বিভিন্ন ধর্ম ও মতবাদ

বৌদ্ধ ধর্ম

বৌদ্ধ ধর্ম আসলে হিন্দু আকিদা বা বিশ্বাসের একটি শাখা। বৌদ্ধ মূলত হিন্দু ধর্মীয় এক উপাধি, তার অর্থ আরিফ বা কুতুব। অতঃপর বৌদ্ধধর্মের প্রবর্তককে বৌদ্ধ বলা হয়, অবশেষে তা তার নামে পরিণত হয়।

বৌদ্ধ: বৌদ্ধ এক ধনাঢ্য পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন, তবে তিনি স্বীয় জীবন ত্যাগ করে ব্রহ্মা সন্ন্যাসীদের সাথে যোগ দেন, তাদের সাথে জীবন-যাপন করেন, কিন্তু তিনি তাদের নিকট সে হাকিকত পাননি যা তিনি তালাশ করছেন, অর্থাৎ (মানুষ ও পৃথিবীর অস্তিত্বের রহস্য), তাই তিনি তাদের পথ ত্যাগ করে নিজে নিজেই হাকীকত বা সে রহস্যভেদের জন্য পথ চলার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি স্বীয় কাপড় থেকে বিচ্ছিন্ন হন ও জঙ্গলে ঘুরে বেড়ান। নিজের নফসকে শাস্তি দেওয়ার বিভিন্ন পদ্ধতি অনুসরণ করেন, এ অবস্থায় তিনি অনেক বছর পার করেন, কিন্তু কোনো ফল লাভ হয়নি তার।

সর্বশেষ তিনি স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেন, ফিরার পথে তিনি একটি গাছের নিচে বসেন, সেখানে—তার ভাষ্যানুযায়ী—তার উপর হাকিকত অবতীর্ণ হয়, তখন তিনি নিশ্চিত হন বৌদ্ধ হয়েছেন, অর্থাৎ আরিফ অথবা কুতুব। তার উপর বেহুশ অবস্থা আপতিত হয়, তিনি না খেয়ে ও না পান করে দীর্ঘ দিন ধ্যান করেন, অতঃপর তিনি মানুষদেরকে সে ভাব ও চিন্তার দিকে আহ্বান করেন, যা তার অন্তরে আপতিত হয়েছে।

বৌদ্ধদের গুরুত্বপূর্ণ আকিদা:

হিন্দু ও বৌদ্ধরা অনেক মূলনীতি ও দার্শনের ক্ষেত্রে একমত, যেমন পুনর্জন্ম ও আল্লাহর সাথে একাকার হওয়ার আকিদা, তবে কয়েকটি বিষয়ে বৌদ্ধরা হিন্দুদের থেকে পৃথক বিশ্বাস পোষণ করে, তন্মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে:

১. ব্রহ্মার অস্তিত্ব অস্বীকার করা। অর্থাৎ হিন্দুদের উপাস্যের অস্তিত্ব ও তার জন্য কুরবানি পেশ করার বিধান অস্বীকার করা।

২. হিন্দু সমাজের ধাপগুলো অস্বীকার করা।

৩. যুহুদ ও দুনিয়া ত্যাগ করার নতুন পদ্ধতি গ্রহণ করা।

আরও দেখুন:  ইয়াহূদী ধর্ম

বৌদ্ধদের ক্রমোন্নতি:

বৌদ্ধরা বৌদ্ধকে অসম্ভব ধরণের সম্মান করে, তার জীবন, আমল ও চিন্তা সম্পর্কে অনেক কিছু লিপিবদ্ধ করেছে তারা। বৌদ্ধ ধর্মে অনেক জাতি ও শ্রেণির লোক প্রবেশ করার ফলে তারা দু’ভাগে ভাগ হয়:

১. আদি বৌদ্ধ: তাদেরকে দক্ষিণা বৌদ্ধ বলা হয়, কারণ তারা বার্মা, থাইল্যান্ড ও শ্রীলঙ্কায় বিস্তার লাভ করে। আদি বৌদ্ধরা মূলত বৌদ্ধকে উপাস্য মানে ও তার ইবাদত করে। তাদের গুরু ‘লামা’ তিব্বতে বাস করেন। তার অনুসারীরা বিশ্বাস করে যে, ইলাহ তার মধ্যে অনুপ্রবেশ করে। তারা কঠিনভাবে সন্ন্যাসবাদ গ্রহণের পক্ষপাতী।

২. আধুনিক বৌদ্ধ: তাদেরকে উত্তরা বৌদ্ধ বলা হয়, কারণ তারা কুরিয়া, জাপান ও চীনে সম্প্রসারিত।

তারা দর্শনশাস্ত্র, গভীরতা ও একাধিক উপাস্যের কারণে আলাদা বৈশিষ্ট্যের অধিকারী, যেমন চীনে বিশ্বাস করে উপাস্যের সংখ্যা ৩৩টি, জাপানিরা বিশ্বাস করে তাদের রাজা উপাস্যের বংশোদ্ভূত।

 

লেখক: ড. সফর ইবনে আব্দুর রহমান আল-হাওয়ালি
অনুবাদ : সানাউল্লাহ নজির আহমদ
সম্পাদনা : ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

৫টি মন্তব্য

  1. বৌদ্ধ ধর্ম গৌতম বুদ্ধ কর্তৃক প্রচারিত একটি ধর্ম বিশ্বাস এবং জীবন দর্শন। বৌদ্ধ ধর্ম আপাত অর্থে জীবন দর্শন। অনুসারীদের সংখ্যায় বৌদ্ধধর্ম বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম ধর্ম।[২] আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দিতে গৌতম বুদ্ধের জন্ম। বুদ্ধের পরিনির্বাণের পরে ভারতীয় উপমহাদেশ সহ এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে বৌদ্ধ ধর্মের প্রসার হয়। বর্তমানে বৌদ্ধ ধর্ম দুটি প্রধান মতবাদে বিভক্ত। প্রধান অংশটি হচ্ছে হীনযান বা থেরবাদ (সংস্কৃত: স্থবিরবাদ)। দ্বিতীয়টি মহাযান নামে পরিচিত। বজ্রযান বা তান্ত্রিক মতবাদটি মহাযানের একটি অংশ। শ্রীলংকা, ভারত, ভুটান, নেপাল, লাওস, কম্বোডিয়া, মায়ানমার, চীন, জাপান, মঙ্গোলিয়া, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, ও কোরিয়াসহ পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশে এই ধর্মবিশ্বাসের অনুসারী রয়েছে। সবচেয়ে বেশি বৌদ্ধধর্মাবলম্বী বাস করেন চীনে। বাংলাদেশের উপজাতীদের বৃহত্তর অংশ বৌদ্ধধর্মে দীক্ষিত।

    ব্যুৎপত্তি

    আক্ষরিক অর্থে “বুদ্ধ” বলতে একজন জ্ঞানপ্রাপ্ত, উদ্বোধিত, জ্ঞানী, জাগরিত মানুষকে বোঝায়। উপাসনার মাধ্যমে উদ্ভাসিত আধ্যাত্মিক উপলব্ধি এবং পরম জ্ঞানকে বোধি বলা হয় (যে অশ্বত্থ গাছের নিচে তপস্যা করতে করতে বুদ্ধদেব বুদ্ধত্ব লাভ করেছিলেন তার নাম এখন বোধি বৃক্ষ)। সেই অর্থে যে কোনও মানুষই বোধিপ্রাপ্ত, উদ্বোধিত এবং জাগরিত হতে পারে। সিদ্ধার্থ গৌতম এইকালের এমনই একজন “বুদ্ধ”। বুদ্ধত্ব লাভের পূর্ববর্তী (জাতকে উল্লেখিত) জীবন সমূহকে বলা হয় বোধিসত্ত্ব। বোধিসত্ত্ব জন্মের সর্বশেষ জন্ম হল বুদ্ধত্ব লাভের জন্য জন্ম। ত্রিপিটকে, বোধিসত্ত্ব হিসেবে ৫৪৭ (মতান্তরে ৫৫০) বার বিভিন্ন কূলে (বংশে) জন্ম নেবার ইতিহাস উল্লেখ আছে যদিও সুমেধ তাপস হতে শুরু করে সিদ্ধার্থ পর্যন্ত অসংখ্যবার তিনি বোধিসত্ত্ব হিসেবে জন্ম নিয়েছেন ।[৩] তিনি তার আগের জন্মগুলোতে প্রচুর পুণ্যের কাজ বা পারমী সঞ্চয় করেছিলেন বিধায় সর্বশেষ সিদ্ধার্থ জন্মে বুদ্ধ হবার জন্য জন্ম গ্রহণ করেন। বুদ্ধত্ব লাভের ফলে তিনি এই দুঃখময় সংসারে আর জন্ম নেবেন না, এটাই ছিলো তার শেষ জন্ম। পরবর্তী মৈত্রেয় বুদ্ধ জন্ম না নেওয়া পর্যন্ত পৃথিবীতে তার শাসন চলবে।

    গৌতম বুদ্ধের জীবনী

    বুদ্ধের দর্শন

    বুদ্ধের দর্শনের প্রধান অংশ হচ্ছে দুঃখের কারণ ও তা নিরসনের উপায়। বাসনা হল সর্ব দুঃখের মূল। বৌদ্ধমতে সর্বপ্রকার বন্ধন থেকে মুক্তিই হচ্ছে প্রধান লক্ষ্য- এটাকে নির্বাণ বলা হয়। নির্বাণ শব্দের আক্ষরিক অর্থ নিভে যাওয়া (দীপনির্বাণ, নির্বাণোন্মুখ প্রদীপ), বিলুপ্তি, বিলয়, অবসান। কিন্তু বৌদ্ধ মতে নির্বাণ হল সকল প্রকার দুঃখ থেকে মুক্তি লাভ। এই সম্বন্ধে বুদ্ধের চারটি উপদেশ যা চারি আর্য সত্য (পালিঃ চত্বারি আর্য্য সত্যানি) নামে পরিচিত। তিনি অষ্টাঙ্গিক মার্গ উপায়ের মাধ্যমে মধ্যপন্থা অবলম্বনের উপর বিশেষ জোর দিয়েছেন।

    পরকাল
    বুদ্ধ পরকাল সম্বন্ধে অনেক কিছুই বলে গেছেন, পরকাল নির্ভর করে মানুষের ইহ জন্মের কর্মের উপর । মৃত্যুর পর মানুষ ৩১ লোকভুমির যে কোনো একটিতে গমন করে। এই ৩১ লোকভুমি হছে ৪ প্রকার অপায় : তীর্যক (পশু-পাখি কুল), প্রেতলোক (প্রেত-পেত্নী), অসুর (অনাচারী দেবকুল), নরক (নিরয়)। ৭ প্রকার স্বর্গ : মনুষ্যলোক, চতুর্মহারাজিক স্বর্গ, তাবতিংশ স্বর্গ, যাম স্বর্গ, তুষিত স্বর্গ, নির্মানরতি স্বর্গ, পরনির্মিত বসবতি স্বর্গ। রুপব্রম্মভূমি (১৬ প্রকার) = ১৬ প্রকার রুপব্রম্মভূমি । অরুপব্রম্মভূমি ( ৪ প্রকার) = ৪ প্রকার অরুপব্রম্মভূমি । মোট ৩১ প্রকার । এই ৩১ প্রকার লোকভুমির উপরে সর্বশেষ স্তর হচ্ছে নির্বাণ ( পরম মুক্তি ) [৪] যেমন : ইহজন্মে মানুষ যদি মাতৃহত্যা , পিতৃহত্যা , গুরুজনের রক্তপাত ঘটায় তাহলে মৃত্যুর পর সেই মানুষ চতুর অপায়ে ( তীর্যক, প্রেতলোক, অসুর, নরক) জন্মগ্রহণ করে, আর ইহজন্মে মানুষ যদি ভালো কাজ করে তাহলে মৃত্যুর পর সেই মানুষ বাকি ২৭ লোকভূমিতে যেকোনো এক ভূমিতে জন্মগ্রহণ করতে হবে।

    বৌদ্ধধর্মের মূলনীতি

    চতুরার্য সত্য
    দুঃখ
    দুঃখ সমুদয়: দুঃখের কারণ
    দুঃখ নিরোধ: দুঃখ নিরোধের সত্য
    দুঃখ নিরোধ মার্গ: দুঃখ নিরোধের পথ
    অষ্টাঙ্গিক মার্গ
    সম্যক দৃষ্টি, (সম্যক ধারণা বা চিন্তা) (Right View),
    সম্যক সংকল্প, (Right Resolve),
    সম্যক বাক্য, (Right Speech),
    সম্যক আচরণ, (Right Action),
    সম্যক জীবিকা (জীবনধারণ), (Right Livelihood),
    সম্যক প্রচেষ্টা, (Right Effort),
    সম্যক স্মৃতি (মনন), (Right Mindfulness),
    সম্যক সমাধি (একাগ্রতা) (Right Samadhi/Concentration)।
    এই আটটি উপায়কে একত্রে বলা হয় আয্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ, যার দ্বারা জীবন থেকে দুঃখ দূর করা বা নির্বাণ প্রাপ্তি সম্ভব। এই আয্য অষ্টাঙ্গিক মার্গের উপর ভিত্তি করেই বৌদ্ধ ধর্মে দশ শীল, অষ্টশীল এবং পঞ্চশীলের উৎপত্তি। অষ্টাঙ্গিক মার্গকে বৌদ্ধ ধর্মের মূল ভিত্তি বলা যায়, যা মধ্যপথ নামে অধিক পরিচিত।

    ত্রিশরণ মন্ত্র
    আর্যসত্য এবং অষ্টবি

  2. আপনারাতো অন্য ধর্মকে কিছুটা হলেও হেও প্রতিপন্ন করছেন এভাবে পোষ্ট দেওয়ার মাধ্যমে। আপনার এখানে ভূল রয়েছে। এভাবে ভূল কিংবা মিথ্যা প্রচার করা এক জন ধার্মিক সত্যবাদীরা কখনোই করেননা। তাই বিনীত অনুরোধ অন্য ধর্মকে হেও দৃষ্টিতে নয় মৈত্রী, ভালো চোখে দেখুন।

    1. আমরা যথাসম্ভব সঠিক তথ্য উপস্থাপনের চেষ্টা করি। কোনো ধর্মকে হেয় প্রতিপন্ন করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। আমাদের উদ্দেশ্য বিভিন্ন ধর্ম ও মতবাদের মূল বিষয়বস্তু সাধারণ মুসলমানকে জানানো। কোনো তথ্য ভুল থাকলে তা প্রমাণসহ কমেন্ট করতে পারেন।

মন্তব্য করুন

Back to top button