হজ্জ ও ওমরাহ

হাজারে আসওয়াদ (কালো পাথর)

হজ বা ওমরাহ করার সময় সবার কালো পাথরের দিকে বিশেষ আগ্রহ থাকে। সবাই একে চুমু খাওয়ার জন্য আকাঙ্ক্ষা পোষণ করেন। এর নাম হাজারে আসওয়াদ। বেহেশতি এই কালো পাথরটি (এখন অবশ্য কয়েকটি খণ্ডে বিভক্ত) কাবা শরিফের পূর্ব কোনে লাগানো। এত চুমু খাওয়ার ফজিলত অত্যন্ত বেশি।

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘যে ব্যক্তি রুকনে ইয়ামানী ও হাজারে আসওয়াদ (কালো পাথর) স্পর্শ করবে, তার সমস্ত গোনাহ ঝরে পড়বে’।[1] তিনি বলেন, ‘যে ব্যক্তি বায়তুল্লাহ্র সাতটি ত্বাওয়াফ করবে ও শেষে দু’রাক‘আত ছালাত আদায় করবে, সে যেন একটি গোলাম আযাদ করল’। ‘এই সময় প্রতি পদক্ষেপে একটি করে গোনাহ ঝরে পড়ে ও একটি করে নেকী লেখা হয়’।[2] তিনি বলেন, ‘ত্বাওয়াফ হ’ল ছালাতের ন্যায়। এই সময় কোন কথা বলা যাবে না, নেকীর কথা ব্যতীত’।[3]

তিনি বলেন, ‘আল্লাহ ক্বিয়ামতের দিন হাজারে আসওয়াদকে উঠাবেন এমন অবস্থায় যে, তার দু’টি চোখ থাকবে, যা দিয়ে সে দেখবে ও একটি যবান থাকবে, যা দিয়ে সে কথা বলবে এবং ঐ ব্যক্তির জন্য সাক্ষ্য দিবে, যে ব্যক্তি খালেছ অন্তরে তাকে স্পর্শ করেছে’।[4]

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) থেকে আরও বর্ণিত হয়েছে যে, ‘হাজারে আসওয়াদ’ প্রথমে দুধ বা বরফের চেয়েও সাদা ও মসৃণ অবস্থায় জান্নাত থেকে অবতীর্ণ হয়। অতঃপর বনু আদমের পাপ সমূহ তাকে কালো করে দেয়’।[5]

মনে রাখা উচিত যে, পাথরের নিজস্ব কোন ক্ষমতা নেই। আমরা কেবলমাত্র রাসূলের সুন্নাতের উপর আমল করব। যেমন ওমর ফারূক (রাঃ) উক্ত পাথরে চুমু দেওয়ার সময় বলেছিলেন, ‘আমি জানি যে, তুমি একটি পাথর মাত্র। তুমি কোন উপকার বা ক্ষতি করতে পারো না। তবে যদি আমি আল্লাহ্র রাসূলকে না দেখতাম তোমাকে চুমু দিতে, তাহ’লে আমি তোমাকে চুমু দিতাম না’।[6] ওমর ফারূক (রাঃ) উক্ত পাথরে চুমু খেয়েছেন ও কেঁদেছেন’।[7]
হাজারে আসাওয়াদের আভিধানিক অর্থ হলো কালো পাথর। তবে অনেক হাদিসে একে সাদা রঙের পাথর বলে উল্লেখ রয়েছে। আল্লামা আবু আবদুল্লাহ আল-ফাকেহি তাঁর ‘আখবারে মক্কা’ গ্রন্থে হজরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রা.) থেকে একটি হাদিস বর্ণনা করেছেন। হাদিসটির সনদ দুর্বল। এতে বলা হয়েছে :

‘রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যদি জাহেলিয়াতের অপবিত্রতা ও নাপাকি এবং জালেম ও পাপিষ্টদের হাতের কালিমায় হাজারে আসওয়াদ কলুষিত না হতো, তাহলে এর মাধ্যমে সব পঙ্গুত্বের চিকিৎসা হতো এবং আল্লাহ প্রথম দিন একে যে আকৃতিতে সৃষ্টি করেছেন হুবহু সেই আকৃতিতেই পাওয়া যেত। আল্লাহ এর রং পরিবর্তন করে এই জন্যই কালো করে দিয়েছেন যে, দুনিয়াবাসী মানুষ যেন বেহেশতের সৌন্দর্য (দুনিয়াতে বসেই) দেখতে না পায় এবং এটা যেন বেহেশতের মধ্যেই ফিরে আসে। এটি বেহেশতের সাদা ইয়াকুত পাথরের একটি। হজরত আদমকে (আ.) পৃথিবীতে পাঠানোর সময় আল্লাহ তা কাবা শরিফের স্থানে রেখে দিয়েছিলেন। তখন কাবাঘর ছিল না। তখন জমিন ছিল পবিত্র, এতে কোনো গুনাহ হতো না।

আরও দেখুন:  পুণ্যভূমি মক্কা : মর্যাদা ও বৈশিষ্ট্য

এতে গুনাহ করার মতো কোনো অধিবাসী ছিল না। আল্লাহ হারাম সীমান্তের চারদিকে একদল ফেরেশতাকে সারি বেঁধে পাহারার কাজে নিয়োজিত করেন। তখন জমিনের অধিবাসী ছিল জিন। এই পাথরের দিকে নজর করার কোনো অধিকার তাদের ছিল না। কেননা, এটা একটি বেহেশতি জিনিস। যে বেহেশতের দিকে নজর করবে সে তাতে প্রবেশ করবে। যে ব্যক্তির জন্য জান্নাত ওয়াজিব হয়েছে তারই কেবল ওই পাথরটি দেখা উচিত। ফেরেশতারা সবাইকে বিতাড়িত করতে থাকে এবং কাউকে তা দেখার অনুমতি দিচ্ছিল না।’

কাবাঘর নির্মাণের সময় ফেরেশতরা হজরত ইব্রাহিমকে (আ.) পাথরটি এনে দিলে তিনি কাবাঘরের পূর্বকোনে লাগান। রাসুলুল্লাহর (সা.) নবুঅতের আগে কুরাইশরা কাবাঘর সংস্কারের সময় তিনি নিজ হাতে পাথরটিকে যথাযথ স্থানে রেখে সম্ভাব্য সঙ্ঘাত এড়ানোর ব্যবস্থা করেছিলেন।

পাথরটি অবশ্য অটুট থাকেনি। হজরত আবদুল্লাহ বিন যোবায়েরের শাসনামলে কাবা শরিফে আগুন লাগে। এ সময় হাজারে আসওয়াদটিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে তিন টুকরা হয়ে যায়। তিনি এটিকে রূপা দিয়ে মুড়িয়ে দেন। তবে সবচেয়ে দুঃখজনক ঘটনাটি ঘটে ৩১৭ হিজরিতে। এ সময় কারামতি সম্প্রদায়ের লোকজন হাজারে আসওয়াদ খুলে নিয়ে কুফার একটি মসজিদে লাগিয়ে দেয়। তাদের উদ্দেশ্য ছিল লোকজন যেন হজের জন্য সেখানে না যায়। ২২ বছর পর আবুল কাসিম মুতিউ, কারো মতে আবুল আব্বাস ফজল বিন আল মোকতাদের ৩০ হাজার দিনারের বিনিময়ে তা আবার মক্কায় নিয়ে এসে কাবাঘরে লাগিয়ে দেন।

হাজারে আসওয়াদ এখন বিশেষভাবে সংরক্ষণ করা হচ্ছে। ১২৬৮ হিজরিতে সুলতান আবদুল হামিদ হাজারে আসওয়াদকে সোনা দিয়ে মুড়িয়ে দেন।

 


 

[1] ছহীহ ইবনু খুযায়মা হা/২৭২৯; ছহীহ নাসাঈ হা/২৭৩২।

[2] তিরমিযী ও অন্যান্য, মিশকাত হা/২৫৮০।

[3] তিরমিযী, নাসাঈ, মিশকাত হা/২৫৭৬; ইরওয়া হা/১১০২।

[4] তিরমিযী, ইবনু মাজাহ, দারেমী, মিশকাত হা/২৫৭৮।

[5] তিরমিযী, মিশকাত হা/২৫৭৭; ছহীহ ইবনু খুযায়মা হা/২৭৩৩।

[6] মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/২৫৮৯।

আরও দেখুন:  ওমরাহ ও তামাত্তু হজ্জের নিয়মাবলী ও প্রয়োজনীয় দো‘আ সমূহ

[7] বায়হাক্বী ৫/৭৪ পৃঃ, সনদ জাইয়িদ।

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

মন্তব্য করুন

Back to top button