মুসলিম জাহান

ফিলিস্তীনের পরিচয়

ফিলিস্তীনের পূর্ব নাম ‘কেন‘আন’। হযরত নূহ (আঃ)-এর পঞ্চম অধঃস্তন পুরুষের নাম ‘ফিলিস্তীন’। ‘ন্টি’ ও ‘এজিয়ান’ সাগরের দ্বীপপুঞ্জ থেকে আগত ফিলিস্তীনীদের নামানুসারে এই অঞ্চল ‘ফিলিস্তীন’ নামে পরিচিত হয়। খ্রিষ্টানদের আগমনের বহু পূর্বেই এরা এই অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে। ফিলিস্তীনীরা ‘অগনন’ সম্প্রদায়ভুক্ত এবং আরব বংশোদ্ভূত। খৃষ্টীয় সপ্তম শতাব্দীতে ইসলামের অভ্যুদয়ের সাথে সাথে তারা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে। খলীফা আবুবকর ও ওমর (রাঃ)-এর সময়ে ১৩-১৭ হিজরী সনে ফিলিস্তীন পূর্ণভাবে ইসলামী খেলাফতের অধীনস্ত হয়। তখন থেকেই ফিলিস্তীন মুসলিম দেশ হিসাবে পরিচিত। মাঝে ১০৯৬ হ’তে ১১৮৭ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত ৯১ বছর খ্রিষ্টান নুসেডাররা একে দখলে রেখেছিল। তারা ‘মসজিদে আক্বছা’-এর মধ্যে আশ্রয় গ্রহণকারী সত্তুর হাযারের অধিক মুসলমানকে এক সপ্তাহের মধ্যে হত্যা করেছিল। পরে ছালাহুদ্দীন আইয়ূবীর কাছে পরাজিত হয়ে খ্রিষ্টান দস্যুরা এদেশ ছেড়ে পালিয়ে যায়। এরপর দীর্ঘ ৪০০ বছর যাবত ফিলিস্তীন ওছমানীয় তুর্কী খেলাফতের শাসনাধীনে একটি প্রাদেশিক রাজ্য ছিল। তাদের নিজস্ব সরকার ছিল, ছিল পৌরসভা এবং রাজধানী কনস্টান্টিনোপলে ওছমানীয় পার্লামেন্টে ছিল তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধি।

এরপর মহাপ্রলয়ের মত বিশ্বব্যাপী ১ম মহাযুদ্ধের দাবানল জ্বলে উঠল ১৯১৪ সালে। যুদ্ধ শেষে ‘ভার্সাই চুক্তি’র বলে ফিলিস্তীনকে নিয়ে নেয় বৃটেন। শুরু হয় বিপর্যয়। ১৯১৭ সালের ২রা নভেম্বর বৃটেন কর্তৃক ‘বেলফোর’ ঘোষণার ভিত্তিতে ১৯১৮ সাল থেকে বহিরাগত ইহূদীদের জন্য ফিলিস্তীনের দুয়ার উন্মুক্ত করে দেওয়া হয় এবং সাথে সাথে তাদের যাবতীয় নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণাধিকার নিয়ে আইন প্রণয়ন করা হয়। ফলে বিভিন্ন দেশ থেকে ইহূদীরা এখানে এসে বসতি স্থাপন শুরু করে। ভূমধ্যসাগর তীরবর্তী ১০,১৬২ বর্গমাইল জুড়ে প্রতিষ্ঠিত ফিলিস্তীনে (প্যালেস্টাইন) ১৯১৮ সালে বৃটিশ অধিকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পূর্বে লোকসংখ্যা ছিল ৭০,৮০০। এর মধ্যে আরব ছিল শতকরা ৯৩ ভাগ এবং বাদবাকী ৭ ভাগ ছিল দেশীয় ইহূদী। মাত্র ৩০ বছর পরে ১৯৪৮ সালে ১৪ই মে যখন বৃটেন সেখান থেকে চলে আসে, তখন ফিলিস্তীনের লোকসংখ্যা দাঁড়ায় ১৯,৫০,০০০। যার মধ্যে ২ লাখ দেশীয় ইহূদী, ৪ লাখ বহিরাগত ইহূদী ও বাদবাকী সাড়ে ১৩ লাখ সুন্নী আরব মুসলিম। ফিলিস্তীনের মর্যাদাগত পরিচয় হ’ল এই যে, এর বুকেই রয়েছে মুসলমানদের প্রথম ক্বিবলা ও মি‘রাজের স্মৃতিধন্য ‘বায়তুল আক্বছা’। প্রথমে কা‘বা গৃহ নির্মাণের ৪০ বছর পর এ গৃহ নির্মিত হয়। পরবর্তীতে দাঊদ ও সুলায়মান (আঃ) কর্তৃক নির্মিত এটিই পৃথিবীর সর্ব প্রাচীন ও দ্বিতীয় ইবাদত গৃহ। এখানে ‘বেথেলহামে’ ঈসা (আঃ) জন্মগ্রহণ করেন এবং এখান থেকেই তাঁকে আসমানে উঠিয়ে নেওয়া হয়। ক্বিয়ামতের পূর্বে তাঁর হাতেই এখানে ইয়াজূজ-মাজূজ ও দাজ্জাল ধ্বংস হবে। ‘তূর’ পাহাড়ও এখানে অবস্থিত।[1]

আরও দেখুন:  পুণ্যভূমি মক্কা : মর্যাদা ও বৈশিষ্ট্য

উল্লেখ্য যে, পশ্চিমা শক্তিসমূহের চাপ ও প্ররোচনায় ১৯৪৭ সালের ২৯শে নভেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ফিলিস্তীনের বিভক্তি প্রস্তাব গ্রহণ করে। যেখানে ফিলিস্তীনে একটি পৃথক আরব রাষ্ট্র ও একটি পৃথক ইহূদী রাষ্ট্র এবং যেরুযালেমের জন্য একটি আন্তর্জাতিক অঞ্চল গঠনের কথা বলা হয়। অতঃপর ১৯৪৮ সালে বৃটেন ফিলিস্তীন ত্যাগ করার সাথে সাথে ইহূদী নেতারা স্বাধীন ‘ইস্রাঈল’ রাষ্ট্রের ঘোষণা দেয় এবং তার কয়েক মিনিট পরেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইস্রাঈলকে স্বীকৃতি দেয়। অতঃপর ১৯৪৯ সালে বৃহৎ শক্তিবর্গ তাকে জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্র করে নেয়। এরপর ইঙ্গ-মার্কিন ও ইস্রাঈলী রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের মুখে দশ লক্ষ আরব মুসলিম নিজেদের দেশ ছেড়ে পার্শ্ববর্তী আরব দেশ সমূহে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। আর ফিলিস্তীনে থেকে যায় মাত্র ২,৪৭,০০০ নির্যাতিত আরব মুসলিম। ফিলিস্তীনের ৮০% ভূভাগ দখল করে নেয় আগ্রাসী ইস্রাঈলী দখলদাররা। সেদিন থেকে নিয়ে বিগত ৫২ বছর যাবত চলছে এই ফিলিস্তীন ট্রাজেডী। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন আরব রাষ্ট্রের উদ্বাস্ত্ত শিবিরে যাদের জন্ম ও মৃত্যু। ইস্রাঈলের পশ্চিম তীরের ফিলিস্তীনী ভূখন্ডে চলছে তাদের নিয়মিত রক্তের হোলিখেলা। যা আজও অব্যাহত রয়েছে…


[1] মুসলিম হা/২৯৩৭; মিশকাত হা/৫৪৭৫।

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

মন্তব্য করুন

Back to top button