সাম্প্রতিক প্রসঙ্গ

প্রসঙ্গ: খুতবার নিয়ন্ত্রণ বা সরকারী খুতবা

এক.

অনেকের ধারণা, হারামাইনের দেশ-সৌদি আরবে জুমার দিন সরকার সর্বরাহকৃত খুতবা পাঠ করতে হয় সে দেশের খতীব সাহেবগণকে। এটা ভুল ধারণা। সৌদি আরবে খতীব সাহেবগণ নিজেরাই খুতবা তৈরি করেন। এবং একই দিনে একেক মসজিদে একেক খুতবা পাঠ করা হয়। বিষয়টি যাঁচাইয়ের জন্য আপনি মক্কা ও মদীনার দুই মসজিদুল হারাম ও অন্যান্য কেন্দ্রীয় মসজিদসমূহের খুতবা পর্যবেক্ষণ করতে পারেন। আমি প্রায় অর্ধযুগ যাবত পেশাগত দায়িত্ব হিসেবে দেশটির বিভিন্ন কেন্দ্রিয় মসজিদে জুমার খুতবার অনুবাদ করে আসছি। বিশেষ কোন প্রেক্ষাপটে একান্ত প্রয়োজন মনে করলে সরকার তরফ হতে খতীবদের কোন বিষয়ে আলোচনার পরামর্শ দেওয়া হয় মাত্র। কালেভদ্রে জামে মসজিদসমূহে লিখিত খুতবা প্রেরণ করা হয়। মিশরে মসজিদগুলো নিয়ন্ত্রণ এবং সরকারের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য জামে মসজিদে সরকারী খুতবা পাঠ বাধ্যতামূলক।

দুই.
আমাদের দেশের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। এখানে সব মসজিদে যোগ্য খতীব কিংবা উপযুক্ত পরিবেশ নেই। খতীব নিয়োগ এবং অন্যান্য বিষয়ে নেই কোন কেন্দ্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা। সে দৃষ্টিকোণ থেকে পরিবেশ-পরিস্থিতি বিবেচনায় সকল মসজিদে যথোপযুক্ত খুতবার সুবিধার্থে প্রতি সপ্তহে একটি নমুনা খুতবা সকল খতীবদের সরবরাহের উদ্যোগ আমি ইতিবাচক মনে করি। তবে সম্প্রতি ইসলামী ফাউন্ডেশন কতৃক খতীব সাহেবদেরকে জুমার নির্ধারিত খুতবা পাঠের নির্দেশনা জারির বিষয়ে বেশিরভাগ উলামায়ে কেরাম বিব্রত। কারণ খুতবা নিয়ন্ত্রণের সরকারী ষোঘণার পর এমন উদ্যোগকে খবরদারী ও হস্তক্ষেপ ছাড়া আর কিইবা ভাবা যেতে পারে? তাছাড়া এদেশে সর্বত্র সরকারদলীয় প্রভাব প্রতিষ্ঠাই বড় সত্য। তাই সরকারী উদ্যোগের উদ্দেশ্যের সাধুতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক।

প্রকৃতপক্ষে আগেই উলামায়ে কেরাম নিজস্বভাবে এমন উদ্যোগ নেওয়া উচিত ছিল। নানা কারণে তা না হওয়ায় সেক্যুলার সরকারের খুতবা মন্ত্রের মতো পাঠ করতে হচ্ছে বা হবে। এখনো উলামায়ে কেরাম সরকারকে সহায়তা এবং উদ্যোগটিকে গ্রণযোগ্য করে তোলার জন্য আলোচনার মাধ্যমে অগ্রসর হতে পারেন। না হয় হাজার হাজার জীবন্ত মসজিদ নির্মমভাবে প্রাণ হারাবে।

আরও দেখুন:  এনআরসি : শতাব্দীর নিকৃষ্টতম আইন

তিন.
কয়েকটি বিষয় যোগ হলে একক খুতবা চালুর উদ্যোগ ইতিবাচক এবং উপকারী ও প্রশংসনীয় হতে পারে-

-খুতবা প্রণয় করবেন দেশের সর্বজন শ্রদ্ধেয় পরিচ্ছন্ন ইমেজের উলামায়ে কেরামের উচ্চ পরিষদ। সরকারী কোন প্রতিষ্ঠানের লোকজন এ দায়িত্ব পালন করবে না। চাঁদ দেখা কমিটির মতো এর জন্য গ্রহণযোগ্য কমিটি করা যেতে পারে। অথবা সেটা সম্ভব না হলে সিনিয়র পণ্ডিত ও যুগসচেতন উলামায় কেরাম নিজেরা এ কাজে উদ্যোগ নিতে পারেন।

-বিশেষ কোন প্রেক্ষাপট ছাড়া খুতবা হুবহু পাঠ বাধ্যতামূলক করা যাবে না। বরং তা কেবল দিকনির্দেশনা মূলক থাকবে।

-নমুনা খুতবার উ্দ্যোগ হতে হবে সহায়তামূলক খবরদারী কিংবা হস্তক্ষেপ মূলক নয়। প্রয়োজনে এর জন্য দেশব্যপী খতীব সাহেবদের নিয়ে মতবিনিময় সভা ও কর্মশালা হতে পারে। এক্ষেত্রেও স্থানীয় গণ্যমান্য উলামাগণকে সামনে রেখে কাজ করলে উদ্যোগটি সার্বজনিনতা অর্জন করবে।

-ইসলাম তথা কুরআন ও সুন্নাহর মূল স্পিরিট স্বাধীনভাবে যেন খুতবায় ফুটে ওঠে এবং কোনভাবেই ক্ষমতাসীন সরকার কিংবা কোন রাজনৈতিক দলের দলীয় প্রভাব খুতবায় বিস্তার লাভ না করে সেজন্য একটি নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নিতে হবে।

এসব বিষয় ব্যতিত কেবল সরকারী ফরমানে একক খুতবা চালুর উদ্যোগকে আলেম সমাজ সাদরে গ্রহণ করবেন বলে মনে হয় না। আর সেক্ষেত্রে এই উদ্যোগ সাময়ীকভাবে খতীবদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, মূল সমস্যার সমাধান কিংবা সুদূর প্রসারী কোন উপকারিতা বয়ে আনবে না।

(এটা আমার নিজস্ব অভিমত। এর ভালোমন্দ দিক নিয়ে আলোচনা হতে পারে। )

– আহমাদ উল্লাহ

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

মন্তব্য করুন

Back to top button