ছোটগল্প/উপন্যাস

এক টুকরো সুখের খোঁজে-০৪

মালিহার খুব মন খারাপ আজ। এলোমেলো ভাবনা গুলো মন টা আরও বিষন্ন করে দিচ্ছে।
দ্বীনদার ছেলে ছাড়া মালিহা বিয়ে করবেনা পরিবারে জানিয়ে দিলেও তারা কিসব প্রপোজ এনে হাজির করছে মালিহার সামনে। মসৃন অবয়বের এই মানুষ গুলো কে কোন মতেই পুরুষ পুরুষ লাগেনা মালিহার। কেমন যেন মেয়েলী ভাব। মেয়েলী চেহারার কাউকে বিয়ের কল্পনাও করতে পারেনা মালিহা।
এরা নাকি খুব ভাল ছেলে!
ভাল এডুকেশনাল ব্যাকগ্রাউন্ড, ভাল জব, ভাল বেতন, ভাল বাসস্থানের মালিক এরা।
ভাল ছেলের ডেফিনেশন সবার কাছে এমন হলেও, ভাল ছেলে বলতে মালিহা বুঝে, যে ছেলে দ্বীন বুঝে এবং শারিয়্যাহ সম্মত জীবন যাপন করতে চায়।
:
দ্বীনের পথে আসছে পর থেকে মালিহা খুব নিঃসঙ্গ,কেমন যেন আর যায়না কারো সাথে!
খুব অবাক হয়ে মালিহা ভাবে মানুষের কত রকম মানসিকতা!
পুরনো ফ্রেন্ডদের ইচ্ছাকৃত এড়িয়ে যায় মালিহা! কেমন যেন আর মিলে না ওদের সাথে। দুনিয়াদারি নিয়ে ব্যস্ত ওরা। একটু বেশী মাত্রায় আধুনিক। কিন্তু দুনিয়ার মায়া ততদিনে কমে গেছে মালিহার।
সময় কাটানোর জন্য একটু ফেসবুকে আসবে তারও উপায় নেই। ফেসবুকে ঢুকলেই বেপর্দা ছবির ছড়াছড়ি। এসব আর ভাল লাগেনা মালিহার। ফেসবুকেও ইদানিং অসহ্য সময় কাটে!
একদিন হঠাৎ ই খেয়াল হল ফেসবুকের এই সার্কেলটাও মালিহার জন্য ক্ষতিকর।
সব গায়রে মাহরাম আর নোংরা,বেপর্দা ছবি আপলোডকারী ফ্রেন্ডদের আনফ্রেন্ড করে দিল মালিহা।
একটা দ্বীনি সার্কেলও হয়ে গেল তার!
কিন্তু কিসের যেন একটা শূন্যতা মালিহাকে নিঃশেষ করে দিচ্ছিল।
নিঃসঙ্গ মালিহা তার পরিবারের কারো সাথেও মন খুলে দুটা কথা বলতে পারেনা। তার দাওয়াহ কে পরিবারের সবাই ভাবে বড়দের উপদেশ দিতে আসছে। বুঝাতে পারেনা কাউকেই। হয়ত মালিহা ছোট বলেই তার কথা গ্রহন করাকে লজ্জাজনক মনে করে বড়রা। কিন্তু নিজের ভাল টা তো অন্তত বুঝা উচিৎ।
:
মালিহা স্বপ্ন দেখে কেমন হবে তার নিজের সংসার, স্বপ্ন দেখে কেমন হবে তার জীবনসঙ্গী।
একজন প্রকৃত দ্বীনদার মানুষকে সে তার সঙ্গী হিসেবে চায় যার দিকে তাকালে মুহূর্তের মিটে যাবে সব পাওয়া না-পাওয়ার হিসাব,
যার উপস্থিতি অফুরন্ত ভাল লাগার আবেশে হৃদয় কে পরিপূর্ণ করে তুলবে, যাকে ভাবলে মুহূর্তেই পাল উড়াবে সুখের কল্পতরী,
যে মানুষ টা ভালবাসবে শর্তহীনভাবে, সুখের মুহূর্ত গুলোতে সাথে হাসবে, কষ্টের দিনে ঝাপটে ধরে রাখবে দুবাহুর নিরাপদ আশ্রয়ে,
যার দিকে তাকালে কোন কারন ছাড়াই হাসি ফুটবে মুখে।
মালিহা এমন একজনকেই চায়। এমন একজন যে ভালবাসায় যতটা কোমল হবে দ্বীনের হুকুম-আহকামের ব্যাপারে তারচেয়েও কঠোর হবে। যে পূর্ণ পর্দায় রাখবে মালিহা কে, নিজেও কোন গায়রে মাহরামের দিকে ফিরে তাকাবেনা, আল্লাহর রাসূল (সঃ) হবে যার সততা,দানশীলতা,উদারতা,কঠোরতা ও লিবাসের আদর্শ।
কেবল তারই অপেক্ষাতে মালিহা নিজেকে পবিত্র রেখেছে, তার কারনেই এই একা থাকা…
মালিহা জানে একটু দেরিতে হলেও সঠিক সময়ে সঠিক মানুষটি এসে ঠিকইই নিয়ে যাবে তাকে। সে মানুষ টি দুনিয়াতেই তাকে দিবে জান্নাতের ছিটেফোটা ফ্লেভার।
:
কিন্তু মালিহার পরিবার মালিহার এমন সব চাহিদার কথা শুনে হাসাহাসি করে। বলে এমন পাত্র নাকি অর্ডার করে বানিয়ে নিতে হবে, রেডিমেইড পাবেনা।
মালিহা জানে কোথায় চাইলে সে তার মনের মত মানুষটিকেই পাবে।
আল্লাহর কাছে চাওয়ার বিকল্প কিছু নেই মালিহা জানে,
শুরু হল তার রবের দরবারে বিয়ে এবং উত্তম দ্বীনদার একজন সঙ্গীর জন্য ফরিয়াদ।
মালিহা কত কান্না করেছে, কত কাকুতি-মিনতি করেছে শুধু রব জানেন।
আবছা আলো-আঁধার ঘরে মাঝ রাতে জায়নামাজে সিজদায় গেলেই কান্না চলে আসত মালিহার।
কেমন যেন ইমোশনাল এক পরিবেশ!
রব ছাড়া কেউ তাকে দেখছেনা!
মালিহার চোখের পানিতে জায়নামায ভিজে যাচ্ছে কিন্তু দুনিয়ার কেউ তা দেখছেনা। বাসার সবাই ঘুমে বিভোর।
নিজেকে খুব একা মনে হত মালিহার।
একজন নেককার,দ্বীনদার,হৃদয়বান মানুষ কে তার করে দিতে রবের কাছে তার এই প্রার্থনা.. হৃদয়ের হাহাকার রব ছাড়া দেখার কে-ই-বা আছে!
রব ছাড়া কে আছে অন্তরের পবিত্রতা রক্ষা করার!!
:
বাসা থেকে মালিহার জন্য ছেলে দেখা হচ্ছে। মালিহা কে এমন সব প্রপোজে রাজি হতে বলে, যারা ৫ ওয়াক্ত নামায ও হয়ত ঠিকমত পড়েনা। পরিবারের সবাই এখন মালিহার উপর বিরক্ত। বলেও দিল যেমন ছেলে চায় তেমন নাকি খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়, মালিহা নিজেই যেন খুঁজে আনে অন্যথায় পরিবারের সিদ্ধান্তে মালিহা কে রাজি হতে হবে।
মালিহা হতাশ হল না। সে জানে তার প্রার্থনা বিফলে যাবেনা। আল্লাহ তার জন্য ঠিকই কোন উত্তম ফায়সালা করবেন, আর আল্লাহর সাহায্য ও খুব নিকটে।
:
দুদিন পর হঠাৎ সায়মা নামের পরিচিত এক দ্বীনি বোন ফোন দিল মালিহা কে। কথায় কথায় জিজ্ঞেস করল বিয়ে করবে কবে। পাত্র খোঁজা হচ্ছে শুনে সায়মা জানতে চাইল কেমন ছেলে চায় মালিহা। মালিহা নিজের পছন্দের কথা জানাতেই বলল আমার চেনা এমন একজন আছে, খোঁজ নিয়ে দেখতে পারি তোমার জন্য।
একদিন পরেই একটা বায়োডাটা নিয়ে হাজির হল সায়মা।
বায়োডাটা পড়ে মালিহার পছন্দ হল। কেমন দ্বীনদার মেয়ে চায় তারও একটা শর্ট লিস্ট ছিল বায়োডাটা তে। দ্বীনের প্রতি লোকটার কঠোরতা মালিহা কে মুগ্ধ করল ভীষন।
এবার ইস্তিখারা করে সিদ্ধান্ত নেয়ার পালা। কয়েকবার ইস্তিখারা করে মালিহার মন লোকটার দিকেই ঝুকলো। এবার সে সিদ্ধান্ত নিল একেই বিয়ে করবে। কিন্তু বিপত্তি ঘটল যখন মালিহার পরিবার জানল ছেলে কেবল পড়াশোনা শেষ করেছে, এখনো চাকুরী/ব্যবসা কিছুই করেনা।
যে মালিহা তার পরিবারে নামায,পর্দার গুরুত্ব ই বুঝাতে ব্যর্থ হয়েছে তার পক্ষে রিযিক, তাকদীর এসব বুঝানো খুব কঠিন ব্যাপার হয়ে দাঁড়াল। কিন্তু মালিহার মনের শক্তি ছিল ইস্তিখারার ফলাফল। আল্লাহর সাথে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নিয়েছে সে, এ থেকে পিছু হটবে না।
অনেক না এর পরও মালিহার জেদের কাছে পরাজিত হল সবাই। বিমর্ষ মনে রাজি হল বেকার ছেলের কাছে মেয়ে কে বিয়ে দিতে।
:
বিয়ের মাস খানেক পর ছোট্ট একটা বাসা নিল সাদ আর মালিহা। সাদের আয়-রোজগার তেমন নেই, সামর্থ্যের মধ্যে এক রুমের ছোট্ট একটা বাসায় সংসার শুরু করল দুজন। ফ্লোরে বিছানা পেতে ঘুমাতে হত, খুবই সাধারন খাবার-দাবার, দামী আসবাবহীন ঘর, বিলাসিতার ছিটেফোটাও নেই তবু মনে হত জগতের সবচেয়ে সুখি দম্পতি ওরা। কারন দুজনই আল্লাহর রাসূল কে নিজেদের আদর্শ হিসেবে গ্রহন করেছে। ফ্লোরে শুতে গিয়ে ওরা মনে করে আল্লাহর রাসূল (স) এর গায়ে তো চাটাইয়ের দাগ হয়ে গিয়েছিল, সে তুলনায় আমরা কত ভাল আছি, সামান্য খাবার সামনে নিয়েও ওরা রবের শোকরিয়া আদায় করে বলে, মাসের পর মাস তো আমাদের রাসূল (স) এর ঘরের চুলায় আগুন জ্বলত না!
:
নিজেকে জগতের সবচেয়ে সুখি স্ত্রী মনে করে মালিহা। এতটা বছর আল্লাহর কাছে সে যেমন সঙ্গীর প্রার্থনা করেছিল, আল্লাহ তাকে তারচাইতেও উত্তম সঙ্গী দান করেছেন।
সাদ অসম্ভব ভালবাসে ওকে। সব কিছুতেই খেয়াল রাখে। মালিহার পর্দার ব্যাপারে মালিহার চেয়ে সাদ ই বেশী সচেতন। সাদ ঘরের কাজেও সাহায্য করে। মালিহা জোর করে তাড়িয়ে দিতে চায় সাদ কে রান্নাঘর থেকে, কিন্তু সাদ রাসূল (স) এর উদাহরন টেনে আনে।
খেতে বসে প্রথম খাবার টা মালিহার মুখে তুলে দেয় সাদ। কখনো ঘরে ফেরার সময় মালিহার পছন্দের ফুল নিয়ে আসে সাদ, নাটকীয় ভঙ্গীতে চোখ বন্ধ করায় মালিহার, ফুল গুলো সামনে ধরে চোখ খুলতে বলে। পছন্দের ফুল পেয়ে মালিহা খুশিতে আত্মহারা! ভালবাসার মানুষটার এমন হাসিমুখ দেখে প্রশান্তিতে চোখ বুজে আসে সাদের।
কখনো কোন কাজের মাঝে মালিহা হুট করলেই বলে বসে, এই.. আমায় ভালবাসো?
সাদ স্মিত হেসে মালিহা কে জড়িয়ে ধরে বলে, অনেক ভালবাসি বাবু টাকে।
এমন একজন মানুষই তো চেয়েছিল মালিহা। যে মালিহা কে খুশি রাখতে চাইবে, যে মালিহার খুশিতে হাসবে, কষ্টে কাঁদবে। যে কারনে-অকারনে কানের কাছে ফিসফিস করে বলবে, শুনছো.. ভালবাসি অনেক।
সাদ কে দেখলেই প্রশান্তি ভরে উঠে মালিহার মন। এই মানুষটা এত কেন ভালবাসে ওকে!
মালিহা ভালবাসাময় একটা সংসারের স্বপ্ন দেখে এসেছে এতকাল, সাদ সেই স্বপ্ন কে পূর্ণতা দিল।
আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতায় সিজদায় পড়ে গেল মালিহা। আল্লাহ তার দোয়া কবুল করেছেন, উত্তমের চাইতেও উত্তম মানুষ টাকে দিয়েছেন।
আবারও বুঝল মালিহা, দোয়া কখনো বিফলে যায়না।
:
এক টুকরো সুখের জন্য মানুষ দ্বীন থেকে সরে গিয়ে কত কিছু করে!
কত বেপর্দায় ফ্যাশন-প্রদর্শন, কত হারাম কাজ, কত অবৈধ সম্পর্ক, কত বাড়ি-গাড়ি, ব্যাংক-ব্যালেন্স, কত অসৎ উপার্জন, কত অন্যায় অত্যাচার, জুলুম, চুরি!
তবু ওরা সুখি হতে পারেনা।
আর দ্বীনের ছায়াতলে একজন বেকার যুবকের স্ত্রী হয়েও, যাবতীয়,সমস্যার সম্মোখীন হয়েও মালিহা রা কত সুখি! সুবহানআল্লাহ!

লিখেছেন→ (MarJaana IsRaa)

আরও দেখুন:  ‘মুসলিম, তোমরা যারা হোলি খেলো’

এক টুকরো সুখের খোঁজে-০৩

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

১টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

Back to top button