রামাযান ও ছিয়াম

রামাযানের একাল-সেকাল : সংযমের নাকি ভোজন উত্সবের মাস?

যে মুসলিমের ইসলাম সম্পর্কে সামান্যতম ধারণা আছে, সেও জানে এই মাস বারাকাহ ও ফজিলতের মাস।

এটা সেই মাস, যে মাসে পবিত্র কুরআন এ পৃথিবীতে নাযিল হয়। এই মাসের আগমন একজন মুসলিম বান্দার প্রতি আল্লাহ্র সুমহান নি‘আমাতগুলোর (অনুগ্রহসমূহের) একটি, কারণ রমযান কল্যাণময় একটি মওসুম। এ মাসে জান্নাতের দরজাসমূহ খুলে দেয়া হয়, জাহান্নামের দরজাসমূহ বন্ধ করে দেয়া হয়। এটি হল ক্বুর‘আনের মাস, আমাদের দ্বীনের গুরুত্বপূর্ণ, চূড়ান্ত সংগ্রামের মাস। বছরের শ্রেষ্ঠতম রাত্রি ‘লাইলাতুল ক্বাদর’ এই মাসেই আসে; যে রাত্রি হাজার মাসের চাইতে উত্তম। এটা সেই মাস, যে মাসে শয়তানকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়। এটা সেই মাস যে মাসের প্রতিটা মুহূর্তই দুয়া কবুলের আর গুনাহ মাফের মুহূর্ত। আল্লাহ্’তাআলা কুরআনুল কারীমে রামাদানের গুরুত্বের কথা শুনিয়েছেন। রাসুলাল্লাহ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার জীবদ্দশায় অসংখ্যবার রামাদানের ফযিলতের কথা বর্ণনা করেছেন।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ মাসকে বরণ করে নেয়ার জন্য আগে থেকে প্রস্তুতি গ্রহণ করতেন। শা’বানের শেষ দিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবীদের লক্ষ্য করে বললেন যে, যেই গুরুত্বপূর্ণ মাসটির অপেক্ষায় আমরা এতদিন ছিলাম সেটি আমাদের দুয়ারে এসে গেছে। তাই এখন আঁটসাঁট বেঁধে এ মাসের প্রতিটি মুহূর্ত থেকে যথাযথ ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করতে হবে। কোনো কোনো পূর্বসূরী (সাহাবীগণ, তাবি‘ঈনগণ …..) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তাঁরা ৬ মাস ধরে আল্লাহ্র কাছে দো‘আ করতেন যাতে তিনি তাঁদের এই মাস পাওয়ার তাওফীক্ব দেন, এরপর (রামাদান শেষে) ৫ মাস ধরে এই দো‘আ করতেন যেন (রামাদানের আ‘মালসমূহ) তাদের কাছ থেকে কবুল করা হয়। তাই একজন মুসলিম তার রবের কাছে দো‘আ করবে যাতে তিনি তাকে এই মাস পাবার তাওফীক্ব দেন সর্বোত্তম দ্বীনি অবস্থা ও শারীরিক সুস্থতার মাঝে এবং তাঁর কাছে এই দো‘আ করবে যাতে তিনি তাকে তাঁর আনুগত্যে সাহায্য করেন এবং তাঁর কাছে এই দো‘আ করবে যাতে তিনি তার আমল কবুল করেন।

আরও দেখুন:  নফল ছিয়াম : পরকালীন মুক্তির পাথেয় - (২)

অথচ, আমরা যারা নিজেদেরকে মুসলিম পরিচয় দেই তারা এই মাসে বর্তমানে কি করছি?

রামাদান ছিল তাঁদের জন্য ইবাদত ও আত্মশুদ্ধি মাস।

আমাদের জন্য রামাদান হলো উৎসব ও আত্মপ্রচারের মাস।

যারা সঠিকভাবে সংযম পালন এবং সালাত আদায় করবে তাদের জন্য রামাদান নিয়ে আসতো আনন্দজনক বার্তা, এবং তাঁরা সেই জন্য সর্বচ্চ প্রস্তুতি নিতেন।

আমরাও রামাদানের প্রস্তুতি নেই। বাড়ী রং করি, নতুন আসবাবপত্র-ডিনার সেট কিনি, জানালার পরদা থেকে বালিশের কাভার – সবই নতুন করে কিনি।

তাঁরা রামাদানের সংযমকে (fast) উপভোগ করতেন।

আমরা রামাদানের খানাপিনাকে (feast) উপভোগ করি।

তাঁদের সাওমের বৈশিষ্ট্য ছিল ক্ষুধা ও তৃষ্ণা।

আমাদের সাওমের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে বিপুল পরিমাণ খাদ্য ও পানীয়ের সমারোহ।

তাঁরা গুনে বলতে পারতেন সেহরি এবং ইফতারে কয়টা খেজুর খাবেন।

সেহরি এবং ইফতারে কত পদের খাবার আমরা খাই, সেটা আমরা গুনেই শেষ করতে পারবো না।

তাঁরা কুরআনকে পড়ে সেই শিক্ষাকে জীবনে ব্যবহারের প্রতি মনোনিবেশ করতেন।

আমরা ‘কুরআন খতমের’ প্রতি মনোনিবেশ করি।

রামাদান শুরুর প্রথমদিন থেকে তাঁরা লাইলাতুল কদরের রাতের জন্য অপেক্ষা করতেন।

রামাদান শুরুর প্রথমদিন থেকে আমরা ঈদের চাঁদ দেখে রামাদান শেষের অপেক্ষায় প্রহর গুনি।

লাইলাতুল কদরের খোঁজে তাঁরা রামাদানের শেষ দশদিন অধিক পরিমানে ইবাদত, ইতিকাফ ও ইস্তিগফার করতেন।

আমরা রামাদানের শেষ দশদিন মূল্যহ্রাস ও নতুন ডিজাইনের খোঁজে বেশী বেশী শপিং মলে ঘোরাঘুরি করি।

তাঁরা রামাদানে গভীর রাত পর্যন্ত আল্লাহ্তালার সামনে ইবাদতে দাঁড়িয়ে কাটাতেন।

রামাদানে আমরা গভীর রাত পর্যন্ত শপিং মল, ইফতার পার্টি ও খাবারের দোকানে ঘোরাঘুরি করে সময় কাটাই।

সেই দিনগুলোতে ধীরে সুন্দরভাবে কুরআন তেলওয়াত করতে পারে এমন ক্বারিরা পছন্দনীয় ছিলেন।

এখন যে ক্বারি যত বেশী দ্রুততায় কুরআন পাঠ করতে পারে, জনপ্রিয়তা ও চাহিদা তারই বেশী।

সেই সময় বিভিন্ন ভাবে লাইলাতুল কদর তথা রামাদানের মর্যাদা, বৈশিষ্ট্য ও ফযীলাত এর সম্পর্কে আলোচনা ও প্রচার করা হত।

আরও দেখুন:  রাসুল (সা.) যেভাবে রামযানের শেষ দশক কাটাতেন

বর্তমানে রামাদান উপলক্ষে প্রচারের সিংহভাগ জুড়ে থাকে শপিংমলগুলোর ৫০% -৭০% ছাড়, ফ্যাশন হাউজগুলোর মন মাতানো ঈদ ফ্যাশান, তারকাদের ঈদ ভাবনা, হোটেলের ইফতার ও সেহরি প্যাকেজ, ‘যাকাতের শাড়ী-লুঙ্গির’ আকর্ষণীয় অফার, ইত্যাদির প্রচার।

তাঁরা যখন নির্জনে, নিভৃতে আল্লাহ্র ইবাদতে মনসংযোগ করতেন।

আমরা তখন সবাই মিলে হইহল্লা করে ইফতার পার্টিতে সময় কাটাই।

রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ “ঐ ব্যক্তি হতভাগা, যে ব্যক্তি রামাদান পেল অথচ তার জীবনের গুনাহ মাফ করাতে পারলো না”।

আবূ বাক্র আল-বালাখী বলেছেন : “রাজাব মাস হল বীজ বপনের মাস, শা‘বান মাস হল ক্ষেতে সেচ প্রদানের মাস এবং রমযান মাস হল ফসল তোলার মাস।”

তিনি আরও বলেছেন : “রাজাব মাসের উদাহরণ হল বাতাসের ন্যায়, শা‘বান মাসের উদাহরণ মেঘের ন্যায়, রমযান মাসের উদাহরণ বৃষ্টির ন্যায় ; তাই যে রাজাব মাসে বীজ বপন করল না, শা‘বান মাসে সেচ প্রদান করল না, সে কীভাবে রমযান মাসে ফসল তুলতে চাইতে পারে?” আমাদের মূর্খতা, সদিচ্ছার অভাব, নির্বুদ্ধিতা এবং ঔদাসীন্য আমাদের বেঁধে রাখছে এই মাসের ফযিলত থেকে। নিতান্তই হতভাগা না হলে এই মাসের ফযিলত থেকে কেউই বঞ্চিত হয়না। কেউ না। এটা কত বড় একটা সুযোগ এটা বুঝতে মহাজ্ঞানী হতে হয়না। শুধু প্রয়োজন অন্তর দিয়ে একটু অনুধাবনের।  আসুন আমরা এই রামাদানে নিজদের তাকওয়া বাড়াই, এই মাসের সঠিক মর্যাদা দিয়ে সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করি, নিজেদের গুনাহ মাফ করতে সচেষ্ট হই। আল্লাহ আমাদেরকে এই রামাদান এবং আরো আরো রামাদান পাওয়ার তাওফিক দান করুন।

 

– সিফত মেহজাবিন

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

মন্তব্য করুন

Back to top button