আদব ও আমলইমান/আখলাক

কাফফারা

EWA A103 Bluetooth Speaker

‘কাফফারা’ আরবী শব্দ। মাদ্দাহ এর আভিধানিক অর্থ হ’ল ঢেকে দেওয়া, আড়াল করা ইত্যাদি। যেমন বলা হয়, ‘আমি বস্ত্তটি ঢেকে দিয়েছি’। সেকারণ অন্ধকার রাতকে ‘কাফির’ বলা হয়। কেননা তা দিনের আলোকে ঢেকে দেয়। শারঈ পরিভাষায় নেক আমল ও কৃত অপরাধের বদলা দ্বারা পাপ ঢেকে দেওয়াকে কাফ্ফারা বলে।

কাফ্ফারা দু’ধরনের। এক ধরনের কাফ্ফারা হ’ল ঐ সকল সৎকর্ম, যা সম্পাদনের ফলে পাপসমূহ মোচন হয়ে যায়। যেমন- ছালাত, ছিয়াম, হজ্জ, যাকাত ইত্যাদি। ছালাত সম্পর্কে রাসূল (ছাঃ) বলেন, তোমাদের কারম্ন ঘরের সম্মুখ দিয়ে প্রবাহিত নদীতে দৈনিক পাঁচবার গোসল করলে তোমাদের দেহে কোন ময়লা বাকী থাকে কি? ছাহাবীগণ বললেন, না। রাসূল (ছাঃ) বললেন, পাঁচ ওয়াক্ত ছালাতের তুলনা ঠিক অনুরূপ। আল্লাহ এর দ্বারা গোনাহ সমূহ বিদূরিত করে দেন’।[1] অনুরূপভাবে ছিয়াম প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে ও ছওয়াবের আশায় রামাযান মাসের ছিয়াম পালন করে, তার বিগত জীবনের গোনাহ সমূহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়’।[2] এভাবে বিভিন্ন ইবাদতের ক্ষেত্রে বর্ণিত হয়েছে। সুতরাং এ জাতীয় নেক আমলগুলোর মাধ্যমে গোনাহ মাফ হওয়ায় ঐ আমলগুলো গোনাহের কাফ্ফারা হয়ে যায়।

দ্বিতীয় প্রকার কাফ্ফারা হ’ল কৃত অপরাধে দ-। অর্থাৎ নির্দিষ্ট কতিপয় ফরয বা ওয়াজিবের ক্ষেত্রে সীমালংঘন করলে তার বিনিময়ে বদলা দেওয়া এবং এর মাধ্যমে ঐ অপরাধের শাসিত্ম থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া। যেমন : যিহার, ছিয়াম অবস্থায় স্ত্রী মিলন, কসম ভঙ্গ করা, মানত পূরণ না করা ইত্যাদি। এ জাতীয় অপরাধের ক্ষেত্রে শরী‘আত কাফফারা নির্ধারণ করে দিয়েছে। যা অনাদায়ে উক্ত ব্যক্তি গোনাহগার হবে। কেননা কাফ্ফারাই তার পাপ মোচনের মাধ্যম। সেকারণ প্রত্যেক মুসলিমের কাফ্ফারাযোগ্য অপরাধ ও তার কাফ্ফারার বিধান জানা প্রয়োজন। কেননা এতে ঐ ব্যক্তি এ জাতীয় জঘন্য সীমালংঘন থেকে নিজেকে পরহেয করতে সচেষ্ট হবে। আলোচ্য নিবন্ধে কাফ্ফারার দ্বিতীয় প্রকার তথা কৃত অপরাধের কাফ্ফারা বা বদলা সম্পর্কে নাতিদীর্ঘ আলোচনা পেশ করা হ’ল।-

. ছালাতের কাফফারা :

ছালাতের ক্ষেত্রে সমাজে অনেক কুসংস্কার প্রচলিত আছে। ছালাতের কাফফারা হিসাবে ছুটে যাওয়া ছালাতের জন্য নির্ধারিত হারে টাকা আদায় করা, কুরআন মাজীদ হাদিয়া দেওয়া, চাউল ছাদাক্বা করা ইত্যাদি আমাদের সমাজে নতুন কিছু নয়। একশ্রেণীর ইমাম এভাবে মৃতব্যক্তির পক্ষ থেকে কাফ্ফারা আদায় করে থাকেন। আর এর দ্বারা তার ওয়ারিছদের বুঝাতে চেষ্টা করেন যে, তার পিতা বা মাতা উক্ত কাফ্ফারার মাধ্যমে ছালাত আদায় না করার অপরাধ থেকে ক্ষমা পেয়ে গেলেন। যেমন- জনৈক ব্যক্তি মাঝে মধ্যে ছালাত আদায় করত। কিন্তু তিন মাস যাবৎ অসুস্থ থাকার কারণে সে ছালাত আদায় করতে পারেনি। ঐ ব্যক্তি মারা গেলে স্থানীয় ইমাম ছাহেব মৃত ব্যক্তির ওয়ারিছের কাছ থেকে উক্ত তিন মাস সময়ের ছালাত আদায় না করা বাবদ কাফ্ফারা স্বরূপ ৩০০০/= টাকা ও তিনটি কুরআন মাজীদ আদায় করেন। অতঃপর জানাযা পড়ে দাফন করেন (আত-তাহরীক)। এ জাতীয় অসংখ্য ঘটনা আমাদের সমাজে প্রতিনিয়ত ঘটছে। অথচ শরী‘আতে এর কোনই ভিত্তি নেই।

মূলত ছালাতের কোন কাফফারা নেই এবং ‘উমরী ক্বাযা’ বলেও কিছু নেই। এক্ষেত্রে করণীয় হচ্ছে তওবা করে ছালাত আদায় শুরম্ন করা। এটাই হ’ল ছালাতের প্রকৃত কাফ্ফারা। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তাদের পরে এলো তাদের অপদার্থ উত্তরসুরীরা। তারা ছালাত বিনষ্ট করল ও প্রবৃত্তির অনুসরণ করল। ফলে তারা অচিরেই জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে। কিন্তু তারা ব্যতীত যারা তওবা করেছে এবং ঈমান এনেছে ও সৎকর্ম করেছে, তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং তাদের প্রতি কোনরূপ যুলূম করা হবে না’ (মারিয়াম ৫৯-৬০)। রাসূল (ছাঃ) ছালাত ভুলে যাওয়া ব্যক্তির জন্য স্মরণ হওয়া মাত্র ছালাত আদায়কেই ভুলে যাওয়ার কাফ্ফারা বলেছেন।

আনাস বিন মালেক (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেন, ‘কেউ যদি ছালাত আদায় করতে ভুলে যায় অথবা ছালাত আদায় না করে ঘুমিয়ে পড়ে, তার কাফ্ফার হচ্ছে যখনই স্মরণ হবে তখনই তা আদায় করে নিবে’।[3] অন্য বর্ণনায় আছে, ‘এটা (ছালাত আদায়) ব্যতীত এর কোন কাফ্ফারা বা প্রতিকার নেই’।[4]

. ছিয়াম ভঙ্গের কাফ্ফারা :

ছিয়ামের বিধান তিন ধরনের। যেমন-

(ক) ভুল করে কিছু খেয়ে ফেললে : ভুলবশতঃ কিছু খেয়ে ফেললে বা পান করলে তার কাযা ও কাফ্ফারা কিছুই লাগবে না। ঐ ছিয়ামটি সে পূর্ণ করবে। অর্থাৎ ভুলক্রমে খাওয়ার পরও বাকী দিন ছিয়াম রাখবে।

আবু হুরায়রা (রাঃ) নবী করীম (ছাঃ) হ’তে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, ‘যে ব্যক্তি রামাযান মাসে (ছিয়াম অবস্থায়) ভুলক্রমে কিছু খেয়ে ফেলে, তার কোন কাযা বা কাফ্ফারা নেই’।[5]

(খ) ইচ্ছাকৃতভাবে বমি করলে : ছিয়াম অবস্থায় ইচ্ছাকৃতভাবে বমি করলে শুধু  কাযা প্রযোজ্য হবে। এক্ষেত্রে কাফ্ফারা লাগবে না। আবু হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত. রাসূল (ছাঃ) বলেন, ‘যে ব্যক্তি মুখ ভরে (অনিচ্ছাকৃতভাবে) বমি করে তার কোন কাযা করতে হবে না। আর যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে বমি করে তার কাযা আদায় করতে হবে’।[6]

(গ) ছিয়াম অবস্থায় স্ত্রী সহবাস করলে : ছিয়াম অবস্থায় স্ত্রীসহবাস করলে কাফ্ফারা প্রযোজ্য হবে। এমতাবস্থায় কাফ্ফারা হচ্ছে- ধারাবাহিকভাবে দু’মাস ছিয়াম পালন করা বা ৬০ জন মিসকীনকে খাওয়ানো অথবা একজন গোলাম আযাদ করা।[7] এ প্রসঙ্গে ছহীহ মুসলিমে আবু হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত আছে তিনি বলেন, একদিন আমরা রাসূল (ছাঃ)-এর নিকট উপবিষ্ট ছিলাম। এমন সময় এক ব্যক্তি  এসে বলল, হে আলস্নাহ্র রাসূল! আমি ধ্বংস হয়ে গেছি। রাসূল (ছাঃ) বললেন, কি বিষয় তোমাকে ধ্বংস করেছে? সে বলল, আমি ছিয়াম অবস্থায় আমার স্ত্রীর সাথে মিলিত হয়েছি। রাসূল (ছাঃ) বললেন, আযাদ করার মত কোন ক্রীতদাস পাবে কি? সে বলল, না। তিনি বললেন, তুমি কি একাধারে দু’মাস ছিয়াম পালন করতে পারবে? সে বলল, না। এরপর তিনি বললেন, ষাটজন মিসকীনকে খাওয়াতে পারবে কি? সে বলল, না। তারপর সে বসে থাকল। এমন সময় রাসূল (ছাঃ)-এর নিকটে এক ঝুড়ি খেজুর পেশ করা হ’ল। রাসূল (ছাঃ) বললেন, এগুলো নিয়ে ছাদাক্বাহ করে দাও। তখন লোকটি বলল, হে আলস্নাহ্র রাসূল! আমার চাইতেও বেশী অভাবগ্রসত্মকে ছাদাক্বাহ করব? আলস্নাহ্র শপথ, মদীনার উভয় প্রামেত্মর মধ্যে আমার পরিবারের চেয়ে অভাবগ্রসত্ম কেউ নেই। আলস্নাহ্র রাসূল (ছাঃ) তখন হাসলেন, এমনকি তাঁর দাঁত দেখা গেল। অতঃপর তিনি বললেন, এগুলো তোমার পরিবারকে খাওয়াও’।[8]

. হজ্জের ত্রম্নটিবিচ্যুতির জন্য কাফ্ফারা :

হজ্জের ওয়াজিব তরক করলে বা ইহরামের পর নিষিদ্ধ কোন কাজে লিপ্ত হ’লে কাফফারা দিতে হয়। হজ্জের ওয়াজিব সমূহ হচ্ছে : মীকাত হ’তে ইহরাম বাঁধা, ‘আরাফা ময়দানে সূর্যাসত্ম পর্যমত্ম অবস্থান করা, মুযদালিফায় রাত্রি যাপন করা,  আইয়ামে তাশরীক্বের রাত্রিগুলো মিনায় অতিবাহিত করা, ১০ তারিখে জামরাতুল আক্বাবায় ও ১১, ১২ ও ১৩ তারিখে তিন জামরায় কংকর নিক্ষেপ করা, মাথা মু-ন করা অথবা সমসত্ম মাথার চুল ছোট করা ও বিদায়ী তাওয়াফ করা।

ইহরামের পর নিষিদ্ধ কাজগুলো হচ্ছে : সুগন্ধি ব্যবহার করা, মাথার চুল বা শরীরের যেকোন স্থানের পশম উঠানো, নখ কাটা, প্রাণী শিকার করা, যৌনাচার, বিবাহের প্রসত্মাব, বিবাহের আক্বদ বা যৌন আলোচনা করা, পুরম্নষের জন্য পাগড়ী-টুপী ও রম্নমাল ব্যবহার করা, সেলাই করা কাপড় পরিধান করা, মহিলাদের জন্য মুখাচ্ছাদন ও হাত মোযা ব্যবহার করা ইত্যাদি।

উপরিউক্ত কারণে কাফ্ফারা হ’ল ১টি বকরী কুরবানী করা অথবা ৬ জন মিসকীনকে খাওয়ানো অথবা তিনটি ছিয়াম পালন করা।[9] উলেস্নখ্য যে, কুরবানী মিনায় দিতে হবে। আর কাফ্ফারা মিনায়ও দেওয়া যায়, মক্কাতেও দেওয়া যায়। তাতে কোন শারঈ বাধা নেই।

. শপথ ভঙ্গের কাফ্ফারা :

শপথ বা অঙ্গীকার পূরণের নির্দেশ দিয়ে মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর তোমরা আলস্নাহ্র নামে অঙ্গীকারের পর তা পূর্ণ কর এবং শপথ পাকাপাকি করার পর তা ভঙ্গ করো না। অথচ তোমরা তোমাদের শপথে আল্লাহকে যামিন করেছ। নিশ্চয় তোমরা যা কর আল্লাহ তা জানেন’ (নাহল ১৬/৯১)।

কসম বা শপথ দুই ধরনের হয়ে থাকে। এক ধরনের কসম মানুষ খামখেয়ালী বশতঃ মিথ্যাভাবে অহরহ করে থাকে। যেমন- আলস্নাহ্র নামে কসম করে বলা, অমুকের সাথে কথা বলব না কিংবা অমুক কাজ করব না। পরে কসমের প্রতি দৃঢ় থাকতে ব্যর্থ হয় এবং তা করে ফেলে। আবার কিছু কসম সত্য ও দৃঢ়তার সাথে করা হয়। প্রথম প্রকারের কসমের কোন কাফ্ফারা নেই। কিন্তু দ্বিতীয় প্রকার কসম ভঙ্গ করলে তার জন্য কাফ্ফারা ওয়াজিব হয়।

আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের অনর্থক শপথের জন্য আল্লাহ তোমাদের পাকড়াও করবেন না। কিন্তু তোমাদের দৃঢ় শপথের জন্য পাকড়াও করবেন’ (মায়েদা ৮৯)।  এ আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার প্রেক্ষাপট সম্পর্কে আয়েশা (রাঃ) বলেন, ‘আয়াতটি অবতীর্ণ হয়েছে মানুষের উদ্দেশ্যবিহীন উক্তি ‘না আলস্নাহ্র শপথ, ‘হ্যাঁ আলস্নাহ্র শপথ ইত্যাদি উপলক্ষে’।[10] অনুরূপভাবে মিথ্যা কসম সম্পর্কে রাসূল (ছাঃ) বলেন, ‘কাবীরা গুনাহসমূহের অন্যতম হচ্ছে আলস্নাহ্র সঙ্গে শরীক করা, পিতামাতার নাফরমানী করা, কাউকে হত্যা করা এবং মিথ্যা কসম করা’।[11]

কসম ভঙ্গের কাফ্ফারা সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘শপথ ভঙ্গের কাফফারা হ’ল, ১০ জন অভাবগ্রসত্মকে মধ্যম মানের খাদ্য প্রদান করা, যা তোমরা সাধারণতঃ খেয়ে থাক, অথবা তাদেরকে অনুরূপ মানের পোষাক প্রদান কর অথবা একটি ক্রীতদাস বা দাসী মুক্ত করে। এগুলোর কোনটা না পারলে একটানা তিনদিন ছিয়াম পালন করবে’ (মায়েদা ৮৯)।

আল্লাহ ব্যতীত অন্য কিছুর নামে কসম করা :

অনেককে কুরআন নিয়ে কসম করতে দেখা যায়। আবার অনেককে দেখা যায় মা-বাবার ও চক্ষুর কসম খেতে। কেউবা চন্দ্র, সূর্য, গ্রহ, নক্ষত্র, মাটি ইত্যাদির নামেও কসম করে থাকে। অথচ আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো নামে কসম করা জায়েয নয়।

আব্দুলস্নাহ ইবনু ওমর (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, ‘আল্লাহ তা‘আলা তোমাদের পিতাদের নামে কসম করতে নিষেধ করেছেন। অতএব যে কসম করতে চায়, সে যেন আলস্নাহ্র নামে কসম করে অথবা চুপ থাকে’।[12]

ইবনে ওমর (রাঃ) নবী করীম (ছাঃ) হ’তে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, ‘সাবধান! যদি তোমাদের কারো কসম করতে হয় তাহ’লে সে যেন আল্লাহ ব্যতীত কারো নামে কসম না করে। কুরায়েশরা তাদের বাপ-দাদার নামে কসম করত। রাসূল (ছাঃ) বলেন, ‘তোমরা বাপ-দাদার নামে কসম কর না’।[13]

অন্য এক বর্ণনায় রয়েছে, রাসূল (ছাঃ) বলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে কসম করল, সে শিরক করল’।[14]

কসমের পর বিপরীতে ভাল প্রকাশ পেলে করণীয় :

কসমের পর এর বিপরীতে ভাল কিছু প্রকাশ পেলে কসমের কাফ্ফারা দিয়ে ভাল কাজটি করতে হবে। আব্দুর রহমান বিন সামুরাহ (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেন, ‘কোন ব্যাপারে যদি শপথ কর আর তা ছাড়া অন্য কিছুর ভিতর কল্যাণ দেখতে পাও, তবে নিজ শপথের কাফ্ফারা আদায় করে তা থেকে উত্তমটি গ্রহণ কর’।[15]

আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূল (ছাঃ) বলেন, ‘যে ব্যক্তি শপথ করল, অতঃপর এর বিপরীতে অন্য বিষয়ে কল্যাণ দেখতে পেল, সে যেন উত্তমটি গ্রহণ করে এবং তার কৃত শপথের কাফ্ফারা আদায় করে’।[16]

. মানত ভঙ্গের কাফ্ফারা :

মানত ভঙ্গের কাফ্ফারা কসম ভঙ্গের কাফ্ফারার ন্যায় ১০ জন মিসকীনকে খাওয়ানো বা একজন গোলাম আযাদ করা অথবা তিনদিন ছিয়াম পালন করা।[17]

নেক কাজের মানত করলে তা পালন করা যরূরী। আয়েশা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, রাসূল (ছাঃ) বলেন, ‘কোন ব্যক্তি যদি আলস্নাহ্র আনুগত্যের মানত করে, তাহ’লে সে যেন তা পূরণ করে। আর কোন ব্যক্তি যদি নাফরমানীর মানত করে, সে যেন তা পূরণ না করে’।[18]

মানতকারীর পক্ষে যদি মানত পূরণ করা সম্ভব না হয় তাহ’লে তাকে কাফ্ফারা আদায় করতে হবে। আর মানতের কাফ্ফারা হচ্ছে শপথের কাফ্ফারা ন্যায়।

উক্ববা বিন ‘আমের হতে বর্ণিত, রাসূল (ছাঃ) বলেন, মানতের কাফ্ফারা শপথের কাফ্ফারার ন্যায়’।[19]

. যিহারের কাফ্ফারা :

‘যিহার’ হ’ল স্ত্রীর কোন অঙ্গকে মায়ের পিঠ বা অন্য কোন অঙ্গের সাথে তুলনা করা।[20] তবে স্ত্রী যদি স্বামীকে বলে যে, আমি তোমার নিকটে তোমার মায়ের ন্যায় তাহ’লে তা যিহার হবে না। কেননা ‘যিহার’ করার অধিকার কেবলমাত্র স্বামীর, স্ত্রী নয়। যেমন পবিত্র কুরআনে বর্ণিত হয়েছে।-

‘তোমাদের মধ্যে যারা তাদের স্ত্রীদেরকে মাতা বলে ফেলে, তাদের স্ত্রীরা তাদের মাতা নয়। তাদের মাতা কেবল তারাই, যারা তাদের জন্মদান করেছে। তারা তো অসমীচীন ও ভিত্তিহীন কথাই বলছে। নিশ্চয় আল্লাহ মার্জনাকারী ও ক্ষমাশীল’ (মুজাদালাহ ৫৮/২)।

অবশ্য যদি কোন স্বামী তার স্ত্রীকে বলে যে, ‘তুমি আমার মা, বোন, খালা বা অনুরূপ কোন মাহরাম মহিলার পিঠের ন্যায়’ তাহ’লে তা ‘যিহার’ হবে। এমতাবস্থায় তার স্ত্রী তার উপরে হারাম থাকবে, যতক্ষণ না স্বামী ‘কাফ্ফারা’ আদায় করবে।

‘যিহার’-এর কাফ্ফারা হচ্ছে- ধারাবাহিকভাবে দু’মাস ছিয়াম পালন করা বা ৬০ জন মিসকীনকে খাওয়ানো অথবা একজন গোলাম আযাদ করা। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন, ‘যারা নিজেদের স্ত্রীদের সাথে যিহার করে, অতঃপর তাদের উক্তি প্রত্যাহার করে, (তাদের কাফ্ফারা হচ্ছে) একে অপরকে স্পর্শ করার পূর্বে একজন দাস মুক্ত করা। এটা তোমাদের জন্য উপদেশ। তোমরা যা কর আল্লাহ খবর রাখেন । কিন্তু যার এ সামর্থ্য নেই, সে স্পর্শ করার পূর্বে পরপর দুই মাস ছিয়াম পালন করবে। এতেও যে অসমর্থ হবে, সে ষাটজন মিসকীনকে আহার করাবে। এটা এ জন্য, যাতে তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর। এগুলো আলস্নাহ্র নির্ধারিত বিধান, আর কাফেরদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাসিত্ম’।[21]

. হত্যার কাফ্ফারা :

কোন মুমিন অপর কোন মুমিনকে হত্যা করতে পারে না। ইচ্ছাকৃভাবে কেউ এই অপরাধে লিপ্ত হ’লে তার পরিণাম জাহান্নাম। আল্লাহ বলেন, ‘যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে কোন মুমিনকে হত্যা করে, তার শাসিত্ম হ’ল জাহান্নাম। সেখানেই সে চিরকাল থাকবে। আল্লাহ তার প্রতি ক্রুদ্ধ হয়েছেন, তাকে অভিসম্পাৎ করেছেন এবং তার জন্য ভীষণ শাসিত্ম প্রস্ত্তত রেখেছেন’ (নিসা ৪/৯৩)। ইচ্ছাকৃত হত্যার জন্য ক্বিছাছ প্রযোজ্য। যা বাসত্মবায়নের দায়িত্ব সরকারের।

অপরদিকে ভুলবশতঃ কেউ কাউকে হত্যা করে ফেললে এর কাফ্ফারা হচ্ছে একজন ক্রীতদাস মুক্ত করা এবং নিহত ব্যক্তির আত্মীয়-স্বজনের নিকট উক্ত হত্যার বিনিময়ে তথা রক্তমূল্য পরিশোধ করা। অথবা দু’মাস ক্রমাগত ছিয়াম পালন করা। আল্লাহ বলেন, ‘যদি কোন মুমিন কোন মুমিনকে ভুলক্রমে হত্যা করে, তবে সে একজন মুমিন ক্রীতদাসকে মুক্ত করবে এবং তার পরিবারকে রক্তমূল্য প্রদান করবে। তবে যদি তারা ক্ষমা করে দেয় সেকথা স্বতন্ত্র। যদি নিহত ব্যক্তি তোমাদের শত্রম্ন দলের অমত্মর্ভুক্ত হয় এবং ঐ ব্যক্তি মুমিন হয়, তাহ’লে একজন মুমিন ক্রীতদাসকে মুক্ত করবে। আর যদি সে তোমাদের সাথে চুক্তিবদ্ধ সম্প্রদায়ের অমত্মর্ভুক্ত হয়, তাহ’লে তার পরিবারকে রক্তমূল্য দিবে এবং একটি মুমিন ক্রীতদাস মুক্ত করবে। কিন্তু যদি সে তা না পায় তাহ’লে আলস্নাহ্র নিকট থেকে ক্ষমা প্রাপ্তির জন্য একটানা দু’মাস ছিয়াম পালন করবে। আল্লাহ মহাবিজ্ঞ ও প্রজ্ঞাময়’ (নিসা ৪/৯২)।

. ঋতু অবস্থায় স্ত্রী সহবাসের কাফ্ফারা :

ঋতু অবস্থায় স্ত্রী সহবাস সম্পূর্ণ হারাম। আল্লাহ বলেন, ‘আর লোকেরা তোমাকে প্রশ্ন করছে মহিলাদের ঋতুস্রাব সম্পর্কে। তুমি বল, ওটা হল কষ্টদায়ক বস্ত্ত। অতএব ঋতুকালে স্ত্রীসঙ্গ হ’তে বিরত থাক। পবিত্র না হওয়া পর্যমত্ম তাদের নিকটবর্তী হয়ো না। অতঃপর যখন তারা ভালভাবে পবিত্র হয়, তখন আলস্নাহ্র নির্দেশ মতে তোমরা তাদের নিকট গমন কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ তওবাকারীদের ভালবাসেন ও পবিত্রতা অর্জনকারীদের ভালবাসেন’ (বাক্বারাহ ২/২২২)। ঋতু অবস্থায় কেউ উক্ত সীমালংঘন করলে তাকে কাফ্ফারা হিসাবে অর্ধ দীনার ছাদাক্বা করতে হবে।

আব্দুলস্নাহ বিন আববাস (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, রাসূল (ছাঃ) বলেন, ‘কোন ব্যক্তি যদি তার স্ত্রীর সাথে হায়েয অবস্থায় মিলিত হয়, সে যেন অর্ধ দীনার ছাদাক্বাহ করে’।[22]

উলেস্নখ্য যে, ১ ভরী সমান ১১.৬৬ গ্রাম। হাদীছে বর্ণিত ১ দীনার সমান ৪.২৫ গ্রাম স্বর্ণ। অতএব হায়েয অবস্থায় স্ত্রী সহবাস করলে ৪.২৫ গ্রাম অথবা এর অর্ধেক স্বর্ণের মূল্য ছাদাক্বা করতে হবে।। এ হিসাবে অর্ধ দীনার ছাদাক্বা করতে চাইলে ১ ভরী স্বর্ণের বর্তমান বাজার মূল্যকে ৫.৫০ দিয়ে ভাগ করে যত টাকা আসবে তা ছাদাক্বা করবে। তবে ইমাম আহমাদ (রহঃ) বলেন, নির্দেশটি ‘মানদূব’ পর্যায়ের। ওয়াজিব পর্যায়ের নয়’।[23] অতএব কঠিনভাবে তওবা করাই কর্তব্য।

উপসংহার :

পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছের আলোকে ইসলামী শরী‘আতের কতিপয় অপরাধ ও এর কাফ্ফারা তথা প্রতিকার সম্পর্কে বিধৃত উপরিউক্ত আলোচনা থেকে সঠিক জ্ঞান হাছিল করা এবং এ জাতীয় সীমালংঘন থেকে বেঁচে থাকা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য অবশ্য কর্তব্য। অনেকে বিধান না জানার কারণে খামখেয়ালী বশতঃ এই অন্যায় কর্মগুলো করে থাকে। তাদের অজ্ঞতা দূরীভূত করা এবং বিশুদ্ধ জীবন পরিচালনাই এই নিবন্ধের উদ্দেশ্য। মহান আল্লাহ আমাদেরকে তাঁর খালেছ বান্দা হিসাবে কবুল করে নিন-আমীন!

. মুহাম্মাদ সাখাওয়াত হোসাইন


[1] মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/৫৬৫।

[2] মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/১৯৫৮।

[3] মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/৬০৩ ‘শীঘ্র ছালাত আদায় করা’ অনুচ্ছেদ।

[4] ছহীহ ইবনে খুযায়মাহ হা/৯৯৩।

[5] ছহীহ ইবনে খুযায়মা হা/১৯৯০; দারাকুৎনী হা/২২২৬; মুসতাদরাক  হাকেম হা/১৫৬৯; বুলূগুল মারাম হা/৬৭০।

[6] হাকেম হা/১৫৫৭; তিরমিযী হা/৭২০; ইবনু মাজাহ হা/১৬৭৬; বুলূগুল মারাম হা/৬৭১ সনদ ছহীহ।

[7] সূরা মুজাদালাহ ৩; বুখারী হা/১৯৩৬; মুসলিম হা/১১১১; মিশকাত হা/২০০৪ ‘ছওম’ অধ্যায়।

[8] মুসলিম হা/১১১১; বুলূগুল মারাম হা/৬৭৭।

[9] মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/২৬৮৮, মুওয়াত্ত্বা, বায়হাক্বী ৫/১৯২; ইরওয়া ৪/২৯৯ পৃঃ, হা/১১০০; ক্বাহত্বানী, পৃঃ ৬৪-৬৫।

[10] বুখারী হা/৬৬৬৩; বুলূগুল মারাম হা/১৩৬৭।

[11] বুখারী হা/৬৬৭৫; মিশকাত হা/৫০।

[12] মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/৩৪০৭ ‘কসম ও মানত’ অধ্যায়; বুখারী হা/৬১০৮; বুলূগুল মারাম হা/১৩৬০।

[13] বুখারী হা/৩৮৩৬; মুসলিম হা/১৬৪৬।

[14] তিরমিযী, মিশকাত হা/৩৪১৯ ঐ অধ্যায়; ছহীহ তিরমিযী হা/১২৪১; আবূদাঊদ হা/৩২৫১, সনদ ছহীহ।

[15] বুখারী হা/৬৭২২; মিশকাত হা/৩৪১২; বুলূগুল মারাম হা/১৩৬৩।

[16] মুসলিম হা/১৬৫০; মিশকাত হা/৩৪১৩।

[17] মুসলিম, বুলূগুল মারাম হা/১৩৭২।

[18] বুখারী হা/৬৬৯৬ ‘আনুগত্যে মানত’ অনুচ্ছেদ; মিশকাত হা/৩৪২৭।

[19] মুসলিম হা/১৬৪৫; মিশকাত হা/৩৪২৯।

[20] নাসাঈ, বুলূগুল মারাম হা/১০৯১ ‘যিহার’ অনুচ্ছেদ।

[21] ১৭৬. মুজাদালাহ ৫৮/৩-৪; বুখারী, মুসলিম, বুলূগুল মারাম হা/৬৬০।

[22] তিরমিযী, আবুদাঊদ ও অন্যান্য; মিশকাত হা/৫৫৩ ‘হায়েয’ অধ্যায়, সনদ ছহীহ।

[23] মির‘আত ৩/২৫১।

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

৫টি মন্তব্য

      1. আসসালামু আলাইকুম,
        সন্মানিত সম্পাদক মহোদয়,
        আর্টিকেলটি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পুনরায় পড়ুন। এখনও অনেক স্থানে মহান “আল্লাহর” নামের বানানটি অশুদ্ধ রয়েছে। এছাড়াও “অন্তর্ভূক্ত” বানান সহ আরও কিছু যুক্তবর্ণ অশুদ্ধ রয়েছে। দয়া করে দ্রুত সংশোধন করুন।

        জাযাকাল্লাহু খাইরান।

মন্তব্য করুন

Back to top button