কিন্তু আমার মেয়ের বয়স তো আঠারো। তার বিয়ের বয়স এখনো না হলে আর কবে হবে বলতো?’ সালিম ভ্রু কপালে তুলে বললেন। মুত্তাকিন কী বলবেন চিন্তা করছেন।
দু’জনই কিছুক্ষণ নীরব রইলেন।
সালিম জানালার ফাঁক দিয়ে বাইরে তাকালেন। শরতের পরিষ্কার আকাশ। সাদা মেঘগুলো এখনো শেষ হয়ে যায়নি। সূর্যের কিরণ লেগে সোনালি আভা ধারণ করেছে তা। সেদিকে তাকিয়ে সালিম বলতে লাগলেন,
‘জানো তো! আমি খুব দেরিতে বিয়ে করেছি। জানি, দেরিতে বিয়ে করা অনেক পাপের পথ খুলে দেয়। তাই আগে থেকেই আমার প্ল্যান ছেলেমেয়েদের সময়মত বিয়ে দেবো। পড়াশোনা করতে হলে করবে। কিন্তু পড়াশোনাকে বিয়ের পথে বাঁধা বানাবো না।’
– কিন্তু তাই বলে পাত্রের জব সিকিউরিটি দেখবা না? একটামাত্র মেয়ে তোমার।
– আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহিস সালাম বলেছেন, যদি কারো সততা ও চরিত্রে আমরা সন্তুষ্ট থাকি, তার কাছে যেন মেয়ে বিয়ে দিই। নইলে যমিনে ফিতনা বাড়বে। আর তুমি তো তাই দেখছো। এই যে ছেলেগুলো সময়মত বিয়ে করতে পারছে না। কারণ মেয়েদের অভিভাবকরা চায় তাদের মেয়ের খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা ও চিত্তবিনোদনের সিকিউরিটি। কিন্তু এতোই সিকিউরড কি মু’মিনের জীবন? না।
.
মুত্তাকিন ততক্ষণে চায়ে আরেকটি চুমুক দিয়ে নিলেন। সালিম বলেই যাচ্ছেন,
‘আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে বালা-মুসিবাতের জন্য। তা আসতেই পারে। দেখো, অর্থ সম্পদ, স্ট্যাটাস এগুলো কোনই কাজে আসবে না যদি আল্লাহ তা ছিনিয়ে নেন। রিযিক তো আল্লাহ দেন। আর সততা, পরিশ্রমী মন, চরিত্র তথা দ্বীনদারিতাই সবচেয়ে বড় সম্পদ। এর বিকল্প টাকা হতে পারে না। ছেলে যদি সৎ হয়, পরিশ্রমী হয় আল্লাহই ব্যবস্থা করে দিবেন।’
– তা অবশ্য অস্বীকার করার কিছু নেই। কিন্তু তারপরও বুঝে শুনে নিও। অনেকেই দ্বীন পালন করে লেবাসস্বর্বস্বভাবে।
– জানা আছে। এবং আমি সচেতন আছি। তবুও আমি বিয়েকে সহজ করার পক্ষপাতী, বুঝলা?
.
সালিম ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলেন চারটা বাজে। ফোনটাও বেজে উঠলো। রমিজ মাস্টারের নাম্বার থেকে ফোন এসেছে। তারা বোধহয় বাজারে এসে পৌঁছে গেছে।
–
“সহজ”
– আবু যুওয়াইনাহ
#ঘুড়ি_Ghuri
Discover more from ইসলামিক অনলাইন মিডিয়া
Subscribe to get the latest posts sent to your email.






